আসুন, একটা ভ্রান্ত ধারণা ভাঙি। শেখ হাসিনা দেশে নেই, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ—আর সে কারণেই তারেক রহমানের বিএনপি ২১২ আসন পেয়ে ‘ডিফল্ট’ বা ওয়াকওভার জিতেছে, এমনটা ভাবলে আপনি মস্ত বড় ভুল করছেন। এটা চরম অলস একটা বিশ্লেষণ। বাংলাদেশের ‘জেন-জেড’ (Gen-Z) ভোটাররা এমনি এমনি বিএনপিকে ক্ষমতায় বসায়নি; বরং তারা খুব হিসেব কষে, রীতিমতো সার্জিক্যাল অপারেশনের মতো জামায়াতে ইসলামীর পশ্চাদপদ রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে স্রেফ অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার তাগিদে।
প্রেক্ষাপট
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। বাংলাদেশ আক্ষরিক অর্থেই একটা রাজনৈতিক ম্যাজিক করে দেখাল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের যে রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল এবং তার ১৫ বছরের স্বৈরতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল, ঠিক তার ১৮ মাস পর জাতি ভোটকেন্দ্রে গেল। এই নির্বাচনের বাজি ছিল আকাশছোঁয়া।
ফলাফলটা ছিল রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের জন্য এক বিশাল ভূকম্পন। তারেক রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অন্যদিকে, ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী—যারা খেলাফত মজলিস এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির খণ্ডিত অংশগুলোকে নিয়ে একটি আক্রমণাত্মক ১১-দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়েছিল—তারা রীতিমতো মুখ থুবড়ে পড়ে। তারা পায় মাত্র ৭৭টি আসন।
ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৪%, যা গত এক দশকে কারচুপির নির্বাচনগুলোর সেই সাজানো ৪২%-এর গল্পকে পুরোপুরি ম্লান করে দেয়। একইসঙ্গে, ভোটাররা বিপুল ভোটে ‘জুলাই সনদ’ (July Charter) গণভোটে পাস করে, যা প্রধানমন্ত্রীর জন্য সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের বাধ্যবাধকতার মতো কাঠামোগত সংস্কারগুলোকে স্থায়ী রূপ দেয়। এটি কেবল ক্ষমতার রুটিন হস্তান্তর ছিল না; এটি ছিল একটি প্রজন্মের হাত ধরে আসা চূড়ান্ত পরিবর্তন।
বিশ্লেষকের চোখে আসল ঘটনা
নির্বাচনের আগের কয়েক সপ্তাহ আমি ঢাকার ভার্সিটি শিক্ষার্থী, গাজীপুরের গার্মেন্টস কর্মী আর সিলেটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে কাটিয়েছি। আপনি যদি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার পণ্ডিতদের কথা শুনে থাকেন, তবে আপনার মনে হতে পারত বাংলাদেশ বুঝি রাতারাতি একটা কট্টর ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। তারা ভয় দেখাচ্ছিলেন যে, মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় জামায়াতের সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক পুরো গণঅভ্যুত্থানটাই হাইজ্যাক করে নেবে।
কিন্তু তাদের ধারণা ডাহা ভুল প্রমাণ হয়েছে।
টকশোর ওই বিশ্লেষকরা যেটা বুঝতে পারেননি তা হলো, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের রূপকাররা কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর জন্য রাস্তায় নামেনি। তারা নেমেছিল একটা মেধাভিত্তিক সমাজ গড়তে। তারা শাহবাগে রক্ত দিয়েছিল এমন এক ফ্যাসিবাদের পতন ঘটাতে, যারা তাদের চাকরি চুরি করেছে, কণ্ঠ রোধ করেছে আর ব্যাংকগুলো দেউলিয়া করেছে। ধুলো যখন উড়তে থামল, তখন ২০২৬ সালের ব্যালটের সামনে দাঁড়িয়ে এই তরুণেরা কোনো আবেগ দেখায়নি, দেখিয়েছে চরম বাস্তববাদিতা। তারা নতুন মোড়কে কোনো চরমপন্থা চায়নি; তারা চেয়েছে একটা সচল অর্থনীতি।
জেন-জেড ভেটো: মতাদর্শের চেয়ে যখন মুদিবাজারের লিস্ট বড়
এই ভোটারদের পেটের ক্ষুধা আর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে দুশ্চিন্তা, সেটা নিয়ে আমাদের কথা বলতেই হবে। দেড় দশক ধরে চলা অর্থপাচার আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি রীতিমতো আইসিইউতে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৩.৯ শতাংশে।
ভাবুন তো, ১১.৪৬% যুব বেকারত্বের এই দেশে ২২ বছর বয়সী একজন সদ্য গ্র্যাজুয়েটের কথা। যখন শ্রমশক্তির ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে ধুঁকছে, তখন জামায়াতের ধর্মীয় গালগল্প দিয়ে তো আর মাস শেষে বাসাভাড়া মেটানো যায় না!
তারেক রহমান আর বিএনপি ঠিক এই জায়গাতেই বাজিমাত করেছে। তারা বুঝতে পেরেছিল সাধারণ মানুষ আসলে কী চাইছে। পুরনো আমলের সেই চেনা রাজনৈতিক সমাবেশের বদলে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অনেকটা আধুনিক ইকোনমিক সামিটের মতো। তারা ইশতেহারে নিয়ে এলো ‘মেক ইন বাংলাদেশ’ টেক হাব, ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে, আর জনস্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫% বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি।
অন্যদিকে, জামায়াত সেই পুরনো ক্ষোভ আর মতাদর্শের বিশুদ্ধতার ওপরই ভরসা করে বসে থাকল। তারা ১১ দলের একটা জগাখিচুড়ি জোট বানিয়ে ভাবল রক্ষণশীল ভোটব্যাংক বুঝি তাদের পকেটেই আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সহ্যক্ষমতা যে তলানিতে ঠেকেছে, সেটা তারা টেরই পায়নি। যখন ৮.৫% মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ ডাল-ভাত কিনতেই মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন সস্তা রাজনৈতিক নাটক তাদের কাছে অপমানজনকই মনে হয়েছে। তরুণরা রাতারাতি কট্টর জাতীয়তাবাদী হয়ে বিএনপিকে ভোট দেয়নি; তারা ভোট দিয়েছে কারণ বিএনপি তাদেরকে কোনো ওয়াজ-নসিহত শোনায়নি, তারা দেখিয়েছে একটা সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক স্প্রেডশিট।
২০২৬ সালের নির্বাচনের আসল চিত্র
- ম্যান্ডেট: বিএনপি পেয়েছে ২১২ আসন; জামায়াতের ১১-দলীয় জোট আটকে গেছে ৭৭-এ।
- ভোটার উপস্থিতি: ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪%, আর নতুন চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালটের কল্যাণে প্রবাসী ভোটারদের ঐতিহাসিক ৮০.১১% অংশগ্রহণ ছিল।
- গণভোট: ৬০.২৬% ভোটার ‘জুলাই সনদ’-এ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট করার আইনি ভিত্তি এখন পাকাপোক্ত।
- অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি: বিএনপির ট্রাম্পকার্ড ছিল ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্যের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং স্বাস্থ্য খাতে ৫% বাজেট বরাদ্দ।
সামষ্টিক অর্থনীতির রূঢ় বাস্তবতা: দুটি ভিন্ন ভবিষ্যতের লড়াই
ভোটাররা কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা বুঝতে হলে আপনাকে পেছনের ডেটা দেখতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মূল্যস্ফীতি ১১.৬% থেকে ৮.৫%-এ নামিয়ে এনে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু স্থিতিশীলতা মানেই তো আর প্রবৃদ্ধি নয়। কারখানা বন্ধের কারণে পোশাক খাতে প্রতিদিন মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছিল, আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
ভোটারদের সামনে পথ ছিল দুটি: হয় জামায়াতের সাথে আদর্শিক বিচ্ছিন্নতার পথে হাঁটা (যা পশ্চিমা ক্রেতাদের ভয় দেখিয়ে গার্মেন্টস শিল্পকে খাদের কিনারে ঠেলে দিত), নয়তো বিএনপির মধ্যপন্থী ও বাস্তবমুখী সংস্কার এজেন্ডাকে বেছে নেওয়া, যা অর্থনীতিকে আবার সচল করবে।
২০২৫ সালের বাস্তবতা বনাম বিএনপির ২০২৬ ম্যান্ডেট
| অর্থনৈতিক সূচক | ২০২৫ সালের চিত্র (যেখানে ছিলাম) | বিএনপির ২০২৬-২০২৭ ম্যান্ডেট (যেখানে যেতে চাই) |
| জিডিপি প্রবৃদ্ধি | ৩.৯% (কারখানা বন্ধ ও অস্থিরতায় কয়েক দশকের সর্বনিম্ন)। | স্থিতিশীল এফডিআই-এর ওপর ভর করে ৫.১% – ৫.৫%-এ উত্তরণের লক্ষ্য। |
| মূল্যস্ফীতি | ৮.৫% (উচ্চ খাদ্যমূল্যে মানুষের নাভিশ্বাস)। | শুল্ক ছাড় ও কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে ৬.৫%-এ নামিয়ে আনার টার্গেট। |
| যুব বেকারত্ব | ১১.৪৬% (শহুরে শিক্ষিত তরুণদের হাহাকার)। | “মেক ইন বাংলাদেশ” হাব এবং ফ্রিল্যান্স পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান। |
| বিদেশি বিনিয়োগ | প্রায় স্থবির; শুধু রি-ইনভেস্টমেন্টের ওপর নির্ভরশীলতা। | প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে আনা। |
নারী ভোটাররাই আসল সীমারেখা টেনে দিয়েছিলেন

নারী ভোটারদের হিসাবের বাইরে রাখলে এই নির্বাচনের কিছুই আপনি বুঝবেন না। গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে ম্যাজিক, তা মূলত তৈরি পোশাক খাতের লাখ লাখ নারীর হাতেই বোনা। তারাই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, এবং তারা নিজেদের ক্ষমতা খুব ভালো করেই বোঝেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারীদের অধিকার আর কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থান নিয়ে জামায়াত নেতারা বেশ কিছু কাণ্ডজ্ঞানহীন ও মান্ধাতার আমলের মন্তব্য করে বসেন। ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে রাখার হুমকি দিয়ে আপনি ন্যাশনাল ইলেকশন জেতার স্বপ্ন দেখতে পারেন না! নারী ভোটাররা পরিষ্কার বুঝেছিলেন, হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের বদলে জামায়াতের সামাজিক রক্ষণশীলতা বেছে নেওয়াটা হবে ‘আকাশ থেকে পড়ে সোজা আগুনে পড়ার’ মতো। তারা বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিলেন, কারণ বিএনপি নারীদের ঘরে ফেরার শর্ত না দিয়েই স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ভূ-রাজনৈতিক দাবাখেলা: একটি মধ্যপন্থী ঢাকা প্রতিবেশীদের জন্য স্বস্তির
এবার একটু মানচিত্রের দিকে তাকাই। বাংলাদেশ এমন একটা ভূ-রাজনৈতিক প্রেশার কুকারের মধ্যে বসে আছে, যেখানে ভারত আর আমেরিকার নজর সব সময় আমাদের ওপর। শেখ হাসিনার পতনের পর গত ১৮ মাস ধরে নয়াদিল্লি রীতিমতো ঘামের মধ্যে ছিল। ওয়াশিংটনেরও ভয় ছিল, ঢাকা যদি উগ্রবাদীদের দখলে চলে যায়, তবে পুরো বঙ্গোপসাগর অঞ্চলেই আগুন জ্বলবে।
জামায়াতের জয় মানেই ছিল একটা কূটনৈতিক বিপর্যয়। এতে সাথে সাথেই বিদেশি বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়ত। বিএনপি এটা খুব ভালো করেই বুঝেছিল। তাই তারেক রহমান খুব সুকৌশলে নিজেকে এবং তার দলকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে একটি ‘মধ্যপন্থী’ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফলাফল দেখুন—নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফোন করে বন্ধুত্বের বার্তা দিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। বিএনপিই ছিল একমাত্র ভরসা, যারা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অন্তত ভয় পাওয়াবে না।
ট্রানজিশন ম্যাট্রিক্স: কে কী পেল?
| পক্ষ / স্টেকহোল্ডার | জামায়াতের মতাদর্শের অধীনে যা হতো | বিএনপির বাস্তববাদী ম্যান্ডেটে যা হচ্ছে |
| জেন-জেড কর্মশক্তি | বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি; প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ খরা। | গ্লোবাল পেমেন্ট সিস্টেমের সাথে যুক্ত হওয়া; টেক হাব তৈরি। |
| নারী শ্রমশক্তি | কর্মক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে দেওয়ার শঙ্কা। | স্বাধীনতা বজায় রাখা; ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর সুবিধা। |
| বিদেশি বিনিয়োগকারী | নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি; ভারত ও আমেরিকার সাথে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত। | স্থিতিশীল সম্পর্ক; এফডিআই-বান্ধব স্বচ্ছ অর্থনৈতিক নীতি। |
প্রাতিষ্ঠানিক রিসেট: কেন ‘জুলাই সনদ’ গেমচেঞ্জার ছিল
সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর যে গণভোট হলো, সেটাই ছিল এই নির্বাচনের আসল মাস্টারস্ট্রোক। এই সনদের মূল দাবি ছিল—প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদের সীমানা নির্ধারণ এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। এই সনদে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে ভোটাররা মূলত তারেক রহমানকে একটি কড়া মেসেজ দিয়েছেন: “আমরা আপনাকে ক্ষমতার চাবি দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সাথে হাতে হাতকড়াও পরিয়ে দিচ্ছি।”
বিএনপি খুব চালাকির সাথে এই সনদ মেনে নেয়। তারা বুঝতে পেরেছিল, ট্রমাটাইজড হয়ে থাকা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে নিজেদের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার এই শর্ত মানতেই হবে। উল্টোদিকে, জামায়াত তরুণদের এই ‘জুলাই স্পিরিট’ ধরতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
“ডিফল্ট বিজয়” তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ
এবার আসি সেই বহুল চর্চিত তত্ত্বে। আওয়ামী লীগের পক্ষের লোকেরা বারবার বলছেন, এটা বিএনপির কোনো অর্জন নয়, বরং আওয়ামী লীগ মাঠে ছিল না বলেই তারা ওয়াকওভার পেয়েছে।
একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই বুঝবেন এই যুক্তি কতটা নড়বড়ে। এটা যদি নিছকই আওয়ামী লীগ-বিরোধী একটা প্রতিবাদী ভোট হতো, তবে বিশাল ফান্ড আর ১১ দলের জোট নিয়ে নামা জামায়াত তো সারা দেশের গ্রামগঞ্জে আসন ভাসিয়ে ফেলত! ভোটাররা যদি চোখ বন্ধ করে শুধু পুরোনোদের শাস্তি দিতে চাইতেন, তবে জামায়াতের আজ কমপক্ষে ১৫০টি আসন থাকার কথা। কিন্তু তারা আটকে গেছে মাত্র ৭৭-এ।
তাছাড়া, প্রায় ৬০% ভোটার শুধু একটা ‘ডিফল্ট’ ভোট দেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে না। তারা খুব হিসাব করে বিএনপি এবং ‘জুলাই সনদ’-এর বাক্সে টিক দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের এই সূক্ষ্ম রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে ‘ডিফল্ট জয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়াটা চরম বোকামি।
শেষ কথা: রোডম্যাপ ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
বিএনপি নির্বাচন জিতেছে ঠিকই, কিন্তু আসল যুদ্ধটা কেবল শুরু। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, দুর্নীতি আর স্বৈরাচারের প্রতি এ দেশের মানুষের এখন জিরো-টলারেন্স। তারেক রহমান হাতে পেয়েছেন একটি ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতি আর এমন এক তরুণ সমাজ, যারা জানে কীভাবে সরকারের পতন ঘটাতে হয়।
টিকে থাকতে হলে, সরকারকে তাদের প্রথম ১০০ দিন একদম নিখুঁতভাবে পার করতে হবে। পলাতক দুর্নীতিবাজদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে হবে, জেন-জেড-কে দেখাতে হবে যে কর্মসংস্থানই তাদের প্রধান লক্ষ্য, আর রাষ্ট্র চালাতে হবে চরম স্বচ্ছতার সাথে। বিএনপি যদি ভাবে এই ২১২ আসনের সাইজ তাদের আওয়ামী লীগের মতো যা খুশি তা করার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছে, তবে চোখের পলক ফেলার আগেই তাদের আবার রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হবে।
তরুণরা তারেক রহমানের হাতে দেশের স্টিয়ারিং তুলে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইমার্জেন্সি ব্রেকের ওপর তারা নিজেদের হাত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার কি আসলেই কথা দিয়ে কথা রাখবে, নাকি তারা এমন এক প্রজন্মের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে, যারা ইতিমধ্যেই একটা সফল বিপ্লব করে দেখিয়েছে?

