ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ঘটনাপ্রধান নয়—বরং মানবসমাজের বিবর্তনের গল্পও বলে। ২৪ জানুয়ারি ঠিক তেমনই একটি তারিখ। এই দিনে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের রক্তমাখা ইতিহাস যেমন আছে, তেমনি ভারতের মেয়েশিশুর অধিকার আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিও আছে। আবার বৈশ্বিকভাবে, এদিন জাতিসংঘ “শিক্ষা দিবস (International Day of Education)” হিসেবে পালন করে—যা শিক্ষাকে কেবল বিদ্যালয়ের বিষয় নয়, বরং উন্নয়ন, শান্তি ও টেকসই সমাজ গঠনের অবকাঠামো হিসেবে তুলে ধরে।
চলুন, এক নজরে দেখি ২৪ জানুয়ারির ইতিহাস, ঘটনাপ্রবাহ ও তার আজকের প্রাসঙ্গিকতা।
দক্ষিণ এশিয়ায় ২৪ জানুয়ারির তাৎপর্য
বাংলাদেশ: গণঅভ্যুত্থান দিবস (১৯৬৯)
১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় চলমান গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তরুণ ছাত্রনেতা মতিউর রহমান মল্লিক ও রুস্তম আলী। এই দুই তরুণের আত্মদান পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ জনতার আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।
এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো সময়—যা একদিকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পথ তৈরি করে, অন্যদিকে নাগরিক ও ছাত্র আন্দোলনের শক্তিকে এক বৃহৎ রাজনৈতিক রূপ দেয়।
আজও ২৪ জানুয়ারি স্মরণ করা হয় ‘গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে—একটি দিন যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তরুণ প্রজন্মের আদর্শ ও প্রতিবাদই যুগে যুগে রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের সাহস দেয়।
ভারত (কলকাতা): কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা (১৮৫৭)
১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্ম হয়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি ছিল একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের কেন্দ্র’, যেখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটে, সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চা নতুন রূপ পায়, এবং সামাজিক সংস্কার আন্দোলন গতিশীল হয়।
আজও এটি দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার মানচিত্রে একটি ভিত্তিপ্রস্তর—যেখানে আধুনিকতা, সংস্কৃতি ও চিন্তার সাহস একসাথে বিকশিত হয়েছে।
ভারত: জাতীয় কন্যাশিশু দিবস (National Girl Child Day)
প্রতি বছর ২৪ জানুয়ারি ভারত সরকার পালন করে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের লক্ষ্য—মেয়েশিশুদের অধিকার, শিক্ষা, পুষ্টি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের প্রতি বৈষম্য দূর করা।
দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে নারীর ক্ষমতায়নের আলোচনা এখন আর কেবল শিক্ষা বা স্বাস্থ্য নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জুড়ে যায় সামাজিক সমতা, আত্মনির্ভরশীলতা ও নেতৃত্বের উপরেও।
বিশেষ তাৎপর্য হলো, এই দিনই আবার জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস, ফলে নারীর শিক্ষা ও বৈশ্বিক অগ্রগতির বার্তা দুটি এই তারিখে একত্র হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দিনটি

জাতিসংঘ: আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ২৪ জানুয়ারিকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস হিসেবে।
এটি বিশ্বব্যাপী শিক্ষা, শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের প্রতি প্রতিশ্রুতির প্রতীক। আজকের বিশ্বে শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়—এটি কর্মসংস্থান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, এমনকি সংঘাত প্রতিরোধেরও মূল উপাদান।
২০২৬ ও পরবর্তী সময়ে এই বার্তাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈষম্যের যুগে মানুষের সক্ষমতা গড়ে তোলার একমাত্র স্থায়ী উপায় হলো শিক্ষা।
রোমানিয়া: ঐক্য দিবস (Unification Day)
১৮৫৯ সালের এই দিনে মোলদাভিয়া ও ওয়ালাকিয়ার একীকরণ ঘটে আলেকজান্দ্রু ইয়োন কুজা-এর নেতৃত্বে, যা আধুনিক রোমানিয়ার ভিত্তি স্থাপন করে।
এই ঐক্যকে বলা হয় “ছোট ঐক্য” (Little Union), কারণ পরবর্তীতে এটি বৃহত্তর রোমানীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক ধাপ হয়ে ওঠে।
এই দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ—যেভাবে রাষ্ট্রগঠন আসলে একাধিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
বৈশ্বিক ইতিহাসে ২৪ জানুয়ারি
যুক্তরাষ্ট্র: ১৮৪৮ – ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশের সূচনা
২৪ জানুয়ারি ১৮৪৮ সালে জেমস ডাব্লিউ মার্শাল ক্যালিফোর্নিয়ার সাটার্স মিল-এ প্রথম স্বর্ণের সন্ধান পান।
এই আবিষ্কার আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে অভিবাসনের ঢেউ তোলে—যাকে আমরা জানি Gold Rush নামে।
তবে স্বর্ণের এই উন্মাদনার পেছনে ছিল এক বিশাল সামাজিক রূপান্তর ও ট্র্যাজেডির গল্পও; আদিবাসী সম্প্রদায়দের জীবন-জীবিকা এবং ভূমি হারানোর বেদনাও এই ইতিহাসের অংশ।
অন্যদিকে, ২০০৩ সালের ২৪ জানুয়ারি টম রিজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব হিসেবে শপথ নেন, এবং ২০১৩ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ নারীদের জন্য কমব্যাট এক্সক্লুশন রুল তুলে দেয়—নারীর পূর্ণ সামরিক অংশগ্রহণের পথে এটি ছিল একটি মাইলফলক।
রাশিয়া: ১৯১৮ সালের ক্যালেন্ডার সংস্কার
রাশিয়ার বলশেভিক সরকার ২৪ জানুয়ারি ১৯১৮ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণের আদেশ জারি করে।
এটি শুধু তারিখ পরিবর্তন নয়—বরং ছিল রাষ্ট্রীয় আধুনিকীকরণের প্রতীক।
সময় গণনার এই পরিবর্তন প্রভাব ফেলেছিল ব্যবসায়িক চুক্তি, ধর্মীয় ক্যালেন্ডার ও প্রশাসনিক কাজের ওপর।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—“সময়”ও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্তের ফল। এছাড়া, ২০১১ সালের এই দিনে মস্কোর ডোমোডেদোভো বিমানবন্দরে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় বহু মানুষ প্রাণ হারান।
কানাডা: ১৯৭৮ সালের কোসমস ৯৫৪ স্যাটেলাইট দুর্ঘটনা
২৪ জানুয়ারি ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক শক্তিচালিত স্যাটেলাইট কোসমস ৯৫৪ পৃথিবীতে পুনঃপ্রবেশ করে এবং কানাডার উত্তরাঞ্চলে তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে দেয়।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ‘অপারেশন মর্নিং লাইট’ নামের অভিযানে দুর্ঘটনাস্থল পরিষ্কারে কয়েক মাস সময় লাগে। এই ঘটনা মহাকাশ আইন ও পরিবেশ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে আজও গবেষণার বিষয়—কারণ এটি প্রমাণ করে, মহাকাশ প্রযুক্তির ঝুঁকি কখনও শুধু আকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না।
যুক্তরাজ্য: উইনস্টন চার্চিলের মৃত্যু (১৯৬৫)
১৯৬৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল মারা যান। তার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হিসেবে তার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে তুলে ধরে। তবে চার্চিলের উত্তরাধিকার আজও বিতর্কিত—যেখানে যুদ্ধকালের সাহসিকতার পাশাপাশি সমালোচিত হয় তার ঔপনিবেশিক নীতি ও বর্ণবৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
এই তারিখটি তাই কেবল স্মরণ নয়, ইতিহাসের বিচারবোধেরও দিন।
দক্ষিণ আমেরিকা (ব্রাজিল): মালে বিদ্রোহ (১৮৩৫)
২৪–২৫ জানুয়ারি রাতে ব্রাজিলের সালভাদর শহরে সংঘটিত হয় আফ্রিকান মুসলিম দাস ও মুক্ত জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে মালে বিদ্রোহ। এটি ছিল ব্রাজিলের অন্যতম দাসবিরোধী বিপ্লব, যেখানে ইসলামি পরিচয়, শিক্ষিত আফ্রিকান প্রভাব ও সামাজিক প্রতিরোধ একসাথে কাজ করে।
এই আন্দোলন লাতিন আমেরিকার দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
বিশিষ্ট জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী
জন্মদিন
-
এডিথ হোয়ার্টন (১৮৬২) – মার্কিন সাহিত্যিক, যিনি আধুনিক বাস্তবধর্মী উপন্যাসের পথিকৃৎ।
-
আর্নেস্ট বরগনাইন (১৯১৭) – অস্কারজয়ী অভিনেতা, দীর্ঘ চলচ্চিত্র ও টিভি ক্যারিয়ারে স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
-
নিল ডায়মন্ড (১৯৪১) – জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও গীতিকার, যিনি বিশ্বব্যাপী কোটি অ্যালবাম বিক্রির রেকর্ড গড়েছেন।
-
মিচিও কাকু (১৯৪৭) – আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, বিজ্ঞানবিষয়ক জনপ্রিয় লেখক ও বক্তা।
-
জন বেলুশি (১৯৪৯) – ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এর প্রথিতযশা কমেডিয়ান ও সংস্কৃতিমনা সংগীতশিল্পী।
বাংলাদেশ থেকে এই তালিকায় রয়েছেন: -
সালাহউদ্দিন লাভলু – নাট্যনির্দেশক, অভিনেতা ও প্রযোজক, যিনি আধুনিক বাংলা টেলিভিশন নাটকের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ।
মৃত্যুবার্ষিকী
-
মতিউর রহমান মল্লিক (১৯৬৯) – বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের শহীদ, গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক।
-
রুস্তম আলী (১৯৬৯) – একই আন্দোলনের আরও এক তরুণ শহীদ, যাঁকে জাতি আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
-
উইনস্টন চার্চিল (১৯৬৫) – ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নেতা।
-
ক্যালিগুলা (খ্রিস্টপূর্ব ৪১) – রোমান সম্রাট, যাঁর হত্যা সাম্রাজ্যের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনে।
-
টেড বান্ডি (১৯৮৯) – যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার, যাঁর বিচার প্রক্রিয়া বিশ্বমিডিয়ায় আলোচিত ছিল।
জানেন কি?
-
২৪ জানুয়ারি একই সঙ্গে ভারতের কন্যাশিশু দিবস ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস—যা নারীশিক্ষা ও বৈশ্বিক উন্নয়নকে এক জায়গায় মিলিত করে।
-
কোসমস ৯৫৪ স্যাটেলাইটের দুর্ঘটনা মহাকাশ দায়বদ্ধতার ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত; আজও এটি পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক আইনের শিক্ষাক্রমে আলোচিত।
-
রাশিয়ার ক্যালেন্ডার সংস্কার (১৯১৮) মানুষের দৈনন্দিন জীবন বদলে দিয়েছিল—কারণ হঠাৎ সময় ও দিন গণনার পরিবর্তন পুরো সমাজকেই নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে বাধ্য করেছিল।
শেষকথা
২৪ জানুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়—এটি প্রতিরোধ, শিক্ষা, ঐক্য ও মানব উন্নয়নের এক যৌথ প্রতিচ্ছবি।
এই দিনে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, যারা নতুন আলো জ্বালিয়েছেন, কিংবা যারা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছেন—তাঁদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়: অতীতের শিক্ষাই ভবিষ্যতের দিশা।
ইতিহাস স্মরণ মানে কেবল শোক নয়, বরং বোঝা—কীভাবে আমরা আরও ন্যায়সঙ্গত, শিক্ষিত ও মানবিক পৃথিবীর পথে এগোতে পারি।

