গুগল অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি চেকআপ: কোন সেটিংস আগে বদলাবেন

সর্বাধিক আলোচিত

গুগলের ‘ম্যানেজ ইওর ডেটা অ্যান্ড প্রাইভেসি’ পেজটি অপশনে ভরপুর। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এখান থেকে বোঝা বেশ কঠিন যে, কোন সেটিংসগুলো ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ আর কোনটি কেবল দৈনন্দিন সেবার সাধারণ অংশ।

আপনার সার্চ হিস্ট্রি, ইউটিউব ভিউ বা লোকেশন—সবকিছুর রেকর্ডই গুগলের সার্ভারে জমা হচ্ছে। তবে প্রাইভেসি সেটিংসের সবকিছু একবারে বন্ধ করে দেওয়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়; এতে স্মার্টফোন ও স্মার্ট ডিভাইসগুলোর স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই অকারণে ঘাবড়ে না গিয়ে চলুন দেখি, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কোন প্রাইভেসি সেটিংসগুলো এখনই অডিট করা জরুরি এবং কীভাবে সেগুলো নিরাপদ রাখা সম্ভব।

ব্রাউজিং ও অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের তথ্য নিয়ন্ত্রণ

গুগলের তথ্য সংগ্রহের সবচেয়ে বড় উৎস হলো তাদের ওয়েব অ্যান্ড অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি সেকশন। গুগল সার্চের ইতিহাস, ব্রাউজ করা ওয়েবসাইট, এমনকি গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টকে দেওয়া ভয়েস কমান্ডের প্রায় সবই এখানে জমা থাকে। এটি পরিবর্তনের জন্য অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করে ডেটা অ্যান্ড প্রাইভেসি ট্যাব থেকে ওয়েব অ্যান্ড অ্যাপ অ্যাক্টিভিটিতে যান। এখানে আপনি চাইলে ট্র্যাকিং সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারেন। তবে এর বড় অসুবিধা হলো, এতে গুগল ম্যাপস বা অ্যাসিস্ট্যান্ট আপনার আগের পছন্দ অনুযায়ী কাজ করতে পারবে না। সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হলো অটো-ডিলিট চালু করা।

এখানে আপনি তিন, আঠারো বা ছত্রিশ মাসের সময়সীমা বেছে নিতে পারেন। নির্দিষ্ট সময় পার হলে পুরনো ডেটা নিজে থেকেই মুছে যাবে। ফলে আপনার নিয়মিত ব্যবহারের সুবিধা যেমন ঠিক থাকবে, তেমনি বছরের পর বছর ধরে আপনার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টও গুগলের কাছে জমা হবে না। নতুন নিয়মে এখন ব্যবহারকারীরা চাইলে ব্রাউজারের কুকিজ এবং অন্যান্য ডেটা আরও সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। তাই আপনার দৈনন্দিন অনলাইন কাজগুলো নিরাপদ রাখতে এই অপশনটি সঠিকভাবে সাজানো অত্যন্ত জরুরি।

অবস্থান ইতিহাস বা টাইমলাইন ব্যবস্থাপনা

অবস্থান ইতিহাস বা টাইমলাইন ব্যবস্থাপনা

আপনি প্রতিদিন কোথায় যাচ্ছেন বা কোন দোকানে কতক্ষণ কাটাচ্ছেন—তার নিখুঁত ম্যাপ তৈরি করে গুগল টাইমলাইন। গুগল সম্প্রতি লোকেশন ডেটা ক্লাউডের বদলে সরাসরি ব্যবহারকারীর ফোনে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ। তবে পুরোনো সেটিংস চালু থাকলে তা ক্লাউডেই জমা হতে থাকে। ডেটা অ্যান্ড প্রাইভেসি ট্যাবের টাইমলাইন অপশনে গিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে দৈনন্দিন চলাফেরার রেকর্ড গুগলের সার্ভারে রাখতে না চাইলে এটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিন।

আর যদি ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে টাইমলাইন ধরে রাখতে চান, তবে অটো-ডিলিট অপশন থেকে তিন মাসের ছোট একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ। এর ফলে পুরোনো লোকেশন ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাবে এবং আপনার ব্যক্তিগত ভ্রমণের তথ্যের অপব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে আসবে। স্মার্টফোনের সাধারণ লোকেশন সেবা চালু থাকলেও গুগলের সার্ভারে দীর্ঘমেয়াদি ডেটা জমা হওয়া আটকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রত্যেক সচেতন ব্যবহারকারীর জন্য অবশ্য পালনীয় একটি কাজ।

তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ্লিকেশনের প্রবেশাধিকার বাতিল

বিভিন্ন অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে দ্রুত অ্যাকাউন্ট খুলতে আমরা প্রায়ই সাইন-ইন উইথ গুগল সুবিধাটি ব্যবহার করি। কাজ শেষে অ্যাপটি মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে মুছে ফেললেও গুগলের ডেটায় তাদের প্রবেশাধিকার থেকে যায়। অনেক বাইরের অ্যাপ বিনা প্রয়োজনে আপনার জিমেইল পড়া, পরিচিতি তালিকা দেখা বা ব্যক্তিগত ছবি দেখার অনুমতি নিয়ে বসে থাকে, যা বড় ধরনের তথ্য চুরির ঝুঁকি তৈরি করে। এই ঝুঁকি এড়াতে সিকিউরিটি ট্যাবে গিয়ে নিচের দিকে ইওর কানেকশনস টু থার্ড-পার্টি অ্যাপস অ্যান্ড সার্ভিসেস অপশনে যান।

সেখানে আপনি দেখতে পাবেন কোন কোন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ আপনার তথ্য ব্যবহার করছে। যেসব অ্যাপ আপনি আর ব্যবহার করেন না বা যাদের নাম অচেনা লাগছে, সেগুলোতে ক্লিক করে সমস্ত সংযোগ মুছে ফেলুন নির্বাচন করে দিন। নিয়মিত এই তালিকাটি পরীক্ষা করলে আপনার অজান্তে কোনো ক্ষতিকর অ্যাপ ব্যক্তিগত ডেটা চুরি করতে পারবে না এবং আপনার ডিজিটাল পরিচয় অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকবে। এই সাধারণ পদক্ষেপটি হ্যাকিং বা ডেটা বেহাত হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ কমিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: সাইবার নিরাপত্তার ঘটনা-এর পর প্রমাণ সংরক্ষণ ও প্রতিবেদন করার পদ্ধতি

ব্যক্তিগতকৃত বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ

অনলাইনে কোনো জুতো বা পোশাক খুঁজলে কিছুক্ষণ পর সব জায়গায় সেই পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখতে পাওয়ার মূল কারণ গুগলের পার্সোনালাইজড অ্যাড ট্র্যাকিং। এটি প্রাইভেসি সেটিংস কীভাবে কাজ করে, তার একটি বড় উদাহরণ। বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করতে ডেটা অ্যান্ড প্রাইভেসি ট্যাব থেকে মাই অ্যাড সেন্টারে প্রবেশ করুন এবং ওপরের ডানদিকে থাকা পার্সোনালাইজড অ্যাডস অপশনটি বন্ধ করে দিন। মনে রাখবেন, এটি বন্ধ করলে বিজ্ঞাপন আসা বন্ধ হবে না।

গুগল বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঠিকই বিজ্ঞাপন দেখাবে, তবে সেগুলো আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, আগ্রহ বা ব্রাউজিং হিস্ট্রির ওপর ভিত্তি করে হবে না। এর একটি বড় সুবিধা হলো, আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ এবং রুচি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আর সরাসরি পৌঁছাবে না। ফলে অনলাইনে আপনার আচরণ মনিটর করে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণার শিকার হওয়া থেকে আপনি বেঁচে যাবেন। যারা অতিরিক্ত ট্র্যাকিং অপছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি বন্ধ রাখা মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সহায়ক এবং এটি ব্রাউজিং অভিজ্ঞতাকে আরও নিরবচ্ছিন্ন করে তোলে।

অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা এবং পুনরুদ্ধারের বিকল্প হালনাগাদ

অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা এবং পুনরুদ্ধারের বিকল্প হালনাগাদ

প্রাইভেসি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত। অ্যাকাউন্টে এমন কোনো পুরোনো ফোন নম্বর বা রিকভারি ইমেইল যুক্ত থাকা উচিত নয়, যার পাসওয়ার্ড আপনি নিজেই ভুলে গেছেন। অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখতে সিকিউরিটি ট্যাবে গিয়ে আজই টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু আছে কি অ্যাকাউন্টে তা যাচাই করুন। সিম কার্ড হারানোর ঝুঁকি বা নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা মাথায় রেখে শুধু এসএমএস-এর ওপর নির্ভর না করে গুগল অথেনটিকেটর অ্যাপ ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।

একই সঙ্গে রিকভারি ফোন এবং রিকভারি ইমেইল অপশনে আপনার বর্তমান ও সচল নম্বর এবং ইমেইল দেওয়া আছে কি না, তা পরীক্ষা করুন। কোনো কারণে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে বা পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে এই তথ্যগুলোই আপনার অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার একমাত্র উপায় হিসেবে কাজ করবে। তাই সঠিক তথ্য দিয়ে এই অংশটি সর্বদা হালনাগাদ রাখা প্রত্যেক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শক্তিশালী এবং হালনাগাদ রিকভারি অপশন অনেক বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

অ্যাকাউন্ট অডিটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

গুগল অ্যাকাউন্টের সেটিংস বদলানোর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে না। আপনি যদি স্মার্টহোম ডিভাইস বা গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হন, তবে অ্যাক্টিভিটি ট্র্যাকিং সম্পূর্ণ বন্ধ করলে সেগুলোর কার্যকারিতা কমে যাবে।

এসব ক্ষেত্রে অটো-ডিলিট শিডিউল ব্যবহার করাই সবচেয়ে ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত। সবচেয়ে ভালো অভ্যাস হলো, প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার আপনার গুগল ড্যাশবোর্ডে প্রবেশ করে বাইরের অ্যাপের তালিকা এবং লোকেশন সেটিংস চেক করা।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ইনকগনিটো মোড ব্যবহার করলে কি ডেটা সেভ করে?

আপনার ব্রাউজার হিস্ট্রি সেভ না হলেও, আপনি যদি ইনকগনিটো মোডে অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করেন, তবে সেই সার্চ হিস্ট্রি গুগলের সার্ভারে জমা হবে।

লোকেশন হিস্ট্রি বন্ধ করলে কি ম্যাপস কাজ করবে না?

গুগল ম্যাপস ঠিকমতোই কাজ করবে এবং আপনি লাইভ নেভিগেশন ব্যবহার করতে পারবেন। লোকেশন হিস্ট্রি বন্ধ করার অর্থ হলো, কেবল আপনার ভ্রমণের অতীত রেকর্ডগুলো সার্ভারে জমিয়ে রাখবে না।

তৃতীয় পক্ষের অ্যাপের অ্যাক্সেস মুছে দিলে কি সেই অ্যাপের অ্যাকাউন্ট ডিলিট হয়ে যায়?

না, অ্যাপের নিজস্ব সার্ভারে থাকা আপনার অ্যাকাউন্ট ডিলিট হবে না। এর মাধ্যমে শুধু আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট থেকে নতুন করে ডেটা নেওয়ার অনুমতি বাতিল হয়ে যাবে।

সর্বশেষ