গত পাঁচ দশক ধরে বিশ্বজুড়ে হৃদরোগের (Heart Disease) প্রধান কারণ হিসেবে আমরা কেবল ‘কোলেস্টেরল’-কেই একমাত্র শত্রু মনে করে এসেছি। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, শত্রু কেবল একটি নয়। আনন্দবাজার পত্রিকার সাম্প্রতিক রিপোর্ট, ‘দ্য ল্যানসেট’ এবং আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির ২০২৪-২৫ সালের যুগান্তকারী গবেষণাগুলো বলছে—সুস্থ ও ফিট মানুষের হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ অনেক ক্ষেত্রেই চর্বি নয়, বরং ‘প্রদাহ’ বা Inflammation।
গবেষকরা রক্তে মিশে থাকা ‘সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন’ (CRP)-কে এখন হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম শক্তিশালী পূর্বাভাসক বা ‘প্রেডিক্টর’ হিসেবে গণ্য করছেন। এই প্রতিবেদনে আমরা জানব কেন সুস্থ মানুষেরও হার্ট অ্যাটাক হয়, এই নতুন ‘ভিলেন’ আসলে কী এবং কীভাবে আপনি নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন।
পর্ব ১: হার্ট অ্যাটাক আসলে কীভাবে হয়? (ভুল ধারণা বনাম বাস্তবতা)
বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, ধমনীতে চর্বি জমতে জমতে নালী বন্ধ হয়ে যায়, আর তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়। একে বলা হয় ‘প্লালাম্বিং সমস্যা’। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ হার্ট অ্যাটাক ঘটে ৫০% বা তার কম ব্লক থাকা ধমনীতে।
আসল মেকানিজম (Plaque Rupture Theory): ধমনীর গায়ে চর্বি জমলে তাকে ‘প্লাক’ বলে। এই প্লাক দুই ধরণের হয়:
- স্টেবল প্লাক (Stable Plaque): এটি শক্ত, পাথরের মতো। এটি রক্তনালী সরু করে বুকে ব্যথা দেয়, কিন্তু চট করে ফাটে না।
- আনস্টেবল প্লাক (Unstable Plaque): এটি নরম এবং এর ভেতরে প্রচুর প্রদাহ থাকে। এটি বাইরে থেকে বোঝা যায় না। রক্তে CRP বেশি থাকলে এই প্লাকের ওপরের আবরণ পাতলা হয়ে ফেটে যায়। ফেটে গেলেই সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে হার্ট অ্যাটাক ঘটায়।
সহজ উপমা: কোলেস্টেরল হলো ‘বারুদ’, আর ইনফ্ল্যামেশন বা CRP হলো ‘দিয়াশলাই’। বারুদ জমলে সমস্যা নেই, যতক্ষণ না কেউ তাতে আগুন দিচ্ছে। CRP সেই আগুনের কাজটি করে।
পর্ব ২: পুরনো বনাম নতুন চিকিৎসা দর্শন

নিচের ছকটি দেখলেই বোঝা যাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কতটা পরিবর্তন এসেছে:
টেবিল ১: হার্ট অ্যাটাকের কারণ—পুরনো বনাম নতুন ধারণা
| বিষয় | প্রচলিত ধারণা (Cholesterol Era) | আধুনিক ধারণা (Inflammation Era) |
|---|---|---|
| মূল সমস্যা | ধমনীতে চর্বি জমে রাস্তা বন্ধ হওয়া। | ধমনীর দেওয়ালে প্রদাহ বা জ্বালা তৈরি হওয়া। |
| ঝুঁকির কারণ | শুধুই উচ্চ এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল। | উচ্চ hs-CRP এবং উচ্চ কোলেস্টেরল (উভয়ই)। |
| ঝুঁকিতে কারা? | যারা তেল-চর্বি বেশি খান, মেদবহুল ব্যক্তি। | যে কেউ (এমনকি স্লিম ও ফিট ব্যক্তিরাও, যদি রক্তে প্রদাহ থাকে)। |
| ডায়াগনস্টিক টেস্ট | লিপিড প্রোফাইল (Lipid Profile)। | লিপিড প্রোফাইল + hs-CRP টেস্ট। |
| চিকিৎসা | চর্বি কমানোর ঔষধ (স্ট্যাটিন)। | প্রদাহ কমানোর ঔষধ + স্ট্যাটিন + জীবনযাত্রা পরিবর্তন। |
পর্ব ৩: ঝুঁকি নির্ণয় (আপনার অবস্থান কোথায়?)
সাধারণ CRP টেস্ট এবং হার্টের জন্য করা hs-CRP (High-Sensitivity CRP) টেস্ট এক নয়। হার্টের সূক্ষ্ম প্রদাহ মাপতে hs-CRP প্রয়োজন।
টেবিল ২: hs-CRP মাত্রা এবং ঝুঁকির তালিকা (গাইডলাইন)
| hs-CRP মাত্রা (mg/L) | ঝুঁকির ধরণ | ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| ১.০-এর নিচে (<1.0) | কম ঝুঁকি | আপনার ধমনীতে প্রদাহ খুবই কম। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ন্যূনতম। |
| ১.০ থেকে ৩.০ | মাঝারি ঝুঁকি | আপনি সাধারণ মানুষের মতোই ঝুঁকিতে আছেন। জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন প্রয়োজন। |
| ৩.০-এর উপরে (>3.0) | উচ্চ ঝুঁকি (Red Flag) | আপনার শরীরে ‘আগুন’ জ্বলছে। কোলেস্টেরল কম থাকলেও আপনার হার্ট অ্যাটাকের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। |
| ১০.০-এর উপরে | অন্যান্য কারণ | এটি সাধারণত হার্টের সমস্যা নয়; শরীরে কোনো ইনফেকশন বা আথ্রাইটিস থাকলে এমন হয়। |
পর্ব ৪: বাঙালি ও দক্ষিণ এশীয়দের জন্য বিশেষ সতর্কতা
আমাদের এই অঞ্চলে হার্ট অ্যাটাকের হার পশ্চিমাদের চেয়ে অনেক বেশি এবং অল্প বয়সে হচ্ছে। এর কারণগুলো হলো:
- জিনগত গঠন: আমাদের ধমনী সরু এবং রক্তে ‘Lp(a)’ নামক বংশগত আঠালো কোলেস্টেরল বেশি।
- খাদ্যাভ্যাস: ভাত ও শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খাওয়ায় ইনসুলিন বাড়ে, যা লিভার থেকে CRP তৈরি বাড়ায়।
- দূষণ: ঢাকার মতো শহরের বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা (PM2.5) নিঃশ্বাসের সাথে রক্তে মিশে ধমনীতে প্রদাহ তৈরি করে।
- পেটের চর্বি: বাঙালিদের শরীরের তুলনায় পেটে চর্বি বা ভুঁড়ি বেশি হয়। এই পেটের চর্বি একটি ‘বিষাক্ত কারখানা’ যা অনবরত প্রদাহজনক কেমিক্যাল নিঃসরণ করে।
পর্ব ৫: কেস স্টাডি—সুস্থ বনাম অসুস্থ
| চরিত্র | জীবনযাপন ও রিপোর্ট | ফলাফল | কেন এমন হলো? |
|---|---|---|---|
| মিস্টার রাজিব (ফিট কিন্তু মৃত) | বয়স ৪৫, জিমে যান, স্লিম। কোলেস্টেরল নরমাল। কিন্তু ধূমপান করেন ও স্ট্রেসে থাকেন। | জিমে ব্যায়াম করার সময় হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক। | তার রক্তে hs-CRP ছিল ৫.৫ mg/L। ধমনীর প্লাক ছোট হলেও প্রদাহের কারণে সেটি ফেটে গেছে। |
| মিস্টার কামাল (মোটা কিন্তু সুস্থ) | বয়স ৫০, ওজন বেশি, কোলেস্টেরল বর্ডারলাইন। কিন্তু হাসিখুশি, সুষম খাবার খান। | ১০ বছরেও কোনো সমস্যা হয়নি। | তার hs-CRP ছিল ০.৮ mg/L। তার প্লাকগুলো ‘স্টেবল’। প্রদাহ না থাকায় সেগুলো ফাটেনি। |
পর্ব ৬: সমাধান ও করণীয় (অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গাইড)

ঔষধের পাশাপাশি খাবার ও জীবনযাত্রা হলো প্রদাহ কমানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
টেবিল ৩: হার্ট সুরক্ষায় আপনার করণীয় চেকলিস্ট
| ক্ষেত্র | করণীয় | বৈজ্ঞানিক কারণ |
|---|---|---|
| ডায়েট | চিনি, সাদা আটা ও সয়াবিন তেল বর্জন। অলিভ অয়েল/সরিষার তেল ও মাছ গ্রহণ। | চিনি ও ওমেগা-৬ তেল (সয়াবিন) শরীরে প্রদাহ বাড়ায়। ওমেগা-৩ (মাছ) প্রদাহ কমায়। |
| মশলা | রান্নায় কাঁচা হলুদ ও রসুন ব্যবহার। | হলুদের ‘কারকিউমিন’ এবং রসুনের ‘অ্যালিসিন’ প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক। |
| দাঁতের যত্ন | প্রতি ৬ মাসে ডেন্টাল চেকআপ ও ফ্লসিং। | মাড়ির রোগের ব্যাকটেরিয়া রক্তে মিশে হার্টের ধমনীতে প্রদাহ তৈরি করে। |
| ওজন | পেটের চর্বি কমানো (পুরুষদের কোমর ৪০” ও নারীদের ৩৫”-এর নিচে)। | পেটের চর্বি বা ভিসেরা ফ্যাট সরাসরি CRP বাড়ায়। |
| ঘুম | রাতে ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম। | ঘুম শরীরের ‘কুলিং সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করে এবং স্ট্রেস হরমোন কমায়। |
পর্ব ৭: চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ
২০২৫-পরবর্তী সময়ে হার্টের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসছে:
- Colchicine: বাতজ্বরের এই সস্তা ওষুধটি এখন হার্ট অ্যাটাক পরবর্তী প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
- IL-6 Inhibitors: জিল্টিভেকিমাব (Ziltivekimab) নামক নতুন ওষুধ সরাসরি প্রদাহের মূলে আঘাত করার জন্য আসছে।
- পার্সোনালাইজড মেডিসিন: এখন হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা হবে রোগীর ধরণ (চর্বি-নির্ভর নাকি প্রদাহ-নির্ভর) অনুযায়ী।
শেষ কথা
এত তথ্যের ভিড়ে মূল কথাটি হলো—হার্ট অ্যাটাক একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু প্রতিরোধের কৌশল বদলাতে হবে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার পরবর্তী কাজ হলো, ডাক্তারের কাছে গিয়ে শুধু কোলেস্টেরলের মাত্রা জানতে না চাওয়া। বরং জিজ্ঞেস করা—“ডাক্তার স্যার , আমার শরীরের প্রদাহ বা hs-CRP এর মাত্রা কত?” এই একটি প্রশ্নই হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে আপনার বা আপনার প্রিয়জনের জীবন।


