বাংলাদেশে কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টির সময় বজ্রপাত একটি নিয়মিত এবং অত্যন্ত ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়। বিশেষ করে মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। প্রতি বছর গ্রাম ও শহরের অসংখ্য মানুষ এই দুর্যোগের শিকার হয়ে প্রাণ হারান, যার মূল কারণ সচেতনতার অভাব এবং হঠাৎ বিপদে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারা।
প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়কে পুরোপুরি থামানো আমাদের হাতে নেই। তবে সঠিক প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে ক্ষতির মাত্রা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই, বজ্রপাতের সময় নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায় সম্পর্কে সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ধারণা থাকা প্রতিটি সচেতন মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক। এই আর্টিকেলে আমরা বজ্রপাত থেকে বাঁচার বাস্তবসম্মত কিছু নিয়ম, জরুরি মুহূর্তের করণীয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসার বিস্তারিত কৌশল নিয়ে আলোচনা করব। এগুলো মেনে চললে আপনি ও আপনার প্রিয়জনেরা অপ্রত্যাশিত বিপদ থেকে নিরাপদে থাকতে পারবেন।
বজ্রপাত কেন হয় এবং এর ক্ষতিকর দিক
আকাশে যখন কালো মেঘ জমে, তখন মেঘের ভেতরের জলকণা ও বরফকণার মধ্যে ঘর্ষণের ফলে বিপুল পরিমাণ স্থির বিদ্যুৎ তৈরি হয়। মেঘের নিচের অংশে নেগেটিভ চার্জ এবং ওপরের অংশে পজিটিভ চার্জ জমা হয়। ভূপৃষ্ঠে থাকা পজিটিভ চার্জ যখন মেঘের নেগেটিভ চার্জের দিকে তীব্র বেগে ধাবিত হয়, তখনই আমরা বিদ্যুতের ঝলকানি দেখি এবং বিকট শব্দ শুনতে পাই, যাকে বজ্রপাত বলা হয়। বজ্রপাতের সময় কয়েক মিলিয়ন ভোল্ট বিদ্যুৎ কয়েক মিলি-সেকেন্ডের মধ্যে মাটিতে নেমে আসে। এর তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়েও প্রায় পাঁচগুণ বেশি হতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হলে স্নায়ুতন্ত্র ও হৃৎপিণ্ড মুহূর্তের মধ্যে অকেজো হয়ে যায়। বাংলাদেশে ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইদানীং বজ্রপাতের হার ও তীব্রতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেনে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক কারণ
- মেঘের জলকণা ও বরফকণার ঘর্ষণে বিদ্যুৎ তৈরি হওয়া।
- বিপরীতমুখী চার্জের (পজিটিভ ও নেগেটিভ) তীব্র আকর্ষণে বৈদ্যুতিক স্পার্ক বা স্ফুলিঙ্গ তৈরি হওয়া।
- ভূপৃষ্ঠের উঁচু স্থান, গাছ বা ভবনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ মাটিতে প্রবাহিত হওয়া।
বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি
- জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কালবৈশাখীর তীব্রতা বৃদ্ধি।
- খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
- শহর অঞ্চলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বজ্রপাত নিরোধক দণ্ডের (Lightning Arrester) অভাব।
বজ্রপাত সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত তথ্য | বিপদের মাত্রা |
| বিদ্যুতের ভোল্টেজ | প্রায় ১০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে। | অত্যন্ত প্রাণঘাতী। |
| তাপমাত্রা | প্রায় ২৭,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (সূর্যের চেয়েও উত্তপ্ত)। | মুহূর্তেই ঝলসে যাওয়ার ঝুঁকি। |
| শব্দের বেগ বনাম আলো | আলোর গতি বেশি হওয়ায় আগে চমক দেখা যায়, পরে শব্দ শোনা যায়। | শব্দ শোনার আগেই আঘাত হানতে পারে। |
বাড়ির ভেতরে থাকাকালীন নিরাপত্তার নিয়ম
বাইরে যখন প্রবল ঝড় ও বিদ্যুৎ চমকায়, তখন বাড়ির ভেতরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ধরা হয়। তবে ঘরের ভেতরে থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে, অন্যথায় বিপদের ঝুঁকি থেকেই যায়। বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ বৈদ্যুতিক তার, ডিশের লাইন এবং পানির ধাতব পাইপের মাধ্যমে খুব সহজেই ঘরের ভেতরে চলে আসতে পারে। এই কারণে জানালার কাঁচ বা মেটালের গ্রিল থেকে দূরে থাকা খুব জরুরি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘরের মাঝখানের কোনো নিরাপদ স্থানে বসুন। ছোট বাচ্চারা মেঘের গর্জনে ভয় পেতে পারে, তাই তাদের শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। এই সময়টায় বজ্রপাতের সময় নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায় হিসেবে বাড়ির ভেতরের সমস্ত ধাতব সংযোগ থেকে দূরে থাকা বাধ্যতামূলক।
বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও প্লাগ ব্যবস্থাপনা
- আকাশ মেঘলা হওয়ার সাথে সাথেই টিভি, ফ্রিজ, ওয়াই-ফাই রাউটার এবং কম্পিউটারের প্লাগ সকেট থেকে সম্পূর্ণ খুলে ফেলুন। শুধু সুইচ বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়।
- মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ চার্জে লাগানো অবস্থায় কোনোভাবেই ব্যবহার করবেন না।
- বজ্রপাতের সময় ল্যান্ডলাইন টেলিফোন ব্যবহার করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন।
পানির লাইন ও ধাতব বস্তু থেকে দূরত্ব
- বজ্রপাতের সময় বাথরুমে গোসল করা, বেসিনে মুখ ধোয়া বা থালাবাসন মাজার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুন।
- ধাতব পানির কল বা পাইপ স্পর্শ করবেন না। পানি বিদ্যুতের খুব ভালো সুপরিবাহী, যা দূর থেকে বিদ্যুৎ টেনে আনতে পারে।
- জানালার গ্রিল, ধাতব দরজা বা বারান্দার রেলিং ধরা থেকে বিরত থাকুন।
বাড়ির ভেতরে করণীয় ও বর্জনীয় কাজ
| অবস্থা | করণীয় নিরাপদ কাজ | বিপজ্জনক বর্জনীয় কাজ |
| বৈদ্যুতিক সংযোগ | প্লাগ খুলে রাখা, চার্জহীন মোবাইল ব্যবহার। | চার্জে থাকা ফোন ব্যবহার, ল্যান্ডলাইনে কথা বলা। |
| পানির ব্যবহার | শুষ্ক স্থানে থাকা, পানি থেকে দূরে বসা। | গোসল করা বা কল ছেড়ে কাপড় ধোয়া। |
| অবস্থান | ঘরের মাঝখানে বা বিছানায় বসা। | জানালা, বারান্দা বা ধাতব দরজার কাছে দাঁড়ানো। |
বজ্রপাতের সময় নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায়: বাইরে থাকলে করণীয়
অনেক সময় জরুরি কাজে বা ভ্রমণের কারণে আমরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরের বাইরে থাকি। ঠিক সেই মুহূর্তে যদি হঠাৎ বজ্রপাত শুরু হয়, তবে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খোলা মাঠে, কৃষিজমিতে বা ফাঁকা রাস্তায় থাকা অবস্থায় বজ্রপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়ে নিরাপদ কোনো আশ্রয় খুঁজে বের করাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত। খোলা আকাশের নিচে ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বা কোনো গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বোকামি। নিজেকে এবং পরিবারকে বাঁচাতে হলে চারপাশের পরিবেশ বুঝে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরাপদ পাকা স্থাপনায় আশ্রয়
- আশেপাশে কোনো কংক্রিটের তৈরি বা পাকা ভবন থাকলে দ্রুত সপরিবারে সেখানে প্রবেশ করুন।
- টিনের চালযুক্ত ঘর, ছোট যাত্রীছাউনি বা খোলা গ্যারেজ বজ্রপাত থেকে বাঁচাতে পারে না, তাই এগুলো এড়িয়ে চলুন।
খোলা মাঠ ও উঁচু স্থান পরিহার
- বজ্রপাত সবসময় চারপাশের সবচেয়ে উঁচু বস্তুকে আঘাত করার চেষ্টা করে। তাই খোলা মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকা বড় গাছের নিচে কখনোই আশ্রয় নেবেন না।
- বিশাল কোনো খোলা মাঠে আটকে পড়লে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ুন এবং দুই হাত দিয়ে কান ঢেকে মাথা নিচু করুন। মাটিতে সোজা হয়ে শুয়ে পড়বেন না।
- বৈদ্যুতিক খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার বা তারের বেড়া থেকে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন।
দলবদ্ধ না হয়ে আলাদা অবস্থান
- পরিবারের একাধিক সদস্য খোলা জায়গায় থাকলে একসাথে জড়ো হয়ে থাকবেন না।
- একে অপরের কাছ থেকে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে বসে পড়ুন। এতে একজনের ওপর বিদ্যুৎ পড়লে অন্যজন বেঁচে যেতে পারেন।
ঘরের বাইরে থাকার সময় সতর্কতা
| ঝুঁকির স্থান | নিরাপদ বিকল্প | বিপদের মূল কারণ |
| খোলা প্রান্তর/মাঠ | হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে বসা। | ফাঁকা জায়গায় মানুষই উঁচু বস্তু হিসেবে কাজ করে। |
| বড় গাছ | পাকা ভবনের নিচে দ্রুত আশ্রয় নেওয়া। | গাছ বিদ্যুতের প্রধান লক্ষ্যবস্তু এবং সহজেই আগুন ধরে। |
| পুকুর বা জলাশয় | দ্রুত ডাঙ্গায় উঠে শুকনো স্থানে যাওয়া। | পানি বিদ্যুতের অত্যন্ত ভালো পরিবাহী। |
গাড়িতে বা ভ্রমণের সময় পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজস্ব গাড়িতে বা বাসে ভ্রমণের সময় কালবৈশাখী ঝড় শুরু হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই ভয় পেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে নিরাপদ স্থান খোঁজার ভুল সিদ্ধান্ত নেন। তবে বিজ্ঞানের মতে, বজ্রপাতের সময় বাইরের পরিবেশের চেয়ে গাড়ির ভেতরটা অনেক বেশি নিরাপদ। গাড়ির বাইরের ধাতব বডি একটি ‘ফ্যারাডে খাঁচা‘ (Faraday cage) হিসেবে কাজ করে, যা বিদ্যুৎকে ভেতরে প্রবেশ করতে না দিয়ে সরাসরি মাটিতে পার করে দেয়। তাই বজ্রপাতের সময় নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায় হিসেবে গাড়ি থেকে বাইরে বের না হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে গাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায়ও কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।
গাড়ির ভেতরে অবস্থান ও গ্লাস বন্ধ রাখা
- ঝড় শুরু হলে গাড়ির সব জানালা বা কাঁচ পুরোপুরি বন্ধ করে দিন। বৃষ্টি বা বাতাস আসার কোনো সুযোগ রাখা যাবে না।
- বজ্রপাত সম্পূর্ণ না থামা পর্যন্ত সপরিবারে গাড়ির ভেতরেই চুপচাপ অপেক্ষা করুন। সম্ভব হলে গাড়ি রাস্তার পাশে নিরাপদ স্থানে পার্ক করুন।
গাড়ির ধাতব অংশ স্পর্শ না করা
- গাড়ির রেডিও, ডোর হ্যান্ডেল, স্টিয়ারিং হুইল বা গিয়ার স্টিক অকারণে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
- নিজেদের হাত কোলে রাখুন এবং সিটে হেলান দিয়ে আরাম করে বসুন। শরীরের কোনো অংশ যেন গাড়ির বডির সাথে লেগে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- টু-হুইলার বা মোটরসাইকেলে থাকলে দ্রুত নিরাপদ ভবনের নিচে আশ্রয় নিন, কারণ বাইক কোনো ফ্যারাডে খাঁচা তৈরি করে না।
গাড়িতে ভ্রমণের সময় করণীয় নির্দেশিকা
| সতর্কতা | সঠিক ও নিরাপদ পদ্ধতি | ভুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি |
| গাড়ির কাঁচ | পুরোপুরি তুলে বা বন্ধ করে রাখা। | গ্লাস নামিয়ে ভিডিও করা বা হাত বের করে রাখা। |
| ভ্রমণকারীর অবস্থান | সিটের ওপর হাত কোলে নিয়ে বসা। | ভয় পেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড় দেওয়া। |
| ধাতব বস্তু | স্টিয়ারিং বা ডোর লক থেকে হাত সরিয়ে নেওয়া। | গাড়ির বডি বা বাইরের রেডিও অ্যান্টেনা ধরা। |
দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি: বাসাবাড়িতে বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা
বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য তাৎক্ষণিক সতর্কতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি থাকাও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যারা বহুতল ভবনে বা গ্রামের ফাঁকা জায়গায় বসবাস করেন, তাদের বাড়িঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বজ্রপাত সরাসরি ভবনে আঘাত হানলে শুধু মানুষের প্রাণহানিই হয় না, ঘরের সমস্ত দামি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। একটু সচেতন হয়ে বাড়ি তৈরির সময়ই যদি বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা যায়, তবে এই ভয়াবহ ক্ষতি থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এটি বজ্রপাতের সময় নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি স্থায়ী সমাধান।
লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন
- বাড়ির ছাদে একটি মানসম্মত লাইটনিং অ্যারেস্টার বা বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন করুন। এটি সরাসরি বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে নিরাপদভাবে মাটিতে পাঠিয়ে দেয়।
- শুধু দণ্ড বসালেই হবে না, এর সাথে সংযুক্ত তামার তারটি যেন সঠিকভাবে মাটির গভীর পর্যন্ত পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
আর্থিং ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ
- বাড়ির সম্পূর্ণ ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিংয়ে সঠিক আর্থিং ব্যবস্থা রাখুন। এতে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও বজ্রপাতের অতিরিক্ত ভোল্টেজ থেকে ঘরের জিনিসপত্র রক্ষা পাবে।
- অন্তত বছর খানেক পরপর একজন পেশাদার ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে আর্থিংয়ের কার্যকারিতা পরীক্ষা করিয়ে নিন।
সার্জ প্রটেক্টর ব্যবহার
- দামি টিভি, কম্পিউটার বা ফ্রিজ সরাসরি মেইন লাইনে না লাগিয়ে ভালো মানের সার্জ প্রটেক্টরের মাধ্যমে ব্যবহার করুন।
- হঠাৎ বিদ্যুতের ভোল্টেজ বেড়ে গেলে এটি যন্ত্রাংশগুলোকে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।
দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা
| প্রযুক্তির নাম | কাজের ধরন | সুবিধা |
| লাইটনিং অ্যারেস্টার | ছাদের ওপর বসানো ধাতব দণ্ড। | সরাসরি ভবনের ওপর বজ্রপাত প্রতিহত করে। |
| আর্থিং তার | মাটির সাথে বিদ্যুতের সংযোগ স্থাপন। | অতিরিক্ত বিদ্যুৎ মাটিতে পাঠিয়ে দেয়। |
| সার্জ প্রটেক্টর | ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্লাগের সাথে ব্যবহার। | হঠাৎ হাই ভোল্টেজ থেকে গ্যাজেট রক্ষা করে। |
বজ্রপাতে আহত হলে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা ও করণীয়
সব রকম সতর্কতা ও প্রস্তুতি নেওয়ার পরও দুর্ভাগ্যবশত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। পরিবারের বা আশেপাশের কেউ যদি বজ্রপাতে আহত হন, তবে বিন্দুমাত্র দেরি না করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত কিন্তু মারাত্মক ভুল ধারণা হলো, বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। এটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কোনো বিদ্যুৎ জমে থাকে না। তাই ভয় না পেয়ে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করলে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন বাঁচানো সম্ভব। সঠিক ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা পরিবারের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।
শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা ও সিপিআর প্রদান
- প্রথমে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে যান এবং তার নাক বা বুকের কাছে কান নিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কি না তা খেয়াল করুন।
- গলার কাছে আঙুল দিয়ে পালস চেক করুন। যদি পালস না পাওয়া যায় বা হার্টবিট বন্ধ মনে হয়, তবে দ্রুত বুক চেপে সিপিআর (Cardiopulmonary Resuscitation) দেওয়া শুরু করুন।
পোড়া ক্ষতের যত্ন ও হাসপাতালে স্থানান্তর
- বজ্রপাতের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে আগুন ধরে গেলে দ্রুত মোটা কাপড় বা কম্বল দিয়ে চেপে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করুন।
- শরীরের কোনো অংশ পুড়ে গেলে বা ঝলসে গেলে সেখানে পরিষ্কার ঠান্ডা পানি ঢালুন। ভুলেও বরফ বা টুথপেস্ট লাগাবেন না।
- প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করার পরপরই দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন অথবা নিকটস্থ বড় হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
প্রাথমিক চিকিৎসার জরুরি ধাপসমূহ
| ধাপের ক্রম | করণীয় কাজ | মূল উদ্দেশ্য |
| প্রথম কাজ | আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করা ও পর্যবেক্ষণ। | শ্বাস-প্রশ্বাস ও পালস চেক করা। |
| দ্বিতীয় কাজ | সিপিআর (CPR) প্রদান করা। | বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস সচল করা। |
| তৃতীয় কাজ | পোড়া স্থানে শুধু ঠান্ডা পানি দেওয়া। | ক্ষতস্থানের জ্বালা কমানো ও ইনফেকশন রোধ। |
| চতুর্থ কাজ | দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর। | উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করে জীবন বাঁচানো। |
সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতা এনে দিবে নিরাপত্তা
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতা আমাদের অনেক বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। বিশেষ করে বজ্রপাতের সময় নিজের পরিবারকে রক্ষার উপায় গুলো আগে থেকেই জানা থাকলে আপনি যেকোনো কঠিন সময়েও মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। বাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায় প্লাগ খুলে রাখা, রাস্তায় খোলা মাঠ বা বড় গাছ এড়িয়ে চলা এবং বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত সিপিআর দেওয়ার মতো সামান্য কয়েকটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ আপনার প্রিয়জনদের অমূল্য জীবন বাঁচাতে পারে। তাই এই নিয়মগুলো শুধু নিজে জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবেন না; পরিবারের সবার সাথে, বিশেষ করে শিশুদের সাথে আলোচনা করুন। ভয় না পেয়ে দুর্যোগের সময় সাহসিকতা ও সচেতনতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. একই জায়গায় কি দু’বার বজ্রপাত হতে পারে?
হ্যাঁ, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা যে বজ্রপাত একই স্থানে দুবার আঘাত হানে না। বাস্তবে, উঁচু ভবন, বড় গাছ বা মোবাইল টাওয়ারে একাধিকবার বজ্রপাত হওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে।
২. বজ্রপাতের সময় কি মোবাইল ডেটা বা ওয়্যারলেস ইন্টারনেট ব্যবহার করা নিরাপদ?
যদি আপনার ফোনটি চার্জে লাগানো না থাকে, তবে ঘরের ভেতর বসে মোবাইল ডেটা বা ওয়্যারলেস ইন্টারনেট ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে বাড়ির ওয়াই-ফাই রাউটার বা ব্রডব্যান্ড লাইনে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে বিধায় সেগুলো বন্ধ রাখাই উত্তম।
৩. রাবার সোলযুক্ত জুতা পরলে কি বজ্রপাত থেকে বাঁচা যায়?
অনেকেই মনে করেন রাবারের জুতা পরলে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বজ্রপাতে যে পরিমাণ ভোল্টেজ থাকে, তা সাধারণ রাবারের জুতা দিয়ে আটকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটি আপনাকে সরাসরি বজ্রাঘাত থেকে বাঁচাতে পারে না, তবে এটি বৈদ্যুতিক আর্থিং থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
৪. বজ্রপাতের সময় কানে হেডফোন বা ইয়ারফোন রাখা কি ঝুঁকিপূর্ণ?
ওয়্যারলেস বা ব্লুটুথ ইয়ারবাড তুলনামূলক নিরাপদ হলেও, মোবাইল বা ল্যাপটপের সাথে তারযুক্ত (Wired) হেডফোন ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বজ্রপাত হলে তারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরাসরি আপনার কান ও মস্তিষ্কে আঘাত করতে পারে।
৫. সুইমিং পুল বা পুকুরে গোসল করা অবস্থায় বজ্রপাত শুরু হলে কী করবেন?
পানি বিদ্যুতের অত্যন্ত ভালো পরিবাহী। তাই সুইমিং পুল, পুকুর বা নদীতে থাকা অবস্থায় মেঘের গর্জন শুনলে এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পানি থেকে উঠে শুকনো ও নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে।


