সাংলির বাড়ির গানের ঘরে তখন সন্ধ্যা নামছে। তানপুরার পাশে বসে এক ছাত্র রেওয়াজ করছে রাগ পূরিয়া ধানেশ্রী, দিনের আলো মরে আসার রাগ। গুরু পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর তাকে গাইতে বলে ভেতরে গেছেন কোনো কাজে। ঘরের এক কোণে খেলছে পাঁচ বছরের একটি মেয়ে। জন্মের সময় তার নাম রাখা হয়েছিল হেমা, বাবা পরে ডাকতে শুরু করেন লতা। পৃথিবী তাকে একদিন চিনবে লতা মঙ্গেশকর নামে। সেই সন্ধ্যায় শিশুটির কানে একটা স্বর এসে কাঁটার মতো বিঁধল।
ছাত্রের গলায় একটি সুর ঠিক জায়গায় পৌঁছায়নি। সামান্য ভুল, বড়রা হয়তো খেয়ালও করত না। মেয়েটি খেলা থামাল, উঠে গিয়ে ছাত্রের সামনে দাঁড়াল, তারপর স্বরটা যেমন হওয়ার কথা, ঠিক তেমন করে গেয়ে দেখাল।
দীননাথ ততক্ষণে ফিরে এসেছেন, শুনেছেন সবটা। বহু বছর পর লতা নিজেই গল্পটা বলেছেন। সে রাতে বাবা মাকে বলেছিলেন, “আমাদের ঘরেই একজন গায়িকা আছে, আর আমরা জানতামই না।”
তালিম শুরু হলো। বাবা একটা কথা বারবার বলতেন, মেয়েটি যা সারা জীবন মনে রেখেছিল: “গুরু হোক বা বাবা, যে-ই শেখাক, গাইতে বসে মনে মনে ভাববে, তুমি তার চেয়ে ভালো গাইবে।”
কিন্তু বাবার সময় ফুরিয়ে আসছিল। নাটকের দল ডুবল। দেনার দায়ে সাংলির বাড়ি নিলামে উঠল, সংসার উঠে এল পুনেতে। রক্তচাপ বাড়ল, নাক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল, তারপর মুখ দিয়েও।
১৯৪২ সালের ২৪ এপ্রিল, এক শুক্রবার সকাল এগারোটা কুড়িতে, পুনের সাসুন হাসপাতালে দীননাথ মঙ্গেশকর মারা গেলেন, আর তাঁর বড় মেয়ের তেরো বছর পূর্ণ হতে তখনো পাঁচ মাস বাকি।
ইন্দোর থেকে মুম্বাই: একটি ট্রেনের গল্প
১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইন্দোরে জন্মেছিল মেয়েটি। কিন্তু ১৯৪৫ সালে বোম্বাইগামী যে ট্রেনে সে উঠেছিল, সেটা ছেড়েছিল কোলহাপুর থেকে। মাঝখানের তিনটে বছর তাকে বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বড় করে দিয়েছিল।
বাবার মৃত্যুর পর একটা প্রশ্ন তার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। পরে নিজেই বলেছেন, তখন শুধু ভাবতেন, “কোথায় কাজ পাব? টাকা আসবে কোথা থেকে?” ঘরে মা, আর চার ভাইবোন: মীনা, আশা, ঊষা, হৃদয়নাথ। সবচেয়ে ছোটটির বয়স তখনো পাঁচ হয়নি।
দীননাথের পুরোনো বন্ধু মাস্টার বিনায়ক, নবযুগ চিত্রপটের কর্ণধার, পরিবারটার পাশে দাঁড়ালেন। কাজ মিলল, তবে গানের নয়, অভিনয়ের। মারাঠি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্র। “কিতি হাসাল” ছবির জন্য সে জীবনের প্রথম গানটা রেকর্ড করেছিল, “নাচু য়া গডে”। ছবি মুক্তির আগে গানটা কেটে বাদ দেওয়া হয়। অভিনয় সে কখনো ভালোবাসেনি। অনেক বছর পর বলেছিলেন, মেকআপ, চড়া আলো, লোকজনের হুকুম, কিছুই তাঁর ভালো লাগত না। কিন্তু তখন উপায় ছিল না।
১৯৪৫ সালে মাস্টার বিনায়কের কোম্পানি সদর দপ্তর সরিয়ে নিল বোম্বাইয়ে। মেয়েটিও গেল। ট্রেনে তার সঙ্গে কী কী ছিল, তার তালিকা কেউ রাখেনি। তবে একটা জিনিস যে ছিল, সেটা জানা যায়: বাবার সেই কথা, যে শেখাবে তার চেয়েও ভালো গাইতে হবে।
যে শহরে সে নামল, সেখানে বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হচ্ছে। রাস্তায় ভিড়, আর স্টুডিওপাড়ায় রাজত্ব করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত গলা: নূরজাহান, শামশাদ বেগম, জোহরাবাঈ আম্বালেওয়ালি। ভারী, ভরাট গলা, তখনকার কান যাতে অভ্যস্ত। এই শহর মেয়েটিকে ঠেলেও দেয়নি, টেনেও নেয়নি। শুধু খেয়াল করেনি।
দিন কাটত ছুটে ছুটে। ভেন্ডিবাজারের ওস্তাদ আমান আলি খানের কাছে তালিম, তারপর যেখানে যা কাজ মেলে। সেই বছরগুলোর কথা বলতে গিয়ে লতা মঙ্গেশকর পরে বলেছেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রেকর্ডিং আর এক স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিওতে দৌড়। কত দিন সারা দিনে খাবার দূরের কথা, এক ঢোক জলও জোটেনি। বলেছেন কোনো অভিযোগ ছাড়াই, যেন খারাপ আবহাওয়ার খবর দিচ্ছেন।
স্টুডিও থেকে আরেক স্টুডিওতে দৌড়া দৌড়ি নত, এই শহরে তার আসল পরীক্ষাটা হবে একটা অফিসঘরে, এক প্রযোজকের টেবিলের সামনে।
“এই মেয়ে দিয়ে হবে না”
ঘরটা ফিল্মিস্তানের, টেবিলের ওপাশে প্রযোজক শশধর মুখার্জি। দেশ সবে ভাগ হয়েছে। মুখার্জি তখন দিলীপ কুমার আর কামিনী কৌশলকে নিয়ে “শহীদ” ছবির কাজ করছেন। সংগীত পরিচালক মাস্টার গুলাম হায়দার সঙ্গে করে এনেছেন আঠারো বছরের এক রোগা মেয়েকে, পরনে সাদামাটা শাড়ি।
মেয়েটি গাইল। মুখার্জি শুনলেন, তারপর সংক্ষেপে রায় দিলেন: গলাটা বড্ড সরু। এই মেয়ে দিয়ে হবে না।
রায়টা অন্তত সেই সময়ের কানে অন্যায্য শোনায়নি। বোম্বাইয়ের শ্রোতা তখন নূরজাহান আর শামশাদ বেগমের ভরাট, ভারী গলায় অভ্যস্ত। তার পাশে এই গলা শোনাত সুতোর মতো পাতলা। সুতোটা যে ইস্পাতের তৈরি, সেটা বোঝার মতো কান তখনো তৈরি হয়নি।
মেয়েটি চুপ করে ছিল।
তবে গুলাম হায়দার চুপ থাকেননি। তিনি লাহোরের মানুষ। পাঞ্জাবি ঢোলের ছন্দ হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীতে এনেছিলেন তিনিই। রাগে থমথমে মুখে তিনি মুখার্জিকে বললেন, “আজ আপনি ওকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু একদিন গোটা ইন্ডাস্ট্রি এই মেয়ের জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে দেবে।” অন্য এক বর্ণনায় কথাটা আরও ধারালো: প্রযোজকেরা একদিন এর পায়ে পড়ে গান গাওয়ানোর জন্য মিনতি করবে।
মুখার্জি মত বদলাননি।
গুলাম হায়দারও থামেননি। ফিল্মিস্তানের চেয়ে বড় ব্যানার বোম্বে টকিজে গিয়ে তিনি মেয়েটির জন্য দরজা খোলালেন। ছবির নাম “মজবুর” (১৯৪৮)। গানটা তিনি শিখিয়েছিলেন স্টুডিওতে নয়, গোরেগাঁও স্টেশনে, মালাডের ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। হাতে ছিল ৫৫৫ সিগারেটের একটা টিন। টিনের গায়ে আঙুল ঠুকে তিনি তাল দিচ্ছিলেন, আর প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের মধ্যে মেয়েটি সুর তুলে নিচ্ছিল: “দিল মেরা তোড়া, মুঝে কহিঁ কা না ছোড়া।”
ছয় দশকেরও বেশি পরে লতা মঙ্গেশকর বলেছিলেন, “গুলাম হায়দার সত্যিই আমার গডফাদার। যে ইন্ডাস্ট্রি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, তিনি লড়াই করে আমাকে সেখানে ঢুকিয়েছিলেন।”
সেদিন মুখার্জির ঘর থেকে যে মেয়েটি বেরিয়ে এসেছিল, সে জানত না ঠিক কী বদলেছে। শুধু জানত, একজন মানুষ তার গলার জন্য একঘর লোকের সামনে গলা চড়িয়েছেন। বাবা চলে যাওয়ার পর এমনটা আর কেউ করেনি।
বছর ঘোরার আগেই গোটা দেশ তার গলা চিনে ফেলবে। শুধু নামটা জানবে না।
“মহল” এবং সেই রাত যখন সব বদলে গেল
১৯৪৯ সালের শেষ দিক। বোম্বাইয়ের কোনো এক ছোট ফ্ল্যাটে রেডিও বাজছে, আর তার ভেতর থেকে ভেসে আসছে একটা গলা। প্রথমে যেন অনেক দূর থেকে, তারপর একটু একটু করে কাছে। গানের নাম “আয়েগা আনেওয়ালা”, যে আসবে সে আসবেই।
যে শুনছে, সে হাতের কাজ থামিয়ে দেয়। এই গলা সে আগে শোনেনি। ভরাট নয়, ভারীও নয়। সরু, ঠিক যেমনটা শশধর মুখার্জি বলেছিলেন। কিন্তু এই সরু গলাই ঘরের সব আওয়াজ কেটে সোজা ভেতরে ঢুকে যায়।
মহল চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল সেই বছরই। অশোক কুমার আর মধুবালা অভিনয় করেছিলেন, পরিচালক কামাল আমরোহী, সুর খেমচাঁদ প্রকাশের। দূর থেকে কাছে আসার ওই প্রভাবটা কোনো যন্ত্রের কারসাজি ছিল না। বহুবার বলা গল্প: স্টুডিওর এক কোণ থেকে গাইতে শুরু করে লতা মঙ্গেশকর ধীরে ধীরে হেঁটে এসেছিলেন মাইক্রোফোনের দিকে।
অথচ গানটা প্রায় বাদ পড়তে বসেছিল। লতা পরে বলেছেন, গানটা আবার রেকর্ড করা হবে নাকি একেবারে বদলে ফেলা হবে, তা নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যা রয়ে গেল, মহলের গানগুলোর মধ্যে সেটাই সবার আগে লোকের মুখে মুখে ফিরল।
তারপর এল প্রশ্ন। গ্রামোফোন রেকর্ডের লেবেলে গায়িকার নাম লেখা “কামিনী”। কামিনী আসলে ছবিতে মধুবালার চরিত্রের নাম। যে মেয়েটি গেয়েছে, তার নাম কোথাও নেই। আজ যাঁদের আমরা বলিউড প্লেব্যাক সিঙ্গার বলি, সেই পেশার মানুষদের নাম ছাপার রেওয়াজই তখন ছিল না।
বেতারকেন্দ্রে চিঠি আসতে লাগল, একটা-দুটো নয়, হাজারে হাজারে। সব চিঠিতে একই কথা: “এই গানটা কে গাইছেন? আমরা তাঁর নাম জানতে চাই।” বেতার থেকে যোগাযোগ করা হলো এইচএমভির সঙ্গে। তারপর একদিন ঘোষকের গলায় শোনা গেল সেই বাক্য: “এই গানটি গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর।”
ব্যাপারটা একবার ভাবুন। গোটা দেশ যাঁকে শুনছে, তাঁকে কেউ দেখেনি। পর্দায় ঠোঁট নাড়ছেন মধুবালা। গলাটা আরেকজনের, যাঁর মুখ কেউ চেনে না, যাঁর নাম পর্যন্ত ছাপা হয়নি। অদৃশ্য থেকেও সবখানে পৌঁছে যাওয়া, এমন অদ্ভুত পথে খুব কম মানুষ বিখ্যাত হয়েছেন।
লতা এই অদৃশ্যতা মেনে নেননি। প্রযোজকদের তিনি বারবার জিজ্ঞেস করতেন, “আমাদের নাম দেন না কেন?” নিজেই বলেছেন, এর জন্য তাঁকে লড়তে হয়েছিল। ১৯৪৯ সালেই “বরসাত” ছবিতে প্রথমবার পর্দায় আর রেকর্ডে তাঁর নাম উঠল।
নামের লড়াই তিনি জিতলেন। এরপর এল টাকার লড়াই, আর সেই লড়াই তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেবে সবচেয়ে বেশি গান গাওয়া সহশিল্পীর গলা।
শিল্পীর অধিকার আদায়ের লড়াই
ষাটের দশকের গোড়া। একটা ঘরে বসেছেন বোম্বাইয়ের নামী গায়ক-গায়িকারা। আলোচনার বিষয় টাকা, আরও নির্দিষ্ট করে বললে রয়্যালটি। রেকর্ড বিক্রি থেকে রেকর্ড কোম্পানি প্রযোজককে রয়্যালটি দেয়। লতা মঙ্গেশকরের দাবি, তার একটা ভাগ পাওয়া উচিত যাঁরা গানটা গেয়েছেন, তাঁদেরও।
ঘরের সবচেয়ে নরম স্বভাবের মানুষটি সেদিন একমত হলেন না। মোহাম্মদ রফির যুক্তি ছিল সোজা: গান গাওয়ার পারিশ্রমিক একবার নেওয়া হয়ে গেলে লেনদেন সেখানেই শেষ।
তর্ক গরম হলো। লতার বর্ণনায়, রফি খানিকটা বিদ্রুপের সুরেই কথা বলছিলেন। তারপর বললেন, “আমি আপনার সঙ্গে আর গাইব না।” লতার জবাব ছিল ছোট আর ধারালো: “আপনি কষ্ট করতে যাবেন কেন?” অর্থাৎ সিদ্ধান্তটা তিনিই নিচ্ছেন। এরপর সুরকারদের তিনি জানিয়ে দিলেন, রফি সাহেবের সঙ্গে আর গান নয়।
যে দুটো কণ্ঠ মিলে কয়েকশো ডুয়েট গেয়েছে, তারা আলাদা হয়ে গেল। রফির পাশে গাইতে লাগলেন সুমন কল্যাণপুর, লতার পাশে মহেন্দ্র কাপুর। গান থামেনি। কিন্তু যারা মন দিয়ে শুনত, তারা টের পেত কিছু একটা নেই।
তিন বছর চলল এই নীরবতা।
বরফ গলানোর কৃতিত্ব সাধারণত দেওয়া হয় সুরকার জয়কিষণকে। ১৯৬৭ সালে শচীন দেব বর্মনের জন্য আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুজনে আবার এক মঞ্চে উঠলেন, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গাইলেন। সেদিন মঞ্চের পেছনে কে কাকে কী বলেছিলেন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য বিবরণ নেই। যা আছে, তা পরের দশকগুলোর দুটো পরস্পরবিরোধী গল্প।
লতা পরে দাবি করেছিলেন, রফি তাঁকে চিঠি লিখে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। রফির পরিবার আর অনুরাগীরা সেই দাবি প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছেন। রফি ততদিনে বেঁচে নেই, ১৯৮০ সালেই চলে গেছেন। চিঠির প্রশ্নের নিষ্পত্তি তাই কোনোদিন হবে না।
তবে দুটো জিনিস নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। রফির মৃত্যুর পর লতা মঙ্গেশকর বারবার বলেছেন, রফির গলার বিস্তারের সঙ্গে আর কারো তুলনা চলে না। আর রয়্যালটির লড়াইটা তিনি ছাড়েননি। ২০১৩ সালে, তিরাশি বছর বয়সে, গায়কদের রয়্যালটি আদায়ের জন্য গড়া সংগঠনের সভাপতি ছিলেন লতা মঙ্গেশকর নিজেই।
ঝগড়াটা ছিল টাকা নিয়ে, শ্রদ্ধাটা গান নিয়ে। অথচ ঠিক এই দশকের গোড়াতেই, সহশিল্পীর সঙ্গে সম্পর্ক যখন তেতো হয়ে উঠছে, একটা গান লতাকে তুলে দিয়েছিল এমন এক মঞ্চে, যার সামনের সারিতে বসে ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
১৯৬২: যে রাতটা ইতিহাস হয়ে গেল
গল্পের শুরু ১৯৬২ সালের শেষ দিকে, মাহিমের সমুদ্রসৈকতে। চীনের সঙ্গে যুদ্ধ সবে থেমেছে, হিমালয়ের বরফে পড়ে আছে ভারতীয় সৈন্যদের দেহ। কবি প্রদীপ সৈকতে হাঁটছিলেন, হঠাৎ কয়েকটা লাইন মাথায় এল। সঙ্গে কাগজ নেই। অচেনা এক পথচারীর কাছ থেকে কলম চেয়ে নিয়ে তিনি সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়লেন, আর ভেতরের রাংতায় লিখে ফেললেন প্রথম স্তবক।
কয়েক সপ্তাহ পর প্রযোজক মেহবুব খান অনুরোধ করলেন, দিল্লিতে সেনা-তহবিলের এক অনুষ্ঠানের জন্য একটা গান চাই। প্রদীপ রাজি হলেন, সুরের ভার দিলেন সি. রামচন্দ্রকে, আর গাওয়ার জন্য চাইলেন লতা মঙ্গেশকরকে।
লতা প্রথমে না বলেছিলেন। পরে নিজেই স্বীকার করেছেন, তখন দিনরাত কাজ চলছে, একটা গানের পেছনে আলাদা করে সময় দেওয়া অসম্ভব মনে হয়েছিল। প্রদীপ নাছোড়। শেষে লতা রাজি হলেন এক শর্তে: মহড়ায় প্রদীপকে থাকতে হবে। কথা ছিল গানটা আশা ভোঁসলের সঙ্গে ডুয়েট হবে। দিল্লি রওনা হওয়ার ঠিক আগে আশা সরে দাঁড়ালেন। লতাকে একাই যেতে হলো।
অনুষ্ঠানের জায়গা আর তারিখ নিয়ে নথিপত্রে গরমিল আছে। কোথাও লেখা ২৬ জানুয়ারি, ন্যাশনাল স্টেডিয়াম, বহু স্মৃতিকথায় ২৭ জানুয়ারি, রামলীলা ময়দান। সাল নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই: ১৯৬৩। সামনে রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, আর জানুয়ারির দিল্লির ঠান্ডায় জড়োসড়ো হাজারো মানুষ। লতা পরে বলেছেন, সেদিন তিনি ভীষণ নার্ভাস ছিলেন।
তারপর শুরু হলো “অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগো”। গানে যুদ্ধজয়ের কোনো কথা নেই। আছে তাদের কথা, যারা ফেরেনি।
লতা মঙ্গেশকরের সবচেয়ে বিখ্যাত গান কোনটি, এই প্রশ্নে বেশিরভাগ মানুষ একটি নামই বলেন: “অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগো”। কবি প্রদীপের লেখা, সি. রামচন্দ্রের সুর করা এই দেশাত্মবোধক গান ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মরণে রচিত। ১৯৬৩ সালের জানুয়ারিতে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সামনে লতা এটি প্রথম গেয়েছিলেন, আর পরে একে বলতেন নিজের সিগনেচার টিউন।
গান শেষ হলে নেহরু তাঁকে ডেকে পাঠালেন। প্রধানমন্ত্রীর চোখ তখনো ভেজা। তিনি বললেন, “বেটি, তুমি আজ আমাকে কাঁদিয়ে দিলে।” তারপর সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে চায়ের আসরে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়েই দ্রুত সরে গেলেন, যেন আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়।
যিনি গানটা লিখেছিলেন, সেদিন তিনি সেখানে ছিলেন না। প্রদীপকে নিমন্ত্রণই করা হয়নি। পঞ্চাশ বছর পর লতা বলেছিলেন, “আমার আফসোস, প্রদীপজিকে ডাকা হয়নি। তিনি থাকলে নিজের চোখে দেখতেন গানটা কী করেছিল।” অথচ গানটা নিয়ে আশা ছিল শুধু প্রদীপেরই। লতাকে তিনি বলেছিলেন, “দেখো লতা, এই গান অনেক দিন চলবে। মানুষ চিরকাল মনে রাখবে।” গানের রয়্যালটি তাঁরা সবাই মিলে দিয়ে গেছেন যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের বিধবাদের তহবিলে।
এক দেশের প্রধানমন্ত্রী সেদিন তাঁর গান শুনে কেঁদেছিলেন। সীমান্তের ওপারে আরেক দেশের কাছে সেই একই গলা একদিন হয়ে উঠবে অস্বস্তির নাম।
সীমানা পেরিয়ে
১৯৫১ সাল। অমৃতসরের কাছে আটারি-ওয়াঘা সীমান্তের শূন্যরেখা। এক পাশে লতা মঙ্গেশকর আর সুরকার সি. রামচন্দ্র, অন্য পাশে লাহোর থেকে আসা নূরজাহান আর তাঁর স্বামী। যে ভরাট গলার পাশে একদিন লতার গলাকে “সরু” মনে হতো, দেশভাগের পর সেই গলা এখন আরেক রাষ্ট্রের।
রেকর্ডিংয়ের কাজে অমৃতসরে এসে লতা নূরজাহানের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। ফোনে কথা হলো, ঠিক হলো সীমান্তেই দেখা হবে। রামচন্দ্র পরে লিখে গেছেন কী ঘটেছিল। নূরজাহান দৌড়ে এলেন, দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর মতো, দুজনেই কাঁদছিলেন। দুই পাশের পাহারাদার সৈন্যরাও চোখ মুছছিল। ওপার থেকে এল লাহোরের মিষ্টি, এপার থেকে গেল ভারতের খাবার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প চলল। রামচন্দ্রের কথায়, “কয়েক ঘণ্টা পর আমরা ফিরলাম ভেজা চোখে।”
যে মানুষটা লতার গলার জন্য প্রযোজকের ঘরে গলা চড়িয়েছিলেন, সেই গুলাম হায়দারও ততদিনে লাহোরে। ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়, মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে।
তারপর এল ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ। পাকিস্তানে ভারতীয় ছবি নিষিদ্ধ হলো, সরকারি পরিসরে ভারতের গানের জায়গা সঙ্কুচিত হলো। কিন্তু গলা তো সিনেমা হলের দরজায় আটকে থাকে না। সীমান্তের ওপারের রেডিওর কাঁটা ঘুরিয়ে, ক্যাসেটে, পরে ইন্টারনেটে, লাহোর আর করাচির ঘরে ঘরে লতা বাজতেই থাকলেন।
২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী উর্দুতে লিখলেন, একটা যুগের অবসান হলো। যিনি দশকের পর দশক সুরের দুনিয়ায় রাজত্ব করেছেন, সেই সুরের রানি চলে গেলেন।
তিন বছর পর, ২০২৫ সালের ১ মে, পহেলগাঁও হামলার পরের উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তান ব্রডকাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশন দেশের সব এফএম স্টেশন থেকে ভারতীয় গান সরিয়ে নিল। তথ্যমন্ত্রী আতা তারার একে বললেন “দেশপ্রেমিক পদক্ষেপ”। সরিয়ে দেওয়া গানের মধ্যে ছিল লতা মঙ্গেশকর গান গেয়েছেন এমন শত শত গান, তাঁর মৃত্যুর তিন বছর পরেও।
তিরিশ হাজার গান এবং একটি অসম্পূর্ণ জীবন
বাড়িটার নাম প্রভুকুঞ্জ। সেখানে রেকর্ডিং সেরে ফেরার রাতগুলো কেমন ছিল, তার একটা ছবি জোড়া লাগানো যায় তাঁর নিজের কথা থেকে। স্টুডিওতে ঢুকে তিনি চটি খুলে রাখতেন, খালি পায়ে গাইতেন। হেমন্ত কুমারের মতো লম্বা সহশিল্পীর পাশে ডুয়েট গাইতে হলে মাইকের নাগাল পেতে একটা ছোট বাক্সে উঠে দাঁড়াতেন। গরমে পাখা বন্ধ রাখতে হতো, নইলে শব্দ উঠত রেকর্ডে। কখনো কখনো সারা রাত চলত রেকর্ডিং। তারপর পেডার রোডের বাড়িতে ফেরা, যেখানে তাঁর পাশেই থাকত তাঁর ভাইবোনেরা।
খবরের কাগজ ততদিনে তাঁকে ডাকে ভারতের নাইটিঙ্গেল। যেকোনো লতা মঙ্গেশকর জীবনী খুললে প্রথম পাতাতেই পাওয়া যায় একটা সংখ্যা: পঁচিশ, কখনো তিরিশ হাজার গান। সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে গিনেস বুকে একসময় তাঁর নামই ছিল। পরে সেই স্থান নেন তাঁরই বোন আশা ভোঁসলে। গবেষকেরা নথি ধরে গুনে অনেক কম সংখ্যায় পৌঁছান, হাজারের বেশি ছবিতে পাঁচ হাজারেরও বেশি গান। সংখ্যাটা নিয়ে তর্ক হয়েছে বহুবার। গানগুলো নিয়ে কখনো হয়নি।
লতা মঙ্গেশকর বিয়ে করেননি। কেন করেননি, সে প্রশ্নের উত্তর তিনি কখনো লম্বা করে দেননি। তবে একটা তুলনা সামনে রাখা যায়। ১৯৪৯ সালে, মহলের বছরেই, ষোলো বছরের আশা পরিবারের অমতে বাড়ি ছেড়ে বিয়ে করেছিলেন। লতা বাড়িতেই থেকে গেলেন। তেরো বছর বয়সে যে সংসারের ভার নিয়েছিলেন, সেটা আর নামিয়ে রাখেননি। ভাই হৃদয়নাথ হলেন সুরকার, বোন ঊষা আর মীনা গায়িকা।
এই জীবনকে করুণা করার উপায় তিনি রাখেননি। ১৯৭০ সালে নিজেই ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের দৌড় থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, নতুনদের জায়গা করে দিতে। নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, “আমি সবসময় নিজের ওপর ভরসা করেছি। আমি নিজের হাতে গড়া মানুষ। লড়তে শিখেছি। কাউকে কোনোদিন ভয় পাইনি।”
২০২১ সালের এক সাক্ষাৎকারে নব্বইয়ের কোঠায় পৌঁছে ওই তেরো বছরের মেয়েটিই বললেন, “৭৫ বছর ধরে গানপ্রেমীরা আমাকে সহ্য করে আসছেন, ভাবতেই পারি না!”
পরের জানুয়ারিতে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলেন।
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২: শেষ নিঃশ্বাস, কিন্তু শেষ গান নয়
জানুয়ারির গোড়ায় কোভিড আর নিউমোনিয়া নিয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালের আইসিইউতে। মাসের শেষে ভেন্টিলেটর খুলে নেওয়া হলো, পরিবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শনিবার আবার অবস্থা খারাপ হলো, আবার লাইফ সাপোর্ট।
রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি। মুম্বাই তখন সবে জাগছে। ছুটির দিনের সকাল, রাস্তা প্রায় ফাঁকা। সকাল আটটা বারোয় নিঃশ্বাস থামল। চিকিৎসক প্রতীত সামদানি সাংবাদিকদের জানালেন, একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে গিয়েছিল। বয়স বিরানব্বই।
লতা মঙ্গেশকর মৃত্যুর খবর ছড়াতে মিনিট লাগল। টেলিভিশনের পর্দায় লাল পট্টি, ফোনে ফোনে বার্তা। সরকার দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করল, পতাকা নামল অর্ধনমিত। সন্ধ্যায় শিবাজি পার্কে তেরঙ্গায় মোড়া দেহের পাশে পুষ্পস্তবক রাখলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বন্দুকের সেলামি, বেদমন্ত্র, আর হাজারো মানুষের ভিড়।
কিন্তু সকালের সেই আটটা বারোয় একবার ফিরে যাওয়া যাক। উপমহাদেশটা বিশাল, আর এখানে কোথাও না কোথাও তাঁর কন্ঠটা বাজছে। হয়তো কোনো হাইওয়ের ধাবায়, পুরোনো ট্রানজিস্টরে। হয়তো ঢাকার কোনো চায়ের দোকানে, কেটলির শোঁশোঁ শব্দের নিচে। হয়তো লাহোরের কোনো ট্যাক্সিচালকের ফোনে, সিগন্যালে দাঁড়িয়ে। কে বাজাচ্ছিল, আমরা জানি না। শুধু এটুকু প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়, ব্রিচ ক্যান্ডির ওই ঘরে নিঃশ্বাসটা যখন থামল, কন্ঠটা তখনও কোথাও বাজছিল।
পুনের সাসুন হাসপাতাল থেকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি, মাঝখানে আশি বছর।
বাবা যেদিন মারা গেলেন, বারো বছরের মেয়েটির মাথায় ঘুরছিল দুটো প্রশ্ন: কোথায় কাজ পাব? টাকা আসবে কোথা থেকে? সে গানকে বেছে নিয়েছিল কোনো স্বপ্নের টানে নয়, বাঁচার প্রয়োজনে। গান গেয়ে ভাইবোনদের মানুষ করেছে, গান গেয়ে সংসার টিকিয়ে রেখেছে।
বিরানব্বই বছরের যে মানুষটি ব্রিচ ক্যান্ডিতে শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন, তিনি আলাদা কেউ নন। সেই একই মেয়ে, যে গোরেগাঁও স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সিগারেটের টিনের তালে সুর তুলে নিয়েছিল, যে বেতারে নিজের নাম শোনার জন্য অপেক্ষা করেছিল, যে স্টুডিওতে ঢুকে আজীবন চটি খুলে রেখেছে। সে বাঁচতে গান ধরেছিল। এখন গানটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে, প্রতিবার কেউ লতা মঙ্গেশকর স্মরণে একটা পুরোনো রেকর্ড চালালে, কিংবা কোনো কিছু না ভেবেই গুনগুন করে উঠলে।



