ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই মানুষের কোনো না কোনো বিজয়, ট্র্যাজেডি বা যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী। তবে ২৩শে সেপ্টেম্বর দিনটি যেন বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য মোহনা, যেখানে এসে মিলেছে নানা চমকপ্রদ ঘটনা। রোমান সম্রাটদের জন্ম থেকে শুরু করে দূরবর্তী গ্রহের আবিষ্কার, ভারতীয় উপমহাদেশে বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ, কিংবা আজকের দিনের বিশাল সব কর্পোরেশনের জন্ম—এই দিনটি বারবার আমাদের জীবনযাপন, শাসনব্যবস্থা এবং মহাবিশ্বকে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন রূপ দিয়েছে।
আপনি যদি স্নায়ুযুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন বুঝতে আগ্রহী একজন ইতিহাসপ্রেমী হন, কিংবা কিংবদন্তি সব সঙ্গীতশিল্পীর জন্মদিনে মুগ্ধ হওয়া কোনো সংস্কৃতি অনুরাগী হন, ২৩শে সেপ্টেম্বর আপনার সামনে মানব ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর জানালা খুলে দেবে। চলুন, ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখে নিই এই দিনে ঘটে যাওয়া কিছু অবিস্মরণীয় ঘটনা, বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম এবং বিদায়ের গল্প।
এক নজরে ২৩শে সেপ্টেম্বর
বঙ্গীয় পরিমণ্ডল ও দক্ষিণ এশিয়ার মাইলফলক
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন এবং ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধের গল্পে বোনা। ২৩শে সেপ্টেম্বর এই অঞ্চলের ইতিহাসে বেশ কয়েকটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মদান (১৯৩২)

বাংলার ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে খুব কম নামই প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো এতটা শ্রদ্ধা ও আবেগের জন্ম দেয়। ১৯৩২ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর, মাত্র ২১ বছর বয়সী এই অকুতোভয় বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী নেতা চট্টগ্রামের (বর্তমান বাংলাদেশে) পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে এক দুঃসাহসিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন। এই ক্লাবটি ছিল ব্রিটিশ আধিপত্যবাদের এক চরম অহংকারী প্রতীক, যার প্রবেশদ্বারে লেখা ছিল একটি কুখ্যাত সাইনবোর্ড: “কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ” (Dogs and Indians not allowed)। মাস্টারদা সূর্য সেনের নির্দেশনায়, প্রীতিলতা ও তাঁর দল সফলভাবে ক্লাবটিতে আক্রমণ চালান।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পুলিশের হাতে কোণঠাসা হয়ে এবং বুলেটের আঘাতে আহত অবস্থায়, প্রীতিলতা আত্মসমর্পণ করার বদলে পটাশিয়াম সায়ানাইড ক্যাপসুল গিলে আত্মাহুতির পথ বেছে নেন। তাঁর এই চূড়ান্ত আত্মত্যাগ অগণিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর বুকে আগুন জ্বালিয়েছিল এবং আজও তা বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে স্মরণীয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক ও বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য
এই দিনটিতে উপমহাদেশ বেশ কয়েকজন কালজয়ী মানুষের জন্মবার্ষিকীও উদযাপন করে, যাদের অবদান সমাজ ও বিজ্ঞানে অপরিসীম।
-
আনন্দমোহন বসু (জন্ম ১৮৪৭): বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা এবং সমাজসংস্কারক, যিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
-
ড. অসীমা চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯১৭): তিনি কাঁচের দেয়াল ভেঙে প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে কোনো ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অব সায়েন্স (D.Sc.) ডিগ্রি অর্জন করেন। জৈব রসায়নে, বিশেষ করে এই অঞ্চলের ঔষধি গাছপালা নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা ম্যালেরিয়া এবং মৃগীরোগের মতো রোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ আবিষ্কারের পথ প্রশস্ত করে, যা বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
-
রামধারী সিং ‘দিনকর’ (জন্ম ১৯০৮): সাহিত্য জগতেও এই দিনটির আলাদা কদর রয়েছে। ‘রাষ্ট্রকবি’ হিসেবে পরিচিত এই হিন্দি কবির ক্ষুরধার কবিতা সমগ্র ভারতজুড়ে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রবলভাবে উজ্জীবিত করেছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, স্বাধীনতার লড়াইয়ে তরবারির মতোই কলমও সমান শক্তিশালী এক হাতিয়ার।
বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনাবলি
উপমহাদেশের সীমানা পেরিয়ে, ২৩শে সেপ্টেম্বর দিনটি মহাজাগতিক আবিষ্কার, চরম রাজনৈতিক কূটকৌশল এবং আধুনিক প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের উত্থানেরও সাক্ষী।
ইউরোপ: মহাকাশের গণিত (১৮৪৬)
১৮৪৬ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বরের আগে, সৌরজগৎ নিয়ে মানুষের মানচিত্র ইউরেনাস গ্রহেই আটকে ছিল। কিন্তু ফরাসি গণিতবিদ উর্বেন লে ভেরিয়ে (Urbain Le Verrier) ইউরেনাসের কক্ষপথে কিছু অদ্ভুত অনিয়ম লক্ষ্য করেন। কেবল বিশুদ্ধ গণিত ব্যবহার করে তিনি হিসাব কষে বের করেন যে, নিশ্চয়ই আরও একটি বিশাল গ্রহ সেখানে আছে, যার মহাকর্ষীয় টান ইউরেনাসকে প্রভাবিত করছে। তিনি তার হিসেব করা স্থানাঙ্ক পাঠিয়ে দেন বার্লিন মানমন্দিরের জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহান গটফ্রিড গ্যালের কাছে। গ্যালে প্রথম রাতেই ঠিক সেই জায়গায় টেলিস্কোপ তাক করেন, যেখানে লে ভেরিয়ের অঙ্ক ইশারা করেছিল—এবং তিনি নেপচুন আবিষ্কার করেন। এটি ছিল নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক বিজয়, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে চিরতরে বদলে দেয়।
এশিয়া: তাসের প্যাকেট থেকে বিশ্বজয় (১৮৮৯)
সুপার মারিও, জেল্ডা বা গেম বয় পৃথিবীতে আসার অনেক আগে, ১৮৮৯ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর জাপানের কিয়োটোতে ফুসাজিরো ইয়ামাউচি নামের এক উদ্যোক্তা ছোট একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। কোম্পানিটির নাম ছিল ‘নিন্টেন্ডো কোপ্পাই’ (Nintendo Koppai), আর তাদের কাজ ছিল ‘হানাফুদা’ (ফুলের তাস) নামের ঐতিহ্যবাহী জাপানি তাস হাতে তৈরি করা। এই তাসগুলো জাপানে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। কে জানত, সেই তাস বানানোর ছোট্ট কোম্পানিটিই দশকের পর দশক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের ভিডিও গেম সাম্রাজ্যে পরিণত হবে, যা আধুনিক বৈশ্বিক বিনোদনের সমার্থক!
যুক্তরাষ্ট্র: টেলিভিশনের পর্দায় রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা (১৯৫২)
১৯৫২ সালে রিচার্ড নিক্সনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল। নির্বাচনী তহবিলে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায়, ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের রানিং মেট হিসেবে নিজের ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা টিকিয়ে রাখতে তিনি এক মরিয়া চেষ্টায় জাতীয় টেলিভিশনের শরণাপন্ন হন। ইতিহাসে যা “চেকার্স স্পিচ” (Checkers Speech) নামে পরিচিত, সেই ভাষণে নিক্সন দারুন চাতুর্যের সাথে সাংবাদিকদের এড়িয়ে সরাসরি আমেরিকার সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে কথা বলেন। তিনি তার সাধারণ আর্থিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন এবং স্বীকার করেন যে তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক উপহারই গ্রহণ করেছেন: ‘চেকার্স’ নামের একটি সাদাকালো ককার স্প্যানিয়েল কুকুরছানা, যা তার সন্তানরা ভীষণ ভালোবাসে। ভাষণটি অভূতপূর্ব সাফল্য পায়, নিক্সনের ক্যারিয়ার রক্ষা পায় এবং প্রথমবারের মতো এটি প্রমাণিত হয় যে, রাজনৈতিক জনমত গঠন এবং সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে টেলিভিশন কতটা শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য: আধুনিক সৌদি আরবের জন্ম (১৯৩২)
২৩শে সেপ্টেম্বর দিনটিকে ‘সৌদি জাতীয় দিবস’ (আল-ইয়াওম-উল-ওয়াতানি) হিসেবে উদযাপন করা হয়। ১৯৩২ সালের এই দিনে রাজা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ আনুষ্ঠানিকভাবে হেজাজ এবং নজদ নামের দুটি পৃথক রাজ্যকে একত্রিত করে আধুনিক কিংডম অব সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করেন। এই একত্রীকরণ এমন একটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল, যার ওপর দাঁড়িয়ে অচিরেই আবিষ্কৃত হয় বিশাল তেলের খনি। আর সেই তেল সম্পদ সৌদি আরবকে বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রভাবকে পরিণত করে।
বিখ্যাত জন্ম: নেতা, কিংবদন্তি এবং আইকন
ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে মানুষ। ২৩শে সেপ্টেম্বর এমন কিছু অসাধারণ মানুষের জন্ম দিয়েছে, যারা রাজনীতি, সঙ্গীত এবং সংস্কৃতির ধারাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন।
আমরা যেমন শুরু বা জন্ম উদযাপন করি, তেমনি ২৩শে সেপ্টেম্বর এমন কয়েকজন মানুষের চূড়ান্ত বিদায়বেলাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়, যাদের সৃষ্টি ও আদর্শ তাদের মৃত্যুর পরও বেঁচে আছে সগৌরবে।
রাতের খাবার টেবিলে দারুণ কোনো আলোচনার বিষয় খুঁজলে, এই দিনটির ইতিহাস আপনাকে চমৎকার কিছু ট্রিভিয়া উপহার দিতে পারে:
-
দীর্ঘতম পদযাত্রা শেষে বাড়ি ফেরা: ১৮০৬ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর, কিংবদন্তি অভিযাত্রী লুইস ও ক্লার্কের (Lewis and Clark) দল দীর্ঘ অভিযান শেষে মিসৌরির সেন্ট লুইসে ফিরে আসে। নবঅর্জিত লুইজিয়ানা পারচেজ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল অন্বেষণ করতে তারা দুই বছরেরও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। উত্তর আমেরিকার বিশাল অজানা মানচিত্র তৈরি করতে তারা প্রায় ৮,০০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছিলেন!
-
এক ধীরগতির মাস্টারপিস: বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মাস্টারপিস খলিল জিবরানের কবিতার বই দ্য প্রফেট (The Prophet) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর। শুরুতে এর বিক্রি ছিল খুবই হতাশাজনক। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে এর প্রশংসা ছড়াতে থাকে এবং একপর্যায়ে এটি অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা পায়। এখন পর্যন্ত বইটির ১০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে, ১০০টিরও বেশি ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে এবং প্রকাশনার পর থেকে এটি কখনোই আউট-অব-প্রিন্ট হয়নি।
-
মহাকাশে যোগাযোগের মর্মান্তিক ব্যর্থতা: ১৯৯৯ সালের এই দিনে নাসা (NASA) তাদের ১২৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘মার্স ক্লাইমেট অরবিটার’ (Mars Climate Orbiter) মহাকাশযানটি হারায়। কারণটি জানলে চমকে উঠবেন—দুটি ইঞ্জিনিয়ারিং দলের মধ্যে যোগাযোগের এক হাস্যকর অথচ ভয়ংকর ভুল! থ্রাস্টার অপারেশনের জন্য একটি দল মেট্রিক একক (নিউটন) ব্যবহার করেছিল, আর অন্য দলটি ব্যবহার করেছিল ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল একক (পাউন্ড-সেকেন্ড)। এই ছোট্ট হিসেবের ভুলে মহাকাশযানটি মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
শেষ কথা
ক্যালেন্ডারের তারিখগুলো নিছক কিছু সংখ্যা নয়; এগুলো আমাদের সামষ্টিক স্মৃতির এক একটি নোঙর। ২৩শে সেপ্টেম্বর দিনটি আমাদের মানব অভিজ্ঞতার বিশাল বর্ণালী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—একদিকে বাংলার স্বাধীনতার জন্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের অসীম সাহসিকতার আত্মদান, অন্যদিকে বার্লিনের মানমন্দিরে টেলিস্কোপে চোখ রেখে জোহান গ্যালের অন্য এক মানুষের অঙ্কে কষা নতুন একটি গ্রহের অস্তিত্ব প্রমাণ করা।
ব্রুস স্প্রিংস্টিন বা জন কোলট্রেনের মতো সাংস্কৃতিক মহারথীদের জন্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ হিসেবে আমরা কতটা সুন্দর শিল্প সৃষ্টি করতে পারি; আবার কিয়োটোতে তাস বানানোর ছোট্ট একটি কারখানার বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হওয়া আমাদের শেখায়, দারুণ কিছু গড়ে তোলার শুরুটা কত সাদামাটাভাবেই না হতে পারে! এই দিনে কী ঘটেছিল তা জানার মধ্য দিয়ে আমরা ইতিহাস নামের সেই জটিল ও অন্তর্জালে বোনা পথটিকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি, যে পথ ধরে আমরা আজকের এই বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছি।

