১৯৭১। পশ্চিমবঙ্গের এক শরণার্থী শিবিরে চোখে অবিশ্বাস্য ক্লান্তি, ভয় আর অসহায়ত্ব নিয়ে একদল মানুষ তাকিয়ে আছে একটি ক্যামেরার দিকে— “স্টপ জেনোসাইড”-এর জন্য তোলা এই মুহূর্তগুলোই বলে দেয়, জহির রায়হান কেবল একজন চলচ্চিত্রকার ছিলেন না—তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সত্যকে পালাতে দেননি, বিপজ্জনক পথ আর অশান্ত সময়ের অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন সত্যের সন্ধানে।
এই মানুষটিই দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ছয় সপ্তাহ পর ঢাকার মিরপুরে যাবেন তাঁর নিখোঁজ অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারের খোঁজে—আর সেখান থেকে আর ফিরবেন না। বস্তুত জহির রায়হান এমন একজন মানুষ যিনি সারাজীবনই অনুপস্থিত সত্যের খোঁজ করেছেন—কখনো সংবাদপত্রের পাতায়, কখনো গল্প-উপন্যাসে, কখনো চলচ্চিত্রের দৃশ্যে, আর একাত্তরে সরাসরি ক্যামেরার লেন্সে। মিরপুরের সেই যাত্রা থেকে তিনি আর ফিরে আসেননি; তাঁকে নিহত বলে ধরে নেওয়া হয়, তাঁর দেহও ফিরে আসেনি। কিন্তু তিনি বারবার ফিরে আসেন কালের সাক্ষী হয়ে, একটি জাতির জন্ম ইতিহাসের সংগত হিসাবে।
এই কারণেই জহির রায়হানের জীবনকে শুধু একজন চলচ্চিত্রকারের জীবন বলা যায় না। সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক, ভাষা আন্দোলনের কর্মী, চলচ্চিত্রনির্মাতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষ্য-সংগ্রাহক—এই পরিচয়গুলো তাঁর মধ্যে বিচ্ছিন্ন ছিল না, বরং একে অন্যের ভেতর প্রবাহিত হয়েছিল। সাংবাদিকতার সাহসিকতা তাঁকে শিখিয়েছিল ঘটনার দিকে সরাসরি তাকাতে, আর ক্যামেরার লেন্স সেই দৃষ্টিকে দিয়েছিল দৃশ্যমান ইতিহাসের শক্তি। কলম ও ক্যামেরা ছিল তাঁর হাতে দুটি ভিন্ন মাধ্যম মাত্র—তাদের নৈতিক কেন্দ্র ছিল একটাই: অন্যায়কে উন্মোচন করা।
দেশভাগ, ভাষার প্রশ্ন এবং এক নতুন নামের জন্ম
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার সোনাগাজীর মজুপুর গ্রামে জন্মেছিলেন আবু আবদাল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ডাকনাম ছিল জাফর। পিতা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, মাতা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন; আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবের একটি অংশ কেটেছিল কলকাতায়। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর পরিবারটি কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। অর্থাৎ তাঁর কৈশোরের চোখের সামনে মানচিত্র বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, মানুষের পরিচয়ের ভাষা বদলানোর চেষ্টা হয়েছে। ইতিহাস তাঁর কাছে পাঠ্যবইয়ের বিষয় হয়ে আসেনি বরং তিনি ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে হেটেছেন।
এর কয়েক বছরের মধ্যেই আরেক সংকট সামনে এল—ভাষার সংকট। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। প্রায় ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত তাঁর কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কথাও জানা যায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এই সময়ের কাছাকাছি তাঁর নাম জহিরুল্লাহ থেকে জহির রায়হান হয়ে ওঠে। নামের এই পরিবর্তন নিছক সাহিত্যিক ছদ্মনামের ঘটনা নয় বলেই মনে হয়; যেন এক তরুণ নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তাকে নতুন করে চিহ্নিত করছিলেন। বাংলার ভাষা, মানুষের অধিকার এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব—এই তিনের টানাপোড়েন তাঁর চেতনার ভিত গড়ে দেয়।
পঞ্চাশের দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং আনুমানিক ১৯৫৮ সালের দিকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আরও বিস্তৃত—রাস্তা, আন্দোলন, সংবাদপত্রের দপ্তর, মানুষের মুখ এবং রাষ্ট্রের চাপের মধ্যে বেঁচে থাকা একটি সমাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য তাঁকে ভাষার গভীরতা দিয়েছে; রাজনীতি দিয়েছে প্রশ্ন করার অভ্যাস; আর সাংবাদিকতা খুব অল্প বয়সেই দিয়েছে বাস্তবতার শীতল স্পর্শ।
জীবনী এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম তারিখ ও স্থান | ১৯ আগস্ট ১৯৩৫; মজুপুর গ্রাম, সোনাগাজী, তৎকালীন ফেনী মহকুমা, নোয়াখালী জেলা, অবিভক্ত বাংলা |
| প্রকৃত নাম | আবু আবদাল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ; ডাকনাম ‘জাফর’; প্রায় ১৯৫২ নাগাদ ‘জহির রায়হান’ নাম গ্রহণ |
| পিতা-মাতা | মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ও সৈয়দা সুফিয়া খাতুন; আট সন্তানের মধ্যে তৃতীয় |
| শিক্ষা | পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য; আনুমানিক ১৯৫৮ সালে স্নাতক |
| স্ত্রী | প্রদত্ত যাচাইকৃত তথ্যতালিকায় নাম নেই; প্রকাশের আগে পৃথক যাচাই প্রয়োজন |
| সন্তান | প্রদত্ত যাচাইকৃত তথ্যতালিকায় নাম নেই; প্রকাশের আগে পৃথক যাচাই প্রয়োজন |
| রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা | প্রায় ১৯৫১–১৯৫৭ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা; ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বে যুক্ত |
| নিখোঁজ/মৃত্যু তারিখ ও প্রেক্ষাপট | ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২; মিরপুরে নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লা কায়সারের সন্ধানে গিয়ে আর ফেরেননি; নিহত বলে ধরে নেওয়া হয় |
| উল্লেখযোগ্য সম্মাননা | বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ১৯৭২; একুশে পদক ১৯৭৭; স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৯২; ২০০৫ সালের হাজার বছর ধরে চলচ্চিত্রের জন্য মরণোত্তর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার |
সাংবাদিকতার আদলে তৈরি হচ্ছিল চলচ্চিত্রকারের চোখ
জহির রায়হানের সাংবাদিকতা শুরু হয় প্রায় ১৯৫০ সালে, যুগের আলো পত্রিকায়। তখন তাঁর বয়স খুব বেশি নয়। পরে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক ও সিনেমা পত্রিকার সঙ্গে কাজ করেন বা লেখেন। ১৯৫৬ সালে বাংলা মাসিক প্রবাহ-এর সম্পাদক হন। ইংরেজি সাপ্তাহিক Express-এর সম্পাদনার সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত। এই সাংবাদিক জীবনই তৈরি করেছিল তাঁর সেই চোখ, যা পরে ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারের ভেতর দিয়ে সমাজকে চিনে নিয়েছিল।
সাংবাদিকতার প্রথম শিক্ষা হলো, দৃশ্যের বাইরে কী আছে তা দেখতে শেখা। একটি ঘটনার ওপরিভাগ থাকে—কী ঘটেছে; আর তার অন্তর্গত স্তর থাকে—কেন ঘটেছে, কাদের ওপর ঘটেছে, কারা কথা বলতে পারছে না। জহির রায়হানের পরবর্তী সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে এই অনুসন্ধিৎসা স্পষ্ট। তাঁর গল্পে মানুষ শুধু চরিত্র নয়, একটি সময়ের সাক্ষী; তাঁর চলচ্চিত্রে পরিবার শুধু পরিবার নয়, বৃহত্তর সমাজের সংকেত। সাংবাদিকের চোখ এখানে শিল্পীর চোখকে তাকে শাণিত করে তুলেছিল।
এই কারণেই তাঁর চলচ্চিত্রকে বোঝার জন্য শুধু নন্দনতত্ত্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই হয় না; সংবাদবোধের দরজাটিও খুলতে হয়। সাংবাদিক জানেন, একটি দৃশ্য কখনো নিরীহ নয়—ক্যামেরা কোথায় রাখা হলো, কাকে দেখা গেল, কাকে দেখা গেল না, কোন নীরবতা দীর্ঘ হলো, কোন মুখের ওপর আলো পড়ল—এসবই অর্থ তৈরি করে। জহির রায়হানের চলচ্চিত্রবোধে এই নির্বাচন-সচেতনতার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। তাঁর বাস্তববাদ কোনো শুষ্ক অনুলিপি নয়; বরং বাস্তবতার রাজনৈতিক তাপমাত্রা মাপার এক পদ্ধতি। সেই কারণেই তাঁর চলচ্চিত্রে সময়ের স্পন্দন এত প্রবল। তিনি যেন পর্দাকে সংবাদপত্রের পরদিনের পাতা বানাতে চাননি, বরং এমন এক দীর্ঘস্থায়ী নথি বানাতে চেয়েছিলেন, যা ঘটনার তাৎক্ষণিকতা পেরিয়েও মানুষের স্মৃতিতে কাজ করবে।
আর সাংবাদিকতার আরেকটি শিক্ষা—সময়ের বিরুদ্ধে কাজ করা। সংবাদ বিলম্ব সহ্য করে না। জহির রায়হানের সৃষ্টিশীল জীবনেও এক ধরনের তাড়না ছিল। তিনি যেন অপেক্ষা করতে শেখেননি। ভাষা আন্দোলনের অভিঘাত সাহিত্য হয়ে ফিরে এসেছে; রাজনৈতিক দমন চলচ্চিত্রে রূপক হয়ে উঠেছে; একাত্তরের হত্যাযজ্ঞ ঘটতে ঘটতেই তিনি ক্যামেরা তুলেছেন। তাঁর কাছে শিল্প ছিল পরবর্তী প্রজন্মের আরামদায়ক স্মৃতিচারণ নয়; বর্তমানের মধ্যে দাঁড়িয়ে সত্যকে ধরে রাখার কাজ।
সহকারী পরিচালকের আসন থেকে নিজের চলচ্চিত্রভাষা
চলচ্চিত্রে তাঁর আগমনও আকস্মিক বিচ্ছিন্নতা নয়। সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর কাজের তালিকায় আছে জাগো হুয়া সাভেরা (১৯৫৯), এ দেশ তোমার আমার (১৯৫৯), নবারুণ (১৯৬০) এবং যে নদী মরুপথে (১৯৬১)। জাগো হুয়া সাভেরা-তে তাঁর সহকারী পরিচালক হিসেবে সম্পৃক্ততার কথাও চলচ্চিত্র-ইতিহাসের সূত্রে পাওয়া যায়।
সহকারী পরিচালকের কাজের ভেতর দিয়ে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের শৃঙ্খলা, দৃশ্যের সংগঠন, অভিনেতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়—এসব বাস্তবতা আত্মস্থ করেছিলেন; তবে তাঁর নিজের নির্মাতা-সত্তা প্রকাশ পায় কখনো আসেনি চলচ্চিত্রে, ১৯৬১ সালে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে। এরপর কাঁচের দেয়াল, সঙ্গম, বেহুলা, আনোয়ারা হয়ে ১৯৭০-এর জীবন থেকে নেয়া—এই পথ কেবল একজন দক্ষ নির্মাতার পরিণতির ইতিহাস নয়; এটি একজন সংবাদসচেতন শিল্পীর রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠার ইতিহাসও। Banglapedia তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি কখনো আসেনি এবং পরবর্তী উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর ধারাবাহিকতা নথিবদ্ধ করেছে।
সঙ্গম ১৯৬৪ সালে উর্দু ভাষায় নির্মিত হয় এবং পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচিত। প্রযুক্তিগত নতুনত্বের প্রতি তাঁর আগ্রহ এখানে স্পষ্ট। কিন্তু জহির রায়হানের গুরুত্ব শুধু ‘প্রথম’ হওয়ার তালিকায় নয়। তাঁর বড় কৃতিত্ব, প্রযুক্তিকে তিনি সামাজিক দৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেননি। ক্যামেরা তাঁর কাছে চকচকে যন্ত্র নয়; মানুষের বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করার উপায়।
এই দৃষ্টির সবচেয়ে সংহত প্রকাশ জীবন থেকে নেয়া। ১৯৭০ সালের এই চলচ্চিত্রকে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি, এমনকি তাঁর শিল্পীসত্তার চূড়া বলেও বিবেচনা করা হয়। আইয়ুব খান-যুগের সেন্সরশাসিত পরিবেশে নির্মিত ছবিটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপক। এখানে সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় ভাষা নেই, সরাসরি রাজনৈতিক বক্তৃতাও চলচ্চিত্রের একমাত্র ভরকেন্দ্র নয়; আছে রূপক, পারিবারিক পরিসর এবং ক্ষমতার কাঠামোকে চিনে নেওয়ার শিল্পীসুলভ কৌশল। সাংবাদিকের সাহস এখানে চলচ্চিত্রকারের বুদ্ধিতে রূপান্তরিত হয়েছে—যা সরাসরি বলা বিপজ্জনক, তা এমনভাবে দেখানো যাতে দর্শক নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বাকিটা পড়ে নিতে পারে। চলচ্চিত্রটির রাজনৈতিক তাৎপর্য ও জাতীয় সংগ্রামের প্রতিফলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা হয়েছে।
কাগজের অক্ষর থেকে চলমান ছবির দিকে
জহির রায়হানের সাহিত্যকে তাঁর চলচ্চিত্রের পাশের ছোট ঘর বলে ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং সাহিত্য ছিল তাঁর চিন্তার আরেকটি পূর্ণাঙ্গ ভূখণ্ড। ১৯৪৯ সালে কলকাতার নতুন সাহিত্য-এ তাঁর প্রথম কবিতা “ওদের জানিয়ে দাও” প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ; ১৯৬০ সালে প্রথম উপন্যাস শেষ বিকেলের মেয়ে। তারপর হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন, বরফ গলা নদী, তৃষ্ণা, আর কতদিন—তাঁর কথাসাহিত্যের পরিসর ক্রমে বিস্তৃত হয়। উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পের মধ্যে আছে সারেং বৌ। তাঁর প্রথম কবিতার ১৯৪৯ সালের প্রকাশ এবং প্রাথমিক সাহিত্যকর্মের ধারাবাহিকতা বিভিন্ন স্মারক ও জীবনপঞ্জিতে নথিবদ্ধ।
তাঁর সাহিত্যকে সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রের মধ্যবর্তী সেতু বলা যায় একটি বিশেষ অর্থে। সাংবাদিকতা তাঁকে ঘটনাকে ধরতে শিখিয়েছিল; সাহিত্য সেই ঘটনাকে মানুষের অন্তর্জীবনে প্রবেশ করিয়েছে; চলচ্চিত্র তাকে দিয়েছে দৃশ্য, শব্দ ও সময়ের যৌথ শরীর। ফলে তাঁর সৃষ্টির তিনটি ক্ষেত্রের ভাষা আলাদা হলেও নৈতিক উদ্বেগে তারা আত্মীয়। মানুষ কোথায় অবদমিত, কোথায় ভয় তাকে নীরব করে, কোথায় ইতিহাস ব্যক্তিগত জীবনের ভেতর ঢুকে পড়ে—এই প্রশ্নগুলো তাঁর কাজকে বারবার ঘিরে থাকে।
আরেক ফাল্গুন-এর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে; হাজার বছর ধরে তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যে স্থায়ী আসন দিয়েছে; আর অন্য উপন্যাসগুলোতেও তাঁর দৃষ্টি মানুষের সামাজিক বাস্তবতার দিকে নিবদ্ধ। এখানে তাঁর সাংবাদিকসত্তা তথ্যের আকারে নয়, দৃষ্টিভঙ্গির আকারে কাজ করে। তিনি চরিত্রকে বিচ্ছিন্ন মানুষ হিসেবে দেখেন না; চরিত্রের ওপর সময়ের চাপ অনুভব করেন। ঠিক যেমন একজন ভালো প্রতিবেদক জানেন, একটি মানুষের গল্পের পেছনে প্রায়ই একটি বৃহত্তর কাঠামোর গল্প থাকে।
কর্মজীবন ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ এক নজরে
| সাল | কাজের নাম | ধরন | সংক্ষিপ্ত তাৎপর্য |
| ১৯৪৯ | “ওদের জানিয়ে দাও” | কবিতা | নতুন সাহিত্য, কলকাতায় প্রকাশিত প্রথম কবিতা |
| প্রায় ১৯৫০ | যুগের আলো | সাংবাদিকতা | সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা |
| ১৯৫০-এর দশক | খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা | সাংবাদিকতা/লেখালেখি | সংবাদ ও সাময়িকপত্রে ধারাবাহিক কাজ |
| ১৯৫৫ | সূর্যগ্রহণ | গল্পগ্রন্থ | প্রথম গল্পগ্রন্থ |
| ১৯৫৬ | প্রবাহ | সাংবাদিকতা—সম্পাদক | বাংলা মাসিকের সম্পাদক |
| সাল তথ্যতালিকায় নেই | Express | সাংবাদিকতা—সম্পাদনা | ইংরেজি সাপ্তাহিকের সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত |
| ১৯৫৯ | জাগো হুয়া সাভেরা | চলচ্চিত্র—সহকারী পরিচালক | চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ |
| ১৯৫৯ | এ দেশ তোমার আমার | চলচ্চিত্র—সহকারী পরিচালক | সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ |
| ১৯৬০ | নবারুণ | চলচ্চিত্র—সহকারী পরিচালক | নির্মাণ-অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা |
| ১৯৬০ | শেষ বিকেলের মেয়ে | উপন্যাস | প্রথম উপন্যাস |
| ১৯৬১ | যে নদী মরুপথে | চলচ্চিত্র—সহকারী পরিচালক | সহকারী পরিচালক পর্বের কাজ |
| ১৯৬১ | কখনো আসেনি | চলচ্চিত্র—পরিচালক | পরিচালক হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্র |
| ১৯৬৩/৬৪ | কাঁচের দেয়াল | চলচ্চিত্র—পরিচালক/লেখক/প্রযোজক | পুরস্কৃত চলচ্চিত্র; নিগার পুরস্কারের সাল ও বিভাগ নিয়ে উৎসভেদে অমিল আছে, তাই প্রকাশের আগে পুনরায় যাচাইযোগ্য |
| ১৯৬৪ | হাজার বছর ধরে | উপন্যাস | অন্যতম প্রধান উপন্যাস |
| ১৯৬৪ | সঙ্গম | চলচ্চিত্র—পরিচালক | উর্দু ভাষায় নির্মিত; পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র |
| ১৯৬৬ | আরেক ফাল্গুন | উপন্যাস | ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ রচনা |
| সাল তথ্যতালিকায় নেই | বেহুলা | চলচ্চিত্র—পরিচালক | উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র |
| সাল তথ্যতালিকায় নেই | আনোয়ারা | চলচ্চিত্র—পরিচালক | উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র |
| সাল তথ্যতালিকায় নেই | বরফ গলা নদী, তৃষ্ণা, আর কতদিন | উপন্যাস | প্রধান কথাসাহিত্যের অংশ |
| সাল তথ্যতালিকায় নেই | সারেং বৌ | ছোটগল্প | উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প |
| ১৯৭০ | জীবন থেকে নেয়া | চলচ্চিত্র—পরিচালক/লেখক/প্রযোজক | বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপক; বহুলভাবে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত |
| ১৯৭১ | স্টপ জেনোসাইড | প্রামাণ্যচিত্র—পরিচালক | মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার ঐতিহাসিক দৃশ্য-সাক্ষ্য |
কর্মজীবনের এই কালানুক্রমে সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের তথ্য একাধিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাঁচের দেয়াল-এর নিগার পুরস্কারের সাল ও পুরস্কার-বিভাগ নিয়ে উৎসে পার্থক্য থাকায় সেটিকে নিশ্চিত করে লেখা হয়নি।
একাত্তর: যখন ক্যামেরা হয়ে উঠল প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ
১৯৭১ সালে জহির রায়হানের জীবনের দুই ধারাই—সাংবাদিকের সাহসিকতা এবং চলচ্চিত্রকারের লেন্স—এক বিন্দুতে এসে মিলল। যুদ্ধ তখন কোনো রূপকের বিষয় নয়; বাস্তব হত্যাযজ্ঞ, বাস্তব দেশচ্যুতি, বাস্তব স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই সময় তিনি নির্মাণ করেন স্টপ জেনোসাইড। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র তাঁর কর্মজীবনের একটি নির্ণায়ক সৃষ্টি; মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নথিতেও ১৯৭১ সালে জহির রায়হানের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে Stop Genocide-এর উল্লেখ আছে।
একজন সাংবাদিক যখন কোনো হত্যাকাণ্ডের সংবাদ লেখেন, তিনি জানেন শব্দের দায় আছে। একজন চলচ্চিত্রকার যখন একই ইতিহাসের সামনে ক্যামেরা দাঁড় করান, তখন ছবিরও দায় তৈরি হয়। জহির রায়হান সেই দায় এড়াননি। তাঁর ক্যামেরা একাত্তরে কেবল শিল্প নির্মাণ করেনি; সাক্ষ্য সংরক্ষণ করেছে। এ কারণেই স্টপ জেনোসাইডকে শুধু চলচ্চিত্র হিসেবে দেখলে তার নৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। এটি এমন এক সময়ে তৈরি, যখন ‘কে কী দেখেছে’ প্রশ্নটি ভবিষ্যতের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠছিল। তিনি দেখেছেন, এবং দেখাকে নথিতে পরিণত করেছেন।
এখানেই সাংবাদিকের সাহসিকতা চলচ্চিত্রের ভাষায় পূর্ণতা পায়। সাহস মানে শুধু বিপদের সামনে দাঁড়ানো নয়; সাহস মানে এমন সত্যের পাশে দাঁড়ানো, যাকে শক্তিশালী পক্ষ অস্বীকার করতে চাইতে পারে। লেন্স তখন আর নিরপেক্ষ কাচ থাকে না। কোন দিকে ক্যামেরা ঘুরবে, কী সংরক্ষিত হবে, কোন যন্ত্রণাকে অদৃশ্য হতে দেওয়া হবে না—এসবই নৈতিক সিদ্ধান্ত। জহির রায়হানের যুদ্ধাস্ত্রের রূপকটি তাই অলংকারমাত্র নয়। তাঁর অস্ত্র মানুষ হত্যা করেনি; বিস্মৃতি, অস্বীকার ও মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রমাণ দাঁড় করিয়েছে।
স্বাধীনতার পরেও যে অনুসন্ধান শেষ হলো না
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তাঁর সামনে নতুন একটি কাজের সময় আসার কথা ছিল। স্বাধীন দেশে একজন নির্মাতা হিসেবে তিনি কী করতেন, তাঁর চলচ্চিত্রভাষা কোন দিকে যেত, নতুন রাষ্ট্রের অসাম্য বা স্বপ্নকে তিনি কীভাবে দেখতেন—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর আমরা পাইনি। কারণ ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ তাঁর জীবনকে আকস্মিকভাবে থামিয়ে দেয়।
অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সার তখন নিখোঁজ। তাঁকে খুঁজতে জহির রায়হান মিরপুরে যান। তারপর আর ফেরেননি। পরবর্তী অনুসন্ধান ও প্রত্যক্ষদর্শী-ভিত্তিক প্রতিবেদনে তাঁকে মিরপুরে নিহত হওয়ার কথাই জোরালোভাবে উঠে এসেছে, যদিও তাঁর দেহ উদ্ধার হয়নি; তাই সতর্ক ভাষায় তাঁকে নিখোঁজ এবং নিহত বলে অনুমিত বলা হয়।
এই মৃত্যু—অথবা আরও যথার্থভাবে বললে, এই অন্তর্ধান—বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এক গভীর অসমাপ্ত বাক্য। কারণ জহির রায়হানের ক্ষেত্রে মানুষটির অনুপস্থিতি তাঁর কাজের উপস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। যে মানুষ সারাজীবন নিখোঁজ সত্যকে খুঁজেছেন, তিনিই শেষে জাতির ইতিহাসে এক নিখোঁজ মানুষ হয়ে থাকলেন। যে মানুষ ক্যামেরায় প্রমাণ রেখে গেছেন, তাঁর নিজের শেষ মুহূর্তের কোনো নিশ্চিত দৃশ্য আমাদের কাছে নেই। এই বৈপরীত্য শোককে আরও গাঢ় করে।
তাঁর প্রতি রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরবর্তী সম্মানও তাঁর বহুমাত্রিক অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক, ১৯৯২ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার এবং ২০০৫ সালে হাজার বছর ধরে উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপের সূত্রে মরণোত্তর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—এই সম্মানগুলো দেখায়, তাঁকে কোনো একক পরিচয়ে আটকে রাখা যায়নি। বাংলা একাডেমির পুরস্কার তালিকায় ১৯৭২ সালে তাঁর নাম আছে; পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সম্মাননাগুলোর কথাও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য স্মারকসূত্রে নথিবদ্ধ।
সাহস ও লেন্স: একই যুদ্ধের দুই মুখ
জহির রায়হানকে নিয়ে ইতিহাসের হিসাব আজও অসম্পূর্ণ—তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত তারিখ নেই, দেহ নেই, এমনকি একটি নিশ্চিত সমাধিও নেই। কিন্তু ঠিক এই অসম্পূর্ণতাই তাঁকে ইতিহাসের একটি স্থির অধ্যায় হয়ে থাকতে দেয়নি। জহির রায়হান স্থির মানুষ ছিলেনও না। তাঁর জীবন এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যাত্রার জীবন—কবিতা থেকে সংবাদ, সংবাদ থেকে গল্প, গল্প থেকে উপন্যাস, সেখান থেকে চলচ্চিত্র, আর চলচ্চিত্র থেকে যুদ্ধকালীন প্রামাণ্য সাক্ষ্য। প্রতিটি যাত্রায় তিনি যেন একই প্রশ্নের নতুন ভাষা খুঁজেছেন: সত্যকে কীভাবে মানুষের সামনে আনা যায়?
তাই জীবন থেকে নেয়া দেখলে আমরা কেবল একটি চলচ্চিত্র দেখি না; দেখি রাজনৈতিক বাস্তবতাকে শিল্পের ভেতর লুকিয়ে আবার প্রকাশ করার সাহস। স্টপ জেনোসাইড দেখলে কেবল একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখি না; দেখি একজন নির্মাতা নিজের সময়ের সাক্ষী হতে অস্বীকার করেননি। তাঁর উপন্যাস পড়লে কেবল কাহিনি পাই না; পাই সমাজের ভেতরে মানুষের অবস্থান নিয়ে এক অস্থির অনুসন্ধান। আর তাঁর সাংবাদিকতার ইতিহাস মনে করলে বোঝা যায়, এই সমস্ত কাজের আগে থেকেই তিনি বাস্তবতার কাছে ঋণী ছিলেন।
জহির রায়হানের জীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর কাজের পরিধি বিস্ময়করভাবে বহুস্তরীয়। মাত্র কয়েক দশকের জীবনে তিনি যে সাংস্কৃতিক ভূগোল অতিক্রম করেছেন, সেখানে ভাষা আন্দোলন আছে, সংবাদপত্র আছে, সাহিত্য আছে, চলচ্চিত্র আছে, সেন্সরের চাপ আছে, জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম আছে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সত্য অনুসন্ধানের এক বিপজ্জনক যাত্রা আছে। এই সবকিছুকে এক সুতোয় বাঁধে তাঁর দৃষ্টির নৈতিকতা—যত বিপদসংকুলই হোক তিনি কখনই সত্য সন্ধান বন্ধ করেন নি।



