প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার: কেন পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন সেই রাতে?

সর্বাধিক আলোচিত

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, রাত পৌনে এগারোটা। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রেললাইনের ধারের সাহেবি ক্লাবটায় তখন পিয়ানো বাজছে, কাচের গ্লাসে বরফ ঠুকঠুক করছে, জানালা গলে সিগারেটের ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে সেপ্টেম্বরের ভেজা অন্ধকারে। ঠিক তখনই একটা হুইসেল। তারপর গুলি আর বোমার শব্দে ছিঁড়ে গেল সেই রাত। যে মানুষটি দলটার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তাঁর পরনে খাকি শার্ট, মাথায় পাগড়ি, কোমরে রিভলভার। পুলিশের খাতায় প্রথমে তিনি ছিলেন একজন অচেনা যুবক। পরদিন ভোরে পাগড়িটা খুলতেই মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল লম্বা কালো চুল।

মানুষটির নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। বয়স একুশ। দর্শনে ডিস্টিংশনসহ স্নাতক, স্কুলশিক্ষিকা, আর মায়ের আদরের “রাণী”। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন দুটো কারণে: ইউরোপিয়ান ক্লাবের পথে একজন নারীকে দেখলেই সন্দেহ জাগত, আর সে যুগে নারীকে সশস্ত্র লড়াইয়ের যোগ্য বলেই মনে করা হতো না। কিন্তু শুধু কৌশল দিয়ে তো একজন মানুষ মৃত্যুর দিকে হেঁটে যায় না। এই “কেন”-র উত্তর লুকিয়ে আছে একটি মেয়ের পুরো জীবনের গল্পে।

রাণী — যে মেয়ে ঘর ঝাড়ু দিত আর স্বপ্ন দেখত

জন্ম ও পরিবার

পটিয়ার ধলঘাট গ্রাম। ১৯১১ সালের ৫ মে সেখানে জন্ম নিল একটি মেয়ে। বাবা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির হেড ক্লার্ক, মাসের শেষে যাঁর হিসাব মেলাতে কপালে ভাঁজ পড়ত। মা প্রতিভাদেবী মেয়েকে ডাকতেন “রাণী”। ছয় ভাইবোনের সংসার, টানাটানির মধ্যবিত্ত জীবন। পরিবারের আসল পদবি ছিল দাশগুপ্ত। নবাবি আমলে কোনো এক পূর্বপুরুষ “ওয়াদ্দেদার” উপাধি পেয়েছিলেন, সেই থেকে দাশগুপ্ত নামটা ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।

একটু থামুন এখানে। যে মেয়ের গল্প শেষ হবে একটা নাম বদল দিয়ে, একটা ছদ্মবেশ দিয়ে, তার পারিবারিক পরিচয়ই শুরু হয়েছিল একটা বদলে যাওয়া নাম থেকে। ইতিহাস মাঝে মাঝে এমন ছোট মিল রেখে যায়।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সংক্ষিপ্ত জীবনী

চট্টগ্রামের মাটিতে শৈশব

বাবার চাকরির সূত্রে পরিবার থাকত শহরে, আসকার দিঘির পাড়ের কাছে। মাটির দেয়াল, টিনের চাল, দোতলা একটা বাড়ি। বর্ষায় সেই টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে মনে হতো কেউ একটানা ঢোল বাজাচ্ছে। রাণী ছিল চুপচাপ, লাজুক ধরনের মেয়ে। অচেনা লোক এলে পর্দার আড়ালে সরে যেত। সকালে উঠে মায়ের সঙ্গে উঠোন ঝাড়ু দিত, রান্নাঘরে মশলা বেটে দিত, ছোট ভাইবোনদের চুল আঁচড়ে স্কুলে পাঠাত।

কেউ যদি সেদিন বলত, এই মেয়েটি একদিন সশস্ত্র দল নিয়ে ব্রিটিশদের ক্লাবে হামলা চালাবে, পাড়ার লোকে হেসে উড়িয়ে দিত। হাসাটাই স্বাভাবিক ছিল। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার জন্ম থেকে বীর ছিলেন না। ভয় পেতেন, লজ্জা পেতেন, মায়ের আঁচল ধরে থাকতেন। আমরা যখন তাঁকে শুধু “অগ্নিকন্যা” বানিয়ে ফেলি, তখন এই সাধারণ মেয়েটিকে হারিয়ে ফেলি। অথচ তাঁর গল্পের আসল জোর এখানেই: একজন সাধারণ, লাজুক মানুষ ধাপে ধাপে কীভাবে অসাধারণ সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যায়।

নিষিদ্ধ বই, ঊষাদি আর ঝাঁসীর রানী

ডা. খাস্তগীর স্কুলের দিনগুলো

চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ার সময় রাণীর পাশের বেঞ্চে বসত আরেকটি মেয়ে। নাম কল্পনা দত্ত। পরে এই দুজনের নামই চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের ইতিহাসে পাশাপাশি লেখা হবে, কিন্তু তখন তারা নিছক দুই সই, টিফিনের সময় একই কুলের আচার ভাগ করে খায়।

স্কুলে ইতিহাস পড়াতেন এক শিক্ষিকা, মেয়েরা ডাকত ঊষাদি। বইয়ের পাতার বাইরের গল্প বলতেন তিনি। একদিন ক্লাসে শোনালেন ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মীবাইয়ের কথা: পিঠে শিশুসন্তান বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে যিনি ইংরেজ সেনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ক্লাসঘর নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে কাকের ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

সে সময় শহরে বিপ্লবীদের নিয়ে নানা কানাঘুষো। বড়দের মুখে শোনা শব্দ মেয়েরাও বলত, দেশের জন্য যারা অস্ত্র হাতে নিয়েছে তারা নাকি “স্বদেশি ডাকাত”। ঊষাদি একদিন শুনে থামিয়ে দিলেন। বুঝিয়ে বললেন, ডাকাত নিজের পেট ভরাতে লুট করে, আর এঁরা জীবন বাজি রাখছেন একটা পরাধীন দেশের জন্য। শব্দটা বদলে গেল মেয়েদের মুখে। শব্দ বদলালে দৃষ্টিও বদলায়।

কল্পনা দত্ত পরে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ছোটবেলায় তাঁরা দুজন ভাবতেন বড় হয়ে বিজ্ঞানী হবেন। ঝাঁসীর রানীর গল্প শোনার পর সেই স্বপ্নের জায়গা নিল অন্য স্বপ্ন। তাঁরা নিজেদের ভাবতে শুরু করলেন ভবিষ্যতের বিপ্লবী হিসেবে।

যে বইগুলো তাঁকে বদলে দিয়েছিল

এরপর এলেন পূর্ণেন্দু দস্তিদার, বিপ্লবী দলের তরুণ কর্মী। ব্রিটিশ সরকার যে বইগুলো বাজেয়াপ্ত করেছিল, তার কয়েকটা তিনি লুকিয়ে রাখার দায়িত্ব দিলেন প্রীতিলতাকে। কেউ সন্দেহ করবে না, একটা শান্ত স্কুলছাত্রীর বইয়ের তাকে নিষিদ্ধ বই!

রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে হারিকেনের সলতে কমিয়ে সেই বইগুলো খুলতেন রাণী। সখারাম গণেশ দেউস্করের “দেশের কথা”, “বাঘা যতীন”, “ক্ষুদিরাম”, “কানাইলাল”। কাগজগুলো হলদেটে, হাতে হাতে ঘুরে কোণ মুড়ে গেছে, গায়ে পুরোনো কাগজের সেই ভেজা গন্ধ। আঠারো বছরের ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়েছিল, এই লাইন পড়তে পড়তে কিশোরী মেয়েটার বুকের ভেতর কিছু একটা জ্বলে উঠেছিল নিশ্চয়ই। এগুলো আসলে বই ছিল না, ছিল প্রথম আগুনের স্ফুলিঙ্গ।

কল্পনাকে লেখা চিঠিতে তিনি জানালেন মনের কথা: মাস্টারদার দলে যোগ দিতে চান। লেখার সময় হাত কেঁপেছিল কি না, জানা যায় না। তবে কাগজে কথাটা লিখে ফেলার মধ্যেই একটা প্রতিজ্ঞা ছিল।

বারবার দরজায় কড়া নেড়েছিলেন, বারবার ফিরে গিয়েছিলেন

ইডেন কলেজ থেকে বেথুন কলেজ

ম্যাট্রিকের পর ঢাকার ইডেন কলেজ। পড়াশোনায় রাণী বরাবরই ভালো, এখানে আরও ভালো করলেন। ১৯২৯ সালের আই এ পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম হলেন। কিন্তু খাতার নম্বরের আড়ালে চলছিল অন্য প্রস্তুতি। পরে নিজেই লিখেছেন, আই এ পড়ার জন্য ঢাকায় দুই বছর থাকার সময় আমি নিজেকে মহান মাস্টারদার একজন উপযুক্ত কমরেড হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছি। লক্ষ করুন শব্দটা: “উপযুক্ত”। কেউ তাঁকে যোগ্য বলে মেনে নেয়নি, তাই তিনি নিজেকে যোগ্য করে তোলার কাজে লেগে ছিলেন।

তারপর কলকাতা, বেথুন কলেজ, দর্শনে অনার্স। ১৯৩২ সালে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করলেন, যদিও বিপ্লবী কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁর সনদ আটকে রাখে। সেই সনদ তাঁর হাতে আর কখনো পৌঁছায়নি; বহু দশক পরে, ২০১২ সালে, মরণোত্তর সম্মান হিসেবে তা দেওয়া হয়।

বেথুনের হোস্টেলের একটা ছবি চোখ বন্ধ করলে দেখা যায়। রাত নেমেছে। বাকি মেয়েরা ঘুমে। ছাদে একা বসে এক তরুণী বাঁশি বাজাচ্ছেন। কলকাতার বাতাসে কয়লার ধোঁয়ার গন্ধ, দূরে ট্রামের ঘণ্টা, আর তার মধ্যে একটা বাঁশির সুর, যা কাউকে উদ্দেশ করে বাজছে না। চট্টগ্রাম থেকে খবর আসছে, অস্ত্রাগার দখল হয়েছে, জালালাবাদ পাহাড়ে লড়াই হয়েছে, বন্ধুরা ধরা পড়ছে, মারা যাচ্ছে। আর তিনি কলকাতায় বসে দর্শনের নোট লিখছেন। সেই বাঁশির সুরে কতটা ছটফটানি মিশে ছিল, আন্দাজ করা কঠিন নয়।

দীপালী সঙ্ঘ — নারীর জন্য প্রথম দরজা

ঢাকায় থাকতেই পরিচয় হয়েছিল লীলা নাগের সঙ্গে, পরে যিনি লীলা রায় নামে পরিচিত। তাঁর গড়া দীপালী সঙ্ঘে মেয়েরা লাঠিখেলা আর ছোরাখেলা শিখত। বিকেলের আলোয় উঠোনে বাঁশের লাঠির খটখট শব্দ, ঘামে ভেজা কপাল, হাতের তালুতে ফোসকা। প্রীতিলতা সেখানে শরীরকে লড়াইয়ের জন্য তৈরি করলেন।

কিন্তু মূল লড়াইয়ের দরজা তখনো বন্ধ। মাস্টারদা সূর্য সেনের দলে নারীদের সরাসরি নেওয়া হতো না। ভয় ছিল, মেয়েরা থাকলে গোপনীয়তা ভাঙবে, সমাজ কথা তুলবে, বিপদে দল দুর্বল হবে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বারবার খবর পাঠিয়েছেন, বারবার উত্তর এসেছে “এখন নয়”।

এই প্রত্যাখ্যানটুকু মনে রাখুন। ছদ্মবেশের গল্পের বীজ এখানেই পোঁতা। দরজা যদি নারীর জন্য বন্ধ থাকে, তবে যে মেয়ে ভেতরে ঢুকবেই বলে ঠিক করেছে, সে অন্য পথ খুঁজে নেবে।

“অমিতা দাস” — চল্লিশবার ফাঁসির ঘরে

প্রীতিলতা ছদ্মনাম নিয়েছিলেন কারণ ফাঁসির অপেক্ষায় থাকা বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি শুধু আত্মীয়রাই পেতেন, আর নিজের নামে গেলে বিপ্লবী দলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ পুলিশের চোখে পড়ে যেত। তাই “অমিতা দাস” নাম নিয়ে, রামকৃষ্ণের খুড়তুতো বোন সেজে তিনি আলিপুর জেলে ঢুকেছিলেন।

রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও আলিপুর জেলের গল্প

রামকৃষ্ণ বিশ্বাস চট্টগ্রামেরই ছেলে, মাস্টারদার দলের সদস্য। এক পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার চেষ্টার মামলায় তাঁর ফাঁসির রায় হয়েছিল। চট্টগ্রাম থেকে আলিপুর অনেক দূর, তাঁর আত্মীয়দের পক্ষে বারবার কলকাতায় আসা সম্ভব ছিল না। কলকাতায় থাকা প্রীতিলতাকে দলের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হলো তাঁর সঙ্গে দেখা করার।

দরখাস্ত লেখা হলো। আবেদনকারী: অমিতা দাস। সম্পর্ক: বন্দির বোন। জেল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিল। একবার নয়, প্রায় চল্লিশবার সেই নামে জেলের লোহার গেট পেরিয়েছেন প্রীতিলতা।

কল্পনা করুন সেই দেখা করার ঘরটা। চুনকাম-খসা দেয়াল, মাঝখানে লোহার জাল, দুপাশে দুটো কাঠের টুল। পাশে দাঁড়িয়ে একজন ওয়ার্ডার, কানখাড়া। কারাগারের ভেতর থেকে ভেসে আসছে লোহার দরজা বন্ধ হওয়ার ঝনঝন শব্দ, কোথাও কেউ কাশছে, বাতাসে ফিনাইল আর স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গন্ধ। জালের ওপাশে এসে বসলেন এক যুবক, যিনি জানেন তাঁর জীবনের দিনগুলো গোনা।

প্রীতিলতা হয়তো আশা করেছিলেন ভয় দেখবেন, ভেঙে পড়া দেখবেন, অন্তত একটা অস্থিরতা। দেখলেন উল্টোটা। রামকৃষ্ণ শান্ত, স্থির, মাঝে মাঝে হাসছেন, দলের খবর নিচ্ছেন, বই চাইছেন। পরে প্রীতিলতা লিখেছিলেন সেই অভিজ্ঞতার কথা, জানিয়েছেন তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ চাউনি, খোলামেলা কথাবার্তা, নিঃশঙ্কচিত্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুতি আমার উপর গভীর রেখাপাত করল।

চল্লিশটা সাক্ষাৎ মানে চল্লিশবার মিথ্যা নাম বলা, চল্লিশবার ওয়ার্ডারের সন্দেহভরা চোখের সামনে বোনের অভিনয় করা, আর চল্লিশবার ফিরে আসা একটা নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ দেখে। প্রতিবার গেট পেরোনোর সময় বুক ধড়ফড় করত নিশ্চয়ই। একটা ভুল উত্তর, একটা অসাবধান চাউনি, আর সব শেষ। কিন্তু কেউ ধরতে পারেনি।

মৃত্যুকে যেভাবে চিনেছিলেন প্রীতিলতা

১৯৩১ সালের ৪ আগস্ট ভোরে আলিপুর জেলে রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসি হয়ে গেল। যে মুখ গত কয়েক মাস ধরে লোহার জালের ওপাশে দেখেছেন, সেই মুখ আর কখনো দেখা হবে না। প্রীতিলতা লিখেছেন, এরপর বিপ্লবী কর্মকান্ডে সরাসরি যুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা আমার অনেক বেড়ে গেল।

এই অধ্যায়টা নিয়ে সাধারণত দু-এক লাইনে কথা সারা হয়। অথচ ছদ্মবেশের রাতটা বুঝতে হলে এখানেই সবচেয়ে বেশি সময় দেওয়া দরকার। “অমিতা দাস” হয়ে প্রীতিলতা প্রথমবার শিখলেন, নিজের নাম, নিজের পরিচয় একটা পোশাকের মতো খুলে রাখা যায়, যদি উদ্দেশ্যটা নিজের চেয়ে বড় হয়। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নামটা জেলগেটের বাইরে রেখে ঢুকতেন তিনি, বেরিয়ে আবার সেটা তুলে নিতেন। পরিচয় বদলালে মানুষ বদলায় না, এটা তিনি হাতে-কলমে জেনেছিলেন।

আর রামকৃষ্ণের কাছ থেকে শিখলেন আরেকটা জিনিস: মৃত্যুকে ভয় না পেলে মানুষের আর কী হারানোর থাকে? যে রাতে তিনি পকেটে পটাশিয়াম সায়ানাইড নিয়ে পাহাড়তলীর দিকে রওনা দেবেন, সেই রাতের শান্ত মুখটা তিনি প্রথম দেখেছিলেন আলিপুরের ওই জালের ওপাশে। মৃত্যুর দিন তাঁর সঙ্গে ছিল রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের একটা ছবি। কাকতালীয় নয়।

পর্ণকুটিরে প্রণাম — মাস্টারদার সামনে শপথ

প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনা

বি এ পাশের পর চট্টগ্রামে ফিরে প্রীতিলতা নন্দনকানন অপর্ণাচরণ স্কুলে প্রধান শিক্ষিকার চাকরি নিলেন। বাবার চাকরি তখন নেই, সংসার চলছে তাঁর বেতনে। এর মধ্যেই ১৯৩২ সালের মে মাসে এল সেই খবর, যার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা। মাস্টারদা দেখা করতে রাজি হয়েছেন।

দিনটা ছিল ঝড়বৃষ্টির। কাদাপথ, পায়ের তলায় পিছল মাটি, মাথার ওপর কালো মেঘ। অনেকটা পথ হেঁটে ধলঘাটের এক ছোট কুঁড়েঘরে পৌঁছালেন প্রীতিলতা। শাড়ির পাড় কাদায় ভারী, চুল ভেজা। মাস্টারদা সূর্য সেন পরে সেই দিনের কথা লিখেছেন: অনেক দূর হেঁটে এসেছে, অথচ মুখে ক্লান্তির চিহ্ন নেই, বরং তার চোখেমুখে একটা আনন্দের আভাস দেখলাম।

প্রীতিলতা নিচু হয়ে প্রণাম করলেন। মাস্টারদা কিছু বললেন না, মাথায় হাত রাখলেন শুধু। টিনের চালে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। যে মানুষটির নামে ব্রিটিশ সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে, তাঁকে সেদিন দেখাচ্ছিল একজন গ্রামের স্কুলমাস্টারের মতো, যিনি নতুন ছাত্রীর মুখে পড়ে নিতে চাইছেন সে কতদূর যেতে পারবে।

দেশের জন্য সর্বোচ্চ বলি

সেই আশ্রয়ে ছিলেন বিপ্লবী নির্মল সেনও। তিনি সরাসরি প্রশ্ন করলেন, পরিবারের প্রতি টান কেমন? প্রশ্নটা নিরীহ নয়। এর উত্তরে ঠিক হবে মেয়েটিকে বড় কাজের দায়িত্ব দেওয়া যাবে কি না। প্রীতিলতা লুকোছাপা করলেন না, বললেন, টান আছে। কিন্তু duty to family-কে duty to country-র কাছে বলি দিতে পারব।

উত্তরটা খেয়াল করুন। তিনি বলেননি টান নেই। মিথ্যা বীরত্ব দেখাননি। স্বীকার করেছেন ভালোবাসা আছে, আর সেই ভালোবাসাকেই বলি দিতে রাজি। ত্যাগ তো তখনই ত্যাগ, যখন হারানোর মতো কিছু থাকে।

এরপর তিন দিন ধরে চলল অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। রিভলভার ধরা, ট্রিগার টানা, লক্ষ্য স্থির করা। প্রথম গুলির ধাক্কায় কবজিতে যে ঝাঁকুনি লাগে, বারুদের যে ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে ঢোকে, সবই নতুন। ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখায় একজন নারী যোদ্ধার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো সেই কুঁড়েঘর থেকে।

সেই রাতে কেন পুরুষের ছদ্মবেশ — আসল উত্তর

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২-এর রাতে পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন প্রধানত কৌশলগত কারণে: পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের দিকে যাওয়ার পথে রাতের বেলা একদল পুরুষের সঙ্গে একজন নারীকে দেখলে পুলিশ ও পাহারাদারদের সন্দেহ তখনই জাগত। তবে সেই পোশাকের একটা প্রতীকী মানেও ছিল, যা কৌশলের চেয়ে কম জরুরি নয়।

কৌশলগত কারণ — শত্রুর চোখ এড়ানো

ক্লাবটা ছিল রেলওয়ে অফিসার আর ইউরোপীয়দের আড্ডাখানা। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, গেটের কাছে লেখা থাকত, কুকুর আর ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ। আশপাশে সশস্ত্র পাহারা, রেল কলোনির রাস্তায় টহল। সে সময়ের চট্টগ্রামে রাত দশটার পর কোনো বাঙালি মেয়ে রাস্তায় থাকলে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় খবর। শাড়ি পরে সেই পথে গেলে মিশন শুরুর আগেই শেষ হয়ে যেত।

তাই পোশাক ঠিক হলো ভেবেচিন্তে। গায়ে খাকি শার্ট। পরনে ধুতি, মালকোঁচা মেরে সৈনিকের ঢঙে গোঁজা, যাতে দৌড়াতে গেলে পায়ে না জড়ায়। মাথায় গেরুয়া পাগড়ি, তার ভেতরে গুটিয়ে বাঁধা লম্বা চুল। কোমরে চামড়ার বেল্ট, বেল্টে ঝোলানো রিভলভার। পায়ে রবার সোলের জুতো, যাতে কাঁকর-বিছানো পথে একটা শব্দও না হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো পাঞ্জাবি যুবক।

এই ছদ্মবেশ নিজের পরিচয় লুকানোর জন্য ছিল না। ছিল কাজটা শেষ করার জন্য। তফাতটা সূক্ষ্ম, কিন্তু আসল।

প্রতীকী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ইউরোপীয় ক্লাবে অভিযানকারণ — নারীর সীমানা ভাঙা

বছরের পর বছর তাঁকে শুনতে হয়েছে, মেয়েরা লড়তে পারে না। মেয়েরা থাকলে দল বিপদে পড়বে। মেয়েদের কাজ চিঠি পৌঁছানো, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, আহত কর্মীর সেবা করা। সামনে দাঁড়ানো নয়।

খাকি শার্ট আর পাগড়িটা ছিল সেই মিথ্যার জবাব। সমাজ যে পোশাককে লড়াইয়ের অধিকারের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল, তিনি সেই পোশাক গায়ে তুলে নিলেন, আর দেখিয়ে দিলেন ভেতরের মানুষটা একই থাকে। সেই রাতে, সেই ইউনিফর্মে, তিনি “পুরুষ সাজা একজন মেয়ে” ছিলেন না। তিনি ছিলেন দলের অধিনায়ক। ইতিহাসে এই প্রথম মাস্টারদার দল কোনো সশস্ত্র অভিযানের নেতৃত্ব একজন নারীর হাতে তুলে দিয়েছিল।

সেই মুহূর্ত যখন মাস্টারদা নিজে পোশাক পরিয়ে দিলেন

রওনা দেওয়ার আগের দৃশ্যটা নিয়ে যে বিবরণ প্রচলিত আছে, সেটা মনে গেঁথে যায়। কাট্টলীর গোপন আশ্রয়ে মাস্টারদা নিজের হাতে প্রীতিলতাকে সেই পোশাক পরিয়ে দিয়েছিলেন। পাগড়ির প্যাঁচ ঠিক করে দিয়েছিলেন হয়তো, বেল্টটা টেনে দেখেছিলেন আলগা আছে কি না। যেমন করে বাবা মেয়েকে প্রথম দিন স্কুলে পাঠানোর আগে জামার বোতাম লাগিয়ে দেন।

প্রীতিলতা শেষবারের মতো প্রণাম করলেন। তারপর দলের সঙ্গে মিশে গেলেন অন্ধকারে। গুরু শিষ্যকে যুদ্ধের পোশাক পরিয়ে বিদায় দিচ্ছেন, আর দুজনেই জানেন এই বিদায়ের মানে কী।

শেষ রাতের চিঠি — “মা, তোমায় বড় ব্যথা দিয়ে গেলাম”

আক্রমণের আগের রাতে কী লিখেছিলেন

আক্রমণের আগের রাত। গোপন আশ্রয়ের ঘরে হয়তো একটা কুপি জ্বলছে, শিখাটা বাতাসে একটু একটু কাঁপছে, আর দেয়ালে সেই কাঁপুনির ছায়া বড় হচ্ছে, ছোট হচ্ছে। একটা কাগজ, একটা কলম। যে হাত পরদিন রিভলভার ধরবে, সেই হাতেই লেখা হচ্ছে মায়ের কাছে চিঠি।

তিনি জানতেন ফিরবেন না। পরিকল্পনাতেই ছিল, ধরা পড়ার আগে সায়ানাইড। কাজেই এটা কোনো সাধারণ চিঠি নয়, যেখানে লেখা থাকে “শিগগির বাড়ি ফিরব”। এটা এমন একটা চিঠি, যার প্রতিটা শব্দ লেখার সময় লেখক জানেন, পাঠক যখন পড়বেন তখন তিনি আর পৃথিবীতে নেই।

চিঠির শুরুতে তিনি মাকে বলছেন একটা স্বপ্নের কথা। মনে হয়েছিল মা শিয়রে বসে তাঁর নাম ধরে ডাকছেন, আর মায়ের চোখের জলে তাঁর বুক ভেসে যাচ্ছে। তিনি সেই ডাকে সাড়া দিতে পারেননি। স্বপ্নে একবার দেখতে চেয়েছিলেন, মা আদরের মেয়ের সেই আবদার রেখেছিলেন।

একটু ভাবুন। আত্মগোপনে থাকা মেয়ে, যে বহুদিন মাকে চোখে দেখেনি, শেষ রাতে যার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা স্বপ্নে মায়ের মুখ। পরদিন সে একটা সশস্ত্র দলের নেতৃত্ব দেবে। আর আজ রাতে সে মায়ের আঁচলের জন্য কাঁদছে।

“অনেক পুত্র প্রাণ দিয়েছে, কোনো কন্যা দেয়নি”

প্রীতিলতার শেষ চিঠি পড়লে প্রথমেই যা ধাক্কা দেয়, সেটা ক্ষমা চাওয়া। কোনো ঘোষণা নয়, কোনো স্লোগান নয়। মেয়েটি লিখছে, মা, আমায় তুমি ক্ষমা করো, তোমায় বড় ব্যথা দিয়ে গেলাম। তারপর যোগ করছে, তোমাকে এতটুকু ব্যথা দিতেও তো চিরদিন আমার বুকে বেজেছে। সে জানাচ্ছে সে এসেছে স্বদেশ-জননীর চোখের জল মোছাতে বুকের রক্ত দিয়ে, আর মাকে অনুরোধ করছে আশীর্বাদ করতে, নইলে তার মনের ইচ্ছা পূর্ণ হবে না।

আর তারপর সেই কথাটা, যা এই চিঠিকে ইতিহাসের দলিল বানিয়েছে। দেশের জন্য অনেক পুত্র প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু কোনো কন্যা এখনো দেয়নি।

এই বাক্যটা পড়ে একটু থেমে থাকুন। এখানে কোনো অহংকার নেই। আছে একটা হিসাব মেলানোর চেষ্টা। যেন একটা একুশ বছরের মেয়ে ইতিহাসের খাতা খুলে দেখছে, কলামটা খালি পড়ে আছে। কাউকে না কাউকে তো সেখানে প্রথম নামটা লিখতে হবে। মা যেন বোঝেন, তাঁর মেয়ে পাগলামি করছে না, একটা শূন্যস্থান পূরণ করছে।

একটিবার মাকে দেখে যেতে না পারার আফসোসও আছে চিঠিতে। হৃদয়কে যেন ভুল না বোঝেন মা, এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে ভোলেননি। একজন বিপ্লবীর মনে ভয় আর ভালোবাসা একসঙ্গে থাকতে পারে না, এমন ধারণা এই কয়েকটা লাইনে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

পূর্ণেন্দু দস্তিদারকেও তিনি একটা ছোট চিঠি লিখেছিলেন, যে মানুষটি একদিন তাঁর হাতে প্রথম নিষিদ্ধ বই তুলে দিয়েছিলেন। সেখানে এক লাইনে যেন নিজের পুরো যাত্রাটা ধরে ফেলেছিলেন: আঁধার পথে দিলাম পাড়ি, মরণ-স্বপন দেখে। বইয়ের তাকে লুকানো আগুন থেকে শুরু হয়েছিল যে পথ, সেই পথ শেষ হচ্ছে একটা অন্ধকার রাস্তায়, যার ওপাশে মৃত্যু। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সেটা জেনেই পা বাড়িয়েছিলেন।

“কালীদা, আমারটুকু আমি খেয়েছি”

গুলি, পতন, শেষ কথা

পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ চলল মিনিট কয়েক। জানালা দিয়ে গুলি, ভেতরে বোমা, হুড়োহুড়ি, চিৎকার, ভাঙা কাচের ঝনঝন। ক্লাবের ভেতরে একজন নিহত হলেন, আহত হলেন অনেকে। কাজ শেষে বাজল ফেরার হুইসেল। দল পিছু হটতে শুরু করল।

প্রীতিলতা তখনো দাঁড়িয়ে। অধিনায়ক সবার শেষে মাঠ ছাড়বেন, এটাই নিয়ম, এটাই তিনি নিজে ঠিক করেছিলেন। ঠিক তখন ক্লাবের পাশের নালার আড়াল থেকে এক ইংরেজ অফিসারের গুলি এসে লাগল তাঁর বুকে। খাকি শার্টটা ভিজে উঠল গরম রক্তে।

পাশে ছিলেন কালীকিংকর দে। প্রীতিলতা নিজের রিভলভারটা তাঁর হাতে তুলে দিলেন। দলের জন্য একটা অস্ত্রও বাঁচানো দরকার। তারপর বললেন সেই কথা, যা তাঁর শেষ কথা হয়ে আছে: কালীদা, আপনার সায়ানাইডটুকু আমাকে দিন, আমারটুকু আমি খেয়েছি। নিজের ভাগের বিষ ততক্ষণে তিনি মুখে দিয়ে দিয়েছেন। বাকি সঙ্গীদের তিনি চলে যেতে বললেন। তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

পাগড়ি খুলে যখন চুল দেখা গেল

পরদিন সকাল, ২৪ সেপ্টেম্বর। ক্লাব থেকে প্রায় একশো গজ দূরে একটা দেহ পড়ে থাকতে দেখল পুলিশ। গায়ে সামরিক ধাঁচের পোশাক, মাথায় পাগড়ি। তারা ধরে নিল কোনো পুরুষ বিপ্লবী। কেউ একজন ঝুঁকে পাগড়িটা খুলল। ঘাসের ওপর ছড়িয়ে পড়ল ভোরের শিশিরে ভেজা লম্বা চুল।

ছদ্মবেশ কাজ করেছিল একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। মৃত্যুর পরেও কয়েক ঘণ্টা শত্রু বুঝতে পারেনি কাকে তারা খুঁজে পেয়েছে।

দেহ তল্লাশি করে পাওয়া গেল বিপ্লবী ইশতেহার, অভিযানের পরিকল্পনার কাগজ, আর রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের একটা ছবি। ময়নাতদন্তে জানা গেল, বুকের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়নি। ক্ষতটা মারাত্মক ছিল না। মৃত্যুর কারণ পটাশিয়াম সায়ানাইড। ধরা পড়ে শত্রুর হাতে জেরার মুখে পড়ার চেয়ে নিজের হাতে মৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

চিঠিটা মায়ের কাছে পৌঁছেছিল

মাস্টারদা সূর্য সেন নিজে তখন পলাতক। মাথার দামে পুরস্কার ঘোষিত, প্রতিটা রাত কাটছে নতুন আশ্রয়ে, প্রতিটা পদশব্দে সতর্ক কান। এমন মানুষের পক্ষে একটা চিঠি কারও বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া মানে নিজের ধরা পড়ার ঝুঁকি আরেকটু বাড়ানো।

তবু তিনি ব্যবস্থা করলেন। প্রীতিলতার মৃত্যুর পর চিঠিটা হাত ঘুরে পৌঁছে গেল আসকার দিঘির পাড়ের সেই মাটির বাড়িতে, প্রতিভাদেবীর হাতে। কোনো সভা হয়নি, কোনো শোকবার্তা ছাপা হয়নি। একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রীর শেষ অনুরোধটুকু চুপচাপ রেখেছিলেন।

মা চিঠি পেলেন। মেয়েকে আর পেলেন না।

ছদ্মবেশ খুলে গেলে যা থাকে

খাকি শার্ট, মালকোঁচা ধুতি, গেরুয়া পাগড়ি, রবার সোলের জুতো। সবই ছিল একটা রাতের কৌশল। “অমিতা দাস” নামটাও ছিল কয়েক মাসের দরকারি মুখোশ। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার যা যা বদলেছিলেন, সবই বাইরের জিনিস।

তিনি নিজের বিশ্বাস লুকাননি। নির্মল সেনের সামনে পরিবারের টান লুকাননি। মায়ের কাছে ভয় আর কষ্ট লুকাননি, ক্ষমা চাইতে লজ্জা পাননি। মৃত্যুর রাতেও পকেটে রেখেছিলেন রামকৃষ্ণের ছবি, অর্থাৎ যে মানুষগুলোকে ভালোবাসতেন, তাদের সঙ্গেই গিয়েছিলেন। পুরুষের ছদ্মবেশের নিচে যে মানুষটা ছিল, সে পুরোপুরি নিজেই ছিল। আসকার দিঘির সেই লাজুক মেয়েটাই, যে উঠোন ঝাড়ু দিত আর রাতে হারিকেনের আলোয় নিষিদ্ধ বই পড়ত।

প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর বীরকন্যা প্রীতিলতাকে স্মরণ করা হয় ফুল দিয়ে, বক্তৃতা দিয়ে। কিন্তু তাঁকে সত্যি মনে রাখার উপায় বোধহয় একটাই: তাঁকে পাথরের মূর্তি বানিয়ে না ফেলা। তিনি ভয় পেতেন, মাকে ভালোবাসতেন, বাঁশি বাজাতেন, আর তবুও গিয়েছিলেন।

পাগড়িটা ছিল শত্রুর চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য; চুলগুলো ছিল ইতিহাসকে সত্যিটা জানিয়ে দেওয়ার জন্য।

পাহাড়তলীর সেই ঘাসে আজ আর রক্তের দাগ নেই। কিন্তু একশো গজের সেই দূরত্বটুকু এখনো মাপা যায়। একটা মেয়ে ঠিক ততটা পথ হেঁটেছিল, যতটা তাকে কেউ কখনো হাঁটতে দেয়নি।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কেন পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন?

পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে যাওয়ার পথে রাতের বেলা একজন নারীকে দেখলে পুলিশের সন্দেহ জাগত, তাই কৌশলগত কারণে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার খাকি শার্ট, ধুতি ও পাগড়ি পরেছিলেন। একই সঙ্গে এটি ছিল নারীরা লড়তে পারে না, এই ধারণার বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী জবাব।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পর পিছু হটার সময় তাঁর বুকে গুলি লাগে। ধরা পড়া এড়াতে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, গুলি নয়, সায়ানাইডই ছিল মৃত্যুর কারণ। তাই ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর আত্মাহুতি দিবস হিসেবে পালিত হয়।

প্রীতিলতার শেষ চিঠিতে কী লেখা ছিল?

আক্রমণের আগের রাতে মাকে লেখা প্রীতিলতার শেষ চিঠিতে তিনি ব্যথা দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, দেশের জন্য অনেক পুত্র প্রাণ দিয়েছে কিন্তু কোনো কন্যা এখনো দেয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর মাস্টারদা সূর্য সেন চিঠিটি তাঁর মায়ের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন।

পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে কী লেখা ছিল?

প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী ক্লাবের প্রবেশপথে লেখা ছিল “কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ”। এই বর্ণবাদী অপমানের প্রতীক হয়ে ওঠা ক্লাবটিকেই মাস্টারদার দল আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয়, যার নেতৃত্ব দেন প্রীতিলতা।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কে ছিলেন?

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১–১৯৩২) ছিলেন চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাটে জন্ম নেওয়া বিপ্লবী, মাস্টারদা সূর্য সেনের দলের সদস্য। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে প্রাণ দেওয়া প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে তিনি বীরকন্যা প্রীতিলতা নামে পরিচিত।

সর্বশেষ