আমাদের চারপাশের বাতাসে, খাবারে, এমনকি সকালের চায়ের কাপেও এখন মিশে আছে এক অদৃশ্য শত্রু। খালি চোখে একে ধরা যায় না, কিন্তু এটি নীরবে আমাদের শরীর শেষ করে দিচ্ছে। আমরা কথা বলছি মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে। প্রতিদিন প্লাস্টিকের যত্রতত্র ব্যবহারের কারণে এই ছোট ছোট কণাগুলো আমাদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। আজ আমরা একদম সহজ ভাষায় জানবো মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা এড়িয়ে চলার উপায় সম্পর্কে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চাইলে এই তথ্যগুলো আমাদের সবার জানা খুব দরকার।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী এবং এটি কীভাবে তৈরি হয়?
প্লাস্টিকের যেসব টুকরো বা কণা আকারে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট, সেগুলোকে আমরা মাইক্রোপ্লাস্টিক বলি। আর এর চেয়েও ক্ষুদ্র অর্থাৎ ১ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাকে বলা হয় ন্যানোপ্লাস্টিক। এগুলো মূলত দুইভাবে তৈরি হয়। প্রথমত, কিছু কোম্পানি ইচ্ছে করেই ফেসওয়াশ বা টুথপেস্টে ছোট ছোট কণা ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন বা খেলনা যখন রোদ-বৃষ্টির কারণে ভেঙে একদম গুঁড়ো হয়ে যায়, তখন তা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এই কণাগুলো এতই হালকা যে সহজেই বাতাস, মাটি আর পানিতে মিশে যায়।
প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক
এগুলো কোম্পানিগুলো সরাসরি ক্ষুদ্র কণা হিসেবে তৈরি করে। যেমন—ফেসিয়াল স্ক্রাব বা টুথপেস্টের ভেতরের শক্ত দানা (মাইক্রোবিডস) এবং সিন্থেটিক কাপড়ের সুক্ষ্ম আঁশ। এগুলো ধোয়ার সময় সরাসরি ড্রেন দিয়ে নদী আর সাগরে গিয়ে পড়ে।
সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক
আমাদের ফেলে দেওয়া বড় প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে এগুলো তৈরি হয়। যেমন—পানির বোতল, পলিথিন ব্যাগ বা গাড়ির টায়ার রাস্তার ঘর্ষণে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যখন বাতাসে ও মাটিতে ক্ষুদ্র কণা আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
| কণার প্রকারভেদ | মূল উৎস | পরিবেশের ওপর প্রাথমিক প্রভাব |
| প্রাইমারি কণা | কসমেটিকস, ফেসিয়াল স্ক্রাব, সিন্থেটিক কাপড় | সরাসরি ড্রেনের পানিতে মিশে জলজ প্রাণীর পেটে যায় |
| সেকেন্ডারি কণা | ভাঙা বোতল, পলিথিন, টায়ারের ঘর্ষণ | মাটির উর্বরা শক্তি নষ্ট করে এবং বাতাসে উড়ে বেড়ায় |
পরিবেশ ও জলজ জীবনের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় আঘাত

নদী বা সমুদ্রে গিয়ে পড়া প্লাস্টিকের এই কণাগুলোকে মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী খাবার মনে করে গিলে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রের মাছ থেকে শুরু করে আমাদের প্রতিদিনের চেনা চিংড়ি বা কাঁকড়ার শরীরেও এই বিষাক্ত কণা জমছে। যখন আমরা এই মাছগুলো বাজার থেকে কিনে খাচ্ছি, তখন পরোক্ষভাবে সেই প্লাস্টিক আমাদের পেটেও চলে আসছে। এটি আমাদের পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সামুদ্রিক জীব বৈচিত্রের ক্ষতি ও প্লাস্টিক-আহার
ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পেটে যাওয়ার পর মাছের স্বাভাবিক হজমপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় এদের পাকস্থলী প্লাস্টিকে ভরে যায়, ফলে এরা অন্য কোনো পুষ্টিকর খাবার খেতে পারে না এবং না খেয়েই মারা যায়। এই প্লাস্টিক কণাগুলোর আরেকটি বিপজ্জনক গুণ হলো, এরা পানির অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন ডিডিটি বা ভারী ধাতু) নিজেদের গায়ে স্পঞ্জের মতো শুষে নেয়। ফলে মাছ যখন প্লাস্টিক খায়, সে মূলত এক দলা ঘনীভূত বিষ গিলে ফেলে।
মাটির উর্বরতা ধ্বংস ও ফসলের ক্ষতি
কৃষিজমিতে প্লাস্টিক মিশ্রিত নোংরা পানি এবং প্লাস্টিকের পলিথিন কণার কারণে মাটির ভেতরের উপকারী অণুজীব ও কেঁচো মারা যাচ্ছে। কেঁচো মাটির ভেতরের বাতাস চলাচলে সাহায্য করে, যা উদ্ভিদের শিকড়ের জন্য দরকারি। মাটি তার স্বাভাবিক পুষ্টি ও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারালে সরাসরি ফসলের ফলন কমে যায় এবং ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়।
| পরিবেশের উপাদান | ক্ষতির ধরন | দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল |
| নদী ও সমুদ্রের মাছ | বিষাক্ত কণা ও রাসায়নিক শরীরে জমা হওয়া | মাছের বংশবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও অকাল মৃত্যু |
| কৃষিজমি ও মাটি | উপকারী অণুজীব ধ্বংস ও কেঁচোর মৃত্যু | ফসলের পুষ্টিগুণ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন হ্রাস |
মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব
বিজ্ঞানীরা মানুষের রক্ত, ফুসফুস, লিভার এমনকি গর্ভস্থ শিশুর প্লাসেন্টাতেও (অমরা) মাইক্রোপ্লাস্টিক খুঁজে পেয়েছেন। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, হৃদরোগীদের ধমনীতে জমে থাকা চর্বির ভেতরেও এখন প্লাস্টিকের কণা মিলছে, যা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আমরা প্রতিদিন যে প্লাস্টিকের কাপে গরম চা খাই বা বোতলের পানি পান করি, তা থেকে লাখ লাখ কণা শরীরে ঢুকছে। এই স্থায়ী বিষ আমাদের ভেতরের অঙ্গগুলোকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দিচ্ছে। আর এই কারণেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা এড়িয়ে চলার উপায় জানাটা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
হরমোনের বারোটা বাজাচ্ছে
প্লাস্টিক শক্ত বা নরম করার জন্য বিসফেনল-এ (BPA) এবং থ্যালেটসের মতো ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এগুলো আমাদের শরীরের হরমোন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দেয়। এর ফলে পুরুষ ও নারীদের প্রজনন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়, গর্ভপাত ঘটে এবং অল্প বয়সে ডায়াবেটিস বা মেটাবলিজম নষ্ট হয়ে দ্রুত স্থূলতা বা মোটা হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
ক্যানসার ও ইমিউনিটি ধ্বংসের ঝুঁকি
শরীরের কোষগুলোতে যখন দিনের পর দিন এই বিষাক্ত কণাগুলো জমা হতে থাকে, তখন সেখানে স্থায়ী প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) এই অজৈব প্লাস্টিক কণাকে শরীর থেকে বের করতে না পেরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি কোষীয় ক্ষতি লিভার, কিডনি, পাকস্থলী এবং ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
| শরীরের অঙ্গ | ক্ষতিকর প্রভাব | সাধারণ লক্ষণ |
| ফুসফুস ও শ্বাসনালী | স্থায়ী প্রদাহ, ফাইব্রোসিস ও টিস্যুর ক্ষতি | দীর্ঘদিনের শুকনো কাশি, হাঁপানি ও হুট করে শ্বাসকষ্ট |
| লিভার ও কিডনি | ছাঁকন ক্ষমতা নষ্ট হওয়া ও প্লাস্টিক জমা | রক্তে বিষাক্ত উপাদান বেড়ে যাওয়া, শরীর ফুলে যাওয়া |
আমাদের দৈনিক খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গোপন প্রবেশ
আপনি হয়তো ভাবছেন, “আমি তো প্লাস্টিক খাচ্ছি না!” কিন্তু গবেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। বাজার থেকে কেনা বোতলজাত পানি, সামুদ্রিক লবণ, এমনকি খোলা বাজারের চিনি ও চায়ের পাতাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির একটি গবেষণা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা যে প্লাস্টিক বা নাইলনের টি-ব্যাগ দিয়ে গরম চা বানাই, সেই একটি ব্যাগ থেকেই প্রায় ১১.৬ বিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ৩.১ বিলিয়ন ন্যানোপ্লাস্টিক কণা সরাসরি চায়ের কাপে মিশে যায়, যা আমরা প্রতিদিন আয়েশ করে খাচ্ছি।
প্লাস্টিকের পানির বোতল ও বড় জার
বাজারের ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের বোতল বা ২০ লিটারের জারের পানি যখন রোদে বা সাধারণ তাপমাত্রায় থাকে, তখন বোতলের ভেতরের দেয়াল থেকে প্লাস্টিক ক্ষয়ে পানিতে মিশতে শুরু করে। বিশেষ করে বোতলের মুখ বারবার খোলা এবং লাগানোর সময় যে ঘর্ষণ হয়, তা থেকেই পানিতে হাজার হাজার কণা খসে পড়ে। এই পানি দিনের পর দিন খাওয়া মানে শরীরে প্লাস্টিকের তরল বিষ ঢোকানো।
সামুদ্রিক লবণ ও সামুদ্রিক খাবার
সমুদ্রের পানি শুকিয়ে যখন লবণ তৈরি করা হয়, তখন পানির সাথে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকও লবণের দানার সাথে আটকে যায়। আধুনিক রিফাইন বা পরিশোধনের পরেও এই কণাগুলোর একটি বড় অংশ লবণে থেকে যায়। একই সাথে শুঁটকি মাছ, চিংড়ি এবং কাঁকড়ার পরিপাকতন্ত্রে এই কণাগুলো থেকে যায়, যা রান্নার সময় পুরো খাবারে ছড়িয়ে পড়ে।
| খাদ্য উপাদান | প্লাস্টিক প্রবেশের মাধ্যম | বিকল্প ও নিরাপদ সমাধান |
| বোতলজাত পানি | বোতলের দেয়াল ও মুখের ঘর্ষণ থেকে কণা ক্ষরণ | কাচ, স্টিল বা তামার বোতল ব্যবহার |
| টি-ব্যাগ চা | গরম পানিতে নাইলন টি-ব্যাগের রাসায়নিক বিক্রিয়া | খোলা পাতার চা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে খাওয়া |
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা এড়িয়ে চলার উপায়: কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ
এখন প্রশ্ন হলো, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে আমরা বাঁচবো কীভাবে? রাতারাতি এই আধুনিক সমাজকে প্লাস্টিকমুক্ত করা হয়তো সম্ভব না, তবে নিজের কিছু ছোট ছোট অভ্যাস বদলালে আমরা পরিবারকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পারবো। গরম খাবার প্লাস্টিকের বক্সে না রাখা, ওভেনে প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার না করা এবং সুতি কাপড়ের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব।
কাচ ও স্টিলের পাত্র ব্যবহার করুন
রান্নাঘর থেকে প্লাস্টিকের বাটি, জগ, বক্স বা চামচ আজই বিদায় করুন। বিশেষ করে গরম তরকারি বা ভাত কখনোই প্লাস্টিকের পাত্রে রাখবেন না বা ওভেনে গরম করবেন না। খাবার ও পানি রাখার জন্য কাচ, সিরামিক বা খাঁটি স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করার অভ্যাস করুন। বাজারে এখন ওভেন-সেফ কাচের বাটি পাওয়া যায়, সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
সুতি ও প্রাকৃতিক কাপড়ের ব্যবহার বাড়ান
সিন্থেটিক, পলিয়েস্টার বা নাইলন কাপড় যখন ওয়াশিং মেশিনে বা সাধারণ উপায়ে ধোয়া হয়, তখন তা থেকে প্রচুর পরিমাণে মাইক্রোফাইবার পানির সাথে মিশে যায়। তাই নিজের পোশাক, গামছা, তোয়ালে বা বিছানার চাদর কেনার সময় শতভাগ সুতি (Cotton) বা লিনেনের মতো প্রাকৃতিক কাপড় বেছে নিন।
প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার পরিহার করুন
প্লাস্টিকের প্যাকেটে মাসের পর মাস সিল করে রাখা চিপস, বিস্কুট বা ওভেনে গরম করে খাওয়ার উপযোগী ‘রেডি মিল’ খাওয়া বন্ধ করুন। প্লাস্টিকের মোড়কে থাকা খাবারগুলো ভেতরের প্লাস্টিক স্তর থেকে রাসায়নিক শুষে নেয়। এর চেয়ে বাজার থেকে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি কিনে ধুয়ে খাওয়ার অভ্যাস অনেক বেশি নিরাপদ।
| ক্ষতিকর অভ্যাস | নেতিবাচক দিক | নিরাপদ বিকল্প অভ্যাস |
| প্লাস্টিকের বক্সে গরম খাবার রাখা | গরমে প্লাস্টিক গলে কেমিক্যাল খাবারে মেশে | কাচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার |
| প্লাস্টিকের জগে বা বোতলে পানি রাখা | পানিতে প্রতিনিয়ত রাসায়নিক কণা ছড়ায় | মাটির কলস বা স্টিলের জগের ব্যবহার |
| সিন্থেটিক কাপড়ের অতিরিক্ত ব্যবহার | ধোয়ার সময় ও বাতাসে সূক্ষ্ম কণা ছড়ায় | সুতি বা লিনেন কাপড়ের ব্যবহার |
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি উদ্যোগের গুরুত্ব
শুধুমাত্র একা সচেতন হলে এই বড় বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি ও সামাজিক পর্যায়ে বড় ধরনের এবং কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পলিথিন ব্যাগ এবং ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের (যেমন প্লাস্টিকের চামচ, কাপ, স্ট্র) ব্যবহার আইন করে পুরোপুরি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। আমরা যদি এখনই যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ না করি, তবে আমাদের সন্তানদের জন্য একটি রোগাক্রান্ত ও অচল পৃথিবী রেখে যেতে হবে।
যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ ও উৎসে বর্জ্য আলাদা করা
রাস্তাঘাট, মাঠ, খাল-বিল বা ড্রেনে প্লাস্টিকের বোতল বা চিপসের প্যাকেট ফেলা একদম বন্ধ করতে হবে। বাসার ময়লা ফেলার সময় প্লাস্টিক জাতীয় জিনিসগুলো আলাদা বিনে বা পাত্রে রাখার অভ্যাস করতে হবে। এতে করে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সেগুলো সহজে রিসাইকেল ফ্যাক্টরিতে পাঠাতে পারবেন এবং মাটির নিচে প্লাস্টিক চাপা পড়ার হার কমবে।
পাটের ও কাগজের পণ্যের সহজলভ্যতা ও আইন প্রয়োগ
প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ, কাগজের ঠোঙ্গা এবং মাটির পাত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকার যদি এই দেশীয় পরিবেশবান্ধব শিল্পে অনুদান দেয়, তবে এগুলোর দাম প্লাস্টিকের চেয়ে কমে আসবে। একই সাথে ক্ষতিকর ওয়ান-টাইম প্লাস্টিক কারখানার ওপর কড়া ট্যাক্স বসানো এবং আইন অমান্যকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা দরকার।
| প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ | মূল ভূমিকা কার | প্রত্যাশিত ইতিবাচক ফলাফল |
| বর্জ্য আলাদা করা | সাধারণ নাগরিক ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী | রিসাইক্লিং সহজ হওয়া ও মাটির সুরক্ষা |
| পলিথিন নিষিদ্ধকরণ | প্রশাসন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও সরকার | প্লাস্টিক দূষণ এক ধাক্কায় অনেক কমে যাওয়া |
| বিকল্প পণ্যের বিকাশ | ব্যবসায়ী ও সরকারি নীতি নির্ধারক | সাশ্রয়ী মূল্যে পাটের ও কাগজের ব্যাগ পাওয়া |
কিছু শেষ কথা
মাইক্রোপ্লাস্টিক কোনো দূরের বা কাল্পনিক সমস্যা নয়; এটি আজ আমাদের ঘরের ভেতরে, আমাদের নিঃশ্বাসে এবং আমাদের প্রতিদিনের খাবারের থালায় চলে এসেছে। একটি সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন পেতে হলে আমাদের আজই, এই মুহূর্ত থেকেই সচেতন হতে হবে। আশা করি, এই বিস্তারিত লেখায় আলোচিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা এড়িয়ে চলার উপায় আপনাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু ভালো পরিবর্তন আনতে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, আপনার নিজের জীবনের একটি ছোট সচেতন পরিবর্তনই পারে আপনার সন্তান ও পুরো পরিবারকে প্লাস্টিকের এই নীরব বিষ থেকে বাঁচাতে। আসুন, প্লাস্টিককে ‘না’ বলি এবং একটি পরিচ্ছন্ন সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলি।
সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা
১. পানি ফুটিয়ে পান করলে কি মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর হয়?
না, পানি ফুটালে ভেতরের জীবাণু, ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস মারা যায়, কিন্তু প্লাস্টিকের মতো অজৈব কণাগুলো দূর হয় না বা গলে যায় না। তবে পানি ভালো মানের রিভার্স অসমোসিস (RO) ফিল্টার বা উন্নত কার্বন ব্লক ফিল্টারে ফিল্টার করলে এই কণাগুলো অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।
২. ঘরের ভেতরের বাতাসেও কি মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে? এটি কীভাবে কমে?
হ্যাঁ, ঘরের বাতাসেও এটি থাকে। আমাদের ঘরের কৃত্রিম কার্পেট, সিন্থেটিক পর্দা, সোফার কভার বা নাইলনের কাপড় থেকে ঘর্ষণের ফলে সূক্ষ্ম প্লাস্টিকের আঁশ বাতাসে ভেসে বেড়ায়, যা আমাদের ফুসফুসে ঢোকে। ঘর নিয়মিত মোছা, ঘরে বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা রাখা এবং সুতি কাপড়ের ব্যবহার এর প্রধান সমাধান।
৩. বাচ্চাদের প্লাস্টিকের ফিডার ব্যবহার করা কি নিরাপদ?
একদমই না। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, প্লাস্টিকের ফিডারে যখন ফুটন্ত গরম দুধ বা পানি ঢেলে ঝাঁকানো হয়, তখন উচ্চ তাপের কারণে বোতলের ভেতরের স্তর থেকে প্রতি লিটারে লাখ লাখ প্লাস্টিক কণা দুধে মিশে যায়। তাই বাচ্চাদের জন্য সবসময় ফুড-গ্রেড কাচের ফিডার বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ব্যবহার করুন।
৪. আমরা কি বর্তমান যুগে এসে সম্পূর্ণ প্লাস্টিকমুক্ত জীবনযাপন করতে পারবো?
আজকের আধুনিক যুগে শতভাগ প্লাস্টিকমুক্ত হওয়া কঠিন, কারণ চিকিৎসার সরঞ্জাম (যেমন সিরিঞ্জ, স্যালাইন ব্যাগ) থেকে শুরু করে প্রযুক্তির অনেক কিছুতেই এটি লাগে। তবে দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ব্যবহার্য জিনিস, যেমন—বাজারের ব্যাগ, খাবারের পাত্র, পানির বোতলে প্লাস্টিক বর্জন করে আমরা এর ক্ষতিকর প্রভাব ৯০% পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারি।
৫. মাটিতে প্লাস্টিক জমলে গাছের ফল বা সবজি কি বিষাক্ত হয়?
হ্যাঁ, কৃষি বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মাটির ক্ষতিকর অত্যন্ত ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিক কণা উদ্ভিদের শিকড় তার পুষ্টির সাথে শুষে নিতে পারে। এর ফলে সেই কণাগুলো গাছের কাণ্ড, পাতা এবং ফলের ভেতরে চলে যায়। ফলস্বরূপ, সেই ফল বা সবজি খেলে প্লাস্টিকের রাসায়নিক আমাদের শরীরেও ঢোকে।


