দুর্গাপূজা ২০২৬: ঢাকের শব্দে যে উৎসব আমারও হয়ে উঠেছিল

সর্বাধিক আলোচিত

আমি মুসলিম পরিবারে বড় হয়েছি। ছোটবেলায় আমার পাড়ায়, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে, স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিল মুসলিম। দুর্গাপূজা তখন আমার কাছে ছিল দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ আর পত্রিকার পাতায় প্রতিমার ছবি। কাছে গিয়ে দেখার সুযোগ হয়নি।

সেটা বদলে গেল কলেজে উঠে। বন্ধু অতনু প্রথম আমাকে পূজায় ডেকেছিল। প্রথমবার মণ্ডপে ঢোকার আগে একটু দ্বিধা ছিল। ঠিক কী করতে হয়, কোথায় দাঁড়াতে হয়, কিছুই জানতাম না। বন্ধু হেসে বলেছিল, “কিছু করতে হবে না। শুধু আয়, দেখ, খা।” সেই থেকে কলেজ আর ভার্সিটি মিলিয়ে বেশ কয়েকবার বন্ধুদের সঙ্গে পূজা দেখেছি। এবারের দুর্গাপূজা ২০২৬ সামনে রেখে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই লেখা।

এখানে থাকছে বাংলাদেশ আর ভারতে পূজার তারিখ, ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিনের রীতি, পূজার খাবার, আর একজন ভিন্ন ধর্মের মানুষ হিসেবে আমার দেখা সম্প্রীতির গল্প।

দুর্গাপূজা ২০২৬ কবে: বাংলাদেশ ও ভারতের তারিখ

দুর্গাপূজা ২০২৬ তারিখ

এ বছর মহালয়া ছিল ১০ অক্টোবর, শনিবার। বাংলাদেশে মহাষষ্ঠী শুক্রবার ১৬ অক্টোবর। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি তালিকা অনুযায়ী মহাষষ্ঠী একদিন পরে, শনিবার ১৭ অক্টোবর। দুই দেশ আলাদা পঞ্জিকা মানে বলে এই একদিনের তফাত। সপ্তমী থেকে দশমী দুই দেশেই একই দিনে।

দিন বাংলাদেশ ভারত (পশ্চিমবঙ্গ)
মহাষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার ১৭ অক্টোবর, শনিবার
মহাসপ্তমী ১৮ অক্টোবর, রবিবার ১৮ অক্টোবর, রবিবার
মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর, সোমবার ১৯ অক্টোবর, সোমবার
মহানবমী ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার
বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর, বুধবার ২১ অক্টোবর, বুধবার

বাংলাদেশে ঢাকার সময় অনুযায়ী সন্ধিপূজা হবে ১৯ অক্টোবর, সোমবার, মোটামুটি সকাল ১০টা ৫৮ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত। জেলাভেদে কয়েক মিনিট এদিক সেদিক হতে পারে।

ছুটির হিসাবও জেনে রাখা ভালো। বাংলাদেশে বিজয়া দশমী (২১ অক্টোবর) সাধারণ ছুটি। সরকার নির্বাহী আদেশে নবমী (২০ অক্টোবর) আর ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবারও ছুটি দিয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর টানা পাঁচ দিনের ছুটি। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি অফিস চতুর্থী থেকেই বন্ধ, চলবে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত।

এবার বাংলাদেশে সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজা হচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় দেড় হাজার বেশি।

ষষ্ঠী: দেবীর বোধন, উৎসবের দরজা খোলা

দুর্গাপূজা ২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক শুরু ষষ্ঠীতে। সন্ধ্যায় বেলগাছের নিচে দেবীর বোধন হয়, মানে দেবীকে জাগানো। এরপর আমন্ত্রণ আর অধিবাস। অনেক মণ্ডপে এদিনই প্রতিমার মুখের আবরণ খোলা হয়। মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় ষষ্ঠীর ব্রত রাখেন। সেদিন অনেকে ভাত খান না, লুচি বা ফলমূল খান।

বাংলাদেশে ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকেই মণ্ডপে ভিড় শুরু হয়। ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন আর পুরান ঢাকার মণ্ডপগুলোতে মানুষের ঢল নামে।

কলকাতায় আসলে ভিড় শুরু হয় ষষ্ঠীর আগেই। থিম প্যান্ডেল দেখতে মানুষ চতুর্থী, পঞ্চমী থেকেই রাস্তায় নামে। এবার ১৭ থেকে ২০ অক্টোবর কলকাতা মেট্রো রাত চারটা পর্যন্ত চলবে, যাতে সারা রাত প্যান্ডেল ঘোরা যায়।

আমার প্রথম পূজা দেখা ছিল এক ষষ্ঠীর সন্ধ্যায়। মণ্ডপে ঢোকার আগে বন্ধু বলেছিল জুতা খুলে রাখতে। ভেতরে ঢুকে প্রথম যেটা চোখে পড়ল তা হলো আলো। হাজার হাজার বাতি, রঙিন কাপড়ের প্যান্ডেল, আর মাঝখানে দশ হাতের প্রতিমা। পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক। প্রতিমার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ধর্মবিশ্বাস আলাদা হলেও কারিগরের হাতের কাজ দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।

সপ্তমী: কলাবউ স্নান আর মূল পূজার শুরু

সপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকা স্নান হয়। নয়টি গাছের চারা একসঙ্গে বেঁধে কলাগাছের মতো সাজানো হয়, তাকে বলে কলাবউ। ঢাক বাজিয়ে তাকে নদী বা পুকুরে স্নান করিয়ে এনে লাল পাড়ের শাড়ি পরিয়ে গণেশের পাশে রাখা হয়। এরপর প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা আর মূল পূজা শুরু।

কলকাতায় কলাবউ স্নান হয় গঙ্গার ঘাটে। ভোরবেলা ঘাটে ঘাটে ঢাকির দল আর পুরোহিতের ভিড় দেখার মতো।

বাংলাদেশে মণ্ডপের কাছের নদী, পুকুর বা দিঘিতে এই স্নান হয়। গ্রামে এটা আরও বড় আয়োজন। পুরো পাড়া ভোরে উঠে ঘাটে যায়।

সপ্তমী থেকে মণ্ডপে ভোগ রান্না শুরু হয়। আমি প্রথম ভোগের খিচুড়ির ঘ্রাণ পেয়েছিলাম এক সপ্তমীর দুপুরে। বিশাল হাঁড়িতে খিচুড়ি, পাশে লাবড়া, বেগুনভাজা, টমেটোর চাটনি আর পায়েস। কলাপাতায় পরিবেশন। প্রসাদ নিয়ে প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস থাকে, আর আমার বন্ধুরা কখনো কিছু নিয়ে জোর করেনি। তারা বরং খেয়াল রাখত আমি স্বচ্ছন্দ আছি কিনা। মণ্ডপের বাইরের মেলায় ফুচকা, চটপটি, জিলাপি আর মুড়ি মুড়কি তো সবার জন্যই।

অষ্টমী: অঞ্জলি, কুমারী পূজা আর সন্ধিপূজা

অষ্টমী পূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। সকালে নতুন জামা পরে সবাই পুষ্পাঞ্জলি দেয়। অনেকে অঞ্জলি দেওয়ার আগ পর্যন্ত কিছু খান না। পুরোহিত মন্ত্র পড়েন, সবাই হাতে ফুল নিয়ে তিনবার অঞ্জলি দেন।

এদিন হয় কুমারী পূজা। ছোট একটি মেয়েকে দেবীর রূপ মনে করে পূজা করা হয়। ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে আর কলকাতার কাছে বেলুড় মঠে কুমারী পূজা দেখতে প্রতি বছর হাজার মানুষ আসে।

অষ্টমী শেষ হয়ে নবমী শুরুর ঠিক সন্ধিক্ষণে হয় সন্ধিপূজা। ৪৮ মিনিটের এই পূজায় জ্বালানো হয় ১০৮টি প্রদীপ, দেওয়া হয় ১০৮টি পদ্মফুল।

অষ্টমীর দিন বেশির ভাগ বাড়িতে নিরামিষ খাবার। লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম, পোলাও, আর শেষে মিষ্টি।

অষ্টমীর সন্ধ্যায় আমি প্রথম ধুনুচি নাচ দেখেছিলাম। ঢাকের তালে তালে নারকেলের ছোবড়া আর ধুনো জ্বালানো মাটির পাত্র হাতে নাচ। ধোঁয়ায় মণ্ডপ ঝাপসা, ঢাকের শব্দে বুক কাঁপে। আমার এক বন্ধু আমার হাতেও একবার ধুনুচি ধরিয়ে দিয়েছিল। নাচ পারিনি, সবাই হেসেছিল, আমিও হেসেছিলাম। ওই হাসিটাই আমার কাছে সম্প্রীতির সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞা।

নবমী: শেষ রাতের ভিড় আর মাংসের ঘ্রাণ

নবমীতে হয় হোম বা যজ্ঞ। আগুনে ঘি আর বেলপাতা দিয়ে পূজা শেষ করা হয়। নবমী মানে পূজার শেষ পুরো দিন, তাই মানুষ এদিন সবচেয়ে বেশি ঘোরে।

কলকাতায় নবমীর রাত মানে প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে হাঁটা। ভোর পর্যন্ত রাস্তায় মানুষ।

বাংলাদেশে নবমী এবার সরকারি ছুটি, তাই মণ্ডপে ভিড় আরও বাড়বে। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার আর তাঁতীবাজারের সরু গলিতে এ রাতে হাঁটাই কঠিন হয়ে যায়।

খাবারের দিক থেকে নবমী একটু আলাদা। দুই বাংলার অনেক বাড়িতে এদিন মাংস রান্না হয়। কষা মাংস আর গরম ভাত, অনেকের কাছে এটাই নবমীর আসল স্বাদ। বন্ধুর বাসায় নবমীর দুপুরে খেতে বসে বুঝেছিলাম, খাবারের টেবিলে কেউ কারো ধর্ম জিজ্ঞেস করে না। শুধু জিজ্ঞেস করে, “আরেকটু দিই?”

দুর্গাপূজা রীতি ও খাবার

দশমী: সিঁদুর খেলা, বিসর্জন আর বিজয়ার কোলাকুলি

দশমীর সকালে দর্পণ বিসর্জন হয়। আয়নায় দেবীর প্রতিবিম্ব দেখে বিদায় জানানো হয়। এরপর দেবীবরণ। বিবাহিত নারীরা প্রতিমাকে মিষ্টি খাইয়ে, সিঁদুর পরিয়ে বিদায় দেন। তারপর শুরু হয় সিঁদুর খেলা। একে অন্যের কপালে আর গালে সিঁদুর মাখিয়ে দেন।

বিকেলে ঢাক বাজিয়ে, গান গেয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় নদীতে বিসর্জনে। ঢাকায় বুড়িগঙ্গার তীরে, কলকাতায় গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে। এবার কলকাতায় বিসর্জনের শোভাযাত্রায় ডিজে আর ক্রেন ব্যবহার নিষেধ করা হয়েছে, আর রেড রোডে দশমীর পরের কার্নিভালও হচ্ছে না।

বিসর্জনের পর শুরু বিজয়া। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে। বাড়িতে বাড়িতে নারকেল নাড়ু, নিমকি, ঘুগনি, রসগোল্লা আর সন্দেশ। বিজয়ার দিন বন্ধুর মা আমার হাতে নাড়ুর বাটি দিয়ে বলেছিলেন, “তুমিও তো আমাদের ছেলে।” সেই কথাটা এখনো মনে আছে।

দশমীর সন্ধ্যায় একটা মন খারাপ ভাব থাকে। ঢাকিরা শেষবার ঢাক বাজায়, সবাই বলে, “আসছে বছর আবার হবে।” আমিও বলি।

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার

বাংলাদেশে প্রতি বছর পূজার সময় একটা কথা বারবার শোনা যায়: ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। কথাটা শুনতে সহজ, কিন্তু মানতে গেলে দুই দিক থেকেই চেষ্টা লাগে।

যারা পূজা করেন, তারা দরজা খোলা রাখেন। আমার বন্ধুরা কোনোদিন আমাকে অতিথির মতো দূরে দাঁড় করিয়ে রাখেনি। আর যারা দেখতে যাই, আমাদের দায়িত্ব সম্মান রাখা। আমি কয়েকটা জিনিস শিখেছি:

  • মণ্ডপের মূল অংশে জুতা খুলে ঢুকতে হয়।
  • প্রতিমা বা পূজার জিনিস ছোঁয়া যাবে না।
  • পূজা চলার সময় শব্দ করে কথা বলা বা ভিড়ে ধাক্কাধাক্কি করা ঠিক নয়।
  • কারো ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া ভালো, বিশেষ করে অঞ্জলি বা সিঁদুর খেলার সময়।
  • প্রসাদ নেওয়া না নেওয়া নিজের বিশ্বাসের ব্যাপার। নম্রভাবে না বললে কেউ মন খারাপ করে না।

ইউনেস্কো ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজাকে মানবজাতির অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় তুলেছে। কিন্তু আমার কাছে এই উৎসবের আসল ঐতিহ্য তালিকায় নেই। সেটা আছে বন্ধুর মায়ের নাড়ুর বাটিতে, ধুনুচি হাতে আমার ব্যর্থ নাচে, আর ভোগের লাইনে পাশাপাশি দাঁড়ানো নানা ধর্মের মানুষের মুখে।

শেষ কথা

দুর্গাপূজা ২০২৬ শুরু হচ্ছে বাংলাদেশে ১৬ অক্টোবর আর পশ্চিমবঙ্গে ১৭ অক্টোবর। শেষ হবে দুই দেশেই ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে। এই কয়টা দিন যদি আপনার কোনো হিন্দু বন্ধু থাকে, তার বাসায় একবার যান। মণ্ডপে একবার ঘুরে আসুন। বিশ্বাস বদলাতে হবে না, শুধু মনটা খোলা রাখলেই চলবে।

আমি মুসলিম হিসেবেই পূজায় গিয়েছি, মুসলিম হিসেবেই ফিরে এসেছি। মাঝখানে পেয়েছি কিছু বন্ধু, কিছু স্মৃতি আর একটা বিশ্বাস: পাশের মানুষের আনন্দে শরিক হতে পারলে সমাজটা একটু বেশি নিজের মনে হয়।

শুভ শারদীয়া।

সর্বশেষ