মানব সভ্যতার ইতিহাস কেবল কিছু শুষ্ক তারিখের সমাহার নয়; এটি মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি এবং যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক বিপ্লবের এক জীবন্ত মোজাইক। ২৫ মে তারিখটির দিকে গভীরভাবে তাকালে আমরা এমন একটি দিন দেখতে পাই, যা মানুষের মুক্তির লড়াই এবং সৃজনশীল আত্মপ্রকাশের মধ্যে এক অপূর্ব সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। ঠিক এই দিনেই বিশ্ব সাক্ষী হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামের জন্মের—সেই ‘বিদ্রোহী কবি’ যিনি তাঁর অগ্নিঝরা লেখনীর মাধ্যমে সমগ্র বঙ্গবদ্বীপে উপনিবেশ বিরোধী চেতনার দাবানল জ্বালিয়েছিলেন এবং শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে কলম ধরেছিলেন।
আবার পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, এই দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি কংগ্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে মানবজাতিকে চাঁদে পৌঁছানোর এক দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, যা মহাশূন্যে আমাদের যাত্রাপথকে চিরতরে বদলে দেয় এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। এটি সেই দিন যখন স্বাধীন আফ্রিকান দেশগুলো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ভারী শৃঙ্খল ভেঙে নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘অর্গানাইজেশন অফ আফ্রিকান ইউনিটি’ গঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। একইসাথে, এই দিনটি গভীর শোক এবং আত্মানুসন্ধানেরও একটি দিন; জর্জ ফ্লয়েডের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এই দিনেই ঘটেছিল, যা বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার ও পদ্ধতিগত বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এক নতুন জাগরণের জন্ম দেয়।
বাঙালি পরিমণ্ডল: দ্রোহ ও প্রতিরোধের এক অনন্য অধ্যায়
ভারত উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল, এই দিনে বেশ কিছু যুগান্তকারী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই এবং অদম্য স্থিতিস্থাপকতার এক জ্বলন্ত উত্তরাধিকার বহন করে ২৫ মে।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম (১৮৯৯)

‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (মতান্তরে ২৫ মে, বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ) অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃহীন হওয়ার পর চরম দারিদ্র্য ও অশেষ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব কাটে এবং খুব অল্প বয়সেই তাঁকে লেটো দলের গায়ক থেকে শুরু করে রুটির দোকানের কর্মী হিসেবে কাজ করতে হয়। এত প্রতিকূলতার পরও সাহিত্য, সঙ্গীত এবং দর্শনের প্রতি তাঁর যে প্রগাঢ় আবেগ ছিল, তা কখনও দমে যায়নি।
ছোটবেলায় মক্তবে পড়াশোনা করার সুবাদে তিনি আরবি, ফার্সি ও ইসলামি শিক্ষার সংস্পর্শে আসেন, যা তাঁর চিন্তাধারাকে আরও প্রসারিত করেছিল। পরবর্তীতে তাঁর লেখা ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মতো সৃষ্টিগুলো ব্রিটিশ শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, যার কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। নজরুল তাঁর লেখায় ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক সমতা এবং অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর যে বার্তা দিয়ে গেছেন, তা আজও আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের যে অপূর্ব মিলন তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা বর্তমান মেরুকরণের যুগে গভীরভাবে শিক্ষণীয়।
প্রতি বছর অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তাঁর জন্মবার্ষিকী ‘নজরুল জয়ন্তী’ হিসেবে উদযাপিত হয়। প্রতি বছর ১১ই জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে) পালিত এই দিনটিতে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাঙালিরা তাঁর চিরস্থায়ী কীর্তিকে সম্মান জানাতে একত্রিত হন। বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি এবং নজরুল সঙ্গীতের হৃদয়স্পর্শী পরিবেশনার মধ্য দিয়ে, নজরুল জয়ন্তী তাঁর বিদ্রোহী চেতনা, স্বাধীনতার জন্য আজীবন সংগ্রাম এবং মানবতার প্রতি তাঁর অবিচল অঙ্গীকারের এক জোরালো স্মারক হিসেবে কাজ করে।
সবরমতী আশ্রম প্রতিষ্ঠা (১৯১৫)
মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সফল আন্দোলন শেষে ভারতে ফিরে আসার পরপরই এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ বাসস্থান বা কমিউন ছিল না; এটি ছিল একটি আদর্শিক গবেষণাগার, যেখানে ‘অহিংসা’ এবং ‘স্বদেশী’ নীতিগুলো কঠোরভাবে পরীক্ষা ও পরিমার্জন করা হতো। গান্ধীজি এখানেই স্থানীয় বস্ত্র শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন এবং জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণার রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। সবরমতী আশ্রমের কঠোর শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কৌশল সমগ্র উপমহাদেশের বুদ্ধিজীবী এবং কর্মীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রামকে বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছিল। এখান থেকেই ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক ডান্ডি মার্চের সূচনা হয়েছিল, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
প্রলয়ংকরী গঙ্গা বদ্বীপ ঘূর্ণিঝড় (১৯৪১)
১৯৪১ সালের এই ঘূর্ণিঝড় অবিভক্ত বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং এটি ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের চরম অবহেলা ও অক্ষমতার এক মর্মান্তিক প্রমাণ। ঘণ্টায় ১০০ মাইলেরও বেশি বেগের বাতাস এবং প্রকাণ্ড জলোচ্ছ্বাসের কারণে বরিশাল, নোয়াখালী এবং আশেপাশের জেলাগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। অবকাঠামো, গবাদি পশু এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে অগণিত মানুষ প্রাণ হারায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ব্রিটিশদের সম্পূর্ণ মনোযোগ ও রসদ তখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত থাকায়, সাধারণ মানুষের জন্য ত্রাণ কার্যক্রমে ভয়াবহ বিলম্ব হয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়টি বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় এবং খাদ্যের মজুদ তলানিতে নিয়ে যায়, যা ১৯৪৩ সালের মর্মান্তিক পঞ্চাশের মন্বন্তরের সরাসরি পটভূমি তৈরি করেছিল।
রাসবিহারী বসুর বিপ্লবী সংগ্রাম (১৮৮৬)
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যখন অনেকে দেশের ভেতর থেকে অহিংস পথে লড়ছিলেন, তখন রাসবিহারী বসু প্রমাণ করেছিলেন যে, ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধকে নিখুঁতভাবে সামরিক রূপ দেওয়া সম্ভব। ১৯১২ সালের দিল্লি-লাহোর ষড়যন্ত্র (যেখানে লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যার চেষ্টা করা হয়) এবং গদর বিদ্রোহের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড বসু ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে জাপানে পালিয়ে যান। সেখানে গিয়েও তিনি নিশ্চুপ ছিলেন না; তিনি জাপানি ভাষা শেখেন, রাজনৈতিক মহলে নিজেকে যুক্ত করেন এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য অক্লান্ত ওকালতি চালিয়ে যান। তিনি শুধু ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ’ প্রতিষ্ঠাই করেননি, বরং পরবর্তীতে সুভাষ চন্দ্র বসুর হাতে শক্তিশালী ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর নেতৃত্বও তুলে দেন।
ইতিহাসের এই পরিক্রমা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবস এই দিনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। নিচে আমরা আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে পালিত এমন কিছু দিবসের দিকে নজর দেব।
আন্তর্জাতিক দিবস ও ছুটিসমূহ
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও ২৫ মে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই দিনে বিশেষ দিবস পালন করে থাকে যা সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং মানবাধিকারের সাথে যুক্ত। নিচে এই দিনের কিছু প্রধান আন্তর্জাতিক দিবসের তালিকা দেওয়া হলো:
| দিবস | মূল বিষয় | তাৎপর্য |
| আফ্রিকা দিবস | মহাদেশীয় ঐক্য | ১৯৬৩ সালে অর্গানাইজেশন অফ আফ্রিকান ইউনিটি প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণ করে। |
| আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবস | শিশু নিরাপত্তা | অপহৃত শিশুদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। |
| গিক প্রাইড ডে | পপ কালচার | বিজ্ঞান কল্পকাহিনী এবং ফ্যানডম সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী উদযাপন। |
আফ্রিকা দিবস মহাদেশটির স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক একীভূতকরণের দিকে অবিরাম যাত্রার এক গভীর উদযাপন, যা আফ্রিকান দেশগুলোর ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তির প্রতীক। অন্যদিকে, ১৯৭৯ সালে নিউইয়র্কে ছয় বছর বয়সী এতান প্যাটজের মর্মান্তিক নিখোঁজ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক নিখোঁজ শিশু দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সারা বিশ্বের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিখোঁজ শিশুদের খোঁজার পদ্ধতিকে আমূল বদলে দেয়।
শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই নয়, বেশ কয়েকটি দেশের জন্য এই দিনটি তাদের আধুনিক রাজনৈতিক রাষ্ট্রের জন্ম এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। নিচে এমন দুটি দেশের জাতীয় দিবসের বিবরণ দেওয়া হলো:
| দেশ | দিবস | ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট |
| জর্ডান | স্বাধীনতা দিবস | ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসান এবং প্রথম আবদুল্লাহর রাজা হিসেবে উত্থান। |
| আর্জেন্টিনা | প্রথম দেশপ্রেমিক সরকার দিবস | ১৮১০ সালের মে বিপ্লব, যা স্প্যানিশ ভাইসরয়কে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। |
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের গণ্ডি পেরিয়ে ২৫ মে দিনটি বিশ্বজুড়ে আরও অনেক যুগান্তকারী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। চলুন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ইতিহাস পর্যালোচনা করি।
বিশ্ব ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহ

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই দিনটি তাদের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন এবং নাগরিক অধিকার আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। নিচে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার তালিকা দেওয়া হলো:
| সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
| ১৭৮৭ | সাংবিধানিক কনভেনশন শুরু | প্রতিনিধিরা এমন একটি নথির খসড়া তৈরি করতে শুরু করেন যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পরিচালনা করবে। |
| ১৯৬১ | অ্যাপোলোর অঙ্গীকার | প্রেসিডেন্ট কেনেডি সেই দশকের শেষ নাগাদ চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। |
| ১৯৭৭ | স্টার ওয়ার্স মুক্তি | জর্জ লুকাসের এই চলচ্চিত্রটি সিনেমা জগতের দৃশ্যপট চিরতরে বদলে দেয়। |
| ২০২০ | জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড | সিস্টেমিক বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাগরিক অধিকার বিক্ষোভের জন্ম দেয়। |
ফিলাডেলফিয়ায় সাংবিধানিক কনভেনশন ছিল এক ভঙ্গুর অথচ সাহসী পরীক্ষা, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের মানুষেরা একটি কার্যকরী প্রজাতন্ত্র গড়ার জন্য একত্রিত হয়েছিলেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর, কেনেডির সাহসী ‘অ্যাপোলো অঙ্গীকার’ স্পেস রেসকে ত্বরান্বিত করে এবং সরাসরি ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক চন্দ্রবিজয়ের পথ সুগম করে। আর অতি সাম্প্রতিক ইতিহাসে, জর্জ ফ্লয়েডের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আমেরিকার সীমানা ছাড়িয়ে পুলিশি বর্বরতা এবং পদ্ধতিগত বর্ণবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে এক প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
রাশিয়ার জন্য এই দিনটি ছিল আদর্শগত স্বাধীনতার এক বিশাল বিজয়। নিচের সারণিতে রাশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরা হলো:
| সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
| ১৯৯৪ | আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিনের প্রত্যাবর্তন | সোভিয়েত আমলে জোরপূর্বক নির্বাসনে থাকার দুই দশক পর এই ভিন্নমতাবলম্বী লেখক রাশিয়ায় ফিরে আসেন। |
প্রাচীন সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা—চীনের ইতিহাসে এই দিনটির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নিচে চীনের ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দেওয়া হলো:
| সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
| ১৬৪৪ | মিং রাজবংশের পতন | মাঞ্চু বাহিনী বেইজিং দখল করে কিং রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। |
| ২০০২ | চায়না এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৬১১ | বোয়িং ৭৪৭ বিমানটি তাইওয়ান প্রণালীর ওপর মাঝ আকাশে ভেঙে পড়ে, ২২৫ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। |
ব্রিটেনের ইতিহাসে এই দিনটি শাসনব্যবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন এবং সাহিত্যের এক দুঃখজনক অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। নিচে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের কিছু ঘটনা তুলে ধরা হলো:
| সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
| ১৬৫৯ | রিচার্ড ক্রমওয়েলের পদত্যাগ | কমনওয়েলথের পতন এবং রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম হয়। |
| ১৮৯৫ | অস্কার ওয়াইল্ডের কারাদণ্ড | “চরম অশালীনতার” অভিযোগে এই মহান নাট্যকারকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। |
ঐতিহাসিক ঘটনার পাশাপাশি, এই দিনে বেশ কয়েকজন কালজয়ী ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন, যাদের অবদান বিশ্বজুড়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত জন্ম ও মৃত্যু
দর্শন, চলচ্চিত্র এবং আধুনিক সঙ্গীতের জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন এমন কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিনের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| সাল | নাম | পেশা ও অবদান |
| ১৮০৩ | রালফ ওয়াল্ডো এমারসন | মার্কিন প্রাবন্ধিক, যিনি ট্রান্সসেনডেন্টালিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। |
| ১৯২৬ | মাইলস ডেভিস | মার্কিন জ্যাজ ট্রাম্পেটার, যিনি বিংশ শতাব্দীর সঙ্গীতকে নতুন রূপ দেন। |
| ১৯৩৯ | ইয়ান ম্যাকেলেন | আইকনিক মঞ্চ অভিনয় এবং ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্রের জন্য সমাদৃত ব্রিটিশ অভিনেতা। |
| ১৯৭৬ | কিলিয়ান মার্ফি | আইরিশ অস্কারজয়ী অভিনেতা, ‘ওপেনহেইমার’ এবং ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’-এর জন্য পরিচিত। |
রালফ ওয়াল্ডো এমারসন আমেরিকার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছিলেন, অন্যদিকে মাইলস ডেভিস জ্যাজ সঙ্গীতের সীমানা প্রসারিত করে একে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। স্যার ইয়ান ম্যাকেলেন এবং কিলিয়ান মার্ফির মতো অভিনেতারা আধুনিক চলচ্চিত্রে নাট্যকলার অসামান্য শক্তি প্রমাণ করেছেন।
বিশ্বের বেশ কয়েকজন যুগান্তকারী নেতা এবং কালজয়ী সঙ্গীতশিল্পী এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| সাল | নাম | মৃত্যুর কারণ বা উত্তরাধিকার |
| ১৯৩৪ | গুস্তাভ হোলস্ট | ‘দ্য প্ল্যানেটস’-এর এই ইংলিশ সুরকার আধুনিক সিনেমাটিক সঙ্গীতে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। |
| ২০২০ | জর্জ ফ্লয়েড | তাঁর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড একটি বিশ্বব্যাপী নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অনুঘটক হয়ে ওঠে। |
| ২০২৩ | টিনা টার্নার | “কুইন অফ রক অ্যান্ড রোল”, যিনি অদম্য মানসিক শক্তি এবং অতুলনীয় কণ্ঠস্বরের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। |
ইতিহাসের মূল ধারার বাইরেও অনেক ছোট ছোট ঘটনা থাকে যা আমাদের চমকে দেয় এবং নতুন করে ভাবতে শেখায়। চলুন, ২৫ মে সম্পর্কে এমনই কিছু অজানা তথ্য জেনে নিই।
অজানা কিছু তথ্য: “আপনি কি জানতেন?”
-
খেলাধুলার ইতিহাসে সেরা ৪৫ মিনিট: ১৯৩৫ সালের ২৫ মে, মার্কিন অ্যাথলেট জেসি ওয়েন্স মিশিগানের অ্যান আর্বারে পিঠের চোট থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে তিনটি বিশ্ব রেকর্ড গড়েন এবং চতুর্থটিতে সমতা আনেন। এটি ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের ইতিহাসে একটি অকল্পনীয় অর্জন।
-
দ্য বামবিনোর শেষ সুইং: বেসবল আইকন বেব রুথ ১৯৩৫ সালের এই দিনেই তাঁর ক্যারিয়ারের ৭১৪ তম হোম রানটি হাঁকান। ফোর্বস ফিল্ডের ছাদের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বিশাল সেই শটটিই ছিল অবসর নেওয়ার আগে তাঁর জীবনের শেষ হোম রান।
-
প্রথম কয়েন পার্কিং মিটার: ১৯৩৮ সালের ২৫ মে, ওকলাহোমার কার্ল ম্যাজি প্রথম কয়েন-নিয়ন্ত্রিত পার্কিং মিটারের পেটেন্ট লাভ করেন, যা পরবর্তীতে শহুরে যানজট নিরসন এবং শহরের রাজস্ব সংগ্রহের চিত্র চিরতরে বদলে দেয়।
কালের আয়নায় ২৫ মে: একটি গভীর আত্মানুসন্ধান
ইতিহাসের পাতায় ২৫ মে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার উত্থান-পতন, নিরন্তর সংগ্রাম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির একটি জীবন্ত দলিল। এই দিনটির বৈচিত্র্যময় ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি যে, কীভাবে মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহা এবং সৃজনশীলতা প্রতিটি যুগে নতুন করে পথ দেখিয়েছে। একদিকে কাজী নজরুল ইসলাম বা রাসবিহারী বসুর মতো অকুতোভয় বিপ্লবীরা যেমন শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছেন, তেমনি জন এফ. কেনেডির চন্দ্রবিজয়ের দূরদর্শী স্বপ্ন মানুষকে তার পরিচিত সীমানা ছাড়িয়ে অসীমে পাড়ি দেওয়ার অবিরাম অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আবার এই একই দিন জর্জ ফ্লয়েডের মতো মর্মান্তিক ঘটনার মাধ্যমে আমাদের অত্যন্ত রূঢ়ভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সাম্য, মানবাধিকার ও ন্যায়ের সংগ্রাম আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
একটি সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই কেবল তার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা বিশাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না, বরং তা মূলত নির্ভর করে সেই সমাজ কতটা মানবিক, সংবেদনশীল এবং বৈষম্যহীন তার ওপর। ২৫ মে আমাদের সেই সম্মিলিত বৈশ্বিক দায়িত্বের কথাটিই বারবার মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি বড় পরিবর্তনের শুরু হয় একটি ছোট পদক্ষেপ, একটি নতুন ভাবনা অথবা একটি সাহসী কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে। তাই, এই ঐতিহাসিক দিনটি শুধু অতীতকে রোমন্থন বা স্মরণ করার জন্যই নয়, বরং নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই অসীম সম্ভাবনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলে একটি সুন্দর, সহনশীল এবং ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় শপথ নেওয়ারও একটি অমূল্য সুযোগ।


