ইতিহাস কখনোই কোনো বদ্ধ পুকুরের মতো স্থির নয়; বরং এটি মানুষের অবিস্মরণীয় জয়, মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি এবং যুগান্তকারী রূপান্তরের এক প্রবহমান নদী। ইতিহাসের পাতা উল্টালে ২৪শে জুন তারিখটিতে আমরা দেখতে পাই অন্বেষণ, বিধ্বংসী যুদ্ধ, আইনি রদবদল এবং বহু সাংস্কৃতিক আইকনের জন্মবৃত্তান্ত। দক্ষিণ আমেরিকার ঘন জঙ্গল থেকে শুরু করে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন বার্লিনের আকাশ পর্যন্ত, এই দিনটি এমন সব ঘটনার সাক্ষী যা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
আপনি ইতিহাসের ছাত্র হোন, কোনো টাইমলাইনের জন্য গবেষণা করুন, অথবা নিজের জন্মদিনে অতীতে কী ঘটেছিল তা নিয়ে স্রেফ কৌতূহলী হোন—এই বিস্তারিত আলোচনা আপনাকে সময়ের এক চমৎকার যাত্রায় নিয়ে যাবে। চলুন, ভারত উপমহাদেশ থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা, বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুর ইতিহাস একনজরে দেখে নিই।
বাংলা ও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস
ভারত উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল যুগ যুগ ধরে সাম্রাজ্যের উত্থান, ঔপনিবেশিক সংগ্রাম এবং নির্ণায়ক রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু থেকেছে। ২৪শে জুন দিনটিও এই অঞ্চলে বেশ কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে।
দিল্লি সুলতানির উত্থান
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছিল ১২০৬ সালের এই দিনে। কুতুবউদ্দিন আইবেক, যিনি একসময় ঘুরি সাম্রাজ্যের একজন ক্রীতদাস ও তুর্কি সেনাপতি ছিলেন, তিনি লাহোরে আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লির সুলতান হিসেবে মুকুট পরেন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি শুধু মামলুক (বা দাস) রাজবংশের সূচনাই করেনি, বরং এটি দিল্লি সুলতানির এমন এক মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যা পরবর্তী তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার করে এবং এই অঞ্চলের স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও প্রশাসনে গভীর প্রভাব ফেলে।
ঔপনিবেশিক কলকাতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন
উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক যুগে পা রাখলে দেখা যায়, ১৭৮৭ সালের ২৪শে জুন কলকাতায় (তৎকালীন ক্যালকাটা) সেন্ট জনস চার্চের উদ্বোধন করা হয়। গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের দান করা জমির ওপর নির্মিত এই উপাসনালয়টি আজ শহরের তৃতীয় প্রাচীন গির্জা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যা বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাথমিক আধিপত্যের এক জীবন্ত পাথুরে স্মৃতিস্তম্ভ।
আধুনিক রাজনৈতিক যুগের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ১৯৭৫ সালের ২৪শে জুন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি রায়ের ওপর শর্তসাপেক্ষে স্থগিতাদেশ দেয়। এলাহাবাদ হাইকোর্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী জয়কে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের এই আইনি পদক্ষেপের ফলে তিনি সংসদে থাকার সুযোগ পান, কিন্তু তার ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপ ও পদত্যাগের দাবির মুখে ঠিক পরের দিনই ইন্দিরা গান্ধীর সরকার দেশজুড়ে ‘জরুরি অবস্থা’ (Emergency) ঘোষণা করে, যা টানা ২১ মাস ধরে ভারতের নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত করে এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের রূপরেখা সাময়িকভাবে বদলে দেয়।
২৪শে জুনে দক্ষিণ এশিয়ায় ঘটে যাওয়া প্রধান মাইলফলকগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।
| বছর | ঘটনা | স্থান |
| ১২০৬ | কুতুবউদ্দিন আইবেকের সুলতান হিসেবে রাজ্যাভিষেক | লাহোর |
| ১৭৮৭ | সেন্ট জনস চার্চের উদ্বোধন | কলকাতা |
| ১৯৪৮ | ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস | কলকাতা |
| ১৯৭৫ | ইন্দিরা গান্ধীর রায়ে সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ | নয়াদিল্লি |
বিশ্ব ইতিহাস: বিস্তৃত পৃথিবীর বুকে

উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, সামরিক কৌশল, ভৌগোলিক আবিষ্কার এবং স্নায়ুযুদ্ধের প্রারম্ভিক সময়ের ক্ষেত্রেও ২৪শে জুন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। অঞ্চলভিত্তিক প্রধান বৈশ্বিক ঘটনাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
আমেরিকা মহাদেশ
এই দিনে আমেরিকার ইতিহাস মূলত আবিষ্কারের নেশা, স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং আধুনিক সময়ের নানা আইনি ও সাংস্কৃতিক বাঁক বদলের গল্প বলে।
-
১৪৯৭: ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম হেনরির পৃষ্ঠপোষকতায় ইতালীয় অভিযাত্রী জন ক্যাবট (জিওভানি ক্যাবোটো) উত্তর আমেরিকার উপকূলে পা রাখেন। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, তিনি বর্তমান কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে অবতরণ করেছিলেন। নর্সদের অভিযানের কয়েক শতাব্দী পর তিনিই ছিলেন প্রথম ইউরোপীয়, যিনি উত্তর আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছান।
-
১৮২১: দক্ষিণ আমেরিকায় কারাবোবোর যুদ্ধ (Battle of Carabobo) সংঘটিত হয়। কিংবদন্তি নেতা সিমন বলিভারের নেতৃত্বে বিপ্লবী বাহিনী স্প্যানিশ রাজকীয় বাহিনীকে চরমভাবে পরাজিত করে। এই ঐতিহাসিক বিজয় ভেনিজুয়েলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং আমেরিকায় স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।
-
১৯৪৭: আধুনিক ‘ইউএফও’ (UFO) যুগের সূচনা হয়। আমেরিকান পাইলট কেনেথ আর্নল্ড ওয়াশিংটনের মাউন্ট রেইনিয়ারের কাছে উড়ন্ত অবস্থায় নয়টি অত্যন্ত চকচকে বস্তুকে অবিশ্বাস্য গতিতে ‘V’ আকৃতিতে উড়ে যেতে দেখেন। তিনি বস্তুগুলোর গতিবিধিকে “জলের ওপর ছুড়ে মারা পিরিচের মতো” বলে বর্ণনা করেন, যেখান থেকে সংবাদমাধ্যমে কালজয়ী “ফ্লাইং সসার” (flying saucer) শব্দগুচ্ছের জন্ম হয়।
-
২০২২: যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট “ডবস বনাম জ্যাকসন উইমেন্স হেলথ অর্গানাইজেশন” মামলায় একটি যুগান্তকারী রায় দেয়। আদালত জানায় যে, মার্কিন সংবিধানে গর্ভপাতের কোনো অধিকার দেওয়া নেই। এই রায়ের মাধ্যমে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো ‘রো বনাম ওয়েড’ (Roe v. Wade) মামলার রায়টি বাতিল হয়ে যায়, যা দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয় এবং প্রজনন অধিকারকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য
মধ্যযুগীয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত থেকে শুরু করে পারমাণবিক যুদ্ধের উত্তেজনা—ইউরোপীয় ইতিহাসের বহু উল্লেখযোগ্য অধ্যায় লেখা হয়েছে ২৪শে জুনে।
- ১৩১৪: ব্যানকবার্নের যুদ্ধ (Battle of Bannockburn) সমাপ্ত হয়, যেখানে স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট দ্য ব্রুস রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের নেতৃত্বাধীন বিশাল ইংরেজ বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধে এটি ছিল এক চূড়ান্ত মোড় ঘোরানো বিজয়।
-
১৫০৯: ইংল্যান্ডের বিতর্কিত রাজা অষ্টম হেনরি এবং তার প্রথম স্ত্রী ক্যাথরিন অব আরাগন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে এক জাঁকজমকপূর্ণ যৌথ অনুষ্ঠানে রাজমুকুট পরেন।
-
১৭১৭: বিশ্বের প্রথম মেসনিক গ্র্যান্ড লজ (দ্য প্রিমিয়ার গ্র্যান্ড লজ অব ইংল্যান্ড) লন্ডনের গুজ অ্যান্ড গ্রিডিরন এল-হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ফ্রিম্যাসনরি নামক গোপন ভ্রাতৃত্বমূলক সংগঠনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
-
১৮১২: ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক ভুলটি করেন। তিনি প্রায় ৬ লক্ষ সেনার এক বিশাল বাহিনী (Grande Armée) নিয়ে নিমান নদী পার হয়ে রাশিয়া আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই ব্যর্থ অভিযান শেষ পর্যন্ত তার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয় এবং তার পতনের সূচনা করে।
-
১৮৫৯: ইতালির দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সলফেরিনোর ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হেনরি ডুনান্ট নামের একজন সুইস ব্যবসায়ী যুদ্ধক্ষেত্রের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখেন, যেখানে হাজার হাজার আহত সেনাকে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার জন্য ফেলে রাখা হয়েছিল। এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তাকে ‘রেড ক্রস’ (International Committee of the Red Cross) প্রতিষ্ঠা করতে এবং জেনেভা কনভেনশনের পক্ষে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করে।
-
১৯৪৮: সোভিয়েত ইউনিয়ন বার্লিন অবরোধ শুরু করলে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। তারা পশ্চিম বার্লিনে যাতায়াতের সমস্ত সড়ক, রেলপথ এবং খালের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে পশ্চিমা মিত্ররা ইতিহাসের বৃহত্তম ‘বার্লিন এয়ারলিফট’ শুরু করে। তারা আকাশপথে অবরুদ্ধ বিশ লাখ মানুষের জন্য খাবার, কয়লা এবং ওষুধ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়।
এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকা
এই মহাদেশগুলোতে এই দিনটি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্বাক্ষী।
-
১৫৭১: স্প্যানিশ বিজেতা মিগুয়েল লোপেজ দে লেগাজপি আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যানিলা শহর প্রতিষ্ঠা করেন। এটি স্প্যানিশ ইস্ট ইন্ডিজের রাজধানী হয়ে ওঠে এবং ফিলিপাইনে ৩ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পথ প্রশস্ত করে।
-
১৯৩২: থাইল্যান্ডে ‘প্রমোটার্স রেভল্যুশন’ নামে একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজা প্রজাধিপককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই যুগান্তকারী ঘটনা কয়েক শতাব্দী ধরে চলা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায় এবং থাইল্যান্ডে সাংবিধানিক যুগের সূচনা করে।
-
১৯৮২: ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ৯ (একটি বোয়িং ৭৪7) অস্ট্রেলিয়ার দিকে যাওয়ার সময় ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট গালুংগুং আগ্নেয়গিরির বিশাল ছাইয়ের মেঘের ভেতর প্রবেশ করে। এর ফলে উড়ন্ত অবস্থায় বিমানের সবকটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। তবে দক্ষ ক্রুরা অসাধারণ নৈপুণ্যে বিমানটিকে ছাইয়ের মেঘ থেকে বের করে আনেন, ইঞ্জিনগুলো পুনরায় চালু করেন এবং কোনো হতাহত ছাড়াই জাকার্তায় সফলভাবে জরুরি অবতরণ করেন।
-
২০০২: তাঞ্জানিয়ার মাশাগালির কাছে আফ্রিকার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় ১২০০ যাত্রী বহনকারী একটি ট্রেনের ব্রেক সম্পূর্ণ ফেল করে এবং সেটি ইগান্দু পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উল্টো দিকে গড়িয়ে বিধ্বস্ত হয়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ২৮১ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটির দিন
ঐতিহাসিক ঘটনার পাশাপাশি ২৪শে জুন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাংস্কৃতিক উৎসব এবং ছুটির দিন হিসেবেও উদযাপিত হয়।
-
মিডসামার ডে (Midsummer Day): মূলত উত্তর ইউরোপে, বিশেষ করে এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং লাটভিয়াতে পালিত হয়। বছরের দীর্ঘতম দিনগুলোকে ঘিরে বিশাল অগ্নিকুণ্ড, ভোজ ও লোকজ ঐতিহ্যের মাধ্যমে এই প্রাচীন উৎসবটি পালিত হয়।
-
সেন্ট-জিন-ব্যাপটিস্ট ডে (Saint-Jean-Baptiste Day): কানাডার কুইবেক প্রদেশে পালিত একটি বিশাল সরকারি ছুটির দিন, যেখানে ফরাসি-ভাষী সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং গর্ব উদযাপন করা হয়।
-
কারাবোবো যুদ্ধ দিবস: স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা নিশ্চিতকারী ১৮২১ সালের সামরিক বিজয়ের স্মরণে ভেনিজুয়েলায় এটি একটি জাতীয় ছুটির দিন।
-
ইন্তি রায়মি দিবস (Inti Raymi Day): পেরুতে ‘কৃষক দিবস’ হিসেবেও পরিচিত এটি ইনকা সাম্রাজ্যের সূর্য দেবতা ইন্তির সম্মানে পালিত একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুষ্ঠান, যা আন্দিজ পর্বতমালায় অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে উদযাপিত হয়।
২৪শে জুনে জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
এই বিশেষ দিনে পৃথিবীতে আগমন ঘটেছিল এমন কয়েকজন কিংবদন্তির, যাদের কাজ, প্রতিভা এবং অধ্যবসায় আজও বিশ্ববাসীকে অনুপ্রাণিত করে। নিচে তাদের বর্ণাঢ্য জীবনের বিস্তৃত দিকগুলো তুলে ধরা হলো।
অ্যামব্রোস বিয়ার্স (১৮৪২)
আমেরিকার ওহিওতে জন্মগ্রহণকারী অ্যামব্রোস বিয়ার্স ছিলেন মার্কিন সাহিত্যের অন্যতম তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর। আমেরিকান গৃহযুদ্ধে ইউনিয়ন আর্মির হয়ে সরাসরি অংশ নেওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তার মনস্তত্ত্বে গভীর দাগ কেটেছিল। এই রূঢ় বাস্তবতা তার লেখনীতে একটি অন্ধকার, নৈরাশ্যবাদী এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। তার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘An Occurrence at Owl Creek Bridge’ এর একটি নিখুঁত উদাহরণ, যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী এক মানুষের মনের বিভ্রম ও বাস্তবতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে।
সান ফ্রান্সিসকোর সাংবাদিকতা জীবনে তিনি তার নির্ভীক ও তীক্ষ্ণ সমালোচনার জন্য ‘বিটার বিয়ার্স’ (Bitter Bierce) নামে ব্যাপক পরিচিতি পান। তার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজ ‘The Devil’s Dictionary’ আজও তার বুদ্ধিদীপ্ত ও তির্যক রসবোধের জন্য মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯১৩ সালে ৭১ বছর বয়সে মেক্সিকান বিপ্লব কভার করতে গিয়ে তিনি চিরতরে নিখোঁজ হন, যা সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম বড় অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে।
জ্যাক ডেম্পসি (১৮৯৫)
উইলিয়াম হ্যারিসন “জ্যাক” ডেম্পসি, যিনি ‘দ্য মানাসা মাউলার’ নামে সমধিক পরিচিত, ১৯১৯ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্ব হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ১৯২০-এর দশকের ‘রোয়ারিং টুয়েন্টিজ’-এর অন্যতম বড় ক্রীড়া আইকন হিসেবে তিনি বেব রুথের মতো কিংবদন্তিদের সমকক্ষ ছিলেন। তার মারকুটে, আক্রমণাত্মক স্টাইল এবং বিধ্বংসী ঘুষি বক্সিংকে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড খেলা থেকে বিশ্বব্যাপী মূলধারার স্পেকটাকলে পরিণত করে। ১৯২১ সালে জর্জেস কার্পেনটিয়ারের বিরুদ্ধে তার টাইটেল ডিফেন্স ফাইটটি প্রথমবারের মতো বক্সিং ইতিহাসে এক মিলিয়ন ডলারের টিকিট বিক্রির রেকর্ড গড়েছিল।
লাইভ রেডিও সম্প্রচারের কারণে তিনি সেসময় তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। বক্সিং থেকে অবসরের পর তিনি নিউইয়র্কে একটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ খোলেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একজন ভালোবাসার পাত্র হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
অনিতা দেশাই (১৯৩৭)
ভারতের মুসৌরিতে এক জার্মান মা এবং বাঙালি বাবার ঘরে জন্মগ্রহণকারী অনিতা দেশাই তার উপন্যাসে একটি অনন্য, বহুসাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। সমসাময়িক অনেক লেখকের মতো তিনি শুধু বাহ্যিক রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখতে চাননি; বরং তিনি চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, বিশেষ করে ভারতীয় নারীদের অভ্যন্তরীণ জীবন নিয়ে লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন।
‘Clear Light of Day’, ‘In Custody’ এবং ‘Fasting, Feasting’-এর মতো অনবদ্য উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি পরিবার, নিঃসঙ্গতা এবং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার এই দুর্দান্ত লেখনীর জন্যই তিনি তিনবার সম্মানজনক বুকার প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছেন এবং পোস্টকলোনিয়াল সাহিত্যের একজন অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
মিন্ডি কালিং (১৯৭৯)
ভেরা মিন্ডি চোকালিঙ্গম, যিনি মিন্ডি কালিং নামেই বেশি পরিচিত, আমেরিকান টেলিভিশনে নিজের মেধা দিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি মূলত জনপ্রিয় সিটকম ‘The Office’-এর কেলি কাপুর চরিত্রটির জন্য বিশ্বজোড়া পরিচিতি পান। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি ওই শোয়ের রাইটিং রুমে একমাত্র নারী হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে এর নির্বাহী প্রযোজক, পরিচালক ও অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। এরপর তিনি ‘The Mindy Project’ তৈরি করেন, যা তাকে আমেরিকান নেটওয়ার্কে নিজের সিটকম চালানো প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারীদের একজনে পরিণত করে। অভিনয়ের পাশাপাশি তার আত্মজীবনীমূলক বইগুলোও বেস্টসেলার হয়েছে। ‘Never Have I Ever’ এবং ‘The Sex Lives of College Girls’-এর মতো প্রজেক্ট তৈরি করে তিনি পর্দায় বৈচিত্র্যময় এবং খাঁটি গল্প বলার ধারাকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন।
লিওনেল মেসি (১৯৮৭)

আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্মগ্রহণকারী লিওনেল মেসি শৈশবের গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি নামের এক কঠিন শারীরিক বাধাকে কাটিয়ে উঠে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন। বার্সেলোনার হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ১০টি লা লিগা এবং ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাসহ অসংখ্য রেকর্ড ভেঙেছেন। তার অতিপ্রাকৃত বল নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, অসাধারণ ভিশন এবং প্লেমেকিং দক্ষতার জন্য তিনি রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন।
২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শ্বাসরুদ্ধকর এক শিরোপা জিতিয়ে তিনি তার ট্রফির খাতা কানায় কানায় পূর্ণ করেছেন এবং আধুনিক ফুটবল জগতে নিজেকে এমন এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা হয়তো ভবিষ্যতে আর কারও পক্ষে ছোঁয়া সম্ভব হবে না।
বিখ্যাত মৃত্যু ও স্মরণীয় বিদায়
ইতিহাস, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিতে গভীর ছাপ রেখে যাওয়া বেশ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব এই দিনে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। নিচে তাদের জীবনের শেষ অধ্যায় ও উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করা হলো।
লুক্রেজিয়া বোরজিয়া (১৫১৯)
কুখ্যাত বোরজিয়া পরিবারে জন্মগ্রহণকারী লুক্রেজিয়াকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একজন বিষপ্রয়োগকারী ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদরা তার জীবনের এই কলঙ্ককে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। তারা মনে করেন, তিনি মূলত তার বাবা (পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডার) এবং ক্ষমতালোভী ভাই সিজারে বোরজিয়ার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার একজন নিরীহ শিকার ছিলেন। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য তাকে তিনবার বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে জীবনের শেষভাগে ফেরারা শহরের ডিউককে বিয়ের পর তিনি নিজের পরিবারের কালো ছায়া থেকে বেরিয়ে আসেন। ফেরারায় গিয়ে তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ প্রশাসক এবং শিল্প ও সাহিত্যের একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে সন্তান জন্মদানকালীন জটিলতায় তার অকাল মৃত্যু হয়।
রেনেসাঁ যুগের এই জটিল ইতিহাসের পথ ধরে আমরা এবার ফিরে তাকাবো আধুনিক আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে, যেখানে সততা ও নীতির এক অনন্য উদাহরণ দেখা যায়।
গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড (১৯০৮)
গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড আমেরিকার রাজনীতির এক অনন্য মুখ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ২২তম (১৮৮৫-১৮৮৯) এবং ২৪তম (১৮৯৩-১৮৯৭)—অর্থাৎ দুটি আলাদা, অবিচ্ছিন্ন নয় এমন মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একমাত্র ব্যক্তি। একজন ডেমোক্র্যাট হিসেবে তিনি তার ব্যক্তিগত সততা, আর্থিক রক্ষণশীলতা এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি তার ‘ভেটো’ (Veto) ক্ষমতার ব্যাপক ব্যবহার করতেন, বিশেষ করে যখন দেখতেন সরকারি কোষাগারের অপচয় হচ্ছে। তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদটি ১৮৯৩ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ১৮৯৩ সালে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক যেন না ছড়ায়, তাই একটি ব্যক্তিগত ইয়টের ভেতর গোপনে তার চোয়ালের একটি টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন।
রাজনীতির এই গুরুগম্ভীর আলোচনার পর আমরা স্মরণ করবো এমন একজনকে, যিনি তার হাস্যরস দিয়ে লাখো মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন।
জ্যাকি গ্লিসন (১৯৮৭)
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আমেরিকান বিনোদনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন জন হার্বার্ট “জ্যাকি” গ্লিসন। তিনি মূলত ক্লাসিক সিটকম ‘The Honeymooners’-এ চির-হতাশ বাস ড্রাইভার রালফ ক্র্যামডেনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, যা ওয়ার্কিং-ক্লাস টেলিভিশন সিটকমের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। বড়সড় শারীরিক গড়ন থাকা সত্ত্বেও তার শারীরিক সাবলীলতা এবং নিখুঁত কমেডি টাইমিং ছিল অসাধারণ। তিনি প্রায় বিনা স্ক্রিপ্টে বা রিহার্সেলে কাজ করতে পারতেন, যা দেখে অরসন ওয়েলস তাকে “The Great One” উপাধি দিয়েছিলেন। কমেডির পাশাপাশি তিনি ‘The Hustler’ (১৯৬১)-এর মতো সিনেমায় সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করে একাডেমি পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছিলেন এবং সত্তরের দশকে বেশ কিছু দারুণ সফল ‘মুড মিউজিক’ অ্যালবামও প্রযোজনা করেছিলেন।
“আপনি কি জানেন?” ২৪শে জুনের কিছু অজানা তথ্য
ইতিহাসের পাতায় মাঝে মাঝেই এমন কিছু মজার ও বিস্ময়কর তথ্য লুকিয়ে থাকে যা সচরাচর সবার নজরে আসে না।
-
মিলিয়ন ডলার তারকা: ১৯১৬ সালের ২৪শে জুন, নির্বাক চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরি পিকফোর্ড—যাঁকে “আমেরিকার সুইটহার্ট” বলা হতো—হলিউডের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে ১০ লাখ ডলারের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যা সে যুগের চলচ্চিত্র শিল্পের বিশাল আর্থিক সম্ভাবনার প্রমাণ ছিল।
-
ক্যান্ডি বোম্বারস: ১৯৪৮ সালের এই দিনে শুরু হওয়া বার্লিন এয়ারলিফটের সময়, আমেরিকান পাইলট গেইল হ্যালভোরসেন রুমাল দিয়ে তৈরি ছোট ছোট প্যারাসুটে করে পশ্চিম বার্লিনের শিশুদের জন্য ক্যান্ডি (মিষ্টি) ফেলতে শুরু করেন। যারা এই চমৎকার উদ্যোগের সাথে জড়িত ছিলেন, তাদেরকে ভালোবেসে Rosinenbomber বা ‘কিশমিশ বোমারু’ বলা হতো।
-
পিকাসোর প্যারিস অভিষেক: ১৯০১ সালের ২৪শে জুন, স্পেনের মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ শিল্পী প্যারিসের রু লাফিতে অবস্থিত একটি আর্ট গ্যালারিতে নিজের প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। সেই তরুণের নাম ছিল পাবলো পিকাসো! মজার ব্যাপার হলো, সেদিনের প্রদর্শনীতে আসা অনেক শিল্প সমালোচকই তাকে নিয়ে খুব একটা মুগ্ধ হননি—যিনি পরবর্তীতে ২০শ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পী হয়ে ওঠেন।
ইতিহাসের পাতায় ২৪শে জুনের চিরস্থায়ী ছাপ
২৪শে জুন প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছে যে, এটি ঐতিহাসিক গুরুত্বে ভরপুর একটি দিন। শত শত বছর ধরে এই দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দেশ গড়েছে বা ভেঙেছে, প্রতিভাবান মানুষদের উত্থান-পতন দেখেছে এবং মানুষের সমষ্টিগত স্মৃতিতে গভীর রেখাপাত করেছে। রাজনৈতিক চুক্তি থেকে শুরু করে প্রযুক্তিগত উন্নতি—সবকিছু মিলিয়ে এই দিনটি মানব ইতিহাসের অবিরত পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
অতীতের এই পাতাগুলো উল্টানোর মাধ্যমে আমরা কেবল কী ঘটেছিল তা-ই জানতে পারি না, বরং এই অর্জন, ক্ষতি ও বিবর্তনের পথ ধরে আমরা আজকের পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি আমাদের বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে বড় পাঠশালা।

