৪ অক্টোবর: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

৪ অক্টোবর দিনটি ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এই দিনে বিশ্বজুড়ে এমন অনেক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে, যা আমাদের বর্তমান বিশ্বকে অনেকাংশেই রূপ দিয়েছে। পাশাপাশি, এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন এমন অনেক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন, আবার বিদায় নিয়েছেন এমন অনেকে যাদের শূন্যতা আজও অনুভূত হয়। এই নিবন্ধে আমরা ফিরে তাকাবো ৪ অক্টোবরের ইতিহাসের দিকে, জানবো উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা, বিখ্যাত জন্ম-মৃত্যু এবং বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাইলফলক সম্পর্কে।

আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন বা এই দিনটির পেছনের গল্পগুলো জানতে আগ্রহী হন, তবে এই ঘটনাগুলো অতীত এবং এর কারিগরদের সম্পর্কে আপনাকে এক চমৎকার ধারণা দেবে।

এক নজরে ৪ অক্টোবর: মূল ঐতিহাসিক ঘটনা

সাল ঘটনার ধরন ঐতিহাসিক ঘটনা / তাৎপর্য অঞ্চল / পরিমণ্ডল
১৫৩৫ সাহিত্য ও ধর্ম মাইলস কাভারডেল বাইবেলের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন যুক্তরাজ্য / ইউরোপ
১৫৮২ বিজ্ঞান ও পঞ্জিকা পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন; ক্যালেন্ডার থেকে ১০ দিন মুছে ফেলা হয় ইউরোপ (বৈশ্বিক প্রভাব)
১৮৫৭ স্বাধীনতা আন্দোলন লন্ডনের ‘ইন্ডিয়া হাউজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্যামজী কৃষ্ণ বর্মার জন্ম ভারতীয় উপমহাদেশ
১৮৯৫ ক্রীড়া ইতিহাস রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টে প্রথম ইউএস ওপেন গলফ চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্র
১৯৩১ সঙ্গীত ও সংস্কৃতি কিংবদন্তি বাঙালি ধ্রুপদী কণ্ঠশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জন্ম বাংলা অঞ্চল
১৯৫৭ মহাকাশ ও প্রযুক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘স্পুটনিক ১’ উৎক্ষেপণ করে, শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধের মহাকাশ প্রতিযোগিতা রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন)
১৯৫৮ রাজনীতি ও আইন নতুন সংবিধানের অধীনে ফ্রান্সে পঞ্চম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপ
১৯৬৬ স্বাধীনতা যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে লেসোথো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে আফ্রিকা
১৯৭৭ কূটনীতি অটল বিহারী বাজপেয়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো হিন্দিতে ভাষণ দেন ভারত / বিশ্ব
১৯৯২ শান্তিচুক্তি রোম সাধারণ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে মোজাম্বিকের ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে আফ্রিকা
১৯৯৩ রাজনৈতিক সংকট মস্কোর হোয়াইট হাউজ (পার্লামেন্ট ভবন)-এ রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্ক থেকে গোলাবর্ষণ রাশিয়া
২০০৪ মহাকাশ বিজ্ঞান ‘স্পেসশিপওয়ান’ আনসারি এক্স প্রাইজ জয় করে, উন্মুক্ত হয় বাণিজ্যিক মহাকাশ যাত্রার পথ যুক্তরাষ্ট্র
২০১৮ সামাজিক নীতি বাংলাদেশ সরকার ৫৬% সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ

বাংলা অঞ্চল ও ভারতীয় উপমহাদেশ

৪ অক্টোবর বাংলা ও বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং প্রশাসনিক বিবর্তনের এক নিরবচ্ছিন্ন যাত্রার সাক্ষী।

ঐতিহাসিক মাইলফলক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন

  • ২০১৮ — বাংলাদেশের কোটা সংস্কার প্রজ্ঞাপন: ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর, দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের টানা কয়েক মাসের তীব্র ও যৌক্তিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ৫৬% কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে একটি ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি মেধাভিত্তিক নিয়োগের পথ প্রশস্ত করে এবং এটি ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস সংস্কারের অন্যতম বড় একটি নীতিগত পরিবর্তন।

  • ১৯৭৭ — জাতিসংঘে ঐতিহাসিক হিন্দি ভাষণ: ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (এবং পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী) অটল বিহারী বাজপেয়ী ১৯৭৭ সালের ৪ অক্টোবর ইতিহাস গড়েন। তিনি প্রথম নেতা হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দিতে ভাষণ প্রদান করেন। তাঁর এই ভাষণে জোটনিরপেক্ষ নীতি, বৈশ্বিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের কথা দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হয়, যা বিশ্ব কূটনীতির মঞ্চে ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বকে সাহসিকতার সাথে তুলে ধরে।

  • ১৮৫৭ — প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী নেটওয়ার্কের ভিত্তি স্থাপন: ১৮৫৭ সালের ৪ অক্টোবর গুজরাটে শ্যামজী কৃষ্ণ বর্মার জন্ম হয়, যিনি পরবর্তীতে বিদেশে উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তিনি লন্ডনে ‘ইন্ডিয়া হাউজ’ এবং ‘ইন্ডিয়ান হোম রুল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপে নির্বাসিত বাঙালি বিপ্লবীসহ অন্য ভারতীয় বিপ্লবীদের জন্য তহবিল গঠন, আশ্রয় প্রদান এবং সংগঠিত হওয়ার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল, বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়।

সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক অবদান

  • সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (১৯৩১–২০২২): ১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর কলকাতার ঢাকুরিয়াতে জন্মগ্রহণকারী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (মুখার্জী) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বাংলা সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী। ওস্তাদ বড় গুলাম আলী খানের মতো ধ্রুপদী কিংবদন্তিদের কাছে তালিম নেওয়া সন্ধ্যার কণ্ঠ বাংলার মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়েছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর দ্বৈত গানগুলো বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছিল, বিশেষ করে সুচিত্রা সেন ও উত্তম কুমার অভিনীত সিনেমাগুলোতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে গান গেয়ে এবং বাঙালি শিল্পীদের সাথে মিলে শরণার্থীদের জন্য তহবিল ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে অসামান্য অবদান রাখেন।

  • দীনবন্ধু মিত্রের চিরস্থায়ী ঐতিহ্য: প্রখ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র ১৮৭৩ সালের নভেম্বরে মৃত্যুবরণ করলেও, ৪ অক্টোবর তারিখটি ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তাঁর সাহিত্যিক অবদান, বিশেষ করে ১৮৬০ সালের কালজয়ী সৃষ্টি ‘নীল দর্পণ’ নাটকটিকে স্মরণ করার দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নাটকটি ব্রিটিশ নীলকরদের দ্বারা বাংলার সাধারণ কৃষকদের উপর চালানো অমানবিক শোষণের চিত্র সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছিল। রেভারেন্ড জেমস লং মাইকেল মধুসূদন দত্তের মাধ্যমে এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন, যা আঞ্চলিক উপনিবেশবিরোধী মনোভাবকে ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত করেছিল।

বৈশ্বিক ইতিহাস

বৈশ্বিক ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্র

  • ১৮৯৫ — প্রথম ইউএস ওপেন গলফ চ্যাম্পিয়নশিপ: রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্ট কান্ট্রি ক্লাবে অনুষ্ঠিত প্রথম ইউএস ওপেন একটি একদিনের, ৩৬-হোলের প্রতিযোগিতা হিসেবে খেলা হয়েছিল। মাত্র ১১ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ২১ বছর বয়সী ইংরেজ গলফার হোরেস রলিন্স শিরোপা জেতেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ১৫০ ডলার এবং একটি স্বর্ণপদক।

  • ২০০৪ — বাণিজ্যিক মহাকাশ ভ্রমণের সূচনা: বার্ট রুতান কর্তৃক নকশাকৃত এবং মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পল অ্যালেনের অর্থায়নে নির্মিত স্কেলড কম্পোজিটস-এর পরীক্ষামূলক স্পেসপ্লেন ‘স্পেসশিপওয়ান’ মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সফল মহাকাশযাত্রা সম্পন্ন করে। ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি উচ্চতায় পৌঁছে এটি ১০ মিলিয়ন ডলারের ‘আনসারি এক্স প্রাইজ’ জিতে নেয় এবং প্রমাণ করে যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও মানুষের মহাকাশ ভ্রমণের স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম।

রাশিয়া / সোভিয়েত ইউনিয়ন

  • ১৯৫৭ — স্পুটনিক ১ উৎক্ষেপণ: ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর মস্কোর সময় রাত ১০:২৮ মিনিটে সোভিয়েত ইউনিয়ন কাজাখস্তানের বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক ১’ উৎক্ষেপণ করে। ৫৮ সেন্টিমিটার ব্যাসের এই ধাতব গোলকটি প্রতি ৯৬ মিনিটে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করত এবং ২০.০০৫ মেগাহার্জে একটি ছন্দময় রেডিও সংকেত প্রেরণ করত। এই বৈজ্ঞানিক যুগান্তকারী ঘটনা পশ্চিমা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত একচেটিয়া আধিপত্যের ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্নায়ুযুদ্ধের মহাকাশ প্রতিযোগিতার সূচনা করেছিল।

  • ১৯৯৩ — মস্কোর সাংবিধানিক সংকটে বোমাবর্ষণ: রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন এবং সুপ্রিম সোভিয়েতের মধ্যে উত্তেজনা ১৯৯৩ সালের ৪ অক্টোবর চরম সহিংস রূপ নেয়। কয়েকদিনের সশস্ত্র অচলাবস্থার পর, ইয়েলৎসিনের অনুগত সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্কগুলো সরাসরি মস্কোর রাশিয়ান পার্লামেন্ট ভবনে (হোয়াইট হাউজ) গোলাবর্ষণ শুরু করে। এই হামলা পার্লামেন্টারি অভ্যুত্থানকে চূর্ণ করে দেয়, যাতে ১৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং সোভিয়েত-পরবর্তী রাশিয়ায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা একচ্ছত্রভাবে সুসংহত হয়।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ

  • ১৫৩৫ — কাভারডেল বাইবেল মুদ্রণ: ইংরেজ সংস্কারক মাইলস কাভারডেলের উদ্যোগে ১৫৩৫ সালের ৪ অক্টোবর ইংরেজিতে বাইবেলের প্রথম সম্পূর্ণ মুদ্রিত অনুবাদ সম্পন্ন হয়। তিনি উইলিয়াম টিনডেলের অনূদিত নিউ টেস্টামেন্ট অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং ল্যাটিন ও জার্মান পাঠ্য থেকে ওল্ড টেস্টামেন্টের বাকি অংশ অনুবাদ করেছিলেন, যা আধুনিক ইংরেজি ধর্মীয় সাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

  • ১৫৮২ — দশ দিন মুছে ফেলা (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন): ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর, পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি মহাবিষুব এবং ইস্টারের দিন গণনায় অসামঞ্জস্যতা দূর করতে প্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বাতিল করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালুর নির্দেশ দেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা ১০ দিনের ত্রুটি সংশোধনের জন্য এই আদেশে বলা হয়েছিল যে ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবারের ঠিক পরের দিনটি হবে ১৫৮২ সালের ১৫ অক্টোবর, শুক্রবার।

  • ১৯৫৮ — ফরাসি পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের গঠন: একটি জাতীয় গণভোটের পর ১৯৫৮ সালের ৪ অক্টোবর ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আধুনিক সংবিধান জারি করে। জেনারেল চার্লস ডি গলের নেতৃত্বে নতুন এই সংবিধান একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, যা সমসাময়িক ফ্রান্সের রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছিল।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত

  • ১৯৫০ — চীনে প্রারম্ভিক কূটনৈতিক ও সামরিক পুনর্বিন্যাস: ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর, কোরিয়ান যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণ নিয়ে বেইজিংয়ে শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়। ৪ অক্টোবর চেয়ারম্যান মাও সেতুং এবং পলিটব্যুরো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসে ইয়ালু নদী পেরিয়ে চাইনিজ পিপলস ভলান্টিয়ার আর্মি মোতায়েনের অনুমোদন দেন।

  • ১৯৯২ — নাফটা (NAFTA) আলোচনা চূড়ান্ত: কানাডিয়ান বাণিজ্য প্রতিনিধিরা তাদের আমেরিকান এবং মেক্সিকান সমকক্ষদের সাথে আলোচনা সম্পন্ন করে উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (NAFTA) মূল পাঠ্য চূড়ান্ত করেন।

  • ১৯৬৬ — লেসোথোর স্বাধীনতা লাভ: ৮২ বছরের পরাধীনতার অবসান ঘটিয়ে ১৯৬৬ সালের ৪ অক্টোবর লেসোথো রাজ্য গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে।

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্ম (৪ অক্টোবর)

নাম জন্মসাল জাতীয়তা পেশা / প্রধান অবদান মূল পুরস্কার / স্বীকৃতি
রাদারফোর্ড বি. হেইজ ১৮২২ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম প্রেসিডেন্ট পুনর্গঠন যুগের সমাপ্তি তদারকি; গৃহযুদ্ধের জেনারেল
শ্যামজী কৃষ্ণ বর্মা ১৮৫৭ ভারতীয় বিপ্লবী, আইনজীবী, সাংবাদিক ইন্ডিয়া হাউজ ও দ্য ইন্ডিয়ান সোসিওলজিস্টের প্রতিষ্ঠাতা
আচার্য রামচন্দ্র শুক্ল ১৮৮২ ভারতীয় সাহিত্যিক ইতিহাসবিদ, সমালোচক হিন্দি সাহিত্যের ঐতিহাসিক কাঠামোগত যুগ বিভাজন প্রণয়ন
বাস্টার কিটন ১৮৯৫ আমেরিকান নির্বাক চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার (১৯৬০); নির্বাক চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ
ভিতালি গিনজবার্গ ১৯১৬ রাশিয়ান/সোভিয়েত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও জ্যোতির্পদার্থবিদ পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার (২০০৩); সুপারকন্ডাকটিভিটি তত্ত্ব
চার্লটন হেস্টন ১৯২৩ আমেরিকান একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী অভিনেতা শ্রেষ্ঠ অভিনেতার অস্কার (বেন-হার, ১৯৫৯)
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ১৯৩১ ভারতীয় (বাঙালি) ধ্রুপদী ও প্লেব্যাক গায়িকা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৭০); বঙ্গবিভূষণ (২০১১)
অ্যান রাইস ১৯৪১ আমেরিকান গথিক ফিকশন ও ফ্যান্টাসি লেখিকা ‘ইন্টারভিউ উইথ দ্য ভ্যাম্পায়ার’-এর রচয়িতা
সুসান সার‍্যান্ডন ১৯৪৬ আমেরিকান চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, অধিকারকর্মী শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর একাডেমি পুরস্কার (ডেড ম্যান ওয়াকিং, ১৯৯৫)
ডেরিক রোজ ১৯৮৮ আমেরিকান পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড় এনবিএ (NBA) ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ এমভিপি (২০১১)

বিশেষ জীবনী (জন্ম)

  • রাদারফোর্ড বি. হেইজ (১৮২২–১৮৯৩): ১৮৭৬ সালের এক বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রশাসন দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে ফেডারেল সেনা প্রত্যাহারের তদারকি করেছিল, যা মূলত ‘রিকনস্ট্রাকশন এরা’ বা পুনর্গঠন যুগের সমাপ্তি টানে।

  • বাস্টার কিটন (১৮৯৫–১৯৬৬): জটিল স্টান্ট করার সময় চরম নির্বিকার মুখভঙ্গির কারণে তিনি “দ্য গ্রেট স্টোন ফেস” নামে পরিচিত ছিলেন। কিটন ‘দ্য জেনারেল’ (১৯২৬) এবং ‘শার্লক জুনিয়র’ (১৯২৪)-এর মতো অসামান্য সিনেমাটোগ্রাফিক মাস্টারপিস তৈরি করেছিলেন।

  • ভিতালি গিনজবার্গ (১৯১৬–২০০৯): এই প্রখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ সুপারকন্ডাকটিভিটির ‘গিনজবার্গ-লান্ডাউ’ তত্ত্বের সহ-বিকাশক ছিলেন, যা অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ভৌত বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ভিত্তি প্রদান করেছিল।

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু (৪ অক্টোবর)

নাম মৃত্যুসাল জাতীয়তা পেশা / প্রধান অবদান মৃত্যুর কারণ / উল্লেখযোগ্য পরিস্থিতি
রেমব্রান্ট ফন রেইন ১৬৬৯ ডাচ ডাচ স্বর্ণযুগের চিত্রকর ও প্রিন্টমেকার স্বাভাবিক মৃত্যু; আমস্টারডামে চরম দারিদ্র্যের মাঝে মারা যান
ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি ১৯০৪ ফরাসি ভাস্কর, স্ট্যাচু অফ লিবার্টির নকশাকার যক্ষ্মা
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ১৯৪৭ জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ; কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক স্বাভাবিক মৃত্যু (বয়স ৮৯); নোবেল পুরস্কার বিজয়ী (১৯১৮)
জ্যানিস জপলিন ১৯৭০ আমেরিকান রক, সোল এবং ব্লুজ ভোকালিস্ট দুর্ঘটনাবশত ড্রাগ ওভারডোজ (বয়স ২৭)
গ্রাহাম চ্যাপম্যান ১৯৮৯ ব্রিটিশ কমেডিয়ান, অভিনেতা (মন্টি পাইথন) টনসিলের ক্যানসার (বয়স ৪৮)
গর্ডন কুপার ২০০৪ আমেরিকান নভোচারী; নাসা মার্কারি সেভেন হার্ট ফেইলিউর (বয়স ৭৭)
কেন হেন্সলি ২০২০ ব্রিটিশ গায়ক-গীতিকার (উড়িয়া হিপ) সংক্ষিপ্ত অসুস্থতা (বয়স ৭৫)

বিশেষ জীবনী (মৃত্যু)

  • রেমব্রান্ট ফন রেইন (১৬০৬–১৬৬৯): রেমব্রান্টকে মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর ‘কিয়ারোস্কুরো’ বা আলো-আঁধারির জাদুকরী ব্যবহার ডাচ স্বর্ণযুগকে সংজ্ঞায়িত করেছিল। জীবনে ব্যাপক সাফল্য পেলেও শেষভাগে তিনি চরম দারিদ্র্যের শিকার হন এবং একটি চিহ্নবিহীন দরিদ্রদের কবরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

  • ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক (১৮৫৮–১৯৪৭): জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক পারমাণবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের বোঝাপড়ায় বিরাট বিপ্লব এনেছিলেন। তিনি প্রস্তাব করেন যে, শক্তি “কোয়ান্টা” নামক বিচ্ছিন্ন ইউনিটে নির্গত হয় ($E = h\nu$), যেখানে $h$ হলো প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক। এটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

  • জ্যানিস জপলিন (১৯৪৩–১৯৭০): জ্যানিস জপলিন ১৯৬০-এর দশকের অন্যতম সেরা রক ভোকালিস্ট ছিলেন। তাঁর আবেগঘন পারফরম্যান্স এবং ‘পিস অফ মাই হার্ট’-এর মতো হিট গানগুলো তাঁকে কিংবদন্তি করে তুলেছে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে অকাল মৃত্যু তাঁকে সংগীতাঙ্গনের কুখ্যাত “২৭ ক্লাব”-এর অন্তর্ভুক্ত করে।

আন্তর্জাতিক দিবস ও বৈশ্বিক পালন

  • বিশ্ব প্রাণী দিবস: ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে শুরু হওয়া এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে প্রাণী কল্যাণের মান উন্নত করা। বাস্তুশাস্ত্রের পৃষ্ঠপোষক সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসির ভোজের দিনের সাথে মিল রেখে ৪ অক্টোবর দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে।

  • বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ (প্রথম দিন): জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব মহাকাশ সপ্তাহ প্রতি বছর ৪ অক্টোবর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত পালিত হয়। শুরুর তারিখটি ১৯৫৭ সালের স্পুটনিক ১-এর উৎক্ষেপণকে সম্মান জানায়। এটি মহাকাশ বিজ্ঞান শিক্ষার নিবেদিত বিশ্বের বৃহত্তম পাবলিক ইভেন্ট।

  • লেসোথোর স্বাধীনতা দিবস: ১৯৬৬ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির দিনটি লেসোথো জুড়ে জাতীয় ছুটি এবং জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়।

“আপনি কি জানতেন?” – ঐতিহাসিক টুকিটাকি

  • যে দিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ৪ অক্টোবর ঘুমাতে গিয়ে ১৫ অক্টোবর জেগে উঠেছিল: ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি যখন গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন, তখন ক্যালেন্ডারকে সৌর বছরের সাথে মেলাতে ১০ দিন এগিয়ে দেওয়া হয়। ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল এবং স্পেনের নাগরিকরা ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর রাতে ঘুমাতে যান এবং পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন দিনটি ১৫ অক্টোবর!

  • একটি সাধারণ রেডিও বীপ, যা নাসার (NASA) জন্ম দিয়েছিল: স্পুটনিক ১-এ কোনো উন্নত ক্যামেরা ছিল না; এটি কেবল একটি সাধারণ “বীপ-বীপ-বীপ” রেডিও সংকেত তৈরি করত। কিন্তু সোভিয়েত প্রযুক্তি আমেরিকার ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সংকেত দিতে পারায় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, যা প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারকে ১৯৫৮ সালে নাসা (NASA) প্রতিষ্ঠায় বাধ্য করেছিল।

  • বাইবেল মুদ্রণ একসময় মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ ছিল: ১৫৩৫ সালের ৪ অক্টোবর মাইলস কাভারডেল যখন ইংরেজিতে প্রথম সম্পূর্ণ মুদ্রিত বাইবেল শেষ করেন, তখন তাকে গোপনে কাজ করতে হয়েছিল। রাজা অষ্টম হেনরির আমলে রাজকীয় অনুমতি ছাড়া ইংরেজিতে ধর্মগ্রন্থ মুদ্রণ করাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যার শাস্তি ছিল জনসমক্ষে আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড।

শেষ কথা

৪ অক্টোবর দিনটি এমন সব ঘটনায় পরিপূর্ণ যা ইতিহাসকে নতুন করে রূপ দিয়েছে। বড় বড় বৈশ্বিক ঘটনা এবং বৈজ্ঞানিক অর্জন থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই দিনটি অনন্য হয়ে আছে। এই দিনে কী ঘটেছিল তার দিকে ফিরে তাকালে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে ব্যক্তিজীবন এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো আমাদের আজকের বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে। প্রতি বছর যেমন ক্যালেন্ডারে নতুন নতুন মাইলফলক যুক্ত হয়, তেমনি ৪ অক্টোবর দিনটিও ইতিহাসের পাতায় চিরকাল তার গুরুত্বপূর্ণ স্থান সগৌরবে ধরে রাখবে।

সর্বশেষ