ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্যের মাঝে এক ঐতিহাসিক পদচারণা

সর্বাধিক আলোচিত

পুরান ঢাকার সরু গলি, রিকশার টুংটাং শব্দ আর বাকরখানির ম-ম গন্ধ—এসবের মাঝেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছরের পুরোনো সব দালান। প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে আমরা এই রাস্তাগুলো দিয়ে ছুটে চলি, কিন্তু খুব কম সময়ই থমকে দাঁড়িয়ে পুরোনো এই ইটের দেয়ালগুলোর চাপা পড়া গল্প শোনার চেষ্টা করি। ১৬০৮ সালে সুবেদার ইসলাম খান চিশতি যখন বুড়িগঙ্গার তীরে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামে রাজধানী স্থাপন করেন, তখন থেকেই মূলত এই শহরের চেহারা বদলাতে শুরু করে। এরপর মোঘলদের লাল ইটের গাঁথুনি, ব্রিটিশদের ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্টাইল এবং আধুনিক যুগের কংক্রিটের ভিড়ে ঢাকা আজকের এই মেগাসিটিতে রূপ নিয়েছে।

আধুনিক কাঁচের বহুতল ভবনের ভিড়ে ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্য আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই শহরের গৌরবময় অতীত ও আভিজাত্যকে। ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে আজ আমরা ঢাকা শহরের সেই ঐতিহাসিক পথ ধরে একটু লম্বা সময় নিয়ে হেঁটে আসব। খুঁটিয়ে দেখব ইট-পাথরের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অজানা সব উপাখ্যান।

মোঘল সাম্রাজ্যের রাজকীয় ছোঁয়া ও আভিজাত্য

মোঘলরা শুধু ঢাকাকে একটি প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবেই গড়ে তোলেনি, তারা এই শহরের বুকে স্থায়ীভাবে এঁকে দিয়ে গেছে তাদের নিজস্ব রুচি আর রাজকীয় আভিজাত্য। এই সময়ের ভবনগুলোতে মূলত লাল ইট, চুন-সুরকি, বহু-খাঁজকাটা খিলান এবং গম্বুজের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। তাদের তৈরি দুর্গ, বিশাল মসজিদ এবং বণিকদের জন্য তৈরি সরাইখানাগুলো সেসময়ের ঢাকার প্রবল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা প্রমাণ করে। সেই সময়ের কারিগরদের নিখুঁত নির্মাণশৈলী আজও প্রত্নতত্ত্ববিদদের অবাক করে দেয়। মোঘল আমলের প্রধান কিছু স্থাপনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।

স্থাপনার নাম নির্মাণের সময়কাল মূল স্থপতি বা নির্মাতা স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য বর্তমান অবস্থা
লালবাগ কেল্লা ১৬৭৮ – ১৬৮৪ আজম শাহ ও শায়েস্তা খান তিন গম্বুজ মসজিদ, হাম্মামখানা সংরক্ষিত জাদুঘর
হোসেনী দালান ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দ সৈয়দ মুরাদ প্রশস্ত প্রাঙ্গণ, রুপার কারুকাজ ব্যবহৃত ও সংরক্ষিত
খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ ১৭০৪ – ১৭০৫ খান মোহাম্মদ মৃধা উঁচু প্ল্যাটফর্ম, নিচে তাহখানা সংরক্ষিত

লালবাগ কেল্লা ও অসমাপ্ত এক স্বপ্ন

বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত লালবাগ কেল্লা মোঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এর আদি নাম ছিল ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’। সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে শাহজাদা আজম শাহ এর নির্মাণকাজ শুরু করলেও সুবেদার শায়েস্তা খানের আমলে এর কাজ সবচেয়ে বেশি এগোয়। কিন্তু শায়েস্তা খানের আদরের মেয়ে ইরান দুখত রহমত বানু, যাকে আমরা ‘পরী বিবি’ নামে চিনি, তার অকাল মৃত্যুর পর শায়েস্তা খান এই কেল্লার নির্মাণকাজ অশুভ মনে করে চিরতরে থামিয়ে দেন। কেল্লার ঠিক মাঝখানে থাকা পরী বিবির মাজারটি সম্পূর্ণ রাজমহলের কালো কষ্টিপাথর, রাজপুতানার সাদা মার্বেল আর বিভিন্ন রঙের টালি দিয়ে সাজানো, যা পুরো বাংলাদেশে সম্পূর্ণ বিরল একটি কাজ। বর্তমানে এর সুনিপুণ বাগান, হাম্মামখানা (গোসলখানা) এবং জাদুঘর প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীকে মোঘলদের বিলাসবহুল জীবনের গল্প শোনায়।

হোসেনী দালান ও শিয়া স্থাপত্যের নিপুণ ছাপ

পুরান ঢাকার বকশীবাজার এলাকার কাছে অবস্থিত হোসেনী দালান মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের একটি শোক পালনের স্থান বা ইমামবাড়া। মীর মুরাদ নামের এক ব্যক্তি কারবালার মর্মান্তিক স্মরণে এই সাদা রঙের বিশাল ভবনটি তৈরি করেন। এর স্থাপত্যে মোঘল রীতির সাথে স্থানীয় আবহাওয়ার উপযোগী চমৎকার এক মিশ্রণ দেখা যায়। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এর ছাদ ধসে পড়লে নওয়াব আহসানউল্লাহ এটি পুনরায় নির্মাণ করেন এবং সমতল ছাদের বদলে গম্বুজ যুক্ত করেন। এর বিশাল তোরণ, ভেতরের প্রশস্ত প্রাঙ্গণ এবং রুপার সুক্ষ্ম কারুকাজ যে কাউকেই মুগ্ধ করতে বাধ্য।

খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ এবং প্ল্যাটফর্ম স্থাপত্য

লালবাগ কেল্লার খুব কাছেই আতশখানা এলাকায় অবস্থিত খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদটি ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্যে কিছুটা ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। এটি সমতল ভূমিতে তৈরি না হয়ে মাটি থেকে প্রায় ১৭ ফুট উঁচু একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত। প্ল্যাটফর্মের নিচের অংশটিতে খিলানযুক্ত বেশ কিছু কক্ষ বা ‘তাহখানা’ রয়েছে, যা মূলত গরমের দিনে শীতল থাকার জন্য এবং আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হতো। এই উঁচু প্ল্যাটফর্মে উঠে নামাজ পড়ার রীতিটি সেসময়ের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।

Dhaka Architectural Heritage

ঔপনিবেশিক আমলের ইন্দো-ইউরোপীয় ফিউশন

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঢাকায় ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়তে থাকে। মোঘলদের ঐতিহ্যবাহী লাল ইটের খিলান জায়গা ছেড়ে দিতে শুরু করে ইউরোপীয় রেনেসাঁ, নিও-ক্লাসিক্যাল এবং ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্য রীতির কাছে। এই সময়ে তৈরি ভবনগুলোতে বড় বড় জানালা, প্রশস্ত বারান্দা, ঢালাই লোহার ব্যবহার এবং করিন্থিয়ান পিলারের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। ব্রিটিশ শাসনামল এবং স্থানীয় জমিদারদের রুচির সংমিশ্রণ ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্য-কে একেবারেই এক নতুন ও আকর্ষণীয় মাত্রা দিয়েছিল। সেসময়ের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ভবনের ব্যবহার এবং নির্মাণশৈলীর রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো।

স্থাপনার নাম স্থাপত্য রীতি মূল ব্যবহার (তখন) বর্তমান ব্যবহার বা অবস্থা
আহসান মঞ্জিল ইন্দো-সারাসেনিক নওয়াবদের বাসভবন জাতীয় জাদুঘর শাখা
কার্জন হল ইন্দো-সারাসেনিক টাউন হল (পরিকল্পিত) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ
রোজ গার্ডেন প্যালেস রেনেসাঁ ও নিও-ক্লাসিক্যাল জমিদারদের প্রমোদভবন সংরক্ষিত (সরকারি মালিকানা)

আহসান মঞ্জিল ও বুড়িগঙ্গার গোলাপি প্রাসাদ

একসময় বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে নৌকায় করে ঢাকায় প্রবেশ করলেই সবার আগে চোখে পড়ত এই বিশাল গোলাপি রঙের প্রাসাদটি। এটি মূলত ফরাসিদের একটি বাণিজ্য কুঠি ছিল, যা পরবর্তীতে খাজা আলিমুল্লাহ কিনে নেন এবং নওয়াব আব্দুল গনি একে একটি পরিপূর্ণ প্রাসাদে রূপ দেন। আহসান মঞ্জিল শুধু একটি ইমারত নয়, এটি নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মতো অনেক বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনার নীরব সাক্ষী। এর বিশাল গম্বুজ, নদীমুখী চওড়া সিঁড়ি, কাঠের চমৎকার মেঝে এবং ইউরোপীয় ধাঁচের বারান্দাগুলো সেই আমলের নওয়াবদের সীমাহীন বিত্তবৈভবের প্রমাণ দেয়।

কার্জন হল ও ইন্দো-সারাসেনিক আভিজাত্য

লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন কার্জন হল মূলত ব্রিটিশ ও মোঘল স্থাপত্যের এক অসাধারণ ফিউশন, যাকে ইন্দো-সারাসেনিক রীতি বলা হয়। ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নামানুসারে তৈরি এই ভবনটি প্রথমে টাউন হল এবং লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা থাকলেও পরে এটি ঢাকা কলেজের অংশ হয়। বর্তমানে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ছত্রী (ছোট গম্বুজ আকৃতির প্যাভিলিয়ন), ঘোড়ার খুরের মতো খিলান এবং গাঢ় লাল ইটের গাঁথুনি ফটোগ্রাফারদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য।

রোজ গার্ডেন প্যালেস ও বিনোদনের একাল-সেকাল

টিকাতুলির কে এম দাস লেনে অবস্থিত রোজ গার্ডেন প্যালেসের পেছনের গল্পটা বেশ চমকপ্রদ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জমিদার হৃষিকেশ দাস বলধা গার্ডেনের এক অনুষ্ঠানে অপমানিত হয়ে জেদের বশবর্তী হয়ে এই বিশাল প্রমোদভবনটি তৈরি করেন। করিন্থিয়ান কলাম, ইতালিয়ান মার্বেলের মূর্তি এবং সামনে বিশাল এক গোলাপ বাগান—সব মিলিয়ে এটি ছিল ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্টাইলের এক নিখুঁত উদাহরণ। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে এই ভবনেই ঐতিহাসিক ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ (বর্তমান আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠিত হয়।

ধর্মীয় স্থাপত্যে বৈচিত্র্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

ঢাকা শহরকে অনেকেই ‘মসজিদের শহর’ বলে থাকেন, তবে গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই শহরে মন্দির, গির্জা এবং প্যাগোডাও সমান ঐতিহ্যের দাবিদার। শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের ও বর্ণের মানুষ এখানে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে, আর তার স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে এখানকার দালানকোঠায়। এই বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা প্রমাণ করে এই শহর সবসময়ই সব মতাদর্শকে আপন করে নিয়েছে। এই উপাসনালয়গুলোর বিশেষত্ব এবং ঐতিহ্যের একটি ঝলক নিচে দেওয়া হলো।

উপাসনালয়ের নাম ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্টতা বিশেষত্ব ও আকর্ষণ বর্তমান অবস্থা
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির হিন্দু ধর্ম ঢাকার নামকরণ, সেন আমলের ইতিহাস নিয়মিত উপাসনা হয়
তারা মসজিদ ইসলাম ধর্ম চিনামাটির ভাঙা টুকরোর নকশা (চিনিটিকরি) ব্যবহৃত ও সংরক্ষিত
আর্মেনিয়ান চার্চ খ্রিস্টান ধর্ম (আর্মেনীয়) ১৭৮১ সালের প্রাচীন কবরস্থান দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ও আদি ইতিহাস

পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির বলা হয়। কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন দ্বাদশ শতাব্দীতে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকের মতেই এই ‘ঢাকেশ্বরী’ বা ‘ঢাকার ঈশ্বরী’ নাম থেকেই ঢাকা শহরের নামকরণ হয়েছে। মূল মন্দির প্রাঙ্গণে চারটি শিব মন্দির রয়েছে, যেগুলো বাংলার চিরায়ত ‘চালা’ রীতির অনুকরণে তৈরি। শত শত বছর ধরে সংস্কারের ফলে এর আদি রূপ কিছুটা বদলালেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি।

তারা মসজিদ এবং চিনিটিকরি নকশার জাদু

আরমানিটোলার তারা মসজিদ আক্ষরিক অর্থেই তারার মতো জ্বলজ্বল করে। উনিশ শতকের শুরুতে মির্জা গোলাম পীর এটি নির্মাণ করলেও পরবর্তীতে আলী জান বেপারী নামের এক ব্যবসায়ী এর বাইরের অংশে ‘চিনিটিকরি’ কাজ যোগ করেন। চিনিটিকরি হলো ভাঙা চিনামাটির প্লেট ও কাপের টুকরো দিয়ে তৈরি মোজাইক নকশা। মোঘল স্টাইলে তৈরি এই মসজিদে পরবর্তীতে জাপানি ফুজিয়ামা পর্বতের নকশাও যুক্ত করা হয়। মসজিদের গম্বুজ এবং দেয়ালের গায়ে হাজার হাজার তারার মোটিফ একে সারা দেশের মধ্যে অন্যতম সুন্দর একটি মসজিদে পরিণত করেছে।

আর্মেনিয়ান চার্চ ও এক ভুলে যাওয়া সম্প্রদায়

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকার নামকরণ হয়েছে মূলত আর্মেনিয়ানদের কারণে। আঠারো শতকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য তারা সুদূর আর্মেনিয়া থেকে ঢাকায় এসে এক জমজমাট বসতি গড়েছিল। ১৭৮১ সালে আগামিনাস ক্যাটাজিক নামের এক ব্যক্তির উদ্যোগে নির্মিত তাদের এই চার্চটি আজ সেই সম্প্রদায়ের টিকে থাকা একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন। চার্চের ভেতরের শান্ত পরিবেশ এবং এর প্রাঙ্গণে থাকা শত বছরের পুরনো কবরগুলোর এপিটাফ আপনাকে মুহূর্তের জন্য হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর ঢাকার বুকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

Dhaka Architectural Heritage Under Threat

আধুনিক নগরায়নের আগ্রাসন এবং বিলুপ্তপ্রায় স্মৃতি

উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসিয়ে ঢাকা আজ অনেক বদলে গেছে, যার একটা অন্ধকার দিকও রয়েছে। নতুন নতুন মেগাপ্রজেক্ট, ফ্লাইওভার এবং অ্যাপার্টমেন্ট কালচারের চাপে পুরান ঢাকার অনেক ঐতিহাসিক ভবন আজ হুমকির মুখে। আইনি জটিলতা, মালিকানা দ্বন্দ্ব এবং আমাদের চরম অবহেলার অভাবে অনেক নান্দনিক স্থাপনা চোখের সামনেই ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে এই ভবনগুলোর বর্তমান অবস্থা শুধু হতাশাজনকই নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য এক বিরাট বঞ্চনা। নিচে এমন কিছু বিপন্ন ইমারতের তালিকা দেওয়া হলো, যা হয়তো আর কয়েক বছর পর শুধু ছবিতেই দেখা যাবে।

ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার নাম মূল সমস্যা বর্তমান অবহেলিত অবস্থা
রূপলাল হাউজ অবৈধ দখলদারিত্ব শ্যামবাজারের মসলা ও পেঁয়াজের আড়ত
বড় কাটরা যথাযথ সংরক্ষণের অভাব নকশা বিকৃত, খিলান ভাঙা, প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত
ছোট কাটরা বেদখল ও অবহেলা সরু গলি আর হকারদের দোকানের আড়ালে ঢাকা

রূপলাল হাউজের করুণ পরিণতি

আহসান মঞ্জিলের ঠিক সমকক্ষ হিসেবে একসময় বুড়িগঙ্গার তীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল রূপলাল হাউজ। হিন্দু জমিদার রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস এই বিশাল প্রাসাদটি কিনেছিলেন এবং কলকাতার বিখ্যাত ‘মার্টিন অ্যান্ড কোং’ দিয়ে এর নকশা করেছিলেন। গ্রিক স্থাপত্য রীতিতে তৈরি এই ভবনের কাঠের ফ্লোরযুক্ত নাচঘরটি সেসময় পুরো ভারতবর্ষে বিখ্যাত ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আজ এই ঐতিহাসিক প্রাসাদটি শ্যামবাজারের পেঁয়াজ-রসুন আর আদার আড়তদারদের অবৈধ দখলে জর্জরিত। এর আদি সৌন্দর্য আজ ময়লার স্তূপে ঢাকা পড়ে গেছে।

বড় কাটরা ও ছোট কাটরার দীর্ঘশ্বাস

মোঘল আমলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বণিকদের থাকার সরাইখানা হিসেবে তৈরি হয়েছিল বড় কাটরা এবং ছোট কাটরা। ১৬৪৪ সালে আবুল কাসেম বড় কাটরা এবং ১৬৬৩ সালে সুবেদার শায়েস্তা খান ছোট কাটরা নির্মাণ করেন। একসময় বুড়িগঙ্গা নদী এই বড় কাটরার গা ঘেঁষে প্রবাহিত হতো। আজ অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং বেদখলের কারণে এই বিশাল স্থাপনাগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। এর বিশাল তোরণগুলো ভেঙে পড়ছে এবং মূল নকশা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে ঘিঞ্জি আবাসিক ভবনের ভিড়ে।

নর্থব্রুক হল বা লালকুঠির অবহেলা

১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুকের ঢাকা আগমন উপলক্ষে বুড়িগঙ্গার তীরে এক চমৎকার ভবন নির্মাণ করা হয়, যা নর্থব্রুক হল বা স্থানীয়দের কাছে ‘লালকুঠি’ নামে পরিচিত। মোঘল আর ইউরোপীয় স্থাপত্যের দারুণ মিশ্রণে তৈরি এই ভবনটি একসময় টাউন হল এবং লাইব্রেরি হিসেবে ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর চারপাশ অবৈধ দোকানপাট, ময়লার স্তূপ আর ঘিঞ্জি বস্তিতে এমনভাবে আটকে গেছে যে, দূর থেকে এর চূড়াটুকু দেখাও বেশ কষ্টদায়ক।

শেকড়ের সন্ধানে আমাদের শেষ কথা

ঢাকা এমন একটি শহর, যা বারবার ভেঙেছে আবার নতুন করে তার নিজের মতো করে গড়ে উঠেছে। মোঘলদের দুর্গ থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের লাল ইটের ভবন, আর নবাবদের প্রমোদভবন—সবকিছুই এই শহরের প্রাণবন্ত চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, যথাযথ আইন প্রয়োগ করে বেদখল হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার না করি, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো কেবল বইয়ের পাতা আর ইন্টারনেটেই দেখতে হবে। ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্য শুধু কিছু পুরোনো ভবনের সমষ্টি নয়; এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের শেকড়। এই শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের একার নয়, সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের সবার। আসুন, কংক্রিটের এই জঙ্গলে আমরা আমাদের ইতিহাসকে আরেকটু যত্ন করতে শিখি, যাতে আগামী প্রজন্মও গর্ব করে বলতে পারে—আমাদেরও এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ছিল।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো টিকে থাকা ইমারত কোনটি?

ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো টিকে থাকা মুসলিম ইমারত হলো ‘বিনত বিবির মসজিদ’, যা ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে নারিন্দা এলাকায় নির্মিত হয়েছিল। এটি মোঘলদের ঢাকা আগমনেরও অনেক আগের স্থাপনা।

২. আর্মেনিয়ানরা কেন সুদূর আর্মেনিয়া থেকে ঢাকায় এসেছিল?

আর্মেনিয়ানরা মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসে। তারা বিশেষ করে পাট, চামড়া এবং লবণের ব্যবসায় ব্যাপক আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং ঢাকার অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল।

৩. লালবাগ কেল্লা নির্মাণের কাজ কেন শেষ করা হয়নি?

সুবেদার শায়েস্তা খানের অতি আদরের কন্যা পরী বিবির অকাল মৃত্যু ঘটে এই কেল্লায়। কন্যার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খান মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং এই কেল্লাটিকে অশুভ মনে করে এর নির্মাণকাজ চিরতরে বন্ধ করে দেন।

৪. ঢাকার স্থাপত্য ঐতিহ্যে ‘চিনিটিকরি’ নকশা কী?

চিনিটিকরি হলো চীনামাটির বা সিরামিকের ভাঙা প্লেট ও কাপের টুকরো দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের মোজাইক নকশা। এটি তারা মসজিদ এবং পুরান ঢাকার বেশ কিছু পুরোনো ভবনের গায়ে অলংকরণ হিসেবে দেখা যায়।

৫. কার্জন হল মূলত কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল?

ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নামানুসারে ১৯০৪ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এটি মূলত ঢাকার নাগরিকদের জন্য একটি টাউন হল এবং পাঠাগার হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল, যদিও পরে তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।

৬. আহসান মঞ্জিলের মূল ভবনটি আগে কী কাজে ব্যবহৃত হতো?

আহসান মঞ্জিল যেখানে অবস্থিত, সেখানে প্রথমে ফরাসি ব্যবসায়ীদের একটি বাণিজ্য কুঠি বা গুদামঘর ছিল। পরে খাজা আলিমুল্লাহ সেটি কিনে নেন এবং তার ছেলে নওয়াব আব্দুল গনি এটিকে প্রাসাদে রূপান্তর করেন।

সর্বশেষ