হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করার পরীক্ষিত উপায়: স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড ২০২৬

সর্বাধিক আলোচিত

বর্তমান যুগে ফেসবুক আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যক্তিগত যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যবসার প্রচার—সবকিছুই এখন ফেসবুক কেন্দ্রিক। কিন্তু একবার ভাবুন তো, হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন আপনার শখের বা প্রয়োজনীয় ফেসবুক আইডিতে আর লগইন করতে পারছেন না। পাসওয়ার্ড ভুল দেখাচ্ছে, কিংবা ইমেইল অ্যাড্রেসটি পরিবর্তন করা হয়েছে। হ্যাঁ, এটি হ্যাকিংয়ের লক্ষণ। বর্তমানে সাইবার ক্রাইম বাড়ার সাথে সাথে ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সঠিক পদ্ধতি জানা থাকলে হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করা সম্ভব।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বেশ কিছু রিকভারি টুলস তৈরি করেছে। কিন্তু অনেকেই সঠিক নির্দেশনার অভাবে তাদের আইডি চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ধাপে ধাপে একটি হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে আনা যায়, হ্যাকার যদি ইমেইল বা ফোন নম্বর বদলে ফেলে তখন কী করণীয়, এবং ভবিষ্যতে অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার উপায়সমূহ। ধৈর্য ধরে পুরো গাইডটি পড়ুন এবং আপনার ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষিত করুন।

১. ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার লক্ষণসমূহ (Signs Your Account is Hacked)

আপনার অ্যাকাউন্টটি হ্যাকারদের দখলে চলে গেছে কি না, তা বোঝার জন্য কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ রয়েছে। অনেক সময় হ্যাকাররা গোপনে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে তথ্য চুরি করতে থাকে, যা ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না। তাই হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে আপনার অ্যাকাউন্টটি আসলেই কম্প্রোমাইজড হয়েছে কি না। সাধারণত হ্যাক হলে আপনি লগইন করতে পারবেন না, অথবা লগইন থাকলেও অদ্ভুত কার্যকলাপ লক্ষ্য করবেন। নিচে কিছু প্রধান লক্ষণ আলোচনা করা হলো যা দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ইমেইল বা পাসওয়ার্ড পরিবর্তন (Changed Email or Password)

সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো আপনার বর্তমান পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করতে না পারা। যদি দেখেন আপনার পাসওয়ার্ড ভুল দেখাচ্ছে এবং আপনি নিশ্চিত যে আপনি তা পরিবর্তন করেননি, তবে এটি হ্যাকিংয়ের ইঙ্গিত। এছাড়া, ফেসবুক থেকে যদি ইমেইল পান যে আপনার পাসওয়ার্ড বা ইমেইল অ্যাড্রেস পরিবর্তন করা হয়েছে, অথচ আপনি তা করেননি, তবে বুঝবেন কেউ আপনার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

অজানা পোস্ট বা মেসেজ (Unwanted Posts or Messages)

আপনি লগইন থাকা অবস্থায় যদি দেখেন আপনার টাইমলাইনে এমন কোনো পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে যা আপনি দেননি, অথবা আপনার ফ্রেন্ডলিস্টের মানুষদের কাছে আপনার অজান্তেই স্প্যাম মেসেজ বা লিঙ্ক যাচ্ছে, তবে এটি হ্যাক হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ। হ্যাকাররা প্রায়ই ম্যালওয়্যার ছড়ানোর জন্য হ্যাক করা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে।

অন্য ডিভাইস থেকে লগইন নোটিফিকেশন (Unrecognized Login Alerts)

ফেসবুক সাধারণত নতুন কোনো ডিভাইস বা লোকেশন থেকে লগইন করা হলে নোটিফিকেশন পাঠায়। যদি দেখেন এমন কোনো জায়গা (যেমন অন্য কোনো দেশ বা শহর) বা ডিভাইস (যেটি আপনার নয়) থেকে লগইন করা হয়েছে, তবে দ্রুত সতর্ক হোন। এটি প্রমাণ করে যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে।

হ্যাকিংয়ের লক্ষণ

লক্ষণ সাধারণ অবস্থা হ্যাকড অবস্থা
পাসওয়ার্ড আপনার সেট করা পাসওয়ার্ড কাজ করবে। সঠিক পাসওয়ার্ড দিলেও ‘Incorrect Password’ দেখাবে।
পোস্ট/মেসেজ শুধুমাত্র আপনার শেয়ার করা কন্টেন্ট থাকবে। অজানা লিঙ্ক, অশ্লীল ছবি বা স্ক্যাম পোস্ট দেখা যাবে।
ডিভাইস আপনার ব্যবহৃত মোবাইল বা পিসি দেখাবে। অপরিচিত ডিভাইস বা ভিন্ন দেশের আইপি দেখা যাবে।
প্রোফাইল তথ্য আপনার দেওয়া নাম ও জন্মতারিখ ঠিক থাকবে। নাম, জন্মতারিখ বা ইমেইল পরিবর্তিত হতে পারে।

২. হ্যাক হওয়ার সাথে সাথে তাৎক্ষণিক করণীয় (Immediate Actions to Take)

হ্যাক হওয়ার সাথে সাথে তাৎক্ষণিক করণীয়

যখনই বুঝতে পারবেন আপনার অ্যাকাউন্টটি ঝুঁকির মুখে, তখন এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়। সময়ের সাথে সাথে হ্যাকার আপনার অ্যাকাউন্টের আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং রিকভারি অপশনগুলো বন্ধ করে দিতে পারে। তাই হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এই ধাপে আপনার প্রধান লক্ষ্য হলো হ্যাকারকে অ্যাকাউন্ট থেকে বের করে দেওয়া এবং নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

পাসওয়ার্ড রিসেট করার চেষ্টা (Attempt Password Reset)

প্রথমেই ‘Forgot Password’ অপশনে গিয়ে আপনার ইমেইল বা ফোন নম্বরে কোড পাঠানোর চেষ্টা করুন। যদি হ্যাকার এখনো আপনার ইমেইল বা ফোন নম্বর পরিবর্তন না করে থাকে, তবে আপনি খুব সহজেই পাসওয়ার্ড রিসেট করে অ্যাকাউন্টের দখল ফিরে পেতে পারেন। এটি হলো সবচেয়ে দ্রুত এবং কার্যকর উপায়।

সাপোর্ট পেজে রিপোর্ট করা (Report to Facebook Support)

যদি দেখেন সাধারণ উপায়ে পাসওয়ার্ড রিসেট করা যাচ্ছে না, তবে ফেসবুকের নির্দিষ্ট সাপোর্ট পেজে (facebook.com/hacked) গিয়ে রিপোর্ট করুন। এখানে ফেসবুক আপনাকে কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন করবে এবং আপনার অ্যাকাউন্টের মালিকানা যাচাই করার চেষ্টা করবে। এই প্রক্রিয়াটি একটু সময়সাপেক্ষ হতে পারে, তবে এটি অত্যন্ত কার্যকরী।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা কার্ড ব্লক করা (Block Linked Payment Methods)

অনেকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সাথে ক্রেডিট কার্ড বা পেপ্যাল যুক্ত থাকে (বিশেষ করে যারা অ্যাড রান করেন)। অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে হ্যাকাররা আপনার অর্থ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন চালাতে পারে। তাই অ্যাকাউন্ট উদ্ধারের চেষ্টার পাশাপাশি দ্রুত আপনার ব্যাংকে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট কার্ড বা পেমেন্ট মেথডটি সাময়িকভাবে ব্লক করুন।

তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ

পদক্ষেপ কেন করবেন কীভাবে করবেন
পাসওয়ার্ড রিসেট নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে। লগইন পেজ থেকে ‘Forgot Password’ এ ক্লিক করুন।
সেশন আউট হ্যাকারকে লগআউট করতে। Settings > Security and Login > Where you’re logged in > Log out of all sessions.
রিপোর্ট ফেসবুককে জানাতে। facebook.com/hacked লিঙ্কে যান।
পেমেন্ট ব্লক আর্থিক ক্ষতি এড়াতে। ব্যাংকের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করুন।

৩. সাধারণ রিকভারি পদ্ধতি: ইমেইল বা ফোন নম্বরের মাধ্যমে (Basic Recovery Method)

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হ্যাকাররা শুরুতে কেবল পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে, কিন্তু ইমেইল বা ফোন নম্বর পরিবর্তন করতে কিছুটা সময় নেয়। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আপনি খুব সহজেই আপনার অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার করতে পারেন। এটি ফেসবুকের দেওয়া সবচেয়ে প্রাথমিক এবং সহজ সমাধান। যদি আপনার ইমেইল বা ফোন নম্বরটি আপনার কাছে সচল থাকে, তবে হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করা মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার।

‘Forgot Password’ অপশন ব্যবহার (Using Forgot Password)

ফেসবুক লগইন পেজে যান এবং পাসওয়ার্ড বক্সের নিচে থাকা ‘Forgot Password?’ লিঙ্কে ক্লিক করুন। এরপর আপনার অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত ফোন নম্বর বা ইমেইল অ্যাড্রেসটি বক্সে লিখুন এবং ‘Search’ বাটনে ক্লিক করুন। আপনার প্রোফাইলটি খুঁজে পাওয়া গেলে সেটি সিলেক্ট করুন।

কোড ভেরিফিকেশন (Code Verification)

ফেসবুক আপনাকে পাসওয়ার্ড রিসেট করার জন্য একটি ৬ ডিজিটের কোড পাঠাবে। আপনি ইমেইল বা এসএমএস—যে মাধ্যমটি বেছে নেবেন, সেখানে কোডটি যাবে। কোডটি নির্ভুলভাবে ফেসবুকের নির্দিষ্ট বক্সে টাইপ করুন। মনে রাখবেন, এই কোডটি কারো সাথে শেয়ার করবেন না।

নতুন পাসওয়ার্ড সেট করা (Setting a New Password)

কোড ভেরিফাই হয়ে গেলে ফেসবুক আপনাকে নতুন একটি পাসওয়ার্ড সেট করতে বলবে। এমন একটি পাসওয়ার্ড দিন যা আগেরগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং শক্তিশালী। পাসওয়ার্ড সেট করার সময় ‘Log out of other devices’ অপশনটি অবশ্যই সিলেক্ট করবেন। এতে হ্যাকারের ডিভাইস থেকে আপনার অ্যাকাউন্টটি লগআউট হয়ে যাবে।

সাধারণ রিকভারি ধাপ

ধাপ বিবরণ টিপস
ধাপ ১ অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করা। সঠিক ইমেইল বা ফোন নম্বর দিন।
ধাপ ২ কোড গ্রহণ ও ইনপুট। স্প্যাম ফোল্ডার চেক করুন যদি ইমেইল না পান।
ধাপ ৩ নতুন পাসওয়ার্ড তৈরি। নম্বর, অক্ষর ও চিহ্নের মিশ্রণ ব্যবহার করুন।
ধাপ ৪ ডিভাইস লগআউট। হ্যাকারকে রিমুভ করতে এটি মাস্ট সিলেক্ট করুন।

৪. যদি ইমেইল ও ফোন নম্বর বদলে ফেলা হয় (Advanced Recovery: Changed Contact Info)

সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন হ্যাকার আপনার অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি ইমেইল অ্যাড্রেস এবং ফোন নম্বরও পরিবর্তন করে ফেলে। তখন ‘Forgot Password’ দিলে কোড চলে যায় হ্যাকারের কাছে। অনেকেই এই পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু ফেসবুক এই পরিস্থিতির জন্যও সমাধান রেখেছে। যদিও এটি একটু দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তবুও ধৈর্যের সাথে চেষ্টা করলে হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করা সম্ভব।

‘No longer have access’ অপশন (No Longer Have Access Option)

লগইন পেজ থেকে ‘Forgot Password’ এ ক্লিক করে আপনার প্রোফাইল খুঁজুন। যখন কোড পাঠানোর অপশন আসবে, তখন নিচে খেয়াল করুন ‘No longer have access to these?’ নামে একটি লিঙ্ক আছে। সেখানে ক্লিক করুন। এই অপশনটি তখনই কাজ করে যখন আপনি এমন কোনো ডিভাইস (মোবাইল বা কম্পিউটার) ব্যবহার করছেন যা দিয়ে আপনি আগে নিয়মিত ফেসবুকে লগইন করতেন।

নতুন ইমেইল যুক্ত করা (Adding a New Email)

উপরের অপশনে ক্লিক করার পর ফেসবুক আপনাকে একটি নতুন ইমেইল অ্যাড্রেস বা ফোন নম্বর দিতে বলবে। এই নতুন ইমেইলটির মাধ্যমেই ফেসবুক পরবর্তীতে আপনার সাথে যোগাযোগ করবে। নিশ্চিত করুন যে এই ইমেইলটি আগে কখনো ফেসবুকে ব্যবহার করা হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।

পুরোনো পাসওয়ার্ড ব্যবহার (Using Old Password)

কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক আপনাকে আপনার মনে থাকা সর্বশেষ পুরোনো পাসওয়ার্ডটি দিতে বলতে পারে। হ্যাকার পাসওয়ার্ড বদলে ফেললেও, ফেসবুকের ডাটাবেসে আপনার আগের পাসওয়ার্ডটি সংরক্ষিত থাকে। সঠিক পুরোনো পাসওয়ার্ড দিতে পারলে ফেসবুক বুঝতে পারবে যে আপনিই প্রকৃত মালিক এবং আপনাকে অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেবে।

অ্যাডভান্সড রিকভারি

ফিচার বিবরণ কার্যকারিতা
ট্রাস্টেড ডিভাইস পরিচিত মোবাইল/পিসি ব্যবহার। সফলতার হার বাড়ায়।
নতুন কন্টাক্ট যোগাযোগের নতুন মাধ্যম। হ্যাকারের অ্যাক্সেস বাইপাস করে।
আইডি ভেরিফিকেশন সরকারি আইডি আপলোড। চূড়ান্ত মালিকানা প্রমাণের উপায়।

৫. ফেসবুক হ্যাকড পেজ ব্যবহার করে রিকভারি (Using facebook.com/hacked)

যদি উপরের কোনো পদ্ধতিই কাজ না করে, তবে ফেসবুকের ডেডিকেটেড হ্যাকিং রিপোর্ট পেজটি ব্যবহার করা হলো সবচেয়ে ভালো উপায়। এই টুলটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে সেই সব ইউজারদের জন্য যারা মনে করেন তাদের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। এখান থেকে রিপোর্ট করলে ফেসবুক সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার অ্যাকাউন্টের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে এবং হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।

রিপোর্ট সাবমিট করার নিয়ম (How to Submit a Report)

যেকোনো ব্রাউজার থেকে facebook.com/hacked এই লিঙ্কে যান। সেখানে “My account is compromised” বা “আমার অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছে” লেখা একটি বাটন দেখতে পাবেন। সেটিতে ক্লিক করুন। এরপর আপনার ইমেইল বা ফোন নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্টটি সার্চ করুন।

অ্যাকাউন্ট চিহ্নিতকরণ ও নিরাপত্তা প্রশ্ন (Identification & Security Questions)

অ্যাকাউন্ট খুঁজে পাওয়ার পর আপনাকে বর্তমান বা পুরোনো পাসওয়ার্ড দিতে বলা হবে। পাসওয়ার্ড দেওয়ার পর ফেসবুক আপনাকে কিছু নিরাপত্তা প্রশ্ন করতে পারে। যেমন—আপনার জন্ম তারিখ, আপনার ফ্রেন্ডলিস্টের কিছু মানুষের নাম বা ছবি শনাক্তকরণ ইত্যাদি। সঠিক উত্তর দিলে আপনি পাসওয়ার্ড রিসেট করার সুযোগ পাবেন।

অ্যাক্টিভিটি রিভিউ (Reviewing Recent Activity)

অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর ফেসবুক আপনাকে গত কয়েক দিনের অ্যাক্টিভিটি রিভিউ করতে বলবে। যদি দেখেন কোনো পেজে লাইক দেওয়া হয়েছে বা কাউকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে যা আপনি করেননি, তবে সেগুলো ডিলিট বা আনডু করার অপশন পাবেন। এটি আপনার অ্যাকাউন্টের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে।

হ্যাকড পেজ টুল

ধাপ কাজ গুরুত্ব
ভিজিট facebook.com/hacked অফিশিয়াল রিকভারি পোর্টাল।
আইডেন্টিফিকেশন অ্যাকাউন্ট সার্চ করা নিজের প্রোফাইল নিশ্চিত করা।
অথেন্টিকেশন পাসওয়ার্ড ইনপুট মালিকানা যাচাই।
ক্লিনআপ সন্দেহজনক কাজ মুছে ফেলা অ্যাকাউন্টের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।

৬. জাতীয় পরিচয়পত্র বা আইডি দিয়ে যাচাইকরণ (Identity Verification via ID)

যখন হ্যাকার সমস্ত রিকভারি মেথড ব্লক করে দেয় এবং টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করে দেয়, তখন শেষ ভরসা হলো আপনার সরকারি পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড। ফেসবুক মানুষের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করে। এটি একটু সময়সাপেক্ষ হতে পারে কারণ এখানে ম্যানুয়াল রিভিউর প্রয়োজন হয়, তবে এটি হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়।

আইডি কার্ড সাবমিট করা (Submitting ID Card)

‘No longer have access’ অপশনের পরবর্তী ধাপে আপনাকে আইডি আপলোড করতে বলা হতে পারে। এখানে আপনি আপনার ন্যাশনাল আইডি কার্ড (NID), পাসপোর্ট, বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের ছবি তুলে আপলোড করতে পারেন। ছবিটি যেন পরিষ্কার হয় এবং লেখাগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। আইডিতে থাকা নাম এবং জন্মতারিখ আপনার ফেসবুক প্রোফাইল তথ্যের সাথে মিল থাকতে হবে।

ভেরিফিকেশন স্ট্যাটাস চেক (Checking Verification Status)

আইডি সাবমিট করার পর ফেসবুক সেটি যাচাই করতে সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় নেয়। এই সময়ে আপনার দেওয়া নতুন ইমেইল অ্যাড্রেসে তারা যোগাযোগ করবে। ধৈর্য ধরুন এবং বারবার রিকোয়েস্ট পাঠানো থেকে বিরত থাকুন, কারণ এতে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হতে পারে।

মালিকানা নিশ্চিতকরণ ও লিঙ্ক প্রাপ্তি (Confirmation & Access Link)

আপনার সাবমিট করা আইডি যদি ফেসবুকের গাইডলাইন অনুযায়ী সঠিক হয়, তবে তারা আপনাকে একটি বিশেষ লগইন লিঙ্ক ইমেইল করবে। সেই লিঙ্কে ক্লিক করে আপনি সরাসরি অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারবেন এবং নতুন করে সব নিরাপত্তা সেটিংস ঠিক করে নিতে পারবেন।

আইডি ভেরিফিকেশন

গ্রহণযোগ্য আইডি শর্তাবলি প্রসেসিং টাইম
NID কার্ড নাম ও ছবি স্পষ্ট হতে হবে। ২৪-৪৮ ঘণ্টা।
পাসপোর্ট মেয়াদ থাকতে হবে। ২৪-৪৮ ঘণ্টা।
ড্রাইভিং লাইসেন্স সরকারি ইস্যুকৃত হতে হবে। ২৪-৪৮ ঘণ্টা।
অন্যান্য স্টুডেন্ট আইডি (মাঝে মাঝে)। সময় বেশি লাগতে পারে।

৭. অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার উপায় (Securing Your Facebook Account)

অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার উপায়

প্রবাদ আছে, “প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।” একবার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঝামেলা পোহানোর পর আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক। হ্যাকাররা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। তাই হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করার পর আপনার প্রথম কাজ হবে অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা দেওয়াল মজবুত করা। নিচে কিছু আধুনিক ও কার্যকরী নিরাপত্তা টিপস দেওয়া হলো।

টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (Two-Factor Authentication – 2FA)

এটি হলো নিরাপত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তর। সেটিংস থেকে ‘Security and Login’ এ গিয়ে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করুন। এর ফলে, কেউ আপনার পাসওয়ার্ড জেনে গেলেও আপনার মোবাইলে আসা কোড ছাড়া লগইন করতে পারবে না। এসএমএস ছাড়াও গুগল অথেন্টিকেটর অ্যাপ বা ফিজিক্যাল সিকিউরিটি কি ব্যবহার করা বেশি নিরাপদ।

শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড (Strong & Unique Password)

কখনো নিজের নাম, মোবাইল নম্বর বা জন্মসাল দিয়ে পাসওয়ার্ড দেবেন না। পাসওয়ার্ড হতে হবে অন্তত ১০-১২ অক্ষরের, যেখানে বড় হাতের ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং স্পেশাল ক্যারেক্টার (!@#$) থাকবে। প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।

সন্দেহজনক অ্যাপ ও ওয়েবসাইট রিমুভ (Remove Suspicious Apps)

অনেক সময় আমরা বিভিন্ন গেম বা কুইজ খেলার জন্য থার্ড-পার্টি অ্যাপকে ফেসবুকের এক্সেস দিয়ে থাকি। এই অ্যাপগুলো অনেক সময় তথ্য চুরি করে। সেটিংস থেকে ‘Apps and Websites’ অপশনে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় বা সন্দেহজনক অ্যাপগুলো রিমুভ করে দিন।

নিরাপত্তা চেকলিস্ট

নিরাপত্তা ফিচার সেটিং লোকেশন কেন জরুরি
2FA Security & Login > Two-factor auth হ্যাকার পাসওয়ার্ড জানলেও লগইন করতে পারবে না।
Login Alerts Security & Login > Setting up extra security কেউ লগইন করার চেষ্টা করলেই নোটিফিকেশন পাবেন।
Trusted Contacts (বর্তমানে আপডেটেড) বন্ধুদের সাহায্যে অ্যাকাউন্ট রিকভারি।
Password Password and Security জটিল পাসওয়ার্ড ব্রুট ফোর্স অ্যাটাক ঠেকায়।

৮. ফিশিং লিঙ্ক ও ম্যালওয়্যার থেকে সতর্কতা (Protection from Phishing & Malware)

অধিকাংশ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয় ফিশিং লিঙ্কের মাধ্যমে। হ্যাকাররা লোভনীয় অফার, ব্রেকিং নিউজ বা “আপনার গোপন ভিডিও ফাঁস হয়েছে”—এমন শিরোনাম দিয়ে লিঙ্ক পাঠায়। এই লিঙ্কগুলো দেখতে হুবহু ফেসবুকের মতো মনে হলেও আসলে এগুলো নকল ওয়েবসাইট। এখানে পাসওয়ার্ড দিলেই তা হ্যাকারের কাছে চলে যায়। হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করার পর এই বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।

সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক না করা (Avoid Clicking Suspicious Links)

মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে আসা কোনো অজানা লিঙ্কে ক্লিক করবেন না। যদি কোনো বন্ধু হঠাৎ অদ্ভুত কোনো লিঙ্ক পাঠায়, তবে ক্লিক করার আগে তাকে জিজ্ঞেস করুন সে আসলেই পাঠিয়েছে কি না। মনে রাখবেন, ফেসবুক কখনো আপনার পাসওয়ার্ড ভেরিফাই করার জন্য ইনবক্সে লিঙ্ক পাঠায় না।

ব্রাউজার ও অ্যাপ আপডেট রাখা (Update Browser & Apps)

আপনার ব্যবহৃত ব্রাউজার (যেমন Chrome, Firefox) এবং ফেসবুক অ্যাপ সবসময় আপ-টু-ডেট রাখুন। পুরোনো ভার্সনে অনেক নিরাপত্তা ত্রুটি থাকে যা হ্যাকাররা কাজে লাগায়। নিয়মিত আপডেটের মাধ্যমে এই ত্রুটিগুলো ফিক্স করা হয়, যা আপনার ডিভাইসকে ম্যালওয়্যার থেকে রক্ষা করে।

অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার (Use Antivirus)

কম্পিউটার এবং মোবাইলে ভালো মানের অ্যান্টিভাইরাস বা ম্যালওয়্যার রিমুভাল টুল ব্যবহার করুন। এগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে এবং কোনো ক্ষতিকর প্রোগ্রাম আপনার তথ্য চুরির চেষ্টা করলে তা ব্লক করে দেয়।

ফিশিং প্রতিরোধ

আক্রমণের ধরন চেনার উপায় করণীয়
ফিশিং লিঙ্ক বানান ভুল, অদ্ভুত ডোমেইন (যেমন https://www.google.com/search?q=faceb00k.com)। ক্লিক করবেন না, রিপোর্ট করুন।
লটারি স্ক্যাম অবিশ্বাস্য অফার বা পুরস্কারের প্রলোভন। ইগনোর করুন এবং ব্লক করুন।
ম্যালওয়্যার ফাইল ডাউনলোডের পর ডিভাইস স্লো হয়ে যাওয়া। অ্যান্টিভাইরাস দিয়ে স্ক্যান করুন।

শেষ কথা

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া নিঃসন্দেহে একটি মানসিক চাপের বিষয়। তবে আতঙ্কিত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় উপরে উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করলে হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করা সম্ভব। মনে রাখবেন, সময়ের সাথে সাথে ফেসবুকের রিকভারি প্রক্রিয়া পরিবর্তন হতে পারে, তাই সবসময় অফিশিয়াল গাইডলাইন মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর অবশ্যই টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করবেন এবং নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করবেন। আপনার ডিজিটাল নিরাপত্তা আপনার হাতেই। সামান্য সতর্কতাই আপনাকে বড় ধরনের সাইবার বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। আপনার অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত থাকুক, এটাই আমাদের কাম্য।

সর্বশেষ