ব্যবসার কাজ স্বয়ংক্রিয় করার আগে কোন প্রক্রিয়াগুলো চিহ্নিত করবেন

সর্বাধিক আলোচিত

একই অর্ডারের তথ্য তিনবার লিখতে হচ্ছে। বিক্রয় বিভাগ একবার লিখছে, হিসাব বিভাগ আরেকবার, পণ্য সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্মী নিজের নথিতে আবার সেই তথ্য রাখছেন। এই কাজ কমাতে নতুন সফটওয়্যার কেনার কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এখানে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, একই তথ্য তিনবার লেখার প্রয়োজন হচ্ছে কেন?

হয়তো বিভাগগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা ভালো নয়। হয়তো সবাই আলাদা নথিতে কাজ করতে অভ্যস্ত। আবার এমনও হতে পারে, একটি সফটওয়্যারেই প্রয়োজনীয় তথ্য রাখার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণ শুরু করার আগে এমন কাজগুলো চিহ্নিত করা দরকার, যেগুলো নিয়মিত করতে হয়, নির্দিষ্ট নিয়মে চলে এবং অপ্রয়োজনীয় সময় নেয়। এরপর খুঁজে দেখতে হবে, সমস্যাটি কাজের নিয়মে, তথ্য আদান-প্রদানে, নাকি সত্যিই সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতায়।

কোনো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার আগে সেটির বর্তমান ধাপগুলো সাজিয়ে দেখার পদ্ধতিই প্রক্রিয়ার মানচিত্র তৈরি বা প্রসেস ম্যাপিং। এখানে কাজ কোথা থেকে শুরু হচ্ছে, কে দায়িত্ব নিচ্ছেন, কোন তথ্য প্রয়োজন এবং কোথায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়। কাজটি বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, ভেতরে তার চেয়ে বেশি সিদ্ধান্ত ও ব্যতিক্রম থাকতে পারে। স্বয়ংক্রিয়করণের পরিকল্পনায় এসব বাদ পড়লেই পরে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ব্যস্ততার হিসাব নয়, আগে কাজের জট খুঁজুন

একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা যে কাজে সবচেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন, সেটিই প্রথমে স্বয়ংক্রিয় করতে হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। ধরা যাক, হিসাব বিভাগের কর্মীরা প্রতিদিন চালান তৈরি করছেন। তাঁদের অনেকটা সময় যাচ্ছে বিক্রয় বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে। কখনো গ্রাহকের ঠিকানা অসম্পূর্ণ, কখনো পণ্যের পরিমাণ ঠিক নেই। ফলে বারবার যোগাযোগ করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় চালান তৈরির সফটওয়্যার বদলালে কাজের গতি কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু অসম্পূর্ণ তথ্যের সমস্যাটি থেকে যাবে। অন্যদিকে, একটি ছোট কাজ হয়তো প্রতিবার শেষ করতে খুব কম সময় লাগে। কিন্তু সেটি দিনে বহুবার করতে হয় এবং প্রতিবার একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এমন কাজ স্বয়ংক্রিয় করার সুযোগ তুলনামূলক বেশি।

অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর গ্রাহককে নির্দিষ্ট বার্তা পাঠানোর বিষয়টি ধরা যাক। প্রয়োজনীয় তথ্য ঠিক থাকলে সফটওয়্যার দিয়ে এই কাজ করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু গ্রাহকের জটিল অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একই ব্যবস্থা যথেষ্ট হবে না। সেখানে ঘটনার ধরন, লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণে প্রথম স্বয়ংক্রিয়করণ প্রকল্পে সবচেয়ে জটিল কাজটি বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং যে কাজের নিয়ম পরিষ্কার, নিয়মিত করতে হয় এবং ভুল হলে সহজে সংশোধন করা যায়, সেটি দিয়ে শুরু করা যুক্তিসংগত। কাজটির জন্য একাধিক সফটওয়্যার যুক্ত করতে হবে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখুন।

কোন কাজগুলো চিহ্নিত করলে সুবিধা হতে পারে

স্বয়ংক্রিয়করণের কথা উঠলে অনেক প্রতিষ্ঠান পুরো একটি বিভাগকে বিবেচনায় নেয়। যেমন, বিক্রয় বিভাগ বা গ্রাহকসেবা বিভাগ। এতে প্রকল্পের পরিধি অকারণে বড় হয়ে যেতে পারে। পুরো বিভাগের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট কাজ বেছে নেওয়া বেশি কার্যকর। একটি ইন্টারনেটভিত্তিক দোকানের ক্ষেত্রে অর্ডার পাওয়া থেকে পণ্য সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা পর্যন্ত অংশটি ধরা যেতে পারে। এর মধ্যে গ্রাহকের তথ্য যাচাই, পণ্যের মজুত দেখা, অর্থপ্রদানের শর্ত নিশ্চিত করা এবং পণ্য মোড়কজাত করার দায়িত্ব দেওয়ার মতো কাজ রয়েছে।

একাধিক মাধ্যম থেকে অর্ডার এলে তথ্যের সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হতে পারে। ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ থেকে পাওয়া অর্ডার কি একই জায়গায় সংরক্ষিত হচ্ছে? নাকি কর্মীরা আলাদা নথি দেখে তথ্য সংগ্রহ করছেন? দ্বিতীয়টি হলে স্বয়ংক্রিয়করণের আগে তথ্য রাখার নিয়ম বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে।

হিসাব বিভাগের ক্ষেত্রে চালান তৈরি ও বকেয়া অর্থের অনুস্মারক পাঠানোর কাজ চিহ্নিত করা যায়। তবে অর্থপ্রদানের অবস্থা যাচাই করার ধাপটি আলাদা করে দেখতে হবে। গ্রাহকের পাঠানো অর্থপ্রদানের ছবিই অর্থপ্রাপ্তির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রদান সেবা বা আর্থিক হিসাব থেকে লেনদেন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

গ্রাহকসেবা বিভাগে অভিযোগ গ্রহণ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীর কাছে পাঠানোর কাজ একটি ভালো প্রাথমিক প্রকল্প হতে পারে। কিন্তু সব অভিযোগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সফটওয়্যারের হাতে দেওয়া ঠিক হবে না। পণ্য সরবরাহের সময় জানতে চাওয়া এবং অনুমোদন ছাড়া অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ এক ধরনের সমস্যা নয়।

আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে মূল জট তৈরি হয় অফিসের ভেতরের অনুমোদন নিয়ে। নতুন কর্মীর জন্য ইমেইল অ্যাকাউন্ট তৈরি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বরাদ্দ কিংবা ক্রয়ের অনুমোদনের মতো কাজে একাধিক বিভাগ যুক্ত থাকতে পারে। এসব কাজের মানচিত্র তৈরির সময় দেখা দরকার, অনুরোধটি কার কাছে যাচ্ছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনুপস্থিত থাকলে কী ঘটছে।

কর্মীর বেতন, পরিচয়পত্র বা অন্য ব্যক্তিগত তথ্য জড়িত থাকলে কে কোন তথ্য দেখতে পারবেন, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, সব কাজ একসঙ্গে স্বয়ংক্রিয় করা জরুরি নয়। একই বিভাগের কয়েকটি কাজের মধ্যে একটি হয়তো সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যাবে, অন্যটির জন্য মানুষের সিদ্ধান্ত অপরিহার্য থাকবে।

প্রক্রিয়ার মানচিত্র বানাতে সুন্দর চিত্র প্রয়োজন নেই

প্রক্রিয়ার মানচিত্র বানাতে সুন্দর চিত্র প্রয়োজন নেই

কাজের ধাপগুলো বুঝতে পারাই প্রথম উদ্দেশ্য। সেই কাজ কাগজে করা যায়, লেখার বোর্ডেও করা যায়। প্রথম দিনেই বিশেষায়িত সফটওয়্যার কেনার দরকার নেই। তবে যে প্রক্রিয়াটির মানচিত্র তৈরি করবেন, তার সীমানা ঠিক করতে হবে। ‘অর্ডার ব্যবস্থাপনা’ বলতে অর্ডার গ্রহণ থেকে পণ্য ফেরত নেওয়া পর্যন্ত অনেক কাজ বোঝানো হতে পারে। প্রথম মানচিত্রে এত বড় অংশ রাখার প্রয়োজন নেই। অর্ডার পাওয়া থেকে সেটি পণ্য সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা পর্যন্ত অংশ নিয়ে শুরু করা সহজ হবে।

এরপর কাজটি যাঁরা করেন, তাঁদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন। অর্ডার পাওয়ার পর প্রথমে কে দেখেন? তিনি কোন তথ্য যাচাই করেন? পরবর্তী কর্মীকে কী পাঠান? কোথাও আবার তথ্য লিখতে হয় কি না? কোনো সমস্যা হলে কার সঙ্গে যোগাযোগ করেন? এ প্রশ্নগুলো ব্যবস্থাপকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরও করতে হবে।

কারণ, লিখিত নির্দেশনায় কাজের যে নিয়ম রয়েছে, বাস্তবে সেটি সব সময় একইভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, এমন নয়। কোনো কর্মী হয়তো প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে অসুবিধা হওয়ায় আলাদা নথিতে হিসাব রাখেন। অন্য কেউ কাজের অনুমোদন নিতে নিয়মের বাইরে আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এগুলো অপ্রয়োজনীয় মনে করে মানচিত্র থেকে বাদ দিলে কাজের বর্তমান অবস্থাটিই ঠিকমতো বোঝা যাবে না। প্রতিটি কাজের পাশে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং কাজ শেষে কী পাওয়া যাচ্ছে, তা লিখুন। সম্ভব হলে আগের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। কোথাও নিয়ম ও বাস্তব কাজের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সেটিও রাখুন।

কোথায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেটি স্পষ্ট করুন

একটি অর্ডার পাওয়ার পর পণ্যের মজুত পরীক্ষা করা হলো। পণ্য আছে, তাই পরবর্তী ধাপে যাওয়া গেল। কিন্তু পণ্য না থাকলে কী হবে? অর্ডার বাতিল হবে, গ্রাহককে বিকল্প জানানো হবে, নাকি নতুন মজুত আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে? প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই পথগুলোর একটি বেছে নিতে হবে। প্রক্রিয়ার মানচিত্রে এ ধরনের বিকল্প পথ দেখানো জরুরি। কাজের স্বাভাবিক ধারাটি লিখে রাখলেই পুরো প্রক্রিয়া বোঝা যায় না।

সাধারণ প্রবাহচিত্রে আয়তক্ষেত্র দিয়ে কাজ, হীরকাকৃতি দিয়ে সিদ্ধান্ত এবং তীরচিহ্ন দিয়ে কাজের প্রবাহ দেখানো যায়। একাধিক বিভাগের দায়িত্ব আলাদা করে দেখতে চাইলে দায়িত্বভিত্তিক প্রবাহচিত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।

জটিল ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া উপস্থাপনের জন্য ‘ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া চিত্রায়ণ ও প্রতীকবিন্যাস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ড রয়েছে। তবে ছোট ব্যবসার প্রথম মানচিত্রে এসব আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক নয়। কর্মীরা চিত্রটি দেখে নিজেদের কাজের ধাপ, দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের জায়গা বুঝতে পারছেন কি না, সেটিই বেশি জরুরি।

কাজের চেয়ে অপেক্ষার সময় বেশি হচ্ছে কি না দেখুন

অনেক সময় কাজটি সম্পন্ন করতে যতটা সময় লাগে, তার চেয়ে বেশি সময় চলে যায় পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার অপেক্ষায়। যেমন, চালান তৈরি হয়ে গেছে, কিন্তু অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। অথবা অর্ডারের সব তথ্য প্রস্তুত, শুধু মজুতের অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা। এ ধরনের বিলম্ব খুঁজে পেতে প্রতিটি ধাপের কাজের সময় ও অপেক্ষার সময় আলাদা করে লিখুন।

কোথায় ভুল সংশোধন করতে হয়, সেটিও নথিভুক্ত করুন। পরবর্তী সময়ে স্বয়ংক্রিয়করণের ফলাফল মূল্যায়ন করতে এই তথ্য কাজে লাগবে। প্রথম মানচিত্রটি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট কর্মী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। কোনো ধাপ বাদ পড়েছে কি না, কোথাও দায়িত্ব ভুলভাবে দেখানো হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণে বর্তমান অবস্থার এই নকশাকে বর্তমান প্রক্রিয়ার মানচিত্র বলা হয়। এরপর অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ দেওয়া, তথ্য আদান-প্রদানের নিয়ম ঠিক করা এবং দায়িত্ব পরিষ্কার করার পর নতুন নকশা তৈরি করা যায়। সেটি পরিকল্পিত বা উন্নত প্রক্রিয়ার মানচিত্র। শব্দ দুটি মনে রাখার চেয়ে পার্থক্যটি বোঝা বেশি দরকার। প্রথম মানচিত্রে দেখানো হবে কাজ এখন কীভাবে চলছে। দ্বিতীয়টিতে থাকবে পরিবর্তনের পর কীভাবে চলা উচিত।

অর্ডারের মানচিত্রে যে সমস্যাগুলো সহজে চোখে পড়ে না

অর্ডার ব্যবস্থাপনার একটি সাধারণ ধারা এমন হতে পারে:

অর্ডার পাওয়া → গ্রাহকের তথ্য যাচাই → পণ্যের মজুত পরীক্ষা → অর্থপ্রদানের শর্ত যাচাই → অর্ডার নিশ্চিত করা → পণ্য মোড়কজাত করার দায়িত্ব দেওয়া।

এভাবে লিখলে কাজটি বেশ সরল দেখায়। কিন্তু প্রতিটি ধাপেই ব্যতিক্রম থাকতে পারে। ধরা যাক, গ্রাহকের ঠিকানা অসম্পূর্ণ। সেটি সংশোধন না করে পণ্য সরবরাহের কাজ শুরু করা যাবে কি? আবার অর্ডারের পণ্য মজুত না থাকলে কে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন?

অর্থপ্রদানের নিয়মও সব অর্ডারে এক নয়। অগ্রিম অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে লেনদেন সফল হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। পণ্য হাতে পাওয়ার সময় অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহের পর অর্থ সংগ্রহ এবং হিসাব মেলানোর ব্যবস্থা থাকবে। এসব পার্থক্য মানচিত্রে না থাকলে সফটওয়্যার চালুর সময় সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আরেকটি পরিস্থিতি হলো একই অর্ডারের অনুরোধ একাধিকবার আসা। প্রতিটি অর্ডারের স্বতন্ত্র শনাক্তকারী রাখা প্রয়োজন, কিন্তু শুধু আলাদা নম্বর থাকলেই একই কাজ একাধিকবার হওয়া বন্ধ হয় না। একই অনুরোধ থেকে সফটওয়্যার যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে নতুন অর্ডার, অর্থপ্রদানের নির্দেশনা বা পণ্য সরবরাহের নির্দেশনা তৈরি না করে, সেই ব্যবস্থাও পরীক্ষা করতে হবে। এই জায়গাগুলো মানচিত্রে পরিষ্কার থাকলে স্বয়ংক্রিয়করণ বাস্তবায়নের সময় অনুমানের প্রয়োজন কমে। কোন কাজ সফটওয়্যার করবে এবং কোথায় মানুষের সিদ্ধান্ত লাগবে, তা নির্ধারণ করাও সহজ হয়।

পুরোনো নিয়ম ঠিক না করে নতুন সফটওয়্যার আনবেন না

পুরোনো নিয়ম ঠিক না করে নতুন সফটওয়্যার আনবেন না

প্রক্রিয়ার মানচিত্র তৈরির পর কিছু সমস্যা এতটাই স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে যে সেগুলোর সমাধানে নতুন সফটওয়্যার কেনার প্রয়োজন হবে না। ধরা যাক, একই তথ্য দুটি বিভাগে আলাদাভাবে লেখা হচ্ছে। একটি অভিন্ন তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা সম্ভব হলে কাজের পুনরাবৃত্তি কমতে পারে। অথবা একটি অনুমোদনের জন্য একাধিক কর্মীর কাছে যেতে হচ্ছে। সেই অনুমোদনগুলোর সব কটি প্রয়োজনীয় কি না, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

আবার একই তথ্যের ভিন্ন নামও সমস্যা তৈরি করে। বিক্রয় বিভাগের কাছে ‘অর্ডার সম্পন্ন’ বলতে পণ্য মোড়কজাত করার কাজ শেষ হওয়া বোঝাতে পারে। পণ্য সরবরাহ বিভাগের কাছে একই কথার অর্থ গ্রাহকের হাতে পণ্য পৌঁছানো।

দুটি আলাদা অবস্থাকে একই নামে দেখালে পরবর্তী প্রতিবেদনেও অসংগতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে তথ্যের নাম, অর্থ ও ব্যবহারের নিয়ম পরিষ্কার রাখা দরকার। সফটওয়্যার কোনো ভুল শনাক্ত করার পর কে সেটি সংশোধন করবেন, সেই দায়িত্বও আগে নির্ধারণ করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো গেলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ না থাকলে কাজ আটকে থাকতে পারে।

এ ধরনের সমস্যা সংশোধনের পর দেখা যেতে পারে, সাধারণ একটি তথ্য সংগ্রহের ছক, অভিন্ন তথ্যভান্ডার কিংবা বিদ্যমান সফটওয়্যারের কোনো সুবিধা ব্যবহার করেই প্রয়োজনীয় কাজটি করা সম্ভব। নতুন সফটওয়্যারের নিয়মিত ব্যবহারের জন্য অর্থ খরচের আগে সেই সুযোগ পরীক্ষা করা ভালো।

আরও পড়ুন: ছোট ব্যবসার সফটওয়্যার স্ট্যাক (Software Stack) কীভাবে পরিকল্পনা করবেন

ছোট ব্যবসার জন্য সফটওয়্যার বাছাইয়ের বাস্তব হিসাব

স্বয়ংক্রিয়করণের সফটওয়্যার নির্বাচনের সময় শুধু কোন কাজটি করা যাবে, তা দেখলে সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেটি চালাতে কী প্রয়োজন এবং নিয়মিত ব্যবহার করতে কত খরচ হবে, তাও দেখতে হবে।

ধরা যাক, প্রতিষ্ঠানটি হিসাব ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার থেকে তথ্য নিয়ে অর্ডার ব্যবস্থাপনার অ্যাপে পাঠাতে চায়। এ জন্য সফটওয়্যার দুটির মধ্যে সংযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে সফটওয়্যারের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের বিশেষ প্রোগ্রামিং ব্যবস্থা অথবা নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য পাঠানোর প্রযুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু ইন্টারনেটভিত্তিক কোনো সফটওয়্যার সেবায় সংযোগের সুবিধা থাকলেই সেটি সব মূল্য পরিকল্পনায় পাওয়া যাবে, এমন নয়। কোন তথ্য আদান-প্রদান করা যাবে, কী অনুমতি লাগবে এবং অতিরিক্ত কার্যক্রমের জন্য খরচ হবে কি না, তা যাচাই করতে হবে। এখানে কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও রয়েছে। নতুন সফটওয়্যার চালু করা গেলেও কর্মীরা সেটি কীভাবে ব্যবহার করবেন, ভুল হলে কোথায় দেখবেন এবং পুরোনো তথ্য কীভাবে পাওয়া যাবে, এসব বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার।

বাংলাদেশে পরিচালিত কোনো ব্যবসা স্থানীয় অর্থপ্রদান ব্যবস্থা ব্যবহার করলে নতুন সফটওয়্যার সেই ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারবে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একইভাবে বাংলা তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন থাকলেও সফটওয়্যারটির সামঞ্জস্য দেখতে হবে।

ইন্টারনেট সংযোগের ওপর পুরো কাজ নির্ভর করলে সংযোগে সমস্যা হলে কী ঘটবে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। আর আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার সেবার ক্ষেত্রে দেশ ও মূল্য পরিকল্পনা অনুযায়ী সুবিধা আলাদা হতে পারে। কর্মীদের বেতন, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য বা আর্থিক নথি যুক্ত থাকলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কে কোন তথ্য দেখতে পারবেন এবং কোথায় তা সংরক্ষিত হবে, সেই নিয়ম নির্ধারণ করা উচিত।

প্রযোজ্য আইনি বাধ্যবাধকতাও দেখতে হবে। বিশেষ করে সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার বা একাধিক দেশে তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি ও তথ্য সুরক্ষা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। ছোট ব্যবসার জন্য প্রথম প্রকল্পে একটি নির্দিষ্ট কাজ স্বয়ংক্রিয় করা সাধারণত বেশি বাস্তবসম্মত। পুরো বিক্রয় বা হিসাব ব্যবস্থা একবারে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই।

কাজ কমল, নাকি নতুন ঝামেলা তৈরি হলো?

সফটওয়্যার চালু হওয়ার পর প্রথমে পরীক্ষা করুন, যে সমস্যার জন্য স্বয়ংক্রিয়করণ শুরু করেছিলেন, সেটি কমেছে কি না। আগে অর্ডারের তথ্য বারবার লিখতে হতো। এখনো কি তা করতে হচ্ছে? ভুল সংশোধনে আগের মতোই কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে? নতুন সফটওয়্যার চালু হওয়ার পর কর্মীদের কি আরেকটি নথিও রাখতে হচ্ছে?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি। পরীক্ষার সময় শুধু স্বাভাবিক কাজের ধারা দেখবেন না। ভুল তথ্য এলে কী হয়, একই অনুরোধ দুবার এলে সফটওয়্যার কী করে কিংবা সংযুক্ত কোনো সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে কোথায় কাজ আটকে যায়, তা দেখুন।

কাজের সময়, অপেক্ষার সময় এবং ভুল সংশোধনের পরিমাণের আগের হিসাব থাকলে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা সহজ হবে। তবে কাজের পরিমাণ বা জটিলতা ভিন্ন হলে সরাসরি তুলনা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী তা জানতে পারছেন কি না, সেটিও পরীক্ষা করা দরকার।

আরেকটি বিষয় আগেই ঠিক করে রাখা ভালো। নতুন ব্যবস্থা সাময়িকভাবে কাজ না করলে পুরোনো পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় কাজ চালানো যাবে কি না। সীমিত পরিসরে পরীক্ষা করে ফলাফল সন্তোষজনক হলে পরবর্তী কাজে স্বয়ংক্রিয়করণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

শুরুটা যেখানে হওয়া উচিত

প্রথম ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণ প্রকল্পের জন্য প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় কিংবা সবচেয়ে জটিল সমস্যাটি বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এমন একটি কাজ খুঁজুন, যেটি নিয়মিত হয়, যার নিয়ম মোটামুটি পরিষ্কার এবং যেখানে বারবার একই তথ্য লেখা বা অনুমোদনের অপেক্ষার মতো সমস্যা রয়েছে। কাজটির বর্তমান ধাপগুলো লিখুন। যাঁরা প্রতিদিন কাজটি করেন, তাঁদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন কোথায় সমস্যা হচ্ছে। এরপর অপ্রয়োজনীয় ধাপ বাদ দিয়ে কাজের নতুন নিয়ম ঠিক করুন।

উচ্চ ঝুঁকির আর্থিক সিদ্ধান্ত, জটিল গ্রাহক বিরোধ কিংবা অস্পষ্ট অনুমোদন প্রক্রিয়ার মতো কাজ প্রথম প্রকল্পে না রাখাই ভালো। স্বয়ংক্রিয়করণের জন্য সফটওয়্যার কেনার আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার, কোন কাজটি স্বয়ংক্রিয় হবে, কোথায় মানুষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন এবং সমস্যা হলে কে দায়িত্ব নেবেন।

এই উত্তরগুলো পাওয়ার পর হয়তো নতুন সফটওয়্যার কেনার সিদ্ধান্তই নেবেন। আবার এটিও বুঝতে পারেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার কয়েকটি নিয়ম বদলালেই আপাতত কাজ চলছে। দুটিই গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত। উদ্দেশ্য সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়ানো নয়; অপ্রয়োজনীয় কাজ কমানো।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন 

১. প্রক্রিয়ার মানচিত্র তৈরির দায়িত্ব কাকে দেওয়া উচিত?

যিনি নিয়মিত কাজটি পরিচালনা করেন, তাঁর অংশগ্রহণ থাকা জরুরি। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নিতে পারেন, তবে শুধু তাঁর বর্ণনার ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মানচিত্র তৈরি করতে হবে। একাধিক বিভাগ যুক্ত থাকলে সবার কাজের ধাপ মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

২. প্রক্রিয়ার মানচিত্র কতটা বিস্তারিত হওয়া দরকার?

যতটা বিস্তারিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কাজের ধাপ, দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্তের জায়গা বুঝতে পারেন, ততটাই যথেষ্ট। প্রতিটি ছোট কাজ আলাদাভাবে দেখানোর প্রয়োজন নেই। তবে কোনো ধাপ বাদ দিলে ভুল সিদ্ধান্ত, বিলম্ব কিংবা তথ্যের অসংগতি তৈরি হতে পারে, এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই রাখতে হবে।

৩. প্রতিষ্ঠানে আগের কাজের কোনো হিসাব না থাকলে কী করবেন?

আগের তথ্য না থাকলেও প্রক্রিয়ার মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এবং কয়েকটি কাজের বাস্তব ধাপ পর্যবেক্ষণ করে শুরু করুন। কাজ শেষ করতে কত সময় লাগছে, কোথায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং কোন ভুলগুলো বারবার হচ্ছে, তা নথিভুক্ত করুন। পরে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর ফলাফল তুলনা করতে এই তথ্য কাজে লাগবে।

৪. ব্যবসার প্রক্রিয়ার মানচিত্র কতদিন পরপর হালনাগাদ করা উচিত?

এর জন্য সব প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। কাজের নিয়ম, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ব্যবহৃত সফটওয়্যার কিংবা অনুমোদনের পদ্ধতি বদলালে সংশ্লিষ্ট মানচিত্র পর্যালোচনা করা উচিত। একইভাবে নতুন কোনো সমস্যা দেখা দিলে আগে তৈরি করা মানচিত্রের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করতে হবে।

৫. প্রক্রিয়ার মানচিত্র তৈরি করেও কি অটোমেশন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?

অবশ্যই। মানচিত্র তৈরির উদ্দেশ্য সব কাজ স্বয়ংক্রিয় করা নয়। এতে যদি দেখা যায়, অপ্রয়োজনীয় ধাপ বাদ দেওয়া বা তথ্য সংরক্ষণের নিয়ম পরিবর্তন করলেই সমস্যা কমানো সম্ভব, তাহলে নতুন সফটওয়্যার কেনার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। অটোমেশন চালুর খরচ ও জটিলতার তুলনায় সম্ভাব্য সুবিধা কম হলে বর্তমান ব্যবস্থা উন্নত করাই যুক্তিসংগত।

সর্বশেষ