বাঙালি আর খাবার—এই দুই জিনিসকে কি আলাদা করা যায়? একদম না। মাছে-ভাতে বাঙালি তো আর এমনি বলা হয় না। সকালের গরম লুচি-আলুর দম, দুপুরের সর্ষে ইলিশ, আর শেষপাতের মিষ্টি—আমাদের সব আনন্দই তো খাবার ঘিরে। কিন্তু ওজন কমানোর কথা উঠলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। পছন্দের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় বিরিয়ানি বা খিচুড়ি। মনে হয়, ডায়েট করতে গেলে বোধহয় সব স্বাদ বিসর্জন দিতে হবে। ওটস, সেদ্ধ সবজি আর সালাদ খেতে খেতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে ডায়েটই ছেড়ে দেন।
আসলে কিন্তু তা নয়। ফিট থাকার জন্য প্রিয় খাবার ছেড়ে দেওয়ার কোনো দরকার নেই। আমাদের চেনা বাঙালি খাবার কিন্তু মোটেও অস্বাস্থ্যকর নয়। সমস্যা হলো আমাদের অলস জীবনযাত্রা আর রান্নার ভুল তরিকায়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা কিন্তু রোজ এক থালা ভাত আর মাছের ঝোল খেয়েই দিব্যি সুস্থ-সবল ছিলেন, কারণ তারা কায়িক পরিশ্রম করতেন। আজ আমাদের লাইফস্টাইল বদলেছে, তাই রান্নার ধরণেও একটু বদল আনা চাই। কিছু ছোটখাটো কৌশল জানলেই কেল্লাফতে। এই বিস্তারিত গাইডে আমরা সহজ ভাষায় দেখব ডায়েট নষ্ট না করে কীভাবে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার উপভোগ করবেন এবং কীভাবে আপনার রোজকার প্লেটকে ফিটনেসের উপযোগী বানাবেন।
বাঙালি খাবারের পুষ্টিগুণ ও আধুনিক ডায়েট
আমাদের ঘরের খাবারের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর বৈচিত্র্য। ডাল, ভাত, হরেক পদের শাকসবজি আর মাছের ঝোল আমাদের শরীরে সব দরকারি পুষ্টি এনে দেয়। তবে সারাদিন বসে কাজ করা আর রান্নায় অতিরিক্ত তেল-মসলা ব্যবহারের কারণে এগুলোই শরীরে মেদ জমায়। তাই খাবার বাদ না দিয়ে রান্নার ধরন আর পরিমাণের দিকে নজর দিন। নিচের ছকটি দেখলেই বুঝবেন আমাদের খাবারে কী কী গুণ আছে:
| পুষ্টি উপাদান | মূল উৎস | শরীরে এর ভূমিকা | ডায়েট টিপস |
| জটিল কার্বোহাইড্রেট | লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি | অনেকক্ষণ শক্তি দেয় ও সহজে খিদে পায় না | সাদা চালের বদলে লাল চাল বেছে নিন |
| লিন প্রোটিন | নদীর মাছ, দেশি মুরগি, ডাল | পেশি মজবুত করে ও মেদ কমাতে সাহায্য করে | ঝোলে تেলের পরিমাণ কমিয়ে আনুন |
| ফাইবার ও ভিটামিন | নানারকম শাকসবজি, শসা, লেবু | হজম ভালো করে ও পেট পরিষ্কার রাখে | পাতে রোজ অন্তত এক পদ সবজি রাখুন |
| ভালো ফ্যাট | সর্ষের তেল, খাঁটি ঘি | হরমোন ও মস্তিষ্ক সচল রাখে | চামচ মেপে তেল ব্যবহার করুন |
সাদা ভাতের পুষ্টিকর বিকল্প বেছে নিন
দুপুরের পাতে ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত না থাকলে আমাদের তৃপ্তি হয় না। কিন্তু সাদা ভাতে সিম্পল কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকায় তা দ্রুত রক্তে সুগার বাড়ায় এবং শরীর অলস করে দেয়। ভাত একদম ছাড়তে না পারলে বাসমতির বদলে লাল চালের ভাত খাওয়া শুরু করুন। এতে থাকা ফাইবার পেট অনেকক্ষণ ভরিয়ে রাখবে এবং এটি একটি চমৎকার ‘কমপ্লেক্স কার্ব’।
আর সাদা ভাতই যদি খেতে হয়, তবে ফ্যান বা মাড় ভালোভাবে ঝরিয়ে নিন। এতে ভাতের অতিরিক্ত স্টার্চ বা মাড় ধুয়ে যায়, ফলে ক্যালোরির মাত্রা কিছুটা কমে। সবচেয়ে বড় কথা, ভাতের পরিমাণ কমিয়ে প্লেটের বাকি অংশ সবজি ও প্রোটিন দিয়ে ভরে ফেলুন। একবারে এক গামলা ভাতের বদলে মেপে এক বাটি ভাত খাওয়ার অভ্যাস করুন।
তেলের ব্যবহারে পরিবর্তন আনুন
বাঙালি রান্নার মূল চাবিকাঠি হলো তেল। সয়াবিন তেলের বদলে খাঁটি সর্ষের তেল বা রাইস ব্রান অয়েল ব্যবহার করা শুরু করুন। সর্ষের তেলের নিজস্ব একটা কড়া গন্ধের কারণে খুব কম তেলেই চমৎকার রান্না করা যায়। রান্না করার সময় বোতল থেকে সরাসরি তেল না ঢেলে সবসময় চা চামচ দিয়ে মেপে দিন।
আমরা অনেকেই মনে করি রিফাইনড তেল ভালো, কিন্তু কোল্ড-প্রেসд বা ঘানির তেল শরীরের জন্য অনেক বেশি উপকারী। পরিমিত সর্ষের তেল আপনার শরীরের ভালো কোলেস্টেরল ($HDL$) বাড়াতে সাহায্য করে। রান্নায় ‘তেল ভাসানো ঝোল’ দেওয়ার মানসিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
রান্নার পদ্ধতিতে আনুন কিছু সহজ পরিবর্তন
খাবারের স্বাদ ঠিক রেখে রাঁধার স্টাইল একটু বদলে নিলেই কিন্তু ডায়েট বজায় রাখা যায়। আমাদের অভ্যাস হলো মসলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কষানো আর ডুবো তেলে ভাজা। এই অভ্যাসটাই একটা ভালো খাবারকে ক্যালোরির বোমা বানিয়ে দেয়। ডুবো তেলে না ভেজে যেকোনো খাবার বেক করা, ভাপে দেওয়া বা অল্প তেলে হালকা সাঁতলানো (Sauté) অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।
| রান্নার ধরন | ক্যালোরির মাত্রা | স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব | বিকল্প স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি |
| ডুবো তেলে ভাজা | অত্যন্ত বেশি | মেদ বাড়ায় ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি তৈরি করে | এয়ার ফ্রায়ার বা তাওয়ায় অল্প তেলে শ্যালো ফ্রাই |
| ভাপে রান্না | খুব কম | পুষ্টিগুণ বজায় থাকে ও সহজে হজম হয় | ভাপা ইলিশ, মাছে-ভাতে পাতুরি |
| অল্প তেলে কষানো | মাঝারি | স্বাদ ও স্বাস্থ্য দুই-ই ঠিক থাকে | নন-স্টিক প্যানে ঢাকনা দিয়ে রান্না |
ভাপা ও পোড়া খাবারের জাদু
বাঙালি রান্নায় ভাপা ইলিশ, পাতুরি কিংবা বেগুন পোড়া, টমেটো পোড়ার মতো দারুণ সব পদ আছে। এগুলো কিন্তু আসলে সেরা ডায়েট ফুড! তেল লাগে নামমাত্র, কিন্তু পোড়া বা ভাপানোর কারণে স্বাদ হয় অতুলনীয়।
যেমন লাউ পাতায় মোড়ানো মাছের পাতুরি—সামান্য সর্ষে বাটা আর কাঁচামরিচ দিয়ে ভাপে তৈরি এই খাবার পুষ্টিতে ঠাসা। সপ্তাহে অন্তত দুই-তিন দিন দুপুরের খাবারে তেলের ঝোলের বদলে এই ভাপা বা পোড়া পদ রাখুন। ডায়েট ভাঙার কোনো ভয়ই থাকবে না। এমনকি শুঁটকি মাছও তেল ছাড়া শুধু পুড়িয়ে বা ভাপে ভর্তা বানিয়ে খাওয়া যায়, যা প্রোটিনের দারুণ উৎস।
মসলার সঠিক ব্যবহার
হলুদ, জিরে, ধনে ও আদা-রসুনের মতো মসলাগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মেটাবলিজম চাঙ্গা করে। রান্নায় বেশি তেল না দিয়ে এই মসলাগুলোর সঠিক ব্যবহার করলেই তরকারি সুস্বাদু হয়।
জিরে বা ধনে গুঁড়ো সামান্য জল দিয়ে পেস্ট করে রান্না করলে কম তেলেও মশলা পুড়ে যায় না এবং সুন্দর গ্রেভি তৈরি হয়। রান্নায় কাঁচামরিচের ব্যবহার বাড়ান, কারণ এতে থাকা ‘ক্যাপসাইসিন’ মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। ধনেপাতা, পুদিনাপাতা বা মেথির মতো ভেষজ উপাদানগুলো খাবারে যোগ করলে তা স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি হজম প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করে।
ডায়েট নষ্ট না করে কীভাবে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার উপভোগ করবেন?
সঠিক পরিমাণে খাওয়া বা ‘পোর্শন কন্ট্রোল’ হলো আসল ম্যাজিক। ডায়েট মানেই পছন্দের খাবার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়। আপনি সবই খেতে পারেন, তবে পরিমাণটা বুঝতে হবে। দুপুরের বা রাতের প্লেটের অর্ধেকটা ভরে ফেলুন নানারকম শাকসবজি আর সালাদ দিয়ে। বাকি অর্ধেকের এক ভাগে রাখুন মাছ, মাংস বা ডিম আর মাত্র এক ভাগে রাখুন ভাত বা রুটি। এভাবে খেলে পেটও ভরবে, আবার ক্যালোরির ওভারডোজও হবে না।
| দুপুরের আদর্শ প্লেট | পরিমাপ | মূল কাজ | উদাহরণ |
| শাকসবজি ও সালাদ | প্লেটের ৫০% | ফাইবার দেয় ও পেট ভরায় | লাল শাক, লাউঘণ্ট, শসা-টমেটোর সালাদ |
| মাছ, মাংস বা ডিম | প্লেটের ২৫% | প্রোটিনের চাহিদা মেটায় | রুই মাছের পাতলা ঝোল বা গ্রিলড চিকেন |
| লাল চালের ভাত বা রুটি | প্লেটের ২৫% | প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায় | ১ কাপ লাল চালের ভাত বা ২টি পাতলা রুটি |
খাবার ভালো করে চিবিয়ে খান
আমাদের অনেকেরই অভ্যাস আছে মোবাইল বা টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে গপাগপ খাবার গিলে ফেলা। এভাবে খেলে পেট যে ভরে গেছে, সেই সংকেত মাথায় পৌঁছানোর আগেই আমরা বেশি খেয়ে ফেলি। তাই প্রতি লোকমা খাবার অন্তত ২০ থেকে ৩০ বার ভালো করে চিবিয়ে খান।
চিবিয়ে খেলে খাবারের সাথে লালা রস মেশে যা হজমপ্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। এর ফলে কম খেয়েই পেট ভরে যায় এবং খাবার শরীর জলদি লুফে নেয়। মন দিয়ে চিবিয়ে খেলে খাবারের আসল স্বাদও অনেক বেশি পাওয়া যায়, যা মানসিক তৃপ্তি দেয়।
খাবারের আগে পানি পানের অভ্যাস
দুপুরের বা রাতের মূল খাবার খাওয়ার ২০-৩০ মিনিট আগে এক গ্লাস হালকা গরম পানি খেয়ে নিন। এটি আপনার হজমশক্তি বাড়াবে এবং পেটের একটা বড় অংশ আগে থেকেই ভরিয়ে রাখবে। ফলে মূল খাবারের সময় বেশি ভাত খাওয়ার ইচ্ছেটা আপনাআপনি কমে যাবে।
তবে মনে রাখবেন, খাওয়ার মাঝখানে বা পরপরই বেশি পানি খাওয়া ঠিক নয়, এতে পেটের পাচক রস পাতলা হয়ে হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। খাবার শেষ করার অন্তত ৩০ মিনিট পর পানি খাওয়া সবচেয়ে ভালো অভ্যাস।
উৎসবের দিনে বাঙালি খাবারের স্বাস্থ্যকর রূপান্তর
ঈদ, পুজো বা বিয়েবাড়ির উৎসবে বিরিয়ানি বা পোলাও ছাড়া কি চলে? একদম না। কিন্তু উৎসবের পরদিনই ওজন মেপে আফসোস করার কোনো মানে হয় না। কিছু ছোটখাটো বদল এনে উৎসবের ঐতিহ্যবাহী খাবারকেও স্বাস্থ্যকর করা সম্ভব। জেনে নিন ডায়েট নষ্ট না করে কীভাবে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার উপভোগ করবেন উৎসবের দিনগুলোতেও।
| উৎসবের চেনা খাবার | স্বাস্থ্যকর রূপান্তর | সুবিধা |
| খাসির চর্বিযুক্ত রেজালা | চর্বি ছাড়া দেশি মুরগির রোস্ট বা স্টু | ক্ষতিকর ফ্যাট ও ক্যালোরি অনেক কমে যায় |
| ঘি-তে ভাজা সাদা পোলাও | বাসমতি চালের হালকা সবজি পোলাও | ফাইবারের পরিমাণ বাড়ে, সুগার হুট করে বাড়ে না |
| দোকানের চড়া মিষ্টি | গুড় বা স্টেভিয়া দিয়ে তৈরি ঘরে পাতা দই | রিফাইনড চিনি সম্পূর্ণ এড়ানো যায় |
চিনির বিকল্প ব্যবহার করুন
বাঙালি মিষ্টি মানেই চিনির রসে টইটম্বুর। উৎসবের মিষ্টি বা পায়েস ঘরে তৈরির সময় সাদাチンির বদলে খেজুরের গুড়, মধু বা জিরো-ক্যালোরি সুইটনার ‘স্টেভিয়া’ ব্যবহার করুন। আজকাল অনেকেই খেজুরের পেস্ট দিয়ে চমৎকার পায়েস তৈরি করেন, যা খেতে অসাধারণ এবং পুষ্টিকরও বটে।
এছাড়া ছানার সন্দেশ বানানোর সময় চিনির পরিমাণ কমিয়ে এলাচ ও জাফরান বাড়িয়ে দিলে চমৎকার ফ্লেভার আসে, চিনির অভাব বোঝাই যায় না। উৎসবের দিনে কমার্শিয়াল কোল্ড ড্রিংকসের বদলে লেবুর শরবত বা ডাবের পানি পান করার চেষ্টা করুন।
টক দইয়ের রায়তা যুক্ত করুন
পোলাও বা বিরিয়ানির সাথে অতিরিক্ত তেল-ঝালের তরকারি না খেয়ে শসা ও টক দই দিয়ে তৈরি রায়তা খান। টক দইয়ের ভালো ব্যাকটেরিয়া ভারী খাবার সহজে হজম করতে সাহায্য করে এবং পেটে গ্যাস বা অ্যাসিডিটি হতে দেয় না।
আর বিয়েবাড়ি বা داওয়াতে খেতে বসলে প্রথমেই সালাদের বাটিটা নিজের কাছে টেনে নিন। এক বাটি সালাদ আগে খেয়ে নিলে মূল রিচ ফুড খাওয়ার জায়গা এমনিতেই কমে যাবে। মাংস খাওয়ার সময় ঝোলটা এড়িয়ে শুধু সলিড পিস বা কোফতা তুলে নিন, এতে তেলের বড় একটা অংশ বাদ দেওয়া যায়।
রাতের খাবারে বাঙালি পদের হালকা আয়োজন
রাতের খাবার সবসময় হালকা হওয়া উচিত। কারণ রাতে আমাদের শারীরিক পরিশ্রম হয় না বললেই চলে, ফলে মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায়। আমরা অনেকে রাতেও এক থালা ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি, যা ডায়েটের জন্য সবচেয়ে বড় ভুল। ভারী ভাত-মাংসের বদলে রাতে হালকা ঝোল আর রুটি বেছে নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
| রাতের হালকা মেনু | প্রধান উপাদান | ক্যালোরি ও পুষ্টি |
| পাতলা মাছের ঝোল ও রুটি | ছোট মাছ, পেঁপে, লাউ, লাল আটার রুটি | সহজে হজম হয় এবং ফ্যাট থাকে না |
| সবজি ডালিয়া বা ওটস খিচুড়ি | ডালিয়া/ওটস, মুগ ডাল, মিক্সড সবজি | উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ ও পেট অনেকক্ষণ ভরা রাখে |
ডাল ও সবজির মিক্স তরকারি
রাতের বেলা ভারী রান্নার বদলে হালকা মসলায় সবজি দিয়ে ডাল রেঁধে নিন। লাউ, ঝিঙে বা পেঁপের সাথে মসুর ডাল মিশিয়ে পাতলা করে রাঁধলে এটি খেতেও ভালো লাগে, আবার প্রোটিন ও ফাইবারের চাহিাদ্দাও মেটে।
চাইলে এতে সামান্য ধনেপাতা কুচি ছিটিয়ে দিতে পারেন, যা স্বাদ ও সুগন্ধ দুই-ই বাড়াবে। হালকা এক বাটি সবজি-ডালের সুপ বা তরকারি রাতে খেলে পেট যেমন হালকা থাকে, তেমনই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকেও রেহাই পাওয়া যায়। এটি রাতের ঘুমকেও অনেক গভীর ও চমৎকার করে তোলে।
রাতে মিষ্টি খাবারকে ‘না’ বলুন
অনেকেরই রাতের খাবারের পর এক টুকরো জিলাপি বা সন্দেশ খাওয়ার অভ্যাস থাকে। এই অভ্যাসটি ডায়েটের বারোটা বাজানোর জন্য যথেষ্ট। রাতে আমাদের শরীর ক্যালোরি বার্ন করতে পারে না, তাই এই সময়ে খাওয়া মিষ্টি সরাসরি চর্বি হিসেবে পেটে ও লিভারে জমা হয়।
মিষ্টির খুব ক্রেভিং বা তীব্র ইচ্ছা হলে সামান্য টক দইয়ের সাথে একটু মধু মিশিয়ে বা এক টুকরো ডার্ক চকোলেট খেতে পারেন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি রাতের খাবার ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে শেষ করে ফেলা যায়।
কিছু চূড়ান্ত পরামর্শ
বাঙালি খাবার মানেই যে তা তৈলাক্ত আর ক্ষতিকর—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমাদের রান্নায় যে ধরনের মসলা আর শাকসবজি ব্যবহার করা হয়, তা শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী। আসলে আমাদের ডিশগুলো কিন্তু ব্যালেন্সড পুষ্টির চমৎকার উদাহরণ। আসল বিষয় হলো আমরা খাবারটি কীভাবে রাঁধছি, কতটা তেল দিচ্ছি এবং কতটা পরিমাণে প্লেটে তুলে নিচ্ছি।
তাই নিজের সংস্কৃতি আর প্রিয় স্বাদকে জীবন থেকে বাদ না দিয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে আপনার প্রতিদিনের প্লেট সাজাতে শিখুন। আশা করি এই বিস্তারিত গাইডটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে ডায়েট নষ্ট না করে কীভাবে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার উপভোগ করবেন। পরিমিত খান, ঘরে তৈরি খাবারে জোর দিন, সুস্থ থাকুন আর ডায়েটের ভয় তাড়িয়ে মনভরে বাঙালির আসল সোয়াদ নিন।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন উত্তর
১. ডায়েট করার সময় কি চিংড়ি মাছ খাওয়া যাবে?
অবশ্যই যাবে। চিংড়ি মাছে প্রচুর প্রোটিন ও ওমেগা-৩ থাকে, যা মেদ কমাতে এবং ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে। তবে চিংড়ির মালাইকারি বা নারকেলের দুধ-ঘি দিয়ে রান্না না করে, অল্প তেতলে লেবুর রস, কাঁচামরিচ ও গোলমরিচ দিয়ে হালকা নেড়ে বা ভাপে রান্না করে খান।
২. ওজন কমাতে চাইলে কোন ডাল খাওয়া সবচেয়ে ভালো?
সব ডালই ভালো, তবে খোসাসহ মুগ ডাল ও মসুর ডাল ফাইবারে ভরপুর হওয়ায় ওজন কমাতে বেশি সাহায্য করে। এগুলো হজম হতে সময় নেয় বলে অনেকক্ষণ খিদে পায় না। শুধু মনে রাখবেন, ডাল রান্নার শেষে ওপরে অতিরিক্ত তেলের বাঘার বা তড়কা দেওয়া যাবে না।
৩. কাচ্চি বিরিয়ানি কি ডায়েটের মধ্যে একেবারেই খাওয়া যাবে না?
কে বলেছে যাবে না! মাসে এক-আধবার পরিমিত পরিমাণে (ছোট এক বাটি) কাচ্চি বিরিয়ানি আপনি খেতেই পারেন। তবে বিরিয়ানির সাথে প্রচুর সালাদ আর টক দই রাখুন। আর চেষ্টা করুন চর্বি ছাড়া সলিড মাংসের টুকরোটি খেতে। পরের বেলার খাবারটা একটু হালকা রাখলেই ক্যালোরি ব্যালেন্স হয়ে যাবে।
৪. বাঙালি ঘরোয়া ভর্তা কি স্বাস্থ্যকর?
আলু ভর্তা বাদে (যেটিতে কার্বোহাইড্রেট ও গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি) বেশিরভাগ সবজি বা মাছের ভর্তা ডায়েটের জন্য দারুণ। যেমন—বেগুন পোড়া, পটল, টমেটো বা কালিজিরা ভর্তা। তবে ভর্তা মাখার সময় কাঁচা সর্ষের তেল এক চা চামচের বেশি দেবেন না।
৫. বিকেলে খিদে পেলে মুড়ি খাওয়া কি ঠিক?
মুড়ি হালকা খাবার এবং এতে ফ্যাট নেই। তবে শুধু মুড়ি খেলে দ্রুত হজম হয়ে আবার খিদে লেগে যেতে পারে। তাই শুকনো মুড়ি না খেয়ে শসা, টমেটো, কাঁচামরিচ আর সামান্য সেদ্ধ ছোলা মিশিয়ে ‘ঝালমুড়ি’ বানিয়ে খান। ছোলা থেকে প্রোটিন আর সবজি থেকে ফাইবার পাওয়ায় পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকবে।
৬. বাঙালি খাবারে পান্তা ভাত খাওয়া কি ডায়েটের জন্য ভালো?
পান্তা ভাত অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর এবং এতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স থাকে। ফারমেন্টেশনের কারণে এতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা প্রোবায়োটিক তৈরি হয় যা পেটের জন্য দারুণ। তবে ডায়েটে থাকলে পান্তা ভাতের সাথে চর্বিযুক্ত ইলিশ ভাজা বা অতিরিক্ত আলু ভর্তা না খেয়ে, পোড়া বেগুন ভর্তা, কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে খাওয়া উচিত।



