বর্তমান ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের পাসপোর্ট সেবা অত্যন্ত আধুনিক এবং জনবান্ধব হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ই-পাসপোর্ট প্রবর্তনের পর থেকে নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণ এবং পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অনেক সহজতর হয়েছে। তবে পাসপোর্টের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে, যা শেষ হওয়ার আগেই ই-পাসপোর্ট রিনিউ করা অত্যন্ত জরুরি।
আপনি যদি সঠিক সময়ে পাসপোর্ট নবায়ন না করেন, তবে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন। বর্তমান ২০২৬ সালে ই-পাসপোর্ট নবায়ন বা রিনিউ করার পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনলাইনে সম্পন্ন করা সম্ভব, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
ই-পাসপোর্ট রিনিউ করার প্রয়োজনীয়তা এবং প্রাথমিক ধারণা
বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট সাধারণত ৫ বছর বা ১০ বছর মেয়াদের হয়ে থাকে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে এটি আর আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য বৈধ থাকে না। অনেক দেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের অন্তত ৬ মাস মেয়াদ থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে।
আপনার বর্তমান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ই-পাসপোর্ট রিনিউ প্রক্রিয়া শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ। নবায়ন প্রক্রিয়ায় মূলত পুরনো পাসপোর্টের তথ্য যাচাই করে নতুন একটি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
পাসপোর্ট রিনিউ সংক্রান্ত মূল তথ্য
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| আবেদন মাধ্যম | অনলাইন পোর্টাল (epassport.gov.bd) |
| মেয়াদকাল | ৫ বছর অথবা ১০ বছর |
| পৃষ্ঠা সংখ্যা | ৪৮ পৃষ্ঠা অথবা ৬৪ পৃষ্ঠা |
| প্রধান শর্ত | এনআইডি কার্ড বা জন্ম নিবন্ধনের সাথে তথ্যের মিল |
ই-পাসপোর্ট নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

অনলাইনে আবেদনের আগে সঠিক কাগজপত্র গুছিয়ে নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আপনার যদি ই-পাসপোর্ট থাকে এবং সেটি রিনিউ করতে চান, তবে মূল আবেদনের প্রিন্ট কপির সাথে পুরনো পাসপোর্ট এবং এনআইডি কার্ডের ফটোকপি প্রয়োজন হবে।
বিশেষ ক্ষেত্রে পেশাগত প্রমাণপত্র বা স্থায়ী ঠিকানার পরিবর্তন থাকলে বিদ্যুৎ বিলের কপিও প্রয়োজন হতে পারে। সঠিক কাগজপত্র না থাকলে আপনার ই-পাসপোর্ট রিনিউ আবেদনটি বাতিল বা স্থগিত হতে পারে।
প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা
| ক্রম | কাগজের নাম | কেন প্রয়োজন? |
| ১ | এনআইডি (NID) / স্মার্ট কার্ড | মূল পরিচয় যাচাইয়ের জন্য |
| ২ | পুরনো পাসপোর্ট | পূর্ববর্তী তথ্যের প্রমাণের জন্য |
| ৩ | অনলাইন আবেদনের সারাংশ | অফিসিয়াল প্রসেসিংয়ের জন্য |
| ৪ | পেমেন্ট স্লিপ (A-Challan) | ফি পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে |
| ৫ | পেশাগত সনদ (যদি প্রয়োজন হয়) | সরকারি বা বিশেষ পদের ক্ষেত্রে |
ধাপে ধাপে ই-পাসপোর্ট রিনিউ করার অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া
অনলাইনে আবেদন করার জন্য প্রথমে আপনাকে বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট অনলাইন পোর্টাল ভিজিট করতে হবে। সেখানে নিজের একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করে সঠিক তথ্য দিয়ে ফরম পূরণ করতে হবে। ফরম পূরণের সময় আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং পুরনো পাসপোর্টের নম্বর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দিতে হবে।
ই-পাসপোর্ট রিনিউ করার ক্ষেত্রে ‘Reason for Reissue’ অপশনে গিয়ে যথাযথ কারণ সিলেক্ট করতে হবে। ভুল তথ্য দিলে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে, তাই প্রতিটি ঘর সতর্কভাবে যাচাই করুন।
আবেদন প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ
| ধাপ | কাজের বিবরণ | টিপস |
| ধাপ ১ | অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন | সচল ইমেইল ব্যবহার করুন |
| ধাপ ২ | জেলা ও থানা নির্বাচন | বর্তমান ঠিকানার অফিস সিলেক্ট করুন |
| ধাপ ৩ | ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান | এনআইডি অনুযায়ী নাম ও জন্ম তারিখ দিন |
| ধাপ ৪ | রি-ইস্যু অপশন নির্বাচন | পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ না হারানো—কারণ লিখুন |
| ধাপ ৫ | ডেলিভারি টাইপ ও পেমেন্ট | আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী মোড বেছে নিন |
পাসপোর্ট রি-ইস্যুর কারণসমূহ
পাসপোর্ট রিনিউ করার সময় আপনাকে অবশ্যই রি-ইস্যুর কারণ উল্লেখ করতে হবে। সাধারণত মেয়াদ শেষ হওয়া (Expired), পাতা শেষ হয়ে যাওয়া (Data Page Exhausted), বা তথ্য পরিবর্তন (Data Change) -এই তিনটি কারণে মানুষ রি-ইস্যু করে থাকে। আপনি যদি পাসপোর্ট নবায়ন করতে চান তবে ‘Expired’ বা ‘About to Expire’ অপশনটি বেছে নিন।
ই-পাসপোর্ট রিনিউ করার ফি এবং পেমেন্ট পদ্ধতি
২০২৬ সালে ই-পাসপোর্টের ফি আগের মতোই পৃষ্ঠা সংখ্যা এবং মেয়াদের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত করা হয়েছে। ৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদী পেমেন্ট এবং ৬৪ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদী পেমেন্টের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এছাড়া আপনি কত দ্রুত পাসপোর্টটি হাতে পেতে চান (Regular, Express, Super Express), তার ওপর ভিত্তি করেও ফির পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে ই-পাসপোর্ট রিনিউ ফি এ-চালানের মাধ্যমে বিকাশ, রকেট বা যেকোনো ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড দিয়ে খুব সহজেই পরিশোধ করা যায়।
ই-পাসপোর্ট ফি তালিকা (৪৮ পৃষ্ঠা)
| ডেলিভারি ধরণ | ৫ বছর মেয়াদ (টাকা) | ১০ বছর মেয়াদ (টাকা) |
| রেগুলার (১৫-২১ দিন) | ৪,০২৫/- | ৫,৭৫০/- |
| এক্সপ্রেস (৭-১০ দিন) | ৬,৩২৫/- | ৮,০৫০/- |
| সুপার এক্সপ্রেস (২ দিন) | ৮,৬২৫/- | ১০,৩৫০/- |
দ্রষ্টব্য: ফির সাথে ১৫% ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকে। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ফি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
অনলাইন পেমেন্ট করার সুবিধা
এখন আর ব্যাংকের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ফি জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার আবেদনের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। তবে পেমেন্ট করার পর চালান কপিটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে রাখা জরুরি, কারণ এটি পাসপোর্ট অফিসে জমা দিতে হবে।
আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক ও সাক্ষাৎকার

অনলাইন ফরম পূরণ এবং ফি জমা দেওয়ার পর আপনাকে একটি নির্দিষ্ট তারিখে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হতে হবে। যদিও রিনিউয়াল প্রক্রিয়ায় অনেকের বায়োমেট্রিক আগের থেকেই সংরক্ষিত থাকে, তবুও নিরাপত্তার খাতিরে নতুন করে ছবি তোলা এবং আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া হতে পারে। আপনার ই-পাসপোর্ট রিনিউ আবেদনের হার্ডকপি এবং অরিজিনাল এনআইডি কার্ড সাথে নিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক। সেখানে কর্তব্যরত কর্মকর্তা আপনার তথ্য যাচাই করবেন এবং সবকিছু ঠিক থাকলে এনরোলমেন্ট স্লিপ প্রদান করবেন।
অফিস পরিদর্শনের চেকলিস্ট
| আইটেম | অবস্থা | করণীয় |
| অ্যাপ্লিকেশন সামারি | প্রিন্ট কপি | সাথে রাখুন |
| পেমেন্ট রিসিট | অরিজিনাল | ফাইলে গেঁথে দিন |
| পুরনো পাসপোর্ট | অরিজিনাল ও ফটোকপি | সাথে রাখা বাধ্যতামূলক |
| এনআইডি কার্ড | অরিজিনাল ও ফটোকপি | তথ্য মিলিয়ে দেখুন |
পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক করার সহজ উপায়
আবেদন জমা দেওয়ার পর পাসপোর্টটি কোন অবস্থায় আছে তা জানার জন্য আপনি অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করতে পারেন। আপনার এনরোলমেন্ট আইডিতে থাকা অ্যাপ্লিকেশন আইডি বা পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে সহজেই স্ট্যাটাস চেক করা যায়। এতে করে আপনার ই-পাসপোর্ট রিনিউ প্রক্রিয়াটি পুলিশ ভেরিফিকেশন পর্যায়ে আছে নাকি প্রিন্টিংয়ে আছে তা জানতে পারবেন। সাধারণত রিনিউয়ালের ক্ষেত্রে যদি স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন না হয়, তবে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন পড়ে না।
স্ট্যাটাসের বিভিন্ন পর্যায়
| স্ট্যাটাস মেসেজ | এর অর্থ কী? |
| Pending Police Verify. | পুলিশ আপনার তথ্য যাচাই করছে |
| Pending Backend Verify. | প্রধান কার্যালয়ে যাচাই চলছে |
| Printed & Shipped | পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়ে অফিসের পথে |
| Ready for Issuance | আপনি এখন সংগ্রহ করতে পারেন |
প্রবাসীদের জন্য ই-পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের জন্য পাসপোর্ট রিনিউ প্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। তাদের নিকটস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশনে গিয়ে এই আবেদন করতে হয়। বিদেশেও এখন অনেক দেশে ই-পাসপোর্ট সেবা চালু হয়েছে। প্রবাসীরাও অনলাইনে ফরম পূরণ করতে পারেন, তবে ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রায় পেমেন্ট করতে হয়। সঠিক নিয়মে ই-পাসপোর্ট রিনিউ না করলে প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ বাড়াতে বা কর্মস্থলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
বিদেশে পাসপোর্ট রিনিউ সংক্রান্ত তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| আবেদন স্থান | বাংলাদেশ হাই কমিশন/দূতাবাস |
| পেমেন্ট কারেন্সি | সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় মুদ্রা |
| পুলিশ ভেরিফিকেশন | সাধারণত প্রয়োজন হয় না (যদি তথ্য অপরিবর্তিত থাকে) |
| ডেলিভারি মাধ্যম | ব্যক্তিগত সংগ্রহ বা কুরিয়ার (যদি ব্যবস্থা থাকে) |
তথ্য সংশোধন ও ভুল সংশোধন পদ্ধতি
অনেক সময় পুরনো পাসপোর্টে তথ্যের ভুল থাকে, যা রিনিউ করার সময় সংশোধন করা প্রয়োজন হয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, আপনার এনআইডি কার্ডে যে তথ্য আছে, পাসপোর্ট সেই অনুযায়ী হতে হবে। যদি এনআইডি এবং পাসপোর্টের তথ্যে অমিল থাকে, তবে প্রথমে এনআইডি সংশোধন করতে হবে এবং এরপর ই-পাসপোর্ট রিনিউ এর জন্য আবেদন করতে হবে। তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাপোর্টিং ডকুমেন্ট (যেমন: শিক্ষা সনদ বা বিয়ের হলফনামা) প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
ই-পাসপোর্ট একটি অত্যাধুনিক নিরাপত্তা সম্বলিত দলিল। সঠিক নিয়মে ই-পাসপোর্ট রিনিউ করা হলে এটি আপনাকে ঝামেলামুক্ত বিদেশ ভ্রমণের নিশ্চয়তা দেয়। ২০২৬ সালে প্রযুক্তির কল্যাণে আবেদন থেকে শুরু করে পেমেন্ট পর্যন্ত সব কাজই এখন হাতের নাগালে। আবেদনের সময় তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং সময়মতো ফি প্রদান করাই হচ্ছে দ্রুত পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার মূল চাবিকাঠি। আশা করি, এই গাইডের মাধ্যমে আপনি ই-পাসপোর্ট নবায়নের পুরো প্রক্রিয়াটি বুঝতে পেরেছেন।


