ব্যবসা করার পুরোনো একটা নিয়ম আমরা সবাই জানি—কাঁচামাল কেনা, পণ্য বানানো, বিক্রি করা এবং ব্যবহার শেষে সেটা ফেলে দেওয়া। বছরের পর বছর এই পদ্ধতি বেশ ভালোভাবেই চলেছে। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। সম্পদের দাম বাড়ছে, পরিবেশের ওপর চাপ পড়ছে এবং ক্রেতারাও আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। ঠিক এখানেই পুরো খেলার নিয়ম বদলে দিচ্ছে নতুন একটি ধারণা।
আজকের দিনে একটি সফল ব্যবসা দাঁড় করাতে হলে শুধু বেশি বিক্রির কথা ভাবলে চলে না, ভাবতে হয় কীভাবে কম খরচে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। একটি সঠিক সার্কুলার ইকোনমি মডেল ঠিক এই কাজটিই করে। এটি শুধু পরিবেশ বাঁচানোর কোনো গালভরা বুলি নয়, বরং এটি একটি প্রুভেন বিজনেস স্ট্র্যাটেজি যা খরচ কমায় এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভের মুখ দেখায়। দেশীয় স্টার্টআপগুলো যারা সীমিত বাজেটে কাজ করে, তাদের জন্য এই ধারণাটি কেন এতটা জরুরি এবং কীভাবে এটি প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়েই আজ আমরা বিস্তারিত জানব।
সার্কুলার ইকোনমি মূলত কী?
সহজ কথায় বললে, এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে কোনো কিছুই আসলে “বর্জ্য” বা “অপ্রয়োজনীয়” হিসেবে ফেলে দেওয়া হয় না। পণ্য এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যেন তা বারবার ব্যবহার করা যায়, মেরামত করা যায় এবং মেয়াদ শেষে পুনরায় নতুন কোনো পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগানো যায়। লিনিয়ার ইকোনমিতে যেমন “টেক-মেক-ডিসপোজ” (নাও, বানাও, ফেলে দাও) নীতি চলে, এখানে চলে “রিডিউস-রিইউজ-রিসাইকেল” (কমাও, পুনরায় ব্যবহার করো, রিসাইকেল করো)। এটি মূলত সম্পদের অপচয় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার একটি কৌশল।

মূল ভিত্তি ও কাজ করার ধরন
এই ধারণার পেছনে তিনটি মূল কাজ করে। প্রথমত, বর্জ্য ও দূষণ একদম গোড়া থেকেই দূর করার পরিকল্পনা করা। দ্বিতীয়ত, পণ্য ও কাঁচামালকে তাদের সর্বোচ্চ ভ্যালুতে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার উপযোগী রাখা। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক সিস্টেমগুলোকে নতুন করে গড়ে উঠতে সাহায্য করা। ধরুন, আপনি এমন একটি প্যাকেজিং নিয়ে কাজ করছেন যা ব্যবহারের পর মাটিতে মিশে সার হয়ে যায়। এখানে আপনি শুধু প্লাস্টিক বর্জ্যই কমাচ্ছেন না, মাটির উর্বরতাও বাড়াচ্ছেন। শূন্য-বর্জ্য প্যাকেজিং বা জিরো-ওয়েস্ট ধারণার মূল কথাই হলো এটি।
পুরোনো লিনিয়ার পদ্ধতির সাথে এই নতুন ব্যবস্থার তফাৎগুলো একবার দেখে নেওয়া যাক।
| বিষয়ের নাম | লিনিয়ার ইকোনমি | সার্কুলার ইকোনমি |
| কাজের ধরন | তৈরি করা এবং ফেলে দেওয়া | পুনরায় ব্যবহার ও রিসাইকেল করা |
| বর্জ্য ব্যবস্থাপনা | বর্জ্য তৈরি হয় এবং জমে থাকে | বর্জ্যকে কাঁচামালে রূপান্তর করা হয় |
| পণ্যের লাইফসাইকেল | খুবই সংক্ষিপ্ত | দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই |
| লাভের উৎস | বেশি পরিমাণ পণ্য বিক্রির ওপর | সেবার মান ও সম্পদের পুনর্ব্যবহারের ওপর |
কীভাবে একটি সার্কুলার ইকোনমি মডেল কাজ করে?
যেকোনো ব্যবসাকে এই মডেলে রূপান্তর করতে হলে শুধু রিসাইক্লিংয়ের ওপর নির্ভর করলে চলে না। এটি শুরু হয় একদম ডিজাইনিংয়ের টেবিল থেকে। একটি আদর্শ সার্কুলার ইকোনমি মডেল পণ্যের পুরো জীবনচক্র নিয়ে কাজ করে। অর্থাৎ, পণ্যটি কীভাবে তৈরি হবে, কার কাছে যাবে, নষ্ট হলে কীভাবে মেরামত হবে এবং একদম শেষে কীভাবে এটি আবার সিস্টেমে ফিরে আসবে, তার পুরো নকশা আগে থেকেই করা থাকে। এখানে প্রোডাক্ট-অ্যাজ-এ-সার্ভিস (PaaS) বা পণ্যের মালিকানার চেয়ে সেবা নেওয়ার দিকে বেশি জোর দেওয়া হয়।
ভ্যালু চেইন অপ্টিমাইজেশন
এই মডেলের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক হলো ভ্যালু চেইন। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে ডেলিভারি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজর রাখা হয় যেন কোনো অপচয় না হয়। ধরুন, একটি ফার্নিচার স্টার্টআপ কাঠ দিয়ে টেবিল বানায়। কাটার পর যে কাঠের গুঁড়ো বা টুকরো বেঁচে যায়, তা ফেলে না দিয়ে কমপ্রেসড বোর্ড বা জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া যায়। এতে মূল পণ্যের পাশাপাশি একটি সাইড ইনকামও জেনারেট হয়।
রিভার্স লজিস্টিকসের ব্যবহার
রিভার্স লজিস্টিকস হলো ক্রেতার কাছ থেকে পুরোনো বা ব্যবহৃত পণ্য আবার কোম্পানির কাছে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া। অনেক স্মার্টফোন কোম্পানি এখন পুরোনো ফোন ফেরত দিলে নতুন ফোনে ছাড় দেয়। তারা পুরোনো ফোনগুলো খুলে দামি পার্টসগুলো আবার ব্যবহার করে। এটি স্টার্টআপগুলোর জন্য দারুণ একটি কৌশল হতে পারে।
মডেলটি সঠিকভাবে কাজ করার জন্য যে ধাপগুলো মানা হয়, তা নিচে দেওয়া হলো।
| ধাপের নাম | মূল কাজ | স্টার্টআপের জন্য সুবিধা |
| ইকো-ডিজাইন | টেকসই ম্যাটেরিয়াল দিয়ে ডিজাইন করা | পণ্যের কোয়ালিটি ও স্থায়িত্ব বাড়ে |
| মেইনটেন্যান্স | পণ্য সহজে মেরামতের সুযোগ রাখা | ক্রেতার লয়্যালটি বৃদ্ধি পায় |
| কালেকশন | পুরোনো পণ্য ফেরত নেওয়ার সিস্টেম | নতুন কাঁচামাল কেনার খরচ বাঁচে |
| রিসাইক্লিং | অব্যবহৃত অংশ গলিয়ে বা ভেঙে নতুন রূপ দেওয়া | কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও বর্জ্য কমে |
দেশীয় স্টার্টআপদের জন্য এটি জানা কেন এতটা জরুরি?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে দেখা যায়, এখানে স্টার্টআপগুলোকে প্রতিনিয়ত কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইনের নানা সমস্যার সাথে লড়তে হয়। ফান্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতা তো আছেই। এই অবস্থায় একটি ব্যবসাকে টেকসই করতে হলে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। গ্লোবাল ইনভেস্টররাও এখন ইএসজি (এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল, এবং গভর্ন্যান্স) রেটিং ছাড়া সহজে ফান্ড দিতে চান না। তাই গ্লোবাল ট্রেন্ডের সাথে তাল মেলাতে এবং নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সার্কুলার ইকোনমি মডেল বোঝা এবং তা প্রয়োগ করা দেশীয় ফাউন্ডারদের জন্য একদম বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।
কাঁচামালের খরচ কমানোর সুযোগ
স্টার্টআপগুলোর সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা থাকে ইনিশিয়াল কস্ট বা প্রাথমিক খরচ। আপনি যদি এমন কোনো ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করেন যা বারবার কাজে লাগানো যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে আপনার প্রডাকশন কস্ট জ্যামিতিক হারে কমে আসবে। বিশেষ করে আমাদের দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বা আরএমজি সেক্টরে প্রচুর ঝুট কাপড় তৈরি হয়। এগুলো ফেলে না দিয়ে নতুন সুতা বা অন্য কোনো পণ্য তৈরি করলে একদিকে যেমন খরচ বাঁচে, অন্যদিকে নতুন একটি মার্কেট তৈরি হয়।
গ্লোবাল ফান্ডিং ও বিনিয়োগ আকর্ষণ
আজকাল সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে ইউরোপের বড় বড় ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা সেসব প্রতিষ্ঠানেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী, যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করে। ক্লাইমেট টেক বা গ্রিন বিজনেসের দিকে ফোকাস করলে গ্লোবাল ফান্ডিং পাওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। আপনার স্টার্টআপ যদি দেখাতে পারে যে তারা কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছে এবং সম্পদের পুনর্ব্যবহার করছে, তবে পিচ ডেক এমনিতেই অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
লোকাল স্টার্টআপগুলো যে বিষয়গুলোতে সরাসরি লাভবান হতে পারে, তা এখানে তুলে ধরা হলো।
| লাভের ক্ষেত্র | সরাসরি প্রভাব | ব্যবসায়িক ফলাফল |
| ব্র্যান্ড ইমেজ | পরিবেশবান্ধব কোম্পানি হিসেবে পরিচিতি | নতুন প্রজন্মের ক্রেতা আকর্ষণ |
| খরচ নিয়ন্ত্রণ | ম্যাটেরিয়াল কস্ট কমে যাওয়া | প্রফিট মার্জিন বৃদ্ধি |
| পলিসি সাপোর্ট | সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া | ট্যাক্স বেনিফিট বা গ্রান্ট লাভ |
| কাস্টমার রিটেনশন | ক্রেতারা দীর্ঘসময় ব্র্যান্ডের সাথে যুক্ত থাকে | কাস্টমার অ্যাকুইজিশন কস্ট (CAC) হ্রাস |
স্টার্টআপরা কীভাবে নিজেদের ব্যবসায় এটি যুক্ত করবে?
বড় কর্পোরেটগুলোর তুলনায় স্টার্টআপদের একটা বড় সুবিধা হলো তারা খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তাদের লিগ্যাসি সিস্টেমের কোনো বাধা থাকে না। তাই একেবারে শূন্য থেকে একটি টেকসই মডেল দাঁড় করানো তাদের জন্য সহজ। তবে রাতারাতি পুরো মডেল পরিবর্তন করার দরকার নেই। ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি শুরু করা যেতে পারে।
প্রোডাক্ট-অ্যাজ-এ-সার্ভিস (PaaS) চালু করা
সবকিছু বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যেমন, আপনি যদি পানি পরিশোধনের ফিল্টার বানান, তবে ফিল্টার বিক্রি না করে মানুষকে সাবস্ক্রিপশন মডেলে বিশুদ্ধ পানি দিন। মেশিন আপনারই থাকবে, আপনি শুধু নির্দিষ্ট সময় পরপর গিয়ে সার্ভিসিং করে আসবেন। এতে কাস্টমার সারাজীবন আপনার সাথে থাকবে এবং মেশিনের পার্টসগুলোও নষ্ট হলে আপনি নিজেই রিসাইকেল করতে পারবেন।
জিরো-ওয়েস্ট এবং ইকো-প্যাকেজিং
ই-কমার্স স্টার্টআপগুলোর জন্য এটি দারুণ একটি পয়েন্ট। ডেলিভারির সময় প্লাস্টিক পলিথিনের বদলে বায়োডিগ্রেডেবল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং ব্যবহার শুরু করুন। ক্রেতাকে বলুন, তিনি যদি পরবর্তী ডেলিভারির সময় পুরোনো বক্সটি ফেরত দেন, তবে তাকে কিছুটা ডিসকাউন্ট দেওয়া হবে। এটি খুব চমৎকার একটি রিটেনশন স্ট্র্যাটেজি।
স্টার্টআপগুলো যে ধাপগুলো অনুসরণ করে যাত্রা শুরু করতে পারে:
| ধাপ | করণীয় কাজ | সম্ভাব্য ফলাফল |
| অডিট করা | সাপ্লাই চেইনে কোথায় অপচয় হচ্ছে তা বের করা | লিকেজ বন্ধ হওয়া |
| পার্টনারশিপ | লোকাল রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চুক্তি | বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমাধান |
| ডিজাইন পরিবর্তন | সহজে খোলা বা মেরামত করা যায় এমন নকশা | লাইফসাইকেল বৃদ্ধি |
| ক্রেতা সচেতনতা | মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ক্রেতাদের শিক্ষিত করা | ব্র্যান্ড ভ্যালু ও বিশ্বাস অর্জন |
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সার্কুলার মডেলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আমাদের দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর এবং তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই দুটি খাতেই প্রচুর পরিমাণে বর্জ্য তৈরি হয়, যা আসলে বিপুল সম্ভাবনাময় সম্পদ। যদি সঠিক প্রযুক্তি এবং এআই ব্যবহার করে এই খাতগুলোর সাপ্লাই চেইন ট্র্যাক করা যায়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এখানে নতুন এক বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হওয়া সম্ভব। বিশেষ করে টেকসই রিয়েল এস্টেট এবং আর্বান ভার্টিকাল গার্ডেনিংয়ের মতো বিষয়গুলো এখন বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে।
আরএমজি ও ই-ওয়েস্ট সেক্টরের বিপ্লব
বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ঝুট কাপড় দিয়ে অনেক স্টার্টআপ এখন দারুণ সব পণ্য বানাচ্ছে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে। পুরোনো ল্যাপটপ বা মোবাইলের ব্যাটারি থেকে লিথিয়াম এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতু আলাদা করার প্রযুক্তি নিয়ে যদি দেশীয় স্টার্টআপগুলো কাজ শুরু করে, তবে তা দেশের প্রযুক্তি খাতের জন্য যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ হবে।
বাংলাদেশের কোন খাতগুলোতে এই মডেলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তা নিচে দেওয়া হলো।
| খাতের নাম | বর্তমান সমস্যা | সার্কুলার সমাধান |
| ফ্যাশন ও টেক্সটাইল | কাপড়ের প্রচুর অপচয় ও বর্জ্য | ঝুট থেকে নতুন সুতা বা ফেব্রিক তৈরি |
| ইলেকট্রনিক্স | ই-ওয়েস্টের অব্যবস্থাপনা | পুরোনো পার্টস থেকে নতুন ডিভাইস অ্যাসেম্বল |
| কৃষি ও খাদ্য | ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলা | বায়ো-গ্যাস বা জৈব সার উৎপাদন |
| নির্মাণ শিল্প | পুরোনো ইটের বা কংক্রিটের বর্জ্য | ইকো-ব্রিকস বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য নির্মাণ সামগ্রী |
পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির এই সময়ে আমার একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
গত কয়েক বছর ধরে গ্লোবাল এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার, রিনিউয়েবল এনার্জি শিফট এবং টেকসই সাপ্লাই চেইন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি একটি স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। ২০২৩ বা ২০২৪ সালের দিকেও স্টার্টআপগুলোর মূল ফোকাস ছিল শুধু ইউজার অ্যাকুইজিশন এবং গ্রোথ। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখছি, ইনভেস্টররা প্রশ্ন করছেন—”আপনার সার্ভারগুলো কি গ্রিন এনার্জিতে চলছে? আপনার প্রোডাক্টের এন্ড-অফ-লাইফ প্ল্যান কী?” এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যাদের কাছে নেই, তারা মার্কেট থেকে ছিটকে পড়ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের দেশীয় স্টার্টআপগুলো অনেক বেশি রেজিলিয়েন্ট। তারা অল্প রিসোর্সে কাজ করতে অভ্যস্ত। এই “অল্প রিসোর্সে বেশি আউটপুট” বের করার স্বভাবটিই মূলত সার্কুলার ইকোনমির মূল কথা। তাই গ্লোবাল বেঞ্চমার্ক মাথায় রেখে, নিজেদের ডেটা ম্যানেজমেন্ট ও সাপ্লাই চেইনকে যদি একটু স্মার্টলি সাজানো যায়, তবে বাংলাদেশ থেকেই দারুণ কিছু ক্লাইমেট টেক বা সার্কুলার বিজনেস গ্লোবাল মার্কেটে লিড দিতে পারবে।
ভবিষ্যতের জন্য কিছু চিন্তার খোরাক
দিন শেষে ব্যবসা মানে শুধু লাভ-ক্ষতির খাতা মেলানো নয়, এটি হলো সমাজ ও সময়ের প্রয়োজন মেটানো। পৃথিবী এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে আমরা আর যথেচ্ছভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারি না। তাই একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সার্কুলার ইকোনমি মডেল গ্রহণ করা এখন আর কোনো অপশন নয়, বরং এটি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে স্মার্ট উপায়। দেশীয় স্টার্টআপগুলোর সামনে এখন বিশাল একটি ক্যানভাস পড়ে আছে। যারা সবার আগে এই পরিবর্তনটি নিজেদের সিস্টেমে ইন্টিগ্রেট করতে পারবে, আগামী দশকের মার্কেট লিডার তারাই হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. ছোট স্টার্টআপগুলোর তো বাজেট কম থাকে, তারা কীভাবে সার্কুলার মডেলে যাবে?
পুরো মডেল একসাথে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট ধাপ দিয়ে শুরু করতে পারেন। যেমন—অফিসের কাগজপত্রের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনা, প্যাকেজিংয়ে পলিথিন বাদ দেওয়া বা রিফার্বিশড ল্যাপটপ ব্যবহার করা। এটি উল্টো আপনার বাজেট বাঁচাবে।
২. সার্কুলার ইকোনমি আর রিসাইক্লিংয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
রিসাইক্লিং হলো পণ্যটি বর্জ্য হয়ে যাওয়ার পর সেটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা। আর সার্কুলার ইকোনমি হলো পণ্যটি বানানোর সময়ই এমনভাবে ডিজাইন করা যেন এটি কখনো বর্জ্য হিসেবে ফেলেই দিতে না হয়। রিসাইক্লিং হলো শেষ ধাপের কাজ, আর সার্কুলার অর্থনীতি হলো একদম শুরুর ধাপের নকশা।
৩. বাংলাদেশে ই-ওয়েস্ট বা প্লাস্টিক রিসাইকেল করার জন্য স্টার্টআপরা কোথা থেকে সাপোর্ট পেতে পারে?
বর্তমানে সরকারিভাবে পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) এবং বেশ কিছু গ্লোবাল এনজিও গ্রিন প্রোজেক্টের জন্য ইনকিউবেশন ও ফান্ডিং সাপোর্ট দিচ্ছে। এছাড়া এস্ক্যাপ (ESCAP) এবং লোকাল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মগুলোও ক্লাইমেট টেক স্টার্টআপদের জন্য আলাদা পোর্টফোলিও তৈরি করেছে।
৪. সার্ভিস-বেসড বা সফটওয়্যার স্টার্টআপগুলোর (যেমন SaaS) ক্ষেত্রে এই মডেল কীভাবে কাজ করে?
সফটওয়্যার কোম্পানির ফিজিক্যাল প্রোডাক্ট না থাকলেও তাদের ডেটা সেন্টার ও সার্ভারের বিশাল এনার্জি খরচ থাকে। ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারের অপ্টিমাইজেশন, রিনিউয়েবল এনার্জি চালিত সার্ভার ব্যবহার এবং ই-ওয়েস্ট কমানোর মাধ্যমে সাস কোম্পানিগুলো এই মডেলে যুক্ত হতে পারে।



