ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই শত শত বছরের ইতিহাসের ভার বহন করে। কোনো দিন হয়তো একটি যুগান্তকারী বিপ্লবের জন্য স্মরণীয়; আবার কোনো দিন নীরবে ধারণ করে জয়, ট্র্যাজেডি, আবিষ্কার এবং শিল্পের জন্মলগ্নের নানা টুকরো স্মৃতি। ১৮ই আগস্ট এমনই একটি বিরল দিন, যা বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশ জুড়ে বিশাল নাগরিক অধিকারের বিজয়, রহস্যময় ঐতিহাসিক প্রস্থান, জ্যোতির্বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার এবং ভূ-রাজনৈতিক মোড় ঘোরানো ঘটনার নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখেছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাংলার শান্ত উপকূলীয় শহরগুলোতে সীমানা নির্ধারণের বিভ্রান্তি দূর করা থেকে শুরু করে আমেরিকার ক্ষমতাশালী করিডোরে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা—এই দিনটির ব্যাপ্তি বিশাল। ভারতের অন্যতম অগ্নিঝরা স্বাধীনতা সংগ্রামীর রহস্যময় অন্তর্ধান থেকে শুরু করে অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুরের আকাশে বসে মহাজাগতিক হিলিয়াম আবিষ্কার, মানব সভ্যতার ইতিহাসে ১৮ই আগস্ট এক অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে।
চলুন, ১৮ই আগস্টের বৈশ্বিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক মাইলফলক, বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জন্ম এবং বিদায়ের এক বিস্তৃত, সাংবাদিকসুলভ ও রোমাঞ্চকর যাত্রায় ডুব দেওয়া যাক।
এক নজরে ১৮ই আগস্ট
১৮ই আগস্ট দিনটি বাংলা এবং বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে নাটকীয় সীমানা পরিবর্তন, সাহিত্যের বিজয় এবং অমীমাংসিত ঐতিহাসিক রহস্যের সাক্ষী।
ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
ভারতভুক্তি দিবস (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট যখন ব্রিটিশরা তড়িঘড়ি করে ভারত ভাগ করে, র্যাডক্লিফ লাইনের তাড়াহুড়ো করে আঁকা সীমানা চরম প্রশাসনিক বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। মানচিত্রের প্রাথমিক ত্রুটি এবং গুজবের কারণে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু অধ্যুষিত জেলা—বিশেষ করে নদীয়া, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ—সাময়িকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।
প্রায় তিন দিন ধরে কৃষ্ণনগর, রানাঘাট এবং মালদহ শহরের মতো জায়গাগুলোতে পাকিস্তানের সবুজ পতাকা উড়ছিল, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও অস্থিরতার সৃষ্টি করে। স্থানীয় নেতাদের মরিয়া আবেদন এবং সীমানা কমিশনের চূড়ান্ত রোয়েদাদ পর্যালোচনার পর, ১৭ই আগস্ট রাতে র্যাডক্লিফ লাইনের সংশোধনী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। অবশেষে ১৮ই আগস্ট, ১৯৪৭ সালের সকালে এই সীমান্ত জেলাগুলো থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ভারতের তেরঙা পতাকা উত্তোলন করা হয়। আজও নদীয়া এবং মালদহের বিভিন্ন সম্প্রদায় ১৮ই আগস্টকে আবেগ ও আনন্দের সাথে ‘ভারতভুক্তি দিবস’ হিসেবে উদ্যাপন করে।
নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর অন্তর্ধান রহস্য (১৯৪৫): জাপানি সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং পরবর্তী বেশ কয়েকটি তদন্ত অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু তাইপেই (তৎকালীন তাইহোকু, তাইওয়ান)-এর মাতসুয়ামা এয়ারফিল্ড থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিমান দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। বলা হয়, সেদিন রাতেই কাছের একটি জাপানি সামরিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তবে, তার এই প্রস্থান আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় একটি অমীমাংসিত রহস্য হয়েই আছে। জাপান ও ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান (শাহ নওয়াজ কমিটি এবং খোসলা কমিশনের সমর্থনে) তাইপেইতে তার মৃত্যুকে স্বীকার করলেও, বিকল্প তত্ত্বগুলো বলছে অন্য কথা। ২০০৫ সালের মুখার্জি কমিশনের তদন্ত অনুযায়ী, অনেকেই বিশ্বাস করেন যে নেতাজি তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তত্ত্ব যা-ই হোক না কেন, কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে ১৮ই আগস্ট এক গভীর শোক ও প্রতিফলনের দিন।
এই অঞ্চলের বিশিষ্ট জন্ম
সেলিম আল দীন (১৯৪৯–২০০৮):

বাংলাদেশের ফেনীর সোনাগাজীর সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণকারী সেলিম আল দীন ‘নাট্যাচার্য’ হিসেবে পূজনীয়। তিনি ইউরোপকেন্দ্রিক নাট্যরীতি ভেঙে বাংলা আখ্যান, লোকগাঁথা এবং জাতিগত পুরাণকে ভিত্তি করে এক নিজস্ব আধুনিক থিয়েটার তৈরি করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অধ্যয়ন শেষে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শিক্ষকতায় যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মধ্যযুগের বাংলা নাটকের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রখ্যাত ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সেলিম আল দীন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পতত্ত্বেরও প্রবর্তক। কিত্তনখোলা, চাকা, ও হরগজ-এর পাশাপাশি তাঁর রচিত অন্যান্য কালজয়ী নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে কেরামত মঙ্গল, হাতহদাই, যৈবতী কন্যার মন, বনপাংশুল এবং নিমজ্জন। বাংলা নাট্যাঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৪ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ২০০৭ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।
গুলজার (জন্ম ১৯৩৪):
দেশভাগের আগে ঝিলাম জেলার (বর্তমান পাকিস্তান) দিনায় জন্মগ্রহণকারী সম্পূর্ণ সিং কালরা, যিনি গুলজার নামেই বেশি পরিচিত, উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। দেশভাগের পর ভারতে এসে শুরুতে গ্যারেজ মেকানিক হিসেবে কাজ করা গুলজারের বলিউডে প্রথম ব্রেক আসে প্রখ্যাত পরিচালক বিমল রায়ের হাত ধরে। ১৯৬৩ সালে বন্দিনী চলচ্চিত্রের “মেরা গোরা রং লেইলে” গানের মাধ্যমে গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। পরিচালক হিসেবেও তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছেন; তাঁর পরিচালিত কালজয়ী সিনেমাগুলোর মধ্যে আঁন্ধি, মৌসম, আঙ্গুর, ইজাজত এবং মাচিস অন্যতম।
সাহিত্যে অনন্য অবদানের পাশাপাশি উর্দু ও হিন্দি কবিতায় তিনি ‘ত্রিবেণী’ (তিন লাইনের কবিতা) নামক একটি নিজস্ব শৈলী জনপ্রিয় করেছেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে চান্দ পুখরাজ কা এবং রাত পশমিনে কি। আর. ডি. বর্মন, এ. আর. রহমান এবং বিশাল ভরদ্বাজের মতো সুরকারদের সাথে তাঁর যুগলবন্দী উপমহাদেশের সঙ্গীতে নতুন যুগের সূচনা করেছে। স্লামডগ মিলিয়নিয়ার (২০০৮) চলচ্চিত্রের ‘জয় হো’ গানের জন্য অস্কার ও গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জয় করা এই কিংবদন্তি ২০০২ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার, ২০০৪ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ এবং ২০১৩ সালে সম্মানজনক ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত (১৯০০–১৯৯০):
এলাহাবাদের বিখ্যাত নেহরু পরিবারে জন্মগ্রহণকারী বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত ছিলেন একজন অকুতোভয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯৫৩ সালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রথম নারী সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দক্ষিণ এশীয় নারীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
পেশোয়া বাজিরাও প্রথম (১৭০০–১৭৪০):
মারাঠা সাম্রাজ্যের এই উদযাপিত সেনাপতি ও পেশোয়া সেন্ট্রাল ও উত্তর ভারতে মারাঠা আধিপত্য বিস্তারের জন্য স্মরণীয়। তার দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনী এবং রণকৌশল ইতিহাস বিখ্যাত।
উপমহাদেশের উল্লেখযোগ্য মৃত্যু
-
শওকত আলী (১৯১৮–১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের ১৮ই আগস্ট প্রয়াণ ঘটে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার শওকত আলীর। তিনি ছিলেন একজন অগ্রগামী রাজনীতিবিদ, আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম সংগঠক এবং ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অপরিহার্য নেতা।
বৈশ্বিক ইতিহাস
১৮ই আগস্ট দিনটি বিশ্বজুড়ে সামরিক সংঘাত, রাজকীয় বিয়ে, সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং মানবাধিকার সংগ্রামের এক সমৃদ্ধ দলিল।
যুক্তরাষ্ট্র: ১৯তম সংশোধনীর চূড়ান্ত বিজয় (১৯২০): ১৮ই আগস্ট, ১৯২০ সালে মার্কিন গণতন্ত্রের দৃশ্যপট চিরতরে বদলে যায়। টেনেসি ৩৬তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে মার্কিন সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী অনুমোদন করে, যার ফলে নারীদের আইনিভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত হয়। এই ভোটাভুটি ছিল চরম উত্তেজনার। ২৪ বছর বয়সী প্রতিনিধি হ্যারি টি. বার্ন প্রথমে নারী ভোটাধিকারের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তার পকেটে ছিল মা ফেব এনসমিংগার বার্নের একটি হাতে লেখা চিঠি, যেখানে লেখা ছিল: “হুররে, ভোটাধিকারের পক্ষে ভোট দাও!… ভালো ছেলে হও।” মায়ের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বার্ন তার ভোট পরিবর্তন করে “হ্যাঁ” বলেন, ৪৮-৪৮ টাই ভেঙে যায় এবং প্রায় ২.৭ কোটি মার্কিন নারী ভোটাধিকার পান।
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ
-
ব্যাটল অব ব্রিটেনে “দ্য হার্ডেস্ট ডে” (১৯৪০): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে জার্মান লুফটওয়াফে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটি ও রাডার স্টেশনগুলোতে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। ইতিহাসে “The Hardest Day” নামে পরিচিত এই দিনে দুই পক্ষেই সর্বোচ্চ সংখ্যক বিমান ধ্বংস হয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF) সফলভাবে তাদের স্টেশনগুলো রক্ষা করে এবং হিটলারের ব্রিটেন আক্রমণের পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
-
সেন্ট বার্থলোমিউ দিবসের গণহত্যার পূর্বলক্ষণ (১৫৭২): প্যারিসে প্রোটেস্ট্যান্ট রাজা হেনরি (নাভারে) এবং ক্যাথলিক রাজকন্যা মার্গারেটের বিয়ে হয়। এটি ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ, কিন্তু ক্যাথলিক অধ্যুষিত প্যারিসে হাজার হাজার প্রোটেস্ট্যান্ট অভিজাতের সমাবেশ একটি বারুদের স্তূপ তৈরি করে, যা ঠিক ছয় দিন পর ভয়াবহ সেন্ট বার্থলোমিউ দিবসের গণহত্যায় রূপ নেয়।
-
ব্যাটল অব গ্র্যাভেলট (১৮৭০): ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের বৃহত্তম এই যুদ্ধে প্রুশিয়ান বাহিনী ফরাসিদের পরাজিত করে, যা পরবর্তীতে জার্মান সাম্রাজ্যের একীকরণের পথ প্রশস্ত করেছিল।
রাশিয়া ও সোভিয়েত বলয়
-
লুনা ২৪-এর চাঁদে অবতরণ (১৯৭৬): স্নায়ুযুদ্ধের মহাকাশ দৌড়ের শেষ অধ্যায়ে, সোভিয়েত রোবোটিক প্রোব লুনা ২৪ চাঁদে অবতরণ করে। এটি সফলভাবে চাঁদের মাটি খুঁড়ে ১৭০.৬ গ্রাম নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসে। এটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ চন্দ্র অভিযান।
-
১৯৯১ সালের সোভিয়েত অভ্যুত্থানের বীজ: ১৮ই আগস্ট সন্ধ্যায়, সোভিয়েত সরকার ও সামরিক বাহিনীর কট্টরপন্থীরা প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভকে তার ক্রাইমিয়ার বাসভবনে গৃহবন্দী করে পদত্যাগের দাবি জানায়। এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান মাত্র চার মাস পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করেছিল।
চীন ও পূর্ব এশিয়া
-
দেং জিয়াওপিং-এর আধুনিকীকরণ মতবাদ (১৯৮০): দেং জিয়াওপিং তার এক ঐতিহাসিক ভাষণে আমলাতান্ত্রিক জড়তা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করেন। এই ভাষণটিই চীনের আধুনিক অর্থনৈতিক উত্থানের আদর্শিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
-
মাও সেতুং ও রেড গার্ড (১৯৬৬): তিয়েনআনমেন স্কয়ারে মাও সেতুং সামরিক পোশাকে ১০ লক্ষেরও বেশি তরুণ রেড গার্ডকে স্বাগত জানিয়ে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ও উত্তাল পর্বের সূচনা করেন।
-
প্যানমুনজম কুঠার হত্যা কাণ্ড (১৯৭৬): কোরীয় ডিমিলিটারাইজড জোনে (DMZ) একটি পপলার গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে উত্তর কোরীয় সৈন্যদের হাতে দুই মার্কিন সেনা নির্মমভাবে নিহত হন। এই ঘটনা কোরীয় উপদ্বীপকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা
-
ব্যাটল অব লং ট্যান (১৯৬৬): দক্ষিণ ভিয়েতনামের একটি রাবার বাগানে মাত্র ১০৮ জন অস্ট্রেলীয় সেনা প্রায় ১৫০০ থেকে ২৫০০ ভিয়েতকং ও উত্তর ভিয়েতনামী সেনার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বীরত্বের সাথে টিকে থাকে। দিনটি আজও অস্ট্রেলিয়ায় ‘লং ট্যান ডে’ এবং ‘ভিয়েতনাম ভেটেরানস ডে’ হিসেবে পালিত হয়।
আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা
-
স্টিভ বিকোর প্রেপ্তার (১৯৭৭, দক্ষিণ আফ্রিকা): বর্ণবাদ বিরোধী ‘ব্ল্যাক কনশাসনেস মুভমেন্ট’-এর নেতা স্টিভ বিকোকে পুলিশের একটি রোডব্লকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশি হেফাজতে নির্মম অত্যাচারে তার মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছিল এবং বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছিল।
-
২০২০ মালির সামরিক অভ্যুত্থান: মালির সামরিক বাহিনীর কিছু বিদ্রোহী সদস্য রাজধানী বামাকোতে প্রবেশ করে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম বুবাকার কেইতা এবং প্রধানমন্ত্রী বুবু সিসেকে পদত্যাগে বাধ্য করে।
বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সাহিত্য: হিলিয়াম আবিষ্কার
১৮ই আগস্ট দিনটির একটি অনন্য বৈজ্ঞানিক ইতিহাস রয়েছে।
১৮৬৮ সালের হিলিয়াম আবিষ্কার: ১৮৬৮ সালের ১৮ই আগস্ট, ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী পিয়েরে জ্যানসেন ভারতের গুন্টুরে (বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশ) একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার নতুন উদ্ভাবিত স্পেকট্রোস্কোপ দিয়ে তিনি সৌর বিকিরণের মধ্যে একটি উজ্জ্বল হলুদ রেখা সনাক্ত করেন। ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নরম্যান লকইয়ার পরে প্রমাণ করেন যে এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন উপাদান, যা পৃথিবীর রসায়নে অজানা। গ্রিক সূর্যদেবতা ‘হেলিওস’-এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘হিলিয়াম’। অবাক করা বিষয় হলো, পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হওয়ার প্রায় ২৭ বছর আগেই হিলিয়াম মহাকাশে আবিষ্কৃত হয়েছিল!
সাহিত্যের মাইলফলক: ললিতা উপন্যাসের মার্কিন প্রকাশ (১৯৫৮): ১৮ই আগস্ট, ১৯৫৮ সালে ভ্লাদিমির নবোকভের বিতর্কিত মাস্টারপিস ললিতা প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়। এর আগে বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ হওয়া এই উপন্যাসটি আমেরিকায় রাতারাতি সাহিত্যিক আলোড়ন তৈরি করে এবং শৈল্পিক স্বাধীনতা ও অশ্লীলতা আইন নিয়ে এক ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
১৮ই আগস্টের উল্লেখযোগ্য জন্মদিন
এই দিনটি পৃথিবীতে স্বাগত জানিয়েছে অনেক রাজপরিবারের সদস্য, অভিযাত্রী, পর্দার আইকন এবং বিজ্ঞানীদের।
-
ভার্জিনিয়া ডেয়ার (১৫৮৭): আমেরিকায় ইংরেজ পিতামাতার ঘরে জন্মগ্রহণকারী প্রথম সন্তান। তার জন্মের কিছুদিন পরই তার পুরো বসতি রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়, যা আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বড় এক রহস্য।
-
মেরিওয়েদার লুইস (১৭৭৪): লুইস এবং ক্লার্ক অভিযানের সহ-নেতা, যিনি উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল মানচিত্রভুক্ত করেছিলেন এবং প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন।
-
সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফ প্রথম (১৮৩০): অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির এই সম্রাটের একটি আল্টিমেটামই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। তিনি দীর্ঘ ৬৮ বছর রাজত্ব করেছিলেন।
-
রবার্ট রেডফোর্ড (১৯৩৬): আমেরিকান সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি (বুচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য সানড্যান্স কিড খ্যাত) এবং সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের রূপকার।
-
জাস্ট ফন্টেইন (১৯৩৩–২০২৩): ফরাসি ফুটবলার যিনি এক বিশ্বকাপে (১৯৫৮) রেকর্ড ১৩টি গোল করেছিলেন—যে রেকর্ড আজও অক্ষত।
১৮ই আগস্টের উল্লেখযোগ্য মৃত্যু
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে বিশ্বশান্তির দূত—অনেকেই এই দিনে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।
-
চেঙ্গিস খান (১২২৭): মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি যাযাবর উপজাতিদের একত্রিত করে মানব ইতিহাসের বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন ভূমি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তার সমাধি আজও পৃথিবীর অন্যতম বড় প্রত্নতাত্ত্বিক রহস্য।
-
অনরে ডি বালজাক (১৮৫০): ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক এবং ইউরোপীয় বাস্তববাদের স্থপতি।
-
বি.এফ. স্কিনার (১৯৯০): ২০ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী মনোবিজ্ঞানী। তার আবিষ্কৃত ‘অপারেন্ট কন্ডিশনিং’ শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের ধারণা চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
-
কিম দে-জং (২০০৯): দক্ষিণ কোরিয়ার ১৫তম প্রেসিডেন্ট এবং শান্তিতে নোবেলজয়ী। সামরিক স্বৈরাচারের অধীনে নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পেরিয়ে তিনি “এশিয়ার নেলসন ম্যান্ডেলা” হিসেবে পরিচিতি পান।
-
কফি আনান (২০১৮): ঘানার অধিবাসী এবং জাতিসংঘের ৭ম মহাসচিব। ২০০১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আনান বিশ্বব্যাপী এইচআইভি/এইডস মহামারী মোকাবিলা এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDG) প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক দিবস ও সংস্কৃতি
রাজনৈতিক মাইলফলকের বাইরেও বিভিন্ন দেশে ১৮ই আগস্ট বিশেষ মর্যাদার সাথে পালিত হয়:
-
ভিয়েতনাম ভেটেরানস ডে (অস্ট্রেলিয়া): লং ট্যানের যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনাদের বীরত্ব স্মরণে জাতীয় শোক ও শ্রদ্ধার দিন।
-
সংবিধান দিবস (ইন্দোনেশিয়া): ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার ঠিক পরের দিন ১৯৪৫ সালের সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসমর্থনের দিন।
-
জাতীয় বিজ্ঞান দিবস (থাইল্যান্ড): রাজা মংকুট (রামা চতুর্থ) কর্তৃক ১৮৬৮ সালে ঠিক এই দিনে সূর্যগ্রহণ সফলভাবে গণনা ও পর্যবেক্ষণের স্মরণে এই দিনটি পালিত হয়।
-
ব্যাড পোয়েট্রি ডে: ইচ্ছাকৃতভাবে জঘন্য ও হাস্যকর কবিতা লিখে মজা করার একটি হালকা মেজাজের দারুণ দিন!
মজার তথ্য: আপনি কি জানতেন?
১. লাল গোলাপ বনাম হলুদ গোলাপ: ১৯২০ সালে টেনেসি অঙ্গরাজ্যে নারী ভোটাধিকার নিয়ে ভোটাভুটির সময় সমর্থকরা হলুদ গোলাপ এবং বিরোধীরা লাল গোলাপ পরতেন। যখন হ্যারি বার্ন লাল গোলাপ পরেও তার মায়ের চিঠির কারণে “হ্যাঁ” ভোট দেন, তখন চেম্বারে এমন হট্টগোল শুরু হয় যে ক্ষুব্ধ লবিস্টদের হাত থেকে বাঁচতে তাকে চিলেকোঠার জানালা দিয়ে পালাতে হয়েছিল!
২. পৃথিবীতে পাওয়ার আগে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে উপাদান আবিষ্কার: ১৮৬৮ সালে যখন পিয়েরে জ্যানসেন হিলিয়ামের অস্তিত্ব পান, তখন বিজ্ঞানীরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে পৃথিবীতে নেই এমন কিছু সূর্যে থাকতে পারে। দীর্ঘ ২৭ বছর পর ১৮৯৫ সালে পৃথিবীতে হিলিয়াম বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়।
৩. ১৯৯৯ সালের “গ্র্যান্ড ক্রস” প্রলয়ের আতঙ্ক: ১৮ই আগস্ট, ১৯৯৯ সালে জ্যোতিষী ও ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো সতর্ক করেছিল যে গ্রহের একটি বিরল বিন্যাস বা “গ্র্যান্ড ক্রস” পৃথিবীতে ভূমিকম্প, পারমাণবিক গলন এবং সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনবে। দিনটি একটি সাধারণ দিনের মতোই পার হয়ে যায় এবং এটি ব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণীর তালিকায় হাস্যকর একটি নাম হিসেবে যুক্ত হয়।
শেষ কথা
মানব ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট তারিখের দিকে গভীরভাবে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে আমাদের বিশ্বটা আসলে কতটা অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত। ১৮ই আগস্ট আমাদের সামনে মানব চেষ্টার এক বিশাল ক্যানভাস তুলে ধরে: ব্যালট বাক্সে সমঅধিকার আদায়ের জন্য নারীদের অদম্য সাহস, ঔপনিবেশিক ভারতে বসে মহাবিশ্বের উপাদান আবিষ্কারের বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল, জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ের অমীমাংসিত আত্মত্যাগ এবং কবি, শিল্পী ও শান্তিকর্মীদের কালজয়ী অবদান।
পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে ‘ভারতভুক্তি দিবস’-এর স্থানীয় আনন্দ-উল্লাস হোক, ক্যানবেরায় লং ট্যানের যুদ্ধের গম্ভীর স্মরণ হোক, অথবা কফি আনানের মতো মানুষের চিরস্থায়ী কূটনীতি হোক—১৮ই আগস্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কেবল অতীতের ফেলে আসা বছরগুলোর ধুলোমাখা সমষ্টি নয়। এটি সেই জীবন্ত ও স্পন্দিত ভিত্তিভূমি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের আজকের এই আধুনিক পৃথিবী সগর্বে টিকে আছে।

