সিভিতে ক্যারিয়ার গ্যাপ (Career Gap): কীভাবে সততা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে তুলে ধরবেন

সর্বাধিক আলোচিত

জীবনবৃত্তান্তে একটি ফাঁকা সময় আছে। ছয় মাস, এক বছর কিংবা আরও বেশি। আগের চাকরির অভিজ্ঞতা লিখতে অসুবিধা হচ্ছে না, সমস্যা হচ্ছে মাঝের ওই সময়টুকু নিয়ে। কেন কাজ করেননি, তা কি জীবনবৃত্তান্তেই ব্যাখ্যা করতে হবে? নাকি নিয়োগকর্তা জানতে চাইলে সাক্ষাৎকারে বলবেন?

চাকরির বিরতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা প্রার্থীরা অনেক সময় জীবনবৃত্তান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিই ভুলে যান। তাঁদের মনোযোগ চলে যায় কীভাবে বিরতি কম দেখানো যায়, কী লিখলে নিয়োগকর্তা খারাপ ভাববেন না, কিংবা বিরতির সময়টাকে কীভাবে কাজের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো যায়, সেদিকে।

অথচ জীবনবৃত্তান্তে কর্মজীবনের বিরতি উপস্থাপনের জন্য সবচেয়ে দরকারি বিষয় হলো কাজের ইতিহাস সঠিক রাখা এবং এখন যে চাকরিতে আবেদন করছেন, তার জন্য নিজের যোগ্যতা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। বিরতির কারণ জানাতে হতে পারে, কিন্তু সেই ব্যাখ্যা যেন পুরো জীবনবৃত্তান্তের প্রধান বিষয় হয়ে না দাঁড়ায়।

অসুস্থতা, পারিবারিক দায়িত্ব, চাকরি হারানো কিংবা নতুন পেশায় যাওয়ার প্রস্তুতি—কর্মজীবনে বিরতির পেছনে নানা পরিস্থিতি থাকে। সব বিরতিকে একইভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা তাই খুব একটা কাজে আসে না। বরং নিজের পরিস্থিতিতে কোন তথ্যটি প্রাসঙ্গিক, সেটি বুঝে লেখা ভালো।

কর্মজীবনের বিরতি নিয়ে এত অস্বস্তির কারণ কী?

একজন চাকরিপ্রার্থী সাধারণত চান, তাঁর জীবনবৃত্তান্ত পড়ে নিয়োগকর্তা আগের কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সম্পর্কে ভালো ধারণা পান। কাজের ইতিহাসে দীর্ঘ বিরতি থাকলে সেই ধারণা তৈরির আগেই কোনো প্রশ্ন উঠবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

উদ্বেগের কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। দীর্ঘদিন নিয়মিত কাজের বাইরে থাকলে আগের দক্ষতাগুলো এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক, তা নিয়োগকর্তা জানতে চাইতে পারেন। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত কাজে বিরতির পর বর্তমান দক্ষতা যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। আবার অন্য কোনো পদে আগের অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

তবে কর্মজীবনে বিরতি দেখেই সব নিয়োগকর্তা একই সিদ্ধান্ত নেবেন, এমন নয়। কেউ বিরতির কারণ জানতে চাইতে পারেন, কেউ আগের কাজের অভিজ্ঞতার ওপর বেশি জোর দিতে পারেন। এখানে প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়টি হলো নিজের তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করছেন।

চাকরির সময়কাল বদলে দিলে সাময়িকভাবে বিরতি কম চোখে পড়তে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কাজের ইতিহাস যাচাই করা হলে অসংগতি ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে বিরতির সময় করা ছোটখাটো কাজকে পূর্ণকালীন চাকরির অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখালে সাক্ষাৎকারে তা ব্যাখ্যা করা কঠিন হতে পারে।

কর্মজীবনে বিরতি থাকা একটি পরিস্থিতি। সেই পরিস্থিতি আড়াল করতে ভুল তথ্য দেওয়া আলাদা সমস্যা।

জীবনবৃত্তান্ত তৈরির সময় এই পার্থক্যটি মনে রাখা দরকার।

কতটুকু ব্যাখ্যা দেবেন, সেটি আগে ঠিক করুন

কতটুকু ব্যাখ্যা দেবেন, সেটি আগে ঠিক করুন

মাত্র কয়েক মাস কাজের বাইরে ছিলেন বলে জীবনবৃত্তান্তে আলাদা করে ‘পেশাগত বিরতি‘ শিরোনাম দিতেই হবে, এমন নিয়ম নেই। আগের ও পরের চাকরির সঠিক সময়কাল উল্লেখ করাই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু বিরতি দীর্ঘ হলে বিষয়টি একটু অন্যভাবে দেখা ভালো।

কাজের ইতিহাসে কয়েক বছর ফাঁকা থাকলে সেই সময়ের জন্য সংক্ষিপ্ত একটি বিবরণ জীবনবৃত্তান্তে রাখা যেতে পারে। এতে কাজের ইতিহাসের ফাঁকা অংশটি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। নিয়োগকর্তাকেও পুরো বিষয়টি অনুমান করতে হয় না।

তবে কত দিনের বিরতির পর অবশ্যই আলাদা ব্যাখ্যা দিতে হবে, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। বিরতির দৈর্ঘ্য, আগের অভিজ্ঞতা এবং আবেদন করা পদের চাহিদা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। পারিবারিক দায়িত্বের জন্য নিয়মিত চাকরি বন্ধ রাখতে হলে জীবনবৃত্তান্তে এমন একটি বিবরণ ব্যবহার করা যেতে পারে:

পেশাগত বিরতি | জানুয়ারি ২০২৪ – ডিসেম্বর ২০২৫

পারিবারিক দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত চাকরি থেকে বিরতি নিয়েছিলাম। বর্তমানে পুনরায় পেশাগত কাজে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এখানে কারণটি বোঝা যাচ্ছে। অথচ পরিবারের কোন সদস্যের কী সমস্যা হয়েছিল কিংবা সেই সময়ে ব্যক্তিগত জীবনে কী ঘটেছে, তার বিস্তারিত কিছু লেখার প্রয়োজন পড়েনি।

নিজের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী এ ধরনের বিবরণ ব্যবহার করা যায়। চাকরির সময়কাল দেখানোর সময় অবশ্য আরেকটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ কেউ শুধু সাল লেখেন। এতে জীবনবৃত্তান্ত সংক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু প্রকৃত মেয়াদ সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। চাকরির আবেদনপত্রে মাস ও সাল চাওয়া হলে সম্পূর্ণ তথ্য দিন। কোনো কারণে কাজ বন্ধ থাকলে সেটিকে আগের চাকরির মেয়াদের মধ্যে দেখানো উচিত নয়।

ব্যক্তিগত সমস্যার কতটা লিখবেন?

জীবনবৃত্তান্তে কর্মজীবনের বিরতি ব্যাখ্যা করার সময় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সংযম দরকার এখানে। অসুস্থতার কারণে কয়েক মাস বা কয়েক বছর চাকরি করতে পারেননি। এখন আবার কাজে ফিরতে চান। এ ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকে আপনার চিকিৎসার পূর্ণ ইতিহাস জানাতে হবে, এমন নয়। সাধারণ চাকরির আবেদনে ‘স্বাস্থ্যগত কারণে নিয়মিত চাকরি থেকে বিরতি নিয়েছিলাম’—এই সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে।

তবে সব চাকরির শর্ত এক নয়। কিছু পেশায় নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিয়ম থাকতে পারে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যতথ্য প্রকাশ, কাজের উপযুক্ততা যাচাই কিংবা বিশেষ কর্মব্যবস্থার বিষয়েও দেশভেদে আইন ও নিয়োগনীতি আলাদা। এ ধরনের পদের জন্য সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি ও প্রযোজ্য নিয়ম দেখা প্রয়োজন।

পারিবারিক দায়িত্বের ক্ষেত্রেও একই সংযম রাখা যায়। সন্তান লালনপালন কিংবা পরিবারের অসুস্থ সদস্যের দেখাশোনার জন্য চাকরি থেকে বিরতি নিয়ে থাকলে সেটি সরাসরি জানাতে পারেন। পরিবারের ব্যক্তিগত পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ যোগ করার প্রয়োজন নেই।

আরেকটি প্রচলিত পরামর্শ নিয়েও সতর্ক থাকা ভালো। অনেক সময় বলা হয়, পারিবারিক দায়িত্ব পালন করলে নেতৃত্ব, সময় ব্যবস্থাপনা কিংবা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জিত হয়, তাই সেগুলো জীবনবৃত্তান্তে লিখতে হবে। কথাটি আংশিকভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় এসব দক্ষতা গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেশাগত নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা হয়ে যায় না। আপনি বাস্তবে যা করেছেন, তার মধ্য থেকে প্রাসঙ্গিক দক্ষতা থাকলে উল্লেখ করুন। শুধু জীবনবৃত্তান্তকে আকর্ষণীয় দেখাতে অপ্রমাণিত অর্জন যোগ করবেন না।

চাকরি হারিয়ে থাকলে ঘুরিয়ে বলার দরকার নেই

কর্মজীবনের বিরতির সব কারণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। প্রতিষ্ঠানে জনবল কমানো, বিভাগ বন্ধ হওয়া কিংবা ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের কারণেও চাকরি শেষ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সত্য ঘটনাটি সংক্ষেপে জানাতে অসুবিধা নেই। আগের প্রতিষ্ঠানে পদ বিলুপ্ত হয়ে থাকলে সে কথাই লিখুন। এরপর নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজেছেন, সেটিও উল্লেখ করা যায়।

কিন্তু চাকরি শেষ হওয়ার কারণ যদি ভিন্ন হয়, সেটিকে মিথ্যাভাবে প্রতিষ্ঠানের ছাঁটাই হিসেবে দেখানো ঠিক নয়। এ ধরনের বিষয় সাক্ষাৎকারে উঠতে পারে। তাই আগের চাকরি কেন শেষ হয়েছিল, তার একটি সংক্ষিপ্ত ও সত্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রস্তুত রাখা ভালো। কাজের দক্ষতা বা আচরণসংক্রান্ত সমস্যা থাকলে সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখেছেন এবং পরবর্তী কাজে কীভাবে উন্নতি করতে চান, তা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

একইভাবে আগের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও জীবনবৃত্তান্তে দীর্ঘ অভিযোগের বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিয়োগকর্তা আপনার অতীত সম্পর্কে জানতে পারেন। কিন্তু নতুন চাকরিতে আপনি কী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জায়গাও জীবনবৃত্তান্তে থাকতে হবে।

বিরতির সময় কিছু করেছেন বলেই সবকিছু জীবনবৃত্তান্তে রাখতে হবে না

নিয়মিত চাকরি ছিল না, কিন্তু মাঝের সময়ে কিছু কাজ করেছেন। হয়তো স্বাধীনভাবে চুক্তিভিত্তিক কাজ, কোনো সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ কিংবা নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য অনুশীলন। এসব অভিজ্ঞতা জীবনবৃত্তান্তে রাখা যেতে পারে। তবে কাজগুলো কোন পদের জন্য কতটা প্রাসঙ্গিক, সেটি বিবেচনা করতে হবে।

কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থের বিনিময়ে লেখালেখি করে থাকলে স্বাধীন পেশায় কাজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করতে পারেন। সেখানে প্রকৃত সময়কাল, দায়িত্ব এবং কী ধরনের কাজ করেছেন, তা লিখুন। কিন্তু নিজের অনুশীলনের জন্য কোনো প্রকল্প তৈরি করলে সেটিকে গ্রাহকের জন্য করা কাজ বলা যাবে না। আবার সত্যিই অর্থের বিনিময়ে স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকলে কাজের সময়কাল ও দায়িত্ব উল্লেখ করা যায়।

স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো অনুষ্ঠানের সময়সূচি তৈরি করেছেন, অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন কিংবা তথ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করেছেন—এ ধরনের অভিজ্ঞতা চাকরির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলে লিখতে পারেন। তবে বিনা পারিশ্রমিকে করা কাজকে বেতনভুক্ত চাকরি হিসেবে দেখাবেন না।

ইন্টারনেটভিত্তিক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একটু বাছাই প্রয়োজন। কোনো প্রশিক্ষণে নিবন্ধন করেছেন মানেই সেটি সম্পন্ন করেছেন, এমন নয়। আর প্রশিক্ষণ শেষ করলেও শুধু নামের দীর্ঘ তালিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবেদন করা কাজের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সেখানে শেখা দক্ষতা কিংবা সেই দক্ষতায় করা প্রকল্প উল্লেখ করুন।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসে। বিরতির সময় নতুন কিছু না শিখে থাকলে কী হবে? তাহলে নতুন কিছু শেখার দাবি করার প্রয়োজন নেই।

অসুস্থতা, পারিবারিক দায়িত্ব বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে অনেকের পক্ষে ওই সময়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব হয় না। জীবনবৃত্তান্তে প্রতিটি ফাঁকা সময় নতুন অর্জন দিয়ে পূরণ করার বাধ্যবাধকতা নেই। আপনার আগের পেশাগত অভিজ্ঞতা তো হারিয়ে যায়নি। সেটি এখনও আবেদন করা পদের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলে সামনে আনুন। প্রয়োজনীয় কোনো দক্ষতায় ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকলে তা নতুন করে চর্চা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

আরও পড়ুন: এটিএস (ATS) বান্ধব সিভি কী? মানুষ ও সফটওয়্যার দুজনের জন্য পড়তে সহজ সিভি

নতুন স্নাতকদের জন্য বিষয়টি কিছুটা অন্য রকম

নতুন স্নাতকদের জন্য বিষয়টি কিছুটা অন্য রকম

পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর প্রথম চাকরি পেতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু আগে নিয়মিত চাকরি না করে থাকলে এই সময়কে দীর্ঘ কর্মজীবনের মাঝখানের বিরতির সঙ্গে একভাবে দেখা ঠিক নয়। নতুন স্নাতকের জীবনবৃত্তান্তে সাধারণত শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প ও প্রাসঙ্গিক দক্ষতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পড়াশোনা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিয়েছেন। পাশাপাশি কোনো কম্পিউটারভিত্তিক কাজ শিখেছেন বা অনুশীলনমূলক প্রকল্প করেছেন। আবেদন করা পদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সেগুলো যুক্ত করতে পারেন। তবে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়কে পেশাগত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো ঠিক নয়।

নিয়োগকর্তা শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরের সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে তখন সংক্ষেপে ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে। আগে চাকরি না করে থাকলে জীবনবৃত্তান্তে আলাদা ‘পেশাগত বিরতি’ শিরোনাম সাধারণত প্রয়োজন হয় না।

জীবনবৃত্তান্তের বিন্যাস পাল্টাবেন, কিন্তু চাকরির ইতিহাস নয়

দীর্ঘ বিরতির পর জীবনবৃত্তান্ত নতুন করে সাজাতে হতে পারে। বিশেষ করে আগের কর্মক্ষেত্রে ফিরতে চাইলে কিংবা পেশা পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিলে। এ ক্ষেত্রে জীবনবৃত্তান্তের শুরুতে প্রাসঙ্গিক দক্ষতা ও সংক্ষিপ্ত পেশাগত পরিচিতি রাখা যায়। তারপর আগের চাকরিগুলো সাম্প্রতিক থেকে পুরোনো ক্রমে সাজান।

এতে নিয়োগকর্তা শুরুতেই আপনার যোগ্যতা দেখতে পাবেন। কাজের প্রকৃত সময়কালও গোপন থাকবে না। শুধু দক্ষতার তালিকা রেখে চাকরির তারিখ বাদ দেওয়ার চেষ্টা ভালো কৌশল নয়। নিয়োগকর্তা বিস্তারিত কাজের ইতিহাস জানতে চাইলে তখনও সঠিক তথ্য দিতে হবে।

জীবনবৃত্তান্তের নকশা সহজ রাখুন। কিছু স্বয়ংক্রিয় চাকরির আবেদন বাছাইব্যবস্থায় অতিরিক্ত চিত্রভিত্তিক উপাদান ও জটিল ছকের তথ্য পড়তে সমস্যা হতে পারে। যদিও সব আবেদন বাছাইব্যবস্থা একইভাবে কাজ করে না এবং কোনো একটি বিন্যাস সব নিয়োগব্যবস্থায় সমান কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিষ্কার শিরোনাম ও পাঠযোগ্য অক্ষরবিন্যাস ব্যবহার করুন। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট নথির ধরন চাওয়া হলে সেটিই অনুসরণ করুন।

সাক্ষাৎকারে বিরতির কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে

জীবনবৃত্তান্তে বিরতির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা থাকলেও সাক্ষাৎকারে বিষয়টি আবার আসতে পারে। তাই আগে থেকে নিজের উত্তর গুছিয়ে রাখা ভালো। তবে মুখস্থ করা দীর্ঘ বক্তব্যের প্রয়োজন নেই। কেন বিরতি নিতে হয়েছিল, তা সংক্ষেপে বলুন। ওই সময়ে কোনো প্রাসঙ্গিক কাজ বা প্রশিক্ষণ করে থাকলে উল্লেখ করুন। এরপর এখন যে পদে আবেদন করছেন, তার জন্য নিজের প্রস্তুতির কথা জানান।

পারিবারিক দায়িত্বের কারণে চাকরি থেকে বিরতি নেওয়া একজন হিসাবরক্ষণ কর্মীর উত্তর এমন হতে পারে:

‘পারিবারিক দায়িত্বের কারণে কিছুদিন নিয়মিত চাকরি করতে পারিনি। এর আগে হিসাবরক্ষণ বিভাগে কাজ করেছি। বর্তমানে আবার ওই ধরনের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

নিজের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে উত্তরটি দিতে হবে। এখানে অপ্রয়োজনীয় আত্মপক্ষ সমর্থনের দরকার নেই। বিরতির জন্য বারবার ক্ষমা চাওয়া কিংবা আগের প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করার বদলে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান যোগ্যতা নিয়ে কথা বলুন।

কিছু ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট পদের যোগ্যতা, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এবং প্রযোজ্য আইনগত শর্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম বিবেচনা করতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে দেওয়া পরিচিতিমূলক চিঠিতেও বিরতির কারণ সংক্ষেপে জানানো যায়। সেখানে আগের অভিজ্ঞতা এবং নতুন পদের প্রতি আগ্রহ তুলে ধরুন। জীবনবৃত্তান্তে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটি আবার দীর্ঘ করে লেখার প্রয়োজন নেই।

লিংকডইন ব্যবহার করলে সেখানকার চাকরির ইতিহাসও মিলিয়ে রাখুন। এই পেশাগত যোগাযোগমাধ্যমে কর্মজীবনের বিরতি উল্লেখ করার সুবিধা রয়েছে। লিংকডইনের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুসারে, এটি ঐচ্ছিক এবং প্রবেশ করা সদস্যদের কাছে দৃশ্যমান হয়। নতুন পেশাগত বিরতি যোগ করলে যোগাযোগের তালিকায় স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয় না। তবে যোগাযোগমাধ্যমটির নির্দেশনা ও ব্যবহারপদ্ধতি পরিবর্তিত হতে পারে।

লিংকডইনে বিরতির তথ্য যোগ করতেই হবে, এমন নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবনবৃত্তান্ত, আবেদনপত্রের পরিচিতিমূলক চিঠি ও পেশাগত পরিচিতির পাতায় চাকরির সময়কাল যেন পরস্পরবিরোধী না হয়।

বিরতির ব্যাখ্যা লিখে থেমে যাবেন না

কর্মজীবনের বিরতি নিয়ে জীবনবৃত্তান্ত সংশোধন করার সময় পুরো মনোযোগ ওই বিরতির ওপর চলে যেতে পারে। ফলে আগের কাজের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও দায়িত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথেষ্ট জায়গা পায় না।

এই জায়গাতেই একটু সতর্ক হওয়া দরকার।

জীবনবৃত্তান্তে কর্মজীবনের বিরতি সৎভাবে উপস্থাপন করার অর্থ বিরতির প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া, সেটিকে জীবনবৃত্তান্তের সবচেয়ে বড় বিষয় বানানো নয়।

আগের চাকরির তারিখগুলো ঠিক আছে কি না, মিলিয়ে নিন। যে কাজ করেছেন, সেটি সঠিক পরিচয়ে লেখা হয়েছে কি না, দেখুন। পুরোনো কোনো দক্ষতা এখনও একইভাবে ব্যবহার করতে পারবেন কি না, সেটিও নিজের কাছে পরিষ্কার রাখুন।

তারপর আবেদন করা পদের বিজ্ঞপ্তিটি আবার পড়ুন। নিয়োগকর্তা যে যোগ্যতা খুঁজছেন, তার সঙ্গে সম্পর্কিত আপনার অভিজ্ঞতা কি জীবনবৃত্তান্তে সহজে পাওয়া যাচ্ছে? প্রয়োজনে অন্য কাউকে জীবনবৃত্তান্তটি পড়ে দেখতে দিতে পারেন। কোনো তথ্য অস্পষ্ট হলে কিংবা সময়কালে অসংগতি থাকলে তা ধরা পড়তে পারে।

কাজের বিরতি জীবনের একটি সময়ের ঘটনা। সেটি আপনার আগের সব অভিজ্ঞতাকে বাতিল করে দেয় না। আবার বিরতি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলেই চাকরি পাওয়া নিশ্চিত হয় না। জীবনবৃত্তান্তে যতটুকু দরকার, ততটুকুই বলুন। বাকি জায়গায় থাকুক আপনার কাজ, দক্ষতা এবং এখন যে দায়িত্ব নিতে চাইছেন, তার প্রস্তুতির কথা।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন 

১. সিভিতে ক্যারিয়ার গ্যাপের কারণ উল্লেখ করা কি বাধ্যতামূলক?

না। প্রতিটি চাকরির বিরতির জন্য আলাদা ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। কয়েক মাসের বিরতি থাকলে চাকরির সঠিক সময়কাল উল্লেখ করাই যথেষ্ট হতে পারে। তবে দীর্ঘ বিরতি থাকলে সংক্ষেপে কারণ জানানো ভালো। চাকরির আবেদনপত্রে নির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হলে তা সঠিকভাবে দিতে হবে।

২. এখনও চাকরি না পেলে সিভিতে ক্যারিয়ার গ্যাপের সময়কাল কীভাবে লিখবেন?

দীর্ঘ বিরতির জন্য আলাদা বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন হলে শুরুর মাস ও সালের সঙ্গে ‘বর্তমান’ লিখতে পারেন। যেমন, ‘পেশাগত বিরতি | জানুয়ারি ২০২৫ – বর্তমান’। তবে এই সময়কে চাকরির অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখাবেন না। বিরতির মধ্যে প্রাসঙ্গিক কোনো কাজ বা প্রশিক্ষণ করে থাকলে সেটি প্রকৃত পরিচয়ে আলাদাভাবে উল্লেখ করুন।

৩. চাকরির বিরতির সময় শুধু নতুন চাকরি খুঁজলে কী লিখবেন?

বিরতির সময় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে থাকলে সেটিই সংক্ষেপে জানাতে পারেন। ওই সময়ে প্রশিক্ষণ বা অন্য কোনো পেশাগত কাজ না করলে সেগুলোর দাবি করার প্রয়োজন নেই। আগের কাজের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানে যে পদের জন্য আবেদন করছেন, তার সঙ্গে সম্পর্কিত যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিন।

৪. কর্মজীবনের বিরতির সময় কি মোট চাকরির অভিজ্ঞতার সঙ্গে যোগ করা যায়?

সাধারণভাবে চাকরি না করার সময়কে পেশাগত অভিজ্ঞতার বছর হিসেবে গণনা করা উচিত নয়। তবে বিরতির মধ্যে সত্যিকারের ফ্রিল্যান্সিং, চুক্তিভিত্তিক কাজ বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক দায়িত্ব পালন করে থাকলে সেই কাজের অভিজ্ঞতা আলাদাভাবে উল্লেখ করা যায়। কাজের প্রকৃত সময়কাল ও ধরন সঠিক রাখতে হবে।

৫. সিভিতে একাধিক ক্যারিয়ার গ্যাপ থাকলে কীভাবে উপস্থাপন করবেন?

একাধিক বিরতি থাকলে প্রতিটির জন্য দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। চাকরির সময়কাল ধারাবাহিকভাবে সাজান। যে বিরতিগুলো কাজের ইতিহাস বুঝতে অস্পষ্টতা তৈরি করতে পারে, সেগুলোর জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত বিবরণ যোগ করুন। বিভিন্ন বিরতির কারণ আলাদা হলে সেগুলোকে একই ব্যাখ্যায় ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।

সর্বশেষ