আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অজানা ইতিহাস ও স্বাস্থ্য রহস্য

সর্বাধিক আলোচিত

আধুনিক বিশ্বের যান্ত্রিক জীবনে মানুষ ক্রমাগত শারীরিক ক্লান্তি এবং মানসিক অবসাদের শিকার হচ্ছে। প্রতিনিয়ত কাজের চাপ, ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারণে আমাদের শরীর ও মন তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলছে। এই নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রাচীন ভারতের এক অমূল্য উপহার হলো যোগব্যায়াম বা ইয়োগা। প্রতি বছর ২১ জুন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালিত হয়, যা আমাদের জীবনে শারীরিক এবং মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনার একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

যোগব্যায়াম শুধু কিছু শারীরিক কসরত নয়; এটি হলো শরীর, মন এবং আত্মার মধ্যে একটি নিখুঁত সেতুবন্ধন তৈরির বিজ্ঞান। এই দিনটি বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে, কৃত্রিমতা পরিহার করে প্রাকৃতিক উপায়ে সুস্থ থাকার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের উৎপত্তি, ইতিহাস ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব

যোগব্যায়ামের চর্চা প্রাচীনকাল থেকেই চলে এলেও, এটিকে একটি আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী প্রেক্ষাপট রয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে মুনি-ঋষিরা যে জ্ঞান নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, আজ তা সারা বিশ্বের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই দিনটিকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে এটি একটি আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এই দিনটিকে নিজেদের সুস্থতার অঙ্গীকার হিসেবে পালন করে।

প্রাচীন ভারতের সাধনা থেকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালনের প্রস্তাবটি প্রথম উত্থাপন করেন। তিনি তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, “যোগব্যায়াম ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অমূল্য উপহার। এটি শরীর ও মনের একতা, চিন্তা ও কাজের সমন্বয় এবং মানুষের সাথে প্রকৃতির সংযোগ স্থাপন করে।” এই প্রস্তাবটি উত্থাপনের পর বিশ্বের ১৭৭টি দেশ এটিকে সমর্থন জানায়, যা জাতিসংঘের ইতিহাসে যেকোনো প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সমর্থন পাওয়ার একটি বিরল রেকর্ড। ২১ জুন উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম দিন, যা গ্রীষ্মকালীন অয়নকাল হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন আধ্যাত্মিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনটিতে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের পথ সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত থাকে। তাই বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতার চমৎকার সমন্বয় বিবেচনা করেই এই দিনটিকে যোগ দিবস হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়।

যোগ দিবসের ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সহজে বোঝার জন্য নিচের সারণিটি লক্ষ্য করুন:

বিবরণ তথ্য
প্রস্তাব উত্থাপনকারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
প্রস্তাবের তারিখ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪
জাতিসংঘের স্বীকৃতি ১১ ডিসেম্বর ২০১৪
প্রথম উদযাপন ২১ জুন ২০১৫
সমর্থনকারী দেশ ১৭৭টি দেশ (জাতিসংঘের ইতিহাসে সর্বোচ্চ)

যোগব্যায়ামের মূল দর্শন: অষ্টাঙ্গ যোগের আটটি স্তর

যোগব্যায়ামকে অনেকেই শুধু কতগুলো শারীরিক আসন বা স্ট্রেচিং হিসেবে ভুল করে থাকেন। কিন্তু মহর্ষি পতঞ্জলির যোগসূত্র অনুযায়ী, যোগ হলো একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা বা দর্শন, যার আটটি সুনির্দিষ্ট স্তর রয়েছে। এই আটটি স্তরকে একত্রে ‘অষ্টাঙ্গ যোগ’ বলা হয়, যা একজন মানুষকে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি নৈতিক ও আত্মিক পূর্ণতার দিকে পরিচালিত করে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস এর মূল চেতনায় এই অষ্টাঙ্গ যোগের দর্শন গভীরভাবে মিশে আছে, যা আমাদের একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করে।

যম, নিয়ম থেকে শুরু করে সমাধি পর্যন্ত যোগের আটটি স্তম্ভ

অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম স্তর হলো ‘যম’, যা অহিংসা, সত্যবাদিতা এবং লোভহীনতার মতো সামাজিক নৈতিকতা শেখায়। দ্বিতীয় স্তর ‘নিয়ম’ শেখায় ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, যেমন— পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সন্তুষ্টি। তৃতীয় স্তরটি হলো ‘আসন’, যা আমরা শরীর চর্চা হিসেবে করে থাকি এবং এটি শরীরকে স্থির ও শক্তিশালী করে। চতুর্থ স্তর ‘প্রাণায়াম’ হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, যা ফুসফুসের ক্ষমতা এবং জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করে। পরবর্তী স্তরগুলো হলো প্রত্যাহার (ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ), ধারণা (মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা), ধ্যান (নিরবচ্ছিন্ন চিন্তন) এবং সমাধি (পরম প্রশান্তি বা আত্মোপলব্ধি)। এই আটটি ধাপ নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে একজন মানুষ তার জীবনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে।

অষ্টাঙ্গ যোগের আটটি স্তর এবং তাদের মূল অর্থ নিচে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

অষ্টাঙ্গ যোগের স্তর মূল অর্থ জীবনের ওপর প্রভাব
যম (Yama) সামাজিক নৈতিকতা ও আচরণবিধি সমাজের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করে
নিয়ম (Niyama) ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা ও শুদ্ধি নিজের জীবনকে সুশৃঙ্খল করে
আসন (Asana) শারীরিক ভঙ্গি বা ব্যায়াম শরীরকে রোগমুক্ত ও শক্তিশালী রাখে
প্রাণায়াম (Pranayama) শ্বাস-প্রশ্বাসের বিজ্ঞান শরীরের শক্তি ও অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ায়
ধ্যান (Dhyana) গভীর মনঃসংযোগ মস্তিষ্ককে শান্ত ও স্থির করে

সুস্বাস্থ্যের জন্য শীর্ষস্থানীয় যোগাসন ও অনুশীলনের সঠিক পদ্ধতি

সুস্বাস্থ্যের জন্য শীর্ষস্থানীয় যোগাসন

আমাদের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের যোগাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি আসনের আলাদা আলাদা উপকারিতা রয়েছে যা শরীরের নির্দিষ্ট পেশী, অস্থিসন্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে উদ্দীপ্ত করে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কর্মশালাগুলোতে কিছু নির্দিষ্ট আসনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, যা আধুনিক মানুষের সাধারণ শারীরিক সমস্যাগুলো দূর করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর। তবে এই আসনগুলো থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে সঠিক পদ্ধতি এবং নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করা অপরিহার্য।

সূর্য নমস্কার, ভুজঙ্গাসন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসনের ধাপে ধাপে নিয়ম

সূর্য নমস্কার বা সান স্যালুটেশন হলো যোগব্যায়ামের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পূর্ণাঙ্গ একটি রূপ। এটি ১২টি ভিন্ন ভিন্ন আসনের একটি চক্র, যা প্রতিদিন সকালে ৫-১০ বার করলে শরীরের বাড়তি মেদ ঝরে যায়, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং চেহারায় লাবণ্য ফিরে আসে। ভুজঙ্গাসন বা কোবরা পোজ মেরুদণ্ডের জন্য জাদুর মতো কাজ করে; এটি পিঠের ব্যথা কমায় এবং বুকের পেশী প্রসারিত করে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায়। ত্রিকোণাসন (ত্রিভুজ পোজ) কোমর ও পায়ের পেশীকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শরীরের ভারসাম্য উন্নত করে। এই আসনগুলো করার সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের সঠিক নিয়ম (কখন শ্বাস নিতে হবে এবং কখন ছাড়তে হবে) মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

গুরুত্বপূর্ণ যোগাসন এবং শারীরিক সুস্থতায় তাদের প্রভাব নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:

যোগাসনের নাম শরীরের কোন অংশে কাজ করে প্রধান স্বাস্থ্যগত উপকারিতা
সূর্য নমস্কার সম্পূর্ণ শরীর পেশীর শক্তি বৃদ্ধি, ওজন কমানো এবং এনার্জি প্রদান
ভুজঙ্গাসন মেরুদণ্ড এবং বুক পিঠের ব্যথা নিরাময় এবং ফুসফুস শক্তিশালী করা
ত্রিকোণাসন পা, কোমর এবং হিপস শরীরের ভারসাম্য বৃদ্ধি এবং কোমরের মেদ কমানো
বৃক্ষাসন স্নায়ুতন্ত্র এবং পা মনোযোগ বৃদ্ধি এবং পায়ের অস্থিসন্ধি মজবুত করা
শবাসন মস্তিষ্ক এবং স্নায়ু শারীরিক ক্লান্তি দূর করে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেওয়া

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক যোগ দিবস এর তাৎপর্য

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা আজ বিশ্বব্যাপী একটি নিরব মহামারীর আকার ধারণ করেছে। কাজের চাপ, সম্পর্কের জটিলতা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মানুষকে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাসায়নিক ওষুধের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে যোগব্যায়ামের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে মানসিক প্রশান্তি অর্জন করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানসিক সুস্থতা ছাড়া শারীরিক সুস্থতা একেবারেই মূল্যহীন। ধ্যান এবং প্রাণায়াম আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে পুনর্গঠিত করে, যা নেতিবাচক চিন্তা দূর করে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।

স্ট্রেস হরমোন হ্রাস এবং স্নায়বিক প্রশান্তি অর্জনের বিজ্ঞান

যখন আমরা মানসিক চাপে থাকি, তখন আমাদের শরীর প্রচুর পরিমাণে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে, যা আমাদের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রাণায়াম (যেমন- অনুলোম-বিলোম বা ভ্রামরী প্রাণায়াম) এবং ধ্যান করলে মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন এবং ডোপামিনের মতো ‘ফিল-গুড’ হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে তাৎক্ষণিকভাবে শান্ত করে এবং উদ্বেগ কমায়। এছাড়া, নিয়মিত যোগচর্চা মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশের আকার বৃদ্ধি করে, যা আমাদের স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতা বাড়াতে সরাসরি সহায়তা করে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যোগব্যায়ামের বিভিন্ন প্রভাব নিচের সারণিতে দেখানো হলো:

মানসিক সমস্যা যোগব্যায়ামের বৈজ্ঞানিক প্রভাব কার্যকর যোগাসন বা পদ্ধতি
অতিরিক্ত স্ট্রেস কর্টিসলের মাত্রা হ্রাস করে প্রাণায়াম এবং ধ্যান
বিষণ্ণতা এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণ বাড়ায় সূর্য নমস্কার এবং উষ্ট্রাসন
অনিদ্রা (Insomnia) মেলাটোনিন হরমোনের ভারসাম্য আনে শবাসন এবং যোগনিদ্রা
মনোযোগের অভাব মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বৃদ্ধি করে বৃক্ষাসন এবং ত্রাটক (দৃষ্টি স্থির করা)

দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে যোগাসনের জাদুকরী ভূমিকা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির পরও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি এবং থাইরয়েডের মতো জীবনধারা সম্পর্কিত রোগগুলো প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলো পুরোপুরি নিরাময় করা কঠিন হলেও, যোগব্যায়ামের মাধ্যমে এগুলোকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনেক চিকিৎসক এখন মূল চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের ‘যোগ থেরাপি’ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে এই রোগগুলোর বিরুদ্ধে প্রাকৃতিকভাবে লড়াই করার কৌশল শেখানো এবং একটি সুস্থ সমাজ গঠন করা।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে যোগব্যায়াম

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ‘মন্ডুকাসন’ বা ফ্রগ পোজ অত্যন্ত কার্যকরী, কারণ এটি সরাসরি প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়ের ওপর চাপ প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক ইনসুলিন উৎপাদনে সহায়তা করে। যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের সমস্যা রয়েছে, তারা নিয়মিত শবাসন এবং দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে রক্তচাপ দ্রুত স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে। নারীদের মধ্যে পিসিওএস (PCOS) এবং থাইরয়েডের সমস্যা এখন খুবই সাধারণ; ‘সর্বাঙ্গাসন’ এবং ‘মৎস্যাসন’ থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া নিয়মিত যোগাভ্যাস জয়েন্টের ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসের সমস্যা কমাতেও সাহায্য করে।

বিভিন্ন জটিল রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক যোগাসনগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

রোগের নাম কার্যকরী যোগাসন কীভাবে কাজ করে
ডায়াবেটিস মন্ডুকাসন এবং অর্ধ মৎস্যেন্দ্রাসন অগ্ন্যাশয়কে উদ্দীপ্ত করে ইনসুলিন তৈরি বাড়ায়
উচ্চ রক্তচাপ শবাসন এবং অনুলোম-বিলোম হার্ট রেট কমায় এবং রক্তনালী শিথিল করে
থাইরয়েড সর্বাঙ্গাসন এবং উষ্ট্রাসন গলার কাছে রক্ত চলাচল বাড়িয়ে থাইরয়েড গ্রন্থি সচল করে
হাঁপানি (Asthma) ভুজঙ্গাসন এবং গোমুখাসন ফুসফুস প্রসারিত করে এবং শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়

নতুনদের জন্য দৈনন্দিন রুটিনে যোগব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল

যেকোনো নতুন অভ্যাস শুরু করা এবং তা ধরে রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। অনেকেই উৎসাহের বশে যোগব্যায়াম শুরু করলেও কয়েকদিন পর সময়ের অভাবে বা আলসেমির কারণে তা ছেড়ে দেন। যোগব্যায়াম থেকে আসল উপকার পেতে হলে এটিকে দৈনন্দিন জীবনের রুটিনে পরিণত করতে হবে, যেমনটা আমরা প্রতিদিন ব্রাশ করা বা গোসল করার ক্ষেত্রে করে থাকি। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস আমাদের সেই প্রেরণা জোগায়, যাতে আমরা আমাদের ব্যস্ত সূচি থেকে নিজেদের জন্য মাত্র ২০-৩০ মিনিট সময় বের করতে পারি। একটি সঠিক পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক কিছু নির্দেশিকা মেনে চললে যোগচর্চা কখনোই কঠিন বা বিরক্তিকর মনে হবে না।

সময় নির্ধারণ, সঠিক পরিবেশ এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখার উপায়

যোগব্যায়াম করার জন্য ভোরবেলা হলো সবচেয়ে আদর্শ সময়, কারণ এ সময় পরিবেশ শান্ত থাকে এবং বাতাস বিশুদ্ধ থাকে। তবে সকালে সময় না পেলে সন্ধ্যায়ও অনুশীলন করা যেতে পারে, তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন পেট খালি থাকে (ভারী খাবার খাওয়ার অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা পর)। একটি সমতল স্থানে যোগা ম্যাট বিছিয়ে, আরামদায়ক ও ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরে ব্যায়াম শুরু করা উচিত। প্রথমদিকে কঠিন আসন চেষ্টা করে শরীরকে কষ্ট দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; বরং সহজ স্ট্রেচিং, ঘাড় ঘোরানো এবং গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা উচিত। ধৈর্য ধরে প্রতিদিন একই সময়ে অনুশীলন করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শরীরে একটি জাদুকরী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

নতুনদের জন্য যোগব্যায়াম শুরু করার একটি আদর্শ রুটিন নিচের সারণিতে দেওয়া হলো:

ধাপ করণীয় বিষয়সমূহ গুরুত্বপূর্ণ টিপস
প্রস্তুতি সঠিক স্থান ও সময় নির্বাচন আলো-বাতাস পূর্ণ শান্ত ঘর বেছে নিন
ওয়ার্ম-আপ (৫ মিনিট) ঘাড়, হাত ও পায়ের জয়েন্ট ঘোরানো শরীরকে যোগাসনের জন্য প্রস্তুত করে
মূল আসন (১০-১৫ মিনিট) সহজ কিছু আসন (যেমন- বৃক্ষাসন, ভুজঙ্গাসন) শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে করুন
প্রাণায়াম (৫ মিনিট) অনুলোম-বিলোম বা গভীর শ্বাস নেওয়া ফুসফুস পরিষ্কার করে এবং মন শান্ত করে
বিশ্রাম (৫ মিনিট) শবাসনে শুয়ে থাকা ব্যায়ামের পর শরীরকে সম্পূর্ণ রিলাক্স করে

কর্পোরেট কর্মক্ষেত্রে এবং পেশাজীবীদের জন্য যোগব্যায়াম

আধুনিক কর্পোরেট পেশাজীবীরা প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ডেস্কে বসে কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাজ করেন। এই দীর্ঘস্থায়ী আসীন জীবনযাত্রার কারণে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের তীব্র ব্যথা (যাকে টেক-নেক বলা হয়) এবং চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা মহামারীর আকার নিয়েছে। এর ফলে কর্মীদের কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। এই সমস্যার অন্যতম সমাধান হলো কর্মক্ষেত্রে ছোট ছোট ‘যোগা ব্রেক’ নেওয়া। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান এখন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালনের পাশাপাশি সারা বছর ধরে তাদের অফিসে কর্মীদের জন্য যোগব্যায়াম সেশন পরিচালনা করছে।

চেয়ার যোগা, চোখের ব্যায়াম এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ

কর্মক্ষেত্রে যোগব্যায়াম করার জন্য আলাদা কোনো ম্যাট বা পোশাকের প্রয়োজন নেই। চেয়ারে বসেই ‘চেয়ার যোগা’ অনুশীলন করা সম্ভব। যেমন— চেয়ারে সোজা হয়ে বসে মেরুদণ্ড ডানে ও বামে ঘোরানো (সিটেড টুইস্ট), দুই হাত উপরের দিকে প্রসারিত করে স্ট্রেচ করা, এবং ঘাড় ধীরে ধীরে চারপাশে ঘোরানো। যারা সারাদিন কম্পিউটারে কাজ করেন, তারা প্রতি ১ ঘণ্টা পর পর দুই হাতের তালু একসাথে ঘষে গরম করে চোখের ওপর রাখলে (যাকে পামিং বলা হয়) চোখের স্নায়ুগুলো দারুণ বিশ্রাম পায়। কাজের ফাঁকে মাত্র ৫ মিনিটের এই চেয়ার যোগা এবং চোখের ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দেয়, ক্লান্তি দূর করে এবং কাজের প্রতি ফোকাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অফিসের ডেস্কে বসে করার মতো কিছু সহজ যোগব্যায়াম নিচে তুলে ধরা হলো:

কর্পোরেট সমস্যা সহায়ক চেয়ার যোগা / ব্যায়াম সরাসরি উপকারিতা
ঘাড় ও কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া নেক রোলস (Neck Rolls) ঘাড়ের পেশীর আড়ষ্টতা দূর করে
চোখের ক্লান্তি ও শুষ্কতা পামিং এবং আই রোটেশন চোখের স্নায়ু শিথিল করে দৃষ্টি সতেজ রাখে
পিঠের নিচের দিকে ব্যথা সিটেড স্পাইনাল টুইস্ট মেরুদণ্ড ফ্লেক্সিবল বা নমনীয় রাখে
মানসিক চাপ ও একঘেয়েমি চেয়ারে বসে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়

শিশু এবং বয়স্কদের জীবনে যোগব্যায়ামের ইতিবাচক প্রভাব

যোগব্যায়ামের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর সর্বজনীনতা; এটি ৭ বছরের একটি শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছরের একজন বৃদ্ধ— সবার জন্যই সমানভাবে উপকারী। শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সময় যোগব্যায়াম একটি শক্ত ভিত তৈরি করে দেয়। অন্যদিকে, বয়স্কদের জন্য এটি তাদের পড়ন্ত বয়সে শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে এবং বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগ থেকে দূরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পরিবারে সুস্থতার চর্চা শুরু করা উচিত একেবারে শিশু বয়স থেকে এবং তা বজায় রাখা উচিত আমৃত্যু।

শিশুদের শারীরিক বিকাশ এবং বয়স্কদের জয়েন্টের ব্যথা নিরাময়

শিশুদের নিয়মিত তাদাসন, বৃক্ষাসন বা সূর্য নমস্কার করালে তাদের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। বর্তমান যুগে স্মার্টফোনে আসক্ত শিশুদের জন্য যোগব্যায়াম হতে পারে চমৎকার একটি বিকল্প। অন্যদিকে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে ভারোত্তোলন বা দৌড়ানোর মতো ভারী ব্যায়াম করা সম্ভব নয়। তাদের জন্য যোগব্যায়ামের হালকা স্ট্রেচিং এবং জয়েন্টের ব্যায়ামগুলো আশীর্বাদস্বরূপ। এটি তাদের আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা কমায়, শরীরের ভারসাম্য উন্নত করে (ফলে পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমে), এবং অ্যালঝেইমারস বা ভুলে যাওয়ার মতো স্নায়বিক রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রাণায়াম তাদের ফুসফুসকে সচল রাখে এবং বার্ধক্যের বিষণ্ণতা দূর করে।

শিশু এবং বয়স্কদের জন্য যোগব্যায়ামের ভিন্নধর্মী উপকারিতাগুলো নিচের সারণিতে দেখুন:

বয়সসীমা মূল শারীরিক/মানসিক সুবিধা সহায়ক যোগাসন ও পদ্ধতি
শিশু ও কিশোর উচ্চতা বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তি ও ফোকাস বাড়ানো তাদাসন, বৃক্ষাসন এবং সূর্য নমস্কার
প্রাপ্তবয়স্ক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ ভুজঙ্গাসন, উষ্ট্রাসন এবং প্রাণায়াম
বয়স্ক নাগরিক বাতের ব্যথা কমানো, স্মৃতিশক্তি অটুট রাখা হালকা স্ট্রেচিং, শবাসন এবং অনুলোম-বিলোম

সুস্থ, সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবনের পথে আপনার চূড়ান্ত পদক্ষেপ

বর্তমান যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের যতই প্রসার ঘটুক না কেন, ওষুধের ওপর নির্ভরশীল জীবন কখনোই প্রকৃত অর্থে সুস্থ জীবন হতে পারে না। প্রাকৃতিক উপায়ে শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী এবং মনকে প্রশান্ত রাখার অন্যতম সেরা উপায় হলো যোগাভ্যাস। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডার ইভেন্ট নয়; এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী আহ্বান।

প্রাচীন মুনি-ঋষিদের এই জ্ঞানকে আধুনিক বিজ্ঞানও আজ বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছে। আপনি ছাত্র, কর্পোরেট পেশাজীবী, গৃহিণী বা বয়স্ক— যাই হোন না কেন, যোগব্যায়াম আপনার জীবনের মান উন্নয়নে জাদুর মতো কাজ করবে। প্রতিদিন মাত্র ২০ মিনিট সময় নিজের শরীর ও মনের জন্য বিনিয়োগ করুন। আজই শুরু করা এই ছোট অথচ ইতিবাচক পদক্ষেপটি আপনাকে আগামী দিনে একটি রোগমুক্ত, আত্মবিশ্বাসী এবং সুন্দর জীবন উপহার দেবে।

সর্বশেষ