১১ আগস্ট। বছর ১৯০৮। মুজাফফরপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের আকাশে তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। ভেতরে একটা আঠারো বছরের কিশোর হেঁটে যাচ্ছে ফাঁসির মঞ্চের দিকে। যে বয়সে আজকের একটা ছেলে সবে কলেজে ভর্তি হয়, প্রথম প্রেমে পড়ে, ভবিষ্যতের পেশা নিয়ে দ্বিধায় থাকে—সেই বয়সেই ক্ষুদিরাম বসু দাঁড়িয়েছিলেন মৃত্যুর মুখোমুখি, নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে। ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা তাঁর জীবনের হিসেব একলাইনে লিখে দিয়েছিল—হত্যার দায়ে দণ্ডিত। কিন্তু ইতিহাস অত সহজ হিসেবে থামেনি। আজ, এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও, ১১ আগস্ট এলেই পুরো বাংলা এই নামটা মনে করে।
কেন করে?
উত্তরটা সহজ কোনো একটা বাক্যে বাঁধা যায় না। এর জন্য ফিরে যেতে হয় অগ্নিযুগ নামে পরিচিত সেই অস্থির সময়টায়, যেখানে কিশোর বয়সেই একদল ছেলে মৃত্যুর ঝুঁকিকে নিজেদের জীবনের সম্ভাবনার চেয়ে ছোট করে দেখতে শিখে যাচ্ছিল। ক্ষুদিরামের গল্পটা আমার কাছে শুধু বীরত্বের গল্প নয়। এটা এমন একটা কিশোরের গল্প, যার শৈশব শুরু হয়েছিল মা-বাবাকে হারিয়ে, আর যৌবন শেষ হয়ে গিয়েছিল ফাঁসির দড়িতে—দুইয়ের মাঝখানে সময়টা ছিল আশ্চর্য রকম কম।
এক নজরে ক্ষুদিরাম বসু
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ৩ ডিসেম্বর, ১৮৮৯ |
| জন্মস্থান | হবিবপুর গ্রাম, মেদিনীপুর জেলা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুর) |
| পিতা-মাতা | ত্রৈলোক্যনাথ বসু (তহশিলদার), লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী |
| পরিবার | তিন বোনের কনিষ্ঠ ভাই; বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর বড় বোন অপরূপা রায়ের কাছে বেড়ে ওঠা |
| শিক্ষা | তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুল; পরে পড়াশোনা ছেড়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত |
| রাজনৈতিক সংযোগ | স্বদেশী আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী প্রতিবাদ, যুগান্তর/অনুশীলন সমিতি-ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্ক |
| আলোচিত অভিযান | ডগলাস কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে মুজাফফরপুর বোমা হামলা (৩০ এপ্রিল ১৯০৮) |
| মৃত্যুদণ্ড কার্যকর | ১১ আগস্ট, ১৯০৮, মুজাফফরপুর কেন্দ্রীয় কারাগার |
| মৃত্যুকালীন বয়স | ১৮ বছর |
তাঁর জন্ম, পারিবারিক পটভূমি, স্কুলজীবন এবং পরবর্তী বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিভিন্ন জীবনীমূলক উৎসে কিছু ছোটখাটো পার্থক্য দেখা যায়। তবে জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ, মেদিনীপুরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, মুজাফফরপুর অভিযান এবং আঠারো বছর বয়সে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত।

তিন মুঠো ক্ষুদের বিনিময়ে যে নাম
১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর। মেদিনীপুরের হবিবপুর গ্রাম। ত্রৈলোক্যনাথ বসু ও লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর ঘরে জন্ম নিল চতুর্থ সন্তান, তিন কন্যার পর একমাত্র পুত্র। এর আগেও এই দম্পতির দুটো ছেলে হয়েছিল, দুজনেই শৈশবেই মারা যায়—এই তথ্য একাধিক জীবনীতে মেলে।
এখানেই আসে সেই বহুশ্রুত কাহিনি।
লোকপ্রচলিত বিবরণ বলে, সন্তানকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর আশায় তখনকার একটা প্রথা মেনে নবজাতক ছেলেটিকে প্রতীকীভাবে বড় বোনের কাছে তিন মুঠো ক্ষুদ—অর্থাৎ ভাঙা চালের বিনিময়ে ‘বিক্রি’ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ‘ক্ষুদ’ থেকেই নাকি নাম হলো ক্ষুদিরাম।
সত্যি বলতে, এই গল্পের কোনো সরকারি নথি নেই, থাকার কথাও না। কিন্তু গল্পটা এতদিন ধরে এত মানুষের মুখে ফিরেছে যে একে নিছক লোককথা বলে ফেলে দেওয়াও ঠিক হবে না। এটা বরং সেই সময়ের বাংলার একটা ছবি আঁকে—যেখানে সন্তানের বেঁচে থাকাটাই ছিল অনিশ্চিত, আর সেই অনিশ্চয়তা মোকাবিলার একটা রাস্তা ছিল বিশ্বাস আর প্রতীকী আচার।
শৈশবের বাকি অংশটুকু অবশ্য লোককথা নয়।
পাঁচ-ছয় বছর বয়সে ক্ষুদিরাম মাকে হারালেন। প্রায় এক বছরের মধ্যে বাবাও চলে গেলেন। যে বয়সে একটা শিশুর গোটা পৃথিবীটাই সাধারণত বাবা-মাকে ঘিরে থাকার কথা, সেই বয়সেই তাঁর জীবনের কেন্দ্রটা ভেঙে পড়ল। বড় বোন অপরূপা রায় তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে বড় করলেন।
তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলে পড়াশোনা শুরু হলো। কিন্তু বইয়ের পাতার চেয়ে তাঁর মন টানছিল অন্য কিছু—তখনকার বাংলার রাজনৈতিক বাতাস।
বঙ্গভঙ্গের আগেই বদলাতে শুরু করেছিল বাংলা
বিশ শতকের গোড়ার দিকের কথা। বাংলার রাজনীতি তখন আর শুধু সভা-সমিতি আর আবেদন-নিবেদনে আটকে নেই। শিক্ষিত তরুণদের একটা অংশের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দ্রুত জমাট বাঁধছে।
মেদিনীপুরও এর বাইরে ছিল না।
১৯০২ ও ১৯০৩ সালে অরবিন্দ ঘোষ ও ভগিনী নিবেদিতা মেদিনীপুরে এসে বক্তৃতা দিয়েছিলেন—এই সফরের কথা স্থানীয় ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। তাঁদের বক্তব্য একা ক্ষুদিরামের মতো কিশোরদের রাজনৈতিক শিক্ষক বনে যায়নি, কিন্তু মেদিনীপুরের ক্রমশ সক্রিয় হয়ে ওঠা বিপ্লবী পরিমণ্ডলে সেই বক্তৃতাগুলো একটা নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছিল। ক্ষুদিরাম সেই ভাষাতেই বড় হচ্ছিলেন।
তারপর এল ১৯০৫।
ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্ত বাংলার রাজনীতিকে একঝটকায় বদলে দিল। প্রতিবাদ ছড়াল শহর থেকে মফস্বলে। বিদেশি পণ্য বর্জন, স্বদেশি দ্রব্যের ব্যবহার, প্রচারপত্র, মিছিল—‘স্বদেশী’ শব্দটা রাতারাতি মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ হয়ে গেল।
ক্ষুদিরামের বয়স তখন পনেরোর আশপাশ।
আজকের চোখে পনেরো বছরের একটা ছেলেকে আমরা কিশোরই ভাবি, তার বেশি কিছু না। কিন্তু ওই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু কিশোরের জীবন অস্বাভাবিক তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছিল। ক্ষুদিরাম ছিলেন সেই দলেরই একজন। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় ব্রিটিশবিরোধী প্রচারপত্র বিতরণের অভিযোগে পনেরো বছর বয়সেই তাঁর প্রথম গ্রেপ্তারের ঘটনা নথিভুক্ত আছে।
এটা তাঁর জীবনের একটা বাঁক। এরপর তিনি আর শুধু প্রতিবাদী স্কুলছাত্র নন।
স্কুলের বই থেকে গোপন বিপ্লবী নেটওয়ার্কে
সে সময়কার বাংলার বিপ্লবী রাজনীতি খুব সরল কাঠামোয় চলত না। একটা কেন্দ্রীয় সংগঠন, স্পষ্ট সদস্যতালিকা, নির্দিষ্ট কমান্ড—সবখানে এমনটা ছিল না। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তরকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দল আর স্থানীয় বিপ্লবী চক্রের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। মানুষ, ধারণা, অস্ত্র—সব এক বৃত্ত থেকে আরেক বৃত্তে চলাচল করত।
ক্ষুদিরাম এই বৃহত্তর জগতের সঙ্গে যুক্ত হলেন। অরবিন্দ ঘোষ, তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মেদিনীপুরের বিপ্লবী কর্মীদের নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়; সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও হেমচন্দ্র কানুনগোর মতো নামও এই বৃত্তে আসে।
ষোলো বছর বয়স থেকেই ক্ষুদিরাম পুলিশ স্টেশন ও সরকারি স্থাপনার আশপাশে বোমা রাখার কাজে জড়িয়ে পড়েন, সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে চালানো বিপ্লবী তৎপরতায় অংশ নেন। অর্থাৎ প্রচারপত্র বিলি করা থেকে সশস্ত্র রাজনীতিতে সরে আসতে তাঁর খুব বেশি সময় লাগেনি।
এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার। আজ স্বাধীন রাষ্ট্রে বসে ‘বিপ্লবী’ শব্দটার সঙ্গে অনেক সময় বীরত্বের একরঙা ছবি জুড়ে যায়। কিন্তু তখনকার বাস্তবতা অতটা সরল ছিল না। গোপন সংগঠনে যোগ দেওয়া মানে জেনেবুঝেই পুলিশি নজরদারি, গ্রেপ্তার আর মৃত্যুর সম্ভাবনার মধ্যে বাঁচা। আর সশস্ত্র আক্রমণ মানে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের ঝুঁকিটাও বাস্তব।
ক্ষুদিরামের জীবনে সেই দুই বাস্তবতাই খুব শিগগির এসে মিলবে। তার আগে মঞ্চে আসেন ডগলাস কিংসফোর্ড।
কিংসফোর্ড কেন হয়ে উঠলেন লক্ষ্যবস্তু
কিংসফোর্ড ছিলেন কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর রায়ের কারণে বিপ্লবী মহলে তিনি প্রবলভাবে অপ্রিয়। পরে তাঁকে বদলি করা হয় মুজাফফরপুরে, জেলা জজের দায়িত্বে।
বিপ্লবীদের একাংশ ঠিক করল, কিংসফোর্ডকে হত্যা করা হবে।
এই সিদ্ধান্তকে সময়ের প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করলে বোঝা কঠিন হয়ে যায়। বঙ্গভঙ্গের পর স্বদেশী আন্দোলনের ওপর প্রশাসনের দমননীতি, জাতীয়তাবাদী কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা আর নানা রকম শাস্তি—এসব মিলিয়ে তরুণ বিপ্লবীদের একটা অংশের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছিল, শুধু প্রকাশ্য আন্দোলন দিয়ে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে নাড়ানো যাবে না। তাদের যুক্তিতে সরাসরি আঘাত করতে হবে শাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদের ওপর। কিংসফোর্ড হয়ে উঠলেন সেই চিন্তারই একটা লক্ষ্য।
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ ছিল না অবশ্য। কলকাতার পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে দূরের মুজাফফরপুরে গিয়ে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তার চলাফেরা চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করতে হবে, পরিচয় গোপন রাখতে হবে, সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করতে হবে।
এই অভিযানের জন্য শেষমেশ বেছে নেওয়া হলো দুই তরুণকে—ক্ষুদিরাম বসু আর প্রফুল্ল চাকী।
দুই তরুণ, একটা লক্ষ্যবস্তু
| বিষয় | ক্ষুদিরাম বসু | প্রফুল্ল চাকী |
| অভিযানে ভূমিকা | কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ | সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ |
| ৩০ এপ্রিলের পর | ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান | ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান |
| শেষ পরিণতি | ওয়াইনি স্টেশনে গ্রেপ্তার | গ্রেপ্তার এড়াতে নিজের গুলিতে আত্মহত্যা |
| মামলার পরিণতি | বিচারে মৃত্যুদণ্ড | জীবিত অবস্থায় বিচারের মুখোমুখি হননি |
কলকাতা হাইকোর্টের ১৯০৮ সালের রায়ে প্রফুল্লকে প্রথমে ছদ্মনাম ‘দীনেশচন্দ্র রায়’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরে তাঁর প্রকৃত পরিচয় নথিভুক্ত করা হয়। দুজনের ভাগ্য যে এত দ্রুত আলাদা হয়ে যাবে, সেটা হয়তো এপ্রিলের সেই সন্ধ্যায় কেউ ভাবেনি।
৩০ এপ্রিল, ১৯০৮: যে গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না
রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা।
কলকাতা হাইকোর্টের পরবর্তী রায়ে প্রসিকিউশনের বিবরণ থেকে জানা যায়, মিসেস কেনেডি ও মিস কেনেডি মুজাফফরপুরের স্টেশন ক্লাব থেকে একঘোড়ার গাড়িতে বাড়ি ফিরছিলেন। গাড়িটা দেখতে অনেকটা কিংসফোর্ডের ব্যবহৃত গাড়ির মতো। রাতও ছিল অন্ধকার।
এই সাদৃশ্যই হয়ে উঠল মারাত্মক ভুলের কারণ। গাড়িটা কিংসফোর্ডের বলে ধরে নিয়ে আক্রমণ চালানো হলো। বোমায় গাড়ি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কিন্তু কিংসফোর্ড সেখানে ছিলেন না।
আহত হলেন মিসেস কেনেডি ও তাঁর মেয়ে। আদালতের নথি বলছে, মিস কেনেডি আঘাতের কিছু সময়ের মধ্যেই মারা যান। মিসেস কেনেডি গুরুতর আহত অবস্থায় আরও কিছুদিন বাঁচেন, ২ মে তাঁর মৃত্যু হয়। গাড়ির সঙ্গে থাকা একজন কর্মচারীও আহত হয়েছিলেন।
এই ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে দ্রুত এড়িয়ে গেলে ইতিহাসের একটা অস্বস্তিকর সত্য চাপা পড়ে যায়—যে অভিযান একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাকে হত্যার জন্য পরিকল্পিত হয়েছিল, তার শিকার হলেন এমন দুজন মানুষ, যাঁরা সেই অভিযানের লক্ষ্যই ছিলেন না। ক্ষুদিরামের জীবনী লিখতে গিয়ে অনেক সময় এই অংশটা তাড়াতাড়ি পার হয়ে যাওয়া হয়। আমার মনে হয় না সেটা ঠিক। সশস্ত্র রাজনীতির নৈতিক ঝুঁকিটা এখানেই সবচেয়ে নগ্নভাবে ধরা পড়ে।
বিস্ফোরণের পর দাঁড়িয়ে থাকার উপায় ছিল না। শহরে তল্লাশি শুরু হওয়ার আগেই ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল সরে পড়েন, দুজন আলাদা পথে।
আর সেখানেই তাঁদের ভাগ্য সত্যিই আলাদা হয়ে গেল।
দীর্ঘ পথ হেঁটে ওয়াইনি স্টেশনে ধরা
বোমা হামলার পর ক্ষুদিরাম মুজাফফরপুর থেকে পালাতে থাকেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি পৌঁছান ওয়াইনি স্টেশনের কাছে। সেখানেই পুলিশ শেষ পর্যন্ত তাঁকে ধরে ফেলে—১ মে সকালে।
এক রাত আগেও তিনি ছিলেন একটা গোপন অভিযানের অংশ। পরদিন সকালেই তিনি ব্রিটিশ পুলিশের হেফাজতে।
প্রফুল্ল চাকীর পরিণতি ছিল আরও তাৎক্ষণিক। তিনিও পালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে নিজের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ফলে মুজাফফরপুর অভিযানের দুই তরুণের মধ্যে বিচার পর্যন্ত জীবিত পৌঁছান শুধু ক্ষুদিরাম।
সামনে তখন আর পালানোর রাস্তা নেই। শুরু হবে বিচার।
আদালতে একজন আঠারো বছরের আসামি
ক্ষুদিরামের বিচার নিয়ে পরবর্তীকালে অসংখ্য কাহিনি ছড়িয়েছে—ফাঁসির রায় শুনে তিনি কী বলেছিলেন, বিচারকের সঙ্গে কেমন কথোপকথন হয়েছিল, তিনি কীভাবে হেসেছিলেন। এসবের সব বক্তব্যের সমান জোরালো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তাই তাঁর সাহস বোঝাতে বাড়তি কোনো সংলাপ বানানোর দরকার নেই আমার মনে হয়—আসল আদালতি নথিই যথেষ্ট নাটকীয়।
কলকাতা হাইকোর্টের ১৩ জুলাই ১৯০৮-এর রায়ে দেখা যায়, ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অভিযোগ আনা হয়। মিসেস ও মিস কেনেডির মৃত্যুর জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়, নিজে বোমা ছুড়েছেন অথবা সহযোগীর সঙ্গে যৌথভাবে সেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন—এই যুক্তিতে।
মুজাফফরপুরের সেশনস জজ তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। মামলা পরে কলকাতা হাইকোর্টে যায়, ক্ষুদিরামের পক্ষ থেকে আপিলও করা হয়—বিশেষ করে তাঁর স্বীকারোক্তি কীভাবে রেকর্ড করা হয়েছে, সেই পদ্ধতি নিয়ে আইনি আপত্তি তোলা হয়েছিল। আদালত সেই যুক্তিগুলো খতিয়ে দেখেও শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। মৃত্যুদণ্ডও বহাল থাকে।
বিচারকদের আলোচনায় তাঁর অল্প বয়সের প্রসঙ্গ স্পষ্টভাবেই এসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা ফাঁসি ঠেকাতে পারেনি।
ক্ষুদিরাম বসুর জীবনের ঘটনাক্রম
| সময় | ঘটনা |
| ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ | মেদিনীপুরের হবিবপুরে জন্ম |
| শৈশব | অল্প বয়সে মা-বাবা দুজনকেই হারান; বড় বোনের কাছে বড় হন |
| ১৯০২-০৩ | অরবিন্দ ঘোষ ও ভগিনী নিবেদিতার মেদিনীপুর সফরের রাজনৈতিক প্রভাব |
| ১৯০৫ | বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়; ১৫ বছর বয়সে প্রথম গ্রেপ্তার |
| ১৯০৫-০৬ পরবর্তী | যুগান্তর/অনুশীলন সমিতি-ঘনিষ্ঠ নেটওয়ার্কে যুক্ত |
| কৈশোর (১৬ বছর নাগাদ) | সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ |
| এপ্রিল ১৯০৮ | প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গে কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে মুজাফফরপুর যাত্রা |
| ৩০ এপ্রিল ১৯০৮ | ভুল গাড়িতে বোমা হামলা; মিসেস ও মিস কেনেডি নিহত |
| ১ মে ১৯০৮ | ওয়াইনি স্টেশনে গ্রেপ্তার |
| ১৩ জুলাই ১৯০৮ | কলকাতা হাইকোর্ট আপিলে দণ্ড বহাল রাখে |
| ১১ আগস্ট ১৯০৮ | মুজাফফরপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর |
আঠারো বছরেই থেমে যাওয়া
১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট মুজাফফরপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ক্ষুদিরাম বসুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৮৮৯ ধরে হিসেব করলে তখন তাঁর বয়স আঠারো।
একটা ছোট্ট অসঙ্গতির কথা বলে রাখা ভালো। খোদ ১৯০৮ সালের আদালতের রায়েই তাঁর বয়স ‘প্রায় ১৯’ বলা হয়েছিল, আর পরবর্তী সময়ের কিছু বিবরণেও উনিশের কাছাকাছি বয়সের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু জন্মতারিখ ও মৃত্যুতারিখ মিলিয়ে হিসেব করলে তিনি তখনও ঊনিশ পূর্ণ করেননি—তাই আধুনিক জীবনী ও স্মরণে তাঁর মৃত্যুকালীন বয়স আঠারো বছর হিসেবেই স্বীকৃত।
ক্ষুদিরামের ফাঁসিকে ঘিরে তাঁর হাসিমুখ, নির্ভীক আচরণ, শেষ মুহূর্তের নানা বর্ণনা পরে কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে। সমকালীন সংবাদপত্রেও তাঁর দৃঢ়তার কথা এসেছিল বলে পরবর্তী সংকলনে উল্লেখ আছে। তবু বারবার পুনর্কথিত নির্দিষ্ট সংলাপগুলোর উৎস সবসময় স্পষ্ট নয়, তাই সেগুলো হুবহু উদ্ধৃত না করাই নিরাপদ। আঠারো বছর বয়সে একটা ঔপনিবেশিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়ে তিনি যে ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন—এই তথ্যটাই নিজে থেকে যথেষ্ট ভারী।
ফাঁসির পর মানুষটার চেয়ে বড় হয়ে উঠল তাঁর নাম
ব্রিটিশ সরকার ক্ষুদিরামের জীবন থামাতে পেরেছিল। তাঁর নাম থামাতে পারেনি।
আঠারো বছর বয়সের ফাঁসি বরং তাঁকে দ্রুত একটা প্রতীকে বদলে দিল। বিশেষ করে বাংলায় তাঁর স্মৃতি ছড়িয়ে গেল গানে, স্মরণে, প্রতিষ্ঠানে, জায়গার নামে।
“একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি”—বাংলার সুপরিচিত এই গানটা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদিরামের ফাঁসির স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। গানটার রচয়িতা হিসেবে পীতাম্বর দাসের নাম বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়, যদিও লোকমুখে দীর্ঘদিন ছড়িয়ে থাকার কারণে গানটাকে ঘিরেও নানা পুনর্কথন তৈরি হয়েছে।
এমন গান কেন এতদিন বেঁচে থাকে? সম্ভবত কারণ ক্ষুদিরামের গল্পে এমন কিছু আছে যা রাজনৈতিক মতাদর্শের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মনে গেঁথে যায়—অস্বাভাবিক কম বয়সে মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার সেই দৃশ্য।
তাঁর নাম আজও বাংলার রোজকার পরিসরে ছড়ানো, খুঁজলে চোখে পড়ে সহজেই—
- কলকাতা মেট্রোর একটা স্টেশনের নাম শহিদ ক্ষুদিরাম।
- ভারতীয় রেলের নথিতে ক্ষুদিরাম বসু পুসা নামে একটা স্টেশন আছে।
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলিপুর ক্যাম্পাসের সরকারি নাম শহিদ ক্ষুদিরাম শিক্ষা প্রাঙ্গণ।
- মেদিনীপুরসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহরে তাঁর নামে রাস্তা ও পার্ক।
এগুলো শুধু নামকরণ নয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও তাঁর স্মৃতি যে জনপরিসরে সক্রিয়, তার চিহ্ন।
অগ্নিযুগের এক মুখ, একমাত্র মুখ নন
ক্ষুদিরামের গল্প বলতে গিয়ে তাঁকে একা কোনো অলৌকিক নায়ক বানিয়ে ফেলাটা ভুল হবে। তিনি ছিলেন একটা সময়ের সন্তান। তাঁর চারপাশে ছিলেন প্রফুল্ল চাকী, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, হেমচন্দ্র কানুনগো আর আরও বহু পরিচিত-অপরিচিত বিপ্লবী। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তরকে ঘিরে সে সময় যে বিপ্লবী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছিল, ক্ষুদিরাম সেই বৃহত্তর ধারারই একজন তরুণ সদস্য মাত্র।
তারপরও তাঁর নাম আলাদা হয়ে রইল কেন? কারণ তাঁর জীবনের প্রায় সব বড় ঘটনা ঘটে গেছে এমন এক বয়সে, যখন বেশিরভাগ মানুষের জীবন আসলে শুরুই হয় না। পনেরো বছরে পুলিশের নজরে পড়া, ষোলোয় সশস্ত্র বিপ্লবে জড়িয়ে পড়া, আঠারোয় মুজাফফরপুর অভিযান, তারপর গ্রেপ্তার-বিচার-ফাঁসি। এত সংকুচিত একটা জীবনকথা ইতিহাসে খুব বেশি নেই।
আজ ১১ আগস্টে ফিরে তাকানোর অর্থ
স্বাধীনতার এত বছর পর ক্ষুদিরামের গল্প আমাদের কী দেয়? শুধুই ব্রিটিশবিরোধী সাহসের একটা উদাহরণ?
আমার মনে হয় তার চেয়ে বেশি কিছু দেয়।
প্রথমত, তাঁর জীবন মনে করিয়ে দেয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম একটামাত্র পথে এগোয়নি। অহিংস গণআন্দোলন ছিল, সাংবিধানিক রাজনীতি ছিল, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন ছিল, আর ছিল বিপ্লবী জাতীয়তাবাদও। এই পথগুলোর মধ্যে গভীর মতভেদ ছিল। সেই মতভেদ মুছে একটা পরিষ্কার সাজানো গল্প বানালে স্বাধীনতা আন্দোলনের আসল জটিলতাটাই হারিয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, তাঁর বয়সটা থামিয়ে দেয় পাঠককে। আঠারো বছর—সংখ্যাটা তাঁর গল্পে এতবার ফিরে আসে যে একসময় এটা আর নিছক সংখ্যা থাকে না, প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কী ধরনের রাজনৈতিক সময়ে একটা কিশোর নিজের জীবনের সম্ভাবনার চেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিকে বড় করে দেখতে শুরু করে? এর সহজ উত্তর নেই। শুধু ‘দেশপ্রেম’ বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়, শুধু ‘উগ্রতা’ বললেও তাই। বঙ্গভঙ্গ, ঔপনিবেশিক বৈষম্য, রাজনৈতিক দমন আর বিপ্লবী সংগঠনের সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে সেই প্রজন্মের কিছু তরুণ এমন একটা পৃথিবী দেখেছিল, যেখানে স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়াটা তাদের কাছে একটা বাস্তব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়ে উঠেছিল। ক্ষুদিরাম সেই প্রজন্মের সবচেয়ে কমবয়সী ও দৃশ্যমান প্রতীকদের একজন।
তৃতীয়ত, তাঁর গল্প শেখায়—বীরত্বের ইতিহাসও প্রশ্নহীনভাবে পড়া উচিত নয়। মুজাফফরপুরে অভিযানের লক্ষ্য ছিলেন কিংসফোর্ড, নিহত হলেন দুজন অন্য মানুষ। এটা মনে রাখা ক্ষুদিরামকে ছোট করে না। বরং মানুষ হিসেবে, ইতিহাসের বাস্তব চরিত্র হিসেবে তাঁকে দেখা। কারণ প্রকৃত ইতিহাসে সাহস আছে, ভুল আছে, আদর্শ আছে, সহিংসতার মূল্যও আছে।
আঠারো বছরের যে জীবন এখনও প্রশ্ন করে
ক্ষুদিরাম বসু স্বাধীন ভারত দেখে যেতে পারেননি। তিনি জানতেনও না ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটতে আরও প্রায় চার দশক লাগবে। তাঁর মৃত্যুর পর স্বাধীনতা সংগ্রাম বহুবার দিক বদলেছে, নতুন নেতা এসেছেন, নতুন কৌশল এসেছে, গণআন্দোলন বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু ক্ষুদিরাম রয়ে গেছেন তাঁর আঠারো বছরেই।
ইতিহাসের এটাই অদ্ভুত ক্ষমতা—একজন মানুষের বয়স থেমে যায়, অথচ তাঁর স্মৃতির বয়স বাড়তে থাকে। জন্মের এক শতাব্দীরও বেশি পর কলকাতা মেট্রোর স্টেশনে তাঁর নাম দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে দেখা যায়, রেলস্টেশনের নামফলকে দেখা যায়। শহীদ দিবস ১১ আগস্ট এলে আবার উচ্চারিত হয় তাঁর নাম।
কিন্তু স্মরণ যদি শুধু ফুল দেওয়া আর পরিচিত দু-একটা বাক্য উচ্চারণে আটকে থাকে, তাহলে মানুষটাকে সত্যিই জানা হয় না। ক্ষুদিরামকে মনে রাখার মানে তাঁর সময়টাকেও মনে রাখা—বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ বাংলা, স্বদেশী আন্দোলনের উত্তেজনা, বিপ্লবী সংগঠনের গোপন জগৎ, ঔপনিবেশিক আদালত, আর সেই প্রজন্মের চরম আত্মত্যাগের মানসিকতা।
মনে রাখতে হবে প্রফুল্ল চাকীকেও। মনে রাখতে হবে কেনেডি পরিবারের দুই নিহত নারীকেও। স্বাধীনতার লড়াইয়ের গৌরব যেমন সত্য, তার মূল্যও তেমন সত্য।
আর সবশেষে ফিরে তাকাতে হবে সেই অসমাপ্ত তরুণটার দিকে, যার সামনে তখনও একটা গোটা জীবন পড়ে থাকার কথা ছিল। সেটা আর হয়নি। ১১ আগস্ট ১৯০৮-এ ফাঁসির দড়ি তাঁর জীবন থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আগুন নিভে গেলেও ছাইয়ের নিচে যেমন কিছু আঁচ থেকে যায়, তেমনি ক্ষুদিরামের জীবন রেখে গিয়েছিল একটা প্রশ্ন, যেটা আজও নেভেনি—
একটা আঠারো বছরের ছেলে কোন বিশ্বাসে নিজের জীবনকে এত ছোট করে দেখতে পারে, আর নিজের দেশের স্বাধীনতাকে এত বড়?
সেই প্রশ্নের কারণেই ক্ষুদিরাম বসু আজও শুধু ইতিহাসের একটা নাম নন। তিনি অগ্নিযুগের এমন এক তরুণ মুখ, যাঁর দিকে তাকালে স্বাধীনতার মূল্যটা হঠাৎ আর বইয়ের পাতার বিষয় বলে মনে হয় না।


