ইতিহাসের পাতা উল্টালে ক্যালেন্ডারের প্রতিটি দিনই যেন এক একটি জীবন্ত গল্প। শত শত বছরের মানবীয় উদ্ভাবন, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, শিল্পের নবজাগরণ এবং ব্যক্তিগত অর্জনের নানা মাইলফলকে ভরপুর এই দিনগুলোই আমাদের আধুনিক পৃথিবীর রূপকার। আর এই ঐতিহাসিক টাইমলাইনে ২৭শে সেপ্টেম্বর দিনটি এক অনন্য এবং যুগান্তকারী অবস্থান দখল করে আছে।
একদিকে এই দিনে আলবার্ট আইনস্টাইন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভিত্তি প্রকাশ করেছিলেন, অন্যদিকে জর্জ স্টিফেনসন নিয়ে এসেছিলেন যাত্রীবাহী বাষ্পীয় ইঞ্জিন, যা বিশ্বজুড়ে যোগাযোগের ধারণাই বদলে দেয়। ঠিক একই দিনে জঁ-ফ্রাঁসোয়া শ্যাম্পোলিয়ন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক্সের পাঠোদ্ধার করে প্রাচীন মিশরের ইতিহাসের তালা খুলেছিলেন। আর আমাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে—ভারতীয় উপমহাদেশ ও বাংলায়—এই দিনটি গভীর রাজনৈতিক বিপ্লব, অসামান্য সাহিত্যিক মেধা এবং সমাজ সংস্কারের নানা অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী।
চলুন, এক নজরে দেখে নিই ২৭শে সেপ্টেম্বরের বিশ্ব ও বাংলার ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর অধ্যায়গুলো।
বাঙালি পরিমণ্ডল ও ভারতীয় উপমহাদেশ
ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে আমাদের বাংলা, দীর্ঘকাল ধরে সমাজ সংস্কার, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী লড়াই, সাহিত্যিক উদ্ভাবন এবং আধুনিক নগরায়ণের এক অন্যতম কেন্দ্র। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের হৃদয়ে ২৭শে সেপ্টেম্বরের কিছু ঘটনা আজও গভীরভাবে অনুরণিত হয়।
ঐতিহাসিক মাইলফলক ও রাজনৈতিক বাঁকদশা
-
বাংলার নবজাগরণের পথপ্রদর্শকের বিদায় (১৮৩৩): বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণের জনক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত রাজা রামমোহন রায় ১৮৩৩ সালের এই দিনে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলের কাছে স্টেপলটনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টাতেই ১৮২৯ সালে নিষ্ঠুর সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়। সমাজ সংস্কার, নারী অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পশ্চিমা শিক্ষার প্রসারে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ যে বীজ বপন করেছিল, তা আধুনিক বাংলার ভিত্তি গড়ে দেয়।
-
এক বিপ্লবী বীরের জন্ম (১৯০৭): ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া অকুতোভয় বিপ্লবী ভগৎ সিং ১৯০৭ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের লায়ালপুর জেলায় (বর্তমান পাকিস্তান) জন্মগ্রহণ করেন। যদিও পারিবারিক কিছু নথিতে ২৮ তারিখের কথা বলা হয়, তবে ঐতিহাসিকরা ২৭ তারিখকেই তাঁর প্রকৃত জন্মবার্ষিকী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের (HSRA) নেতা হিসেবে ১৯২৯ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ এবং মাত্র ২৩ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি বরণ করে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণায় পরিণত হন।
-
স্বাধীনতা-পরবর্তী সীমান্ত সমীকরণ (১৯৮১): ১৯৮১ সালের এই দিনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তে অপ্রত্যাশিত অস্থিরতা ও অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দেয়। ১৯৭১ সালের পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ এবং দিল্লির মধ্যকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক কতোটা নাজুক ছিল, এই ঘটনাটি তারই একটি বড় প্রমাণ।
উপমহাদেশের স্মরণীয় জন্ম
-
সিরাজ শিকদার (১৯৪৪–১৯৭৫): ব্রিটিশ ভারতের শরীয়তপুরে জন্মগ্রহণকারী এই অকুতোভয় বীর ছিলেন একাধারে বুয়েট থেকে পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক কৌশলবিদ। তিনি ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী ধারার এক অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়।
-
আনিসুল হক (১৯৫২–২০১৭): ফেনীর সোনাগাজীতে জন্ম নেওয়া আনিসুল হক ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম দূরদর্শী উদ্যোক্তা, জনপ্রিয় টেলিভিশন উপস্থাপক এবং আপাদমস্তক একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। বিজিএমইএ এবং এফবিসিসিআই-এর সফল সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ থেকে শুরু করে ঢাকাকে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে অসমাপ্ত স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজও নগরবাসীর কাছে এক আক্ষেপের নাম।
-
যশ চোপড়া (১৯৩২–২০১২): অবিভক্ত ভারতের লাহোরে জন্ম নেওয়া কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা যশ চোপড়া হিন্দি সিনেমাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ‘কিং অব রোমান্স’ খ্যাত এই পরিচালকের পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে দিওয়ার, কাভি কাভি, চাঁদনী এবং দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে-এর মতো মাস্টারপিসগুলো শুধু বলিউড নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পপ কালচারকেই নতুন রূপ দিয়েছে।
-
মাতা অমৃতানন্দময়ী বা “আম্মা” (জন্ম ১৯৫৩): ভারতের কেরালায় জন্ম নেওয়া এই বিশ্বখ্যাত হিন্দু আধ্যাত্মিক নেতা তাঁর দাতব্য সংস্থা ‘এমব্রেসিং দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা এবং শিক্ষা প্রদান করে চলেছেন।
উপমহাদেশের স্মরণীয় প্রয়াণ
-
সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫–২০১৬): কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ এবং কালজয়ী সব গানের লিরিক্স—সব শাখায় সমান বিচরণ ছিল বলে তাঁকে ডাকা হতো বাংলার ‘সব্যসাচী লেখক’ হিসেবে। ২০১৬ সালের এই দিনে তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। নূরলদীনের সারাজীবন বা পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর মতো নাটকগুলো বাংলাদেশের থিয়েটার জগতের অমর সৃষ্টি। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি এবং স্বাধীনতা পদকজয়ী এই লেখকের শূন্যতা আজও অপূরণীয়।
-
এস. আর. রঙ্গনাথন (১৮৯২–১৯৭২): ভারতীয় এই গণিতবিদ ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞানী ১৯৭২ সালের এই দিনে মারা যান। আধুনিক লাইব্রেরি সায়েন্সের “ফাইভ লজ” বা পাঁচটি সূত্র এবং ‘কোলন ক্লাসিফিকেশন’ সিস্টেমের উদ্ভাবক হিসেবে সারা বিশ্বে তিনি নমস্য।
-
মাহবুবে আলম (১৯৪৯–২০২০): বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় (২০০৯–২০২০) অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহবুবে আলম ২০২০ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর বিদায় নেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মতো ঐতিহাসিক মামলাগুলোতে তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অসামান্য আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন।
-
যশবন্ত সিং (১৯৩৮–২০২০): ভারতের ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত কূটনীতিক। ১৯৯৮ সালের পরমাণু পরীক্ষা এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
আন্তর্জাতিক দিবস ও উদযাপন
সাংস্কৃতিক বিনিময়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২৭শে সেপ্টেম্বর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হয়।
-
বিশ্ব পর্যটন দিবস (UNWTO): ১৯৭০ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) বিধিমালা গৃহীত হওয়ার দিনটিকে স্মরণ করে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৭শে সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
-
তুর্কমেনিস্তানের স্বাধীনতা দিবস: ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই দিনে তুর্কমেনিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।
-
বেলজিয়ামের ফ্রেঞ্চ কমিউনিটি দিবস: ১৮৩০ সালের বেলজিয়াম বিপ্লবের সময় ব্রাসেলস পার্কে ডাচ সেনাদের বিরুদ্ধে বেলজিয়ান দেশপ্রেমিকদের বিজয়ের স্মরণে দিনটি পালিত হয়।
বিশ্ব ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি

ইউরোপের গবেষণাগার থেকে শুরু করে এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ভূ-রাজনীতি—২৭শে সেপ্টেম্বর দিনটি নানা বৈশ্বিক বাঁকদশারও সাক্ষী।
যুক্তরাষ্ট্র
-
ওয়ারেন কমিশন রিপোর্ট (১৯৬৪): প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত প্রেসিডেন্সিয়াল কমিশন এদিন তাদের ৮৮৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টে বলা হয়, লি হার্ভে অসওয়াল্ড সম্পূর্ণ একাই গুলি চালিয়েছিলেন। যদিও এই দাবি আজও আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত আইনি বিষয়গুলোর একটি।
-
গুগলের আনুষ্ঠানিক জন্মদিন (১৯৯৮): যদিও ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন ১৯৯৮ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর গুগলকে ইনকর্পোরেট করেছিলেন, তবুও রেকর্ডসংখ্যক ওয়েব পেজ ইনডেক্স করার একটি মাইলফলককে স্মরণীয় করে রাখতে গুগল ২৭শে সেপ্টেম্বরকেই তাদের অফিশিয়াল জন্মদিন হিসেবে বেছে নেয়।
যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথ
-
স্টিম লোকোমোটিভ বিপ্লব (১৮২৫): জর্জ স্টিফেনসনের তৈরি লোকোমোটিভ লোকোমোশন নং ১ ইংল্যান্ডের স্টকটন এবং ডার্লিংটন রেলওয়েতে বিশ্বের প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন টেনে নিয়ে যায়। শিল্প বিপ্লবকে অভাবনীয় গতি এনে দেওয়া এই ঘটনাই ছিল আধুনিক বাণিজ্যিক রেল যুগের সূচনা।
-
নরম্যান বিজয়ের সূচনা (১০৬৬): প্রতিকূল বাতাসের কারণে কয়েক সপ্তাহ আটকে থাকার পর নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম অবশেষে ২৭শে সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর আক্রমণকারী নৌবহর নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেন। এই অভিযানের চূড়ান্ত ফলস্বরূপ পালটে যায় ব্রিটিশ রাজতন্ত্র, সংস্কৃতি এবং স্বয়ং ইংরেজি ভাষার গতিপথ।
ইউরোপ
-
মিশরের রহস্যভেদ – দ্য রোজেটা স্টোন (১৮২২): ফরাসি স্কলার জঁ-ফ্রাঁসোয়া শ্যাম্পোলিয়ন প্যারিসে তাঁর বিখ্যাত চিঠির মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, তিনি তিন ভাষায় লেখা রোজেটা স্টোনের সাহায্যে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক্সের পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। হাজার বছরের প্রাচীন ফারাওদের ইতিহাস জানার এই যুগান্তকারী মুহূর্তটিই আধুনিক ইজিপ্টোলজির জন্ম দেয়।
-
আইনস্টাইনের $E=mc^2$ তত্ত্বের প্রকাশ (১৯০৫): বস্তুর ভর ও শক্তির সম্পর্ক নিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইনের অবিস্মরণীয় তিন পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রটি জার্মান জার্নাল Annalen der Physik-এ প্রকাশিত হয়। তাঁর দেওয়া $E=mc^2$ সমীকরণটি প্রমাণ করে যে ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব, যা পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা ও আধুনিক মহাজাগতিক চিন্তাধারার ভিত্তি গড়ে দেয়।
-
জেসুইটদের প্রতিষ্ঠা (১৫৪০): পোপ তৃতীয় পল ইগনাটিয়াস অফ লয়োলার নেতৃত্বে ‘সোসাইটি অফ জেসাস’ বা জেসুইটদের প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেন। পরবর্তীতে তারা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় এবং শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
চীন ও পূর্ব এশিয়া
-
বিধ্বংসী চিলি ভূমিকম্প (১২৯০): চীনের বোহাই সাগর অঞ্চলে (বর্তমান ইনার মঙ্গোলিয়া ও লিয়াওনিং) এক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, প্রায় এক লাখ মানুষ এই দুর্যোগে প্রাণ হারায়।
-
জেনারেল ম্যাকআর্থার ও সম্রাট হিরোহিতোর সাক্ষাৎ (১৯৪৫): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের সাথে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো টোকিওস্থ আমেরিকান দূতাবাসে এক ঐতিহাসিক সাক্ষাতে মিলিত হন। ম্যাকআর্থারের ক্যাজুয়াল খাকি পোশাক এবং সম্রাটের ফর্মাল পোশাকের সেই যুগান্তকারী ছবিটি জাপানিদের মনে সম্রাটের ‘ঈশ্বরত্ব’-এর মিথ ভেঙে দেয় এবং গণতান্ত্রিক জাপানের পথ সুগম করে।
রাশিয়া ও বিশ্বমঞ্চ
-
সয়ুজ ১২ মিশন (১৯৭৩): ১৯৭১ সালের মর্মান্তিক সয়ুজ ১১ দুর্ঘটনার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের মহাকাশচারী ভ্যাসিলি লাজারেভ এবং ওলেগ মাকারভকে নিয়ে সফলভাবে ‘সয়ুজ ১২’ মিশন সম্পন্ন করে, যা মহাকাশ ভ্রমণের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে।
-
কাবুলের পতন (১৯৯৬): তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করে প্রেসিডেন্ট বুরহানউদ্দিন রব্বানির সরকারকে উৎখাত করে এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়।
বিশ্বমঞ্চে স্মরণীয় জন্ম ও মৃত্যু
বিখ্যাত জন্ম
-
স্যামুয়েল অ্যাডামস (১৭২২–১৮০৩): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাপিতা (Founding Father) এবং ‘বোস্টন টি পার্টি’-র মূল সংগঠক।
-
ফ্রান্সের রাজা ত্রয়োদশ লুই (১৬০১–১৬৪৩): তিনি ফরাসি পরম রাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
-
গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দা (১৮৭১–১৯৩৬): ইতালীয় ঔপন্যাসিক এবং ১৯২৬ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী দ্বিতীয় নারী।
-
এভ্রিল ল্যাভিন (জন্ম ১৯৮৪): কানাডীয় পপ-পাঙ্ক রানি, যাঁর ‘Let Go’ অ্যালবামটি বিশ্বজুড়ে দুই কোটির কাছাকাছি বিক্রি হয়েছিল।
বিখ্যাত মৃত্যু
-
এডগার দেগা (১৮৩৪–১৯১৭): ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
-
ক্লারা বো (১৯০৫–১৯৬৫): ১৯২০-এর দশকের নির্বাক চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী এবং হলিউডের প্রথম দিককার মেগাস্টার।
-
ক্লিফ বার্টন (১৯৬২–১৯৮৬): মেটালিকা ব্যান্ডের প্রভাবশালী বেস গিটারিস্ট, যিনি মাত্র ২৪ বছর বয়সে এক মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় মারা যান।
-
মাইকেল গ্যামবন (১৯৪০–২০২৩): ‘হ্যারি পটার’ সিরিজে প্রফেসর ডাম্বলডোর চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া আইরিশ-ব্রিটিশ অভিনেতা।
-
ম্যাগি স্মিথ (১৯৩৪–২০২৪): হ্যারি পটারের ‘প্রফেসর ম্যাকগোনাগল’ কিংবা ডাউনটন অ্যাবির ‘ডোয়াগার কাউন্টেস’ খ্যাত দুইবারের অস্কারজয়ী অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রিটিশ অভিনেত্রী।
অজানা তথ্য
-
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া সংকেত-উদ্ধারকারী: রোজেটা স্টোন ব্যবহার করে জঁ-ফ্রাঁসোয়া শ্যাম্পোলিয়ন যখন হায়ারোগ্লিফিক্সের রহস্য ভেদ করে ফেলেন, তখন তিনি আনন্দে এতোটাই আত্মহারা হয়েছিলেন যে, দৌড়ে ভাইয়ের অফিসে গিয়ে “Je tiens l’affaire!” (“আমি পেয়ে গেছি!”) চিৎকার করেই ফ্লোরে অজ্ঞান হয়ে পড়েন! ধকল সামলে উঠতে তাঁর পুরো পাঁচ দিন সময় লেগেছিল।
-
বাতাস যখন ইতিহাস গড়ে: ১০৬৬ সালে ডিউক উইলিয়ামের নৌবহর বাতাসের প্রতিকূলতার কারণে আটকে ছিল। ২৭শে সেপ্টেম্বর হঠাৎ বাতাসের দিক দক্ষিণমুখী হলে তারা নির্বিঘ্নে ইংলিশ চ্যানেল পার হন। বাতাস যদি আর কয়েকদিন এমনি থাকতো, তাহলে হয়তো অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা হ্যারল্ড তার সৈন্যবাহিনী গুছিয়ে নিতে পারতেন এবং আধুনিক ইংরেজি ভাষা বা ব্রিটেনের ইতিহাস আজ অন্যরকম হতো।
-
গুগলের ভাসমান জন্মদিন: গুগলের আসলে কোনো একটি নির্দিষ্ট জন্মদিন নেই! প্রতিষ্ঠা, ইনকর্পোরেশন, ডোমেইন কেনা—সব হয়েছে সেপ্টেম্বরের আলাদা আলাদা তারিখে। তবে ২০০৫ সালে যখন ইয়াহুকে হটিয়ে গুগল প্রথম সার্চ ইনডেক্সের শীর্ষে চলে যায়, তখন থেকে এই অর্জনকে উদ্যাপন করতেই ২৭ তারিখকে পাকাপাকিভাবে জন্মদিন ধরে নেওয়া হয়।
শেষ কথা
২৭শে সেপ্টেম্বর দিনটি মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, অদম্য কৌতূহল এবং রাজনৈতিক পালাবদলের এক চমৎকার দলিল। একটু ভেবে দেখুন—কোথায় আইনস্টাইনের $E=mc^2$ সমীকরণের নিরিবিলি গবেষণা, কোথায় জর্জ স্টিফেনসনের রেল ইঞ্জিন নিয়ে উন্মাদনা, আর কোথায় শ্যাম্পোলিয়নের প্রাচীন মিশরের রহস্য উন্মোচন! সবকিছু একই সুতোয় গাঁথা। আমাদের এই বাংলায় রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার, ভগৎ সিংয়ের দেশপ্রেম, সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্য কিংবা আনিসুল হকের আধুনিক নগরের স্বপ্ন—সবই আসলে আমাদের বৃহত্তর মানব সভ্যতারই একেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়। ক্যালেন্ডারের পাতায় ২৭শে সেপ্টেম্বর নিছক কোনো দিন নয়; এটি আমাদের বৈশ্বিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত ক্যানভাস।

