৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে ৩টা বিশ্বকাপ? 

সর্বাধিক আলোচিত

ফুটবলকে যদি একটি ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল নিঃসন্দেহে তার সবচেয়ে বড় উপাসনালয়। ১৯৫৮ সালে সুইডেনের মাটিতে ১৭ বছরের এক কিশোর পেলের জাদুকরী উত্থান থেকে শুরু করে ২০০২ সালে ইয়োকোহামায় রোনালদো নাজারিওর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে ব্রাজিল ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছে পাঁচটি সোনালী বিশ্বকাপ শিরোপা। কিন্তু এই মহিমান্বিত সোনালী ইতিহাসের সমান্তরালে ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রায়ই একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খায়— ৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে তিনটে বিশ্বকাপ? এই কৌতূহলোদ্দীপক রহস্যের জট খুলতে গেলে আমাদের ডুব দিতে হবে বিশ্ব ফুটবলের আদি ইতিহাস, রোমাঞ্চকর চুরির রোমহর্ষক ঘটনা এবং ফিফার ট্রফি প্রদান সংক্রান্ত আইনি প্রবিধানের এক দীর্ঘ ও জটিল পথপরিক্রমায়।   

উরুগুয়ের চার তারা রহস্য এবং জুলে রিমে ট্রফির ঐতিহাসিক প্রবিধান

উরুগুয়ের জাতীয় দলের জার্সিতে ৪টি তারকা চিহ্নের উপস্থিতি এবং প্রথম বিশ্ব আসরগুলোর ট্রফি বণ্টন সংক্রান্ত নিয়মাবলী ফুটবল ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি অধ্যায়। এই অধ্যায়গুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কীভাবে প্রাক-বিশ্বকাপ যুগের ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলো আজকের আধুনিক টুর্নামেন্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। নিচে এই ঐতিহাসিক ঘটনাবলী এবং জুলে রিমে ট্রফির আদি মালিকানার শর্তাবলী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো, যা থেকে ৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে তিনটে বিশ্বকাপ তার প্রথম দিককার ধারণাগত সূত্র পাওয়া যায়।

উরুগুয়ের চার তারকা জার্সির আদি ইতিহাস ও ফিফার অলিম্পিক স্বীকৃতি

লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে অফিশিয়াল ফিফা বিশ্বকাপ জিতেছে মাত্র দুইবার—১৯৩০ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথম আসরে এবং ১৯৫০ সালে মারাকানা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও উরুগুয়ের ফুটবল জার্সিতে ৪টি তারকা শোভা পায়, যা অনেক সাধারণ ফুটবলপ্রেমীকে বিভ্রান্ত করে। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৩০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার আগে, ফিফা অলিম্পিক গেমসের ফুটবল টুর্নামেন্টকে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। উরুগুয়ে ১৯২৪ এবং ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে টানা দুবার স্বর্ণপদক জয় করে। পরবর্তীতে ফিফা অলিম্পিকের এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের তকমা প্রত্যাহার করে নিলেও উরুগুয়ের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা অলিম্পিকের দুটি স্বর্ণপদককে বিশ্বকাপের সমমানের মর্যাদা দিয়ে নিজেদের জার্সিতে ৪টি তারকা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়, যা নিয়ে দীর্ঘ সময় ফিফার সঙ্গে তাদের আইনি বিতর্ক চলেছে।   

জুলে রিমে ট্রফির প্রবিধান এবং তিনবার বিজয়ের স্থায়ী মালিকানা শর্ত

জুলে রিমে ট্রফির প্রবিধান

১৯৩০ সালে যখন প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, তখন প্রতিযোগিতার মূল ট্রফিটির নাম ছিল “ভিক্টরি”। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে ফিফার দীর্ঘকালীন সভাপতি জুলে রিমের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সোনালী ট্রফিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “জুলে রিমে কাপ”। এই ট্রফিটি হস্তান্তরের সময় জুলে রিমে একটি বিশেষ ও ঐতিহাসিক শর্ত যুক্ত করেছিলেন। শর্তটি ছিল—যে দেশ প্রথম তিনবার এই গৌরবময় বিশ্বকাপ জয় করতে পারবে, তারা এই মূল সোনালী ট্রফিটি চিরদিনের জন্য নিজেদের দেশে স্থায়ীভাবে রাখার অধিকার পাবে। এই নিয়মটিই পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক মহা আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ফুটবল পরাশক্তিদের মধ্যে তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার এক অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু করে দেয়。   

সাল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশ ট্রফির ধরন স্থায়ী মালিকানার শর্ত তৎকালীন ফিফা সভাপতি
১৯৩০ উরুগুয়ে জুলে রিমে ট্রফি ৩ বার জয়ের শর্ত প্রযোজ্য জুলে রিমে (ফ্রান্স)
১৯৩৪ ইতালি জুলে রিমে ট্রফি ৩ বার জয়ের শর্ত প্রযোজ্য জুলে রিমে (ফ্রান্স)
১৯৩৮ ইতালি জুলে রিমে ট্রফি ৩ বার জয়ের শর্ত প্রযোজ্য জুলে রিমে (ফ্রান্স)
১৯৫০ উরুগুয়ে জুলে রিমে ট্রফি ৩ বার জয়ের শর্ত প্রযোজ্য জুলে রিমে (ফ্রান্স)
১৯৫৪ পশ্চিম জার্মানি জুলে রিমে ট্রফি ৩ বার জয়ের শর্ত প্রযোজ্য রডলফ উইলিয়াম সিলড্রায়ার্স
১৯৫৮ ব্রাজিল জুলে রিমে ট্রফি ৩ বার জয়ের শর্ত প্রযোজ্য আর্থার ড্রিউরি

১৯৬৬ সালের লন্ডনের রোমাঞ্চকর চুরি এবং বীর কুকুর পিকলসের বীরত্বগাথা

১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের মাত্র কয়েক মাস আগে লন্ডনের বুক থেকে বিশ্বকাপের মূল ট্রফিটি যেভাবে চুরি হয়ে গিয়েছিল, তা তৎকালীন সময়ে ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক মস্ত বড় চপেটাঘাত ছিল। এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর টনক নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং ট্রফির নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়টিকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছিল। নিচে এই অবিশ্বাস্য চুরির ঘটনা, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তদন্ত এবং একটি সাধারণ কুকুরের অবিশ্বাস্য বীরত্বগাথার বিবরণ তুলে ধরা হলো।

ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হল এবং স্ট্যাম্পেক্স প্রদর্শনী থেকে দিনের আলোয় চুরি

১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে ফিফা ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) কাছে বিশ্বকাপের মূল জুলে রিমে ট্রফিটি হস্তান্তর করে। মার্চ মাসে স্ট্যানলি গিবনস নামক একটি বিখ্যাত স্ট্যাম্প কোম্পানির অনুরোধে ট্রফিটি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলের ‘স্ট্যাম্পেক্স’ প্রদর্শনীতে প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা পাহারার শর্ত থাকলেও ২০শে মার্চ রবিবার দুপুরে প্রহরীদের নজরদারির ফাঁক গলে চোরেরা হলের পেছনের কাঠের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা প্রদর্শনীর কাচের ক্যাবিনেটের তালা ভেঙে ৩,০০০ পাউন্ড মূল্যের স্বর্ণের ট্রফিটি চুরি করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়, অথচ ক্যাবিনেটের পাশেই রাখা প্রায় ৩০ লাখ পাউন্ড মূল্যের দুর্লভ ডাকটিকিটগুলো তারা স্পর্শও করেনি।   

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তদন্ত, এডওয়ার্ড বেটশলি এবং রহস্যময় ১৫,০০০ পাউন্ডের মুক্তিপণ

চুরির ঘটনা জানাজানি হতেই বিশ্বজুড়ে হাহাকার পড়ে যায় এবং ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী তদন্ত সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তদন্তভার গ্রহণ করে। চুরির পরদিনই এফএ চেয়ারম্যান জো মেয়ার্স একটি বেনামী চিঠি এবং ট্রফির ওপরের অংশের একটি খুলে নেওয়া অংশ পান। চিঠিতে ট্রফিটি অক্ষত ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ১৫,০০০ পাউন্ড দাবি করা হয় এবং পুলিশকে জানালে ট্রফিটি গলিয়ে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা পরিদর্শক চার্লস বাগির নেতৃত্বে ছদ্মবেশী পুলিশ ব্যাটারসি পার্কে মুক্তিপণ হস্তান্তরের ফাঁদ পেতে এডওয়ার্ড বেটশলি নামের এক মধ্যসত্ত্বভোগীকে গ্রেফতার করে। তবে বেটশলি নিজেকে কেবল দালালি কাজের লোক দাবি করে আসল চোরের অবস্থান ও ট্রফির খোঁজ দিতে অস্বীকার করেন।   

কুকুর পিকলস এবং ডেভিড করবেটের আকস্মিক আবিষ্কার

গোটা ইংল্যান্ড যখন লজ্জায় মাথা নত করার উপক্রম করেছে, ঠিক তখন ২৭শে মার্চ সকালে দক্ষিণ লন্ডনের আপার নরউডে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে ২৬ বছর বয়সী ডেভিড করবেট তার প্রিয় মিক্সড-ব্রিড কলি কুকুর ‘পিকলস’কে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে বের হন। হাঁটার সময় পার্ক করা একটি গাড়ির পাশে ঝোপের নিচে রাখা খবরের কাগজে মোড়ানো একটি ভারী প্যাকেট দেখে পিকলস তীব্রভাবে ঘ্রাণ নিতে শুরু করে এবং ডেভিডের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ডেভিড কৌতুহলী হয়ে প্যাকেটের কিছু অংশ ছিঁড়তেই দেখতে পান ভেতরে জ্বলজ্বল করছে একটি সোনালী মূর্তি, যার গায়ে খোদাই করা রয়েছে ব্রাজিল, জার্মানি ও উরুগুয়ের নাম। তিনি দ্রুত সেটি নিয়ে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে যান এবং এভাবেই উদ্ধার হয় বিশ্বকাপের হারানো মুকুট। বীরত্বের জন্য পিকলসকে একটি রৌপ্য পদক এবং তার মালিক ডেভিডকে ৫,০০০ পাউন্ডের বেশি পুরস্কার দেওয়া হয়。   

এফএ কর্তৃক গোপন রেপ্লিকা তৈরি এবং ১৯৯৭ সালের রেকর্ড মূল্যের ফিফা নিলাম

লন্ডনের চুরির ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অত্যন্ত গোপনে ব্রোঞ্জ দিয়ে একটি হুবহু রেপ্লিকা ট্রফি তৈরি করিয়েছিল, যাতে মূল ট্রফিটি আর কখনো প্রদর্শনীতে ব্যবহার করতে না হয়। ১৯৬৬ সালের ফাইনালে ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক ৪-২ গোলের জয়ের পর মাঠে খেলোয়াড়রা আসল ট্রফি দিয়ে উদযাপন করলেও ড্রেসিংরুমে গোপনে এই ব্রোঞ্জের রেপ্লিকাটি আসলটির সঙ্গে বদলে নেওয়া হয়। এই গোপনীয়তা এতটাই নিখুঁত ছিল যে ফিফা নিজেও এই কপির অস্তিত্ব সম্পর্কে অন্ধকারে ছিল। ১৯৯৭ সালে এই গোপন রেপ্লিকাটি লন্ডনের একটি নিলামে তোলা হলে ফিফা এটিকে আসল ট্রফি সন্দেহে ২,৫৪,৫০০ পাউন্ড দিয়ে কিনে নেয়, যা ছিল তার আসল মূল্যের প্রায় দশ গুণ বেশি। পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে এটি প্রকৃতপক্ষে ইংল্যান্ডের তৈরি সেই ব্রোঞ্জের রেপ্লিকাই ছিল।   

চুরির পর্যায় সংঘটিত ঘটনা প্রধান চরিত্র আইনি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
চুরির সূত্রপাত প্রদর্শনী হলের পেছনের দুর্বল কাঠের দরজা ও তালা ভেঙে ট্রফি চুরি অজ্ঞাত চোরচক্র ব্রিটিশ ক্রীড়া জগতের চরম নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা
মুক্তিপণ পর্যায় ১৫,০০০ পাউন্ডের বেনামী মুক্তিপণ দাবি ও ট্রফি গলানোর হুমকি এডওয়ার্ড বেটশলি (দালাল) স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের দ্রুত ফাঁদ এবং ব্যাটারসি পার্ক থেকে বেটশলি গ্রেফতার
উদ্ধার পর্যায় ঝোপের নিচে খবরের কাগজে মোড়ানো অবস্থায় আকস্মিক সন্ধান লাভ পিকলস (বীর কুকুর) ও ডেভিড করবেট পিকলস রাতারাতি ব্রিটেনের জাতীয় বীরে পরিণত হয় এবং বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়
পরবর্তী সুরক্ষা প্রদর্শনীর নিরাপত্তার জন্য গোপনে হুবহু ব্রোঞ্জের ডুপ্লিকেট ট্রফি প্রস্তুত ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মূল ট্রফিটিকে গোপনে জুরিখে ফেরত পাঠিয়ে রেপ্লিকা দিয়ে সব কাজ চালানো হয়

৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে তিনটে বিশ্বকাপ

৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে তিনটে বিশ্বকাপ

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌতূহল এবং রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো তাদের গৌরবময় পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের পরেও কেন ক্যাবিনেটে কেবল তিনটি বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিলিপি বা সংস্করণ দেখা যায়। ১৯৭০ সালে পেলের হাত ধরে ব্রাজিল চিরদিনের জন্য জুলে রিমে ট্রফিটি নিজেদের করে নিয়েছিল, কিন্তু তারা সেই অমূল্য স্মৃতিচিহ্নটি চোরের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ১৯৮৩ সালের সেই কুখ্যাত রিও চুরির ঘটনা এবং পরবর্তী জয়ের ক্ষেত্রে ফিফার নতুন ট্রফি নীতির কারণেই আজ ৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে তিনটে বিশ্বকাপ সেই দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।   

১৯৮৩ সালের ১৯ ডিসেম্বরের কালো রাত এবং রুয়া দা আলফান্দেগা কার্যালয়ে হানা

১৯৮৩ সালের ১৯শে ডিসেম্বর মধ্যরাতে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর রুয়া দা আলফান্দেগায় অবস্থিত ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) সদর দপ্তরে এক কুখ্যাত ডাকাতি সংঘটিত হয়। সিবিএফ ভবনে জুলে রিমে ট্রফিটি ৯ তলায় একটি বুলেটপ্রুফ কাচের আলমারিতে প্রদর্শনীর জন্য রাখা ছিল। কিন্তু এই ক্যাবিনেটের একটি মারাত্মক ত্রুটি ছিল—এর সামনের অংশটি বুলেটপ্রুফ কাচ দিয়ে তৈরি হলেও পেছনের অংশটি ছিল সাধারণ পাতলা কাঠের ফ্রেম দ্বারা যুক্ত। চোরেরা রাতে ভবনের একমাত্র বৃদ্ধ নাইটওয়াচম্যান জোয়াও বাতিস্তাকে মারধর করে হাত-পা বেঁধে ফেলে এবং একটি সাধারণ সাবল বা ক্রাবার ব্যবহার করে সহজেই কাঠের ফ্রেমটি ভেঙে ফেলে। তারা জুলে রিমে ট্রফির পাশাপাশি ইকুইতাভিতা এবং হুরিতো নামের আরও দুটি মূল্যবান ট্রফি নিয়ে চম্পট দেয়।   

চুরির প্রধান হোতা সার্জিও পেরালতা এবং সহযোগীদের পৈশাচিক অভিযান

এই চাঞ্চল্যকর চুরির মাস্টারমাইন্ড ছিলেন সার্জিও পেরালতা নামের এক ব্যাংকার এবং ফুটবল ক্লাবের অনিয়মিত এজেন্ট, যিনি সিবিএফ ভবনের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েছিলেন。 তিনি এই কাজ সম্পন্ন করতে প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা ফ্রান্সিসকো রিভেইরা (চিকো বারবুদো) এবং পেশাদার ডেকোরেটর হোসে লুই ভিয়েরা (লুই বিগোদ)-কে ভাড়া করেন। পেরালতা প্রথমে আন্তোনিও সেত্তা নামের এক বিখ্যাত সেফক্র্যাকারকে এই কাজে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেত্তা নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবি করে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ ১৯৭০ সালে ব্রাজিল যখন বিশ্বকাপ জয় করে তখন তার ভাই আনন্দে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গিয়েছিলেন, তাই তিনি দেশের অমূল্য ট্রফি চুরির অংশ হতে চাননি।   

অপরাধীচক্রের পরিণতি: রহস্যময় মৃত্যু, কারাবাস ও পলায়ন

চুরির পর ব্রাজিলের পুলিশ প্রশাসন নজিরবিহীন তদন্ত শুরু করে এবং অবশেষে পেরালতা ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে। কিন্তু এই ট্র্যাজেডির পর অপরাধীদের জীবন এক রহস্যময় এবং করুণ পরিণতির দিকে ধাবিত হয়। ১৯৮৯ সালে অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজন চিকো বারবুদোকে রিও ডি জেনেইরোর এক বারে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা ৭টি গুলি করে হত্যা করে। মূল সাক্ষী আন্তোনিও সেত্তা ১৯৮৫ সালে আদালতে জবানবন্দী দেওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগে এক রহস্যময় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। মূল পরিকল্পনাকারী সার্জিও পেরালতা কারাগারে সাজা খাটার পর ১৯৯৮ সালে মুক্তি পান এবং ২০০৩ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চুরির পর অভিযুক্তরা আদালতের রায় ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ সময় পলাতক থাকায় ব্রাজিলের আইনি ব্যবস্থা চরম সমালোচনার মুখে পড়েছিল।   

জুলে রিমে ট্রফি গলানোর অপবাদ এবং হুয়ান কার্লোস হার্নান্দেজের ভূমিকা

তদন্তে নেমে ব্রাজিলের পুলিশ দাবি করে যে, চুরির পরপরই ট্রফিটি হুয়ান কার্লোস হার্নান্দেজ নামের এক কুখ্যাত আর্জেন্টিনীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। হার্নান্দেজ তার রিও ডি জেনেইরোর গোপন কারখানায় ট্রফিটি গলিয়ে সোনার বারে রূপান্তর করে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। যদিও হার্নান্দেজ আদালতে এই দাবি কঠোরভাবে অস্বীকার করেন এবং তার কারখানার ছাই পরীক্ষা করে ট্রফির উপাদানের সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া যায়নি, তবুও পুলিশ তাকে চুরির মালামাল গ্রহণের দায়ে সাজা দেয়। অনেক ধাতব বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জুলে রিমে ট্রফিটি নিরেট সোনার ছিল না, বরং সোনা দিয়ে মোড়ানো স্টার্লিং সিলভারের তৈরি ছিল, তাই এটিকে গলিয়ে সোনার বার বানানো অসম্ভব। ফলে ট্রফিটি গলিয়ে ফেলার কাহিনীটি হয়তো বানোয়াট ছিল এবং ট্রফিটি হয়তো কোনো গোপন সংগ্রাহকের বেজমেন্টে আজো টিকে রয়েছে।   

অপরাধী ও চরিত্রের নাম চুরির ঘটনায় ভূমিকা আইনি সাজা ও রায় মৃত্যুর বিবরণ ও পরকাল
সার্জিও পেরালতা চুরির মূল পরিকল্পনাকারী এবং নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিতকারী ৯ বছরের কারাদণ্ড হয়, দীর্ঘ সময় পলাতক থাকার পর গ্রেফতার ২০০৩ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান
ফ্রান্সিসকো রিভেইরা (চিকো বারবুদো) সরাসরি ক্যাবিনেট ভেঙে ট্রফি চুরিতে অংশ নেওয়া সাবেক পুলিশ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দীর্ঘ সাজা পান ১৯৮৯ সালে আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন
হোসে লুই ভিয়েরা (লুই বিগোদ) সরাসরি ক্যাবিনেট ভেঙে ট্রফি চুরিতে অংশ নেওয়া ডেকোরেটর কারাদণ্ড হয়, পরে ১৯৯৮ সালে কারামুক্তি লাভ করেন বর্তমানে লোকচক্ষুর অন্তরালে জীবনযাপন করছেন
হুয়ান কার্লোস হার্নান্দেজ ট্রফি কিনে গলিয়ে সোনার বার বানানোর প্রধান সন্দেহভাজন চোরাই মাল গ্রহণের দায়ে সাজা পেলেও পরে ফ্রান্সে পালিয়ে যান ১৯৯৮ সালে মাদক পাচারের দায়ে পুনরায় গ্রেফতার হন

সিলভিও গাজ্জানিগার আধুনিক ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি এবং ফিফার নতুন নীতি

১৯৭০ সালে জুলে রিমে ট্রফি চিরতরে ব্রাজিলের ক্যাবিনেটে চলে যাওয়ার পর ফিফাকে সম্পূর্ণ নতুন একটি ট্রফির নকশা তৈরি করতে হয়েছিল। নতুন যুগের এই ট্রফিটি কেবল আকৃতিতেই ভিন্ন ছিল না, বরং এর সুরক্ষায় ফিফা এমন কিছু বৈপ্লবিক নিয়ম ও আইনি কাঠামো চালু করেছিল যা বিশ্ব ফুটবলকে চিরতরে বদলে দেয়। এই কঠোর প্রবিধানের কারণেই ৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে তিনটে বিশ্বকাপ তার মূল প্রশাসনিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

নতুন ট্রফির রূপান্তর: ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার শিল্পকর্ম ও এর গূঢ় অর্থ

১৯৭১ সালে ফিফা একটি নতুন ট্রফি তৈরির জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে মিলানের বিখ্যাত ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার নকশাটি জয়ী হয়। গাজ্জানিগা এই ট্রফিটিকে এমন এক অনন্য শৈল্পিক রূপ দিয়েছিলেন যা পূর্ববর্তী জ্যামিতিক ট্রফিগুলোর চেয়ে একেবারেই আলাদা ছিল। নিরেট ১৮-ক্যারট সোনা দিয়ে তৈরি ৩৬.৮ সেন্টিমিটার উচ্চতার এই ট্রফিটি মূলত দুই জন মানব ক্রীড়াবিদের প্রতিমূর্তি, যারা কঠোর পরিশ্রমের পর পরম উল্লাসে সমগ্র পৃথিবীকে নিজেদের কাঁধে তুলে ধরে রেখেছে। গাজ্জানিগা এটিকে শক্তির গতিশীলতা এবং বিজয়ের আনন্দ উদযাপনের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যার গোড়ার দিকে সবুজ রঙের মেলাকাইট পাথরের দুটি স্তর রয়েছে যা দেখতে সবুজ ফুটবল মাঠের মতো লাগে।   

চিরস্থায়ী স্বত্ব বাতিলের আইনি প্রবিধান ও গোল্ড-প্লেটেড রেপ্লিকা নীতি

নতুন “ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি” প্রবর্তনের সময় ফিফা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের নিয়মে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ যতবারই বিশ্বকাপ জয় করুক না কেন, তারা কখনোই আসল সোনালী ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের ঘরে নিয়ে যেতে পারবে না। ফাইনালের পর মূল ট্রফিটি বিজয়ী দলের হাতে শুধুমাত্র উদযাপনের সময় কয়েক মিনিটের জন্য তুলে দেওয়া হয় এবং দলের ছবি তোলার পরপরই তা ফিফার অফিশিয়ালদের কাছে ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়। পরিবর্তে বিজয়ী দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে ব্রোঞ্জের ওপর সোনা দিয়ে নিখুঁতভাবে মোড়ানো একটি অফিশিয়াল রেপ্লিকা ট্রফি স্থায়ীভাবে রাখার জন্য দেওয়া হয়, যা জুরিখের মূল ট্রফিটির চেয়ে আকৃতি ও ওজনে সামান্য হালকা হয়।   

২০১৫ সালে ফিফা আর্কাইভে জুলে রিমে ট্রফির মূল বেসের পুনরাবিষ্কার

ব্রাজিল থেকে জুলে রিমে ট্রফিটি চুরি যাওয়ার পর বছরের পর বছর ধরে নানা গবেষণা হলেও ২০১৫ সালে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদর দপ্তরের বেসমেন্টে এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কার হয়। সেখানে বহু বছর ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা আসল জুলে রিমে ট্রফির সেই নীল রঙের ল্যাপিস লাজুলি বেস বা ভিত্তিটি উদ্ধার করা হয়。 প্রকৃতপক্ষে, ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের আগে ট্রফিতে আরও বেশি বিজয়ী দেশের নাম খোদাই করার জন্য আগের চার-পার্শ্বের বেসটি বদলে একটি নতুন অষ্টকোণী বেস লাগানো হয়েছিল এবং পুরনো মূল বেসটি ফিফার আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হয়েছিল যা পরবর্তীতে হারিয়ে গিয়েছিল। এটিই এখন পর্যন্ত জুলে রিমে ট্রফির একমাত্র আসল অংশ যা অক্ষত অবস্থায় ফিফা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।   

ইস্টম্যান কোডাকের ১.৮ কেজি সোনার রেপ্লিকা এবং সিবিএফ জাদুঘরের বর্তমান চিত্র

১৯৮৩ সালের চুরির চরম অপমানের পর, ১৯৮৪ সালে সিবিএফ তাদের ঐতিহাসিক স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য বিখ্যাত ক্যামেরা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইস্টম্যান কোডাককে দিয়ে হুবহু একটি জুলে রিমে ট্রফির রেপ্লিকা তৈরি করায়। এই রেপ্লিকাটি তৈরিতে ১.৮ কিলোগ্রাম খাঁটি সোনা ব্যবহার করা হয়েছিল, যা তৎকালীন ব্রাজিলের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট জোয়াও ফিগেইরেদোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে রিও ডি জেনেইরোর সিবিএফ মিউজিয়ামে গেলে দর্শনার্থীরা এই ইস্টম্যান কোডাকের তৈরি জুলে রিমের রেপ্লিকা এবং ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের জয়ের পর ফিফা থেকে প্রাপ্ত দুটি অফিশিয়াল রেপ্লিকাই দেখতে পান। অর্থাৎ, ব্রাজিলের ঘরে প্রদর্শনীর জন্য রাখা ট্রফিগুলোর মধ্যে তিনটিই আসলে রেপ্লিকা এবং মূল জুলে রিমে ট্রফিটি চিরতরে হারিয়ে গেছে।   

ট্রফির বিবরণী জুলে রিমে ট্রফি (Jules Rimet) আধুনিক ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি
প্রস্তুতকারক ভাস্কর আবেল লাফ্লুর (ফ্রান্স) সিলভিও গাজ্জানিগা (ইতালি)
নকশার ধরন গ্রিক জয়ের দেবী নিকে কাপটি মাথায় ধরে আছেন দুজন ক্রীড়াবিদ কাঁধে করে পৃথিবীকে তুলে ধরেছেন
ধাতু ও ওজন ৩.৮ কিলোগ্রাম ওজনের সোনা দিয়ে মোড়ানো সিলভার ৬.১৭ কিলোগ্রাম ওজনের ১৮-ক্যারট নিরেট সোনা
আইনি বণ্টন নীতি ৩ বার জয়ী দেশকে স্থায়ীভাবে চিরকালের জন্য প্রদান কখনোই স্থায়ীভাবে দেওয়া হয় না, রেপ্লিকা দেওয়া হয়
বর্তমান অবস্থান ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলে চুরি যাওয়ার পর চিরতরে নিখোঁজ জুরিখের ফিফা সদর দপ্তরের বিশেষ স্ট্রংরুমে সংরক্ষিত

ব্রাজিলের আধুনিক ট্রফি খরা, ইউরোপীয় অভিশাপ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের ব্যর্থতা

২০০২ সালে এশিয়ার মাটিতে রোনালদোর জাদুতে পঞ্চম শিরোপা জয়ের পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে এক দীর্ঘ বসন্তের অবসান ঘটেছিল। এরপর থেকে বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ক্রমাগত নিম্নগামী হয়েছে, যা তাদের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম ট্রফি খরা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত ২৮ বছর ধরে তারা আর কোনো বিশ্বকাপের ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি, যা তাদের সমর্থকদের চরম হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। এই দীর্ঘ ট্রফি খরা কাটিয়ে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে আবারও তাদের হেক্সা বা ষষ্ঠ ট্রফি জয়ের মিশনে নামতে হবে।   

২০০২ সালের ইয়োকোহামা বিজয়ের পর দীর্ঘ ট্রফি খরা ও ইউরোপীয় প্রাচীর

২০০২ সালের পর অনুষ্ঠিত প্রতিটি বিশ্বকাপেই ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে নকআউট পর্বে ইউরোপীয় দলগুলোর কাছে হেরে। ২০০৬ সালে ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটেছিল ২০১৪ সালে স্বাগতিক হিসেবে, যখন সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ঐতিহাসিক ৭-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয় তারা। এরপর ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ এবং ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় সেলেসাওরা। ইউরোপীয় দলগুলোর এই ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্ব ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির দুর্বলতাগুলোকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।   

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কার্লো আনচেলত্তির কৌশলগত ভুল এবং নরওয়ের কাছে ট্র্যাজিক বিদায়

২০২৬ সালের বিশ্বকাপে নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের হেক্সা মিশন চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, যখন তারা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। এই ম্যাচে আনচেলত্তির লাইনআপে বেশ কিছু মারাত্মক ভুল ছিল; ইনজুরিতে আক্রান্ত লুকাস পাকেতার জায়গায় ক্রিয়েটিভ রোলে অভিজ্ঞ নেইমারকে না নামিয়ে তিনি গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে খেলান, যিনি পুরো ম্যাচে মাত্র ২০টি সফল পাস দিতে পেরেছিলেন। প্রথমার্ধে দলের প্রধান খেলোয়াড়দের থাকতে ব্রুনো গুইমারেসের মতো রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারকে পেনাল্টি শট নিতে পাঠানো হয়, যার মন্থর ও দুর্বল রান-আপের কারণে নরওয়ের গোলরক্ষক সহজে বলটি সেভ করেন।

দ্বিতীয়ার্ধে গুইমারেসকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার পর ব্রাজিলের মিডফিল্ডে নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং নরওয়ের আরলিং হাল্যান্ডের জোড়া গোলের কারণে ব্রাজিল টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়, যেখানে এন্ড্রিক একটি অত্যন্ত সহজ ওপেন চান্স মিস করেছিলেন।   

জোগো বনিতো ঘরানার অবক্ষয় এবং ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির রূপান্তর

ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের এই ঐতিহাসিক পতনের পেছনে কেবল মাঠের কৌশল নয়, বরং তাদের গভীর সামাজিক ও মানসিক রূপান্তর দায়ী। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্যময় ফুটবল বা ‘জোগো বনিতো’র ধারাটি আধুনিক খেলোয়াড়দের ইউরোপীয় ঘরানার যান্ত্রিক ফুটবলের অনুকরণের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে。 একসময় ব্রাজিলের প্রতিটি অলিতে-গলিতে ফুটবল ছিল জীবন ও আবেগ, কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ অনেক বেশি ডিজিটাল গেমস এবং অন্যান্য বিনোদনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাছাড়া, ঘরোয়া ফুটবল অবকাঠামোর দুর্বলতার কারণে তরুণ খেলোয়াড়রা অতি অল্প বয়সেই ইউরোপের ক্লাবগুলোতে চলে যাচ্ছেন, যার ফলে জাতীয় দলের জার্সির প্রতি তাদের আবেগ ও উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা অনেকটাই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।   

বিশ্বকাপ বছর বিদায়ের পর্যায় বিজয়ী প্রতিপক্ষ দেশ ম্যাচের চূড়ান্ত স্কোর ব্রাজিলের ঐতিহাসিক ট্রফি খরা (বছর)
২০০৬ কোয়ার্টার ফাইনাল ফ্রান্স ০–১ ৪ বছর
২০১০ কোয়ার্টার ফাইনাল নেদারল্যান্ডস ১–২ ৮ বছর
২০১৪ সেমিফাইনাল জার্মানি ১–৭ ১২ বছর
২০১৮ কোয়ার্টার ফাইনাল বেলজিয়াম ১–২ ১৬ বছর
২০২২ কোয়ার্টার ফাইনাল ক্রোয়েশিয়া ১–১ (পেনাল্টি: ৪–২) ২০ বছর
২০২৬ রাউন্ড অব ১৬ নরওয়ে ১–২ ২৪ বছর

শেষ কথা

ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে ব্রাজিলের পাঁচটি সোনালী তারকার প্রতিটিই এক একটি অনন্য বীরত্বগাথার প্রতীক হলেও তাদের ট্রফি ক্যাবিনেটের শূন্যতা এক চিরস্থায়ী বেদনার গল্প শোনায়। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ৫ বার বিশ্বকাপ জিতেও কেন ব্রাজিলের ঘরে তিনটে বিশ্বকাপ তার মূল কারণ হলো ১৯৮৩ সালের সেই অভিশপ্ত রিও চুরি, যেখানে তাদের স্থায়ীভাবে পাওয়া আসল জুলে রিমে ট্রফিটি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। চোরের দল দেশের অমূল্য সম্পদকে গলিয়ে সামান্য টাকার স্বর্ণের বারে রূপান্তর করে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধটি করেছিল।

পরবর্তীতে ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালের জয়ের ক্ষেত্রে ফিফার পরিবর্তিত কঠোর নিয়মের কারণে তারা কেবল গোল্ড-প্লেটেড ব্রোঞ্জের রেপ্লিকা ট্রফি লাভ করেছিল, যা আসল ট্রফি স্থায়ীভাবে হস্তান্তরের পথ বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে সিবিএফ মিউজিয়ামে শোভা পাওয়া ইস্টম্যান কোডাকের তৈরি জুলে রিমের রেপ্লিকা এবং পরবর্তী দুটি জয়ের অফিশিয়াল রেপ্লিকাই প্রমাণ করে যে ব্রাজিলের সোনালী ইতিহাসের বাস্তব রূপটি আজ কেবল স্মৃতির পাতায় আর ধাতুর নিখুঁত অনুকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিলের পাঁচটি জয়ের মাহাত্ম্য কোনো ধাতব ট্রফির চেয়ে অনেক বেশি দীপ্তিময় এবং ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তা চিরকাল অক্ষুণ্ন থাকবে।  

সর্বশেষ