শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে কী হয়? লক্ষণ, কারণ ও প্রতিকার

সর্বাধিক আলোচিত

অক্সিজেন হলো মানবদেহের মূল চালিকাশক্তি। আমরা প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে বাতাস গ্রহণ করি, তার অক্সিজেন ফুসফুস থেকে রক্তে মিশে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের প্রতিটি কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করার জন্য এবং শক্তি (ATP) উৎপাদনের জন্য এই অক্সিজেনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। একজন সুস্থ মানুষের রক্তে অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা বা স্যাচুরেশন (SpO2) সাধারণত ৯৫% থেকে ১০০% এর মধ্যে থাকে। কিন্তু নানা কারণে এই মাত্রা নিচে নেমে যেতে পারে। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে নানাবিধ শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়, যা সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা অক্সিজেনের ঘাটতির কারণ, লক্ষণ, রোগ নির্ণয় এবং এটি প্রতিরোধ করার কার্যকর উপায়গুলো নিয়ে বিস্তারিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা করব।

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে কী ঘটে?

অক্সিজেন ছাড়া আমাদের শরীরের কোষগুলো শক্তি উৎপাদন করতে পারে না। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে সবার আগে মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। যখন রক্ত পর্যাপ্ত অক্সিজেন বহন করে কোষে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তখন কোষগুলো শ্বাসরোধ হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে মারা যায়।

এই অবস্থাকে অবহেলা করলে তা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্ষতি, এমনকি মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরের কারণ হতে পারে। নিচে অক্সিজেনের বিভিন্ন মাত্রা এবং তার প্রভাব তুলে ধরা হলো।

অক্সিজেনের মাত্রা (SpO2) শারীরিক অবস্থা প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
৯৫% – ১০০% স্বাভাবিক বা নরমাল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণ সুস্থভাবে কাজ করে, শক্তি উৎপাদন স্বাভাবিক থাকে।
৯০% – ৯৪% সতর্কতামূলক অবস্থা হালকা শ্বাসকষ্ট, মনোযোগের অভাব এবং ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
৮৫% – ৮৯% হাইপোক্সিয়া (Hypoxia) দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি এবং হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়।
৮৫% এর নিচে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কোমা, ব্রেন ড্যামেজ বা অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো বড় বিপদ হতে পারে।

হাইপোক্সিয়া (Hypoxia) ও হাইপোক্সেমিয়া কী?

হাইপোক্সেমিয়া হলো এমন একটি অবস্থা যখন আপনার রক্তে (ধমনীতে) অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়। আর রক্ত থেকে যখন শরীরের টিস্যু বা কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না, তখন সেই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাইপোক্সিয়া বলে। সাধারণত হাইপোক্সেমিয়ার ফলেই হাইপোক্সিয়া তৈরি হয়। এটি হঠাৎ করে হতে পারে, যাকে অ্যাকিউট হাইপোক্সিয়া বলে (যেমন হাঁপানির টান উঠলে)। আবার এটি দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরেও হতে পারে, যাকে ক্রনিক হাইপোক্সিয়া বলে (যেমন সিওপিডি রোগীদের ক্ষেত্রে)।

মস্তিষ্ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে প্রভাব

আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের মোট অক্সিজেনের প্রায় ২০ শতাংশ একাই ব্যবহার করে। তাই অক্সিজেনের অভাব হলে সবচেয়ে আগে মস্তিষ্কে এর প্রভাব পড়ে। মানুষ তার মনোযোগ হারিয়ে ফেলে, স্মৃতিভ্রম ঘটে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। অক্সিজেনের মাত্রা আরও কমে গেলে হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে যায়, কারণ হার্ট তখন শরীরে অক্সিজেন সাপ্লাই বাড়ানোর জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত পাম্প করতে শুরু করে। দীর্ঘস্থায়ী অক্সিজেনের অভাবে কিডনি এবং লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

কোষে শক্তির অভাব ও ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি

স্বাভাবিক অবস্থায় কোষ অক্সিজেন ব্যবহার করে গ্লুকোজ ভেঙে শক্তি (ATP) তৈরি করে। কিন্তু অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে কোষগুলো বিকল্প উপায়ে (অ্যানেরোবিক রেসপিরেশন) শক্তি উৎপাদনের চেষ্টা করে। এর ফলে শরীরে প্রচুর পরিমাণে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হতে থাকে। ল্যাকটিক অ্যাসিড জমে যাওয়ার কারণে পেশিতে তীব্র ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা এবং চরম ক্লান্তি দেখা দেয়, যা রোগীকে স্বাভাবিক কাজকর্মে অক্ষম করে তোলে।

অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার প্রধান কারণসমূহ

অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার প্রধান কারণসমূহ

শরীরে অক্সিজেন কমে যাওয়ার পেছনে পরিবেশগত, শারীরিক এবং রোগতাত্ত্বিক—নানা ধরনের কারণ থাকতে পারে। মূলত ফুসফুস যদি বাতাস থেকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন গ্রহণ করতে না পারে, অথবা রক্ত যদি সেই অক্সিজেন বহন করে কোষে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তখনই এই সমস্যা দেখা দেয়। পরিবেশের দূষণ থেকে শুরু করে জটিল ক্রনিক রোগ, সবকিছুই এর জন্য দায়ী হতে পারে।

কারণের ধরন নির্দিষ্ট রোগ বা অবস্থা মূল প্রভাব
ফুসফুসের সমস্যা হাঁপানি (Asthma), সিওপিডি (COPD), নিউমোনিয়া শ্বাসনালী ব্লক হওয়া বা বায়ুথলিতে পানি জমা।
রক্তের সমস্যা অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা রক্তে হিমোগ্লোবিনের অভাব অক্সিজেন পরিবহন কমায়।
পরিবেশগত কারণ উঁচু স্থানে (পাহাড়ে) ওঠা, কার্বন মনোক্সাইড দূষণ বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব বা চাপ কমে যাওয়া।
হার্ট ও ঘুমের সমস্যা কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ, স্লিপ অ্যাপনিয়া রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হওয়া এবং ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া।

ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা

ফুসফুস হলো আমাদের শরীরের অক্সিজেন কারখানা। হাঁপানি বা সিওপিডি (COPD)-এর মতো রোগ থাকলে শ্বাসনালী সরু হয়ে যায় এবং সেখানে প্রদাহ তৈরি হয়, ফলে বাতাস ঠিকমতো ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে না। এছাড়া নিউমোনিয়া, পালমোনারি ফাইব্রোসিস বা কোভিড-১৯ এর মতো ভাইরাল সংক্রমণে ফুসফুসের অ্যালভিওলাই (বায়ুথলি) তরল বা পুঁজ দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। বায়ুথলিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বাতাস থেকে অক্সিজেন কোনোভাবেই রক্তে মিশতে পারে না।

হৃদরোগ ও রক্ত সঞ্চালনের সমস্যা

ফুসফুস সঠিকভাবে অক্সিজেন গ্রহণ করলেও হার্ট যদি সেই অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পুরো শরীরে পাম্প করতে না পারে, তাহলেও হাইপোক্সিয়া দেখা দেয়। হার্ট ফেইলিউর বা জন্মগত হৃদরোগের (Congenital Heart Defects) কারণে হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে, রক্তে হিমোগ্লোবিন নামক প্রোটিন অক্সিজেন বহন করে। অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা থাকলে শরীরে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন থাকে না, ফলে ফুসফুস থেকে টিস্যু পর্যন্ত অক্সিজেন পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

জীবনযাপন, পরিবেশ ও স্লিপ অ্যাপনিয়া

উঁচু স্থানে, যেমন পাহাড়ের চূড়ায় বাতাসের চাপ কম থাকে বলে সেখানে অক্সিজেনের ঘনত্বও অনেক কম হয়। এ কারণে পাহাড়ে উঠলে অনেকেই অল্টিটিউড সিকনেস বা শ্বাসকষ্টে ভোগেন। এছাড়া অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea) এমন একটি মারাত্মক সমস্যা যেখানে ঘুমের মধ্যে মানুষের শ্বাসনালী বারবার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ঘুমের ঘোরেই রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনক হারে নিচে নেমে আসে। ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে তামাকের ধোঁয়ার কার্বন মনোক্সাইড রক্তে মিশে অক্সিজেনের জায়গা দখল করে নেয়, যা স্থায়ীভাবে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি করে।

অক্সিজেনের অভাব বোঝার উপায় ও প্রধান লক্ষণ

অক্সিজেনের ঘাটতি শরীর নিজে থেকেই কিছু সংকেতের মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দেয়। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দেয়, যা অনেকেই সাধারণ ক্লান্তি বা কাজের চাপ ভেবে ভুল করেন। তবে সঠিক সময়ে লক্ষণ চিনতে পারলে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। রোগীর বয়স এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে।

লক্ষণের ধরন প্রধান উপসর্গসমূহ কাদের বেশি হয়
প্রাথমিক লক্ষণ চরম ক্লান্তি, অস্থিরতা, বুক ধড়ফড় করা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া সব বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে
মাঝারি লক্ষণ মাথা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মনোযোগের অভাব, চোখে ঝাপসা দেখা প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে
মারাত্মক লক্ষণ নীলচে ত্বক (সায়ানোসিস), জ্ঞান হারানো, প্রলাপ বকা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে
শিশুদের লক্ষণ বুকের খাঁচা দেবে যাওয়া, ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করা, নিস্তেজ হওয়া নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে

প্রাথমিক লক্ষণসমূহ 

শুরুতেই রোগী চরম ক্লান্তি ও অবসাদ অনুভব করেন। সামান্য পরিশ্রমে বা হাঁটাহাঁটিতে হাঁপিয়ে ওঠা এর অন্যতম প্রধান লক্ষণ। শরীর তার অক্সিজেনের ঘাটতি মেটাতে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে এবং হার্টবিট অনেক বেড়ে যায় (Tachycardia)। এর পাশাপাশি হালকা মাথা ব্যথা, অস্থিরতা, অকারণে প্রচুর ঘাম হওয়া এবং সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব বা ঝিমুনি দেখা দিতে পারে।

মারাত্মক বা ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ

অবস্থা গুরুতর হলে ঠোঁট, আঙুলের ডগা, নখ এবং ত্বক নীলচে হতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘সায়ানোসিস’ (Cyanosis) বলা হয়। রোগীর শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয় এবং বুকের ভেতর মনে হয় কেউ পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। এক পর্যায়ে রোগীর কথা জড়িয়ে যায়, তিনি কোথায় আছেন তা ভুলে যান (Confusion), প্রলাপ বকতে শুরু করেন বা পুরোপুরি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী হাইপোক্সিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে আঙুলের মাথা ফুলে ড্রামস্টিকের মতো হয়ে যায়, যাকে ‘ক্লাবিং’ বলা হয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে হাইপোক্সিয়ার বিশেষ লক্ষণ

শিশুদের ফুসফুস প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে ছোট হওয়ায় তারা খুব দ্রুত অক্সিজেনের অভাবে ভোগে। শিশুদের শ্বাসকষ্ট হলে শ্বাস নেওয়ার সময় তাদের বুকের পাঁজর ভিতরের দিকে দেবে যায় (Chest indrawing)। শ্বাস ছাড়ার সময় নাক ফুলে ওঠে এবং গলা থেকে ঘোঁত ঘোঁত (Grunting) শব্দ বের হয়। শিশু দুধ পান করতে চায় না, অস্বাভাবিক কান্না করে এবং ত্বক ও ঠোঁট ফ্যাকাশে বা নীল হয়ে যায়। এমন লক্ষণ দেখলে দেরি না করে দ্রুত শিশুকে ইমার্জেন্সিতে নিতে হবে।

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা নির্ণয়ের সঠিক পদ্ধতি

অক্সিজেনের ঘাটতি সন্দেহ হলে তা দ্রুত পরিমাপ করা জরুরি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অক্সিজেনের মাত্রা মাপার বেশ কয়েকটি সহজ ও কার্যকরী উপায় রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী বাড়িতে বা হাসপাতালে এই পরীক্ষাগুলো করা হয়ে থাকে।

পরীক্ষার নাম কোথায় করা হয় সুবিধা
পালস অক্সিমিটার বাড়িতে বা ক্লিনিকে তাৎক্ষণিক ফলাফল দেয়, রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস (ABG) হাসপাতালে অক্সিজেনের পাশাপাশি কার্বন ডাইঅক্সাইড ও pH লেভেল জানা যায়।
পালমোনারি ফাংশন টেস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ফুসফুসের ধারণক্ষমতা ও কার্যকারিতা সঠিকভাবে পরিমাপ করে।

পালস অক্সিমিটার এর ব্যবহার ও সতর্কতা

অক্সিজেনের লেভেল মাপার সবচেয়ে সহজ ও বহুল ব্যবহৃত যন্ত্র হলো পালস অক্সিমিটার। এটি ইনফ্রারেড রশ্মি ব্যবহার করে ত্বকের ভেতর দিয়ে রক্তে অক্সিজেনের স্যাচুরেশন (SpO2) মাপে। এটি ব্যবহারের সময় নখে যেন নেইলপলিশ বা মেহেদি না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে, কারণ এগুলো আলোর প্রবাহে বাধা দেয়। হাত স্থির রেখে এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তর্জনী বা মধ্যমায় ক্লিপটি লাগান। রিডিং স্থির হওয়ার জন্য অন্তত এক মিনিট অপেক্ষা করুন।

আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস (ABG) টেস্ট

এটি পালস অক্সিমিটারের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল একটি ডাক্তারি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সরাসরি ধমনী (Artery) থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়, সাধারণত কব্জির ধমনী থেকে। এই টেস্টের মাধ্যমে রক্তে ঠিক কতটা অক্সিজেন (PaO2) এবং কতটা কার্বন ডাইঅক্সাইড আছে তা নিখুঁতভাবে মাপা যায়। মুমূর্ষু রোগী বা আইসিইউতে থাকা রোগীদের প্রকৃত অবস্থা জানতে চিকিৎসকরা মূলত এই টেস্টটি করে থাকেন।

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে তাৎক্ষণিক করণীয়

রক্তে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিলে প্যানিক বা আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি। আতঙ্কিত হলে বা ছটফট করলে শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা উল্টো আরও বেড়ে যায়। জরুরি চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগে বা অ্যাম্বুলেন্স আসার অপেক্ষায় বাড়িতেই কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ এর ফলে কী উপকার হয় কীভাবে করবেন
প্রোন পজিশনিং (উপুড় হওয়া) ফুসফুসের পেছনের অংশ প্রসারিত হয় এবং রক্তে অক্সিজেন বাড়ে। পেটের নিচে ও বুকের নিচে বালিশ দিয়ে উপুড় হয়ে শুতে হবে।
পার্সড-লিপ ব্রিদিং শ্বাসনালী খোলা রাখে এবং ফুসফুস থেকে আটকে থাকা বাতাস বের করে দেয়। ঠোঁট গোল করে শিস দেওয়ার মতো করে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন।
সতেজ বাতাস চলাচল ঘরে জমাট বাঁধা কার্বন ডাইঅক্সাইড দূর করে অক্সিজেন বাড়ায়। ঘরের সব জানালা-দরজা খুলে দিন এবং ভিড় কমিয়ে দিন।
টাইট পোশাক ঢিলা করা বুক প্রসারিত হতে এবং শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। গলার বোতাম, বেল্ট বা টাইট কাপড় সাথে সাথে খুলে দিন।

প্রোন পজিশনিং এর সঠিক নিয়ম

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় এই পদ্ধতিটি দারুণ জনপ্রিয়তা পায় এবং অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচায়। আমাদের ফুসফুসের একটি বিশাল অংশ পিঠের দিকে থাকে। চিত হয়ে শুয়ে থাকলে অভিকর্ষ এবং শরীরের ওজনের কারণে সেই অংশগুলো সংকুচিত থাকে। উপুড় হয়ে বুকের নিচে, পেটের নিচে এবং পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে শুলে ফুসফুস পুরোপুরি প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায়। এতে ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোতে বেশি বাতাস ঢুকতে পারে এবং রক্তে দ্রুত অক্সিজেনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এটি দিনে কয়েকবার ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত করা যেতে পারে।

প্রাথমিক চিকিৎসা ও কৃত্রিম অক্সিজেন সরবরাহ

যদি রোগীর অক্সিজেনের মাত্রা ক্রমাগত ৯২%-এর নিচে নামতে থাকে, তবে কৃত্রিম অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। যাদের বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার বা অক্সিজেন কনসেনট্রেটর (Oxygen Concentrator) আছে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত তা চালু করতে হবে। কনসেনট্রেটর সরাসরি পরিবেশের বাতাস থেকে অক্সিজেন ফিল্টার করে রোগীকে সরবরাহ করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, রোগীর যদি সিওপিডি (COPD) থাকে, তবে অতিরিক্ত অক্সিজেন দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে; তাই সব সময় ডাক্তারের নির্দেশিত ফ্লো-রেট (Flow rate) মেনে চলা উচিত।

স্বাভাবিক অক্সিজেনের মাত্রা ধরে রাখার ও বাড়ানোর উপায়

রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে, রোগ প্রতিরোধ করা উত্তম। প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন আনলে শরীরে সবসময় অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

সুস্থ থাকার উপায় করণীয় এবং কার্যকারিতা
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ডায়াফ্রাগমেটিক ব্রিদিং ফুসফুসের নিচের অংশের ধারণক্ষমতা বাড়ায়।
আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ায় এবং কোষকে ড্যামেজ থেকে রক্ষা করে।
পর্যাপ্ত পানি পান রক্তকে তরল রাখে ফলে অক্সিজেন দ্রুত শরীরের সব কোষে পৌঁছায়।
ইনডোর প্লান্ট রাখা ঘরের ভেতরের দূষিত বাতাস পরিষ্কার করে এবং অক্সিজেনের জোগান দেয়।

শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যকরী ব্যায়াম

নিয়মিত যোগব্যায়াম বা প্রাণায়াম ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করে। ‘৪-৭-৮’ (4-7-8) ব্রিদিং পদ্ধতি খুব জনপ্রিয়: ৪ সেকেন্ড নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন, ৭ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন এবং ৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। এছাড়াও ‘ডায়াফ্রাগমেটিক ব্রিদিং’ বা পেট ফুলিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস করলে ফুসফুসের পেশি শক্তিশালী হয়। দিনে অন্তত ১০-১৫ মিনিট মুক্ত বাতাসে এই ব্যায়ামগুলো করলে ফুসফুস অনেক বেশি সতেজ থাকে।

অক্সিজেন বৃদ্ধিতে খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ভূমিকা

রক্তে অক্সিজেন বহন করার দায়িত্ব হলো লোহিত রক্তকণিকার (হিমোগ্লোবিন)। আর হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রধান উপাদান হলো আয়রন ও ফলিক এসিড। তাই খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে পালং শাক, কচুশাক, গরুর কলিজা, ডাল, বিট এবং ডালিম রাখতে হবে। পাশাপাশি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: লেবু, কমলা, মাল্টা) খেতে হবে, কারণ ভিটামিন সি শরীরকে আয়রন শোষণে সাহায্য করে। তাছাড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি ও গ্রিন-টি কোষগুলোকে ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল ড্যামেজ থেকে বাঁচায় এবং অক্সিজেনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে।

দৈনন্দিন জীবনযাপন ও ইনডোর প্লান্টের ব্যবহার

পর্যাপ্ত পানি পান করা রক্ত সঞ্চালনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শরীর হাইড্রেটেড থাকলে রক্তের ভলিউম ঠিক থাকে এবং অক্সিজেন সহজেই কোষে পৌঁছাতে পারে। ধুমপান ফুসফুসের সবচেয়ে বড় শত্রু, তাই যেকোনো মূল্যে ধূমপান এবং পরোক্ষ ধূমপান (Second-hand smoke) এড়িয়ে চলতে হবে। ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখতে স্নেক প্লান্ট (Snake Plant), অ্যালোভেরা বা স্পাইডার প্লান্টের মতো কিছু ইনডোর গাছ রাখতে পারেন। এগুলো রাতেও অক্সিজেন তৈরি করে এবং ঘরের ক্ষতিকর টক্সিন শুষে নেয়।

শেষ কথা

পর্যাপ্ত অক্সিজেন হলো মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রথম ও প্রধান শর্ত। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে তা কখনো অবহেলা করা উচিত নয়, কারণ এটি কোনো সাধারণ ক্লান্তি নয় বরং শরীরের ভেতরের কোনো জটিল বা প্রাণঘাতী সমস্যার নীরব সংকেত হতে পারে। বিশেষ করে যাদের হাঁপানি, হার্টের সমস্যা, সিওপিডি বা ফুসফুসের অন্যান্য রোগ রয়েছে, তাদের সবসময় সচেতন থাকতে হবে এবং একটি মানসম্মত পালস অক্সিমিটার হাতের কাছে রাখা উচিত।

নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান ত্যাগ এবং প্রতিদিন সামান্য হলেও শারীরিক পরিশ্রম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম আপনার ফুসফুসকে শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করবে। তবে মনে রাখবেন, ঘরোয়া টোটকা কেবল প্রাথমিক সহায়ক। অক্সিজেনের মাত্রা ৯২%-এর নিচে নেমে গেলে, ঠোঁট নীল হয়ে গেলে বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে এক মুহূর্ত দেরি না করে অবশ্যই নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন।

সর্বশেষ