ইফতারে স্বাস্থ্যকর ১০ ফলের শরবত: পানিশূন্যতা কমিয়ে শরীর রাখবে সতেজ ও এনার্জিতে ভরপুর

সর্বাধিক আলোচিত

সারাদিন রোজা রাখার পর শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকার ফলে আমাদের শরীর কেবল পানিই হারায় না, বরং হারায় প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট এবং খনিজ উপাদান। এই পানিশূন্যতা দূর করতে এবং তাৎক্ষণিক এনার্জি ফিরে পেতে তাজা ফলের শরবত চমৎকার কাজ করে। ইফতারে স্বাস্থ্যকর ফলের শরবত পান করার অভ্যাস শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ রাখে এবং কোষগুলোতে পুষ্টির যোগান দেয়। কৃত্রিম রং এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত বোতলজাত পানীয় এড়িয়ে তাজা ফলের জুস বেছে নেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকরী একটি উপায়। এটি শুধু তৃষ্ণাই মেটায় না, বরং সারাদিনের ক্লান্ত শরীরকে পরবর্তী দিনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

রমজানে পানিশূন্যতার কারণ ও এর ক্ষতিকর দিক

আমাদের শরীরের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই পানি। রমজান মাসে দীর্ঘক্ষণ পানি পান না করার কারণে এই ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে গরমের দিনে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম বেরিয়ে যায়। ইফতারের সময় শুধু সাধারণ পানি পান করলে তৃষ্ণা মেটে ঠিকই, কিন্তু খনিজ লবণের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হয় না। পানিশূন্যতার কারণে মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেশিতে টান লাগা এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ইফতারের খাদ্যতালিকায় এমন পানীয় রাখা প্রয়োজন যা একই সাথে শরীরকে হাইড্রেট করবে এবং পুষ্টির অভাব দূর করবে।

বাজারের কেনা শরবতের বদলে কেন তাজা ফলের জুস?

ইফতারের আয়োজনে অনেকেই সময় বাঁচাতে বাজারের কেনা প্যাকেটজাত জুস বা পাউডার শরবত ব্যবহার করেন। এই ধরনের পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম চিনি, প্রিজারভেটিভ এবং ক্ষতিকর ফুড কালার মেশানো থাকে। এগুলো সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয় এবং কিছুক্ষণ পরেই শরীর আরও বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে তাজা ফলের শরবতে থাকে প্রাকৃতিক ফ্রুক্টোজ যা ধীরে ধীরে রক্তে মিশে দীর্ঘক্ষণ এনার্জি ধরে রাখে। এতে থাকা প্রাকৃতিক ফাইবার হজমে সহায়তা করে এবং পেটের সমস্যা দূরে রাখে।

পানিশূন্যতা দূর করতে সেরা ১০ ফলের শরবতের তালিকা

প্রকৃতি আমাদের এমন অনেক ফল দিয়েছে যা শরীরে পানির ঘাটতি মেটাতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। নিচে এমন ১০টি শরবতের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো যা আপনার ইফতারের টেবিলকে করবে আরও স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু। পুষ্টিগুণ, কার্যকারিতা এবং ক্যালরির বিস্তারিত তথ্য জেনে আপনি আপনার পছন্দমতো পানীয় বেছে নিতে পারবেন।

১. তরমুজের সতেজ শরবত

তরমুজে প্রায় ৯২ শতাংশ পানি থাকে। এটি শরীরকে দ্রুত ঠান্ডা করতে এবং পানিশূন্যতা রোধ করতে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় একটি ফল। তরমুজে থাকা লাইকোপেন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখতে দারুণ কাজ করে। ইফতারে তরমুজের শরবত পান করলে সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়। তরমুজের প্রাকৃতিক মিষ্টি স্বাদের কারণে এতে বাড়তি কোনো চিনি মেশানোর প্রয়োজন পড়ে না। এটি তৈরি করাও খুব সহজ। তরমুজের টুকরো বীজ ফেলে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিলেই তৈরি হয়ে যায় চমৎকার এই পানীয়। স্বাদ বাড়াতে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস এবং পুদিনা পাতা যোগ করতে পারেন।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, লাইকোপেন এবং ম্যাগনেসিয়াম দ্রুত পানিশূন্যতা দূর করে, পেশির ক্লান্তি কমায় এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে প্রতি ১০০ গ্রামে মাত্র ৩০ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এটি খুব দ্রুত হজম হয় এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: তরমুজ প্রাকৃতিকভাবেই অনেক মিষ্টি তাই এতে বাড়তি চিনি মেশালে পুষ্টিগুণ নষ্ট হতে পারে এবং ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে।

২. বেলের শরবত

সারাদিন রোজা রাখার পর পেট ঠান্ডা রাখতে এবং হজমশক্তি বাড়াতে বেলের শরবত একটি আদর্শ পানীয়। বেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার যা পেটের যেকোনো সমস্যা সমাধানে কার্যকরী। রমজানে অনেকেরই কোষ্ঠকাঠিন্য বা অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দেয়। নিয়মিত বেলের শরবত পান করলে এই সমস্যাগুলো থেকে খুব সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বেল ফাটিয়ে ভেতরের শাঁস বের করে সামান্য পানির সাথে চটকে নিতে হয়। এরপর ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিলেই শরবত তৈরি। চাইলে সামান্য গুড় বা মধু মিশিয়ে এর পুষ্টিগুণ আরও বাড়ানো যায়।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
ডায়েটারি ফাইবার, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন এবং ভিটামিন সি হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটায়, পেটের আলসার প্রতিরোধ করে এবং শরীর ঠান্ডা রাখে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১৩৭ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এটি দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পান করার পর দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয়।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: বেলের বিচি ও আঁশ ঠিকমতো ছেঁকে না নিলে শরবত পান করার সময় অস্বস্তি লাগতে পারে এবং স্বাদ তেতো হতে পারে।

৩. কাঁচা আমের জুস

গরমের দিনে রোজা শেষে কাঁচা আমের টকমিষ্টি শরবত শরীরে এনে দেয় এক প্রশান্তির পরশ। কাঁচা আমে থাকা ভিটামিন সি এবং পেকটিন হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে দারুণ কার্যকরী। ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যে লবণ বেরিয়ে যায় কাঁচা আমের জুস তা খুব দ্রুত পূরণ করতে পারে। কাঁচা আম সেদ্ধ করে বা পুড়িয়ে এর ভেতরের শাঁস বের করে নিতে হয়। এরপর ব্লেন্ডারে আমের শাঁস, সামান্য বিট লবণ, কাঁচা মরিচ, চিনি বা মধু এবং পানি দিয়ে ব্লেন্ড করে নিলেই তৈরি হয়ে যায় দারুণ স্বাদের এই পানীয়।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
প্রচুর ভিটামিন সি, পেকটিন, আয়রন এবং নিয়াসিন হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং লিভার সুস্থ রাখে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৪৩ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এটি ঘামের সাথে বেরিয়ে যাওয়া লবণের ঘাটতি খুব দ্রুত পূরণ করতে পারে এবং রুচি বাড়ায়।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: যাদের গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির তীব্র সমস্যা আছে তাদের ইফতারের শুরুতেই খালি পেটে অতিরিক্ত টক জাতীয় পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত।

healthy fruit juice for iftar

৪. লেবু ও পুদিনা পাতার পানীয়

লেবু এবং পুদিনা পাতার মিশ্রণ শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ করে তোলে এবং মুখের অরুচি ভাব দূর করে। পুদিনা পাতায় থাকা মেনথল পাকস্থলীকে ঠান্ডা রাখে এবং হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। অন্যদিকে লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড শরীরের দূষিত পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে। এক গ্লাস পানিতে একটি পাতিলেবুর রস, কয়েক টুকরো তাজা পুদিনা পাতা, সামান্য বিট লবণ এবং মধু মিশিয়ে খুব সহজেই এই পানীয় তৈরি করা যায়। এটি ইফতারের জন্য অন্যতম সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিকর একটি শরবত।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
ভিটামিন সি, সাইট্রিক অ্যাসিড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং মেনথল শ্বাস-প্রশ্বাস সতেজ করে, বমি ভাব দূর করে এবং হজমে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে প্রতি গ্লাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এটি তৈরি করা সবচেয়ে সহজ, সময় বাঁচে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য দারুণ উপকারী।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: পুদিনা পাতা খুব বেশি ব্লেন্ড করলে পানীয়টির স্বাদ কিছুটা কষটে বা তেতো হয়ে যেতে পারে তাই পাতা আস্ত বা হালকা থেঁতো করে ব্যবহার করা ভালো।

৫. ডাবের পানি ও মিশ্র ফলের শরবত

ডাবের পানিকে বলা হয় প্রাকৃতিক স্যালাইন। এতে থাকা পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম শরীরের কোষগুলোতে সরাসরি পুষ্টি পৌঁছে দেয়। শুধু ডাবের পানি পান করাই অনেক উপকারী তবে এর সাথে অন্যান্য ফল মিশিয়ে একটি দারুণ শরবত তৈরি করা যায়। ডাবের পানির সাথে ছোট ছোট করে কাটা আপেল, আঙুর, বেদানা এবং ডাবের নরম শাঁস মিশিয়ে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে পান করলে এর স্বাদ অসাধারণ লাগে। এটি শরীরে ইলেকট্রোলাইটের চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা বাড়ায়।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
প্রাকৃতিক পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং সাইটোকাইনিন শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং পেশির দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে প্রতি ১০০ মিলিলিটারে মাত্র ১৯ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এতে কোনো ক্ষতিকর ফ্যাট নেই এবং এটি ত্বক সতেজ ও উজ্জ্বল রাখতে সরাসরি কাজ করে।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: ডাব কাটার পর পানি বেশিক্ষণ খোলা অবস্থায় ফেলে না রেখে তাজা অবস্থাতেই পান করা সবচেয়ে ভালো।

৬. আনার বা ডালিমের জুস

আনারের রস রক্তশূন্যতা দূর করতে এবং শরীরে নতুন এনার্জি তৈরি করতে দারুণ কার্যকর একটি পানীয়। এতে থাকা আয়রন এবং ফলিক অ্যাসিড রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। সারাদিন রোজা রাখার পর যাদের খুব বেশি দুর্বল বা মাথা ঘোরানোর সমস্যা হয় তাদের জন্য ডালিমের জুস একটি আদর্শ নির্বাচন হতে পারে। ডালিমের দানা ছাড়িয়ে ব্লেন্ডারে হালকা করে ব্লেন্ড করে নিতে হবে। এরপর ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে রস আলাদা করে পান করতে হয়। এর শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হার্ট সুস্থ রাখে।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন কে এবং শক্তিশালী পলিফেনল রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়ায়, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং হার্টের ব্লক প্রতিরোধ করে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৮৩ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এর শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ক্ষতিকর টক্সিন বা দূষিত পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: ব্লেন্ড করার সময় বিচিগুলো যাতে বেশি গুঁড়ো না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন নতুবা জুস তেতো হতে পারে এবং পানের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে।

৭. পাকা পেঁপের স্মুদি

পাকা পেঁপে দিয়ে তৈরি স্মুদি ইফতারে একটি স্বাস্থ্যকর, ঘন ও পুষ্টিকর পানীয় হতে পারে। পেঁপেতে থাকা প্যাপেইন এনজাইম প্রোটিন জাতীয় খাবার খুব দ্রুত হজম করতে সাহায্য করে। ইফতারে অনেক সময় ভাজাপোড়া বা ভারী খাবার খাওয়া হয় যার কারণে বদহজম হতে পারে। পেঁপের স্মুদি এই সমস্যা রোধে সাহায্য করে। পাকা পেঁপে টুকরো করে কেটে সামান্য দুধ বা দইয়ের সাথে ব্লেন্ড করে এই স্মুদি তৈরি করা যায়। এটি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং শরীরে ভিটামিন এ এর চাহিদা পূরণ করে।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
প্যাপেইন এনজাইম, ডায়েটারি ফাইবার, ভিটামিন এ এবং ফোলেট প্রোটিন জাতীয় খাবার দ্রুত হজম করতে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৪৩ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এটি পাকস্থলীর জ্বালাপোড়া কমায়, কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে এবং দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: এটি অন্যান্য শরবতের তুলনায় কিছুটা ভারী পানীয় তাই ইফতারের শুরুতে পরিমিত পরিমাণে পান করা ভালো।

৮. সতেজ মাল্টার জুস

মাল্টাতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে যা সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দেয়। সাইট্রাস জাতীয় এই ফলটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে দারুণ কাজ করে। মাল্টার জুস শরীরে পানির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখে। এটি তৈরি করতে জুসার বা হাত দিয়ে চেপে মাল্টার রস বের করে নিতে হয়। এর সাথে সামান্য বিট লবণ এবং গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে নিলে স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি পান করার পর দারুণ সতেজ অনুভূতি আসে।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
ভিটামিন সি, ফ্ল্যাভোনয়েড, থায়ামিন এবং পটাসিয়াম ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে, ত্বকের বলিরেখা কমায় এবং সর্দি বা কাশি থেকে রক্ষা করে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৪৭ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এটি তাৎক্ষণিক এনার্জি দেয় এবং শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমাতে দারুণভাবে কাজ করে।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: রস বের করার পর বেশিক্ষণ ফেলে রাখলে বাতাসের সংস্পর্শে এসে এর স্বাদ তেতো হয়ে যায় তাই সাথে সাথে পান করা উচিত।

৯. বাঙ্গির শরবত

অনেকে বাঙ্গি খেতে খুব একটা পছন্দ না করলেও এর শরবত শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং পানিশূন্যতা দূর করতে চমৎকার কাজ করে। বাঙ্গিতে ক্যালরি খুব কম থাকে কিন্তু পানির পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। যারা রমজান মাসে নিজেদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তাদের জন্য এটি সেরা পছন্দ হতে পারে। বাঙ্গির ভেতরের শাঁস ব্লেন্ডারে দিয়ে সামান্য পানি এবং চিনি বা জিরো ক্যালরি সুইটনার দিয়ে ব্লেন্ড করে শরবত তৈরি করা যায়। এটি শরীর গভীরভাবে হাইড্রেট করে এবং পেশির টান লাগা রোধ করে।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
বিটা ক্যারোটিন, ফোলিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি এবং প্রচুর পানি শরীর গভীরভাবে হাইড্রেট করে, পেশির টান লাগা রোধ করে এবং কোলাজেন তৈরি করে প্রতি ১০০ গ্রামে মাত্র ৩৪ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এতে ক্যালরি খুবই কম থাকে তাই যারা ওজন কমাতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার পানীয়।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: বাঙ্গির নিজস্ব স্বাদ কিছুটা কম থাকে তাই স্বাদ বাড়াতে সামান্য বিট লবণ, পুদিনা পাতা বা কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মেশাতে পারেন।

১০. আপেল ও গাজরের মিশ্র জুস

আপেল ও গাজরের মিশ্রণে তৈরি জুস ফাইবার ও ভিটামিনে ভরপুর একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর পানীয়। আপেলে থাকা পেকটিন এবং গাজরে থাকা বিটা ক্যারোটিন একসাথে মিলে লিভার পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এই জুসটি শরীরে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে এবং দীর্ঘক্ষণ কর্মক্ষম রাখে। একটি আপেল এবং একটি গাজর ছোট ছোট টুকরো করে কেটে সামান্য পানি দিয়ে জুসারে বা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে ছেঁকে নিলেই এই স্বাস্থ্যকর পানীয় তৈরি হয়ে যায়।

প্রধান পুষ্টি উপাদান স্বাস্থ্য উপকারিতা ক্যালরি মাত্রা
ভিটামিন এ, পেকটিন, বিটা ক্যারোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, কোলেস্টেরল কমায় এবং লিভারের দূষিত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ক্যালরি

  • আমাদের যা ভালো লেগেছে: এই পানীয়টি শরীরে পুষ্টির একটি বড় ঘাটতি পূরণ করে এবং প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে।
  • যে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন: জুস করার সময় খোসা ফেলে না দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ব্লেন্ড করলে সবচেয়ে বেশি পুষ্টি এবং ফাইবার পাওয়া যায়।

শরবত তৈরির ক্ষেত্রে কিছু স্বাস্থ্যকর নিয়ম

ইফতারে শরবত পানের সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে এটি তৈরির সময় কিছু নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। প্রথমত শরবতে রিফাইন্ড বা সাদা চিনি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এর পরিবর্তে মধু, আখের গুড় অথবা ফলের নিজস্ব মিষ্টি স্বাদ উপভোগ করার চেষ্টা করুন। দ্বিতীয়ত ফল ব্লেন্ড করার পর বারবার ছেঁকে ফেলার অভ্যাস বাদ দিন। ছেঁকে ফেললে ফলের প্রাকৃতিক ফাইবার বা আঁশ নষ্ট হয়ে যায় যা হজমের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সবশেষে শরবত খুব বেশি ঠান্ডা করে পান করবেন না। সারাদিন খালি পেটে থাকার পর অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি বা বরফ দেওয়া পানীয় পাকস্থলীর তাপমাত্রা হঠাৎ কমিয়ে দেয় যা হজমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। সাধারণ তাপমাত্রার চেয়ে সামান্য ঠান্ডা পানীয় ইফতারের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।

শেষ কথা

তাজা ফলের শরবত ইফতারের টেবিলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হওয়া উচিত। ইফতারে স্বাস্থ্যকর ফলের শরবত পান করার অভ্যাস আপনার পুরো রমজান মাসকে সতেজ এবং রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করবে। প্রতিদিন একই ধরনের শরবত পান না করে আপনার শারীরিক চাহিদা ও স্বাদের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন শরবত তৈরি করতে পারেন। এতে স্বাদেও বৈচিত্র্য আসবে এবং শরীর সব ধরনের পুষ্টি উপাদান সমানভাবে পাবে।

সর্বশেষ