ক্যারিয়ার পরিবর্তনের আগে স্কিল গ্যাপ অ্যানালিসিস (Skill Gap Analysis) করবেন কীভাবে?

সর্বাধিক আলোচিত

ক্যারিয়ার বদলাতে চাইছেন। নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন দেখছেন, বিভিন্ন কোর্সের খোঁজ নিচ্ছেন। কোথাও SQL শেখার পরামর্শ, কোথাও ডেটা অ্যানালাইসিস, আবার কোথাও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের নতুন কোনো টুলের কথা বলা হচ্ছে। এত কিছু দেখে কোনটি আগে শিখবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়া অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু নতুন পেশায় যাওয়ার জন্য সবকিছু নতুন করে শেখার দরকার নাও হতে পারে। আগের চাকরিতে অর্জন করা কিছু দক্ষতা হয়তো সেখানে কাজে লাগবে। আবার যে সফটওয়্যারটি শেখার জন্য কোর্স খুঁজছেন, সেটি আপনার কাঙ্ক্ষিত পদের জন্য জরুরি না-ও হতে পারে।

এসব বুঝতেই Career skill gap analysis করা দরকার। এর মাধ্যমে নতুন পেশার চাহিদার সঙ্গে নিজের বর্তমান দক্ষতা মিলিয়ে দেখা যায়। কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোনটি আগে পূরণ করা প্রয়োজন এবং কোন বিষয়ে আপাতত সময় না দিলেও চলবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

কাজটি শুরু করতে কোনো বিশেষ সফটওয়্যার বা দামি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। প্রাসঙ্গিক চাকরির বিজ্ঞাপন, নিজের কাজের অভিজ্ঞতা এবং একটি সাধারণ স্প্রেডশিটই যথেষ্ট।

চাকরি বদলাতে চান, কিন্তু কোন পদে?

একটি পেশা পছন্দ হওয়া আর সেই পেশার নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া আলাদা বিষয়। ‘আইটি খাতে যেতে চাই’ কিংবা ‘মার্কেটিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ব’—এমন লক্ষ্য নিয়ে কোর্স খুঁজতে গেলে তালিকা দীর্ঘ হতে থাকবে। কারণ একই খাতের বিভিন্ন পদে আলাদা দক্ষতা প্রয়োজন।

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কথাই ধরা যাক। SEO Executive-এর কাজে সার্চ পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ, ওয়েবসাইটের কনটেন্ট অপটিমাইজেশন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য বোঝার দক্ষতা দরকার হতে পারে। Performance Marketing Executive-এর দায়িত্বে বিজ্ঞাপন পরিচালনা, প্রচারণার ফলাফল বিশ্লেষণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বেশি থাকতে পারে। Social Media Manager-এর কাজ আবার কনটেন্ট পরিকল্পনা, প্রকাশনা পরিচালনা ও দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে।

একই খাতের তিনটি পদ, অথচ প্রস্তুতির ধরন ভিন্ন। তাই পেশার নামের চেয়ে নির্দিষ্ট চাকরির পদ বেছে নেওয়া বেশি কাজে দেবে। শুরুর পর্যায়ের চাকরি খুঁজছেন, নাকি আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মধ্যম পর্যায়ের পদে যেতে চান, সেটিও ঠিক করুন।

আর কোথায় চাকরি করতে চান? বাংলাদেশে, ভারতে, নাকি আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানে? একই পদের দায়িত্ব ও নিয়োগের শর্ত প্রতিষ্ঠান এবং দেশভেদে বদলাতে পারে। এই বিষয়গুলো পরিষ্কার না হলে দক্ষতার ঘাটতির হিসাবও ঠিকভাবে করা কঠিন।

কোর্সের বিজ্ঞাপন নয়, চাকরির বিবরণ পড়ুন

কোর্সের বিজ্ঞাপন নয়, চাকরির বিবরণ পড়ুন

কোনো কোর্সে একটি প্রযুক্তিকে খুব জনপ্রিয় বলা হচ্ছে। কিন্তু আপনার কাঙ্ক্ষিত চাকরিতে সেই প্রযুক্তির প্রয়োজন কতটুকু? উত্তর খুঁজতে নিয়োগদাতাদের চাহিদা দেখতে হবে। শুরুতে যে পদে যেতে চান, তার ১০–১৫টি সাম্প্রতিক চাকরির বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন নিন। একই নিয়োগ বিজ্ঞাপন একাধিক সাইটে থাকলে সেটি একবারই হিসাব করুন।

এবার শুধু সফটওয়্যারের নাম না দেখে কাজের বিবরণ পড়ুন। প্রতিষ্ঠানটি আসলে কী করাতে চায়? নিয়মিত প্রতিবেদন তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকের সমস্যা সমাধান, নাকি একটি প্রকল্প পরিচালনা? বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে এসব কাজের সম্পর্ক খুঁজুন। তারপর আলাদা করে লিখে রাখুন কোন দক্ষতা আবশ্যিক এবং কোনটি থাকলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে।

অনেক নিয়োগ বিজ্ঞাপনে ‘Required’ ও ‘Preferred’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত প্রথমটি আবশ্যিক যোগ্যতা বোঝায়। দ্বিতীয়টি বাড়তি যোগ্যতা হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কী বোঝাতে চেয়েছে, তা পুরো বিজ্ঞাপন পড়ে বুঝতে হবে।

একই দক্ষতার নাম বারবার দেখলে কী বুঝবেন?

ধরা যাক, ডেটা অ্যানালিস্ট পদের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে বারবার SQL-এর উল্লেখ পাচ্ছেন। অন্যদিকে কোনো একটি বিশেষ সফটওয়্যারের নাম এসেছে মাত্র দু-একটিতে। এতে আপনার সংগ্রহ করা চাকরিগুলোর প্রস্তুতিতে SQL-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার যুক্তি পাওয়া যায়।

তবে কয়েকটি অনলাইন বিজ্ঞাপন পুরো শ্রমবাজারের চিত্র নয়। অনেক চাকরি অনলাইনে প্রকাশিত হয় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের ধরনও আলাদা। এ কারণে বিজ্ঞাপনের প্রকাশের তারিখ, প্রতিষ্ঠানের নাম ও চাকরির অবস্থান লিখে রাখুন। চাকরির চাহিদা বুঝতে এই তথ্যগুলো কাজে দেবে।

কোনো পদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও জানতে O*NET OnLine-এর মতো পেশাভিত্তিক তথ্যভান্ডারও দেখতে পারেন। সেখানে বিভিন্ন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, প্রযুক্তি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ রয়েছে। তবে O*NET-এর শ্রমবাজারসংক্রান্ত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। বাংলাদেশের বা ভারতের চাকরির শর্ত বোঝার জন্য স্থানীয় বিজ্ঞাপনই বেশি প্রাসঙ্গিক।

নিজের দক্ষতা যাচাই করতে গিয়ে যে ভুলটি হয়

অনেকে জীবনবৃত্তান্তে দক্ষতার একটি দীর্ঘ তালিকা রাখেন। কিন্তু সেই তালিকার প্রতিটি কাজ কতটা ভালো পারেন, তা আলাদাভাবে ভেবে দেখেন না। Excel জানেন বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছেন? ডেটা লিখতে পারেন, সাধারণ হিসাব করতে পারেন, নাকি বড় একটি ডেটাসেট নিয়ে স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণও করতে পারেন?

কোনো কোর্স শেষ করার সঙ্গে একটি কাজ ভালোভাবে করতে পারার পার্থক্য এখানেই। নিজের বর্তমান ও আগের চাকরির কাজগুলো লিখে দেখুন। কী কী দায়িত্ব পালন করেছেন? কোন সমস্যার সমাধান করেছেন? কোন কাজটি সাহায্য ছাড়া করতে পারেন?

শিক্ষার্থী হলে অ্যাসাইনমেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ বা স্বেচ্ছাসেবী কাজও বিবেচনা করতে পারেন। নিজের দক্ষতার তালিকায় ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপনা’ লিখলে পাশে উল্লেখ করুন, কোন প্রকল্পে কী দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘তথ্য বিশ্লেষণ’ লিখলে কোন তথ্য নিয়ে কী প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, সেটিও রাখুন।

কাজের প্রমাণ থাকলে নিজের অবস্থান বোঝা সহজ হয়। প্রথমে খুব জটিল মূল্যায়নের দরকার নেই। প্রতিটি দক্ষতাকে তিনভাবে দেখতে পারেন। কাজটি স্বাধীনভাবে পারেন, কিছুটা পারেন কিন্তু সাহায্য লাগে, নাকি একেবারেই জানেন না।

প্রয়োজনে আরও বিস্তারিত মূল্যায়নের জন্য নিজের দক্ষতার স্তর নির্ধারণ করতে পারেন। তবে নম্বর দেওয়ার চেয়ে বাস্তবে কাজটি করতে পারছেন কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভব হলে আপনার কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ কারও মতামত নিন। নিজের মূল্যায়নের সঙ্গে অন্যের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখলে ঘাটতি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

আগের চাকরির অভিজ্ঞতা পুরোপুরি বাদ দেবেন কেন?

নতুন পেশায় যাওয়ার কথা ভাবলে অনেকেই ধরে নেন, আবার একেবারে শুরু থেকে শিখতে হবে। অথচ আগের চাকরিতে অর্জন করা কিছু দক্ষতা নতুন পেশায় সরাসরি কাজে লাগতে পারে। এগুলোকে বলা হয় Transferable Skills বা স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা।

একজন শিক্ষক করপোরেট প্রশিক্ষণের কাজে যেতে চাইলে তাঁর বিষয় ব্যাখ্যা করা, শেখার উপকরণ তৈরি এবং অংশগ্রহণকারীদের অগ্রগতি মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। একজন কাস্টমার সাপোর্ট কর্মীরও এমন দক্ষতা থাকতে পারে, যা অন্য কাজে প্রাসঙ্গিক। যেমন গ্রাহকের অভিযোগ বিশ্লেষণ, সমস্যা চিহ্নিত করা কিংবা সমাধানের অগ্রগতি জানানো।

এখানে পদবির চেয়ে আগের চাকরিতে কী কাজ করেছেন, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনবৃত্তান্তে শুধু ‘কাস্টমার সাপোর্টে কাজ করেছি’ লেখার পরিবর্তে বাস্তবে করে থাকলে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কাজের ফলাফল তুলে ধরতে পারেন।

তবে আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলেই নতুন পদের সব শর্ত পূরণ হয়ে যাবে না। নতুন প্রযুক্তি, কাজের পদ্ধতি কিংবা বিশেষায়িত জ্ঞান শেখার দরকার হতে পারে। প্রশ্ন হলো, কোনটুকু আগে থেকেই জানেন আর কোনটুকু নতুন করে শিখতে হবে? এই হিসাবটি না করলে হয়তো এমন বিষয় শেখার পেছনেও সময় দেবেন, যেটি আপনি আগের চাকরিতে নিয়মিত ব্যবহার করেছেন।

এবার আসল হিসাব: কী পারেন, আর কী শিখতে হবে

এবার আসল হিসাব: কী পারেন, আর কী শিখতে হবে

এতক্ষণে নতুন চাকরির চাহিদা ও নিজের দক্ষতা সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হওয়ার কথা। এবার দুটি তালিকা মিলিয়ে দেখুন। একটি কাগজ বা স্প্রেডশিটে তিনটি বিষয় পাশাপাশি রাখুন—নতুন চাকরিতে কী দক্ষতা চাওয়া হচ্ছে, আপনি সেই কাজ কতটা পারেন এবং তার কী প্রমাণ রয়েছে।

বিষয়টি পরিষ্কার করতে কনটেন্ট মার্কেটিং থেকে ডেটা অ্যানালাইসিসে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা যায়। কনটেন্ট মার্কেটিংয়ের কাজে হয়তো নিয়মিত ওয়েবসাইটের পারফরম্যান্স প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তথ্য সংগ্রহ, ফলাফল ব্যাখ্যা ও প্রতিবেদন লেখার অভিজ্ঞতা আপনার রয়েছে।

তাহলে নতুন করে প্রতিবেদন লেখার প্রাথমিক কোর্স করাই প্রথম কাজ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যে ডেটা অ্যানালিস্ট পদে আবেদন করতে চান, সেখানে SQL ব্যবহার করে তথ্য বের করা আবশ্যিক। আর SQL-এ আপনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

সেক্ষেত্রে দক্ষতার বড় ঘাটতিটি এখানে। Excel মোটামুটি পারেন, কিন্তু তুলনামূলক জটিল বিশ্লেষণে অসুবিধা হয়? সেটিও লিখুন। ড্যাশবোর্ড তৈরি করতে সাহায্য লাগে? সেটি আলাদা রাখুন। এভাবে প্রতিটি দক্ষতার পাশে নিজের অবস্থান লিখলে অগ্রাধিকার ঠিক করা সহজ হবে।

সবচেয়ে বড় ঘাটতি আর সবচেয়ে জরুরি ঘাটতি সব সময় এক নয়।

কোনো সফটওয়্যার একেবারেই না জানলেও সেটি যদি আপনার কাঙ্ক্ষিত পদের জন্য জরুরি না হয়, তাহলে আপাতত সেটি শেখার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, সামান্য ঘাটতি থাকা কোনো দক্ষতা যদি চাকরির আবশ্যিক শর্ত হয়, তাহলে সেটি আগে পূরণ করাই যুক্তিসংগত।

সবকিছু শেখার পরিকল্পনা বাদ দিন

স্কিল গ্যাপের তালিকা তৈরি করার পর পরবর্তী সমস্যা হলো, সেই তালিকা দেখে একসঙ্গে অনেক কিছু শিখতে চাওয়া। একটি কোর্সে SQL, অন্যটিতে Power BI, আরেকটিতে Python। এরপর নতুন একটি টুলের নাম চোখে পড়লেই সেটিও শেখার তালিকায় চলে আসে।

এভাবে শেখার বিষয় বাড়তে থাকলে কোনটি কেন শিখছেন, সেই লক্ষ্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। এর চেয়ে আগে সেই দক্ষতাগুলোতে মনোযোগ দিন, যেগুলো ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পদের মূল কাজ করা কঠিন।

যেসব দক্ষতা কাজের মান বাড়াতে সাহায্য করবে, সেগুলো পরবর্তী পর্যায়ে রাখতে পারেন। আর ভবিষ্যতের উচ্চতর পদ বা বিশেষায়িত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় আপাতত বাদ দেওয়া যায়।

অবশ্য কিছু পেশায় বিষয়টি আরও জটিল। নির্দিষ্ট ডিগ্রি, পেশাগত নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাধ্যতামূলক থাকলে শুধু নতুন দক্ষতা শেখার পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের শর্ত যাচাই করতে হবে। এক দেশের সনদ অন্য দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

টাকা খরচ করে শেখার আগে একটু খোঁজ নিন

কোন দক্ষতা শিখতে হবে, তা পরিষ্কার হলে কোর্স নির্বাচনও সহজ হয়। তবে সব ঘাটতির সমাধান পূর্ণাঙ্গ কোর্স নয়। Excel-এর একটি নির্দিষ্ট ফাংশন শিখতে চাইলে নির্দেশিকা দেখে অনুশীলন করাই যথেষ্ট হতে পারে। সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রযুক্তিগত বিষয়ে অবশ্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, অনুশীলন এবং কাজের মূল্যায়ন দরকার হতে পারে।

কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগে পাঠ্যসূচি ভালোভাবে পড়ুন। যে দক্ষতার ঘাটতি পূরণ করতে চান, কোর্সে সেটি কতটা শেখানো হবে? বাস্তব কাজ করার সুযোগ রয়েছে? প্রশিক্ষণ শেষে নিজের সক্ষমতা যাচাই করার ব্যবস্থা আছে?

সনদের গুরুত্ব থাকলে সেটির স্বীকৃতি যাচাই করুন। পাশাপাশি কোর্স ফি ছাড়াও সফটওয়্যার, পরীক্ষা বা অন্যান্য খরচ আছে কি না, দেখুন। বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (NSDA) ন্যাশনাল স্কিলস পোর্টাল কাজে আসতে পারে। সেখানে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন, কোর্স অনুমোদন ও মূল্যায়নকেন্দ্রের স্বীকৃতিসংক্রান্ত তথ্য রয়েছে।

প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হওয়া আর তার নির্দিষ্ট কোর্স অনুমোদিত হওয়া আলাদা বিষয়। তাই সনদের স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হলে দুটিই যাচাই করুন। ভারতে National Career Service (NCS) পোর্টালে চাকরি অনুসন্ধান, ক্যারিয়ার নির্দেশনা, কাউন্সেলিং ও দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। সরকারি NCS নিবন্ধন, চাকরির আবেদন ও সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় কোনো ফি নেওয়া হয় না। তবে পোর্টালে উল্লেখিত পৃথক প্রশিক্ষণের খরচ থাকতে পারে।

আগের পেশার সঙ্গে নতুন পেশার দক্ষতার মিল বুঝতে CareerOneStop-এর mySkills myFuture-ও দেখতে পারেন। যদিও এর চাকরি, বেতন ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক, দক্ষতার তুলনা করার পদ্ধতিটি কাজে লাগতে পারে।

আরও পড়ুন: কোন Career আপনার জন্য মানানসই: আগ্রহ, দক্ষতা ও জীবনযাপন মিলিয়ে দেখুন

নতুন দক্ষতা শিখতে কত দিন লাগবে?

এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন। একই বিষয় শিখতে দুজনের সমান সময় লাগবে না। আগে থেকে কতটা জানেন, নিয়মিত অনুশীলন করতে পারছেন কি না এবং কাজটির জটিলতা কেমন—এসবের ওপর সময় নির্ভর করবে।

তাই ‘তিন মাসে ডেটা অ্যানালিস্ট হব’ ধরনের লক্ষ্য ঠিক করার চেয়ে ছোট ছোট কাজের জন্য সময় নির্ধারণ করা ভালো। শুরুর কয়েক সপ্তাহে নতুন চাকরির চাহিদা বোঝা ও নিজের দক্ষতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করতে পারেন। এরপর সবচেয়ে জরুরি ঘাটতিটি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করুন।

ধীরে ধীরে ছোট কাজের মাধ্যমে অনুশীলন বাড়ান। একটি বিষয় সম্পর্কে ধারণা হওয়ার পর সেটি ব্যবহার করে নিজে কিছু তৈরি করার চেষ্টা করুন। একটি ১২ সপ্তাহের পরিকল্পনা প্রথম পর্যায়ের প্রস্তুতি গোছাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু ১২ সপ্তাহ পূর্ণ হলেই কোনো নির্দিষ্ট পেশায় দক্ষ হয়ে যাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

চাকরির পাশাপাশি শিখলে সময়ের হিসাব আরও জরুরি। সপ্তাহে পাঁচ ঘণ্টা সময় পাওয়া গেলে তার কিছুটা নতুন বিষয় বোঝার জন্য, কিছুটা অনুশীলনের জন্য এবং বাকি সময় ভুলগুলো পর্যালোচনার জন্য রাখা যেতে পারে।

একটি বিষয় বুঝতে বেশি সময় লাগলে পরিকল্পনা বদলান। শুধু সময়সূচি ধরে রাখতে গিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে চলে যাওয়ার দরকার নেই। প্রশ্ন রাখুন, গত মাসে যে কাজটি করতে পারতেন না, এখন সেটি নিজে করতে পারছেন কি না।

কোর্স শেষ হয়েছে, কিন্তু কাজটি কি নিজে করতে পারবেন?

নতুন পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য এই প্রশ্নটি জরুরি। শুধু কোর্স শেষ করার সনদ দিয়ে সব সময় বোঝানো যায় না, বাস্তব কাজ কতটা ভালো পারেন। ডেটা অ্যানালাইসিস শিখলে একটি নমুনা ডেটাসেট নিয়ে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করুন। ডেটা কীভাবে সাজিয়েছেন, কোন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন এবং ফলাফল কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেগুলো দেখান।

কাজের নমুনা তৈরির সময় শুধু শেষের ফলাফল রাখবেন না। কোন সমস্যা পেয়েছেন এবং কীভাবে সমাধান করেছেন, সেটিও ব্যাখ্যা করুন। UX ডিজাইনের কাজে গবেষণা থেকে ডিজাইন সিদ্ধান্ত পর্যন্ত প্রক্রিয়া দেখানো যায়। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজের পরিকল্পনা, সময়সূচি এবং অগ্রগতি প্রতিবেদনের নমুনা তৈরি করা সম্ভব।

এসব নমুনা পোর্টফোলিওতে রাখতে পারেন।

তবে অনুশীলনের প্রকল্পকে বাস্তব ক্লায়েন্টের কাজ হিসেবে দেখানো উচিত নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ক্লায়েন্টের গোপন তথ্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করবেন না। সব পেশায় অবশ্য পোর্টফোলিও সমান গুরুত্ব পায় না। কোথাও আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা, সনদ, নিবন্ধন বা তত্ত্বাবধানে কাজের অভিজ্ঞতা বেশি প্রাসঙ্গিক। সম্ভব হলে নতুন পেশায় কর্মরত কারও কাছে নিজের কাজ দেখান। কোন জায়গায় আরও অনুশীলন দরকার, সে বিষয়ে তাঁর মতামত নিন।

ক্যারিয়ার বদলানোর আগে নিজের অবস্থাটাও দেখুন

দক্ষতার ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে বলেই এখনই চাকরি পরিবর্তন করতে হবে, এমন নয়। বর্তমান চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর আয়ের কী হবে, সেটিও ভাবতে হবে। নতুন পেশায় শুরুর পর্যায়ের পদে আবেদন করতে হলে আগের তুলনায় দায়িত্ব বা বেতনে পরিবর্তন আসতে পারে। আপনার সঞ্চয় কত দিন চলবে? নতুন চাকরির জন্য কতটা প্রস্তুত? আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মধ্যম পর্যায়ের কোনো পদে যাওয়ার সুযোগ আছে কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেকের জন্য চাকরির পাশাপাশি নতুন দক্ষতা শেখা বাস্তবসম্মত পথ। আবার কিছু পেশায় দীর্ঘমেয়াদি বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা সময় দিতে হতে পারে।

যাঁরা শিক্ষার্থী, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই স্কিল গ্যাপ বিশ্লেষণ কাজে আসবে। চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলে অ্যাসাইনমেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ বা ব্যক্তিগত অনুশীলন দিয়ে নিজের দক্ষতা যাচাই করা যায়। ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্লায়েন্টের কাজের বিবরণ বিশেষভাবে দেখতে হবে। ক্লায়েন্ট কী ধরনের কাজ ও ফলাফল চাইছেন, তার সঙ্গে নিজের দক্ষতা মিলিয়ে নেওয়াই এখানে বেশি প্রাসঙ্গিক।

আর নতুন পেশায় ইংরেজিতে দক্ষ হওয়া বাধ্যতামূলক কি না, সেটিও নির্ভর করবে কাজের ধরনের ওপর। কিছু পদে ইংরেজিতে প্রতিবেদন লেখা বা আন্তর্জাতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। অন্য ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষায় যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কোথা থেকে শুরু করবেন?

ক্যারিয়ার বদলানোর প্রস্তুতিতে প্রথম কাজটি খুব সাধারণ। যে পদে যেতে চান, তার কয়েকটি সাম্প্রতিক চাকরির বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করুন। এরপর নিজের কাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখুন। কোন দক্ষতাগুলো ইতিমধ্যে আছে, কোথায় নতুন করে শিখতে হবে এবং কোন ঘাটতিটি চাকরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা লিখে ফেলুন।

সেই একটি ঘাটতি পূরণের কাজ দিয়েই শুরু করতে পারেন। Career skill gap analysis আপনাকে বলে দেবে না কোন পেশায় সফল হবেন। তবে কোন বিষয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় করা যুক্তিসংগত, আর কোথায় আগের অভিজ্ঞতাই কাজে লাগতে পারে, তা বুঝতে সাহায্য করবে।

নতুন দক্ষতা শেখার পর ছোট একটি প্রকল্পে সেটি ব্যবহার করে দেখুন। কাজটি কেমন লাগছে, কতটা স্বাধীনভাবে করতে পারছেন এবং নতুন পেশার দায়িত্ব আপনার প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে কি না, সে বিষয়ে ধারণা নিন। তারপর চাকরি পরিবর্তনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. Skill Gap Analysis আর Skill Assessment-এর মধ্যে পার্থক্য কী?

Skill Assessment-এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বর্তমানে কোনো কাজ কতটা ভালো পারেন, তা মূল্যায়ন করা হয়। অন্যদিকে Skill Gap Analysis-এ সেই দক্ষতার সঙ্গে নির্দিষ্ট চাকরি বা পেশার চাহিদা তুলনা করা হয়। অর্থাৎ প্রথমটি আপনার বর্তমান সক্ষমতা বোঝায়, আর দ্বিতীয়টি দেখায় নতুন পেশার জন্য কোথায় আরও প্রস্তুতি দরকার।

২. ক্যারিয়ার পরিবর্তনের জন্য কতগুলো নতুন দক্ষতা শিখতে হবে?

এর কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। কাঙ্ক্ষিত পদের চাহিদা এবং আপনার বর্তমান দক্ষতার ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। কারও কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখা দরকার হতে পারে, আবার কারও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা নতুন যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন হতে পারে। তাই কতগুলো দক্ষতা শিখবেন, তার চেয়ে কোনগুলো চাকরির জন্য জরুরি, সেটি আগে দেখুন।

৩. কত দিন পরপর Skill Gap Analysis আপডেট করা উচিত?

নতুন দক্ষতা শেখার সময় প্রায় চার সপ্তাহ পরপর নিজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে পারেন। তবে পুরো বিশ্লেষণ আবার করার প্রয়োজন হতে পারে যদি কাঙ্ক্ষিত চাকরির পদ বদলে যায়, নতুন কোনো যোগ্যতার শর্ত দেখা দেয় অথবা শেখার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত মনে না হয়। তখন নতুন চাকরির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে নিজের দক্ষতার তালিকা আবার মিলিয়ে নিন।

৪. টাকা খরচ না করেও কি দক্ষতার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব?

কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব। বিনামূল্যের শেখার উপকরণ, নির্দেশিকা এবং ব্যক্তিগত প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক দক্ষতা অনুশীলন করা যায়। তবে সব পেশার প্রস্তুতি এভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কোথাও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা বা স্বীকৃত যোগ্যতার প্রয়োজন হতে পারে। তাই কোর্স কেনার আগে সংশ্লিষ্ট চাকরির শর্ত যাচাই করুন।

৫. কখন বুঝবেন নতুন পেশায় চাকরির আবেদন করার মতো প্রস্তুতি হয়েছে?

কাঙ্ক্ষিত পদের আবশ্যিক যোগ্যতাগুলো পূরণ করছেন কি না, সেটি আগে দেখুন। এরপর নিজেকে প্রশ্ন করুন, চাকরির প্রধান দায়িত্বগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ কতটা স্বাধীনভাবে করতে পারবেন। প্রাসঙ্গিক প্রকল্প বা কাজের নমুনা থাকলে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করা সহজ হতে পারে। সব অতিরিক্ত দক্ষতা অর্জন না করেও কিছু পদে আবেদন করা সম্ভব, তবে বাধ্যতামূলক যোগ্যতার শর্ত উপেক্ষা করা উচিত নয়।

সর্বশেষ