বাড়িতে সোলার পাওয়ার সিস্টেমের সুবিধা: কেন এটি লাভজনক বিনিয়োগ?

সর্বাধিক আলোচিত

গরমকাল এলেই আমাদের সবার মনে একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করে। একদিকে কাঠফাটা রোদ আর অসহ্য গরম, অন্যদিকে এসি বা ফ্যান চালানোর কারণে মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলের বিশাল অঙ্ক। এর সাথে আবার লোডশেডিংয়ের বিরক্তি তো আছেই। প্রতিদিনের এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পেতে আজকাল অনেকেই বিকল্প রাস্তার খোঁজ করছেন। আর ঠিক এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি আলো ছড়াচ্ছে সৌরশক্তি বা সোলার এনার্জি। বাড়ির ছাদে বা উঠোনে এক টুকরো ফাঁকা জায়গা থাকলে, তাকে কাজে লাগিয়ে আপনি নিজের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন।

প্রথমবার শোনার পর মনে হতে পারে, এতে অনেক টাকা খরচ। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝবেন, এটি আসলে খরচের বদলে চমৎকার একটি সঞ্চয়। আজ আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব সোলার পাওয়ার সিস্টেমের সুবিধা নিয়ে। এই গাইডটি পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন কেন এটি কেবল একটি শখ নয়, বরং আপনার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য সবচেয়ে লাভজনক একটি বিনিয়োগ।

অর্থনৈতিক সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

যেকোনো নতুন প্রযুক্তি কেনার আগে আমরা প্রথমেই হিসাব করি, এতে আমার পকেটের কত টাকা বাঁচবে। সোলার প্যানেল বসানোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণই হলো বিদ্যুৎ বিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। গ্রিডের বিদ্যুতের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে এই খরচ দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু একবার সোলার সিস্টেম বসিয়ে নিলে, সূর্যের আলো যতদিন আছে, আপনার বিদ্যুৎ ততদিন ফ্রি। প্রাথমিক খরচটা একটু বেশি মনে হলেও, প্রতিদিনের বেঁচে যাওয়া টাকা হিসাব করলে দেখবেন মাত্র ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যেই আপনার পুরো বিনিয়োগ উঠে এসেছে। এরপর প্যানেলের বাকি জীবনকাল, অর্থাৎ প্রায় ২০-২৫ বছর আপনি একদম বিনামূল্যে বিদ্যুৎ উপভোগ করবেন।

বিদ্যুৎ বিলের ওপর সরাসরি প্রভাব

আমরা প্রতিনিয়ত লাইট, ফ্যান, এসি, ফ্রিজ বা পানির পাম্প ব্যবহার করছি। আপনি যদি একটি অন-গ্রিড বা হাইব্রিড সিস্টেম ব্যবহার করেন, তবে দিনের বেলায় আপনার পুরো বাড়ি সোলার থেকে চলবে। ফলে সাধারণ মিটার খুব ধীর গতিতে ঘুরবে বা একেবারেই ঘুরবে না।

খরচের খাত সাধারণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (গ্রিড) সোলার পাওয়ার সিস্টেম
মাসিক বিল ব্যবহার অনুযায়ী প্রতি মাসে বাড়তে থাকে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে
প্রাথমিক খরচ কেবল সংযোগ ও মিটার বসানোর খরচ প্যানেল ও ইনভার্টার খরচ (এককালীন বেশি)
দীর্ঘমেয়াদি লাভ কোনো রিটার্ন নেই, পুরোটাই খরচ ৫-৭ বছরে মূল টাকা ফেরত, এরপর পুরোটাই লাভ
দাম বাড়ার ঝুঁকি ইউনিটের দাম বাড়লে খরচ বাড়ে বিদ্যুতের দাম বাড়লেও কোনো চিন্তা নেই

Benefits of Solar Power System

পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সবুজ শক্তির ব্যবহার

শুধু নিজের পকেট বাঁচানোই নয়, পৃথিবীর প্রতিও আমাদের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আমরা প্রতিদিন যে সাধারণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, তার বড় একটি অংশ আসে কয়লা, ডিজেল বা গ্যাস পুড়িয়ে। এই প্রক্রিয়ায় বাতাসে মিশছে টনকে টন বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড, যা আমাদের পৃথিবীকে মারাত্মকভাবে গরম করে তুলছে। কিন্তু সৌরশক্তি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি উৎস। এটি ব্যবহারের সময় কোনো ধরনের ধোঁয়া, শব্দ বা ক্ষতিকারক গ্যাস তৈরি হয় না। প্রকৃতিকে বাঁচানোর পাশাপাশি সোলার পাওয়ার সিস্টেমের সুবিধা হলো এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে সাহায্য করে।

কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর কার্যকর উপায়

একটি সাধারণ বাড়ির ছাদে বসানো সোলার সিস্টেম বছরে প্রায় ৩-৪ টন কার্বন নিঃসরণ আটকাতে পারে। এটি অনেকটা প্রতি বছর ১০০টির বেশি নতুন গাছ লাগানোর মতো উপকার করে। এছাড়া সাধারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে টারবাইন ঠান্ডা করতে প্রচুর বিশুদ্ধ পানি লাগে, কিন্তু সোলারে এক ফোঁটা পানিরও দরকার হয় না।

শক্তির উৎস কার্বন নিঃসরণ (প্রতি কিলোওয়াট) পরিবেশের ওপর প্রভাব
কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রায় ১০০০ গ্রাম মারাত্মক ক্ষতিকর, বায়ু দূষণ ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ায়
প্রাকৃতিক গ্যাস প্রায় ৪০০-৫০০ গ্রাম মাঝারি মানের দূষণ তৈরি করে
সৌরশক্তি (সোলার) ৪০-৫০ গ্রাম (কেবল তৈরির সময়) সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও নীরব

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্স

বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের বিকট শব্দ আর তেলের ধোঁয়া সহ্য করার দিন এখন শেষ। সৌরবিদ্যুৎ আপনাকে অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল থাকতে দেয় না। যখন জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ থাকে না বা ঝড়ের কারণে তার ছিঁড়ে যায়, তখনও আপনার ঘর আলোকিত থাকে। সঠিক ক্ষমতার ইনভার্টার এবং মজবুত ব্যাটারি ব্যবহার করলে এসি থেকে শুরু করে ওভেন—বড় বড় গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিও অনায়াসে চালানো যায়। এটি আপনাকে বিদ্যুতের দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বা ‘এনার্জি ইন্ডিপেন্ডেন্ট‘ করে তোলে।

লোডশেডিংয়ের ঝামেলা থেকে চিরতরে মুক্তি

প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে এখন হাইব্রিড সোলার ইনভার্টারগুলো এতটাই স্মার্ট যে, বিদ্যুৎ চলে গেলে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই এটি ব্যাটারি থেকে পাওয়ার নেওয়া শুরু করে। আপনি টেরই পাবেন না কখন লোডশেডিং হলো। অফিসিয়াল মিটিং, ফ্রিল্যান্সিং কাজ বা বাচ্চাদের পড়াশোনায় কোনো ব্যাঘাত ঘটে না।

সিস্টেমের ধরন মূল বৈশিষ্ট্য কাদের জন্য বেশি উপযোগী
অন-গ্রিড (On-grid) ব্যাটারি থাকে না, সরাসরি গ্রিডের সাথে যুক্ত শহরে যাদের বিল বেশি আসে, কিন্তু লোডশেডিং কম
অফ-গ্রিড (Off-grid) গ্রিড নেই, পুরোটাই ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা পাহাড়ে যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি
হাইব্রিড (Hybrid) গ্রিড এবং ব্যাটারি উভয়ের চমৎকার সমন্বয় যেখানে বিল বেশি এবং নিয়মিত লোডশেডিংও হয়

প্রপার্টির বাজার মূল্য বা রিয়েল এস্টেট ভ্যালু বৃদ্ধি

বাড়ি বিক্রির সময় বা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সোলার সিস্টেম আপনার প্রপার্টির ভ্যালু বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান সময়ের স্মার্ট ক্রেতারা এমন বাড়ি বেশি পছন্দ করেন যেখানে আগে থেকেই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের আধুনিক ব্যবস্থা করা আছে। তাই ছাদে সোলার প্যানেল বসানোকে শুধু একটি সাধারণ গ্যাজেট হিসেবে না দেখে, বাড়ির ভ্যালু বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। একটি ভালো সোলার সিস্টেম বাড়ির নান্দনিকতাও বাড়িয়ে দেয়।

রিয়েল এস্টেট বাজারে আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব

রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞদের মতে, সোলার প্যানেল যুক্ত বাড়ির দাম সাধারণ বাড়ির চেয়ে বেশ কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। ক্রেতারা জানেন যে এই বাড়িতে উঠলে তাদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। তাই তারা একটু বেশি দাম দিতেও পিছপা হন না।

বাড়ির অবস্থা ক্রেতার আকর্ষণ প্রপার্টি ভ্যালু বা ভাড়ার পরিমাণ
সোলার প্যানেল বিহীন বাড়ি সাধারণ মানের আকর্ষণ এলাকার গড় বাজার মূল্যের সমান
পুরোনো সোলার যুক্ত বাড়ি মাঝারি (সিস্টেম আপগ্রেড লাগতে পারে) সামান্য বেশি বা সমান
আধুনিক সোলার যুক্ত বাড়ি অনেক বেশি (বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কারণে) সাধারণের চেয়ে ৫-১০% বেশি মূল্য পাওয়া সম্ভব

সহজ রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্স

যেকোনো মেশিন কিনলেই তার মেইনটেনেন্স বা রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে একটা ভয় কাজ করে। কিন্তু সোলারের ক্ষেত্রে এই ভয় একেবারেই নেই। এর যন্ত্রাংশে জেনারেটর বা গাড়ির ইঞ্জিনের মতো কোনো ঘূর্ণনশীল অংশ (Moving parts) থাকে না। তাই এটি সহজে ঘর্ষণজনিত কারণে ক্ষয় হয়ে নষ্ট হয় না। একবার ঠিকঠাক ইনস্টল করে নিলে বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে থাকা যায়। নামিদামি ব্র্যান্ডের প্যানেলগুলো সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছরের বেশি পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দিয়ে থাকে।

সোলার প্যানেলের যত্ন নেওয়ার সঠিক নিয়ম

দীর্ঘমেয়াদে সোলার পাওয়ার সিস্টেমের সুবিধা পুরোপুরি উপভোগ করতে প্যানেলগুলোকে পরিষ্কার রাখা খুব জরুরি। বছরে দুই-তিনবার প্যানেলগুলোর ওপর জমে থাকা ধুলোবালি, মরা পাতা বা পাখির বিষ্ঠা পানি দিয়ে ধুয়ে দিলেই কাজ হয়ে যায়। ধুলো জমে থাকলে সূর্যের আলো প্যানেলের সেল পর্যন্ত ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না।

কাজের ধরন কতদিন পরপর করবেন কীভাবে বা কে করবে
প্যানেল পরিষ্কার করা প্রতি ৩-৪ মাস পরপর নিজেই হোস পাইপের পানি ও নরম কাপড় দিয়ে
ইনভার্টার চেক করা বছরে ১ বার প্রফেশনাল টেকনিশিয়ান দ্বারা
ব্যাটারির পানি দেওয়া প্রতি মাসে একবার (টিউবুলার হলে) বাড়ির মালিক নিজেই করতে পারেন
তার ও সংযোগ পরীক্ষা বছরে ১ বার অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে চেক করানো

সরকারি উদ্যোগ, পলিসি এবং নেট মিটারিং

আমাদের দেশে এবং বিশ্বজুড়ে সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে গ্রাহকদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো নেট মিটারিং (Net Metering)। এর মানে হলো, আপনার সোলার প্যানেল যদি বাড়ির চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তবে সেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নষ্ট না করে আপনি সরকারি গ্রিডে বিক্রি করে দিতে পারবেন। এটি একদম ম্যাজিকের মতো কাজ করে!

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ থেকে সরাসরি আয় করার উপায়

ধরুন, আপনি দিনের বেলায় সপরিবারে অফিসে বা স্কুলে থাকেন। আপনার বাড়ির ফ্যান বা এসি তখন বন্ধ। কিন্তু ছাদে থাকা প্যানেল কড়া রোদে ঠিকই বিদ্যুৎ বানাচ্ছে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে এই অব্যবহৃত বিদ্যুৎ সরাসরি চলে যাবে সরকারি লাইনে। মাস শেষে বিল করার সময় আপনি যতটুকু বিদ্যুৎ দিয়েছেন, তা আপনার নেওয়া বিদ্যুৎ থেকে মাইনাস হবে।

পলিসির নাম সুবিধা কীভাবে কাজ করে
নেট মিটারিং বিদ্যুৎ বিক্রি বা বিল সমন্বয় করা বাই-ডিরেকশনাল বা দ্বি-মুখী মিটারের মাধ্যমে মাপা হয়
ট্যাক্স রিবেট সরঞ্জামের ওপর ভ্যাট বা ট্যাক্স মওকুফ সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানিতে ট্যাক্স ছাড়
সহজ ঋণ সুবিধা কিস্তিতে কেনার দারুণ সুযোগ অনেক ব্যাংক সবুজ শক্তির জন্য কম সুদে লোন দেয়

সঠিক সোলার প্যানেল এবং যন্ত্রাংশ নির্বাচনের গাইডলাইন

Choose Best Solar Power System for home

বাজারে এখন অনেক ধরনের সোলার প্যানেল পাওয়া যায়। পলিক্রিস্টালাইন থেকে শুরু করে মোনোক্রিস্টালাইন বা হাফ-কাট সেল—নানা প্রযুক্তির ছড়াছড়ি। আপনার বাড়ির ছাদের জায়গা যদি কম হয়, তবে মোনোক্রিস্টালাইন প্যানেল ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ এগুলো অল্প জায়গায় বেশি বিদ্যুৎ বানাতে পারে। প্যানেল বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন এর ওপর আশেপাশের কোনো উঁচু গাছ বা ভবনের ছায়া না পড়ে।

আপনার বাড়ির জন্য কতটুকু ক্যাপাসিটি প্রয়োজন?

আপনার বাড়িতে যদি ২টো এসি, ১টি ফ্রিজ এবং সাধারণ লাইট-ফ্যান থাকে, তবে ৫ থেকে ১০ কিলোওয়াটের একটি সিস্টেম লাগতে পারে। অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার আপনার বাড়ির লোড ক্যালকুলেট করে সঠিক মাপ বলে দেবেন।

প্যানেলের ধরন কার্যক্ষমতা (Efficiency) জায়গা কেমন লাগে
পলিক্রিস্টালাইন ১৫-১৭% (তুলনামূলক কম) বেশি জায়গা লাগে, তবে দাম কিছুটা কম
মোনোক্রিস্টালাইন ১৯-২২% (অনেক ভালো) কম জায়গায় বেশি পাওয়ার দেয়, দাম একটু বেশি
থিন-ফিল্ম (Thin-film) ১০-১২% (খুব কম) ফ্লেক্সিবল, তবে ছাদের জন্য তেমন উপযোগী নয়

ইনভার্টার এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির আধুনিক রূপ

সোলার প্যানেল বিদ্যুৎ তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু সেই বিদ্যুৎ আমাদের ঘরের যন্ত্রপাতি চালানোর উপযোগী (AC কারেন্ট) করার দায়িত্ব ইনভার্টারের। ভালো মানের ইনভার্টার সিস্টেমের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এর সাথে যুক্ত হয় ব্যাটারি। আজকাল লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির জায়গা দখল করে নিচ্ছে অত্যাধুনিক লিথিয়াম-আয়ন বা LiFePO4 ব্যাটারি। এগুলো ওজনে হালকা, টেকে বেশিদিন এবং খুব দ্রুত চার্জ হয়।

লিথিয়াম-আয়ন বনাম লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি

দীর্ঘমেয়াদে শান্তিতে থাকতে চাইলে আধুনিক ইনভার্টার এবং লিথিয়াম ব্যাটারির কম্বিনেশন সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এটি আপনার স্মার্টফোনের অ্যাপের সাথে কানেক্ট করা যায়, ফলে আপনি অফিসে বসেও দেখতে পারবেন আপনার বাড়ির ছাদে আজ কতটুকু বিদ্যুৎ তৈরি হলো।

ব্যাটারির ধরন জীবনকাল (Lifespan) মেইনটেনেন্স বা যত্ন
লেড-অ্যাসিড (টিউবুলার) ৩-৫ বছর নিয়মিত পানি চেক করতে হয়
লিথিয়াম-আয়ন ১০-১৫ বছর কোনো যত্নের প্রয়োজন নেই (Zero Maintenance)
জেল ব্যাটারি (Gel) ৪-৬ বছর পানি দেওয়ার ঝামেলা নেই, তবে দাম মাঝারি

শেষ কথা

পুরো আলোচনা শেষে এটা স্পষ্ট যে, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি গ্রহণ করা শুধু একটি ট্রেন্ড নয়, এটি বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা এবং স্মার্ট একটি সিদ্ধান্ত। প্রথম দিকে প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি কিনতে একটু মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হলেও, এটি আপনাকে আজীবন আরাম দেবে। মাসের পর মাস বিদ্যুৎ বিলের বোঝা টানা থেকে যেমন মুক্তি পাবেন, তেমনি লোডশেডিংয়ের অন্ধকার থেকেও রক্ষা পাবেন। সবদিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, সোলার পাওয়ার সিস্টেমের সুবিধা যেকোনো সাধারণ ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের চেয়েও বেশি রিটার্ন দেয়। তাই আর দেরি না করে, আজই ভালো কোনো সোলার কোম্পানির সাথে কথা বলে আপনার বাড়ির জন্য উপযুক্ত সিস্টেমটি বেছে নিন এবং একটি উজ্জ্বল ও সবুজ ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ান।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. সোলার প্যানেল কি রিসাইকেল (পুনর্ব্যবহার) করা যায়?

হ্যাঁ, অবশ্যই। সোলার প্যানেল মূলত কাঁচ, অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম এবং সিলিকন দিয়ে তৈরি। এর প্রায় ৮০-৯০% উপাদানই রিসাইকেল করে নতুন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে এগুলো পরিবেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না।

২. বৃষ্টির দিন বা মেঘলা আবহাওয়াতে সোলার প্যানেল কীভাবে কাজ করে?

মেঘলা দিনে সোলার প্যানেল সরাসরি সূর্যের কড়া আলো পায় না ঠিকই, তবে মেঘ ভেদ করে আসা বিক্ষিপ্ত আলোকরশ্মি থেকেও এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তবে উৎপাদনের পরিমাণ রোদেলা দিনের তুলনায় কিছুটা (১০-২৫%) কমে যায়।

৩. ছাদ ছাড়া অন্য কোথাও কি সোলার প্যানেল বসানো যায়?

অবশ্যই। আপনার যদি বাড়ির আঙিনায় বা বাগানে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা থাকে যেখানে সারাদিন রোদ পড়ে, তবে সেখানে গ্রাউন্ড মাউন্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে স্ট্যান্ড তৈরি করে প্যানেল বসানো সম্ভব। অনেক দেশে এটি বেশ জনপ্রিয়।

৪. সোলার প্যানেল কি বজ্রপাতের সময় বিপজ্জনক?

সোলার সিস্টেম ইনস্টল করার সময় আর্থিং (Earthing) এবং লাইটনিং অ্যারেস্টর (Lightning Arrestor) ব্যবহার করা হয়। ফলে বজ্রপাত হলেও তা প্যানেল বা বাড়ির কোনো ক্ষতি না করে আর্থিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি মাটিতে চলে যায়। এটি পুরোপুরি নিরাপদ।

৫. প্যানেলের ওপর যদি গাছের পাতার ছায়া পড়ে, তবে কি পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায়?

পুরোনো প্রযুক্তির প্যানেলে এমনটি হতো, তবে আধুনিক ‘হাফ-কাট’ (Half-cut) প্যানেলগুলো আলাদা আলাদা জোনে কাজ করে। তাই প্যানেলের এক পাশে ছায়া পড়লে শুধু ওই অংশের উৎপাদন কমে, বাকি অংশ ঠিকমতোই বিদ্যুৎ তৈরি করতে থাকে।

সর্বশেষ