ক্যালেন্ডারের প্রতিটি পাতাই যেন এক একটি জীবন্ত ইতিহাস। প্রতিটি দিনেরই রয়েছে মানবসভ্যতার জয়, ট্র্যাজেডি, বৈজ্ঞানিক যুগান্তকারী আবিষ্কার এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্থান-পতনের নিজস্ব এক স্বতন্ত্র গল্প। ১৯শে আগস্ট দিনটিও এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। হাজার হাজার বছর ধরে এই একক ২৪ ঘণ্টার চক্রটি রোমের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাটের বিদায়, ফটোগ্রাফির মাধ্যমে দৃশ্যমান স্মৃতি সংরক্ষণের গণতান্ত্রিক সূচনা, মধ্যপ্রাচ্যের গতিপথ পাল্টে দেওয়া গোপন অভিযান এবং মহাকাশে বীরত্বপূর্ণ যাত্রার মতো অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী হয়েছে।
বাংলার নদীতীর থেকে শুরু করে প্যারিস, মস্কো এবং বাগদাদের রাজপথ—সবখানেই ১৯শে আগস্ট এমন এক মোহনা হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে লেখা হয়েছে বিভিন্ন জাতির ভাগ্য এবং জন্ম নিয়েছেন বিশ্ববরেণ্য সাংস্কৃতিক আইকনরা। চলুন, আজকের এই দিনে ঘটে যাওয়া ইতিহাস, রাজনীতি, এবং সংস্কৃতির এক বিস্তারিত ও ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব-পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়া যাক।
বাঙালি পরিমণ্ডল ও দক্ষিণ এশিয়ার মাইলফলক
ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলার সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপটে ১৯শে আগস্ট এমন কিছু রাজনৈতিক, শৈল্পিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে, যা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে।
১৭৫৭: কলকাতায় প্রথম ঔপনিবেশিক মুদ্রার (রুপির) প্রচলন
১৭৫৭ সালের জুনে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর, রবার্ট ক্লাইভ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার নতুন নবাব মীর জাফরের সাথে একটি বাধ্যতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এই চুক্তির অধীনে কোম্পানি তাদের নিজস্ব মুদ্রা তৈরির সার্বভৌম অধিকার লাভ করে। ফলশ্রুতিতে, ১৭৫৭ সালের ১৯শে আগস্ট কলকাতার টাঁকশালে প্রথমবারের মতো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিজস্ব রুপি তৈরি করা হয়। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ছিল না, বরং বাংলা এবং সমগ্র উপমহাদেশ জুড়ে ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক আধিপত্য এবং পদ্ধতিগত অর্থনৈতিক শোষণের এক আনুষ্ঠানিক সূচনা ছিল।
১৯৪২: বালিয়া বিদ্রোহ এবং ‘স্বরাজ’ সরকার গঠন
মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ (Quit India) আন্দোলনের চূড়ান্ত উত্তেজনার সময়, পূর্ব উত্তর প্রদেশের বালিয়া শহরে এক অভাবনীয় উপনিবেশ-বিরোধী বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। বিপ্লবী নেতা চিত্তু পান্ডের নেতৃত্বে, ১৯৪২ সালের ১৯শে আগস্ট হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতা স্থানীয় কারাগারে হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করে এবং স্বাধীন সমান্তরাল এক জনপ্রশাসন বা ‘স্বরাজ সরকার’ প্রতিষ্ঠা করে। যদিও কয়েকদিন পরই ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী নিষ্ঠুরভাবে জেলাটি পুনর্দখল করে নেয়, কিন্তু নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠার এই দুঃসাহসী পদক্ষেপের জন্য বালিয়া চিরকালের জন্য ‘বাগী বালিয়া’ (বিদ্রোহী বালিয়া) উপাধি অর্জন করে।
১৯৪৬: গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের পর ত্রাণ ও মানবিকতার ঘুরে দাঁড়ানো
১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-কে কেন্দ্র করে কলকাতায় যে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল, ১৯শে আগস্ট দিনটি ছিল সেই দাঙ্গার মোড় ঘোরানোর এক নির্ণায়ক মুহূর্ত। এদিন পাড়া-মহল্লার বিভেদ ভুলে বেসামরিক ত্রাণকর্মী, ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক এবং সম্প্রদায়ের নেতারা একত্রিত হয়ে গণ-আশ্রয়কেন্দ্র এবং ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। বাংলার বুদ্ধিজীবী এবং মানবিক সংগঠনগুলো আটকে পড়া পরিবারগুলোকে উদ্ধার করতে এবং দাঙ্গার বিস্তার রোধ করতে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।
দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের জন্ম ও মৃত্যু
ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সমাজ সংস্কার এবং জনজীবনে অসামান্য অবদান রাখা বেশ কয়েকজন আইকনিক ব্যক্তিত্বের সাথে ১৯শে আগস্ট গভীরভাবে যুক্ত।
জহির রায়হান (জন্ম: ১৯ আগস্ট ১৯৩৫ – মৃত্যু: ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২)

ফেনীর মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী জহির রায়হান ছিলেন বাংলার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এই মানুষটির সৃজনশীলতা ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭০ সালে তার নির্মিত রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করে, যেখানে একজন আধিপত্যকামী নারী চরিত্রকে রাষ্ট্রের স্বৈরাচারের রূপক হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়, সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্মম হত্যাযজ্ঞকে তিনি তার ২০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’-এ তুলে ধরেন, যা বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে মিরপুরে তার নিখোঁজ ভাই, প্রখ্যাত সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজেই এক মর্মান্তিক ও রহস্যজনক পরিস্থিতিতে চিরতরে হারিয়ে যান।
পদ্মজা নাইডু (জন্ম: ১৯ আগস্ট ১৯০০ – মৃত্যু: ২ মে ১৯৭৫)
কিংবদন্তি কবি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী সরোজিনী নাইডুর কন্যা পদ্মজা নাইডু নিজেও ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী স্বাধীনতা কর্মী। ভারতের স্বাধীনতার পর, তিনি ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—যা তাকে ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী নারী গভর্নরের মর্যাদা দেয়। পরবর্তীতে তিনি ইন্ডিয়ান রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারপারসন হিসেবে কাজ করেন এবং জনস্বাস্থ্য, শরণার্থী পুনর্বাসন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দশকের পর দশক ব্যয় করেন। দার্জিলিংয়ের ‘পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক’ তারই সম্মানে নামকরণ করা হয়েছে।
উৎপল দত্ত (মৃত্যু: ১৯ আগস্ট ১৯৯৩ – জন্ম: ২৯ মার্চ ১৯২৯)
১৯৯৩ সালের এই দিনে ভারতীয় নাট্যজগৎ তার অন্যতম শক্তিশালী এক স্তম্ভকে হারায়। ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’ (যা পরে ‘পিপলস লিটল থিয়েটার’ নামে পরিচিত হয়)-এর প্রতিষ্ঠাতা উৎপল দত্ত পথনাটক এবং মঞ্চকে ব্যবহার করেছিলেন ‘কল্লোল’, ‘অঙ্গার’ এবং ‘টিনের তলোয়ার’-এর মতো আপোষহীন, মার্কসবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত রাজনৈতিক নাটক নির্মাণের জন্য। সমান্তরাল এবং বাণিজ্যিক—উভয় ধারার ভারতীয় সিনেমাতেই উৎপল দত্ত ছিলেন সমানভাবে জনপ্রিয়। মৃণাল সেনের যুগান্তকারী চলচ্চিত্র ‘ভুবন সোম’ (১৯৬৯)-এ অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া হৃষিকেশ মুখার্জির ‘গোলমাল’ (১৯৭৯) এবং ‘নরম গরম’ (১৯৮১)-এর মতো ধ্রুপদী কমেডি সিনেমায় তার অসাধারণ হাস্যরসাত্মক অভিনয়ের জন্য তিনি আজও দর্শকদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।
বিশ্ব ইতিহাসের পাতা থেকে
উপমহাদেশের বাইরেও ১৯শে আগস্ট দিনটি বিশ্ব ইতিহাসের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং পটপরিবর্তনের মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে।
১৪ খ্রিষ্টাব্দ: সিজার অগাস্টাসের মৃত্যু এবং সাম্রাজ্যিক রোমের পালাবদল
১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে আগস্ট, গাইয়াস জুলিয়াস সিজার অক্টাভিয়ানাস (সম্রাট অগাস্টাস) ইতালির নোলা শহরে ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। রোমান প্রজাতন্ত্রকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে অগাস্টাস পশ্চিমা ধ্রুপদী বিশ্বকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। তিনি রোমান প্রিন্সিপেট প্রতিষ্ঠা করেন, ‘প্যাক্স রোমানা’ (দুই শতাব্দীর অভ্যন্তরীণ শান্তি) সূচনা করেন, কর ব্যবস্থার সংস্কার করেন এবং রোমের ভৌত অবকাঠামো পুনরায় নির্মাণ করেন। কথিত আছে, তার শেষ কথা ছিল—”আমি রোমকে পেয়েছিলাম ইটের তৈরি এক শহর হিসেবে, আর রেখে যাচ্ছি মার্বেলের শহর হিসেবে।” তার এই উক্তি রোমান সাম্রাজ্যের স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপকেই নির্দেশ করে।
১৮৩৯: বিশ্বকে ফ্রান্সের ফটোগ্রাফি উপহার
প্যারিসে ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্সেস এবং একাডেমি দে বোজ-আর্টস-এর এক যৌথ অধিবেশনে পদার্থবিদ ও রাজনীতিবিদ ফ্রাঁসোয়া আরাগন, লুই ডাগুয়েরের যুগান্তকারী ‘ডাগুয়েরোটাইপ’ (Daguerreotype) প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত দিকগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। দৃশ্যমান স্মৃতি সংরক্ষণের এই অভাবনীয় শক্তিকে অনুধাবন করে, ফরাসি সরকার এর প্যাটেন্ট স্বত্ব কিনে নেয় এবং ফটোগ্রাফিকে “বিশ্বের জন্য একটি উন্মুক্ত উপহার” হিসেবে ঘোষণা করে। এই যুগান্তকারী মুহূর্তটিকে স্মরণ করেই ১৯শে আগস্ট বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস’ পালিত হয়।
১৯৪২: অপারেশন জুবিলি – ডিয়েপ্পের ট্র্যাজেডি ও শিক্ষা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোতে, প্রায় ৬,০০০ মিত্রবাহিনীর সেনা—যাদের বেশিরভাগই ছিল ২য় কানাডিয়ান পদাতিক ডিভিশনের এবং সাথে ছিল ব্রিটিশ কমান্ডো ও আমেরিকান রেঞ্জাররা—জার্মান অধিকৃত ফরাসি বন্দর ডিয়েপ্পে এক বিশাল উভচর আক্রমণ (amphibious assault) চালায়। ‘অপারেশন জুবিলি’ নামক এই অভিযানটি ছিল কৌশলগত দিক থেকে এক ভয়ংকর বিপর্যয়: কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৯০০ জনেরও বেশি কানাডিয়ান সেনা নিহত হন এবং প্রায় ২,০০০ সেনা ওই নুড়িপাথরের উন্মুক্ত সৈকতে বন্দি হন। তবে ডিয়েপ্পের এই ব্যর্থতা মিত্রবাহিনীকে উভচর সাঁজোয়া যানের ব্যবহার, উপকূলীয় বোমা হামলা এবং লজিস্টিকাল সময়জ্ঞান সম্পর্কে এমন কিছু অমূল্য শিক্ষা দিয়েছিল, যা ঠিক দুই বছর পর নরম্যান্ডিতে সফল ‘ডি-ডে’ অবতরণের পথ প্রশস্ত করেছিল।
১৯৫৩: অপারেশন আজাক্স এবং মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের পতন
১৯৫৩ সালের ১৯শে আগস্ট ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (CIA) এবং যুক্তরাজ্যের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (MI6)-এর একটি গোপন গোয়েন্দা অভিযানের সমাপ্তি ঘটে। ‘অপারেশন আজাক্স’ (Operation Ajax) নামের এই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তার ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি দেশের তেলের মজুদ জাতীয়করণ করেছিলেন। এই অভ্যুত্থানের ফলে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির অধীনে নিরঙ্কুশ রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা সুসংহত হয়। তবে এর ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী; পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব, যা আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকে চিরতরে বদলে দেয়।
১৯৬০: স্পুটনিক ৫ এবং কুকুর মহাকাশচারী বেলকা ও স্ট্রেলকা
মানুষকে মহাকাশের শূন্যতায় পাঠানোর আগে, বিজ্ঞানীদের এটা নিশ্চিত করতে হয়েছিল যে জটিল জীবজন্তুরা কক্ষপথের বিকিরণ এবং ওজনহীনতা সহ্য করে বাঁচতে পারবে কি না। ১৯৬০ সালের ১৯শে আগস্ট, সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘স্পুটনিক ৫’ (Korabl-Sputnik 2) উৎক্ষেপণ করে। এতে ছিল বেলকা (“কাঠবিড়ালি”) এবং স্ট্রেলকা (“ছোট তীর”) নামের দুটি রাস্তার কুকুর, সাথে ৪০টি ইঁদুর, ২টি র্যাট এবং বেশ কয়েক ধরনের উদ্ভিদের বীজ। পৃথিবীকে ১৭ বার প্রদক্ষিণ করার পর মহাকাশযানটি নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে। বেলকা ও স্ট্রেলকা হয়ে ওঠে পৃথিবীর প্রথম প্রাণী যারা মহাকাশে গিয়ে জীবিত ফিরে আসে। এটি মানুষের মহাকাশ ভ্রমণের শারীরিক সম্ভাবনা প্রমাণ করেছিল, যা ১৯৬১ সালের এপ্রিলে ইউরি গ্যাগারিনের ঐতিহাসিক যাত্রাকে সম্ভব করে তোলে।
১৯৮৯: প্যান-ইউরোপিয়ান পিকনিক এবং লৌহ যবনিকা ভেদ
হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়া সীমান্তের সোপ্রন শহরের কাছে, ১৯৮৯ সালের ১৯শে আগস্ট ‘প্যান-ইউরোপিয়ান পিকনিক’ নামক একটি শান্তি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। হাঙ্গেরির সংস্কারপন্থী কর্তৃপক্ষের নীরব সম্মতিতে, সীমান্ত গেটটি প্রতীকীভাবে তিন ঘণ্টার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। হাঙ্গেরিতে ছুটি কাটাতে আসা ৬০০ জনেরও বেশি পূর্ব জার্মান নাগরিক এই সুযোগ লুফে নেন এবং সীমান্ত পার হয়ে অস্ট্রিয়ায় প্রবেশ করেন। এটি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘আয়রন কার্টেইন’ বা লৌহ যবনিকায় প্রথম বড় ধরনের ফাটল। এই শান্তিপূর্ণ প্রস্থানের ঘটনাপ্রবাহ সরাসরি সেই বছরের নভেম্বরে বার্লিন প্রাচীর পতনের দিকে নিয়ে যায়।
১৯৯১: সোভিয়েত ‘আগস্ট অভ্যুত্থান’ প্রচেষ্টা
মস্কোয় কমিউনিস্ট পার্টির কট্টরপন্থী অংশ, সামরিক প্রধান এবং কেজিবি নেতৃত্ব মিলে “স্টেট কমিটি অন দ্য স্টেট অফ ইমার্জেন্সি” (GKChP) গঠন করে এবং সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের বিরুদ্ধে এক সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে। ক্রিমিয়ার ফোরোসে গর্বাচেভকে তার বাসভবনে গৃহবন্দি করে রেখে, ষড়যন্ত্রকারীরা মস্কোর রাস্তায় ট্যাংক নামিয়ে দেয় যাতে ‘নতুন ইউনিয়ন চুক্তি’ সই করা না যায়। কিন্তু আত্মসমর্পণ করার বদলে বরিস ইয়েলৎসিনের নেতৃত্বে হাজার হাজার রুশ নাগরিক রাশিয়ান পার্লামেন্ট ভবনের চারপাশে ব্যারিকেড গড়ে তোলেন। মাত্র তিন দিনেই এই অভ্যুত্থান ভেঙে পড়ে, যা কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয় এবং মাত্র চার মাস পরই সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক পতনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
২০০৩: বাগদাদে ক্যানেল হোটেলে বোমা হামলা
২০০৩ সালের ১৯শে আগস্ট বিশ্ব মানবিক কর্মী সম্প্রদায়ের ওপর এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি নেমে আসে। ইরাকের বাগদাদে ক্যানেল হোটেলে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে একটি আত্মঘাতী ট্রাক বোমা বিস্ফোরিত হয়। এই হামলায় ২২ জন নিহত এবং ১০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার এবং ইরাকে মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি সার্জিও ভিয়েরা ডি মেলো। একজন অত্যন্ত মেধাবী ও সহানুভূতিশীল ব্রাজিলিয়ান কূটনীতিক হিসেবে তার মৃত্যু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল শোকের ছায়া ফেলে। তার এবং সকল মানবিক কর্মীদের স্মরণে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯শে আগস্ট দিনটিকে ‘বিশ্ব মানবিক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
আঞ্চলিক ইতিহাসের খণ্ডচিত্র
উত্তর আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্র
-
১৮১২ — ইউএসএস কনস্টিটিউশনের ‘ওল্ড আয়রনসাইডস’ নাম অর্জন: ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময়, নোভা স্কটিয়ার উপকূলে ব্রিটিশ ফ্রিগেট এইচএমএস গুরিয়ারের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেন আইজ্যাক হালের নেতৃত্বে ইউএসএস কনস্টিটিউশন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। যখন ব্রিটিশদের ১৮ পাউন্ডের কামানের গোলা আমেরিকান জাহাজের শক্ত সাদা ওক কাঠের গায়ে লেগে ফিরে আসছিল, তখন একজন আমেরিকান নাবিক আনন্দে চিৎকার করে বলে ওঠেন, “হুররে! এর দুই পাশ যেন লোহা দিয়ে বানানো!” এই বিজয় প্রমাণ করেছিল যে নৌ শক্তিতে আমেরিকা ব্রিটেনের সমকক্ষ।
-
১৯৫৮ — ক্লারা লুপার এবং কাৎজ ড্রাগ স্টোর সিট-ইন: নাগরিক অধিকারের পথিকৃৎ ক্লারা লুপার এবং ওকলাহোমা সিটি এনএএসিপি ইয়ুথ কাউন্সিলের সদস্যরা মিলে ওকলাহোমা সিটির কাৎজ ড্রাগ স্টোরে শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গদের জন্য নির্ধারিত লাঞ্চ কাউন্টারে এক অহিংস অবস্থান ধর্মঘট (sit-in) শুরু করেন। তাদের এই নিরলস অহিংস সংগ্রাম মালিকপক্ষকে বাধ্য করে তিনটি রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা তাদের ৩৮টি স্টোরের লাঞ্চ কাউন্টারে বর্ণবাদ বিলুপ্ত করতে।
ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য
-
১৫৬১ — মেরি স্টুয়ার্টের স্কটল্যান্ডে আগমন: স্বামী, ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় ফ্রান্সিসের অকাল মৃত্যুর পর, ১৮ বছর বয়সী মেরি (কুইন অব স্কটস) শৈশব থেকে ফ্রান্সে কাটানোর পর নিজের সিংহাসন আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করতে স্কটল্যান্ডের লেইথ বন্দরে এসে পৌঁছান।
-
১৯৪৪ — প্যারিসের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু: ফ্রেঞ্চ ফোর্সেস অফ দ্য ইন্টেরিয়র (FFI), ধর্মঘটকারী রেলকর্মী এবং মিউনিসিপ্যাল পুলিশের সাথে হাত মিলিয়ে প্যারিসজুড়ে দখলদার জার্মান গ্যারিসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। এই বিদ্রোহই জেনারেল ফিলিপ লেক্লার্কের ২য় ফ্রেঞ্চ আর্মার্ড ডিভিশন এবং মিত্রবাহিনীকে ২৫শে আগস্ট প্যারিসকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্ত করার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়।
বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জন্মদিন
নেতৃত্ব, আবিষ্কার, সংস্কৃতি এবং দূরদর্শিতার ভিন্ন ভিন্ন জগৎ থেকে আসা বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্ম এই ১৯শে আগস্ট:
অরভিল রাইট (জন্ম: ১৯ আগস্ট ১৮৭১ – মৃত্যু: ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮)
বড় ভাই উইলবার রাইটের সাথে মিলে অরভিল রাইট মানবজাতির চলাফেরার ধারণাকেই মৌলিকভাবে পাল্টে দিয়েছিলেন। ১৯০৩ সালের ১৭ই ডিসেম্বর, নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হকে, অরভিল ‘রাইট ফ্লায়ার’ নামের একটি যান চালিয়ে ১২ সেকেন্ডের জন্য ১২০ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করেন। এটিই ছিল মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত, টেকসই এবং মোটর-চালিত সফল উড্ডয়ন। তার এই অবদানের সম্মানার্থে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯শে আগস্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ন্যাশনাল অ্যাভিয়েশন ডে’ (জাতীয় বিমান চলাচল দিবস) হিসেবে পালন করা হয়।
কোকো শ্যানেল (জন্ম: ১৯ আগস্ট ১৮৮৩ – মৃত্যু: ১০ জানুয়ারি ১৯৭১)
ফ্রান্সের সোমুরে গ্যাব্রিয়েল বোনার শ্যানেল নামে জন্মগ্রহণ করা এই নারী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে নারীদের পোশাকে এক বিশাল বিপ্লব এনেছিলেন। কষ্টকর কর্সেট (corset) পরার প্রথা বাতিল করে তিনি স্পোর্টি, আরামদায়ক এবং রুচিশীল পোশাকের প্রচলন করেন। তার হাত ধরেই আমরা পাই চিরন্তন ফ্যাশন স্ট্যাপল ‘লিটল ব্ল্যাক ড্রেস’, শ্যানেল স্যুট এবং বিখ্যাত ‘শ্যানেল নাম্বার ৫’ পারফিউম। তার ডিজাইনের মূল দর্শন ছিল আরামের সাথে আধুনিক নারী স্বাধীনতার অপূর্ব মিশ্রণ।
জিন রডেনবেরি (জন্ম: ১৯ আগস্ট ১৯২১ – মৃত্যু: ২৪ অক্টোবর ১৯৯১)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন যুদ্ধবিমান চালক এবং লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা জিন রডেনবেরি ১৯৬৬ সালে কালজয়ী সায়েন্স ফিকশন ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘স্টার ট্রেক’ (Star Trek) তৈরি করে টেলিভিশনের দুনিয়ায় এক পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। ২৩ শতকের স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে তিনি দারিদ্র্য, বর্ণবাদ এবং যুদ্ধমুক্ত এক আশাবাদী ও মানবিক ভবিষ্যতের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধ এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের চরম উত্তেজনার যুগে বিভিন্ন জাতি-বর্ণের সমন্বয়ে তৈরি করা একটি ক্রু দেখিয়ে এই সিরিজটি তখন এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
বিশ্বের স্মরণীয় প্রয়াণ (১৯শে আগস্ট)
বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিক এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিদায়ের দিন হিসেবেও ১৯শে আগস্ট ইতিহাসের পাতায় দাগ কেটে আছে।
ব্লেইজ প্যাসকেল (জন্ম: ১৯ জুন ১৬২৩ – মৃত্যু: ১৯ আগস্ট ১৬৬২)
ফরাসি পলিম্যাথ (বহুবিদ্যায় পারদর্শী) ব্লেইজ প্যাসকেল মাত্র ৩৯ বছর বয়সে প্যারিসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজীবন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগেও তিনি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, হাইড্রোডাইনামিকস এবং গণিতে মৌলিক অবদান রেখে গেছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর (প্যাসকেলাইন) উদ্ভাবন এবং পিয়েরে ডি ফার্ম্যাটের সাথে মিলে সম্ভাব্যতা তত্ত্বের (probability theory) গাণিতিক সূত্রায়ন। পদার্থবিজ্ঞানে চাপের এসআই একক ‘প্যাসকেল’ (Pa) এবং ‘প্যাসকেলের সূত্র’ আজও তার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের স্থায়ী সাক্ষী হয়ে আছে।
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা (জন্ম: ৫ জুন ১৮৯৮ – মৃত্যু: ১৯ আগস্ট ১৯৩৬)
স্পেনের ‘জেনারেশন অব টুয়েন্টি সেভেন’-এর অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক পর পরই জাতীয়তাবাদী আধাসামরিক বাহিনীর হাতে অপহৃত ও নিহত হন। ‘রোমান্সেরো গিতানো’ (Gypsy Ballads)-এর মতো কবিতার বই এবং ‘ব্লাড ওয়েডিং’ ও ‘দ্য হাউস অফ বার্নার্ডা আলবা’-এর মতো নাটকের জন্য বিখ্যাত লোরকার এই হত্যাকাণ্ড তাকে পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী সর্বগ্রাসিতার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিরোধের এক স্থায়ী আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত করে।
লিনাস পলিং (জন্ম: ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯০১ – মৃত্যু: ১৯ আগস্ট ১৯৯৪)
মার্কিন রসায়নবিদ, প্রাণরসায়নবিদ এবং শান্তি কর্মী লিনাস পলিং ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি এককভাবে দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। রাসায়নিক বন্ধনের প্রকৃতি এবং জটিল অণুর গঠন নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি ১৯৫৪ সালে রসায়নে নোবেল পান। এরপর পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বিরুদ্ধে তার ক্লান্তিহীন আন্তর্জাতিক প্রচারণার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬২ সালে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক দিবস ও জাতীয় উদ্যাপন
-
বিশ্ব মানবিক দিবস (জাতিসংঘ): ২০০৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবর্তিত এই দিনটি সেই সকল মানবিক কর্মীদের স্মরণ করে, যারা বিশ্বব্যাপী সংঘাতপূর্ণ এলাকা, শরণার্থী শিবির এবং জলবায়ু-বিপর্যস্ত অঞ্চলগুলোতে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিতে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নেন।
-
বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস: পেশাদার ফটোগ্রাফার, ফটোসাংবাদিক এবং বিশ্বের লাখো ছবিপ্রেমীদের দ্বারা পালিত এই দিনটি মানুষের জীবনের সত্য ঘটনা ও শৈল্পিক অভিব্যক্তি ফ্রেমবন্দী করার আনন্দকে উদযাপন করে।
-
জাতীয় স্বাধীনতা দিবস (আফগানিস্তান): ১৯শে আগস্ট আফগানিস্তানের জাতীয় দিবস। ১৯১৯ সালের ১৯শে আগস্ট স্বাক্ষরিত অ্যাংলো-আফগান রাওয়ালপিন্ডি চুক্তির স্মৃতিতে এই দিনটি পালিত হয়, যে চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তান আমিরাতের বৈদেশিক বিষয়ক পূর্ণ সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়েছিল।
জানতেন কি? (ঐতিহাসিক মজার তথ্য)
-
স্পুটনিক ৫-এর ‘কোল্ড ওয়ার পাপি’ বা স্নায়ুযুদ্ধের কুকুরছানা: ১৯৬০ সালের ১৯শে আগস্ট কক্ষপথ থেকে নিরাপদে ফিরে আসার কিছুকাল পর, মহাকাশচারী কুকুর স্ট্রেলকা ছয়টি সুস্থ কুকুরছানার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ এর মধ্যে ‘পুশিঙ্কা’ (যার অর্থ ‘ফ্ল্যাফি’ বা তুলতুলে) নামের একটি ছানা মার্কিন ফার্স্ট লেডি জ্যাকুলিন কেনেডিকে উপহার হিসেবে পাঠান। পুশিঙ্কা পরবর্তীতে কেনেডি পরিবারের পোষা কুকুর চার্লির সাথে মিলে চারটি কুকুরছানার জন্ম দেয়, যাদের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি আদর করে ‘পাপনিকস’ (Pupniks) বলে ডাকতেন।
-
ফটোগ্রাফির ‘উন্মুক্ত উপহারে’র একটি ব্যতিক্রম: ১৮৩৯ সালের আগস্টে ফরাসি সরকার যখন লুই ডাগুয়েরের প্যাটেন্ট কিনে নিয়ে মানবজাতিকে এই প্রযুক্তি বিনামূল্যে উপহার দেয়, তখন তারা জানত না যে মাত্র কয়েকদিন আগেই ডাগুয়ের গ্রেট ব্রিটেনে একটি স্বাধীন প্যাটেন্ট দাখিল করেছিলেন! এর ফলে সারা বিশ্বের ফটোগ্রাফাররা বিনামূল্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলেও, ব্রিটিশ ফটোগ্রাফারদের প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে লাইসেন্স কিনতে হয়েছিল।
-
অগাস্টাসের কাকতালীয় মৃত্যু: ১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে আগস্ট ইতালির নোলা শহরে সম্রাট অগাস্টাস মারা যান। অবাক করা বিষয় হলো, তিনি ঠিক সেই ঘরেই মারা গিয়েছিলেন যেখানে ৭২ বছর আগে তার জন্মদাতা পিতা গাইয়াস অক্টাভিয়াস শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন! উল্লেখ্য, ৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রোমান সিনেট অগাস্টাসের সামরিক ও রাজনৈতিক কৃতিত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে ক্যালেন্ডারের ‘সেক্সটিলিস’ মাসের নাম পরিবর্তন করে ‘অগাস্টাস’ (August) রেখেছিল।
শেষ কথা
শত শত বছর জুড়ে ১৯শে আগস্ট দিনটির দিকে ফিরে তাকালে আমরা বুঝতে পারি যে, কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং সামষ্টিক আন্দোলন আমাদের আজকের আধুনিক বিশ্বকে রূপ দিয়েছে। ১৭৫৭ সালে বাংলায় ঔপনিবেশিক মুদ্রার প্রচলন থেকে শুরু করে ১৯৪২ সালে ডিয়েপ্পে মিত্রবাহিনীর আত্মত্যাগ, কিংবা জহির রায়হানের ক্যামেরায় ধরা পড়া কালজয়ী প্রতিরোধ থেকে শুরু করে ১৮৩৯ সালে ফটোগ্রাফির মতো এক জাদুকরী গণতান্ত্রিক উপহার—এই দিনটি মানুষের টিকে থাকার লড়াই, সৃজনশীলতা এবং মানব জীবনের জটিল অভিজ্ঞতার এক অনবদ্য দলিল।
এই ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা একটি বিষয় খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি; আজ আমরা যে স্বাধীনতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং শৈল্পিক ঐতিহ্য উপভোগ করছি, তা একদিনে আসেনি। ১৯শে আগস্টের মতো কোনো না কোনো দিনে, কোনো না কোনো সাহসী মানুষের নেওয়া পদক্ষেপের প্রত্যক্ষ ফসলই হলো আমাদের আজকের এই পৃথিবী।

