গ্রিন টেকনোলজি ক্যারিয়ারের নতুন ভূমিকা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা

সর্বাধিক আলোচিত

ধরা যাক, একজন ইইই শিক্ষার্থী গ্রিন টেক ক্যারিয়ার নিয়ে খোঁজ করছেন। প্রথম কয়েক মিনিটেই তার সামনে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং, বিদ্যুৎ গ্রিডের সমন্বয়, জ্বালানি নিরীক্ষা—এমন পাঁচ-ছয়টি আলাদা দিক চলে আসবে। আর ব্যবসা বা তথ্য বিশ্লেষণের পটভূমি থাকলে তালিকাটা আবার অন্য রকম।

সমস্যাটা এখানেই। “গ্রিন টেকনোলজিতে কাজ করতে চাই” কথাটি খুব বড়। চাকরির বাজার এতটা গুছিয়ে সাজানো নয় যে একটি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিবিষয়ক কোর্স শেষ করলেই পরের ধাপ পরিষ্কার হয়ে যাবে। বরং উল্টোভাবে ভাবা বেশি কার্যকর। আপনি এখন কী জানেন, সেই জ্ঞান কোন ধরনের কাজের কাছাকাছি, আর সেখানে আসলে কী দক্ষতা চাওয়া হচ্ছে—এই জায়গা থেকেই শুরু করা উচিত।

খাতটি অবশ্যই বড় হচ্ছে। ২০২৪ সালে বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ কাজ করেছেন। এর মধ্যে সৌর ফটোভোলটাইক বা সৌর পিভি খাতেই ছিল প্রায় ৭২ লাখ কর্মসংস্থান।

তবে আরেকটি সংখ্যা একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ২.৩%। অর্থাৎ সৌর প্যানেল বেশি বসছে মানেই চাকরিও একই হারে বাড়বে—এমন হিসাব চলে না। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, উৎপাদন দক্ষতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডের সীমাবদ্ধতা কর্মসংস্থানের গতি কমিয়ে দিতে পারে। এ কারণেই গ্রিন টেক ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা করার সময় “কোন খাত বাড়ছে?” প্রশ্নের পাশাপাশি “কোন কাজের জন্য মানুষ নেওয়া হচ্ছে?” প্রশ্নটিও দরকার।

গ্রিন জব আসলে অনেক পুরোনো পেশার নতুন রূপ

গ্রিন টেকনোলজি নিয়ে কথা বললে আলাদা একগুচ্ছ ভবিষ্যতের চাকরির কথা ভাবা সহজ। বাস্তবে পরিবর্তনটা অনেক জায়গায় পুরোনো পেশার ভেতরেই হচ্ছে। একজন বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছেন। যান্ত্রিক প্রকৌশলী শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও জ্বালানি দক্ষতা দেখছেন। তথ্য বিশ্লেষক বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন নিয়ে কাজ করছেন। হিসাবরক্ষক কার্বন নিঃসরণের তথ্য নিয়ে বসছেন।

একই সময়ে ইলেকট্রিশিয়ান, স্থাপনকর্মী, বিদ্যুৎ লাইনকর্মী এবং কারিগরের প্রয়োজনও থাকছে। জ্বালানি খাত নিয়ে সাম্প্রতিক কর্মীসংক্রান্ত জরিপগুলোতে দক্ষ কারিগরি কর্মী নিয়োগে ঘাটতির কথা এসেছে। এতে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়: সবুজ অর্থনীতি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়-স্নাতকদের দাপ্তরিক চাকরির বাজার নয়।

এই জায়গাটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের পেশা নিয়ে আলোচনায় এখনও ডিগ্রির নাম দিয়ে চাকরি খোঁজার অভ্যাস আছে। কিন্তু গ্রিন টেক খাতে কাজের পদ অনেক সময় ডিগ্রির নামের সঙ্গে হুবহু মেলে না।

একজন বৈদ্যুতিক প্রকৌশল স্নাতক হয়তো “সবুজ জ্বালানি প্রকৌশলী” নামের পদে আবেদন করবেন না। তিনি “সৌর নকশা প্রকৌশলী”, “বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী”, “পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী” বা “বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং প্রকৌশলী” নামের পদে বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারেন।

নামের চেয়ে কাজের বিবরণ দেখা তাই জরুরি।

সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে পরিচিত পথ, কিন্তু এখানেও কাজের ধরন আলাদা

সৌর পিভিকে গ্রিন টেক ক্যারিয়ারের সহজ প্রবেশপথ বলা যায় না, তবে এটি বোঝা তুলনামূলক সহজ। একটি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ধরুন। প্রথমে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও জায়গা দেখা হয়। তারপর ব্যবস্থার আকার নির্ধারণ, বিন্যাস, ইনভার্টার, বৈদ্যুতিক সুরক্ষা, তার সংযোগ, স্থাপন এবং চালু করার কাজ আসে। কাজ শেষ হলেও পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ থাকে।

সব কাজ একই ব্যক্তি করেন না।

যে শিক্ষার্থী বৈদ্যুতিক বা ইইই পটভূমি থেকে আসছেন, তার জন্য সার্কিট, বিদ্যুৎব্যবস্থা, ইনভার্টার, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং একরেখা বৈদ্যুতিক চিত্র বোঝা কাজে আসে। মাঠপর্যায়ের কাজ করতে চাইলে তার সংযোগ, ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং নিরাপদে কাজ করার অভ্যাস আরও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি ছোট কাজের নমুনা তৈরি করাও কাজে দিতে পারে। ধরুন, একটি কাল্পনিক বাড়ি বা ছোট অফিসের জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রাথমিক আকার নির্ধারণ করলেন। বিদ্যুতের চাহিদার হিসাব দিলেন, কতটি প্যানেল লাগবে দেখালেন, সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন হিসাব করলেন।

এটি কোনো পেশাদার নকশার বিকল্প নয়। কিন্তু সাক্ষাৎকারে “সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে আগ্রহ আছে” বলার চেয়ে অনেক বেশি নির্দিষ্ট কিছু দেখায়। বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রটি একেবারে তাত্ত্বিকও নয়। ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের জন্য ২০% এবং ২০৪০ সালের জন্য ৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য রাখা হয়েছে। নেট মিটারিং নির্দেশিকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহারের পথও রাখা হয়েছে। তবু নীতিগত লক্ষ্য আর চাকরির নিশ্চয়তা এক জিনিস নয়। এটুকু মাথায় রাখা দরকার।

সৌরবিদ্যুতের পরেই গ্রিড আর ব্যাটারি সংরক্ষণের প্রশ্ন আসে

সৌরবিদ্যুতের পরেই গ্রিড আর ব্যাটারি সংরক্ষণের প্রশ্ন আসে

নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাড়লে একটি নতুন সমস্যা সামনে আসে: বিদ্যুৎ যখন তৈরি হচ্ছে, তখনই কি সেটির প্রয়োজন হচ্ছে? সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় বেশি উৎপাদন করবে। চাহিদা অন্য সময়ে বাড়তে পারে। গ্রিড কতটা নিতে পারবে, সংরক্ষণব্যবস্থা কোথায় বসবে, ব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকবে কি না—এসব নিয়ে কাজ করতে হয়।

এই কারণে গ্রিড এবং ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা মানুষের প্রয়োজন বাড়ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৩৯ লাখ বেড়েছে। সৌর পিভি সবচেয়ে বড় কারণ হলেও গ্রিড, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ অবকাঠামোও এই বৃদ্ধির অংশ।

বিদ্যুৎ প্রকৌশল পড়লে এই জায়গাটি কাছের মনে হতে পারে।

কিন্তু “ব্যাটারি” শব্দটি দেখে একটি স্বল্পমেয়াদি কোর্স বেছে নিলেই হবে না। ব্যাটারি কোষের রসায়ন, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, বৃহৎ গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, পাওয়ার ইলেকট্রনিকস এবং তাপ ব্যবস্থাপনা—এগুলো একই বিষয় নয়। কোন দিকে যেতে চান, সেটি আগে পরিষ্কার হওয়া ভালো।

বৈদ্যুতিক গাড়িতে সবচেয়ে বেশি ভুল হয় কোর্স বাছাইয়ের সময়

বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে প্রশিক্ষণ এখন অনেক জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু সব বৈদ্যুতিক গাড়িবিষয়ক কোর্স একই কাজের প্রস্তুতি দেয় না। কারও কাজ গাড়ির ত্রুটি শনাক্ত করা। কেউ ব্যাটারি ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন। কেউ চার্জিং স্টেশন নিয়ে। কেউ পাওয়ার ইলেকট্রনিকস নিয়ে।

২০২৪ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ি-সংশ্লিষ্ট যানবাহন উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮ লাখ বেড়েছে। তাই খাতটি উপেক্ষা করার নয়। যান্ত্রিক বা অটোমোটিভ পটভূমির জন্য গাড়ির দিকটি বেশি স্বাভাবিক হতে পারে। বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রনিকস পটভূমির কেউ চার্জিং, পাওয়ার ইলেকট্রনিকস বা ব্যাটারি ব্যবস্থার দিকে যেতে পারেন।

বিশেষ করে চার্জিং অবকাঠামোর ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার: এটি গাড়ির কোনো অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ নয়। এটি বিদ্যুৎ অবকাঠামোর অংশ। বিদ্যুতের চাপ, বিতরণব্যবস্থা, সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা না বুঝে শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তি জানাই যথেষ্ট নয়। এই কারণে কোনো প্রশিক্ষণে ভর্তি হওয়ার আগে পাঠ্যসূচি দেখা উচিত। সেখানে গাড়ির ব্যবস্থা বেশি, নাকি বৈদ্যুতিক চার্জিং অবকাঠামো—এই পার্থক্য পেশার পথ বদলে দিতে পারে।

জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে কম কথা হয়, কিন্তু কাজ কম নয়

গ্রিন টেকনোলজি নিয়ে আলোচনায় সৌরবিদ্যুৎ আর বৈদ্যুতিক গাড়ি যতটা জায়গা পায়, জ্বালানি দক্ষতা ততটা পায় না। কিন্তু কোনো কারখানা বা বাণিজ্যিক ভবনের জন্য নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা বসানোর আগে বিদ্যুৎ কোথায় নষ্ট হচ্ছে, সেটি দেখা অনেক সময় বেশি জরুরি।

২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ জ্বালানি দক্ষতা-সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত ছিলেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভবনের জ্বালানি ব্যবস্থা, শিল্পযন্ত্র, জ্বালানি নিরীক্ষা এবং ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ—এসবের সঙ্গে এই কাজ জড়িত। যান্ত্রিক প্রকৌশল, পুরকৌশল, স্থাপত্য বা বৈদ্যুতিক প্রকৌশলের পটভূমি থাকলে এটি বেশ স্বাভাবিক পেশাগত সম্প্রসারণ হতে পারে।

এখানে কাজটি খুব চাকচিক্যময় শোনায় না। কিন্তু বাস্তব শিল্পে বিদ্যুৎ বিল, যন্ত্রের দক্ষতা এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ে সরাসরি কাজ হয়। ফলে যারা কারখানা, ভবন পরিচালনা বা শিল্পকারখানার কার্যক্রমের কাছাকাছি থাকতে চান, তাদের জন্য এটি গুরুত্ব দিয়ে দেখার মতো ক্ষেত্র।

প্রকৌশল না পড়েও গ্রিন টেক খাতে জায়গা আছে

এখানেই কার্বন হিসাবের কথা আসে। একটি প্রতিষ্ঠানের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কোথা থেকে আসছে, কীভাবে হিসাব করা হয়েছে, কোন তথ্য ব্যবহার হয়েছে—এসব এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কাজের অংশ।

পরিবেশবিজ্ঞান পটভূমি অবশ্যই কাজে আসে। কিন্তু ব্যবসা, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি বা তথ্য বিশ্লেষণের পটভূমি থেকেও এখানে যাওয়া যায়। স্কোপ ১, স্কোপ ২ এবং স্কোপ ৩ বোঝা দরকার। এরপর কার্যক্রমের তথ্য, নিঃসরণ গুণক, হিসাবের অনুমান এবং নথিপত্র আসে।

এই কাজের একটি বড় অংশ আসলে ভালো হিসাব এবং ভালো নথি সংরক্ষণ।

তবে কার্বন হিসাবের নিয়ম এখনও বদলাচ্ছে। ২০২৬ সালে গ্রিনহাউস গ্যাস প্রোটোকল এবং আন্তর্জাতিক মান সংস্থা করপোরেট গ্রিনহাউস গ্যাস হিসাবের মান আরও সমন্বিত করার কাজ করছে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী সমন্বিত মান ২০২৮ সালের দিকে আসতে পারে।

সুতরাং দুই বছর আগের প্রশিক্ষণ স্লাইডকে চূড়ান্ত সত্য ধরে রাখা ঠিক হবে না।

আরও পড়ুন: কোন Career আপনার জন্য মানানসই: আগ্রহ, দক্ষতা ও জীবনযাপন মিলিয়ে দেখুন

তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা থাকলে আলাদা ‘গ্রিন ডিগ্রি’ দরকার নাও হতে পারে

তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা থাকলে আলাদা ‘গ্রিন ডিগ্রি’ দরকার নাও হতে পারে

জ্বালানি ব্যবহার, নিঃসরণ, বর্জ্য বা সরবরাহব্যবস্থার তথ্য—সবই শেষ পর্যন্ত তথ্য। তাই কম্পিউটার বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান বা তথ্যবিজ্ঞান পটভূমির জন্যও গ্রিন টেক খাতে ঢোকার পথ আছে। স্প্রেডশিট জানলে শুরু করা যায়। এরপর কাজ অনুযায়ী এসকিউএল, পাইথন, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বা ব্যবসায়িক তথ্য বিশ্লেষণের সফটওয়্যার দরকার হতে পারে।

এখানে সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো সব সফটওয়্যার একসঙ্গে শেখা।

একটি চাকরির বিজ্ঞাপনে পাইথন আছে দেখে পাইথন। অন্যটিতে ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা আছে দেখে সেটি। এরপর পাওয়ার বিআই, এসকিউএল, ট্যাবলো—শেষ পর্যন্ত কোন দক্ষতা কোন কাজের জন্য শিখছেন, সেটিই আর পরিষ্কার থাকে না।

এর চেয়ে ১০–১৫টি কাছাকাছি চাকরির বিজ্ঞাপন খুলে দেখা ভালো।

একই ধরনের কাজে যদি এক্সেল ও এসকিউএল বারবার আসে, আগে সেগুলো শিখুন। ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা যদি শুধু বিশেষায়িত কাজে আসে, পরে শেখা যাবে। পেশা পরিকল্পনার এই অংশটি খুব সাধারণ শোনায়, কিন্তু অনেক অপ্রয়োজনীয় কোর্স এখানেই বাদ পড়ে যায়।

চক্রাকার অর্থনীতির বড় কর্মসংস্থান সংখ্যা একটু সাবধানে পড়তে হবে

চক্রাকার অর্থনীতিতে মেরামত, পুনর্ব্যবহার, পুনঃব্যবহার, পুনঃউৎপাদন এবং বর্জ্য কমানোর মতো কাজ আসে। ২০২৫ সালের একটি বৈশ্বিক গবেষণায় এই ধরনের কর্মকাণ্ডে ১২ কোটি ১০ লাখ থেকে ১৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের হিসাব এসেছে। সংখ্যাটা শুনতে বিশাল।

কিন্তু এটি উচ্চদক্ষতার গ্রিন টেক চাকরির সংখ্যা নয়। এই কর্মশক্তির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাই “চক্রাকার অর্থনীতিতে ১৪ কোটি প্রযুক্তি চাকরি” ধরনের শিরোনাম বিভ্রান্তিকর হবে।

তারপরও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উপকরণ, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, সম্পদ দক্ষতা এবং টেকসই ক্রয়ব্যবস্থার মতো পেশার সঙ্গে এই ক্ষেত্রের সরাসরি সম্পর্ক আছে। বস্ত্র, শিল্প প্রকৌশল, রসায়ন বা সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে যারা পড়েছেন, তাদের জন্য এখানে সুযোগ থাকতে পারে।

নিজের ডিগ্রির কাছাকাছি পথ আগে দেখলে সুবিধা

পেশা পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তনের একটা শেখার খরচ আছে। ইইই বা বৈদ্যুতিক প্রকৌশল হলে সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিড, সংরক্ষণব্যবস্থা বা বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং কাছাকাছি। যান্ত্রিক বা অটোমোটিভ হলে বৈদ্যুতিক গাড়ি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কিংবা জ্বালানি দক্ষতা।

পুরকৌশল বা স্থাপত্য হলে ভবনের জ্বালানি কার্যকারিতা। কম্পিউটার বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান বা তথ্য বিশ্লেষণের পটভূমি থাকলে জ্বালানি তথ্য বিশ্লেষণ। পরিবেশবিজ্ঞান বা রসায়ন হলে কার্বন হিসাব কিংবা পরিবেশ ব্যবস্থাপনা।

ব্যবসা বা অর্থনীতি হলে টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদন, প্রকল্প অর্থায়ন বা কার্বন তথ্য। ডিপ্লোমা বা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পটভূমি থাকলে স্থাপন, বৈদ্যুতিক কাজ এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ।

এগুলো কোনো নিয়ম নয়। বরং শুরুর মানচিত্র। একজন ইলেকট্রিশিয়ান অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে সৌর পিভিতে যেতে পারেন। কিন্তু নতুন মান, সনদ বা মাঠপর্যায়ের অনুশীলন প্রয়োজন হতে পারে। এখানে “স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা” কথাটি সত্য, কিন্তু পরিবর্তন সব সময় সহজ নয়।

বাংলাদেশ আর ভারতের বাজার একইভাবে দেখলে ভুল হবে

বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পখাতের জ্বালানি দক্ষতা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং কার্বন-সংশ্লিষ্ট কাজ এখন বেশি বাস্তব ক্ষেত্র বলে মনে হয়। এর পেছনে নীতিগত সংকেত আছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য আছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য নেট মিটারিং কাঠামো আছে। রপ্তানিমুখী শিল্পেও কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ বাড়ছে।

তবে এখানেও চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

“গ্রিন টেকনোলজি বিশেষজ্ঞ” লিখে চাকরি খোঁজার চেয়ে সৌর প্রকৌশলী, জ্বালানি প্রকৌশলী, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ-সামাজিক-সুশাসন, কার্বন, পরিবেশ বা বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী—এভাবে আলাদা করে খোঁজা বেশি কাজে দিতে পারে।

ভারতের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা।

২০২৪ সালে সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর্মসংস্থান ছিল প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার। সৌর পিভি ও জলবিদ্যুৎ এর বড় অংশ।

আর আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পথও তুলনামূলক পরিষ্কার।

ভারতের নতুন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ সময়ের জন্য অনুমোদিত। সেখানে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, বৃত্তি, গবেষণা সহায়তা এবং শিক্ষানবিশির মতো পথ রাখা হয়েছে।

সৌর পিভি স্থাপনকারী এবং সৌর ফটোভোলটাইক কারিগরের মতো স্বীকৃত বৃত্তিমূলক যোগ্যতাও পাওয়া যায়। ভারতের পাঠকের জন্য এটি একটি বাড়তি সুবিধা। বেসরকারি কোর্স প্রদানকারীর প্রচারপত্রের বাইরে গিয়ে স্বীকৃত যোগ্যতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ মিলিয়ে দেখা যায়।

গ্রিন টেক ক্যারিয়ার নিয়ে সবচেয়ে কাজে লাগে চাকরির বিজ্ঞাপন

এতগুলো ক্ষেত্রের মধ্যে কোনটি বেছে নেবেন, তার উত্তর কোনো বৈশ্বিক প্রতিবেদন দেবে না। চাকরির বিজ্ঞাপন দিতে পারে। যে কাজে যেতে চান, সেই ধরনের কয়েকটি সাম্প্রতিক চাকরির বিজ্ঞাপন খুলুন। পদের নাম আলাদা হলেও কাজের বিবরণ পড়ুন।

  • কোন দক্ষতা বারবার এসেছে?
  • কোন যোগ্যতা বাধ্যতামূলক?
  • কোনটি অগ্রাধিকারযোগ্য?
  • অভিজ্ঞতার জায়গায় কী চাওয়া হচ্ছে?

তারপর নিজের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।

কোর্স আসবে এরপর।

একটি সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য প্রাথমিক ব্যবস্থা-আকার নির্ধারণের নমুনা কাজে লাগতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণের কাজ হলে জ্বালানি ব্যবহারের তথ্যচিত্র বা বিশ্লেষণী প্যানেল। কার্বন হিসাব হলে নমুনা নিঃসরণ তালিকা।

এরপর শিক্ষানবিশি বা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। জ্বালানি খাতের কর্মশক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও প্রশিক্ষণের প্রাপ্যতা এবং কর্মশক্তি পরিকল্পনার দুর্বলতার কথা এসেছে। তাই প্রশিক্ষণের বাজার আর চাকরির বাজার একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

গ্রিন টেক ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা করার সময় সবচেয়ে বড় ভুল সম্ভবত “গ্রিন” শব্দটির পেছনে দৌড়ানো। চাকরিটা কী, সেটি আগে বুঝুন। তারপর দক্ষতা শিখুন। এই ক্রমটি উল্টো হলে সনদ বাড়তে পারে, কিন্তু পেশার দিকনির্দেশনা খুব একটা পরিষ্কার হয় না।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

গ্রিন টেক ক্যারিয়ার শুরু করতে কি প্রকৌশল ডিগ্রি দরকার?

সব ক্ষেত্রে নয়। সৌরবিদ্যুৎ, গ্রিড, ব্যাটারি বা বৈদ্যুতিক গাড়ির কিছু কাজে প্রকৌশল বা কারিগরি পটভূমি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কার্বন হিসাব, টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদন, জ্বালানি তথ্য বিশ্লেষণ বা প্রকল্প অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে ব্যবসা, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি, পরিবেশবিজ্ঞান বা তথ্য বিশ্লেষণের পটভূমি থেকেও আসা যায়।

বাংলাদেশে কোন গ্রিন টেক ক্যারিয়ারগুলো আগে দেখা যেতে পারে?

বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, শিল্পখাতের জ্বালানি দক্ষতা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্বন বা টেকসই উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণের কাজ আগে দেখা যেতে পারে। তবে শুধু খাতের প্রবৃদ্ধি দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সাম্প্রতিক চাকরির বিজ্ঞাপনে কী ধরনের দক্ষতা চাওয়া হচ্ছে, সেটি দেখা বেশি কার্যকর।

গ্রিন টেকনোলজি খাতে চাকরির জন্য কোন দক্ষতাগুলো বেশি দরকার?

কাজের ধরন অনুযায়ী দক্ষতা বদলে যায়। বৈদ্যুতিক ও সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট কাজে বিদ্যুৎব্যবস্থা, সুরক্ষা, ইনভার্টার ও ত্রুটি শনাক্তকরণ দরকার হতে পারে। তথ্যভিত্তিক কাজে স্প্রেডশিট, এসকিউএল বা তথ্য বিশ্লেষণের দক্ষতা কাজে লাগে। কার্বন হিসাবের ক্ষেত্রে নিঃসরণের তথ্য, হিসাবের পদ্ধতি এবং নথিপত্র বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রিন টেক ক্যারিয়ারের জন্য কি অনেক সার্টিফিকেট নেওয়া দরকার?

সার্টিফিকেটের সংখ্যার চেয়ে সেটি নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে কতটা সম্পর্কিত, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগে যে ধরনের চাকরিতে আবেদন করতে চান, সেই ধরনের কয়েকটি সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপন দেখুন। তারপর যে দক্ষতার ঘাটতি আছে, সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, প্রকল্প, শিক্ষানবিশি বা মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বেছে নেওয়া ভালো।

তথ্য বিশ্লেষণের পটভূমি থাকলে গ্রিন টেক খাতে কী ধরনের কাজ করা যায়?

জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ, বর্জ্য, সরবরাহব্যবস্থা বা ভবনের কার্যকারিতা-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের কাজে সুযোগ থাকতে পারে। কাজ অনুযায়ী স্প্রেডশিট, এসকিউএল, পাইথন, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বা ব্যবসায়িক তথ্য বিশ্লেষণের সফটওয়্যার দরকার হতে পারে। সব টুল একসঙ্গে শেখার বদলে নির্দিষ্ট চাকরির চাহিদা দেখে শেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

সর্বশেষ