জীবনের রেলগাড়ি থেমে যাওয়ার এগারো বছর – আমার বড়মামা রিপন কুণ্ডু নীলুকে স্মরণ

সর্বাধিক আলোচিত

জীবনের রেলগাড়ি কখন কোথায় থেমে যায়, আমরা কেউ জানি না। কোনো কোনো স্টেশনে মানুষ নেমে যায় চিরদিনের জন্য, অথচ যারা থেকে যাই, তাদের যাত্রা চলতেই থাকে। শুধু পাশের আসনটা খালি হয়ে যায়। কথা থাকে, স্মৃতি থাকে, অভিমান থাকে, না-বলা কত কিছু জমে থাকে—শুধু মানুষটিই আর থাকেন না।

দেখতে দেখতে আমার প্রিয় বড়মামা রিপন কুণ্ডু নীলু চলে যাওয়ার এগারো বছর হয়ে গেল। সময়ের হিসাবে এগারো বছর অনেক দীর্ঘ। কিন্তু স্মৃতির হিসাবে? কখনো কখনো মনে হয়, এই তো সেদিন তাঁর সঙ্গে কথা হলো, এই তো সেদিন তাঁর হাসিমুখ দেখলাম।

সময় বড় অদ্ভুত! সে মানুষকে দূরে নিয়ে যায়, অথচ স্মৃতিকে কখনো কখনো আরও কাছে এনে বসায়।

ছোটবেলার সেই মানুষটি

আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে বড়মামা মানেই একরাশ আনন্দ।

মামার বাড়িতে গেলেই যেন আমার জন্য আলাদা একটা পৃথিবী তৈরি হয়ে যেত। ভালো-মন্দ খাওয়ানো থেকে শুরু করে আমার ছোট ছোট আবদার—যা চেয়েছি, সাধ্যের মধ্যে তিনি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কখনো কিছু কিনে দিয়েছেন, কখনো ঘুরতে নিয়ে গেছেন। ছোটবেলায় আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতিও আজও চোখের সামনে ভাসে।

আমি ছোট, আর মামা আমাকে কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন—জীবনের তখন কত সহজ ছবি!

সে বয়সে এসব ভালোবাসার মূল্য বোঝার ক্ষমতা থাকে না। আমরা শুধু ভালোবাসা নিই। মনে করি, এই মানুষগুলো বুঝি সারাজীবন এভাবেই থাকবেন। বয়স বাড়ার পর বুঝি, সেই কাঁধে তুলে নেওয়ার মুহূর্তগুলো আসলে কত বড় সম্পদ ছিল।

মামা ছিলেন খুবই হাস্যোজ্জ্বল মানুষ। রসিকতা করতেন, মজা করতেন, মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারতেন। তাঁর কাছে গেলে দূরত্ব বলে কিছু মনে হতো না। কাছে টেনে নিতেন, বুকে জড়িয়ে আদর করতেন।

খুবই ফিটফাট ও টিপটপ মানুষ ছিলেন নীলু মামা। শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক উচ্চস্তরে না গেলেও মানবিকতায়, আতিথিয়েতায় ছিলেন পরিপূর্ণ।

আজ এত বছর পর তাঁর কথা মনে হলে প্রথমেই তাঁর সেই হাসিটাই মনে পড়ে।

মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়; কিন্তু কোনো কোনো হাসি থেকে যায় বহু বছর।

২০১৩: জীবনের ছন্দ বদলাতে শুরু করল

২০১৩ সালে মামার প্রথম স্ট্রোক হয়।

চিকিৎসার জন্য তিনি বগুড়ায় এসেছিলেন। একটি ক্লিনিকে ভর্তি ছিলেন। অসুস্থতার সেই সময়টায় তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর পাশে সর্বোচ্চটা দিয়ে থেকেছি আমরা দুই ভাই। জীবনের যে মানুষটিকে সবসময় প্রাণবন্ত ও হাসিমুখে দেখেছি, তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় দেখা—এটাও এক ধরনের কঠিন অভিজ্ঞতা।

পরে তিনি তাঁর জন্মভূমি বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় চৈত্র সংক্রান্তির একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন মহাশ্মশান কালীবাড়িতে। সেখানেও তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক ছিলাম। সেবার ভালোই সময় কেটেছিল মামার সাথে আমাদের বাড়িতে। তাঁর বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সুহৃদগণ তাঁর আসার খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে এসেছিলেন দেখতে। কেউ আমাদের বাড়িতে, কেউ দুপচাঁচিয়া বোরাই মহাশ্মশান কালীবাড়ির অনুষ্ঠানে। নীলু মামা ছিলেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার সপ্তর্ষি সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, স্বনামধন্য প্রয়াত শিক্ষক দেবেন্দ্রনাথ কুন্ডুর জ্যেষ্ঠ পুত্র।

আজ ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারি, জন্মভূমিতে সেটিই ছিল তাঁর শেষ আসা, আমাদের অনেক পরিচিত মানুষের সঙ্গে শেষ দিককার দেখা।

তখন কি আমরা কেউ বুঝেছিলাম?

সম্ভবত না।

জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়গুলোর একটি হলো—কোনো একটি দেখা যে ‘শেষ দেখা’, সেটি আমরা সাধারণত সেই মুহূর্তে জানতে পারি না।

জানলে হয়তো আরও কিছুক্ষণ বসে থাকতাম।

আরও কিছু কথা বলতাম।

আরেকবার জড়িয়ে ধরতাম।

বিদায়ের সময় হয়তো একটু বেশি সময় তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

আমার শেষ দেখা

ব্যবসা ও জীবিকার কারণে মামা পরবর্তী সময়ে সিরাজগঞ্জ শহরেই স্থায়ী হয়েছিলেন।

তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে কাজী ইউনূস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।

সেই দিনের কথা এখনো মনে পড়ে।

অথচ তখন একবারও ভাবিনি—এটাই আমাদের শেষ দেখা।

মানুষের জীবনে কিছু তারিখ ক্যালেন্ডারের সাধারণ তারিখ হয়ে থাকে না। তারা মনের মধ্যে স্থায়ী হয়ে যায়। ৩০ নভেম্বর ২০১৪ আমার কাছে তেমনই একটি দিন।

তারপর দিন গেছে, মাস গেছে। নিজের জীবন, কাজ, ব্যস্ততা—সবকিছুর মধ্যে হয়তো ভেবেছি, আবার দেখা হবে।

একদিন যাব।

কথা হবে।

মামা আগের মতো মজা করবেন।

কিন্তু সেই ‘একদিন’ আর আসেনি।

এটাই আমার জীবনের একটি বড় আফসোস।

শেষ দেখার পর আরেকবার গিয়ে তাঁকে দেখে আসা হয়নি।

যে দিন তিনি চলে গেলেন

যে দিন তিনি চলে গেলেন

যেদিন মামা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, সেদিন আমার নিজের জীবনেও ঘটেছিল আরেকটি ঘটনা।

সেদিনই আমার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। শরীর ভালো ছিল না, খুবই বেশি ছিল সুগারের মাত্রা আর সাথে সিভিয়ার ইউরিন ইনফেকশন। বাবার সঙ্গে বগুড়া পপুলারে ছিলাম, আমাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তখন পরিবারও চিন্তিত ছিল।

এই পরিস্থিতির কারণে মামাকে শেষবার দেখতে যেতে পারিনি!

আমার বড় ভাই গিয়েছিলেন মামার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধুকে সাথে করে নিয়ে।

আমি, বাবা-মা তখন যেতে পারিনি।

জীবনের কিছু না-পারা মানুষ সারাজীবন বহন করে।

যুক্তি দিয়ে হয়তো নিজেকে বোঝানো যায়—পরিস্থিতি ছিল, নিজের অসুস্থতা ছিল। কিন্তু হৃদয় সবসময় যুক্তির ভাষা বোঝে না।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আর একবার যদি দেখতে পারতাম!

আর একবার যদি তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারতাম!

কিন্তু জীবনের রেলগাড়ি তো পেছনের স্টেশনে ফিরে যায় না।

কিছু সম্পর্ক মৃত্যুতেও শেষ হয় না

বয়স যত বাড়ছে, ততই বুঝতে পারছি—আমাদের জীবনের প্রকৃত সম্পদ আসলে মানুষ।

শৈশবে বাবা-মায়ের স্নেহের বাইরে বড়মামা ছিলেন আমার জন্য তেমনই এক আশ্রয়ের মানুষ। তাঁর ভালোবাসার মধ্যে কোনো হিসাব ছিল না। আমার আবদার, আমার আনন্দ, আমার ছোটবেলার দুষ্টুমি—সবকিছুরই জায়গা ছিল তাঁর কাছে।

আজ মা নেই, সাড়ে পাঁচ বছর হয়ে গেল!

বাবাও নেই, চার বছর আটমাস হয়ে গেল!

দাদুও নেই, প্রায় ২০ বছর হতে চলল!

কাকাও নেই, ১৮ বছর পেরিয়ে গেল!

বড়মামাও নেই, বড়মাসিও নেই, কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেলেন সবাই!!

জীবনের একেকটি সময় যেন একেকটি ঘর। একসময় যে ঘরগুলো মানুষের কণ্ঠস্বর, হাসি, রাগ-অভিমান আর ভালোবাসায় ভরা ছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নিঃশব্দ হয়ে যায়।

কিন্তু সত্যিই কি নিঃশব্দ হয়?

কখনো একটি পুরোনো ছবি সামনে এলে মনে হয়, তিনি যেন তাকিয়ে আছেন।

কখনো ছোটবেলার কোনো ঘটনা মনে পড়লে তাঁর হাসির শব্দ যেন শুনতে পাই।

কখনো মনে হয়, এখন যদি মামা থাকতেন, এই কথাটা তাঁকে বলতাম।

এই জিনিসটা দেখাতাম।

এই সাফল্যের খবরটা দিতাম।

মানুষটি নেই—কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলার অভ্যাসটা যেন মনের কোনো এক কোণে এখনো রয়ে গেছে।

ছবির ফ্রেমের বাইরেও তিনি আছেন

এখন বড়মামাকে দেখি পুরোনো ছবিতে।

কোনো ছবিতে বয়স একটু কম। কোনো ছবিতে জীবনের পরিণত সময়। কোথাও পরিচিত হাসি, কোথাও শান্ত মুখ।

ছবিগুলো দেখলে মাঝেমধ্যে মনে হয়, মানুষ কি সত্যিই কেবল একটি ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে যায়?

না।

আমার কাছে বড়মামা কোনো সাদা-কালো ছবির মানুষ নন।

তিনি আমার শৈশবের একটি অংশ।

কাঁধে চড়ে বেড়ানোর আনন্দ।

মামার বাড়িতে গিয়ে আবদার করার স্বাধীনতা।

ভালো খাবারের আয়োজন।

হাসি-ঠাট্টা।

বুকে টেনে নেওয়া সেই আদর।

এগুলোই তো একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

জীবনের রেলগাড়ি চলতেই থাকে

এগারো বছর হয়ে গেল।

জীবনের রেলগাড়ি মামাকে একটি অজানা স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

আমরাও এগিয়ে গেছি।

আমাদের বয়স বেড়েছে। জীবনে নতুন মানুষ এসেছে, অনেক পরিচিত মুখ হারিয়ে গেছে। পৃথিবী বদলেছে। আমাদের চারপাশ বদলেছে।

শুধু কিছু স্মৃতি আশ্চর্যভাবে বদলায়নি।

সেই ছোটবেলার আমি এবং আমাকে কাঁধে তুলে নেওয়া মামা—মনের মধ্যে তাঁরা আজও একই বয়সে দাঁড়িয়ে আছেন।

হয়তো এটাই স্মৃতির সবচেয়ে আশ্চর্য ক্ষমতা।

সময় মানুষকে বৃদ্ধ করে, দূরে সরিয়ে দেয়, একদিন পৃথিবী থেকেও নিয়ে যায়; কিন্তু স্মৃতি সময়কে থামিয়ে রাখতে পারে।

আজ বড়মামার একাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই মৃত্যুর কথা যতটা মনে পড়ছে, তার চেয়ে বেশি মনে পড়ছে তাঁর জীবনের কথা।

তাঁর হাসি।

তাঁর রসিকতা।

তাঁর স্নেহ।

তাঁর ভালোবাসা।

আমাকে কাঁধে তুলে নেওয়া সেই মানুষটির কথা।

প্রিয় নীলু মামা,

জীবনের রেলগাড়ি আপনাকে আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে গেছে। কিন্তু স্মৃতির পথ ধরে আপনি আজও বারবার ফিরে আসেন আমাদের মাঝে। 

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের জায়গাটা আর কেউ নিতে পারে না।

আপনি তেমনই একজন।

গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়—
এগারো বছর পরও আপনি আমাদের স্মৃতিতে চিরস্মরণীয়, অমলিন ও অম্লান।

সর্বশেষ