লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি: জাত কী, আর কে দিল আমাদের জাত?

সর্বাধিক আলোচিত

আজ ১৭ অক্টোবর, ২০২৬। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের দেহত্যাগের ১৩৬ বছর পূর্ণ হলো। আজ সকাল থেকেই সেখানে জড়ো হচ্ছেন বাউল, ফকির আর সাধারণ মানুষ। তিন দিনের উৎসবে তাঁরা গান গাইবেন, একসঙ্গে ভাত খাবেন, পাশাপাশি বসবেন। কেউ জিজ্ঞেস করবে না কে হিন্দু, কে মুসলমান। এই সহজ ছবিতেই লুকিয়ে আছে লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি: জাত কী, আর কে দিল আমাদের এই জাত?

শতবর্ষেরও বেশি আগে লালন গানে গানে এই প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি পরিষ্কার উত্তর পাননি। আমরাও পাইনি। আজও বাংলাদেশ আর দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষ সেই পরিচয়ের নামে একে অপরকে আঘাত করছে, যে পরিচয় নিয়ে লালন হেসেছিলেন।

যে মানুষ নিজের ধর্মের নাম বলেননি

লালন কোথায় জন্মেছিলেন, তাঁর বাবা মা কোন ধর্মের ছিলেন, তা কেউ নিশ্চিত করে জানে না। একটি প্রচলিত গল্প বলে, তিনি হিন্দু ঘরে জন্মেছিলেন। তীর্থযাত্রায় অসুস্থ হয়ে পড়লে এক মুসলমান পরিবার তাঁকে সেবা করে বাঁচিয়ে তোলে। অন্য গল্পে আছে অন্য কথা। লালন নিজে কখনো এ নিয়ে কিছু স্পষ্ট করেননি। কেউ জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতেন গানে।

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে

এটা প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া ছিল না। এটাই ছিল তাঁর উত্তর। যে জাত চোখে দেখা যায় না, হাতে ছোঁয়া যায় না, তা দিয়ে কেন দেয়াল তুলি? এ কারণেই লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, তা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। সৎ উত্তর দিলে আমাদের বিভেদগুলোকেই হাস্যকর মনে হয়।

১৮৮৯ সালে, মৃত্যুর এক বছর আগে, পদ্মার বুকে এক বজরায় বসে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের ছবি আঁকেন। জীবিত অবস্থায় আঁকা লালনের এটিই একমাত্র ছবি। ছবিটা ভালো করে দেখুন। দেখবেন এক রোগা, শান্ত বৃদ্ধকে। হিন্দু বা মুসলমান দেখবেন না। দেখবেন একজন মানুষকে।

লালনের জীবন নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের লেখা লালন শাহ: কুষ্টিয়ার বাউল সাধক।

"জাত গেল জাত গেল বলে": যে গান আজও বেঁধে

“জাত গেল জাত গেল বলে”: যে গান আজও বেঁধে

লালনের সবচেয়ে ধারালো গানগুলোর একটি শুরু হয় জাত হারানোর হইচই দিয়ে।

জাত গেল জাত গেল বলে এ কী আজব কারখানা

লালন শব্দ বেছেছেন “কারখানা”। কারখানায় জিনিস তৈরি হয়। লালন বলছেন, জাত মানুষের তৈরি, সৃষ্টিকর্তার নয়। মানুষ নিজেই এটা গড়ে, আবার ভাঙলে নিজেই আতঙ্কে চিৎকার করে।

আরেক গানে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়েছেন। ধর্ম প্রমাণের চিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়েছেন। সুন্নত দেখে মুসলমান পুরুষ চেনা যায়। পৈতা দেখে ব্রাহ্মণ পুরুষ চেনা যায়। তারপর তিনি এমন এক প্রশ্ন করেন, যা ষষ্ঠ শ্রেণির শিশুও বুঝবে।

সুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীলোকের কী হয় বিধান বামন চিনি পৈতা প্রমাণ, বামনী চিনি কী ধরে

যে নিয়ম অর্ধেক মানুষকেই ধরতে পারে না, তা আকাশের আইন নয়। তা মানুষের অভ্যাস। লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, সেটি এত বেঁধে কারণ প্রশ্নটা খুব সহজ, অথচ আমাদের অজুহাতগুলো জটিল।

১৩৬ বছর পরেও ফিরে এসেছে পুরোনো লড়াই

এ বছর ছেঁউড়িয়ায় রং করা, মঞ্চ বানানো আর দোকান বসানোর কাজ সময়মতো শেষ হয়েছে। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেছেন, এই দিন দেশের লোকসংস্কৃতি, মানবতা আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন। তিনি এও জানিয়েছেন, উৎসব নিরাপদ রাখতে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।

শেষ কথাটাই অনেক কিছু বলে দেয়। গানের উৎসবে নিরাপত্তা পরিকল্পনা লাগার কথা নয়। কিন্তু গত দুই বছরের ঘটনা বলে দেয় কেন লাগছে।

  • ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশজুড়ে বহু মাজার, দরবার শরিফ আর বাউল আখড়ায় হামলা হয়েছে। অনেক ভক্ত সাংবাদিকদের বলেছেন, ভয়ে তাঁরা যাওয়া বন্ধ করেছেন।
  • ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ, তাঁর পালাগানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। তিন দিন পর তাঁর মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে হামলা হয়। মার খাওয়ার ভয়ে কয়েকজন পুকুরে নেমে পালান।
  • ২০২৬ সালের মার্চে সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারের কাছে বাউল আসরে শতাধিক লোক হামলা চালায়। তারা বাদ্যযন্ত্র আর সাউন্ড সিস্টেম ভাঙে এবং আর কখনো এমন আসর না করার হুমকি দেয়।
  • ২০২৬ সালের ১৫ মে ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী মাজারে সাপ্তাহিক ওরসের সময় লাঠি হাতে হামলা হয়। কয়েকজন ভক্ত আহত হন।

প্রত্যেক হামলাকারী ভাবে, সে লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, তার মীমাংসা করে ফেলেছে। সে উত্তর দেয় লাঠি দিয়ে। লালন একেই বলতেন আজব কারখানা।

এখানে একটা অদ্ভুত ফাঁক আছে। প্রতি অক্টোবরে রাষ্ট্র সরকারি আয়োজনে লালনকে সম্মান জানায়। অথচ যাঁরা তাঁর বাণী নিয়ে বাঁচেন, লম্বা চুল আর একতারা হাতে সেই বাউলরা বছরের বাকি সময় নিরাপদ বোধ করেন না। মৃত সাধককে সম্মান করা সহজ। তাঁর জীবিত অনুসারীদের রক্ষা করাই আসল পরীক্ষা।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য লালনের প্রশ্ন কেন জরুরি

এটা শুধু বাংলাদেশের গল্প নয়। সীমান্তের ওপারে ভারতে আজও জাতের বাইরে বিয়ে করলে দম্পতিরা হুমকি পান, কখনো খুনও হন। পাকিস্তানে ধর্ম অবমাননার একটা গুজবই কয়েক ঘণ্টায় কারও দরজায় উন্মত্ত ভিড় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশে গ্রামের মেলায় একটা গান গাওয়ার জন্য এখন মামলা হতে পারে। জায়গা বদলালে পরিচয়ের নাম বদলায়। রাগটা একই থাকে।

সামাজিক মাধ্যম এই আগুন আরও দ্রুত ছড়ায়। কাটা একটা ভিডিও, রাগী একটা পোস্ট, আর সত্য যাচাইয়ের আগেই জড়ো হয় ভিড়। লালন কখনো ফোন দেখেননি। তবু ভিড়ের মন তিনি ঠিকই বুঝতেন। “জাত গেল, জাত গেল” যে কোনো যুগের উন্মত্ত ভিড়ের আওয়াজ।

তাই লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, তা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রশ্ন। এখানে শত কোটির বেশি মানুষ একই নদী, খাবার, গান আর দেশভাগের দীর্ঘ ক্ষত ভাগ করে নেয়। তবু আমরা একে অপরের গায়ে দাগ টানি, আর সেই দাগ ক্ষত হয়ে গেলে অবাক হই।

লালনকে সম্মান জানানো মানে কী

লালনকে সম্মান জানানো মানে কী

লালন আমাদের শুরু করার একটা ভালো জায়গা দিয়ে গেছেন। তিনি গেয়েছেন:

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি

এই কথাকে সত্যি ধরলে তাঁর তিরোধান দিবসে সম্মান জানানোর মানে দাঁড়ায় কয়েকটি স্পষ্ট কাজ:

  1. সারা বছর আখড়া আর মাজার রক্ষা করা। নিরাপত্তা যেন শুধু উৎসবের দিনে না আসে।
  2. শিল্পীকে নয়, হামলাকারীকে শাস্তি দেওয়া। গানের জন্য বাউল গ্রেপ্তার হবেন আর হামলাকারীরা ঘুরে বেড়াবে, এটা ভুল বার্তা দেয়।
  3. গানের সঙ্গে গানের অর্থও শেখানো। শিশুরা শিখুক লালন কী প্রশ্ন করেছিলেন, শুধু সুর নয়।
  4. নিজেকে প্রশ্ন করা। কাউকে ধর্ম বা জাত দিয়ে বিচার করার আগে একবার থেমে ভাবা, আসলে আমরা কী দেখছি।

এর জন্য নতুন আইন বা বড় বাজেট লাগে না। লাগে সাহস। লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, তার মুখোমুখি হওয়া মানে মেনে নেওয়া যে এই দেয়াল আমরা নিজেরাই তুলেছি।

শেষ কথা: লালন যে উত্তর রেখে গেছেন

এই ১৩৬তম তিরোধান দিবসে ছেঁউড়িয়া থেকে আবার গান উঠবে। হাজারো মানুষ একই মাটিতে বসবেন, একই হাঁড়ি থেকে খাবেন, একই পদে কাঁদবেন। তিন দিনের জন্য দেয়ালগুলো চুপ থাকবে।

লালনের যে প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি, হয়তো তার গোছানো উত্তর কোনোদিন কথায় মিলবে না। কিন্তু তিনি নিজের জীবন দিয়ে উত্তরটা দেখিয়ে গেছেন। তিনি কোনো পরিচয়ের তকমা গায়ে নেননি। যে এসেছে, তাকে আগে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তাঁকে সম্মান জানাতে চাইলে তাঁর ধর্মের ধাঁধা মেলানোর দরকার নেই। দরকার একে অপরকে এই প্রশ্ন করা বন্ধ করা।

লালনের মতো করেই বলি, এই নজরে তাকান। জাত খুঁজে পাবেন না। খুঁজে পাবেন একজন মানুষ।

সর্বশেষ