ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে প্রতিটি দিনেরই নিজস্ব কিছু গল্প থাকে। তবে ১২ সেপ্টেম্বর এমন একটি দিন, যা বিশ্বজুড়ে সাহসিকতা, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, রাজনৈতিক রূপান্তর এবং অসামান্য সাংস্কৃতিক অর্জনের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। কখনো তা দুর্গম পাহাড়ি দুর্গে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াইয়ের ইতিহাস, কখনো চাঁদে পা রাখার আকাশচুম্বী সংকল্প, আবার কখনো বাংলা সাহিত্যের পল্লীপ্রকৃতির মায়াবী চিত্রপট। ইতিহাসের এই বিশেষ দিনটি কেন বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে বাঙালি মানসে চিরভাস্বর, তা বিশদভাবে ফিরে দেখা যাক।
বাঙালি বলয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশ
উপমহাদেশের ইতিহাস ও বাঙালি সংস্কৃতির জন্য ১২ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। একদিকে রণক্ষেত্রের বীরত্বগাথা, অন্যদিকে মাটির গান ও কথাসাহিত্যের অনন্ত সৃষ্টিশীলতা দিনটিকে গভীরভাবে জড়িয়ে রেখেছে।
ঐতিহাসিক ঘটনা
-
১৮৯৭ – সারাগড়ির অমর বীরত্বগাথা: তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে (বর্তমান পাকিস্তান) সংঘটিত সারাগড়ির যুদ্ধ সামরিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা শেষ রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ৩৬তম শিখ রেজিমেন্টের মাত্র ২১ জন সাহসী শিখ সৈন্য এক দুর্গম পাহাড়ি চৌকি পাহারা দিচ্ছিলেন। তাঁদের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার আফগান ও ওরাকজাই উপজাতি যোদ্ধা। পিছু হটার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই ২১ জন যোদ্ধা শেষ গুলি ও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। তাঁরা শত্রুদের এতটাই ব্যস্ত রেখেছিলেন যে মূল ব্রিটিশ বাহিনী এসে পৌঁছানোর যথেষ্ট সময় পেয়ে যায়। এই অসম যুদ্ধে ২১ জন বীর সেনাই মৃত্যুবরণ করেন। মরণোত্তরভাবে তাঁদের ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ইন্ডিয়ান অর্ডার অব মেরিট (IOM)-এ ভূষিত করা হয়।
স্মরণীয় জন্ম
বিশ্বমঞ্চে ১২ সেপ্টেম্বর পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার দিন হিসেবেও চিহ্নিত।
-
জাতিসংঘ দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা দিবস (UN Day for South-South Cooperation): ১৯৭৮ সালের বুয়েনস আইরেস কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দিনটিকে স্মরণ করে জাতিসংঘ এই দিবসটি পালন করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর (গ্লোবাল সাউথ) মধ্যে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সম্পদ ও টেকসই উন্নয়নের পথ ভাগাভাগি করে নেওয়া, যাতে তারা পশ্চিমা সাহায্যের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের শক্তিতে সমৃদ্ধ হতে পারে।
-
জাতীয় অনুপ্রেরণা দিবস (যুক্তরাষ্ট্র): ২০০৭ সালে শুরু হওয়া এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে ইতিবাচক মানসিকতা ছড়িয়ে দেওয়া। এক টুকরো প্রশংসা বা অনুপ্রেরণামূলক কথা যে মানুষের জীবনে কতটা বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তা স্মরণ করিয়ে দেয় এই দিন।
-
জাতীয় ডিফেনসোরেস দিবস: লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশ মধ্য-সেপ্টেম্বরের এই দিনটিতে ১৯ শতকে ঔপনিবেশিক শাসন ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা দেশপ্রেমিক সৈনিক ও বীরদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলানো ঘটনাপ্রবাহ
যুক্তরাষ্ট্র
-
১৯৫৩ – কেনেডি দম্পতির রাজকীয় বিয়ে: তৎকালীন তরুণ সিনেটর জন এফ কেনেডি এবং জ্যাকলিন লি বুভিয়ে রোড আইল্যান্ডের সেন্ট মেরি চার্চে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিয়ে তৎকালীন মার্কিন সমাজে বিপুল সাড়া ফেলে এবং পরে হোয়াইট হাউসের রোমান্টিক ও প্রভাবশালী ‘ক্যামেলট’ যুগের ভিত গড়ে তোলে।
-
১৯৫৮ – আধুনিক কম্পিউটিংয়ের ভিত্তিপ্রস্তর: টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসের গবেষক জ্যাক কিলবি বিশ্বের প্রথম কার্যকর ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (মাইক্রোচিপ) সফলভাবে তৈরি করেন। অর্ধপরিবাহী পদার্থের একটি ক্ষুদ্র পাতলা স্তরে একাধিক ইলেকট্রনিক উপাদান যুক্ত করার এই যুগান্তকারী আবিষ্কার আজকের আধুনিক কম্পিউটার, স্মার্টফোন ও ডিজিটাল বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
-
১৯৬২ – চাঁদে যাওয়ার অমর ঘোষণা: টেক্সাসের রাইস ইউনিভার্সিটিতে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন: “We choose to go to the moon.” তিনি ঘোষণা করেন, কাজগুলো সহজ বলে নয়, বরং কঠিন বলেই আমরা তা বেছে নিয়েছি। তাঁর এই দূরদর্শী ঘোষণাই মার্কিন জনতাকে উজ্জীবিত করে এবং অ্যাপোলো মিশনের মাধ্যমে মহাকাশযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
-
১৯৯২ – মহাকাশে বর্ণবাদের দেয়াল ভাঙা: ড. মে জেমিসন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে স্পেস শাটল এন্ডেভার (STS-47)-এ করে মহাকাশে পাড়ি জমান। তিনি ওজনহীনতায় মানবদেহের হাড়ের কোষের পরিবর্তন নিয়ে গভীর গবেষণা পরিচালনা করেন।
রাশিয়া ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন
-
১৯৫৯ – চাঁদের বুকে লুনা ২-এর আঘাত: সোভিয়েত ইউনিয়ন সফলভাবে মহাকাশযান লুনা ২ উৎক্ষেপণ করে। দুদিন পর যানটি চাঁদের মাটিতে অবতরণ (ক্র্যাশ ল্যান্ড) করে। মানব ইতিহাসের প্রথম কোনো মানবনির্মিত বস্তু হিসেবে চাঁদের বুক স্পর্শ করে এটি স্নায়ুযুদ্ধের মহাকাশ প্রতিযোগিতায় তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
-
১৯৭০ – লুনা ১৬ মিশন: সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক মিশন হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন লুনা ১৬ পাঠায়। এটি চাঁদের বুকে নেমে মাটি খনন করে নমুনা সংগ্রহ করে এবং নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে—যা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক অবিশ্বাস্য সাফল্য ছিল।
যুক্তরাজ্য
-
১৯২৩ – দক্ষিণ রোডেশিয়া অন্তর্ভুক্তি: ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ রোডেশিয়াকে (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) একটি স্বায়ত্তশাসিত উপনিবেশ হিসেবে ঘোষণা করে। এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ পরবর্তী ৬০ বছর ধরে এই অঞ্চলের বর্ণবাদী রাজনীতি ও উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের গতিপথকে চরমভাবে প্রভাবিত করেছিল।
ইউরোপ
-
১৬৮৩ – ভিয়েনার যুদ্ধ: ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম ভাগ্যনির্ধারক সংঘাত। অটোমান সাম্রাজ্যের দুই মাসব্যাপী ভিয়েনা অবরোধ ভেঙে দেয় ইউরোপীয় জোট বাহিনী। পোলিশ উইংড হুসারদের সেই রক্তক্ষয়ী অশ্বারোহী আক্রমণ মধ্য ইউরোপে অটোমান সাম্রাজ্যের অগ্রযাত্রাকে চিরতরে থামিয়ে দেয় এবং ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন রূপ নেয়।
-
১৯৪০ – ল্যাসকো গুহাচিত্র আবিষ্কার: দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে একটি হারিয়ে যাওয়া কুকুরের সন্ধান করতে গিয়ে চার কিশোর এক পাহাড়ি গুহার সন্ধান পায়। গুহার ভেতর তারা দেখতে পায় প্রায় ১৭,০০০ বছর আগের বিস্ময়কর সব গুহাচিত্র। বন্য প্রাণীদের এই অনবদ্য আদিম শিল্পকর্ম আদিম মানবচেতনা ও প্রাচীন প্যালিওলিথিক শিল্প সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাই আমূল বদলে দেয়।
-
১৯৪৩ – গ্রান সাসো রেইড: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জার্মানির প্যারাট্রুপার ও এসএস কমান্ডোরা এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে ইতালির বন্দি একনায়ক বেনিতো মুসোলিনিকে পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত হোটেল থেকে মুক্ত করে আনে। এটি সামরিক ইতিহাসে অপারেশন এইশে নামে পরিচিত।
চীন
-
২০০৫ – হংকং ডিজনিল্যান্ডের যাত্রা: দ্য ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি চীনে তাদের প্রথম থিম পার্ক খোলে। এটি ছিল পশ্চিমা বিনোদন মাধ্যমের সাথে সমৃদ্ধ এশীয় সংস্কৃতির এক যুগান্তকারী বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত
-
১৯৭৪ – সম্রাট হেইলে সেলাসির পতন (ইথিওপিয়া): প্রায় অর্ধশতক ধরে আফ্রিকার স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেশ শাসন করা সম্রাট হেইলে সেলাসিকে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে মার্কসবাদী জুন্টা ডার্গ। এর মাধ্যমে ইথিওপিয়ার প্রায় তিন হাজার বছরের প্রাচীন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।
-
১৯৭৭ – স্টিভ বিকোর হত্যাকাণ্ড (দক্ষিণ আফ্রিকা): দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ এবং ‘ব্ল্যাক কনশাসনেস মুভমেন্ট’-এর প্রবক্তা স্টিভ বিকো পুলিশের অমানুষিক নির্যাতনে প্রাণ হারান। তাঁর এই নির্মম মৃত্যু সারা বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর কঠোর সামরিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে এবং বিকো স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর শহীদে পরিণত হন।
বিশ্বখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
স্মরণীয় জন্ম
-
টাইপরাইটার ও QWERTY কীবোর্ড: ১৮৭৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলস প্রথম বাণিজ্যিকভাবে সফল টাইপরাইটার তৈরি সম্পন্ন করেন। দ্রুত টাইপ করার সময় মেকানিক্যাল হাতলগুলো যেন একে অপরের সাথে জড়িয়ে জ্যাম না হয়ে যায়, সেজন্যই তিনি তৈরি করেছিলেন ‘QWERTY’ লেআউট। আজও আধুনিক সব স্মার্টফোন ও কম্পিউটারের পর্দায় আমরা এই বিন্যাসই ব্যবহার করে আসছি।
-
হারলেম গ্লোবট্রটার্সের টানা জয়ের অবসান: টানা ২৪ বছর এবং ৮,৮২৯টি খেলায় অপরাজিত থাকার পর ১৯৯৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কিংবদন্তি প্রদর্শনী বাস্কেটবল দল ‘হারলেম গ্লোবট্রটার্স’ ভিয়েনায় করিমের অল-স্টার দলের কাছে ৯১-৮৫ ব্যবধানে পরাজিত হয়।
-
ট্রাফিক সিগন্যালে পরমাণু যুগের সূচনা: ১৯৩৩ সালের এই দিনে হাঙ্গেরিয়ান পদার্থবিদ লিও জিলার্ড লন্ডনের সাউদাম্পটন রো-এর একটি ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিলেন। লাল বাতি পার হয়ে যখন সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে, রাস্তা পার হওয়ার ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর মাথায় খেলে যায় ‘নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন’ বা পরমাণু শৃঙ্খল বিক্রিয়ার তাত্ত্বিক ধারণা—যা পরবর্তীতে পারমাণবিক শক্তি ও আণবিক বোমা আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়।
শেষ কথা
১২ সেপ্টেম্বর ইতিহাসের পাতায় নানা গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় ঘটনার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই দিনে সংঘটিত রাজনৈতিক, সামাজিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সময়ের সঙ্গে মানবসভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করা বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, আর এই দিনে মৃত্যুবরণ করা গুণী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা তাঁদের কর্ম ও চিন্তার মাধ্যমে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
তাই প্রতিটি তারিখের মতো ১২ সেপ্টেম্বরও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের জীবন ও অবদান আমাদের অতীতকে জানতে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে এবং বর্তমানকে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে অনুপ্রাণিত করে।


