একটি শিশুর পৃথিবীতে আগমনের পর তার প্রথম কান্না, প্রথম হাসি এবং আধো আধো বোল বাবা-মায়ের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার। কিন্তু এই স্বাভাবিক বিকাশের পথে যদি কোনো অদৃশ্য বাধা এসে দাঁড়ায়? যদি আপনার আদরের শিশু কি কানে কম শুনছে—এমন সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে? শ্রবণশক্তি বা শোনার ক্ষমতা হলো মানুষের যোগাযোগের মূল ভিত্তি। এটি কেবল শব্দ শোনার বিষয় নয়; এটি ভাষা শেখা, মস্তিষ্কের বিকাশ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রায় ৩৪ মিলিয়ন শিশু শ্রবণশক্তির সমস্যায় ভুগছে । এর মধ্যে একটি বড় অংশ সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অভাবে আজীবনের জন্য কথা বলার ক্ষমতা হারাচ্ছে।
অনেক সময় বাবা-মায়ের মনে প্রশ্ন জাগে, শিশু কি কানে কম শুনছে? কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন বা কী কী লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন। কখনো বা কুসংস্কার বা সঠিক তথ্যের অভাবে চিকিৎসার সুবর্ণ সময়টি (Golden Period) পার হয়ে যায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে নবজাতকের স্ক্রিনিং থেকে শুরু করে কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্টের মতো যুগান্তকারী প্রযুক্তি এসেছে, যা জন্মগত বধির শিশুকেও শব্দের জগতে ফিরিয়ে আনতে পারে। এই প্রতিবেদনে আমরা শিশুদের শ্রবণশক্তির সমস্যা, এর কারণ, বয়সভেদে লক্ষণ, রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি, এবং বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপটে এর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা করব। আমাদের উদ্দেশ্য হলো, প্রতিটি অভিভাবককে এমনভাবে সচেতন করা যাতে একটি শিশুও নীরবতার অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
মানুষের শ্রবণ প্রক্রিয়া: শব্দ কীভাবে মস্তিষ্কে পৌঁছায়?
শিশুর শ্রবণশক্তির সমস্যা বোঝার আগে আমাদের বুঝতে হবে স্বাভাবিক শ্রবণ প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল এবং সূক্ষ্ম জৈবিক প্রক্রিয়া। মানুষের কানকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: বহিঃকর্ণ (Outer Ear), মধ্যকর্ণ (Middle Ear) এবং অন্তঃকর্ণ (Inner Ear)।
যখন কোনো শব্দের উৎপত্তি হয়, তা বাতাসের মাধ্যমে ঢেউয়ের মতো বহিঃকর্ণ বা পিনা (Pinna)-তে এসে পৌঁছায়। পিনা সেই শব্দতরঙ্গকে একত্রিত করে কানের ছিদ্র বা ইয়ার ক্যানেল (Ear Canal) দিয়ে কানের পর্দার (Eardrum) দিকে চালিত করে। শব্দতরঙ্গের আঘাতে কানের পর্দায় কম্পন সৃষ্টি হয়। এই কম্পন মধ্যকর্ণে অবস্থিত মানবদেহের সবচেয়ে ছোট তিনটি হাড়—ম্যালিয়াস, ইনকাস এবং স্টেপিস (Ossicles)-এর মাধ্যমে বহুগুণে বর্ধিত হয়ে অন্তঃকর্ণে পৌঁছায় ।

অন্তঃকর্ণে থাকে শামুকের মতো দেখতে একটি অঙ্গ, যার নাম ককলিয়া (Cochlea)। ককলিয়ার ভেতরে থাকে তরল পদার্থ এবং হাজার হাজার আণুবীক্ষণিক হেয়ার সেল (Hair Cells)। মধ্যকর্ণ থেকে আসা কম্পন ককলিয়ার তরলে ঢেউ তোলে, যা হেয়ার সেলগুলোকে আন্দোলিত করে। এই আন্দোলন যান্ত্রিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক সংকেতে (Electrical Signals) রূপান্তর করে। অবশেষে, এই সংকেত শ্রবণ স্নায়ু বা অডিটরি নার্ভ (Auditory Nerve)-এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের অডিটরি কর্টেক্সে পৌঁছায়, যেখানে মস্তিষ্ক এই সংকেতকে ‘শব্দ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে । এই পুরো পথের যেকোনো একটি স্থানে যদি কোনো বাধা বা ত্রুটি থাকে, তখনই শিশু কি কানে কম শুনছে—এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এবং শ্রবণশক্তির সমস্যা দেখা দেয়।
কানের বিভিন্ন অংশের কাজ ও সম্ভাব্য সমস্যা
| কানের অংশ | প্রধান কাজ | সম্ভাব্য সমস্যা যা শ্রবণশক্তি কমায় |
| বহিঃকর্ণ (Outer Ear) | শব্দ সংগ্রহ করে পর্দায় পাঠানো। | ওয়াক্স বা খৈল জমা, কানের ছিদ্র না থাকা (Atresia), ইনফেকশন (Otitis Externa)। |
| মধ্যকর্ণ (Middle Ear) | শব্দের কম্পন বাড়িয়ে অন্তঃকর্ণে পাঠানো। | কানের পর্দায় ফুটো, ওটাইটিস মিডিয়া (ইনফেকশন), তরল জমা (Glue Ear)। |
| অন্তঃকর্ণ (Inner Ear) | শব্দকে স্নায়ু সংকেতে রূপান্তর। | জন্মগত ত্রুটি, হেয়ার সেল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া (মেনিনজাইটিস বা ওষুধের প্রভাবে)। |
| শ্রবণ স্নায়ু (Auditory Nerve) | সংকেত মস্তিষ্কে বহন করা। | অডিটরি নিউরোপ্যাথি, টিউমার, জন্ডিসজনিত ক্ষতি। |
শিশুর শ্রবণশক্তির বিকাশের মাইলফলক
শিশুদের শ্রবণশক্তির বিকাশ গর্ভাবস্থা থেকেই শুরু হয়। জন্মের পর বিভিন্ন বয়সে তাদের শোনার প্রতিক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন হয়। বাবা-মা হিসেবে এই মাইলফলকগুলো (Milestones) জানা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এর বিচ্যুতির মাধ্যমেই বোঝা যায় শিশু কি কানে কম শুনছে কি না।
জন্ম থেকে ৩ মাস: শব্দের প্রতি প্রথম প্রতিক্রিয়া
একটি সুস্থ নবজাতক জন্মের পরপরই উচ্চ শব্দে চমকে ওঠে (Startle Reflex)। এটি তার স্বাভাবিক স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়ার অংশ। এই বয়সে শিশু মায়ের গলার স্বর চিনতে পারে এবং কান্নারত অবস্থায় মায়ের কথা শুনে শান্ত হয়। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কোনো শব্দ হলে (যেমন দরজা লাগানোর শব্দ বা হাততালি) শিশু নড়ে ওঠে বা তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। যদি ৩ মাস বয়সের মধ্যেও শিশু উচ্চ শব্দে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখায়, তবে এটি শ্রবণ সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে ।
৪ থেকে ৬ মাস: শব্দের উৎস খোঁজা
এই বয়সে ঘাড় শক্ত হওয়ার সাথে সাথে শিশু শব্দের উৎসের দিকে মাথা ঘোরাতে শুরু করে। তার দৃষ্টিসীমার বাইরে কোনো শব্দ হলে সে কৌতূহলী হয়ে সেদিকে তাকায়। খেলনার শব্দ, ঝুমঝুমির আওয়াজ বা গানের সুরে সে আনন্দ প্রকাশ করে। এই সময় তারা বাবলিং (Babbling) শুরু করে, অর্থাৎ ‘বা-বা’, ‘মা-মা’ জাতীয় অর্থহীন শব্দ করে নিজের গলার স্বর শোনার চেষ্টা করে ।
৭ থেকে ১২ মাস: ভাষা ও শব্দের সংযোগ
এই পর্যায়ে শিশু নিজের নাম চিনতে পারে। তাকে নাম ধরে ডাকলে সে সাড়া দেয়। সাধারণ শব্দ যেমন “না”, “দাও”, “এসো” বুঝতে শেখে এবং নির্দেশ মানার চেষ্টা করে। এক বছর বয়সের মধ্যে শিশু অন্তত একটি বা দুটি অর্থপূর্ণ শব্দ (যেমন ‘মা’, ‘বাবা’, ‘পানি’) বলতে শুরু করে। যদি শিশু শুধু ইশারায় সব বোঝাতে চায় এবং মুখ দিয়ে কোনো শব্দ না করে, তবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ।
১ থেকে ২ বছর: বাক্য গঠন ও নির্দেশনা পালন
দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে শিশুর শব্দভাণ্ডার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সে ছোট ছোট দুই শব্দের বাক্য বলতে পারে (যেমন “ভাত খাব”, “বল দাও”)। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ (চোখ, নাক, কান) দেখিয়ে দিলে চিনতে পারে। আপনি যদি তাকে অন্য ঘর থেকে ডাকেন, সে ছুটে আসে। এই বয়সেও যদি শিশু কথা না বলে বা অদ্ভুত আওয়াজ করে, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত ।
বয়স অনুযায়ী শ্রবণ ও ভাষার বিকাশ
| বয়স | স্বাভাবিক শ্রবণ ও ভাষা বিকাশ | কখন সতর্ক হবেন? (Red Flags) |
| ০ – ৩ মাস | উচ্চ শব্দে চমকে ওঠা, মায়ের স্বরে শান্ত হওয়া। | তীব্র শব্দেও ঘুম না ভাঙা বা চমকে না ওঠা। |
| ৪ – ৬ মাস | শব্দের দিকে চোখ বা মাথা ঘোরানো, বাবলিং শুরু। | শব্দের উৎসের দিকে না তাকানো, বাবলিং না করা। |
| ৭ – ১২ মাস | নাম ধরে ডাকলে তাকানো, সাধারণ নির্দেশ বোঝা। | নাম ডাকলে সাড়া না দেওয়া, ১ বছরের মধ্যে একটি শব্দও না বলা। |
| ১ – ২ বছর | ছোট বাক্য বলা, শরীরের অঙ্গ চিনে দেখানো। | ইশারা নির্ভর যোগাযোগ, কথার উত্তর না দেওয়া, টিভি খুব জোরে শোনা। |
| স্কুল বয়স | কথোপকথন চালানো, গল্প বলা। | ক্লাসে অমনোযোগী, বারবার “কী?” জিজ্ঞেস করা, আচরণগত সমস্যা। |
কেন শিশুরা কানে কম শোনে? কারণ ও শ্রেণিবিভাগ
শিশু কি কানে কম শুনছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের এর পেছনের কারণগুলো জানতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে শ্রবণশক্তি হ্রাস বা Hearing Loss-কে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়: কন্ডাক্টিভ (Conductive), সেন্সরি-নিউরাল (Sensorineural) এবং মিশ্র (Mixed)। প্রতিটি ধরনের কারণ ও প্রতিকার ভিন্ন।
কন্ডাক্টিভ হিয়ারিং লস (Conductive Hearing Loss)
যখন শব্দ বাইরের কান থেকে অন্তঃকর্ণ পর্যন্ত পৌঁছাতে কোনো বাধার সম্মুখীন হয়, তখন তাকে কন্ডাক্টিভ হিয়ারিং লস বলে। এটি সাধারণত সাময়িক এবং চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য।
-
কানের খৈল (Impacted Wax): শিশুদের কানে অতিরিক্ত খৈল বা ওয়াক্স জমে শক্ত হয়ে গেলে শব্দ ঠিকমতো পর্দায় পৌঁছাতে পারে না। এটি শ্রবণশক্তি কমার অন্যতম সাধারণ কারণ ।
-
মধ্যকর্ণের সংক্রমণ (Otitis Media): শিশুদের ইউস্টেশিয়ান টিউব (Eustachian Tube) ছোট এবং সমান্তরাল হওয়ার কারণে সহজেই গলার ইনফেকশন কানে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে কানের পর্দার পেছনে তরল জমে যায়, যাকে ‘গ্লু ইয়ার’ (Glue Ear) বলা হয়। এটি কানের পর্দাকে কাঁপতে দেয় না, ফলে শিশু কম শোনে ।
-
কানের পর্দায় ফুটো: কানে আঘাত লাগলে বা দীর্ঘস্থায়ী ইনফেকশন থাকলে কানের পর্দা ফুটো হয়ে যেতে পারে।
-
জন্মগত গঠনগত ত্রুটি: কখনো কখনো শিশু কানের ছিদ্র বা ইয়ার ক্যানেল ছাড়া জন্মায় (Microtia/Atresia), যা শব্দ পরিবহনে বাধা দেয় ।
সেন্সরি-নিউরাল হিয়ারিং লস (Sensorineural Hearing Loss)
এটি অন্তঃকর্ণের ককলিয়া বা শ্রবণ স্নায়ুর সমস্যার কারণে হয়। এটি সাধারণত স্থায়ী প্রকৃতির এবং ওষুধের মাধ্যমে সারানো যায় না। এর কারণগুলো হলো:
-
বংশগত বা জেনেটিক: প্রায় ৫০% জন্মগত বধিরতার কারণ হলো জিনগত ত্রুটি। বাবা-মা উভয়েই যদি ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক হন, তবে শিশুর শ্রবণশক্তি না থাকার ঝুঁকি থাকে। Connexin 26 জিনের মিউটেশন এর একটি প্রধান উদাহরণ ।
-
গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ (TORCH): গর্ভাবস্থায় মা যদি রুবেলা (Rubella), সাইটোমেগালোভাইরাস (CMV), টক্সোপ্লাজমোসিস বা হারপিস ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তবে গর্ভস্থ শিশুর শ্রবণ অঙ্গের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় ।
-
জন্মকালীন জটিলতা: জন্মের সময় শিশুর ওজন ১৫০০ গ্রামের কম হলে, জন্মের পর তীব্র জন্ডিস (Hyperbilirubinemia) হলে যার জন্য রক্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, অথবা জন্মের সময় শিশু কাঁদেন না বা অক্সিজেনের অভাব (Birth Asphyxia) হলে শ্রবণ স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ।
-
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন Gentamicin, Amikacin) এবং ক্যানসার বা ম্যালেরিয়ার ওষুধ অন্তঃকর্ণের হেয়ার সেল ধ্বংস করতে পারে। একে অটোটক্সিসিটি (Ototoxicity) বলে ।
-
সংক্রামক রোগ: জন্মের পর ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস, মাম্পস বা হাম হলে ককলিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শিশু বধির হয়ে যেতে পারে। মেনিনজাইটিস থেকে সেরে ওঠার পর দ্রুত ককলিয়া শুকিয়ে হাড় হয়ে যেতে পারে (Ossification), তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ।
অডিটরি নিউরোপ্যাথি স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ANSD)
এটি একটি বিশেষ ধরনের সমস্যা যেখানে কানের গঠন এবং ককলিয়া ঠিক থাকলেও শ্রবণ স্নায়ু শব্দকে ঠিকমতো মস্তিষ্কে পৌঁছে দিতে পারে না। ফলে শিশু শব্দ শুনতে পেলেও তা বুঝতে পারে না। তীব্র জন্ডিস বা প্রি-ম্যাচিউর শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায় ।
শ্রবণশক্তি হ্রাসের ধরন ও ঝুঁকির কারণসমূহ
| ধরন | কারণসমূহ | নিরাময় সম্ভাবনা |
| কন্ডাক্টিভ | কানের খৈল, গ্লু ইয়ার, কানের পর্দায় ফুটো, অ্যালার্জি। | সাধারণত ওষুধ বা ছোট সার্জারিতে ভালো হয়। |
| সেন্সরি-নিউরাল | জেনেটিক, রুবেলা, মেনিনজাইটিস, জন্ডিস, শব্দদূষণ। | স্থায়ী ক্ষতি; হিয়ারিং এইড বা ইমপ্ল্যান্ট প্রয়োজন। |
| মিশ্র (Mixed) | একই সাথে ইনফেকশন এবং স্নায়ুর ক্ষতি। | আংশিক নিরাময়যোগ্য। |
| অডিটরি নিউরোপ্যাথি | তীব্র জন্ডিস, অপরিণত জন্ম, অক্সিজেনের অভাব। | জটিল; বিশেষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। |
রোগ নির্ণয়: কখন এবং কী পরীক্ষা করবেন?
অনেক অভিভাবক মনে করেন, “বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে”। কিন্তু শ্রবণশক্তির ক্ষেত্রে এই ধারণাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। শিশুর জন্মের প্রথম ৩ বছর হলো ভাষা শেখার ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’। এই সময়ে মস্তিষ্ক শব্দ গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে শেখে। তাই রোগ নির্ণয়ে দেরি হলে শিশুর স্বাভাবিক বাক-বিকাশ চিরতরে ব্যাহত হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত 1-3-6 নির্দেশিকা অনুযায়ী:
-
১ মাস বয়সের মধ্যে: সকল নবজাতকের স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা।
-
৩ মাস বয়সের মধ্যে: নিশ্চিত রোগ নির্ণয় (Diagnosis) করা।
-
৬ মাস বয়সের মধ্যে: চিকিৎসা ও পুনর্বাসন (Intervention) শুরু করা ।
নিউবর্ন হিয়ারিং স্ক্রিনিং (Newborn Hearing Screening – OAE)
এটি সদ্যোজাত শিশুর জন্য নিরাপদ, ব্যথামুক্ত এবং দ্রুততম পরীক্ষা। শিশু যখন ঘুমিয়ে থাকে বা শান্ত থাকে, তখন তার কানে একটি ছোট ইয়ারফোন বা প্রোব দেওয়া হয়। কানের ভেতরের ককলিয়া বাইরের শব্দে সাড়া দিয়ে প্রতিধ্বনি (Echo) তৈরি করছে কি না, তা এই যন্ত্র রেকর্ড করে। একে বলা হয় Otoacoustic Emissions (OAE)।
-
ফলাফল: যদি শিশু ‘Pass’ করে, তবে তার অন্তঃকর্ণের কাজ স্বাভাবিক। যদি ‘Refer’ আসে, তার মানে সমস্যা থাকতে পারে এবং পুনরায় পরীক্ষার প্রয়োজন। কানে পানি বা ভার্নিক্স (Vernix) থাকলেও প্রথমবার ফেল করতে পারে, তাই ঘাবড়ানোর কিছু নেই ।
বেরা বা এ বি আর টেস্ট (BERA / ABR Test)
যদি শিশু OAE স্ক্রিনিং-এ বারবার ব্যর্থ হয়, বা শিশুর যদি উচ্চ ঝুঁকির (High Risk) ইতিহাস থাকে (যেমন এনআইসিইউ-তে থাকা), তবে Auditory Brainstem Response (ABR) বা BERA টেস্ট করা হয়। এটি শ্রবণশক্তি পরিমাপের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড।
-
পদ্ধতি: শিশুকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। তার কপাল ও কানের পেছনে ছোট ইলেকট্রোড বা সেন্সর লাগানো হয়। কানে হেডফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন মাত্রার শব্দ পাঠানো হয় এবং কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখা হয় যে শ্রবণ স্নায়ু ও মস্তিষ্ক সেই শব্দে সাড়া দিচ্ছে কি না।
-
গুরুত্ব: এই পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিকভাবে বোঝা যায় শিশু কত ডেসিবল শব্দ শুনতে পায় এবং সমস্যাটি ককলিয়াতে নাকি স্নায়ুতে ।
টিম্পানমেট্রি (Tympanometry)
এটি শ্রবণশক্তির পরীক্ষা নয়, বরং মধ্যকর্ণের স্বাস্থ্যের পরীক্ষা। কানের পর্দার পেছনে কোনো তরল (Fluid) জমে আছে কি না বা পর্দা ঠিকমতো নড়াচড়া করছে কি না, তা দেখার জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। শিশুদের সর্দি-কাশিজনিত কানের সমস্যায় এটি খুবই জরুরি ।
পিওর টোন অডিওমেট্রি (Pure Tone Audiometry – PTA)
একটু বড় শিশু (সাধারণত ৪-৫ বছরের বেশি), যারা নির্দেশ বুঝতে পারে এবং হাত তুলে সাড়া দিতে পারে, তাদের জন্য এই পরীক্ষা করা হয়। সাউন্ড-প্রুফ রুমে বসিয়ে কানে হেডফোন দিয়ে বিভিন্ন কম্পাঙ্কের (Frequency) শব্দ শোনানো হয়। এটি শ্রবণশক্তির হ্রাসের মাত্রা (Mild, Moderate, Severe, Profound) নির্ধারণে সাহায্য করে ।
বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার তুলনা
| পরীক্ষার নাম | কাদের জন্য উপযুক্ত? | কী নির্ণয় করে? | বিশেষ সতর্কতা |
| OAE | নবজাতক (০-২৮ দিন) | অন্তঃকর্ণের (Hair Cell) কার্যকারিতা। | শিশু শান্ত বা ঘুমন্ত হতে হবে। |
| BERA / ABR | নবজাতক ও ছোট শিশু | শ্রবণ স্নায়ুর প্রতিক্রিয়া ও থ্রেশহোল্ড। | গভীর ঘুমের প্রয়োজন (সিডেশন লাগতে পারে)। |
| Tympanometry | সব বয়সের শিশু | মধ্যকর্ণে তরল বা ইনফেকশন। | কানে ব্যথা থাকলে সাবধানে করতে হয়। |
| Play Audiometry | ২.৫ – ৫ বছর | খেলার ছলে শ্রবণশক্তির মাত্রা নির্ণয়। | শিশুর সহযোগিতা প্রয়োজন। |
আধুনিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: নীরবতা ভাঙার উপায়
রোগ নির্ণয়ের পর বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে, “আমার শিশু কি আর স্বাভাবিকভাবে শুনতে বা কথা বলতে পারবে?” উত্তর হলো—হ্যাঁ, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এখন প্রায় সব ধরনের শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুকেই মূলধারার জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে সমস্যার তীব্রতা এবং কারণের ওপর।
ওষুধ ও সার্জারি (Medical & Surgical Management)
যদি সমস্যাটি কন্ডাক্টিভ হয়, যেমন কানের খৈল বা মধ্যকর্ণের ইনফেকশন, তবে ওষুধের মাধ্যমেই তা সারানো সম্ভব। অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টি-হিস্টামিন বা নাকের ড্রপ ব্যবহার করা হয়। যদি মধ্যকর্ণে দীর্ঘদিন তরল জমে থাকে (Glue Ear), তবে ছোট একটি অপারেশনের মাধ্যমে কানের পর্দায় একটি ছোট টিউব (Grommet) বসিয়ে দেওয়া হয়, যা তরল বের করে দেয় এবং বাতাস চলাচল স্বাভাবিক রাখে ।
হিয়ারিং এইড বা শ্রবণযন্ত্র (Hearing Aids)
সেন্সরি-নিউরাল হিয়ারিং লস বা স্থায়ী বধিরতার ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হলো হিয়ারিং এইড। এটি শব্দকে বিবর্ধিত (Amplify) করে কানে পৌঁছে দেয়। শিশুদের জন্য সাধারণত Behind-The-Ear (BTE) হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা হয়।
-
কেন BTE? শিশুদের কানের ছিদ্র বা ক্যানেল বয়সের সাথে সাথে দ্রুত বড় হয়। BTE মেশিনে কানের পেছনের অংশটি স্থায়ী থাকে, শুধু ইয়ার মোল্ডটি (Ear Mold) পরিবর্তন করলেই চলে, যা সাশ্রয়ী। এছাড়া BTE মেশিনগুলো টেকসই এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ।
-
ডিজিটাল প্রযুক্তি: আধুনিক ডিজিটাল হিয়ারিং এইডগুলো অনেক বুদ্ধিমান। এগুলো মানুষের গলার স্বর এবং ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, ফলে কোলাহলপূর্ণ জায়গাতেও শিশু কথা বুঝতে পারে ।
কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট (Cochlear Implant)
যখন শিশুর শ্রবণশক্তি হ্রাসের মাত্রা ‘তীব্র’ থেকে ‘গভীর’ (Severe to Profound) পর্যায়ে থাকে এবং শক্তিশালী হিয়ারিং এইড ব্যবহার করেও সে কথা বুঝতে পারে না, তখন কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট হলো একমাত্র ও সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
-
কীভাবে কাজ করে? এটি সাধারণ হিয়ারিং এইড নয়। এটি একটি বায়োনিক ডিভাইস যা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কানের ভেতরে বসানো হয়। এটি ক্ষতিগ্রস্ত ককলিয়াকে বাইপাস করে সরাসরি বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে শ্রবণ স্নায়ুকে (Auditory Nerve) উদ্দীপ্ত করে। মস্তিষ্কে এই সংকেত পৌঁছালে শিশু শব্দ শুনতে পায় ।
-
অপারেশন ও খরচ: এটি একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ ও ভারতে সরকারি সহায়তায় এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই অপারেশন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) এবং ভারতের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ‘ADIP’ স্কিমের আওতায় বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট দেওয়া হয় ।
-
সফলতার শর্ত: কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্টের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো ‘যত দ্রুত সম্ভব’ অপারেশন করা। ১ থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে ইমপ্ল্যান্ট করলে শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে ও শুনতে শেখে। ৫ বছরের পর মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity) কমে যায়, ফলে ফলাফল ততটা ভালো হয় না ।
বোন অ্যাঙ্কর্ড হিয়ারিং সিস্টেম (BAHA)
যাদের বহিঃকর্ণ বা ইয়ার ক্যানেল গঠিত হয়নি (Microtia/Atresia), তাদের জন্য সাধারণ হিয়ারিং এইড কাজ করে না। তাদের ক্ষেত্রে মাথার খুলির হাড়ের মাধ্যমে শব্দ সরাসরি অন্তঃকর্ণে পাঠানোর জন্য BAHA ডিভাইস ব্যবহার করা হয়।
হিয়ারিং এইড বনাম কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট – কোনটা কখন?
| মাপকাঠি | হিয়ারিং এইড (Hearing Aid) | কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট (Cochlear Implant) |
| সমস্যার ধরন | মৃদু থেকে তীব্র (Mild to Severe) শ্রবণ সমস্যা। | তীব্র থেকে গভীর (Severe to Profound) বধিরতা। |
| কার্যপদ্ধতি | শব্দকে জোরে বা বিবর্ধিত করে শোনায় (এম্পলিফায়ার)। | শব্দকে বৈদ্যুতিক সিগন্যালে রূপান্তর করে স্নায়ুতে পাঠায়। |
| শারীরিক প্রক্রিয়া | নন-ইনভেসিভ, কানের বাইরে পরা হয়। | ইনভেসিভ, সার্জারির মাধ্যমে ভেতরে বসাতে হয়। |
| উপযোগিতা | ককলিয়ার হেয়ার সেল কিছুটা ভালো থাকলে কাজ করে। | হেয়ার সেল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলেও কাজ করে। |
| রক্ষণাবেক্ষণ | ব্যাটারি বদলানো, মোল্ড পরিষ্কার রাখা। | ব্যাটারি চার্জ দেওয়া, বাহ্যিক প্রসেসর যত্ন নেওয়া, ম্যাপিং করা। |
অডিটরি ভারবাল থেরাপি (AVT): কথা বলার প্রশিক্ষণ
শুধুমাত্র মেশিন বা ইমপ্ল্যান্ট লাগিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। একটি শিশু যে জন্ম থেকে বধির, তার মস্তিষ্ক জানে না ‘শব্দ’ কী বা এর অর্থ কী। হিয়ারিং এইড বা ইমপ্ল্যান্টের মাধ্যমে সে শব্দ শুনতে পায় ঠিকই, কিন্তু সেটা তার কাছে অর্থহীন কোলাহল মনে হতে পারে। এই শব্দকে ভাষায় রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ, যার নাম অডিটরি ভারবাল থেরাপি (Auditory Verbal Therapy – AVT)।
AVT-এর মূলনীতি
AVT কোনো সাধারণ স্পিচ থেরাপি নয়। এখানে শিশুকে ইশারা বা ঠোঁট নাড়া (Lip Reading) দেখতে নিরুৎসাহিত করা হয় এবং শুধুমাত্র ‘কানে শুনে’ কথা বুঝতে শেখানো হয়। এর লক্ষ্য হলো, শিশু যেন স্বাভাবিক শিশুদের মতোই শ্রবণশক্তির ওপর নির্ভর করে বড় হয় এবং মূলধারার স্কুলে পড়াশোনা করতে পারে ।
বাবা-মায়ের ভূমিকা ও ‘অডিটরি স্যান্ডউইচ’
AVT-তে থেরাপিস্টের চেয়ে বাবা-মায়ের ভূমিকা বেশি। থেরাপিস্ট বাবা-মাকে শিখিয়ে দেন কীভাবে দৈনন্দিন কাজের মাধ্যমে (যেমন গোসল করানো, খাওয়ানো, খেলাধুলা) শিশুকে ভাষা শেখাতে হয়। একটি জনপ্রিয় কৌশল হলো ‘অডিটরি স্যান্ডউইচ’ (Auditory Sandwich):
-
প্রথম ধাপ (শোনা): প্রথমে বস্তুটি না দেখিয়ে শুধু নাম বলুন (যেমন, “বলটি দাও”)।
-
দ্বিতীয় ধাপ (দেখানো): যদি শিশু না বোঝে, তবে বস্তুটি দেখান বা ইশারা করুন।
-
তৃতীয় ধাপ (আবার শোনা): বস্তুটি সরিয়ে নিয়ে আবার শুধু নাম বলুন। এভাবে শিশুর মস্তিষ্ক শব্দের সাথে বস্তুর সংযোগ ঘটাতে শেখে ।
লিং সিক্স সাউন্ড চেক (Ling 6 Sound Check)
প্রতিদিন সকালে হিয়ারিং এইড বা ইমপ্ল্যান্ট পরানোর পর শিশু সব ধরনের ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য ‘লিং সিক্স সাউন্ড’ চেক করা হয়। এই ছয়টি শব্দ হলো: /a/ (আ), /u/ (উ), /i/ (ই), /m/ (ম), /s/ (স), এবং /sh/ (শ)। এই শব্দগুলো মানুষের কথার সব ধরনের কম্পাঙ্ককে কভার করে। যদি শিশু এই ছয়টি শব্দ শুনে পুনরাবৃত্তি করতে পারে, তবে বোঝা যায় তার যন্ত্র ঠিকমতো কাজ করছে ।
শিক্ষাজীবন ও মানসিক বিকাশ: অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা জয়
শিশু কি কানে কম শুনছে—এই সমস্যাটি অনেক সময় স্কুলে গিয়ে প্রকট হয়। একে বলা হয় “অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা” (Invisible Disability)। কারণ, বাইরে থেকে শিশুটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ দেখায়, কিন্তু সে ক্লাসের পড়া কিছুই শুনতে পায় না।
স্কুলে প্রভাব ও একাডেমিক চ্যালেঞ্জ
গবেষণায় দেখা গেছে, সামান্য শ্রবণ সমস্যা থাকলেও (Unilateral or Mild Hearing Loss) শিশুরা শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ এবং সাধারণ জ্ঞানে পিছিয়ে পড়ে। ক্লাসরুমের কোলাহল (Background Noise) তাদের জন্য শোনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা শিক্ষকের কথা শোনার জন্য অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়, ফলে দিনের শেষে তারা প্রচণ্ড মানসিক ক্লান্তিতে (Listening Fatigue) ভোগে। অনেক সময় তারা ভুল উত্তর দেয় বা নির্দেশ বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে, যা শিক্ষকদের কাছে অমনোযোগিতা বা বুদ্ধিমত্তার অভাব বলে মনে হতে পারে ।
আচরণগত পরিবর্তন ও সামাজিকীকরণ
বন্ধু বা সহপাঠীদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারার কারণে এই শিশুরা নিজেকে গুটিয়ে নেয় (Social Isolation)। তারা খেলতে চায় না, কারণ খেলার নিয়ম বা বন্ধুদের ডাক তারা শুনতে পায় না। এই হতাশা থেকে তাদের মধ্যে রাগ, জেদ বা আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় তারা বুলিং-এর শিকার হয়, যা তাদের আত্মবিশ্বাস চূর্ণ করে দেয়। তাই স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীদের সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি ।
ইনক্লুসিভ এডুকেশন বা একীভূত শিক্ষা
আধুনিক ধারণায় বধির শিশুদের জন্য আলাদা ‘স্পেশাল স্কুল’-এর চেয়ে ‘মেইনস্ট্রিম’ বা সাধারণ স্কুলে পড়াশোনাকে উৎসাহিত করা হয়। তবে এর জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা (Accommodations) প্রয়োজন:
-
শিশুকে ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসানো।
-
শিক্ষক কথা বলার সময় যেন শিশুর দিকে তাকিয়ে কথা বলেন।
-
ক্লাসরুমে এফএম সিস্টেম (FM System) ব্যবহার করা, যেখানে শিক্ষকের গলায় মাইক্রোফোন থাকে এবং শব্দ সরাসরি শিশুর কানে পৌঁছায়।
-
পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময় দেওয়া।
স্কুলে শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য সহায়ক কৌশল
| সমস্যা | সমাধান বা কৌশল |
| দূরত্ব | শিশুকে শিক্ষকের কাছাকাছি (প্রথম বা দ্বিতীয় সারিতে) বসাতে হবে। |
| কোলাহল | ফ্যান বা জানালার পাশ থেকে দূরে বসানো; ক্লাসে শব্দ কমানো। |
| নির্দেশনা বোঝা | মৌখিক নির্দেশের পাশাপাশি বোর্ডে লিখে দেওয়া বা ছবি দেখানো। |
| ক্লান্তি (Fatigue) | মাঝে মাঝে শিশুকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া (Listening Break)। |
| বন্ধুত্ব | ‘বাডি সিস্টেম’ চালু করা, যেখানে একজন সহপাঠী তাকে নোট নিতে সাহায্য করবে। |
প্রতিরোধ ও সচেতনতা: প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়
যদিও সব ধরনের শ্রবণ সমস্যা প্রতিরোধযোগ্য নয় (যেমন জেনেটিক কারণ), তবুও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের শ্রবণশক্তি হ্রাসের প্রায় ৬০ শতাংশ কারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। গর্ভাবস্থা থেকে শৈশব পর্যন্ত কিছু নিয়ম মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেক কমানো যায়।
-
গর্ভাবস্থায় সতর্কতা ও রুবেলা স্ক্রিনিং: গর্ভবতী মায়েদের গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া শিশুর শ্রবণশক্তির জন্য মারাত্মক। তাই বিয়ের আগে বা গর্ভাবস্থার পরিকল্পনার সময় মায়ের রুবেলা প্রতিরোধ ক্ষমতা (IgG test) পরীক্ষা করা উচিত এবং প্রয়োজনে টিকা নেওয়া উচিত। গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধ খাওয়া যাবে না ।
-
সময়মতো টিকাদান (Vaccination): শিশুকে ইপিআই (EPI) শিডিউল অনুযায়ী সব টিকা দিতে হবে। বিশেষ করে হাম (Measles), মাম্পস ও রুবেলার টিকা (MMR Vaccine) শ্রবণশক্তি রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া মেনিনজাইটিস ও নিউমোনিয়ার টিকা (Pneumococcal, Hib) মস্তিষ্কের সংক্রমণ রোধ করে বধিরতা ঠেকায় ।
-
কানের যত্ন ও ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণ: শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মাথা একটু উঁচিয়ে রাখতে হবে, যাতে দুধ গড়িয়ে কানে না যায় (যা ইনফেকশনের কারণ)। কানে ব্যথা হলে বা কান দিয়ে পানি পড়লে অবহেলা না করে দ্রুত ইএনটি বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে। কখনোই কানে কটন বাড, কাঠি বা তেল দেওয়া উচিত নয়, এতে কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে ।
-
শব্দদূষণ থেকে সুরক্ষা: শিশুদের কান বড়দের চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। উচ্চ শব্দের খেলনা, লাউডস্পিকার, বা হেডফোনের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার শ্রবণ স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতি (Noise-Induced Hearing Loss) করতে পারে। শিশুদের কোলাহলপূর্ণ উৎসবে বা কনসার্টে নেওয়া থেকে বিরত থাকুন বা প্রয়োজনে ইয়ার মাফ (Ear Muff) ব্যবহার করুন ।
-
নবজাতকের জন্ডিস ব্যবস্থাপনা: জন্মের পর শিশুর জন্ডিস হলে তা যেন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। তীব্র জন্ডিস বা কার্নিকটেরাস (Kernicterus) শ্রবণ কেন্দ্র ও স্নায়ু ধ্বংস করে দেয়। তাই জন্ডিস হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে ফটোথেরাপি বা প্রয়োজনে রক্ত পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে ।
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপট: পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে, শিশুদের শ্রবণশক্তির সমস্যা একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই অঞ্চলে বধিরতার হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি।
-
পরিসংখ্যান: বাংলাদেশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯.৬% মানুষের কোনো না কোনো মাত্রার শ্রবণ সমস্যা রয়েছে, এবং শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মধ্যকর্ণের প্রদাহ (CSOM) একটি প্রধান কারণ । ভারতে প্রতি ১০০০ নবজাতকের মধ্যে প্রায় ৫-৬ জন শ্রবণ সমস্যা নিয়ে জন্মায়, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি ।
-
চিকিৎসা সুবিধা ও খরচ: হিয়ারিং এইড এবং কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্টের উচ্চ মূল্য এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় বাধা। একটি ভালো মানের ডিজিটাল হিয়ারিং এইডের দাম ১৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট সার্জারির খরচ ৫ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ সরকার (সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও BSMMU-এর মাধ্যমে) এবং ভারত সরকার (ADIP স্কিম) শিশুদের বিনামূল্যে ইমপ্ল্যান্ট দেওয়ার কর্মসূচি চালু করেছে। অনেক এনজিও এবং দাতা সংস্থাও এতে সহায়তা করছে ।
-
চ্যালেঞ্জ: গ্রাম পর্যায়ে দক্ষ অডিওলজিস্ট ও স্পিচ থেরাপিস্টের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক সময় জেলা শহরেও স্ক্রিনিং মেশিন (OAE) পাওয়া যায় না। এছাড়া সামাজিক কুসংস্কারের কারণে বাবা-মায়েরা হিয়ারিং এইড পরাতে চান না, পাছে লোকে কিছু বলে। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি ।
বাংলাদেশ ও ভারতে শ্রবণ সেবার চিত্র
| বিষয় | বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান অবস্থা |
| প্রাদুর্ভাব | প্রতি হাজারে ১-৩ জন শিশু জন্মগত বধির; ইনফেকশনজনিত বধিরতা আরও বেশি। |
| প্রধান কারণ | গর্ভাবস্থায় অসচেতনতা, বাড়িতে প্রসব, অপুষ্টি, কানের ইনফেকশন (CSOM)। |
| সরকারি উদ্যোগ | বাংলাদেশে কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট কর্মসূচি; ভারতে ADIP স্কিম ও RBSK প্রোগ্রাম। |
| বাধা | সচেতনতার অভাব, উচ্চ খরচ, গ্রামে বিশেষজ্ঞের অভাব, কুসংস্কার। |
শেষ কথা
শিশু কি কানে কম শুনছে?—এই প্রশ্নটি কেবল একটি ডাক্তারি প্রশ্ন নয়, এটি একটি শিশুর ভবিষ্যতের প্রশ্ন। শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া মানে মেধা বা বুদ্ধিমত্তার কমতি নয়। হেলেন কেলার থেকে শুরু করে টমাস আলভা এডিসন—ইতিহাস প্রমাণ করে যে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধকতা জয় করে মানুষ বিশ্ব জয় করতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ।
বাবা-মা হিসেবে আপনার সচেতনতাই আপনার সন্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি। জন্মের পর স্ক্রিনিং করান, টিকার শিডিউল মেনে চলুন এবং শিশুর আচরণের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখুন। যদি কোনো সন্দেহ হয়, তবে “দেরিতে কথা বলা বংশগত” বা “বড় হলে ঠিক হবে”—এমন সান্ত্বনায় না ভুলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, আধুনিক বিজ্ঞান আপনার পাশে আছে। হিয়ারিং এইড বা কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি শিশুর অধিকার। শব্দহীন পৃথিবীতে আপনার সন্তানকে একা থাকতে দেবেন না; তাকে শব্দের জাদুকরী ভুবনে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের সবার।

