২০ জুন: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই ইতিহাসের পাতায় কোনো না কোনো জয়, ট্র্যাজেডি কিংবা মোড় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকে। তবে ২০ জুন তারিখটি ইতিহাসের এক গভীর ও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আমরা যখন এই নির্দিষ্ট দিনটির ইতিহাসের স্তরে স্তরে তাকাই, তখন মানব সভ্যতার এমন কিছু বৈশ্বিক পরিবর্তনের গল্প উন্মোচিত হয়, যা চিরতরে আমাদের ভূরাজনীতি, শিল্প, বিজ্ঞান ও মানবাধিকারের গতিপথ বদলে দিয়েছে।

একটি আইনসভার কলমের খোঁচায় বিশাল বাংলা ভূখণ্ড দ্বিখণ্ডিত হওয়া থেকে শুরু করে, এক ১৮ বছরের তরুণীর সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রানি হওয়ার গল্প—সবই ঘটেছিল এই ২০ জুনে। এই দিনের ঘটনাগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে একটি স্থানীয় সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে বিশাল ঢেউ তুলতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর জন্য হটলাইন স্থাপন হোক কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকারতম বন্দিশালা থেকে বন্দিদের অলৌকিক ও দুঃসাহসিক পালিয়ে যাওয়া—২০ জুনের ইতিহাস মানুষের অদম্য সহনশীলতা, বুদ্ধিমত্তা এবং সময়ের নিরলস অগ্রযাত্রার এক অনন্য দলিল। নিচে আমরা এই ঐতিহাসিক মাইলফলক, বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জন্ম-মৃত্যু এবং এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা আন্তর্জাতিক দিবসগুলোর এক বিস্তারিত ও গভীর যাত্রা শুরু করছি।

বাঙালি অনুষঙ্গ: উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের দিন

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে, বিশেষ করে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ আমাদের এই বাংলা অঞ্চলে ২০ জুন তারিখটি এক অত্যন্ত গভীর ও আবেগময় ছাপ রেখে গেছে। এই দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একাধারে যেমন দেশের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছে, তেমনি জন্ম দিয়েছে এমন সব সাহিত্যিক কিংবদন্তির, যাঁরা নিজেদের লেখনী দিয়ে জনগণের অধিকার রক্ষায় আজীবন লড়াই করেছেন।

বাংলা বিভাজনের ঐতিহাসিক ভোট (১৯৪৭)

১৯৪৭ সালের ২০ জুন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক চূড়ান্ত এবং অত্যন্ত বেদনাদায়ক মুহূর্তের জন্ম হয়েছিল। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা (যা ৩ জুনের পরিকল্পনা নামেও পরিচিত) এর অধীনে বাংলার আইনসভায় প্রদেশের বিভাজনের বিষয়ে এক ঐতিহাসিক ভোট অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার এক ফুটন্ত কড়াই হয়ে উঠেছিল। এর আগে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন একবার বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশরা সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। তবে ১৯৪৭ সালের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ এবং কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার পর রাজনৈতিক সমীকরণ এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে, তৎকালীন অনেক রাজনৈতিক নেতার কাছে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অসম্ভব বলে মনে হতে থাকে।

এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে আইনপ্রণেতারা তীব্র বিতর্কের মধ্য দিয়ে ভোট দেন। প্রথমে একটি যৌথ অধিবেশনে ১২৬-৯০ ভোটে ভারতের বিদ্যমান গণপরিষদে যোগদানের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়। এই অংশটি মূলত একটি স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলার পক্ষে অথবা সম্পূর্ণ অংশ পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করার পক্ষে ছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎচন্দ্র বসুর মতো নেতারা একটি অখণ্ড স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যাতে এই প্রদেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতি অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু এরপরই অমুসলিম-প্রধান অঞ্চলের प्रतिनिधियों নিয়ে আলাদা একটি বৈঠক বসে। সেখানে ৫৮-২১ ভোটে বাংলা বিভাজনের পক্ষে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়। এই একটি ভোট নিশ্চিত করে যে, হিন্দু-প্রধান পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে থাকবে এবং মুসলিম-প্রধান পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ (পূর্ব পাকিস্তান) হবে—যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে এক রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ভোটের পরপরই স্যার র্যাডক্লিফের সীমানা রেখা টানা হয়, যা কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি, অবর্ণনীয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং এমন এক প্রজন্মের ট্রমার জন্ম দেয়, যার প্রভাব আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও সমাজে স্পষ্ট।

সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক বেগম সুফিয়া কামালের জন্ম (১৯১১)

১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদের এক রক্ষণশীল ও অভিজাত জমিদার পরিবারে জন্ম নেন বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি ছিলেন বাঙালি সাহিত্য এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ও সাহসী কণ্ঠস্বর। তৎকালীন সময়ে রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়েদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ কিংবা বাংলা ভাষা শেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কারণ তৎকালীন অভিজাত সমাজ বাংলাকে সাধারণ মানুষের ভাষা মনে করত। এই কঠোর সামাজিক ও পিতৃতান্ত্রিক বাধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুফিয়া কামাল তাঁর মায়ের এবং গৃহকর্মীদের সহায়তায় গোপনে বাংলা শেখেন, পাশাপাশি সামাজিকভাবে বাধ্যতামূলক উর্দু, হিন্দি এবং আরবিও আয়ত্ত করেন। তাঁর এই মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকে কোনো বাধাই আটকে রাখতে পারেনি। পরবর্তীতে কলকাতায় গিয়ে নারীবাদের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাথে তাঁর পরিচয় হয়, যা তাঁর চিন্তাভাবনার জগতকে সম্পূর্ণ বদলে দেয় এবং বিখ্যাত ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়।

সুফিয়া কামাল কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আপসহীন একনিষ্ঠ কর্মী। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’র ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাঙালি নারীদের জন্য প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা ‘বেগম’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকার ধানমন্ডিতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কড়া নজরদারিতে বন্দি থেকেও তিনি গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, ওষুধ ও রসদ সরবরাহ করেছেন। তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খান যখন বাঙালিদের প্রতি অপমানজনক মন্তব্য করেছিলেন, তখন সুফিয়া কামাল তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সাহসিকতার সাথে তার প্রতিবাদ করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের জাগ্রত বিবেক। মৃত্যুর পর তিনিই প্রথম বাঙালি নারী যিনি পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হন।

এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য নিচে একটি সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক সারণী দেওয়া হলো।

বছর ঐতিহাসিক ঘটনা / ব্যক্তিত্ব মূল তাৎপর্য ভৌগোলিক অঞ্চল
১৭৫৬ কলকাতার ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডি নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করেন এবং ব্রিটিশ বন্দিদের অন্ধকূপে বন্দি করা হয়। বাংলা ভূখণ্ড
১৯১১ বেগম সুফিয়া কামালের জন্ম প্রখ্যাত কবি, নারীবাদী এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নির্ভীক নেত্রীর জন্ম। বাংলাদেশ
১৯৪৭ বাংলা বিভাজনের ঐতিহাসিক ভোট আইনসভা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদেশটি বিভক্ত করার পক্ষে রায় দেয়, যার ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান তৈরি হয়। ভারত / বাংলাদেশ
২০২৩ পশ্চিমবঙ্গ দিবস ঘোষণা ১৯৪৭ সালের এই ঐতিহাসিক বিধানসভা ভোটকে স্মরণ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

বৈশ্বিক ইতিহাস: বিশ্বকে বদলে দেওয়া কিছু মুহূর্ত

বৈশ্বিক ইতিহাস

বাঙালি অনুষঙ্গের বাইরে গিয়ে যদি আমরা বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখব ২০ জুন তারিখটি বড় বড় সাম্রাজ্যের উত্থান, স্বৈরাচারের কবল থেকে অলৌকিক মুক্তি এবং প্রযুক্তির এমন কিছু অভাবনীয় অগ্রগতির সাক্ষী, যা পুরো বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে।

ভিক্টোরিয়ান যুগের সূচনা (১৮ ৩৭)

১৮৩৭ সালের ২০ জুন ভোরের আলো ফোটার আগেই উইন্ডসর ক্যাসেলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান যুক্তরাজ্যের রাজা চতুর্থ উইলিয়াম। যেহেতু তাঁর কোনো বৈধ সন্তান ছিল না, তাই রাজমুকুট চলে যায় তাঁর মাত্র ১৮ বছর বয়সী ভাইঝি প্রিন্সেস আলেকজান্দ্রিনা ভিক্টোরিয়ার কাছে। সকাল ঠিক ৬টায় আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবারি এবং লর্ড চেম্বারলেইন তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে এই বিশাল সাম্রাজ্যের দায়িত্বভারের কথা জানান। সেই তরুণী শান্তভাবে এই বিশাল নিয়তিকে মেনে নেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রানি ভিক্টোরিয়া হিসেবে শাসনভার গ্রহণ করেন।

এই সকালটি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও প্রভাবশালী ভিক্টোরিয়ান যুগ-এর সূচনা, যা প্রায় ৬৩ বছর স্থায়ী হয়েছিল। তাঁর শাসনামলেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী পরাশক্তিতে পরিণত হয়। এই সময়ে বিশ্বে শিল্প বিপ্লব গতি পায়, রেলওয়ে ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে, টেলিগ্রাফের আবিষ্কার হয় এবং ১৮৫১ সালের ‘গ্রেট এক্সজিবিশন’-এর মাধ্যমে ব্রিটেন তার প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে। তবে এই অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি এবং শৈল্পিক রোমান্টিকতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এশিয়া ও আফ্রিকার কলোনিগুলোতে নির্মম ঔপনিবেশিক শোষণ, প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন এবং লাখ লাখ আদিবাসী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সাম্রাজ্যবাদী নির্যাতন।

স্নায়ুযুদ্ধের ‘রেড টেলিফোন’ স্থাপন (১৯৬৩)

১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর, যখন পুরো বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বুঝতে পারে যে তাদের মধ্যে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের কোনো দ্রুত মাধ্যম নেই। সেই সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এবং সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভের মধ্যে একটি বার্তা পাঠাতে, তা কোড করতে, অনুবাদ করতে এবং পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যেত। এই ভয়ানক বিলম্বের কারণে বিশ্ব ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল।

এই ভুলত্রুটি শুধরে নিতে ১৯৬৩ সালের ২০ জুন জেনেভায় দুই পরাশক্তি ওয়াশিংটন ডি.সি. এবং মস্কোর মধ্যে একটি সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা বা হটলাইন স্থাপনের চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। গণমাধ্যম এবং হলিউড থ্রিলারে একে রেড টেলিফোন বলা হলেও, বাস্তবে কোনো লাল রঙের ফোন বা ভয়েস কলের ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। কণ্ঠস্বরের আবেগ, ভুল অনুবাদ বা রাগান্বিত সুর যাতে ভুলবশত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে না আনে, সেজন্য এটি ছিল মূলত একটি অত্যন্ত নিরাপদ ক্রিপ্টোগ্রাফিক ‘টেলিটাইপ’ বা লিখিত বার্তা পাঠানোর যন্ত্র। এটি লন্ডন, কোপেনহেগেন, স্টকহোম এবং হেলসিঙ্কি হয়ে একটি ১০,০০০ মাইল দীর্ঘ আটলান্টিক কেবলের মাধ্যমে সংযুক্ত ছিল। ওয়াশিংটন থেকে পাঠানো প্রথম পরীক্ষামূলক বার্তাটি ছিল বিখ্যাত ইংরেজি বাক্য: “The quick brown fox jumped over the lazy dog’s back 1234567890”। এই ব্যবস্থাটি পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ এবং ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের সময় দুই দেশের উত্তেজনা প্রশমনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

আউশভিৎস থেকে কাজিমিয়ার্জ পিয়েচোভস্কির দুঃসাহসিক পলায়ন (১৯৪২)

মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর স্থান হলো নাৎসিদের আউশভিৎস কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা নির্যাতন শিবির। কিন্তু ১৯৪২ সালের ২০ জুন এই নরককুণ্ড থেকেই ঘটেছিল সাহসিকতার এক অবিস্মরণীয় গল্প। পোলিশ রাজনৈতিক বন্দি কাজিমিয়ার্জ পিয়েচোভস্কি (যিনি একজন স্কাউট সদস্য ছিলেন) এবং তাঁর আরও তিন সহবন্দি (স্তানিস্লাভ গুস্তাভ জাস্তার, জোজেফ লেম্পার্ট এবং ইউজেনিউজ বেন্দেরা) মিলে একটি অবিশ্বাস্য ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পালানোর পরিকল্পনা করেন।

কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার চেষ্টা করলে নির্ঘাত মৃত্যু, তাই তারা সিদ্ধান্ত নেন তারা সোজা সদর দরজা দিয়েই হেঁটে বেরিয়ে যাবেন! বেন্দেরা ছিলেন ক্যাম্পের মোটর গ্যারেজের মেকানিক, তিনি কৌশলে ক্যাম্পের কুখ্যাত প্রধান রুডলফ হোসের ব্যক্তিগত ‘স্টায়ার ২২০’ কমান্ড কারের চাবি নকল করেন। এরপর এই চারজন নাৎসিদের ইউনিফর্মের গুদাম ভেঙে উচ্চপদস্থ এসএস (SS) কর্মকর্তাদের পোশাক পরে নেন এবং ভারী অস্ত্র হাতে গাড়িতে ওঠেন। গাড়িটি যখন মেইন গেটের সামনে পৌঁছায়, তখন এসএস অফিসারের পোশাকে থাকা পিয়েচোভস্কি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এবং নিখুঁত জার্মান ভাষায় দায়িত্বরত নাৎসি গার্ডদের ওপর চিৎকার করে দ্রুত গেট খোলার নির্দেশ দেন। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এই প্রচণ্ড রাগ দেখে ভয় পেয়ে গার্ডরা তৎক্ষণাৎ গেট খুলে দেয়। তারা নির্বিঘ্নে আউশভিৎস থেকে পালিয়ে পোল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে মিশে যান। তাদের একজন, জাস্তার, তাঁর সাথে নিয়ে এসেছিলেন ‘উইটোল্ড পিলেকি রিপোর্ট’—যা ছিল আউশভিৎসে নাৎসিদের ইহুদি গণহত্যার (Holocaust) প্রথম বিস্তারিত গোপন দলিল, যা তিনি পোলিশ প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেন।

‘জকস’ (Jaws) চলচ্চিত্রের মুক্তি এবং ব্লকবাস্টারের জন্ম (১৯৭৫)

১৯৭৫ সালের ২০ জুন হলিউডের তৎকালীন মাত্র ২৮ বছর বয়সী এক তরুণ পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ রূপালি পর্দায় মুক্তি দেন এমন এক চলচ্চিত্র, যা মানুষের মনে সমুদ্রের পানির প্রতি এক চিরন্তন ভয়ের জন্ম দিয়েছিল। ছবিটির নাম ছিল জকস (Jaws)। এই সিনেমার আগে হলিউডের বড় বড় সিনেমাগুলো প্রথমে কয়েকটি নির্দিষ্ট শহরের নামী থিয়েটারে মুক্তি পেত এবং পরে তা ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু ইউনিভার্সাল পিকচার্স এই নিয়ম ভেঙে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়। তারা দেশজুড়ে টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচারণা চালায় এবং আমেরিকার শত শত প্রেক্ষাগৃহে একযোগে সিনেমাটি মুক্তি দেয়।

এই কৌশলটি ছিল বিশাল এক জুয়া। কারণ সিনেমার শুটিংয়ের সময় যান্ত্রিক হাঙ্গর ‘ব্রুস’ বারবার নোনা পানিতে ডুবে যাচ্ছিল বা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। বাধ্য হয়ে স্পিলবার্গ সিনেমার বেশিরভাগ অংশে হাঙ্গরটিকে সরাসরি না দেখিয়ে কেবল তার উপস্থিতি অনুভব করানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সুরকার জন উইলিয়ামসের সেই বিখ্যাত দুটি নোটের শিরদাঁড়া কাঁপানো আবহ সঙ্গীত ব্যবহার করে দর্শকদের মধ্যে এক মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি করেন। এই সীমাবদ্ধতাই সিনেমাটিকে একটি মাস্টারপিসে পরিণত করে। ‘জকস’ সে সময় ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমা হয়ে ওঠে এবং স্থায়ীভাবে বদলে দেয় হলিউডের ব্যবসায়িক মডেল, যা আজ আমরা ‘সামার ব্লকবাস্টার’ কৌশল নামে চিনি।

নিচে বৈশ্বিক ইতিহাসের অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি সংকলন দেওয়া হলো।

বছর বৈশ্বিক ঘটনা স্থান ঐতিহাসিক তাৎপর্য
১৭৮৯ টেনিস কোর্টের শপথ ফ্রান্স ফরাসি বিপ্লবের একটি অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর, যেখানে তৃতীয় শ্রেণীর প্রতিনিধিরা নতুন সংবিধানের দাবি জানান।
১৮৪০ স্যামুয়েল মোর্সের টেলিগ্রাম পেটেন্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্যামুয়েল মোর্স আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিপ্লবী বৈদ্যুতিক যোগাযোগ যন্ত্রের পেটেন্ট লাভ করেন।
১৮৬৩ ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার রাজ্যত্ব লাভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া কনফেডারেট ভার্জিনিয়া থেকে আলাদা হয়ে ইউনিয়নের ৩৫তম রাজ্য হিসেবে যোগ দেয়।
১৮৭৭ প্রথম বাণিজ্যিক টেলিফোন সেবা 加拿大 আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ওন্টারিওতে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক টেলিফোন লাইনের সংযোগ স্থাপন করেন।
১৯০০ বক্সার বিদ্রোহের অবরোধ চীন সাম্রাজ্যবাদী চীনা সেনাবাহিনী বেইজিংয়ে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক ও নাগরিকদের ওপর ৫৫ দিনের রক্তাক্ত অবরোধ শুরু করে।

বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জন্মবার্ষিকী

২০ জুনের এই বিশেষ দিনে এমন কিছু মানুষের জন্ম হয়েছে, যাঁরা বিংশ শতাব্দীর শিল্প, সঙ্গীত এবং সামরিক ইতিহাসের মানচিত্রকে নিজেদের মেধা ও কর্ম দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।

অডি মারফি: কৃষক সন্তান থেকে যুদ্ধনায়ক (১৯২৪)

১৯২৪ সালের ২০ জুন টেক্সাসের এক অত্যন্ত দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেন অডি মারফি। ছোটবেলায় পরিবারের অনেকগুলো ভাইবোনের মুখে অন্ন জোগাতে তিনি রাইফেল দিয়ে ছোটখাটো শিকার করতেন। পার্ল হারবারে জাপানি হামলার পর তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাইলেও কম বয়স এবং কম ওজনের কারণে বারবার প্রত্যাখ্যাত হন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর জন্ম সনদে বয়স বাড়িয়ে জاليةতির মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ছোটখাটো ও রোগা গড়নের এই ছেলেই পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পদকপ্রাপ্ত মার্কিন সৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

তাঁর সবচেয়ে কিংবদন্তিসম বীরত্বগাথা তৈরি হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ২৬ জানুয়ারি ফ্রান্সের কোলমার পকেটে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে এক ভয়াবহ জার্মান আক্রমণের মুখে মারফি তাঁর দলের বাকি সৈনিকদের পিছু হটার নির্দেশ দেন এবং নিজে একটি জ্বলন্ত এম১০ ট্যাংক ডেস্ট্রয়ারের ওপর চড়ে বসেন, যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারত। তিনি সেই ট্যাংকের ওপর থাকা .৫০ ক্যালিবারের মেশিনগান দিয়ে একাই পুরো এক কোম্পানি জার্মান সৈন্যকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আটকে রাখেন এবং ল্যান্ডলাইন টেলিফোনের মাধ্যমে নিজের আর্টিলারিকে শত্রুর অবস্থান বাৎলে দেন। এই অবিশ্বাস্য বীরত্বের জন্য তিনি আমেরিকার সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘মেডাল অব অনার’ পান। যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি হলিউডে এক সফল অভিনয় জীবন শুরু করেন এবং নিজের জীবনী নিয়ে তৈরি ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘টু হেল অ্যান্ড ব্যাক’-এ নিজেই অভিনয় করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত বা পিটিএসডি (PTSD) নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা প্রথম ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন, যা যুদ্ধফেরত সৈনিকদের মানসিক চিকিৎসায় এক বড় বিপ্লব এনেছিল।

লাইওনেল রিচি: একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর (১৯৪৯)

১৯৪৯ সালের ২০ জুন আলাবামার ঐতিহাসিক টাস্কিজি শহরে জন্ম নেন লাইওনেল রিচি। টাস্কিজি ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসে বড় হওয়া রিচির চারপাশ জুড়েই ছিল আফ্রো-আমেরিকান সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের সমৃদ্ধ মেলবন্ধন। প্রথমে যাজক হওয়ার কথা ভাবলেও, পরবর্তীতে তিনি সঙ্গীতের দুনিয়ায় পা রাখেন এবং আধুনিক পপ ও সোল মিউজিকের এক অনন্য কারিগর হয়ে ওঠেন। ‘দ্য কমোডোরস’ ব্যান্ডের স্যাক্সোফোন বাদক এবং মূল গীতিকার হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়, যেখানে তিনি “Brick House” এবং “Three Times a Lady” এর মতো বিখ্যাত গান উপহার দেন।

১৯৮২ সালে একক ক্যারিয়ার শুরু করার পর রিচি বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক সফলতার শিখরে পৌঁছান। তাঁর গাওয়া “Hello”, “All Night Long”, এবং “Endless Love” এর মতো গানগুলো চার্ট মাতায়। তিনি ৪টি গ্র্যামি এবং ১টি অস্কার জয় করেন। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি ছিল ১৯৮৫ সালে মাইকেল জ্যাকসনের সাথে যৌথভাবে লেখা দাতব্য সঙ্গীত “We Are the World”, যা বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে পপ সঙ্গীতের শক্তিকে এক অভূতপূর্ব মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল।

নিচে ২০ জুনে জন্মগ্রহণকারী আরও কয়েকজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বের তালিকা দেওয়া হলো।

বছর নাম জাতীয়তা অবদান ও পরিচিতি
১৮১৯ জাক অফেনবাক জার্মান-ফরাসি অত্যন্ত প্রভাবশালী সুরকার, যিনি অপেরেটা বা হালকা হাসির অপেরার জনক এবং বিখ্যাত ‘ক্যান-ক্যান’ নাচের সুরকার।
১৯০৯ এরল ফ্লিন অস্ট্রেলিয়ান হলিউডের স্বর্ণযুগের কিংবদন্তি অভিনেতা, যিনি পর্দায় তাঁর রোমান্টিক ও তলোয়ারবাজ চরিত্রের জন্য বিখ্যাত।
১৯৪২ ব্রায়ান উইলসন আমেরিকান ‘দ্য বিচ বয়েজ’ ব্যান্ডের দূরदर्शी সহ-প্রতিষ্ঠাতা, সুরকার এবং সঙ্গীত ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রতিভাবান প্রযোজক।
১৯৫২ জন গুডম্যান আমেরিকান হলিউডের অত্যন্ত বহুমুখী চরিত্রের শক্তিশালী অভিনেতা, যিনি ‘রোজেন’ সিরিজ এবং কোয়েন ব্রাদার্সের সিনেমার জন্য পরিচিত।
১৯৬৭ নিকোল কিডম্যান অস্ট্রেলিয়ান-আমেরিকান অস্কারজয়ী বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রী ও প্রযোজক, যিনি তাঁর তীব্র ও জটিল মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রের অভিনয়ের জন্য প্রশংসিত।

মহাপ্রয়াণ: যাঁদের আমরা হারিয়েছি

২০ জুন তারিখটি এমন কিছু প্রভাবশালী মানুষের চলে যাওয়ার দিন, যাঁরা বিজ্ঞান, রাজনীতি ও সংস্কৃতির আঙিনায় এমন কিছু উত্তরাধিকার রেখে গেছেন যা আজও মানব সভ্যতাকে পথ দেখাচ্ছে।

জর্জ লেমেত্রা: বিগ ব্যাং তত্ত্বের জনক (১৯৬৬)

১৯৬৬ সালের ২০ জুন বেলজিয়ামের এই প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং পদার্থবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জর্জ লেমেত্রা ছিলেন এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব যিনি একাধারে গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস (তিনি একজন ক্যাথলিক যাজক ছিলেন) এবং কঠোর বৈজ্ঞানিক যুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। ১৯২৭ সালে একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্রে তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন যে এই মহাবিশ্ব একসময় একটি আদি পরমাণু (primeval atom) থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এবং এটি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে—যা আজকে আমরা বিগ ব্যাং তত্ত্ব বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব নামে জানি।

শুরুর দিকে স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনও তাঁর এই তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং লেমেত্রাকে বলেছিলেন, “আপনার গণিত ঠিক আছে, কিন্তু আপনার ফিজিক্স বা পদার্থবিজ্ঞান একেবারেই জঘন্য।” কিন্তু এর দুই বছর পর যখন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর দূরে সরে যাওয়ার পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ উপস্থাপন করেন, তখন আইনস্টাইন নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং লেমেত্রার গাণিতিক ও মহাজাগতিক ব্যাখ্যার ভূয়সী প্রশংসা করেন। লেমেত্রা প্রমাণ করেছিলেন যে বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে কোনো চিরন্তন বিরোধ নেই, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।

নিচে ২০ জুনে মৃত্যুবরণ করা আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো।

বছর নাম জাতীয়তা ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
১৮২০ ম্যানুয়েল বেলগ্রানো আর্জেন্টাইন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী এবং বিপ্লবী রাজনীতিবিদ যিনি আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকার নকশা করেছিলেন।
১৮৩৭ quarto উইলিয়াম ব্রিটিশ জর্জিয়ান যুগের সর্বশেষ ব্রিটিশ রাজা, যাঁর মৃত্যুর পরই রানি ভিক্টোরিয়ার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ শাসনের সূচনা ঘটে।
১৯৪৭ বাগসি সিগেল আমেরিকান কুখ্যাত মাফিয়া গ্যাংস্টার, যিনি আমেরিকার লাস ভেগাস স্ট্রিপের প্রাথমিক বাণিজ্যিক রূপান্তর ও ক্যাসিনো সাম্রাজ্য গড়তে হিংস্র ভূমিকা রেখেছিলেন।

আন্তর্জাতিক দিবস: মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা

আন্তর্জাতিক দিবস

ইতিহাস যেখানে প্রায়শই রাজা, রানি, জেনারেল আর রাজনীতিবিদদের গল্প শোনায়, সেখানে ২০ জুন তারিখটি এমন লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জন্য উৎসর্গীকৃত, যাঁরা বৈশ্বিক রাজনীতির নিষ্ঠুর খেলার শিকার হয়েছেন।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস: মানুষের সহনশীলতার এক অনন্য প্রতীক

২০০০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০ জুন তারিখটিকে বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিনটি বেছে নেওয়ার মূল কারণ ছিল আফ্রিকান শরণার্থী দিবসের সাথে সামঞ্জস্য রাখা, কারণ আফ্রিকা মহাদেশ বিশ্বের একটি বিশাল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই দিবসটি বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, ধর্মীয় নিপীড়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিজেদের আদি ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া লাখ লাখ শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের অদম্য সাহস ও বেঁচে থাকার লড়াইকে সম্মান জানায়। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং আফ্রিকার সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে শরণার্থীর সংখ্যা এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে, যা এই দিনটির গুরুত্বকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

ইতিহাসের আয়নায় ২০ জুন: এক অবিনশ্বর পদচিহ্ন

আমরা যখন ২০ জুনের এই বিশাল ক্যানভাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দিকে তাকাই, তখন মানব সভ্যতার বিবর্তনের একটি স্পষ্ট ধরন আমাদের চোখে পড়ে। এই দিনটি মূলত সীমানা বা গণ্ডির দিন—কখনো তা সীমানা টেনে দেওয়ার, আবার কখনো বা সেই সীমানা ভেঙে ফেলার। ১৯৪৭ সালের বাংলার আইনসভার সেই vote মানচিত্রে এমন এক রক্তক্ষয়ী সীমানা এঁকে দিয়েছিল যার ক্ষত আজও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি, অন্যদিকে স্নায়ুযুদ্ধের সেই হটলাইন চেয়েছে আদর্শিক দূরত্বের সীমানা ভেঙে পৃথিবীকে পারমাণবিক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।

কাজিমিয়ার্জ পিয়েচোভস্কি আউশভিৎসের খুনে দেয়াল ভেঙে বের হওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছেন, আবার জর্জ লেমেত্রা ভেঙেছেন মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণার গণ্ডি। রানি ভিক্টোরিয়ার হাত ধরে বিশাল সাম্রাজ্যের উত্থান থেকে শুরু করে স্টিভেন স্পিলবার্গের হাত ধরে সিনেমার খোলনলচে বদলে যাওয়া—২০ জুন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস কখনো স্থবির থাকে না। এই ক্যালেন্ডারের পাতায় জন্ম নেওয়া বা হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর গল্প আজও আমাদের আধুনিক পৃথিবীর ভূগোল, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতিকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে চলেছে।

সর্বশেষ