চাকরির জন্য সিভি তৈরি করতে গিয়ে কাজের অভিজ্ঞতার অংশে অনেকেই আটকে যান। কোথায় চাকরি করেছেন, কত দিন করেছেন, কী দায়িত্ব ছিল—এসব লেখা সহজ। কিন্তু সেই চাকরিতে নিজের অবদান কী ছিল, তা লিখতে গেলেই সমস্যা শুরু হয়।
ধরা যাক, একজন বিপণন কর্মকর্তা তিন বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজ করেছেন। তাঁর সিভিতে লেখা আছে, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা ও নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশ’। একই পদে আবেদন করা আরও অনেক প্রার্থী প্রায় একই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পারেন। তাহলে নিয়োগকর্তা কীভাবে বুঝবেন, এই কর্মীর কাজ অন্যদের থেকে কোথায় আলাদা?
হয়তো তিনি কোনো প্রচারাভিযানের দুর্বলতা শনাক্ত করেছিলেন। প্রকাশনার পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছিলেন। কিংবা এমন একটি কাজের পদ্ধতি চালু করেছিলেন, যা সহকর্মীদের সময় বাঁচিয়েছে। এসব তথ্য তাঁর সিভিতে নেই। সিভিতে অর্জন লেখার (CV achievements writing) মূল বিষয় এখানেই। দায়িত্বের বিবরণের পাশাপাশি নিজের উদ্যোগ, কাজের ফলাফল এবং প্রতিষ্ঠানে রাখা অবদান বোঝাতে হবে। সে জন্য বড় কোনো পুরস্কার পাওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় নিয়মিত কাজের ছোট একটি উন্নতিও যথেষ্ট অর্থবহ হতে পারে।
তবে অর্জন লিখতে গিয়ে অতিরঞ্জন করা যাবে না। নিজের ভূমিকা যতটুকু ছিল, ঠিক ততটুকুই তুলে ধরতে হবে। নিয়োগকর্তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য থাকার জন্য এটিই বেশি জরুরি।
চাকরির দায়িত্ব আর অর্জন এক জিনিস নয়
একজন হিসাবরক্ষক মাসিক হিসাব তৈরি করেন। একজন গ্রাহকসেবা কর্মকর্তা অভিযোগের উত্তর দেন। একজন সম্পাদক প্রকাশের আগে লেখা যাচাই করেন। এগুলো তাঁদের নিয়মিত দায়িত্ব।
কিন্তু ওই হিসাবরক্ষক যদি হিসাব যাচাইয়ের নতুন পদ্ধতি তৈরি করেন, গ্রাহকসেবা কর্মকর্তা যদি পুনরাবৃত্ত অভিযোগ কমানোর কাজে অবদান রাখেন কিংবা সম্পাদক যদি প্রকাশনার ভুল শনাক্ত করার ব্যবস্থা উন্নত করেন, তাহলে সেগুলো তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের উদাহরণ হতে পারে।
একটি সাধারণ উদাহরণ দেখা যাক।
- দায়িত্বের বিবরণ: নিয়মিত বিক্রয় প্রতিবেদন তৈরি করতেন।
- অর্জনের বিবরণ: বিক্রয় প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের পদ্ধতি পরিবর্তন করে প্রতিবেদন তৈরির সময় কমিয়েছেন।
প্রথম বাক্যটি থেকে কাজের ধরন বোঝা যায়। দ্বিতীয়টিতে কর্মীর উদ্যোগ সম্পর্কে কিছু জানা যাচ্ছে। সময় কতটা কমেছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব থাকলে সেটিও উল্লেখ করা যায়। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। প্রত্যেক দায়িত্বের পেছনে বিশেষ কোনো অর্জন খুঁজে বের করতেই হবে, এমন নয়। কোনো কাজ আপনি নিয়মিত করেছেন, কিন্তু সেখানে আলাদা কোনো পরিবর্তন আনেননি—সেক্ষেত্রে দায়িত্বের বিবরণই রাখুন। বরং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ভালোভাবে লেখা থাকলে সেটি দায়িত্বের দীর্ঘ তালিকার চেয়ে বেশি তথ্য দিতে পারে।
আরও পড়ুন: এটিএস (ATS) বান্ধব সিভি কী? মানুষ ও সফটওয়্যার দুজনের জন্য পড়তে সহজ সিভি
নিজের কাজের কোন অংশটি সিভিতে রাখার মতো?
অনেকেই অর্জন বলতে প্রথমে পদোন্নতি, পুরস্কার কিংবা বড় প্রকল্পের কথা ভাবেন। কিন্তু কর্মজীবনে এমন ঘটনা খুব ঘন ঘন ঘটে না। তার মানে এই নয় যে মাঝের সময়টায় উল্লেখ করার মতো কোনো কাজ হয়নি। একটি অফিসে নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা এলোমেলো ছিল। প্রয়োজনীয় কাগজ খুঁজে পেতে কর্মীদের অসুবিধা হতো। একজন কর্মী নথিগুলো বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানোর নতুন পদ্ধতি তৈরি করলেন। কাজটি হয়তো খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু এর মাধ্যমে সমস্যা শনাক্ত করা এবং সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার দক্ষতা বোঝা যায়।
আবার কোনো কর্মী নতুন সহকর্মীদের একই নিয়ম বারবার বুঝিয়ে দিতেন। পরে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনাগুলো লিখে একটি প্রশিক্ষণ নথি তৈরি করলেন। সেখানেও নির্দিষ্ট একটি অবদান রয়েছে। নিজের পুরোনো কাজগুলো মনে করার সময় দেখুন, কোথাও এমন কিছু করেছিলেন কি না।
কোনো সমস্যার সমাধান, অপ্রয়োজনীয় কাজ কমানো, সহকর্মীদের কাজ সহজ করা, নতুন পদ্ধতি তৈরি কিংবা নির্ধারিত সময়ে কঠিন কোনো কাজ শেষ করা—এগুলোর যেকোনোটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে ‘কঠোর পরিশ্রম করেছি’ বা ‘দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করেছি’ ধরনের বক্তব্য দিয়ে অর্জন বোঝানো কঠিন। নিয়োগকর্তা জানতে চাইতে পারেন, কী করেছিলেন এবং তার ফলাফল কী হয়েছিল।
পুরোনো নথি দেখলে অনেক তথ্য মনে পড়তে পারে

কয়েক বছর আগের কাজের সব বিবরণ মনে রাখা সহজ নয়। তাই আগের কর্মমূল্যায়ন, প্রকল্পের প্রতিবেদন, নিজের কাজের তালিকা কিংবা সংরক্ষিত নথি দেখে নিতে পারেন।
বিপণনে কাজ করলে আগের প্রচারাভিযানের ফলাফল, বিক্রয় বিভাগে থাকলে বিক্রয়ের হিসাব এবং প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট কাজে সমস্যা সমাধানের নথি কাজে আসতে পারে।
তবে এগুলো দেখার উদ্দেশ্য নিজের অবদান শনাক্ত করা। আগের কর্মস্থলের গোপন ব্যবসায়িক তথ্য কিংবা গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা নয়। প্রয়োজনে সংবেদনশীল তথ্য বাদ দিয়েও কী ধরনের কাজ করেছেন, তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
অর্জনের সঙ্গে সংখ্যা যোগ করবেন কি না
সিভি লেখার অনেক পরামর্শে প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে সংখ্যা বা শতাংশ যুক্ত করতে বলা হয়। পরামর্শটি সব ক্ষেত্রে খারাপ নয়, কিন্তু সব কাজের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্যও নয়।
বিক্রয়, বিপণন কিংবা পরিচালনাসংক্রান্ত কিছু কাজে পরিমাপযোগ্য তথ্য পাওয়া তুলনামূলক সহজ। কতটি সমস্যা সমাধান হয়েছে, কত সময় বেঁচেছে অথবা কতজন গ্রাহককে সেবা দেওয়া হয়েছে—এ ধরনের হিসাব থাকতে পারে।
ধরা যাক, একজন কর্মী প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি উন্নত করেছেন। আগে প্রতিটি প্রতিবেদন তৈরি করতে গড়ে ৪০ মিনিট লাগত। পরিবর্তনের পর সময় কমে ৩০ মিনিট হয়েছে।
তাঁর সিভিতে লেখা যেতে পারে:
“তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি পুনর্গঠন করে প্রতি প্রতিবেদন তৈরির গড় সময় ৪০ মিনিট থেকে ৩০ মিনিটে নামিয়েছেন, যা আগের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম।”
এখানে সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা কাজের পরিবর্তন বোঝাচ্ছে।
এই নিবন্ধে ব্যবহৃত সংখ্যাসংবলিত উদাহরণগুলো কাল্পনিক। নিজের সিভিতে প্রকৃত ও যাচাইযোগ্য তথ্য ব্যবহার করতে হবে। সমস্যা হয় তখন, যখন সংখ্যা দেওয়ার জন্য অনুমানকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা হয়।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বেড়েছে। সেই সময়ে আপনি বিপণন বিভাগে কাজ করতেন। বিক্রয় বৃদ্ধির পেছনে আপনার কাজের ভূমিকা থাকতে পারে, কিন্তু পুরো বৃদ্ধির কৃতিত্ব দাবি করার আগে সেটি যাচাই করা প্রয়োজন।
দলের অন্য সদস্যদের কাজ, বাজার পরিস্থিতি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তও বিক্রয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ‘বিক্রয় বৃদ্ধি নিশ্চিত করেছেন’ লেখার চেয়ে ‘বিক্রয় বৃদ্ধির কার্যক্রমে অবদান রেখেছেন’ বলা বেশি যথাযথ।
শতাংশের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা দরকার। কোনো কাজে আগে ১০ দিন লাগত, এখন ৮ দিন লাগে। অর্থাৎ সময় ২০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু সিভিতে শুধু ‘২০ শতাংশ উন্নতি’ লিখলে ঠিক কী পরিবর্তন হয়েছে, তা বোঝা যায় না। কোন কাজের পরিবর্তন হয়েছে এবং কোন সময়ের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, সেটি পরিষ্কার রাখুন।
সংখ্যা না থাকলে অর্জন বাদ দিতে হবে?
একেবারেই নয়। শিক্ষকতা, গবেষণা, মানবসম্পদ, নকশা বা প্রশাসনিক সহায়ক কাজের অনেক অবদান সরাসরি সংখ্যায় প্রকাশ করা কঠিন। এসব ক্ষেত্রে কাজের নির্দিষ্ট বিবরণ বেশি উপযোগী হতে পারে।
যেমন, একজন সম্পাদক যদি প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি মাননিয়ন্ত্রণ তালিকা তৈরি করে থাকেন, সেটি সিভিতে উল্লেখ করতে পারেন।
“নিবন্ধ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই ও সম্পাদনার জন্য একটি মাননিয়ন্ত্রণ তালিকা তৈরি করেছেন এবং সেটি সম্পাদকীয় কাজে ব্যবহার করেছেন।”
এখানে কোনো অপ্রমাণিত ফলাফলের দাবি নেই। কিন্তু কর্মীর উদ্যোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। তবে তালিকা তৈরি করেছেন বলেই প্রকাশনার ভুল কমেছে, এমন দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যাবে না। সেই ফলাফল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকতে হবে।
নতুন কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা তৈরি কিংবা অফিসের নথি সাজানোর পদ্ধতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। সব অর্জনকে সংখ্যায় প্রকাশ করার চেয়ে নিজের কাজটি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করাই বেশি প্রয়োজন।
সিভির বাক্য গুছিয়ে লিখতে যে পদ্ধতিগুলো কাজে আসে
নিজের অর্জন শনাক্ত করার পর সেটিকে এক বা দুই বাক্যে প্রকাশ করা অনেকের কাছেই কঠিন মনে হয়। কী কাজ করেছেন, কতটা করেছেন এবং ফলাফল কী—সবকিছু লিখতে গিয়ে বাক্য দীর্ঘ হয়ে যেতে পারে। এখানে কয়েকটি পরিচিত পদ্ধতি সাহায্য করতে পারে। তবে সিভি লেখার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সূত্র অনুসরণ বাধ্যতামূলক নয়।
Google-এর প্রকাশিত একটি সিভি লেখার নির্দেশিকায় XYZ Formula ব্যবহারের পরামর্শ রয়েছে। নির্দেশিকাটি মূলত সামরিক বাহিনী থেকে অন্য পেশায় যেতে আগ্রহীদের জন্য তৈরি হলেও এর কাঠামো অন্যান্য কাজের অভিজ্ঞতা লেখার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়।
সূত্রটি হলো:
Accomplished X, as measured by Y, by doing Z.
সহজভাবে বললে, কী অর্জন করেছেন, সেটি কীভাবে পরিমাপ করেছেন এবং কোন কাজের মাধ্যমে ফলাফল এসেছে। যেমন, প্রতিবেদনের সময় ৪০ মিনিট থেকে ৩০ মিনিটে কমানোর উদাহরণে এই তিনটি তথ্যই রয়েছে। তাই সেখানে সূত্রটি ব্যবহার করা সুবিধাজনক।
অন্যদিকে, PAR পদ্ধতিতে কাজ বা প্রকল্প, নিজের উদ্যোগ এবং ফলাফল তুলে ধরা হয়। কোনো অর্জনের সঙ্গে নির্দিষ্ট সংখ্যা না থাকলেও এই কাঠামো ব্যবহার করা যায়। ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানে নথি খুঁজে পেতে সমস্যা হতো। একজন কর্মী সেগুলো বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানোর ব্যবস্থা করেছেন।
সিভিতে লেখা যেতে পারে:
“প্রতিষ্ঠানের নথি বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানোর নতুন পদ্ধতি তৈরি করে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করেছেন।”
এখানে নির্দিষ্ট কাজ ও পরিবর্তনটি বোঝানো হয়েছে। STAR Method একটু ভিন্ন। এটি মূলত চাকরির সাক্ষাৎকারে আচরণভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। Situation, Task, Action এবং Result—এই চারটি বিষয় ধরে কোনো অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করা যায়।
ধরা যাক, একটি প্রকল্প সময়মতো শেষ হচ্ছিল না। একজন কর্মী কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং দায়িত্ব বণ্টনের পদ্ধতি বদলান। সিভিতে পুরো ঘটনা লেখার প্রয়োজন নেই। সংক্ষেপে লেখা যায়:
“প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও দায়িত্ব বণ্টনের পদ্ধতি উন্নত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে দলকে সহায়তা করেছেন।”
সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানতে চাইলে তখন সমস্যাটি কী ছিল, নিজের দায়িত্ব কী ছিল এবং কী ফলাফল এসেছে, তা ব্যাখ্যা করা যাবে। এই তিনটি পদ্ধতির মধ্যে যেটি আপনার অভিজ্ঞতা পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করে, সেটিই ব্যবহার করুন। প্রতিটি অর্জনের জন্য আলাদা সূত্র খুঁজতে গেলে লেখাটি অকারণে জটিল হয়ে যেতে পারে।
নতুন চাকরিপ্রার্থীদের সিভিতে কী থাকবে?

চাকরির অভিজ্ঞতা নেই বলে সিভিতে অর্জনের অংশ ফাঁকা রাখতে হবে, এমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প, শিক্ষানবিশি, গবেষণা, শিক্ষার্থী সংগঠনের কাজ কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম থেকেও দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন। সিভিতে শুধু ‘গবেষণা প্রকল্পে অংশগ্রহণ’ লেখা থাকলে তাঁর দায়িত্ব বোঝা যাচ্ছে না।
এর পরিবর্তে তিনি লিখতে পারেন:
“দলগত গবেষণা প্রকল্পে নির্ধারিত উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন।”
এতে কাজের ধরন পরিষ্কার হচ্ছে। গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকলে সেটির নামও উল্লেখ করা যায়। ক্যাম্পাসের সংগঠনে কাজের ক্ষেত্রেও নিজের দায়িত্বের বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ। একটি অনুষ্ঠানে অনেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন, সেটি আয়োজনের পরিসর বোঝাতে পারে। কিন্তু আপনার ব্যক্তিগত অবদান কী ছিল, তা জানতে হলে আরও তথ্য প্রয়োজন।
আপনি কি অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধনের দায়িত্বে ছিলেন? স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ সমন্বয় করেছেন? অনুষ্ঠান আয়োজনের কোনো সমস্যার সমাধান করেছেন?
যে দায়িত্ব বাস্তবে পালন করেছেন, সেটিই লিখুন।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওয়েবসাইট তৈরি, নকশা প্রস্তুত কিংবা লেখালেখির কাজ করলেও সেই অভিজ্ঞতা সিভিতে রাখা যায়। কাজের নমুনা অনলাইনে থাকলে লিংক দিতে পারেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট বা ব্যক্তিগত প্রকল্পকে চাকরির অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সিভি তৈরির সময় বড় অভিজ্ঞতার অভাব ঢাকার চেয়ে নিজের শেখা এবং বাস্তবে ব্যবহার করা দক্ষতাগুলো স্পষ্ট করা বেশি যুক্তিসংগত।
চাকরি পরিবর্তনের সময় পুরোনো সব অভিজ্ঞতা সমান জরুরি নয়
কয়েক বছর কাজ করার পর সিভিতে অনেক দায়িত্ব ও প্রকল্পের বিবরণ জমে যায়। তখন নতুন সমস্যা তৈরি হয়। কোন অভিজ্ঞতা রাখবেন, আর কোনটি বাদ দেবেন? এ প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করে আপনি কোন চাকরিতে আবেদন করছেন, তার ওপর।
ধরা যাক, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রকল্প সমন্বয়ের পদে যেতে চান। আগের চাকরিতে তিনি নথি তৈরি, কাজের সময়সূচি প্রস্তুত এবং বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেছেন। নতুন পদের জন্য সময়সূচি তৈরি ও বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। সেক্ষেত্রে এই কাজগুলোর নির্দিষ্ট উদাহরণ সামনে রাখা ভালো।
পদোন্নতির জন্য আবেদন করলে নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান কিংবা সহকর্মীদের কাজে সহায়তার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা যায়। তবে দায়িত্বের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পদবির পার্থক্য বজায় রাখুন। কোনো প্রকল্পে কয়েকজনের কাজ সমন্বয় করেছেন বলেই নিজেকে প্রকল্পপ্রধান হিসেবে পরিচয় দেওয়া ঠিক হবে না।
নিজের প্রকৃত পদবি রেখে কোন দায়িত্ব পালন করেছেন, তা লিখুন।
চাকরির বিজ্ঞাপনের ভাষা হুবহু নকল করবেন না
আবেদন করার আগে চাকরির বিজ্ঞাপনটি ভালোভাবে পড়ুন। প্রতিষ্ঠান কোন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা দেখুন। বিজ্ঞাপনে তথ্য বিশ্লেষণ, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কিংবা গ্রাহক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলে নিজের আগের কাজ থেকে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ বেছে নিন।
কিছু প্রতিষ্ঠান চাকরির আবেদন গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় Applicant Tracking System বা ATS ব্যবহার করে। এসব সফটওয়্যারের কিছু ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা কীওয়ার্ডের ভিত্তিতে আবেদন যাচাইয়ের সুযোগ থাকে।
কিন্তু সব ATS একইভাবে কাজ করে না। কোনো নির্দিষ্ট শব্দ লিখলেই সিভি নির্বাচিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। চাকরির বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত প্রাসঙ্গিক পরিভাষা নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে গেলে তা ব্যবহার করতে পারেন। তবে পুরো বাক্য অনুলিপি করবেন না।
কাজের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও দক্ষতার জন্য পরিষ্কার শিরোনাম রাখুন। অনলাইন নিয়োগব্যবস্থায় আবেদন করলে অপ্রয়োজনীয় গ্রাফিকস ও জটিল বিন্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। বাংলাদেশ ও ভারতে সাধারণ চাকরির আবেদনপত্রকে প্রায়ই সিভি বলা হয়। তবে আন্তর্জাতিক চাকরি, গবেষণা কিংবা একাডেমিক পদে Resume ও Curriculum Vitae-এর মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
সিভিতে নিজের অবদান বড় করে দেখানোর দরকার নেই
অনেকে মনে করেন, সিভিতে যত বড় সাফল্যের কথা লেখা যাবে, নিয়োগকর্তার কাছে তত ভালো প্রভাব পড়বে। বাস্তবে অতিরঞ্জিত দাবি সাক্ষাৎকারে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। যেমন ‘অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়েছেন’ লেখার বদলে কোন কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটি উল্লেখ করা বেশি অর্থবহ।
একইভাবে প্রতিষ্ঠানের কোনো বড় সাফল্যে দলের সদস্য হিসেবে যুক্ত থাকলে নিজের কাজের অংশটুকু আলাদা করে লিখুন। কোনো প্রকল্প এখনও শেষ হয়নি অথচ সিভিতে সেটিকে সম্পন্ন অর্জন হিসেবে দেখানোও ঠিক নয়। কাজটি কোন পর্যায় পর্যন্ত এগিয়েছে এবং সেখানে নিজের অবদান কী ছিল, তা উল্লেখ করুন।
সিভি সম্পাদনার জন্য এআইভিত্তিক লেখার সহায়তা ব্যবহার করলেও তথ্য যাচাই করতে হবে। সফটওয়্যার কোনো অর্জনকে আকর্ষণীয় দেখাতে নিজের মতো শতকরা হার, ফলাফল বা দায়িত্ব যোগ করলে সেগুলো বাদ দিন। প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্যও অনুমতি ছাড়া এ ধরনের টুলে দেওয়া উচিত নয়। সিভি ভালোভাবে লেখার জন্য এমন কোনো দাবি করার প্রয়োজন নেই, যা পরে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না।
বর্তমান সিভিটি কীভাবে সংশোধন করবেন?
পুরো সিভি নতুন করে লেখার আগে সাম্প্রতিক চাকরি বা প্রকল্পের অভিজ্ঞতা অংশটি দেখুন। সেখান থেকে তিনটি সাধারণ দায়িত্ব বেছে নিন। প্রতিটির পাশে লিখুন, কাজটি করতে গিয়ে আপনি কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং কোনো পরিবর্তন এসেছিল কি না।
তারপর আগের প্রতিবেদন বা নথি থেকে ফলাফলের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, দেখুন। সংখ্যা থাকলে তার ভিত্তি যাচাই করুন। না থাকলে অনুমান করে বসাবেন না। নতুন বাক্য লেখার সময় চাকরির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতাগুলোকে গুরুত্ব দিন। যেসব দায়িত্ব নতুন পদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, সেগুলো সংক্ষিপ্ত করা যায়।
শেষে সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট পেশার কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা বিশ্বস্ত সহকর্মীকে সিভিটি পড়তে দিন। তিনি আপনার কাজের ধরন ও অবদান বুঝতে পারছেন কি না, তা জানতে চান। পদবি, চাকরির সময়কাল, বানান এবং যোগাযোগের তথ্যও পরীক্ষা করুন। প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুযায়ী সিভির ফাইলের ধরন ও বিন্যাস ঠিক রাখুন।
ভালো সিভি তৈরি করলেই সাক্ষাৎকারের ডাক পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পদের চাহিদা এবং অন্য আবেদনকারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রভাব থাকে। তবে দায়িত্বের দীর্ঘ তালিকার মধ্যে নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চাপা পড়ে থাকলে সেগুলো আলাদা করে তুলে ধরা দরকার।
সিভি সংশোধনের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত শুরু হতে পারে একটি সাধারণ বাক্য দিয়ে। যেমন ‘মাসিক প্রতিবেদন তৈরি করতেন’। এবার ভেবে দেখুন, সেই কাজটি আপনি কীভাবে করতেন, সেখানে কোনো পরিবর্তন এনেছিলেন কি না এবং তার ফলাফল সম্পর্কে কী প্রমাণ রয়েছে। এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর থেকেই নিজের অভিজ্ঞতার আরও নির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ তৈরি করা সম্ভব।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
সিভিতে অর্জন কোন অংশে লিখতে হয়?
সাধারণত কাজের অভিজ্ঞতা (Work Experience) অংশে সংশ্লিষ্ট চাকরির নিচে অর্জন উল্লেখ করা হয়। শিক্ষার্থী বা নতুন চাকরিপ্রার্থীরা শিক্ষাগত প্রকল্প, শিক্ষানবিশি কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের বিবরণেও অর্জন লিখতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্জনটি যেন সংশ্লিষ্ট কাজ বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
একটি চাকরির জন্য সিভিতে কতটি অর্জন লেখা উচিত?
এর কোনো বাধ্যতামূলক সংখ্যা নেই। সাম্প্রতিক ও প্রাসঙ্গিক চাকরির ক্ষেত্রে সাধারণত দুই থেকে চারটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন দিয়ে শুরু করা যায়। তবে কাজের ধরন, অভিজ্ঞতা এবং আবেদন করা পদের চাহিদা অনুযায়ী সংখ্যা কমবেশি হতে পারে। একই ধরনের কয়েকটি অর্জন লেখার চেয়ে আলাদা দক্ষতার পরিচয় দেয়, এমন উদাহরণ রাখা ভালো।
একই অর্জন কি একাধিক চাকরির আবেদনে ব্যবহার করা যায়?
হ্যাঁ। একই অর্জন বিভিন্ন চাকরির জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে প্রতিটি আবেদনে সেই অর্জনের কোন দিকটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা বিবেচনা করা উচিত। যেমন একটি প্রকল্প সফলভাবে শেষ করার অভিজ্ঞতা এক চাকরিতে সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং অন্য চাকরিতে দলগত সমন্বয়ের প্রমাণ হিসেবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। অবশ্য মূল ঘটনা ও ফলাফল পরিবর্তন করা যাবে না।
সিভিতে উল্লেখ করা অর্জনের প্রমাণ কি জমা দিতে হয়?
সাধারণ চাকরির আবেদনে প্রতিটি অর্জনের জন্য আলাদা প্রমাণপত্র জমা দেওয়া সাধারণত প্রয়োজন হয় না, যদি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তা না চায়। তবে সাক্ষাৎকারে কাজের ফলাফল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হতে পারে। তাই নিজের ভূমিকা, কাজের সময়কাল এবং উল্লেখ করা তথ্যের ভিত্তি ব্যাখ্যা করার প্রস্তুতি রাখা ভালো। গোপনীয় প্রতিষ্ঠানের নথি অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা উচিত নয়।

