সেলিম আল দীনের নাট্যভুবন: বাংলার আত্মজ নাট্যধারার সুতিকাগার

সর্বাধিক আলোচিত

“চাকা” নাটকের সেই দৃশ্য—একটি লাশ, কয়েকজন গরুর গাড়িয়াল, আর পথের মাঝখানে থমকে যাওয়া একটি চাকা। সংলাপ নেই তেমন সেখানে; আছে অপেক্ষা, আছে জীবিকার টানাপোড়েনে জর্জরিত মানুষের নিঃশব্দ হাহাকার, আর আছে একজন গায়েনের কণ্ঠ, যিনি বর্ণনার ভেতর দিয়ে গল্পটাকে বহন করে নিয়ে যান দর্শকের কাছে। এই দৃশ্যই বলে দেয়, সেলিম আল দীন নিছক মঞ্চের জন্য নাটক লিখতেন না —তিনি লিখতেন বাংলার মাটির জন্য, যেখানে গল্প বলার নিজস্ব একটা রীতি ছিল বহুকাল ধরে, আর তিনি সেই ঐতিহ্যবাহী রীতিকেই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন আধুনিক মঞ্চে।

সেলিম আল দীনকে তাই অতীতকালের ক্রিয়াপদ দিয়ে লেখা যায় না। কারণ যিনি বাংলা নাটককে পাঁচালির ছন্দ, পালাগানের সুর আর বয়াতির কণ্ঠস্বর ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তিনি কালের সীমানা মানেন না। আজও কোথাও কোনো মঞ্চে তাঁর গায়েন বর্ণনার ভেতর দিয়ে গল্প এগিয়ে নিয়ে যান, কিংবা কোনো অভিনেতা সংলাপের বদলে বয়ানে ফিরে যান নিজের চরিত্রের কাছে। এ যেন তাঁরই কালোত্তীর্ন উপস্থিতির প্রমাণ।

১৮ আগস্ট ১৯৪৯-এ ফেনীর সোনাগাজীর সেনেরখিল গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৪ জানুয়ারি ২০০৮-এ তাঁর জীবনাবসান। কিন্তু জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানের আটান্ন বছরের জীবনকে তারিখের রেখায় মাপলে সেলিম আল দীনকে খুব সামান্যই ধরা যায়। বাংলা নাটককে তিনি শুধু কয়েকটি অসামান্য রচনা দেননি; নাটক কাকে বলে, বাংলা নাটকের নিজের শরীরটি কেমন হতে পারে—পশ্চিমা কাঠামোর বাইরে গিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তরই নতুন করে খুঁজেছিলেন। “চাকা”র সেই থমকে যাওয়া গাড়ির মতোই, তাঁর সেই প্রশ্নগুলোও থেমে থাকেনি—বরং ঘুরে চলেছে আজও, প্রতিটি নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীর ভাবনার ভেতর।

জীবনী এক নজরে

Selim Al Deen biography

বিষয় তথ্য
জন্ম ১৮ আগস্ট ১৯৪৯, সেনেরখিল, সোনাগাজী, ফেনী
মৃত্যু ১৪ জানুয়ারি ২০০৮, ঢাকা; সমাধি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে
পিতা-মাতা মফিজউদ্দিন আহমেদ ও ফিরোজা খাতুন
শিক্ষা ১৯৬৪ এসএসসি; ১৯৬৬ এইচএসসি; করটিয়ার সা’দত কলেজ থেকে স্নাতক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ; ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি
গবেষণার বিষয় মধ্যযুগের বাংলা নাট্য
কর্মক্ষেত্র প্রথমে বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে কপিরাইটার; ১৯৭৪ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; পরে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
সহধর্মিণী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা সেলিম
উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ১৯৮৪; একুশে পদক ২০০৭; মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৩

সেনেরখিল থেকে নাটকের শিকড়ের দিকে

সেলিম আল দীনের শিক্ষাজীবন এক জায়গায় স্থির ছিল না। সেনেরখিলের মঙ্গলকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে এসএসসি, ফেনী কলেজ থেকে ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাসের পর ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত সেখানে পড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চলে যান টাঙ্গাইলের করটিয়ার সা’দত কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক হয়ে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। বহু পরে, ১৯৯৫ সালে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যযুগের বাংলা নাট্য নিয়ে গবেষণা করে অর্জন করেন পিএইচডি।

এই শিক্ষাপথটি তাঁর নাট্যচিন্তার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। তিনি যেন বারবার কেন্দ্র থেকে প্রান্তে গেছেন, তারপর প্রান্তের অভিজ্ঞতা নিয়েই কেন্দ্রে ফিরেছেন। তাঁর নাটকেও সেই যাত্রা—নগরের শিক্ষিত মঞ্চ থেকে মেলা, পালা, পাঁচালি, গায়েন, জেলে, মাঝি, কৃষক, কাহার, বয়াতি ও নানা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে।

১৯৬৮ সালে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের সাহিত্য নিয়ে তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখার সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৬৯ সালে বেতারে প্রচারিত হয় বিপরীত তমসায়; ১৯৭০ সালে টেলিভিশনে আসে ঘুম নেই; আর ১৯৭২ সালে মঞ্চস্থ হয় তাঁর প্রথম মঞ্চনাটক সর্প বিষয়ক গল্প। অর্থাৎ তাঁর যাত্রা এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে—প্রবন্ধ, বেতার, টেলিভিশন, মঞ্চ—ক্রমাগত নিজের ভাষা খোঁজার যাত্রা।

‘দ্বন্দ্বাত্মক রূপান্তর’ নয়—প্রামাণ্য পরিভাষায় ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’

সেলিম আল দীনের নাট্যদর্শন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কখনো কখনো “দ্বন্দ্বাত্মক রূপান্তর” কথাটি ব্যাখ্যামূলক অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ও গবেষণামূলক উৎসে তাঁর শিল্পতত্ত্বের স্বীকৃত নাম ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। তাঁর সঙ্গে একাঙ্গীকরণ বা Fusion Theory এবং New Ethnic Theatre ধারণারও উল্লেখ পাওয়া যায়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর শিল্পতত্ত্ব নিয়ে আয়োজিত আলোচনাতেও ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ নামটিই ব্যবহৃত হয়েছে।

সহজ করে বললে, সেলিম আল দীন সেই নাটকের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি যা ইউরোপ থেকে এসেছে; তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—বাংলার নিজস্ব নাট্যস্মৃতি কোথায়?

বাংলার পালা, পাঁচালি, কীর্তন, যাত্রা, কথকতা—এসব পরিবেশনায় গল্প, গান, নাচ, বর্ণনা ও অভিনয় পরস্পরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে থাকে না। একজন গায়েন এক মুহূর্তে কাহিনি বলেন, পরক্ষণে চরিত্র হয়ে ওঠেন; গানের মধ্যে গল্প এগোয়, বর্ণনা অভিনয়ে রূপ নেয়। সেলিম আল দীন এই অবিভক্ত নন্দনজগতকে আধুনিক নাটকে ফিরিয়ে আনলেন। ফলে তাঁর নাটকে সংলাপ আর বর্ণনা, কবিতা আর কাহিনি, গান আর অভিনয় একে অন্যের সীমানা অতিক্রম করতে থাকে।

সেই অর্থে “দ্বন্দ্বাত্মক রূপান্তর”কে তাঁর নাট্যপ্রক্রিয়ার একটি ব্যাখ্যামূলক সূত্র বলা চলে—পুরোনো লোকরীতিকে হুবহু নকল নয়, আবার আধুনিকতার কাছে আত্মসমর্পণও নয়; সংঘাত ও আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে পুরোনো রূপের নতুন জন্ম। কিন্তু এটিকে তাঁর প্রামাণ্য তত্ত্ব-নাম বলা যথার্থ হবে না।

কিত্তনখোলা থেকে পুত্র: নিজের নাট্যভাষার সন্ধান

সেলিম আল দীনের নাট্যজীবনে কিত্তনখোলা একটি সন্ধিক্ষণ। এরপর কেরামতমঙ্গল ও হাত হদাই-এ তাঁর দেশজ নাট্যরীতির অনুসন্ধান আরও গভীর হয়। চাকা, হরগজ ও যৈবতী কন্যার মন-এ বর্ণনামুখর ‘কথানাট্য’ নতুন মাত্রা পায়। পরে বনপাংশুল, প্রাচ্য, নিমজ্জন, ধাবমান, স্বর্ণবোয়াল ও পুত্র-এর মতো রচনায় পাঁচালি ও আখ্যানের ঐতিহ্যকে তিনি আরও স্বাধীনভাবে ব্যবহার করেন।

তাঁর কাছে লোকজ সংস্কৃতি কোনো সাজসজ্জা নয়। মঞ্চের পাশে একটি ঢোল রেখে, দু-একটি আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করে “লোকনাট্য” বানানোর পথ তাঁর ছিল না। বরং তিনি বাংলার শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের জীবনকেই নাটকের মহাকাব্যিক মর্যাদা দেন। তাঁর নাট্যে কৃষক, জেলে, মাঝি, মাল্লা, কাহার, ডোম, কবিয়াল, তাঁতি, বয়াতি, যাত্রাশিল্পী—যাঁরা প্রচলিত ‘উচ্চ’ সাহিত্যে বহুদিন প্রান্তে ছিলেন, তাঁরা নিজেদের ভাষা ও জীবনদর্শন নিয়েই কেন্দ্রে উঠে আসেন।

হাত হদাই-এর উপকূল তাই কেবল ভূগোল এর বর্ণনা ব্যঞ্জনায় সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবন-সংগ্রামের নোনাজলমাখা মানচিত্র। যৈবতী কন্যার মন-এ আখ্যান আর নাট্যের সীমারেখা ভাঙে। চাকা সংলাপনির্ভর প্রচলিত নাট্যের বদলে চলমান কথনের শক্তিকে সামনে আনে। আর হরগজ এমন এক নাট্যভাষার দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে, যা দেশের বাইরে অনুবাদ ও মঞ্চায়নের পথও পেয়েছে।

সেলিম আল দীন অত্যন্ত সফলভাবে  “লোকজ”কে অতীতের জাদুঘর থেকে বের করে আধুনিকতার একটি বিকল্প ভাষা বানিয়েছেন।

কর্মজীবন এক নজরে

সাল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
১৯৬৮ কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের সাহিত্য নিয়ে প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ
১৯৬৯ প্রথম বেতার নাটক বিপরীত তমসায় প্রচার
১৯৭০ প্রথম টেলিভিশন নাটক ঘুম নেই
১৯৭২ প্রথম মঞ্চনাটক সর্প বিষয়ক গল্প মঞ্চায়িত
১৯৭৩ ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মকাণ্ডে যুক্ত; প্রথম নাট্যগ্রন্থ প্রকাশের সময়কাল
১৯৭৪ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান
১৯৮১–৮২ নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার গড়ে তোলেন
১৯৮৪ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার
১৯৮৬ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে যোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ
১৯৯৫ মধ্যযুগের বাংলা নাট্য বিষয়ে পিএইচডি
২০০৭ একুশে পদক
২০০৮ ১৪ জানুয়ারি মৃত্যু
২০২৩ সাহিত্যে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার

বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রাম থিয়েটার এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণ

সেলিম আল দীন ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করে পরে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসাবে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে যান। বর্তমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকেই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করে; বিভাগের গবেষণাপত্র Theatre Studies-এর সঙ্গেও তাঁর সম্পাদকীয় ও গবেষণামূলক ভূমিকা ছিল।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান Theatre and Performance Studies বিভাগের পাঠ ও পরিবেশনা-দর্শনে সেলিম আল দীন গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার; বিভাগটির নিজস্ব নথিতেই রবীন্দ্রনাথ, সৈয়দ শামসুল হক, মামুনুর রশীদদের সঙ্গে তাঁর নাটক অধ্যয়ন ও অভিনয়ের কথা রয়েছে।

আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের বৃহত্তর ভূগোলে ছিল ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে ১৯৮১–৮২ সালে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি নাটককে রাজধানীর মিলনায়তন থেকে দেশের জনপদে ফেরানোর সাংগঠনিক পথও নির্মাণ করেন।

রচনাপঞ্জি: যতদূর প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য উৎসে যাচাই সম্ভব

নাটক ও মঞ্চরচনা

রচনা প্রকাশ/রচনা/প্রথম প্রযোজনার যাচাইকৃত সাল ধরন
মহাকবি আলাওল সাল নিশ্চিত নয় মঞ্চনাটক
বিশু কুমারের পুতুলনাচ সাল নিশ্চিত নয় মঞ্চনাটক
অনিকেত অন্বেষণ ১৯৭০ মঞ্চনাটক
এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা ১৯৭২ মঞ্চনাটক
জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন ১৯৭২; গ্রন্থ ১৯৭৫ মঞ্চনাটক
সর্প বিষয়ক গল্প প্রথম মঞ্চ ১৯৭২; গ্রন্থ ১৯৭৩ মঞ্চনাটক
করিম বাউয়ালীর শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা ১৯৭৩ মঞ্চনাটক
সংবাদ কার্টুন ১৯৭৩ মঞ্চনাটক
মুনতাসীর ১৯৭৪–৭৫ মঞ্চনাটক
আতর আলীদের নীলাভ পাট ১৯৭৫ মঞ্চনাটক
চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি ১৯৭৬ পথনাটক
শকুন্তলা ১৯৭৭ মঞ্চনাটক
কিত্তনখোলা ১৯৭৮–৮০; পৃথক গ্রন্থ ১৯৮৯ মঞ্চ/আখ্যাননাট্য
আততায়ী ১৯৮৩ মঞ্চনাটক
সয়ফুলমূলক বদিউজ্জামাল ১৯৮৩ মঞ্চনাটক
বাসন ১৯৮৪; গ্রন্থ ১৯৮৫ মঞ্চনাটক
কেরামতমঙ্গল ১৯৮৪–৮৫; গ্রন্থ ১৯৮৮ মঞ্চনাটক
হাত হদাই ১৯৮৮ কথানাট্য
চাকা ১৯৯০; গ্রন্থ ১৯৯১ কথানাট্য
যৈবতী কন্যার মন ১৯৯২; গ্রন্থ ১৯৯৩ কথানাট্য
হরগজ ১৯৯২ কথানাট্য
একটি মারমা রূপকথা ১৯৯৫ গবেষণাগার নাট্য
বনপাংশুল উৎসভেদে ১৯৯৬/১৯৯৭ নাটক
প্রাচ্য ১৯৯৭; গ্রন্থ ১৯৯৮ নব্য-পাঁচালি/নাট্য
নিমজ্জন গ্রন্থ ২০০২; পরবর্তী প্রযোজনা-তালিকায় ২০০৬–০৭ নাটক
ধাবমান ২০০৫–০৬ নাটক
স্বর্ণবোয়াল ২০০৬ নাটক
স্বপ্ন রমণীগণ ২০০৬ নৃত্যনাট্য
ঊষা উৎসব ২০০৭ নৃত্যনাট্য
পুত্র ২০০৭; গ্রন্থ ২০০৮ নাটক
দেয়াল রচনাসাল নিশ্চিত নয়; ২০২৬-এ মঞ্চায়ন নথিবদ্ধ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক

মূল ক্রম ও সাল:

বেতার ও টেলিভিশনের নাট্যরচনা

রচনা যাচাইকৃত প্রচারকাল ধরন
বিপরীত তমসায় ১৯৬৯ বেতার নাটক
ঘুম নেই ১৯৭০ টিভি নাটক
রক্তের আঙ্গুরলতা সাল নিশ্চিত নয় বেতার/টিভি নাটক
শেকড় কাঁদে জলকণার জন্য সাল নিশ্চিত নয় টিভি নাটক
মশারী ’৭৩ সাল স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয় নাটক
একদিন একরাত্রি সাল নিশ্চিত নয় নাটক
শ্যামল ছায়ায় সাল নিশ্চিত নয় নাটক
মাছি সাল নিশ্চিত নয় নাটক
শয্যা সাল নিশ্চিত নয় নাটক
নীল নীল যন্ত্রণা সাল নিশ্চিত নয় নাটক
অশ্রুত গান্ধার ১৯৭৬ বিটিভি নাটক
হলুদ পাতার গান ১৯৭৭ টিভি নাটক
শেষ বংশধর ১৯৭৯ বিটিভি নাটক
ওহ দেবদূত ১৯৭৯ বিটিভি নাটক
ভাঙনের শব্দ শুনি ১৯৮১–৮২ ‘আয়না’ সিরিজ
মাঠের পর মাঠ ১৯৮২ বিটিভি নাটক
লালমাটি কালো ধোঁয়া ১৯৮২–৮৩ ‘আয়না’ সিরিজ
প্রজাপতি ১৯৮২–৮৩ বিটিভি নাটক
গ্রন্থিকগণ কহে ১৯৯০–৯১ আট পর্বের ধারাবাহিক
অনূত রাত্রি ১৯৯৩ টিভি নাটক
ছায়া শিকারী ১৯৯৪–৯৫ নয় পর্বের ধারাবাহিক
হিতঙ্কর ১৯৯৯ বিটিভি নাটক
ইচ্ছা পূরণ ২০০০ টিভি নাটক
নকশি পাড়ের মানুষ ২০০২ টিভি নাটক
ক্ষমা ২০০৩ টিভি নাটক
রঙের মানুষ ২০০৩ টিভি ধারাবাহিক
বসবাস ২০০৪ টিভি নাটক
ধার উধার সাল নিশ্চিত নয় টিভি নাটক

তালিকার তথ্য:

উপন্যাস, কবিতা, গবেষণা ও অন্যান্য রচনা

শিরোনাম সাল ধরন
নন্দিকেশ্বরের অভিনয় দর্পণ ১৯৮২ অনুবাদ/সম্পাদনা
কবি ও তিমি ১৯৯০ কাব্যগ্রন্থ
মধ্যযুগের বাংলা নাট্য পিএইচডি ১৯৯৫; গ্রন্থরূপে উৎসভেদে ১৯৯৫/১৯৯৬ গবেষণাগ্রন্থ
বাংলা নাট্যকোষ ১৯৯৮ নাট্যকোষ/গবেষণা
অমৃত উপাখ্যান প্রকাশকাল নিয়ে উৎসভেদ—১৯৮৯/২০০৫ উপন্যাস
আমেরিকার কালোদের সাহিত্য: লোকসঙ্গীত ১৯৬৮ প্রবন্ধ
আমেরিকার কালোদের সাহিত্য: কাব্যধারা ১৯৬৮ প্রবন্ধ
মোরাভিয়া: তিনটি দ্বন্দ্বমান চরিত্র ১৯৬৮ প্রবন্ধ
ও নীলের একটি নাটক, রুবি বিষয়ক ১৯৬৯ প্রবন্ধ
ভাষা আন্দোলন ও নাটক ১৯৭২ প্রবন্ধ
সমকালীন নাট্যচর্চা বিষয়ে ১৯৭৩–৭৪ প্রবন্ধ
একটি কাব্যপাঠের গল্প ১৯৭৭ প্রবন্ধ
মিউজিক্যাল কমেডি ও মুনতাসীর ১৯৭৭ নাট্যপ্রবন্ধ
হাসতে হাসতে দেয়াল ভাঙ—দাদা ঠাকুর ১৯৭৯–৮০ প্রবন্ধ
কিত্তনখোলা নাটক ও প্রযোজনা প্রসঙ্গে ১৯৮৫ নাট্যপ্রবন্ধ
মহাকবির নাট্য রচনা বিষয়ে ১৯৯১ গবেষণা প্রবন্ধ
কিত্তনখোলা ও ঢাকা থিয়েটার ১৯৯২ প্রবন্ধ
‘শ্রী চৈতন্যভাগবতে’ নাট্যপ্রসঙ্গ ১৯৯২ গবেষণা প্রবন্ধ
বাঙলা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের পূর্বাপর ১৯৯৫ গবেষণা প্রবন্ধ
নাট্য গবেষণা পদ্ধতি ও ব্যবহারিক প্রসঙ্গ ১৯৯৮ গবেষণা প্রবন্ধ
মান্দাই নৃ-গোষ্ঠী সাল নিশ্চিত নয় ছয় পর্বের গবেষণামূলক লেখা
দিনলিপি প্রথম প্রকাশের সাল নিশ্চিত নয় দিনলিপি
ভাঙা প্রেম অশেষ বিশেষ প্রথম সংস্করণের সাল নিশ্চিত নয় সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধসংকলন

উল্লেখ্য, মহুয়া, দেওয়ানা মদিনা, সধবার একাদশী, বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ, মেঘনাদবধ, কাঁদো নদী কাঁদো ও ম্যাকবেথ-এর মতো কয়েকটি প্রযোজনায় তাঁর নির্দেশনা বা নাট্যরূপ-সম্পর্কিত ভূমিকা থাকলেও সেগুলো তাঁর মৌলিক সাহিত্যকর্ম নয়।

স্বীকৃতি: পুরস্কারের চেয়েও বড় যে গ্রহণযোগ্যতা

১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে নান্দিকার-সংশ্লিষ্ট সম্মাননা, ২০০৭ সালে একুশে পদক এবং ২০২৩ সালে সাহিত্যে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার—রাষ্ট্র ও নাট্যসমাজ উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর স্বীকৃতির পরিধি বিস্তৃত। তাঁর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়েও বিভিন্ন জীবনীসূত্রে উল্লেখ আছে; তবে সংশ্লিষ্ট বছর নিয়ে ১৯৯৩ ও ১৯৯৪—দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।

কিন্তু পুরস্কারের তালিকার বাইরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার আরেক ভাষা আছে। তাঁর মৃত্যুর পর নাট্যজনেরা বাংলা নাটকের ইতিহাসে তাঁর সময়কে স্বতন্ত্র এক পর্ব হিসেবে দেখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক তাঁকে বাংলা নাটকের প্রধান পুরুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন; অধ্যাপক অরুণ সেনও দুই বাংলার নাট্যভুবনে তাঁর অসামান্য অবস্থানের কথা বলেছেন।

এই মূল্যায়নের কারণ তাঁর নাটকের সংখ্যা নয়। কারণ, তিনি নাট্যকার হওয়ার পাশাপাশি নাটকের জন্য একটি নিজস্ব জ্ঞানতাত্ত্বিক ভূগোল তৈরি করেছিলেন।

Selim Al Din's theatrical language

যে উত্তরাধিকার এখনও মঞ্চে হাঁটে

সেলিম আল দীনকে “লোকজ নাট্যকার” বললে তাঁকে আংশিক বর্ণনা করা হয়। লোকজ উপাদান তাঁর উপকরণ, কিন্তু গন্তব্য ছিল আরও বড়—উপনিবেশোত্তর বাঙালির নিজের নন্দনসত্তার সন্ধান।

তিনি শেখালেন, আধুনিক হওয়ার অর্থ নিজের অতীত ভুলে যাওয়া নয়। পাঁচালি আধুনিক হতে পারে, গায়েন আধুনিক হতে পারে, বর্ণনা নাটকের প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে; গ্রামের এক দরিদ্র মানুষের জীবনও গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কের মতো মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি ধারণ করতে পারে। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের নাট্যকার ও নির্দেশকদের জন্য এই উপলব্ধিই সবচেয়ে বড় মুক্তি। ২০১৮ সালের একটি বিস্তৃত নাট্যবিশ্লেষণেও দেখা যায়, তাঁর কথানাট্য, আখ্যান ও নব্য-পাঁচালির পথে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় একটি স্বতন্ত্র দেশজ ধারা স্থায়ী হয়ে উঠেছে।

তাঁর প্রভাব যে কেবল স্মারকসভায় আটকে নেই, তার সাম্প্রতিক প্রমাণও আছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব নিয়ে আবার আলোচনার আয়োজন হয়েছে এবং তাঁর দেয়াল মঞ্চস্থ হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর শিল্পতত্ত্ব এখনও পাঠযোগ্য, তাঁর নাটক এখনও অভিনয়যোগ্য, তাঁর প্রশ্ন এখন অমীমাংসিত নয়—বরং জীবন্ত।

জন্মদিনে ফিরে দেখা: যে মানুষটি আমাদের নিজেদের দিকে ফিরিয়েছিলেন

১৮ আগস্ট ফি-বছর ফিরে আসে ক্যালেন্ডারে। আমরা সেলিম আল দীনের জন্মদিন পালন করি। ফুল যায় সমাধিতে, নাট্যদল তাঁর রচনা মঞ্চে তোলে, গবেষকেরা তাঁর তত্ত্ব নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তাঁকে স্মরণের সবচেয়ে অর্থবহ উপায় সম্ভবত অন্যত্র—নিজেদের সংস্কৃতির দিকে নতুন চোখে তাকানোয়।

কারণ সেলিম আল দীন আমাদের শেকড়ের কাছে ফিরতে বলেছিলেন শেকড়ে বন্দী হওয়ার জন্য নয়। তিনি ফিরেছিলেন, যাতে সেখান থেকে সামনে যাওয়া যায়।

তাঁর নাটকের গায়েন তাই পেছনের যুগের মানুষ নন; তিনি ভবিষ্যতেরও কথক। তাঁর পাঁচালি কোনো মৃত ঐতিহ্য নয়; নতুন নাট্যভাষার সম্ভাবনা। তাঁর কৃষক, মাঝি, জেলে, কাহার কিংবা যাযাবর মানুষও করুণার পাত্র নয়—তারা ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র।

তাঁর নাট্যভুবনে অনেকগুলো দিগন্ত রেখা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। একজন অভিনেতা নিজের পরিচয় ছেড়ে আরেক চরিত্রে প্রবেশ করছেন; আবার চরিত্র থেকে বেরিয়ে গল্প বলছেন। কথা থেকে গান হচ্ছে, গান থেকে শরীর, শরীর থেকে আখ্যান। কোথায় নাটক শেষ, কোথায় কবিতা শুরু—বোঝার প্রয়োজনই যেন নেই।

সেই অনির্দিষ্ট সীমান্তেই সেলিম আল দীনের আসল বাস।

আজ সেলিম আল দীন কে দেখা যায় একটি সুতিকাগারের নির্মাতা হিসেবে—যেখানে বাংলার বহু শতাব্দীর কথা, নৃত্য, গীত, পাঁচালি, মানুষের শ্রম ও লোকস্মৃতি নতুন আধুনিকতার জন্ম দিয়েছে।

সর্বশেষ