সময়ের সীমানা পেরিয়ে ক্রিকেটীয় মহানায়ককে ফিরে দেখা

সর্বাধিক আলোচিত

ক্রিকেট বিশ্বে এমন খুব কম খেলোয়াড়ই এসেছেন যাঁদের নাম একটি নির্দিষ্ট খেলার সমার্থক হয়ে উঠেছে। ভারতে ক্রিকেট যদি ধর্ম হয়, তবে সেই ধর্মের ঈশ্বর হিসেবে পূজা পান শচীন রমেশ টেন্ডুলকার । প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল যখন শচীন টেন্ডুলকারের জন্মদিন উদযাপিত হয়, তখন তা কেবল একজন প্রাক্তন ক্রিকেটারের বয়সবৃদ্ধির দিন হিসেবে থাকে না; বরং এটি একটি গোটা জাতির জন্য নস্টালজিয়া, আবেগ এবং উদযাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় । 

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন ভারতীয় সমাজ ও অর্থনীতি বিশ্বায়নের পথে পা বাড়াচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে শচীনের উত্থান ঘটেছিল এবং তিনি হয়ে উঠেছিলেন কোটি কোটি মানুষের আশার প্রতীক । দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যে আধিপত্য তিনি বিস্তার করেছেন, তা ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধ্যায় । এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি কেবল রানের পাহাড়ই গড়েননি, বরং শৃঙ্খলা, বিনয় এবং একাগ্রতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন । এই বিশেষ দিনে আমরা তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক নিয়ে একটি বিশদ আলোচনা করব।

শৈশব, পরিবার এবং ক্রিকেটে হাতেখড়ি

১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল বোম্বে শহরের (বর্তমান মুম্বাই) একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শচীন টেন্ডুলকার । তাঁর বাবা রমেশ টেন্ডুলকার ছিলেন একজন লেখক ও অধ্যাপক, এবং মা কাজ করতেন একটি জীবন বিমা কোম্পানিতে । বাবা রমেশ টেন্ডুলকার বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক শচীন দেব বর্মনের ভীষণ ভক্ত ছিলেন, আর সেই থেকেই ছেলের নাম রাখেন ‘শচীন’ । ছোটবেলায় শচীন ছিলেন অত্যন্ত দুরন্ত স্বভাবের। তাঁর এই চঞ্চলতাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতেই পরিবার তাঁকে ক্রিকেটের সাথে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি প্রথম ক্রিকেট ব্যাট হাতে পান এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিতে শুরু করেন ।

শৈশবের প্রভাবক শচীনের জীবনে অবদান ও প্রভাব
পিতা রমেশ টেন্ডুলকার শচীনকে বিনয়ী হতে এবং সফলতার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন ।
মাতা শচীনের মতো দুরন্ত সন্তানকে সামলেছেন এবং তাঁর ক্রিকেট খেলায় সর্বদা মানসিক সমর্থন জুগিয়েছেন ।
ভাই অজিত টেন্ডুলকার শচীনের ভেতরের প্রতিভা প্রথম শনাক্ত করেন এবং তাঁকে পেশাদার কোচের কাছে নিয়ে যান ।
কোচ রমাকান্ত আচরেকর কঠোর প্রশিক্ষণ, নিখুঁত টেকনিক গঠন এবং শৃঙ্খলাবোধ তৈরি করেন ।

 

ভাই অজিতের অবদান ও অনুপ্রেরণা

শচীনের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল তাঁর বড় ভাই অজিত টেন্ডুলকারের নিখুঁত নির্দেশনায় । অজিতই প্রথম শচীনের ভেতরের স্ফুলিঙ্গ দেখতে পান এবং তাঁকে পেশাদার ক্রিকেটের পথে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শচীনকে নিয়ে যান মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ক্রিকেট কোচ রমাকান্ত আচরেকরের কাছে, যিনি শচীনের খেলার ধরনকে চিরতরে পাল্টে দিয়েছিলেন । শচীন নিজেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, অজিত তাঁর প্রতিভা শনাক্ত না করলে হয়তো তিনি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পারতেন না । পরিবারের এই নিঃশর্ত সমর্থন শচীনকে শুরু থেকেই একটি স্থিতিশীল মানসিকতা প্রদান করেছিল।

গুরু রমাকান্ত আচরেকর এবং ১৩টি মুদ্রার গল্প

রমাকান্ত আচরেকরের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত কঠোর, যা শচীনকে মানসিক ও শারীরিকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছিল । শিবাজি পার্কে দীর্ঘ অনুশীলনের পর যখন শচীন ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তখন আচরেকর স্টাম্পের ওপর একটি এক টাকার মুদ্রা রাখতেন । নিয়মটি ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ—যদি কোনো বোলার শচীনকে আউট করতে পারে, তবে মুদ্রাটি সেই বোলার পাবে; আর যদি শচীন পুরো সেশন অপরাজিত থাকেন, তবে মুদ্রাটি তাঁর হবে । শচীন তাঁর কিশোর বয়সে এমন ১৩টি মুদ্রা অর্জন করেছিলেন, যা আজও তাঁর জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ । একবার স্কুলের সিনিয়র দলের খেলা গ্যালারি থেকে দেখার জন্য শচীন নিজের ম্যাচ মিস করেছিলেন, যার কারণে আচরেকর তাঁকে কষে একটি চড় মারেন এবং বলেন, “অন্যের জন্য তালি না বাজিয়ে এমন কিছু করো যাতে মানুষ তোমার জন্য তালি বাজায়” । এই শিক্ষাই শচীনকে কিংবদন্তি হতে সাহায্য করেছিল।

পরিসংখ্যান ও রেকর্ড: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অবিসংবাদিত আধিপত্য

শচীন টেন্ডুলকারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি আক্ষরিক অর্থেই ক্রিকেটের রেকর্ড বই নতুন করে লিখেছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর পাকিস্তানের বিপক্ষে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয় । এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ শিখরে বিরাজ করেছেন। তাঁর এই যাত্রায় তিনি এমন কিছু রেকর্ড গড়েছেন যা ভাঙা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হয়। তিনি ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই সমান সাবলীল ছিলেন এবং ক্যারিয়ার শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩৪,৩৫৭ রান নিয়ে অবসরে যান ।

ক্রিকেট ফরম্যাট ম্যাচ সংখ্যা মোট রান সর্বোচ্চ স্কোর শতক (১০০) অর্ধশতক (৫০) ব্যাটিং গড়
টেস্ট (Test) ২০০ ১৫,৯২১ ২৪৮* ৫১ ৬৮ ৫৩.৭৮
ওয়ানডে (ODI) ৪৬৩ ১৮,৪২৬ ২০০* ৪৯ ৯৬ ৪৪.৮৩
প্রথম শ্রেণি (FC) ৩১০ ২৫,৩৯৬ ২৪৮* ৮১ ১১৬ ৫৭.৮৪
টি-টোয়েন্টি (T20) ৯৬ (সামগ্রিক) ২,৩৩৪ (আইপিএল) ১০০* ১ (আইপিএল) ১৬


টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে রাজত্ব

টেস্ট ক্রিকেটে ২০০টি ম্যাচ খেলার অনন্য রেকর্ড শচীনের দখলে রয়েছে, যা আর কোনো ক্রিকেটারের নেই । তিনি টেস্টে ৫৩.৭৮ গড়ে ১৫,৯২১ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ৫১টি শতক । অন্যদিকে, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে (ODI) তিনি ৪৬৩টি ম্যাচ খেলে ১৮,৪২৬ রান সংগ্রহ করেছেন । তিনিই প্রথম পুরুষ ক্রিকেটার যিনি ওয়ানডেতে দ্বিশতক (২০০*) হাঁকানোর গৌরব অর্জন করেন । ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গওয়ালিয়রে খেলা তাঁর সেই অপরাজিত ২০০ রানের ইনিংসটি ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে ।

শতকের শতক এবং অনন্য কিছু মাইলফলক

শচীন টেন্ডুলকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০টি শতক করা একমাত্র খেলোয়াড় । ২০১২ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের বিপক্ষে মিরপুরে তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত ১০০তম শতকটি পূর্ণ করেন । দীর্ঘ ৩৩টি ইনিংস অপেক্ষার পর এই মাইলফলক স্পর্শ করা তাঁর জন্য একটি প্রবল মানসিক চাপ মুক্তির মুহূর্ত ছিল । এই ১০০টি শতকের মধ্যে ৫১টি এসেছে টেস্টে এবং ৪৯টি ওয়ানডেতে । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও তিনি নিজের জাত চিনিয়েছেন। আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে ৭৮টি ম্যাচ খেলে তিনি ২,৩৩৪ রান করেন এবং ২০১১ সালে কোচি টাস্কার্সের বিপক্ষে মাত্র ৬৬ বলে অপরাজিত ১০০ রান করে টি-টোয়েন্টিতেও সেঞ্চুরির দেখা পান।

আইকনিক ইনিংস এবং কিংবদন্তি বোলারদের সাথে দ্বৈরথ

শচীন টেন্ডুলকারের ক্যারিয়ারে অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস রয়েছে, তবে কিছু নির্দিষ্ট ইনিংস এবং বিশ্বের সেরা বোলারদের সাথে তাঁর লড়াই ক্রিকেট রূপকথায় পরিণত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ এবং শেন ওয়ার্ন ও গ্লেন ম্যাকগ্রার মতো কিংবদন্তিদের বিপক্ষে তাঁর দ্বৈরথ ছিল দর্শকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়। শচীনের এই লড়াইগুলো প্রমাণ করে যে তিনি কেবল রান করতে জানতেন না, বরং বিশ্বের সেরা বোলারদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরাস্ত করতেও পারদর্শী ছিলেন ।

ঐতিহাসিক ম্যাচ/টুর্নামেন্ট প্রতিপক্ষ ও বোলার শচীনের রান ম্যাচের ফলাফল ও তাৎপর্য
শারজা কোকা-কোলা কাপ (লিগ ম্যাচ, ১৯৯৮) অস্ট্রেলিয়া ১৪৩ (১৩১ বল) ধূলিঝড়ের পর অসামান্য আক্রমণাত্মক ইনিংস, যা ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ নামে পরিচিত ।
শারজা কোকা-কোলা কাপ (ফাইনাল, ১৯৯৮) অস্ট্রেলিয়া ১৩৪ শচীনের শতকে ভর করে ভারতের ঐতিহাসিক শিরোপা জয় ।
চেন্নাই টেস্ট (১৯৯৮) অস্ট্রেলিয়া (শেন ওয়ার্ন) ১৫৫* ওয়ার্নকে সামলাতে বিশেষ অনুশীলনের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাচ-জেতানো শতক ।
অ্যাডিলেড টেস্ট (১৯৯৯) অস্ট্রেলিয়া (গ্লেন ম্যাকগ্রা) ম্যাকগ্রার বলে কাঁধে লেগে বিতর্কিত এলবিডব্লিউ (LBW) আউট, যা ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ।


শারজার ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ (১৯৯৮)

১৯৯৮ সালের এপ্রিলে শারজায় অনুষ্ঠিত কোকা-কোলা কাপে শচীনের পারফরম্যান্স ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ বা মরুভূমির ঝড় নামে পরিচিত । ২২ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের জয়ের জন্য ২৮৫ রানের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ছিল। প্রবল ধূলিঝড়ের কারণে খেলা ২৫ মিনিট বন্ধ থাকে এবং লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ ওভারে ২৭৬ রানে পুনর্নির্ধারিত হয় । এই প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে শচীন ১৩১ বলে ১৪৩ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন । ড্যামিয়েন ফ্লেমিংয়ের বলে আউট হওয়ার আগে তিনি ভারতকে খাদের কিনারা থেকে তুলে আনেন। যদিও ভারত ম্যাচটি হেরে যায়, কিন্তু ফাইনালে ওঠার যোগ্যতা অর্জন করে। এরপর ২৪ এপ্রিল, নিজের ২৫তম জন্মদিনে ফাইনালে শচীনের ১৩৪ রানের আরেকটি অনবদ্য শতকে ভর করে ভারত শিরোপা জয় করে ।

শেন ওয়ার্ন ও গ্লেন ম্যাকগ্রার বিপক্ষে লড়াই

শেন ওয়ার্ন এবং গ্লেন ম্যাকগ্রার মতো বোলারদের বিপক্ষে শচীনের লড়াই ছিল সেয়ানে সেয়ানে। ১৯৯৮ সালের সিরিজে ওয়ার্নকে মোকাবেলা করার জন্য শচীন নেটে বিশেষ ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। লেগ স্টাম্পের বাইরে বল ফেলে স্পিন খেলার অনুশীলন করেছিলেন তিনি । চেন্নাই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়ার্নের বলে অপরাজিত ১৫৫ রান করে শচীন প্রমাণ করেছিলেন যে স্পিনের বিপক্ষে তাঁর ফুটওয়ার্ক কতটা নিখুঁত । অন্যদিকে, গ্লেন ম্যাকগ্রার নিখুঁত লাইন-লেন্থের বিপক্ষেও শচীনকে বহুবার কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হয়েছে। ১৯৯৯ সালের অ্যাডিলেড টেস্টে ম্যাকগ্রার একটি নিচু হওয়া বল শচীনের কাঁধে আঘাত করে এবং আম্পায়ার তাঁকে এলবিডব্লিউ (LBW) আউট দেন, যা নিয়ে আজও ক্রিকেট বিশ্বে বিতর্ক রয়েছে ।

বিশ্বকাপের মঞ্চে শচীন: আক্ষেপ থেকে পরম প্রাপ্তি

শচীন টেন্ডুলকারের দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত লক্ষ্য ছিল দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জয় করা। তিনি তাঁর ক্যারিয়ারে মোট ছয়টি ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেছেন (১৯৯২ থেকে ২০১১) । এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেক হতাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়। বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে বড় টুর্নামেন্টে তিনি কতটা নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় ছিলেন। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি রান (২,২৭৮) করার রেকর্ড আজও শচীনের দখলে রয়েছে ।

বিশ্বকাপ সাল ভারতের অবস্থান শচীনের উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স ও অবদান
১৯৯৬ বিশ্বকাপ সেমি-ফাইনাল টুর্নামেন্টের অন্যতম সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬৫ রান করেন ।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ সুপার সিক্স টুর্নামেন্ট চলাকালীন বাবার মৃত্যুর শোক সামলে কেনিয়ার বিপক্ষে ১৪০* রানের আবেগঘন ইনিংস ।
২০০৩ বিশ্বকাপ রানার্স-আপ ৬৭৩ রান নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক এবং ‘ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ নির্বাচিত হন ।
২০১১ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন টুর্নামেন্ট জুড়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘ ২১ বছরের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ।


২০০৩ বিশ্বকাপের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স

২০০৩ সালের আইসিসি বিশ্বকাপে ভারত ফাইনালে উঠলেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে শিরোপা বঞ্চিত হয়। তবে পুরো টুর্নামেন্টে শচীন ছিলেন অবিশ্বাস্য ছন্দে। তিনি ১১ ম্যাচে ৬৭৩ রান করে ‘ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ নির্বাচিত হন, যা একটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড । এই টুর্নামেন্টের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো পাকিস্তানের বিপক্ষে তাঁর ৯৮ রানের ঐতিহাসিক ইনিংস, যেখানে তিনি শোয়েব আখতারের মতো বোলারদের তুলোধুনো করেছিলেন । এছাড়া শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে তিনি পেট খারাপ নিয়েও টিস্যু পেপারের সাহায্যে তিন ঘণ্টা ব্যাটিং করে ৯৭ রান করেছিলেন, যা তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দেশের প্রতি নিবেদনের প্রমাণ দেয় । নামিবিয়ার বিপক্ষে তিনি ১৫২ রানের একটি বিশাল ইনিংসও খেলেছিলেন ।

২০১১ বিশ্বকাপ জয় এবং স্বপ্নের পূর্ণতা

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১১ সালে নিজের ঘরের মাঠ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ভারত বিশ্বকাপ জয় করে। ৩৭ বছর বয়সে এসে এই জয় শচীনের কাছে ছিল জীবনের সেরা মুহূর্ত । জয়ের পর বিরাট কোহলি, ইউসুফ পাঠানরা শচীনকে কাঁধে তুলে পুরো স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ করেন। শচীন আনন্দে শিশুদের মতো লাফিয়ে উঠেছিলেন । বিরাট কোহলি তখন এক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন, “যে মানুষটি ২১ বছর ধরে জাতির ভার বহন করেছেন, আজ সময় এসেছে তাঁকে আমাদের কাঁধে তুলে নেওয়ার” । এই জয় শচীনের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দিয়েছিল।

ব্যাটিং কৌশল, ব্যাকরণ এবং শট সিলেকশন

শচীন টেন্ডুলকারকে আধুনিক ক্রিকেট ব্যাকরণের নিখুঁত প্রতিমূর্তি বলা হয়। তাঁর ব্যাটিং কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি যেকোনো পরিস্থিতি এবং পিচের সাথে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারতেন। তাঁর ফুটওয়ার্ক, শরীরের চমৎকার ভারসাম্য এবং বলের দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টি তাঁকে অন্য ব্যাটারদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছিল । তাঁর এই ব্যাটিং দর্শনের মূলে ছিল একটি স্থির মাথা (Still Head) এবং দ্রুত হাতের ব্যবহার, যা তাঁকে বিশ্বের সেরা ফাস্ট বোলারদের বিপক্ষেও আধিপত্য বিস্তারে সাহায্য করেছে ।

ব্যাটিং কৌশল বৈশিষ্ট্য ও খেলার পদ্ধতি কার্যকারিতা
স্ট্রেইট ড্রাইভ নিখুঁত ভারসাম্য, স্থির মাথা এবং ব্যাটের ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল । অত্যন্ত কম ঝুঁকির শট, বল মাটি কামড়ে বাউন্ডারিতে পৌঁছায় ।
প্যাডেল সুইপ স্পিনারদের লেন্থ নষ্ট করা এবং হাঁটু গেড়ে বসে বল স্কুপ করা । লেগ স্লিপের ফিল্ডারের ওপর দিয়ে নিয়ন্ত্রিত শট খেলা এবং স্পিন আক্রমণ ভোঁতা করা ।
ব্যাকফুট পাঞ্চ বলের লাইনে গিয়ে শরীরের ওজন পেছনের পায়ে রাখা । অফ সাইডে জায়গা বানিয়ে বলকে ফিল্ডারদের ফাঁক দিয়ে দ্রুত বের করে দেওয়া ।


নিখুঁত স্ট্রেইট ড্রাইভের পেছনের বিজ্ঞান

শচীনের সবচেয়ে আইকনিক শট হিসেবে বিবেচনা করা হয় ‘স্ট্রেইট ড্রাইভ’-কে। এই শটটি খেলার সময় তাঁর মাথা একেবারে স্থির থাকত এবং চোখ বলের ওপর নিবদ্ধ থাকত । তাঁর ব্যাট সামনের উরুর খুব কাছ দিয়ে নিচে নেমে আসত এবং বলের লাইনে এসে নিখুঁত টাইমিংয়ে বলকে বাউন্ডারির বাইরে পাঠাত । ব্যাটের এই ৪৫ ডিগ্রি কোণ একটি সোজা লাইন তৈরি করত, যা বলকে শূন্যে ভাসতে দিত না। এটি একটি অত্যন্ত কম ঝুঁকির শট ছিল, অথচ এর কার্যকারিতা ছিল মারাত্মক।

স্পিনারদের বিপক্ষে প্যাডেল সুইপ

ক্যারিয়ারের শুরুতে শচীন ছিলেন অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তিনি তাঁর খেলায় পরিবর্তন আনেন। স্পিনারদের বিপক্ষে তাঁর ‘প্যাডেল সুইপ’ খেলার কৌশল ছিল মাস্টারক্লাস । সম্প্রতি তিনি আধুনিক ব্যাটার ঋষভ পন্তের প্যাডেল সুইপ নিয়েও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। শচীনের মতে, পন্ত ইচ্ছাকৃতভাবেই শট খেলার সময় মাটিতে পড়ে যান, যাতে তিনি বলের নিচে ভালোভাবে পৌঁছাতে পারেন এবং লেগ স্লিপের ওপর দিয়ে স্কুপ করতে পারেন । শচীনের এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে ক্রিকেটের টেকনিক্যাল এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে তাঁর জ্ঞান কতটা প্রখর।

অধিনায়কত্ব, মেন্টরশিপ এবং ব্যক্তিগত শখ

শচীন টেন্ডুলকারের ক্যারিয়ার মূলত তাঁর পাহাড়সম ব্যাটিং রেকর্ডের জন্য বিখ্যাত হলেও, তিনি দুই মেয়াদে ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর পরিসংখ্যান তাঁর ব্যাটিং রেকর্ডের মতো উজ্জ্বল নয় ঠিকই, কিন্তু ক্রিকেট দলের প্রতি তাঁর নিবেদন ছিল প্রশ্নাতীত । মাঠের বাইরে একজন মেন্টর হিসেবে এবং ব্যক্তিজীবনে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তাঁর বেশ কিছু চমৎকার দিক রয়েছে যা ভক্তদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।

শচীনের বিভিন্ন ভূমিকা ও শখ বিবরণ ও পরিসংখ্যান
টেস্ট অধিনায়কত্ব ২৫টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ৪টিতে জয় (১৬% জয়ের হার) ।
ওয়ানডে অধিনায়কত্ব ৭৩টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ২৩টিতে জয় (৩১.৫০% জয়ের হার) ।
মেন্টরশিপ মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের আইকন এবং আদিদাসের মাধ্যমে ১১ জন তরুণ ক্রিকেটারকে মেন্টরিং করা ।
প্রিয় খাবার ও শখ রান্না করতে ভালোবাসা (বেগুন ভর্তা), বাঙালি খাবার (চিংড়ি মালাইকারি, ভেটকি পাতুরি, মিষ্টি দই) ।


অধিনায়ক হিসেবে উত্থান-পতন

১৯৯৬ সালে প্রথমবার অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি দল নিয়ে খুব একটা সফল হতে পারেননি। দলের অন্যান্য খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকতার অভাব এবং সমগ্র জাতির অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ তাঁর নিজস্ব ব্যাটিংয়ের ওপরও মাঝে মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলত। পরবর্তীতে ২০০০ সালে তিনি অধিনায়কত্ব থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান এবং সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি তাঁর পুরো মনোযোগ শুধুমাত্র ব্যাটিংয়েই দেবেন । এরপর থেকে তিনি সৌরভ গাঙ্গুলি, রাহুল দ্রাবিড় এবং মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে দলের একজন সিনিয়র মেন্টর হিসেবে অসামান্য অবদান রাখেন।

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে মেন্টরশিপ এবং তরুণদের গাইড করা

২০০৮ সাল থেকে আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে খেলা শুরু করেন শচীন। ২০১৩ সালে খেলোয়াড় হিসেবে অবসরের পর তিনি এই দলের মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন । এছাড়া, ২০১৪ সালে আদিদাস-এর একটি উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিনি উন্মুক্ত চাঁদ, পারভেজ রসুল এবং সরফরাজ খানের মতো ১১ জন উদীয়মান তরুণ ক্রিকেটারকে মেন্টরিং করার দায়িত্ব নেন । নাভি মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের (NMMC) স্কুল শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ এবং কিট প্রদানের উদ্যোগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ।

ভোজনরসিক শচীন এবং প্রিয় বাঙালি খাবার

মাঠের বাইরে শচীন একজন দারুণ ভোজনরসিক মানুষ। তিনি নিজে রান্না করতেও খুব ভালোবাসেন। লকডাউনের সময় পরিবারের জন্য বেগুন ভর্তা বানানোর কথা তিনি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন । তাঁর ডায়েটে সাধারণত ৪০% কার্বোহাইড্রেট, ৩০% ফ্যাট ও ৩০% প্রোটিন থাকে । মজার ব্যাপার হলো, শচীন বাঙালি খাবারের ভীষণ ভক্ত। নব্বইয়ের দশকে কলকাতায় পি সেন ট্রফিতে এরিয়ান ক্লাবের হয়ে খেলতে এসে তিনি স্থানীয় কর্তাদের অনুরোধ করেছিলেন তাঁর জন্য চিংড়ি মাছের মালাইকারি এবং ভেটকি মাছের পাতুরি রান্না করে রাখতে । এছাড়া মিষ্টি দই এবং রসগোল্লাও তাঁর অত্যন্ত পছন্দের খাবার।

মাঠের বাইরের জীবন: সমাজসেবা এবং রাজ্যসভার ভূমিকা

মাঠের বাইরেও শচীন টেন্ডুলকার একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর খ্যাতি এবং সম্পদকে মানবকল্যাণে এবং সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন । শচীন টেন্ডুলকারের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর এই দাতব্য কাজগুলোর কথা স্মরণ করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ একজন মহানায়ক কেবল তাঁর পেশাগত সাফল্য দিয়ে নয়, বরং সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা দিয়েও মূল্যায়িত হন।

খাত / প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ ও অনুদানের বিবরণ
শচীন টেন্ডুলকার ফাউন্ডেশন শিশু স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং খেলাধুলার উন্নয়নে কাজ করা (২৩,০০০+ শিশু উপকৃত) ।
আপনালয় (Apnalaya) মুম্বাইয়ের বস্তির ২০০+ সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন ।
ক্যান্সার ও স্বাস্থ্যসেবা ক্যান্সার রোগীদের সহায়তায় ১.০২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ এবং ‘একম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে সহায়তা ।
রাজ্যসভা ও সরকারি তহবিল রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে প্রাপ্ত ৯০ লক্ষ টাকা বেতন প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে (PM Relief Fund) দান ।


শচীন টেন্ডুলকার ফাউন্ডেশন ও দাতব্য কার্যক্রম

২০১৯ সালে শচীন ও তাঁর স্ত্রী ডা. অঞ্জলি টেন্ডুলকার ‘শচীন টেন্ডুলকার ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন । তবে এর অনেক আগে থেকেই তিনি ‘আপনালয়’ নামক একটি এনজিও-র সাথে যুক্ত ছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ দুই দশক ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, স্টেশনারি এবং ইউনিফর্মের খরচ বহন করেছেন । তিনি ১০০তম শতক হাঁকানোর পর তাঁর ব্যবহৃত ব্যাট নিলামে তুলে সেই অর্থ দাতব্য সংস্থায় দান করেছিলেন । ‘একম ফাউন্ডেশন’ এবং ‘পরিবার’ (Parivaar)-এর মতো সংস্থার সাথে যুক্ত হয়ে তিনি মধ্যপ্রদেশের দুর্গম আদিবাসী এলাকায় অপুষ্টি দূরীকরণ এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করেছেন । কোভিড-১৯ লকডাউনের সময়ও তিনি ৪,০০০ দরিদ্র মানুষের আর্থিক দায়িত্ব নিয়েছিলেন । 

Sachin Tendulkar works

রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে কাজ ও বিতর্ক

২০১২ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শচীন ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । যদিও ৬ বছরে সংসদে তাঁর উপস্থিতির হার (মাত্র ২৯ দিন) নিয়ে দেশজুড়ে বেশ সমালোচনা হয়েছিল, তবে তিনি প্রমাণ করেছেন যে তিনি অর্থের জন্য সেখানে যাননি। তিনি তাঁর সাংসদ হিসেবে প্রাপ্ত পুরো ৯০ লক্ষ টাকা বেতন ও ভাতা প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিলে (PM Relief Fund) দান করে দেন । এর আগে ২০১৩ সালে উত্তরাখণ্ডে ভয়াবহ বন্যার সময়ও তিনি ত্রাণ তহবিলে ৫১ লক্ষ টাকা প্রদান করেছিলেন । সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি ‘খেলার অধিকার ও দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ’ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতাও প্রদান করেছিলেন ।

আবেগঘন বিদায় এবং কিংবদন্তিদের চোখে মূল্যায়ন

২০১৩ সালের ১৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০০তম টেস্ট ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে চিরতরে অবসর গ্রহণ করেন শচীন টেন্ডুলকার । তাঁর সেই বিদায়বেলা গোটা ভারতকে কাঁদিয়েছিল। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার দর্শক এবং টিভির পর্দায় চোখ রাখা কোটি কোটি ভক্ত সেদিন চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। অবসর গ্রহণের পরপরই ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ (Bharat Ratna) প্রদানে ভূষিত করার ঘোষণা দেয় ।

কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব শচীন সম্পর্কে তাঁদের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও উক্তি
মহেন্দ্র সিং ধোনি “দলের জন্য তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন্ত কোচিং ম্যানুয়াল। তাঁর স্কুলপড়ুয়ার মতো উৎসাহ আমাকে মুগ্ধ করে।”
রাহুল দ্রাবিড় “তাঁর সাথে একই দলে খেলা বিশাল সম্মানের। শচীনের মতো এত পরিপূর্ণ ক্রিকেটার আর পাওয়া সম্ভব নয়।”
বীরেন্দ্র শেবাগ “শচীন টেন্ডুলকার না থাকলে আমি হয়তো জীবনে কখনো ক্রিকেট ব্যাট হাতেই তুলে নিতাম না।”
শেন ওয়ার্ন “আমি তাঁকে বিশ্বের সেরা মনে করি। তিনি এমন একজন যিনি আমার স্বপ্নে এসেও আমাকে ছক্কা মারতেন।”

ওয়াংখেড়েতে অশ্রুসিক্ত বিদায়বেলা

বিদায়ী ভাষণে শচীন তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে অবদান রাখা প্রতিটি মানুষের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে তাঁর প্রয়াত বাবা রমেশ টেন্ডুলকারকে স্মরণ করে বলেন যে, তাঁর বাবার দিকনির্দেশনা ছাড়া তিনি কখনো এই অবস্থানে পৌঁছাতে পারতেন না । তিনি তাঁর মা, স্ত্রী অঞ্জলি, এবং সন্তান সারা ও অর্জুনের আত্মত্যাগের কথাও উল্লেখ করেন, যাঁদের কারণে তিনি ক্রিকেটে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পেরেছিলেন । দর্শকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “সময় খুব দ্রুত কেটে গেছে, কিন্তু আপনারা আমাকে যে স্মৃতি দিয়েছেন তা চিরকাল আমার সাথে থাকবে। বিশেষ করে ‘শচীন, শচীন’ ধ্বনিটি আমার কানে বাজবে আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত” । এই কথাগুলো শুনে সেদিন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে এক পিনপতন নীরবতা এবং আবেগের বন্যা বয়ে গিয়েছিল ।

সমসাময়িকদের চোখে মাস্টার ব্লাস্টার

বিশ্বের বড় বড় কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা শচীনকে সর্বকালের সেরা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে তাঁর তুলনার কথা সর্বজনবিদিত। সতীর্থ হিসেবে মহেন্দ্র সিং ধোনির মতে, শচীন দলের জন্য একজন আস্ত কোচিং ম্যানুয়ালের মতো ছিলেন । কপিল দেব বলেছেন, শচীন দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়াদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন । ম্যাথু হেইডেন, রিকি পন্টিং এবং গ্লেন ম্যাকগ্রারাও তাঁর টেকনিক ও মানসিক দৃঢ়তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। শেন ওয়ার্ন তো তাঁকে ‘সুপারহিউম্যান’ আখ্যা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে দুই দশক ধরে এত বিপুল প্রত্যাশার চাপ সামলে সেরা ফর্মে থাকা অবিশ্বাস্য । এই উদ্ধৃতিগুলোই প্রমাণ করে যে শচীন শুধু ভক্তদের কাছে নয়, বরং প্রতিপক্ষ এবং সতীর্থদের কাছেও কতটা শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।

শচীন টেন্ডুলকারের জন্মদিন ও তাঁর অমর উত্তরাধিকার

একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে শচীন টেন্ডুলকার যেভাবে নিজেকে বিশ্ব ক্রীড়ার এক অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছিলেন, তা সত্যিই রূপকথার মতো। ২৪ বছর ধরে প্রত্যাশার পাহাড় প্রমাণ চাপ কাঁধে নিয়ে তিনি ভারতকে বিশ্বের বুকে একটি শক্তিশালী ক্রীড়া পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ক্রিকেটীয় রেকর্ডের বাইরে গিয়ে তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’ (Playing It My Way)-এর মাধ্যমে শিখিয়েছেন কীভাবে চরম সাফল্যের মাঝেও পা মাটিতে রাখতে হয় এবং শৃঙ্খলার সাথে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হয় ।

শচীন টেন্ডুলকারের জন্মদিন তাই শুধু কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্মবার্ষিকী নয়, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের এক স্বর্ণযুগের উদযাপন এবং অগণিত মানুষের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস। একজন খেলোয়াড় হিসেবে তিনি যেমন সফল, তেমনি একজন সমাজসেবক, একজন আদর্শ পারিবারিক মানুষ এবং তরুণদের মেন্টর হিসেবেও তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সময়ের সীমানা পেরিয়ে, রেকর্ড বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে শচীন টেন্ডুলকার এবং তাঁর রেখে যাওয়া এই অসামান্য উত্তরাধিকার আগামী শত শত বছর ধরে ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।

সর্বশেষ