গতকাল ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, রবিবার, সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু স্যার মার্ক টুলি (Sir Mark Tully) আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ভারতের নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই প্রয়াণে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের সাংবাদিকতা এবং ইতিহাসের এক বিশাল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
ব্রিটিশ হলেও হৃদয়ে তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর দক্ষিণ এশীয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সত্য খবর ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন স্যার মার্ক টুলি এবং বিবিসি হয়ে উঠেছিল অবরুদ্ধ বাঙালির একমাত্র ভরসার স্থল। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার এক পরম সুহৃদকে।
প্রাথমিক জীবন ও ভারত-প্রেম
স্যার মার্ক টুলি ১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী এবং মা ছিলেন ব্রিটিশ। শৈশবের প্রথম ১০ বছর তিনি ভারতেই কাটান, যা তাঁর মনে ভারতের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা তৈরি করে। এরপর পড়াশোনার জন্য তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিওলজি বা ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করলেও, নিয়তি তাঁকে সাংবাদিকতার দিকে নিয়ে আসে।
১৯৬৫ সালে তিনি বিবিসি-তে যোগ দেন এবং জুনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পুনরায় ভারতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি আর কখনোই পুরোপুরি ভারত ছাড়েননি। তিনি নিজেকে প্রায়ই “ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী ভারতীয়” বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন।
এক নজরে মার্ক টুলির প্রাথমিক জীবন
| সাল/সময়কাল | ঘটনা | বিবরণ |
| ১৯৩৫ | জন্ম | কলকাতা, ব্রিটিশ ভারত। |
| ১৯৪৫ | ইংল্যান্ড গমন | পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। |
| ১৯৫০-এর দশক | উচ্চশিক্ষা | কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাস অধ্যয়ন। |
| ১৯৬৫ | বিবিসি-তে যোগদান | ভারতে ফিরে আসা এবং বিবিসির হয়ে কাজ শুরু। |
১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর ও মার্ক টুলি
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত, ১৯৭১ সাল। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালাচ্ছিল এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সংবাদ প্রচারে বাধা দিচ্ছিল, তখন সত্য খবর তুলে ধরার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন স্যার মার্ক টুলি। সে সময় তিনি বিবিসি-র দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বাঙালিরা তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পাশাপাশি বিবিসি বাংলার সংবাদের ওপর নির্ভর করত। মার্ক টুলির ভরাট কণ্ঠস্বর এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে শুরু করে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা—সবার মনে আশা জাগাত। তিনি কেবল সংবাদ পাঠক ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির ‘ভয়েস অব ট্রুথ’ বা সত্যের কণ্ঠস্বর।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর সাংবাদিকতার প্রভাব
| বিষয় | ভূমিকা | প্রভাব |
| সংবাদ প্রচার | যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা | বিশ্ববাসী পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা সম্পর্কে জানতে পারে। |
| বিশ্বাসযোগ্যতা | বিবিসি বাংলার খবর | আকাশবাণী বা রেডিও পাকিস্তানের চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করা হতো। |
| মনোবল বৃদ্ধি | মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা | তাঁর রিপোর্ট শুনে মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারতেন বিশ্ব তাঁদের পাশে আছে। |
স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক ও সম্মাননা
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও স্যার মার্ক টুলি বাংলাদেশের সাথে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। তিনি বহুবার বাংলাদেশে এসেছেন এবং এদেশের মানুষের ভালোবাসা সিক্ত হয়েছেন। তিনি সব সময় বলতেন, ১৯৭১ সালের স্মৃতি তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ (Friends of Liberation War Honour) প্রদান করে। এটি ছিল তাঁর প্রতি বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র। তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে কাজ করে গেছেন।
বাংলাদেশ ও মার্ক টুলি: বন্ধুত্বের স্মারক
| সাল | ঘটনা/পুরস্কার | বিবরণ |
| ১৯৭২ | বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন | তিনি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সরাসরি কভার করেছিলেন। |
| ২০১২ | মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা | বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। |
| বিভিন্ন সময় | বাংলাদেশ সফর | সাহিত্য উৎসব ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা সফর। |
বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতা জীবন ও সাহিত্যকর্ম
স্যার মার্ক টুলি দীর্ঘ ২২ বছর বিবিসি-র নয়াদিল্লি ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারি (১৯৭৫), অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা ও রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির মতো ঘটনাগুলো তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কভার করেছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন সুলেখও ছিলেন। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়াকে নিয়ে লেখা তাঁর বইগুলো পশ্চিমা পাঠকদের এই অঞ্চল সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর লেখা বইগুলোতে সাধারণ মানুষের গল্প, ধর্ম, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ পাওয়া যায়।
উল্লেখযোগ্য বই ও সাংবাদিকতা
| বইয়ের নাম | প্রকাশকাল | বিষয়বস্তু |
| Amritsar: Mrs Gandhi’s Last Battle | ১৯৮৫ | অপারেশন ব্লু স্টার ও শিখ রাজনীতির বিশ্লেষণ। |
| No Full Stops in India | ১৯৯১ | ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির গভীর পর্যবেক্ষণ। |
| India in Slow Motion | ২০০২ | আমলাতন্ত্র ও ভারতের ধীরগতির অগ্রগতির চিত্র। |
| The Heart of India | ১৯৯৫ | ভারতের গ্রামীণ জীবনের গল্প। |
শেষ জীবন ও প্রস্থান
দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভোগার পর স্যার মার্ক টুলি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। গত কিছুদিন ধরেই তিনি দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬-এ তাঁর মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে সাংবাদিক মহলে।
মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি তাঁর পার্টনার গিলিয়ান রাইট এবং অগণিত গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি এমন এক জীবন কাটিয়েছেন, যা সত্য ও সাহসের প্রতীক হয়ে থাকবে।
মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য
| তথ্য | বিবরণ |
| মৃত্যুর তারিখ | ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, রবিবার। |
| মৃত্যুর স্থান | নয়াদিল্লি, ভারত। |
| বয়স | ৯০ বছর। |
| কারণ | বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা ও স্ট্রোক। |
শেষ কথা
সাংবাদিকতা যে কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, বরং ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া এবং মজলুমের কণ্ঠস্বর হওয়া—তা স্যার মার্ক টুলি তাঁর কর্মজীবনের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন। বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে মনে রাখবে এক বিপদের বন্ধু হিসেবে, যিনি ১৯৭১ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
৯০ বছরের এক বর্ণিল জীবনের সমাপ্তি ঘটল, কিন্তু তাঁর কর্ম ও আদর্শ আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। বিবিসি বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্যার মার্ক টুলি—এই শব্দগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে সমার্থক হয়েই বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।


