২৫শে সেপ্টেম্বর—ক্যালেন্ডারের পাতায় নিছক একটি সাধারণ দিন মনে হলেও, মানব ইতিহাসের এক বিশাল ক্যানভাসে এই দিনটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রতিটি দিনই মানুষের যাত্রাপথের নীরব সাক্ষী, কিন্তু ২৫শে সেপ্টেম্বর যেন এমন এক বিরল মুহূর্তের সমাহার, যেখানে মানুষের অদম্য সাহস প্রথাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং গোটা দেশ ও জাতির গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছে। ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের মধ্যযুগীয় রণাঙ্গনে ভাইকিং যুগের আকস্মিক অবসান থেকে শুরু করে আমেরিকার লিটল রক সেন্ট্রাল হাইস্কুলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কিশোর-কিশোরীদের সাহসী লড়াই—এই দিনটি বারবার প্রমাণ করেছে কীভাবে একক মানুষের বীরত্ব ইতিহাসকে নতুন রূপ দিতে পারে।
ঠিক এই দিনেই, ১৯৭৪ সালে, সদ্য স্বাধীন এক দক্ষিণ এশীয় প্রজাতন্ত্রের স্থপতি প্রথমবারের মতো তার মাতৃভাষায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়ে বিশ্ব কূটনীতিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, যা ছিল ভূ-রাজনৈতিক সংশয়ের বিপরীতে এক দৃঢ় আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ২৫শে সেপ্টেম্বর জন্ম দিয়েছে সাহিত্যের পথিকৃৎ, যুগান্তকারী বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক আইকনদের; আবার একই দিনে পৃথিবী বিদায় জানিয়েছে নোবেল বিজয়ী, বিপ্লবী পরিবেশবাদী এবং সংস্কৃতির মহীরুহদের। চলুন, ২৫শে সেপ্টেম্বরের এই ঘটনাবহুল, রোমাঞ্চকর এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাসের পাতাগুলো একটু উল্টে দেখি।
বাংলা ও উপমহাদেশের প্রেক্ষাপট: ভাষা, মুক্তি এবং ঐতিহাসিক মাইলফলক
বঙ্গব-দ্বীপ এবং বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে ২৫শে সেপ্টেম্বর কূটনীতি, বিজ্ঞান, শিল্প ও রাষ্ট্র গঠনের এক অনন্য দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
- বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ঐতিহাসিক ভাষণ (১৯৭৪): ১৯৭৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার মাত্র আট দিন পরের ঘটনা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়ান। কূটনৈতিক প্রথা ভেঙে তিনি ইংরেজি বা ফরাসির বদলে সম্পূর্ণ বাংলায় তার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এর পেছনে ছিল গভীর প্রতীকী ও রাজনৈতিক তাৎপর্য। বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বুকের রক্ত ঢেলে ছাত্র-জনতা বাংলাকে রক্ষা করেছিল। পৃথিবীর সর্বোচ্চ কূটনৈতিক মঞ্চে বাংলায় কথা বলে বঙ্গবন্ধু মূলত সেই আত্মত্যাগকেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন। কেবল ভাষা নয়, তাঁর সেই ভাষণ ছিল বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে এক জোরালো ইশতেহার। তিনি বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য, মুদ্রাস্ফীতি, যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। “কারো সাথে বৈরিতা নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব”—বাংলাদেশের এই পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি তিনি সেদিনই বিশ্বের সামনে ঘোষণা করেছিলেন।
- সতীশ ধাওয়ানের জন্ম (১৯২০): জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে জন্মগ্রহণ করা সতীশ ধাওয়ান ছিলেন ভারতের নিজস্ব মহাকাশ ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান রূপকার। ১৯৭২ সালে বিক্রম সারাভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ISRO) তৃতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্বেই ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি একটি সুগঠিত ও কার্যকর রূপ লাভ করে। তার অধীনেই ভারত ১৯৭৫ সালে প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘আর্যভট্ট’ উৎক্ষেপণ করে এবং পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল (PSLV) তৈরির কাজ শুরু করে। অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায় অবস্থিত ভারতের প্রধান মহাকাশ উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটি তাঁর সম্মানে ‘সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার’ নামকরণ করা হয়েছে।
- দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জন্ম (১৯১৬): উত্তরপ্রদেশের মথুরায় জন্মগ্রহণ করা দীনদয়াল উপাধ্যায় ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং ভারতীয় জনসংঘের অন্যতম নেতা। তাঁর ‘Integral Humanism’ বা ‘একাগ্র মানবতাবাদ’ তত্ত্বটি ছিল এমন একটি দেশীয় আর্থ-সামাজিক মডেল, যা পশ্চিমা পুঁজিদবাদ এবং মার্কসীয় বস্তুবাদ—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি একটি বিকেন্দ্রীকৃত, মানব-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা আজও ভারতের রাজনৈতিক দর্শনে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
- বিষেণ সিং বেদীর জন্ম (১৯৪৬): পাঞ্জাবের অমৃতসরে জন্ম নেওয়া বিষেণ সিং বেদী ছিলেন ভারতের বিখ্যাত স্পিন-চতুষ্টয়ের (বেদী, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর এবং ভেঙ্কটরাঘবন) অন্যতম প্রাণভোমরা। তার ছন্দময় রান-আপ এবং বলের ঘূর্ণির মায়াজালে তিনি বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটারদের বোকা বানাতেন। ভারতের হয়ে ২২টি টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়া এই বাঁহাতি স্পিনার তার ক্যারিয়ার শেষ করেন ২৬৬টি টেস্ট উইকেট নিয়ে। ক্রিকেটের নৈতিকতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে তিনি সারাজীবন ছিলেন আপসহীন।
- প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের প্রয়াণ (১৯৯০): এই দিনটিতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রখ্যাত গান্ধীবাদী নেতা প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই বীর সেনানী ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং চরম খাদ্য সংকটের সময় তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আজও স্মরণীয়।
বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্তগুলো

উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে তাকালে দেখা যায়, ২৫শে সেপ্টেম্বর এমন সব যুগান্তকারী ঘটনার জন্ম দিয়েছে, যা সমাজ, রাষ্ট্র ও ভূগোলের মানচিত্র বদলে দিয়েছে।
- মার্কিন সংবিধানে মানবাধিকারের ভিত্তি (১৭৮৯): নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কংগ্রেস জেমস ম্যাডিসনের খসড়া করা ১২টি সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করে। পরবর্তীতে এর মধ্যে ১০টি সংশোধনী রাজ্যগুলো দ্বারা অনুমোদিত হয়ে ‘বিল অব রাইটস’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে যুক্ত হয়। বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের মতো মৌলিক মানবাধিকারগুলো এই দিনেই আইনি কাঠামোর স্বীকৃতি পেয়েছিল।
- লিটল রক সেন্ট্রাল হাইস্কুলে বর্ণবাদবিরোধী লড়াই (১৯৫৭): মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের সরাসরি নির্দেশে ১০১তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের সশস্ত্র সেনারা ৯ জন আফ্রিকান-আমেরিকান শিক্ষার্থীকে (যাঁরা ‘লিটল রক নাইন’ নামে পরিচিত) আরকানসাসের সেন্ট্রাল হাইস্কুলে নিরাপদে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের ক্ষুব্ধ জমায়েত এবং গভর্নর অরভাল ফবাসের বিরোধিতাকে তোয়াক্কা না করে এই সামরিক পদক্ষেপ প্রমাণ করেছিল যে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে মার্কিন সরকার বদ্ধপরিকর। এটি ছিল আমেরিকার নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক বিশাল নৈতিক বিজয়।
- সুপ্রিম কোর্টে প্রথম নারী বিচারপতি (১৯৮১): প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান কর্তৃক মনোনীত হয়ে সান্দ্রা ডে ও’কনর মার্কিন সিনেটে ৯৯-০ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ২৪ বছরের কার্যকালে তিনি প্রজনন অধিকার, ভোটাধিকার এবং বৈষম্য বিলোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে অত্যন্ত নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে বিচারব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিক একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটান।
- স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধ (১০৬৬): ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে রাজা হ্যারল্ড গডউইনসন নরওয়ের রাজা হ্যারাল্ড হার্ডরাডা এবং নিজের বিদ্রোহী ভাই টস্টিগের নেতৃত্বাধীন আক্রমণকারী নরওয়েজীয় বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। হার্ডরাডার মৃত্যু ইংল্যান্ডে ভাইকিং সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নের চিরস্থায়ী সমাপ্তি ঘটায়।
- ট্রিটি অব ইয়র্ক (১২৩৭): ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় হেনরি এবং স্কটল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়। নদী ও উপত্যকা ধরে টানা এই সীমানা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জাতীয় সীমানা, যা আজও প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
- শান্তি চুক্তি পিস অব অগসবার্গ (১৫৫৫): রোমান সম্রাট প্রথম ফার্দিনান্দ এবং জার্মান রাজকুমারদের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় সংঘাতের অবসান ঘটে। “যার রাজ্য, তার ধর্ম”—এই নীতির ভিত্তিতে জার্মান রাজকুমারদের নিজেদের অঞ্চলে ক্যাথলিক বা লুথেরান ধর্ম বেছে নেওয়ার আইনি অধিকার দেওয়া হয়।
- চীনের পিংক্সিংগুয়ান যুদ্ধ (১৯৩৭): দ্বিতীয় সিনো-জাপানি যুদ্ধের সময় শানসি প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায় লিন বিয়াওয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট বাহিনী ইম্পেরিয়াল জাপানি লজিস্টিক ডিভিশনকে অতর্কিত আক্রমণ করে। যদিও এটি খুব বড় কোনো যুদ্ধ ছিল না, কিন্তু জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে চীনাদের এই প্রথম উল্লেখযোগ্য জয় জাপানিদের “অপরাজেয়” থাকার মিথ ভেঙে দেয় এবং চীনাদের মনোবল ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলে।
- মহাকাশে আমেরিকা ও রাশিয়ার মেলবন্ধন (১৯৯৭): স্নায়ুযুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই নাসা স্পেস শাটল আটলান্টিস (মিশন এসটিএস-৮৬) উৎক্ষেপণ করে, যা রাশিয়ার মহাকাশ স্টেশন মীরের সাথে ডক করে। আমেরিকা, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের মহাকাশচারীরা একসাথে কাজ করেন, যা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) জন্য একটি সফল পরীক্ষামূলক মিশন হিসেবে প্রমাণিত হয়।
- চীনের প্রথম স্পেসওয়াক (২০০৮): চীন জিউকুয়ান স্যাটেলাইট লঞ্চ সেন্টার থেকে তাদের তৃতীয় মানববাহী অরবিটাল মিশন ‘শেনজৌ ৭’ উৎক্ষেপণ করে। এই মিশনের মাধ্যমেই চীন ইতিহাসে তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বাধীনভাবে মহাকাশে মানুষের হাঁটা বা স্পেসওয়াক সম্পন্ন করার গৌরব অর্জন করে।
- প্রশান্ত মহাসাগর আবিষ্কার (১৫১৩): স্থানীয় আদিবাসীদের সহায়তায় পানামা ইস্থমাস অতিক্রম করে স্প্যানিশ অভিযাত্রী ভাস্কো নুনেজ দে বালবোয়া একটি বিশাল জলরাশি দেখতে পান, যার নাম তিনি দেন ‘মার দেল সুর’ বা দক্ষিণ সাগর। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে আমেরিকা এশিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি মহাদেশ, যা সেযুগের বৈশ্বিক ভূগোল সম্পর্কে মানুষের ধারণা পুরোপুরি পালটে দেয়।
- আলজেরিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা (১৯৬২): ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সাত বছরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর আলজিয়ার্সে আলজেরিয়ান গণপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা দেয়। ১৩২ বছরের ফরাসি শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই ঘটনা আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের অনেক দেশকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
- ওআইসি বা ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার জন্ম (১৯৬৯): জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে মরক্কোর রাবাতে ২৪টি মুসলিম দেশের নেতারা এক জরুরি শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হন। ২৫শে সেপ্টেম্বর তারা ওআইসি-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সনদে স্বাক্ষর করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্ম: যাঁরা আমাদের চিন্তার জগৎ বদলে দিয়েছেন
২৫শে সেপ্টেম্বর সাহিত্য, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির জগতে এমন কিছু কালজয়ী মানুষের জন্ম দিয়েছে, যাঁদের কাজ আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
- উইলিয়াম ফকনার (জন্ম ১৮৯৭): মিসিসিপিতে জন্ম নেওয়া এই নোবেলজয়ী মার্কিন ঔপন্যাসিক আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ‘স্ট্রিম-অফ-কনশাসনেস’ বা চেতনার প্রবাহ রীতির সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি এবং অ্যাজ আই লে ডাইং-এর মতো কালজয়ী সব উপন্যাস উপহার দিয়েছেন, যেখানে আমেরিকান দক্ষিণাঞ্চলের বর্ণবাদ, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
- দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ (জন্ম ১৯০৬): রাশিয়ার এই কিংবদন্তি সুরকার বিংশ শতাব্দীর ধ্রুপদী সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। স্তালিনের শাসনামলে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকলেও তার সঙ্গীত হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য স্পৃহার এক শৈল্পিক দলিল। বিশেষ করে তার ‘সিম্ফনি নম্বর ৭’, যা নাৎসিদের লেনিনগ্রাদ অবরোধের সময় রচিত, আজও মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতীক হয়ে আছে।
- ক্রিস্টোফার রিভ (জন্ম ১৯৫২): ১৯৭৮ সালের ‘সুপারম্যান’ সিনেমার মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাস্তবের সুপারহিরো। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে ঘাড় থেকে নিচ পর্যন্ত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ার পর তিনি আড়ালে চলে যাননি। বরং তিনি মেরুদণ্ডের আঘাত এবং স্টেম সেল গবেষণার জন্য একটি বৈশ্বিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের বাঁচার নতুন আলো দেখায়।
- বেল হুকস (জন্ম ১৯৫২): জন্মগত নাম গ্লোরিয়া জিন ওয়াটকিনস হলেও, নিজের চিন্তাধারাকে ব্যক্তির চেয়ে বড় করে তুলতে তিনি ‘বেল হুকস’ ছদ্মনাম (ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট হাতের অক্ষরে) বেছে নেন। এই প্রখ্যাত সমাজতান্ত্রিক ও নারীবাদী লেখক তার লেখার মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে বর্ণবাদ, পুঁজিবাদ এবং লিঙ্গবৈষম্য মিলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিপীড়নের জন্ম দেয়।
যাঁদের আমরা হারিয়েছি: বিদায়ের সুর
এই দিনটিতে পৃথিবী এমন কিছু অসাধারণ মানুষকে হারিয়েছে যাঁদের শূন্যতা আজও অনুভব করা যায়।
- এরিখ মারিয়া রেমার্ক (মৃত্যু ১৯৭০): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা নিজ চোখে দেখা এই জার্মান লেখক রচনা করেছিলেন যুদ্ধবিরোধী সাহিত্যের মাস্টারপিস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। ট্রেঞ্চের ভেতরের নারকীয় যন্ত্রণা এবং সৈনিকদের মানসিক ট্রমার এমন নিপুণ বর্ণনা এর আগে কেউ দেয়নি। নাৎসিরা তার বই পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার কলম চালিয়ে গেছেন।
- এডওয়ার্ড সাঈদ (মৃত্যু ২০০৩): ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই প্রখ্যাত তাত্ত্বিক ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তার ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বইটির মাধ্যমে গোটা বিশ্বের চিন্তার জগতে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছিলেন। পাশ্চাত্য কীভাবে প্রাচ্যকে নিজেদের মনগড়া এক হীন দৃষ্টিতে দেখে এবং সেই ধারণাকে সাম্রাজ্যবাদ কায়েমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তা তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছিলেন।
- ওয়াঙ্গারি মাথাই (মৃত্যু ২০১১): কেনিয়ার এই অকুতোভয় পরিবেশবাদী ছিলেন প্রথম আফ্রিকান নারী, যিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রিন বেল্ট মুভমেন্ট’ কেনিয়ার লাখ লাখ গ্রামীণ নারীকে গাছ লাগানোর কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার কাছে গাছ লাগানো কেবল পরিবেশ রক্ষা ছিল না, এটি ছিল নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের এক অভিনব সংগ্রাম।
- জন বনহ্যাম (মৃত্যু ১৯৮০): বিখ্যাত ব্রিটিশ রক ব্যান্ড ‘লেড জেপেলিন’-এর ড্রামার জন বনহ্যামকে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ড্রামার হিসেবে মানা হয়। ড্রামসে তার অবিশ্বাস্য গতি, শক্তি এবং ছন্দ রক সঙ্গীতের ব্যাকরণই বদলে দিয়েছিল। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তার অকাল মৃত্যুতে ব্যান্ডটি ভেঙে যায়।
- আরনল্ড পামার (মৃত্যু ২০১৬): গলফ জগতে যিনি ‘দ্য কিং’ বা রাজা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার জাদুকরী ব্যক্তিত্ব এবং খেলার সাধারণ, আগ্রাসী শৈলী গলফকে কেবল অভিজাতদের খেলা থেকে বের করে এনে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
এছাড়াও ১৮৪৯ সালের এই দিনে আমরা হারিয়েছি বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান সুরকার জোহান স্ট্রস প্রথম-কে, যিনি ভিয়েনিজ ওয়াল্টজকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন এবং কালজয়ী ‘রাদেটস্কি মার্চ’ রচনা করেছিলেন।
বিশ্বব্যাপী দিবস ও ঐতিহ্য
২৫শে সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায় জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্যের উদযাপনে একত্রিত হয়।
- বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস: ২০০৯ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কংগ্রেসে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক ফার্মাসিস্ট দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নিরাপদ ওষুধ সরবরাহ, রোগ প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্যে ফার্মাসিস্টদের অপরিসীম অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই দিনটি পালিত হয়।
- মোজাম্বিকের সশস্ত্র বাহিনী দিবস: ১৯৬৪ সালের এই দিনে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মোজাম্বিকের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মোজাম্বিকে দিনটি অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হয়।
- ফ্রাঙ্কো-অন্টারিও দিবস (কানাডা): কানাডার অন্টারিও প্রদেশে বসবাসরত ফরাসিভাষী মানুষের ৪ শতাব্দী প্রাচীন সংস্কৃতি এবং অবদানকে সম্মান জানাতে ১৯৭৫ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ফ্রাঙ্কো-অন্টারিও পতাকা উত্তোলন করা হয়, যার স্মরণে দিনটি উদযাপিত হয়।
- আন্তর্জাতিক অ্যাটাক্সিয়া সচেতনতা দিবস: অ্যাটাক্সিয়া একটি বিরল স্নায়বিক রোগ, যেখানে রোগী ধীরে ধীরে শারীরিক ভারসাম্য হারাতে থাকে। এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গবেষণায় তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়।
জানা-অজানা চমকপ্রদ তথ্য
- প্রথম খবরের কাগজের ওপরই নিষেধাজ্ঞা: ১৬৯০ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর বেঞ্জামিন হ্যারিস বোস্টন থেকে আমেরিকার প্রথম সংবাদপত্র ‘পাবলিক অকারেন্সেস’ প্রকাশ করেন। কিন্তু ফরাসি রাজতন্ত্রের সমালোচনা এবং সত্য খবর ছাপানোর অপরাধে মাত্র চারদিন পরই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাগজটি নিষিদ্ধ করে এবং এর সমস্ত কপি বাজেয়াপ্ত করে!
- যে অস্ত্রোপচার বেসবল খেলার ইতিহাস বদলে দিল: ১৯৭৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর লস অ্যাঞ্জেলেস ডজার্সের পিচার টমি জনের কনুইতে সার্জন ড. ফ্র্যাঙ্ক জোব এক যুগান্তকারী পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচার করেন। সবাই ধরে নিয়েছিল জনের ক্যারিয়ার শেষ, কিন্তু তিনি আরও ১৪ বছর সফলতার সাথে খেলেন। ‘টমি জন সার্জারি’ নামে পরিচিত এই চিকিৎসা আজও হাজারো অ্যাথলেটের ক্যারিয়ার বাঁচিয়ে চলেছে।
- দৈত্যাকার গাছদের রক্ষায় জাতীয় উদ্যান: ১৮৯০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হ্যারিসন ক্যালিফোর্নিয়ায় সেকোয়া ন্যাশনাল পার্ক প্রতিষ্ঠার বিলে স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কোনো পার্ক, যা কেবল কোনো জীবন্ত সত্তাকে (দৈত্যাকার প্রাচীন সেকোয়া গাছ) বাণিজ্যিক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
- হলিউডের এক অদ্ভুত সমাপতন: বয়সের ব্যবধান ২৫ বছর হওয়া সত্ত্বেও হলিউডের বিখ্যাত দম্পতি মাইকেল ডগলাস (জন্ম ১৯৪৪) এবং ক্যাথরিন জেটা-জোনস (জন্ম ১৯৬৯) একই দিনে নিজেদের জন্মদিন উদ্যাপন করেন!
শেষ কথা
ইতিহাসের পাতা উল্টালে ২৫শে সেপ্টেম্বর আমাদের শেখায় যে, নিজের বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থেকে করা একটি একক কাজও সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত অনুরণিত হতে পারে। আমেরিকার একটি স্কুলে ফেডারেল গার্ডের প্রহরায় কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের প্রবেশ হোক, আফ্রিকার বুকে গাছ লাগিয়ে নারীদের পরিবেশ ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম হোক, কিংবা সদ্য স্বাধীন এক দেশের নেতার বিশ্বমঞ্চে মাতৃভাষায় গর্জে ওঠা হোক—এই দিনটি বারবার প্রমাণ করেছে যে মানুষের মর্যাদা, আত্মপ্রকাশ এবং প্রগতির স্পৃহা কতখানি অদম্য। উইলিয়াম ফকনার কিংবা বেল হুকসের লেখা আজও আমাদের সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়, ঠিক যেমন শোস্তাকোভিচের সুর মনে করিয়ে দেয় যে স্বৈরাচারের চেয়ে শিল্পের শক্তি অনেক বেশি। ২৫শে সেপ্টেম্বরের এই মাইলফলকগুলো স্মরণ করার অর্থ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসকে সম্মান জানানো এবং মানুষের অসীম সম্ভাবনার দিগন্তকে আরও প্রসারিত করা।

