বর্তমানে আমাদের অত্যন্ত ব্যস্ত ও কর্মমুখর জীবনে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার সময় খুব কমই মেলে। আমরা প্রায়শই ভাবি যে, শরীরে কোনো দৃশ্যমান ব্যথা বা অস্বস্তি না থাকলে আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এমন অসংখ্য রোগ রয়েছে যা শরীরে বাসা বাঁধে অত্যন্ত নীরবে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে এদের কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। সঠিক সময়ে এই নীরব ঘাতক রোগগুলো শনাক্ত করতে না পারলে পরবর্তীতে তা জীবনঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
তাই শরীরে কোনো সমস্যা অনুভব না করলেও নির্দিষ্ট সময় পরপর একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া এবং রুটিন চেকআপ করানো প্রতিটি সচেতন মানুষের অবশ্য কর্তব্য। নিচে আমরা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং চেকআপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
নীরব ঘাতক রোগ কী এবং কেন এরা বিপজ্জনক?
আমাদের আশেপাশে এমন অনেক ভয়াবহ রোগ রয়েছে যেগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কোনো ধরনের উপসর্গ বা লক্ষণ প্রকাশ করে না। এগুলোকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নীরব ঘাতক’ বা ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলা হয়। এই রোগগুলো ধীরে ধীরে মানুষের শরীরের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে থাকে এবং ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয়। যখন এসব রোগের স্পষ্ট উপসর্গ প্রকাশ পায়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীর অবস্থা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ কারণেই এই ধরনের রোগগুলো যেকোনো মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে এবং এ থেকে বাঁচতে আগাম সতর্কতা অপরিহার্য।
সাধারণ নীরব ঘাতক রোগসমূহের প্রভাব
উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন), টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল, ফ্যাটি লিভার এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সার (যেমন- কোলন বা ওভারিয়ান ক্যান্সার) নীরব ঘাতক হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। এগুলো বছরের পর বছর ধরে নীরবে হার্ট, কিডনি এবং মস্তিষ্কের মতো সংবেদনশীল অঙ্গগুলোর মারাত্মক ক্ষতি করে চলে। রুটিন মেডিকেল চেকআপ ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে এগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে থেকে জানা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।
নীরব ঘাতক রোগগুলো আমাদের শরীরের কী ধরনের ক্ষতি করে এবং কীভাবে এর প্রতিরোধ সম্ভব, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে নিচের সারণিটি লক্ষ্য করুন।
| রোগের নাম | শরীরে ক্ষতির ধরন ও প্রভাব | প্রতিরোধের উপায় ও সতর্কতা |
| উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন) | রক্তনালী ব্লক করে হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। | নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং লবণ কম খাওয়া। |
| টাইপ-২ ডায়াবেটিস | কিডনি ফেইলিউর, চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং স্নায়ুর ক্ষতি করে। | রক্তে সুগারের মাত্রা পরীক্ষা এবং শর্করা নিয়ন্ত্রণ। |
| উচ্চ কোলেস্টেরল | ধমনীতে চর্বি জমিয়ে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। | লিপিড প্রোফাইল টেস্ট এবং চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার। |
| ফ্যাটি লিভার ডিজিজ | লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের দিকে ধাবিত করে। | লিভার ফাংশন টেস্ট এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা। |
সার্বিক সুস্থতায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব

আমাদের সমাজের অনেকেই মনে করেন, শরীরে জ্বর, ব্যথা বা বড় কোনো সমস্যা না থাকলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল এবং ক্ষতিকর ধারণা হিসেবে প্রমাণিত। একজন মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘায়ু লাভ করতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু রোগ প্রতিরোধই করে না, বরং আপনার শরীরের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিত্র প্রদান করে। এর মাধ্যমে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন আপনার খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে কি না।
রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসা
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা বা হেলথ চেকআপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একদম প্রাথমিক পর্যায়ে যেকোনো রোগ নির্ণয় করতে পারা। ক্যান্সার, হার্ট ডিজিজ বা কিডনির মতো জটিল রোগগুলো যদি একেবারে শুরুতে ধরা পড়ে, তবে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে তা প্রায় পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব হয়। ডাক্তাররা আপনার ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট দেখে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা জানাতে পারেন এবং বড় ধরনের বিপদ এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের সঠিক গাইডলাইন প্রদান করেন।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল সুবিধাগুলো আমাদের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা এক নজরে বুঝতে নিচের টেবিলটি দেখুন।
| সুবিধা | বিস্তারিত বিবরণ | দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব |
| আগাম সতর্কতা | রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগেই টেস্টের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা। | দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার মাধ্যমে দ্রুত আরোগ্য লাভ। |
| লাইফস্টাইল পরিবর্তন | রিপোর্টে কোনো অসংগতি দেখলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার সুযোগ। | স্বাস্থ্যকর জীবনের রুটিন তৈরি করা সম্ভব হয়। |
| অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুরক্ষা | হার্ট, লিভার এবং কিডনির কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। | অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো বড় ঝুঁকি থেকে মুক্তি। |
| ইমিউনিটি ট্র্যাকিং | শরীরে ভিটামিন বা মিনারেলের ঘাটতি আছে কি না তা বের করা। | পুষ্টিহীনতা দূর করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। |
বয়স অনুযায়ী রুটিন চেকআপ: কখন কোন টেস্ট জরুরি?
মানুষের বয়সের সাথে সাথে শরীরের গঠন, হরমোনের মাত্রা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তাই সব বয়সের বা সব শারীরিক অবস্থার মানুষের জন্য একই ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কখনোই প্রযোজ্য নয়। একজন ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, পেশাগত ঝুঁকি এবং পারিবারিক চিকিৎসা ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন ভিন্ন টেস্টের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সঠিক বয়সে সঠিক টেস্ট করালে অনেক বংশগত বা বয়সজনিত জটিল রোগ থেকে খুব সহজেই নিজেকে দূরে রাখা যায়। চলুন জেনে নিই জীবনের কোন পর্যায়ে বা কোন বয়সে কী ধরনের চেকআপ করা সবচেয়ে বেশি যৌক্তিক।
ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সীদের জন্য প্রয়োজনীয় মেডিকেল টেস্ট
ত্রিশ বছর বয়সের পর থেকে মানুষের শরীরের মেটাবলিজম রেট ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং কর্মজীবনের চাপের কারণে মানসিক চাপ বাড়ে। এ সময় নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, ফাস্টিং ব্লাড সুগার, লিপিড প্রোফাইল, লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) এবং কিডনি ফাংশন টেস্ট করা অত্যন্ত জরুরি। মহিলাদের ক্ষেত্রে সার্ভিকাল ক্যান্সারের ঝুঁকির জন্য প্যাপ স্মিয়ার (Pap Smear) এবং ব্রেস্ট স্ক্রিনিং করা উচিত। অন্যদিকে পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন (PSA) টেস্ট, কোলনোস্কোপি ও হাড়ের ঘনত্ব (Bone Density) পরীক্ষা করানো আবশ্যক।
বয়সভেদে কোন ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা মানুষের জন্য বেশি জরুরি এবং কেন জরুরি, তা নিচের ছকে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
| বয়সসীমা | প্রস্তাবিত মেডিকেল টেস্ট | কেন এই টেস্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ |
| ২০-৩০ বছর | ব্লাড প্রেশার, বিএমআই (BMI), ব্লাড সুগার, ডেন্টাল চেকআপ। | প্রাথমিক স্থূলতা এবং সাধারণ সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে। |
| ৩০-৪০ বছর | কোলেস্টেরল, থাইরয়েড, লিভার ও কিডনি টেস্ট, ইসিজি। | কর্মজীবনের চাপ থেকে সৃষ্ট মেটাবলিক রোগ ঠেকাতে। |
| ৪০-৫০ বছর | ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং, প্যাপ স্মিয়ার, ম্যামোগ্রাম, প্রোস্টেট টেস্ট। | বয়সজনিত হরমোনাল পরিবর্তন ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে। |
| ৫০+ বছর | কোলনোস্কোপি, বোন ডেনসিটি টেস্ট, চোখের ছানি পরীক্ষা, হার্ট স্ক্রিনিং। | হাড় ক্ষয় রোধ, দৃষ্টিশক্তি রক্ষা এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে। |
আর্থিক সাশ্রয় ও মানসিক শান্তিতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব
অসুস্থতা শুধু একজন মানুষের শারীরিক কষ্টই বাড়ায় না, এটি রোগীর পুরো পরিবারের ওপর বিশাল আর্থিক ও মানসিক চাপও সৃষ্টি করে। হঠাৎ করে যদি পরিবারের কারো কোনো বড় রোগ ধরা পড়ে, তবে হাসপাতালের বেড ভাড়া, আইসিইউ বিল, দামি ওষুধ এবং অপারেশন বাবদ লাখ লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। ঠিক এখানেই একজন সচেতন নাগরিকের জীবনে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, কারণ এটি এই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারে। বছরে একবার সামান্য খরচে রুটিন চেকআপ করালে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের মেডিকেল বিল থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন
নিজের শরীর ভেতর থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ আছে, মেডিকেল রিপোর্টের এই নিশ্চয়তা মানুষের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসকের কাছ থেকে ‘সবকিছু স্বাভাবিক আছে’ শোনার পর যে মানসিক প্রশান্তি কাজ করে, তা কোনো অর্থের বিনিময়ে পাওয়া সম্ভব নয়। এই প্রশান্তি একজন মানুষের প্রতিদিনের ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ায়, রাতের ঘুম ভালো করে এবং দুশ্চিন্তামুক্ত একটি সুন্দর, সাবলীল জীবনযাপন করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।
নিয়মিত চেকআপ কীভাবে আমাদের জীবনের আর্থিক ও মানসিক দিক দিয়ে সাহায্য করে, তা নিচের সারণিতে খুব সুন্দরভাবে দেওয়া হলো।
| প্রভাবের ক্ষেত্র | চেকআপ না করার নেতিবাচক ফল | নিয়মিত চেকআপ করার ইতিবাচক সুবিধা |
| চিকিৎসা ব্যয় | রোগ জটিল হলে আইসিইউ বা অপারেশনের বিশাল খরচ। | শুরুতেই সামান্য খরচের ওষুধে রোগ নিরাময়। |
| মানসিক চাপ | হঠাৎ বড় রোগ ধরা পড়লে পরিবারের সবার প্যানিক বা আতঙ্ক। | শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত থাকা। |
| কর্মক্ষমতা | অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন অফিসে বা ব্যবসায় অনুপস্থিতি। | সুস্থ শরীরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া। |
| জীবনযাত্রার মান | অসুস্থ শরীর নিয়ে হতাশাগ্রস্ত ও যন্ত্রণাদায়ক জীবন। | আত্মবিশ্বাসী, সতেজ এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন। |
একটি আদর্শ হেলথ চেকআপ প্যাকেজে কী কী থাকে?
বর্তমানে প্রায় সব নামকরা হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন ক্যাটাগরির হেলথ চেকআপ বা মাস্টার হেলথ স্ক্রিনিং প্যাকেজ পাওয়া যায়। আপনার বয়স, কাজের ধরন ও শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ডাক্তাররা আপনার জন্য সবচেয়ে সঠিক প্যাকেজটি বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন। একটি আদর্শ ও মানসম্মত প্যাকেজে সাধারণত মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা নিখুঁতভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা থাকে। মূলত এই প্যাথলজিক্যাল এবং রেডিওলজিক্যাল টেস্টগুলোর মাধ্যমেই চিকিৎসকরা শরীরের ভেতরের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান।
রক্ত, হার্ট এবং কিডনির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাসমূহ
সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজগুলোতে কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC), ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS), হার্টের অবস্থার জন্য ইসিজি (ECG) ও ইকোকার্ডিওগ্রাম, বুকের এক্স-রে এবং হোল অ্যাবডোমেন আল্ট্রাসনোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া কিডনির সুস্থতা যাচাইয়ের জন্য সিরাম ক্রিয়েটিনিন ও ইউরিন রুটিন টেস্ট এবং লিভারের জন্য এসজিপিটি (SGPT) বা বিলিরুবিন টেস্ট করা হয়। প্রয়োজনে থাইরয়েড হরমোন (TSH), ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়ামের মাত্রাও পরীক্ষা করা হতে পারে।
একটি বেসিক বা মাস্টার হেলথ চেকআপ প্যাকেজে সাধারণত কী কী টেস্ট থাকে এবং কেন করা হয়, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো।
| টেস্টের নাম | কোন অঙ্গ বা উপাদানের জন্য | পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য |
| সিবিসি (CBC) | সম্পূর্ণ রক্ত | রক্তশূন্যতা, ইনফেকশন বা ব্লাড ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ নির্ণয়। |
| ইসিজি (ECG) | হৃৎপিণ্ড (Heart) | হার্ট রেট স্বাভাবিক আছে কি না এবং ব্লক আছে কি না তা যাচাই করা। |
| সিরাম ক্রিয়েটিনিন | কিডনি (Kidney) | কিডনি সঠিকভাবে রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ফিল্টার করছে কি না তা দেখা। |
| এসজিপিটি (SGPT) | যকৃৎ (Liver) | লিভারে অতিরিক্ত চর্বি বা প্রদাহ (ফ্যাটি লিভার/জন্ডিস) আছে কি না জানা। |
চেকআপের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?
যেকোনো মেডিকেল টেস্ট বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার সবচেয়ে নির্ভুল এবং সঠিক ফলাফল পেতে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। টেস্টের আগে সঠিক প্রস্তুতি না নিলে ল্যাবরেটরি রিপোর্টের ফলাফলে ব্যাপক তারতম্য আসতে পারে, যার ফলে ডাক্তার ভুল চিকিৎসা দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট ডাক্তার বা হাসপাতালের ল্যাব টেকনিশিয়ানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করলে পরীক্ষার মান নিখুঁত হয়। তাই রুটিন চেকআপে যাওয়ার আগে বাসা থেকে কিছু বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
ডাক্তারের সাথে খোলামেলা আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
ব্লাড সুগার বা লিপিড প্রোফাইল (কোলেস্টেরল) টেস্টের আগে সাধারণত রোগীকে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা খালি পেটে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়; এ সময় শুধু পানি পান করা যায়। চেকআপের দিন ডাক্তারের সাথে আপনার বর্তমান কোনো শারীরিক সমস্যা, আগের পুরনো কোনো রিপোর্ট এবং পরিবারের কারও ক্যানসার বা ডায়াবেটিস আছে কি না তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। আপনি যদি আগে থেকে নিয়মিত প্রেশার বা অন্য কোনো রোগের ওষুধ খেয়ে থাকেন, তবে টেস্টের দিন সকালে তা খাবেন কি না সে সম্পর্কে অবশ্যই আগে থেকে ডাক্তারের পরামর্শ জেনে নিন।
মেডিকেল চেকআপে যাওয়ার আগে আপনার কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত, তা নিচের টেবিল থেকে ধাপে ধাপে জেনে নিন।
| প্রস্তুতির ধাপ | করণীয় বিষয় | এর পেছনের কারণ |
| খাদ্যাভ্যাস | ফাস্টিং টেস্টের আগে ৮-১২ ঘণ্টা খাবার থেকে বিরত থাকা। | খাবারের কারণে রক্তে সুগার বা ফ্যাটের মাত্রা সাময়িক বেড়ে যেতে পারে। |
| পোশাক নির্বাচন | ঢিলেঢালা এবং আরামদায়ক পোশাক পরিধান করা। | ইসিজি বা এক্স-রে করার সময় যাতে সহজে পোশাক পরিবর্তন করা যায়। |
| ডকুমেন্টেশন | পুরনো সব প্রেসক্রিপশন ও টেস্টের রিপোর্ট সাথে নেওয়া। | ডাক্তার যেন পূর্ববর্তী অবস্থার সাথে বর্তমান রিপোর্টের তুলনা করতে পারেন। |
| ওষুধ গ্রহণ | ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সকালের রুটিন ওষুধ না খাওয়া। | কিছু ওষুধ নির্দিষ্ট টেস্টের ফলাফলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। |
সুস্থ জীবনের জন্য চূড়ান্ত চিন্তাভাবনা
জীবন একটাই এবং সুস্থতা সৃষ্টিকর্তার দেওয়া শ্রেষ্ঠ নিয়ামতগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমাদের সামান্য একটু অবহেলা বা সময়ের অভাবের অজুহাত পুরো পরিবারকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। আমরা যেমন আমাদের ব্যবহৃত গাড়ির বা অন্যান্য যন্ত্রপাতির দীর্ঘস্থায়ীত্বের জন্য নিয়মিত সার্ভিসিং করাই, তেমনি আমাদের শরীরেরও সঠিক যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। রোগ হওয়ার পর হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে চিকিৎসা করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা নিশ্চিত করতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নীরব ঘাতক রোগগুলো থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা পেতে দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই আর অবহেলা নয়, আজই আপনার চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন, আপনার বয়স ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রুটিন চেকআপটি করিয়ে নিন এবং একটি সুন্দর, সুস্থ ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের দিকে এগিয়ে যান।

