২৯ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের এই দিনে – বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী

সর্বাধিক আলোচিত

ইতিহাসের পাতায় প্রতিটি দিনেরই নিজস্ব একটা আলাদা গল্প থাকে, আর ২৯শে সেপ্টেম্বর দিনটিও তার ব্যতিক্রম নয়। বড়সড় কোনো ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে বিখ্যাত মানুষদের জন্ম-মৃত্যু, কিংবা বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া নানা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা—সব মিলিয়ে এই দিনটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার নানা উত্থান-পতনের কাহিনি।

আপনি যদি ইতিহাসের বাঁকগুলো খুঁজতে ভালোবাসেন, তবে ২৯শে সেপ্টেম্বরের এই ঘটনাবলি আপনাকে নিরাশ করবে না। চলুন, ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখে নেওয়া যাক এই দিনটিতে কী কী ঘটেছিল।

বাঙালির ইতিহাস ও উপমহাদেশের প্রেক্ষাপট

২৯শে সেপ্টেম্বরের দিকে ফিরে তাকালে বাংলা তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের এক অন্যরকম ছবি ফুটে ওঠে। একদিকে যেমন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ, অন্যদিকে ক্রীড়া ও বিজ্ঞানে নতুন পথের সূচনা, এমনকি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও রচিত হয়েছিল এই দিনে।

ঐতিহাসিক মাইলফলক

  • ১৯১৪ – বজবজে কোমাগাতা মারু ট্র্যাজেডি: কানাডার বৈষম্যমূলক অভিবাসন আইনের প্রতিবাদ জানাতে গুরদিত সিংয়ের নেতৃত্বে জাপানি স্টিমার ‘কোমাগাতা মারু’ পাড়ি দিয়েছিল ভ্যাঙ্কুভারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে জাহাজটি যখন কলকাতার কাছে বজবজ বন্দরে ফিরে আসে, তখন ব্রিটিশ পুলিশ জোর করে যাত্রীদের পাঞ্জাবগামী একটি বিশেষ ট্রেনে তোলার চেষ্টা করে। যাত্রীরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে ব্রিটিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই ২০ জন নিরীহ যাত্রী প্রাণ হারান এবং বহু মানুষকে বন্দি করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সমগ্র বাংলা ও উত্তর ভারতে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা পরবর্তীকালে গদর আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছিল।
  • ১৯৪২ – মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মোৎসর্গ (ভারত ছাড়ো আন্দোলন): মহাত্মা গান্ধীর ডাকে তখন সারা দেশে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ঢেউ। এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরে ৭২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা, যাঁকে আমরা ‘গান্ধী বুড়ি’ নামে চিনি, প্রায় ৬,০০০ মানুষের এক বিশাল ও শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে তমলুক থানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকা। ব্রিটিশ পুলিশ এই নিরস্ত্র মিছিলের ওপর গুলি চালায়। একাধিক গুলি শরীরে বিদ্ধ হওয়ার পরও এই বীরাঙ্গনা নারী একটুও পিছিয়ে যাননি। মাটি লুটিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল—”বন্দে মাতরম”। ইতিহাসে তাঁর এই আত্মত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
  • ১৯৫৯ – আরতি সাহার ইংলিশ চ্যানেল জয়: মাত্র ১৯ বছর বয়সী বাঙালি সাঁতারু আরতি সাহা এক অসাধ্য সাধন করেন। ফ্রান্সের কেপ গ্রিস-নেজ থেকে ইংল্যান্ডের স্যান্ডগেট পর্যন্ত ৪২ মাইল পথ মাত্র ১৬ ঘণ্টা ২০ মিনিটে সাঁতরে পার হন তিনি। আরতি সাহাই প্রথম এশীয় নারী যিনি এমন এক কঠিন ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এই অসাধারণ কীর্তির জন্য ১৯৬০ সালে তিনি ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ লাভ করেন, যা কোনো নারী ক্রীড়াবিদের জন্য ছিল প্রথম।
  • ১৯৬২ – এম. পি. বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের উদ্বোধন: কলকাতার চৌরঙ্গী রোডে উদ্বোধন করা হয় এম. পি. বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম। এটি শুধু ভারতের প্রথম বড় মাপের তারামণ্ডলই ছিল না, এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম তারামণ্ডল হিসেবে পূর্ব ভারতে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।
  • ১৯৭৭ – ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা জল চুক্তি: নয়াদিল্লিতে ভারত ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার জল বণ্টন সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে জলের ন্যায্য বণ্টনের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়, যা দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে জল কূটনীতির ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
  • ২০১৬ – ভারতীয় সেনাবাহিনীর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক: জম্মু ও কাশ্মীরের উরিতে মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার ঠিক এগারো দিন পর, ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘোষণা করে যে তারা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) পেরিয়ে জঙ্গি ঘাঁটিগুলোর ওপর সফল সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা ও সামরিক কৌশলে এটি ছিল এক বড় মাপের পরিবর্তন।

আঞ্চলিক খ্যাতিমানদের জন্ম ও প্রয়াণ

জন্ম:

  • মুবারক আলী খান দ্বিতীয় (১৮১০ – ১৮৩৮): বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব। মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত ‘হাজারদুয়ারি প্রাসাদ’ নির্মাণের জন্য তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। স্থপতি ডানকান ম্যাকলিওডের নকশায় তৈরি এই প্রাসাদ আজও পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
  • হামিদ দলওয়াই (১৯৩২ – ১৯৭৭): মহারাষ্ট্রের এই সমাজ সংস্কারক ও লেখক স্বাধীন ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার এবং ইসলামি সমাজে প্রগতিশীল সংস্কারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন।
  • তাপস পাল (১৯৫৮ – ২০২০): আশির দশকের তুমুল জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেতা এবং পরবর্তীকালে রাজনীতিবিদ। ‘দাদার কীর্তি’ (১৯৮০) দিয়ে তাঁর রুপোলি পর্দায় অভিষেক এবং ‘সাহেব’, ‘নিশান্তনে’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

মৃত্যু:

  • মাতঙ্গিনী হাজরা (১৮৭০ – ১৯৪২): তমলুকে ব্রিটিশের গুলিতে শহীদ হওয়া এই বিপ্লবী নারীর কথা আগেই বলা হয়েছে। কলকাতার ময়দানসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তাঁর মূর্তি আজও তাঁর বীরত্বের সাক্ষ্য বহন করে।
  • ওস্তাদ ইউনুস হুসেন খান (১৯২৭ – ১৯৯১): আগ্রা ঘরানার প্রবাদপ্রতিম ধ্রুপদী গায়ক এবং সুরকার। ঐতিহ্যবাহী হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের (বন্দিশ) ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

আন্তর্জাতিক দিবস ও উদযাপন

আন্তর্জাতিক দিবস ও বিশ্বব্যাপী উদযাপন

শুধু আঞ্চলিক নয়, বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ২৯শে সেপ্টেম্বর পালন করা হয়:

  • বিশ্ব হার্ট দিবস: ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ উদ্যোগে পালিত এই দিনটি হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রচারণা। জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে কীভাবে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়, তা নিয়ে মানুষকে সচেতন করাই এই দিনের মূল লক্ষ্য।
  • আন্তর্জাতিক খাদ্য অপচয় রোধ দিবস: জাতিসংঘ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) যৌথ উদ্যোগে এই দিনটি পালিত হয়। পৃথিবীতে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই নষ্ট বা অপচয় হয়—এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিশ্ববাসীকে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়।
  • মাইকেলমাস (সেন্ট মাইকেল ও সকল ফেরেশতাদের ভোজ): পশ্চিমা খ্রিস্টানদের ক্যালেন্ডারে এটি একটি বড় উৎসব। ব্রিটেন এবং ইউরোপে ঐতিহাসিকভাবে এটি আর্থিক বছরের চারটি ‘কোয়ার্টার ডে’-র একটি হিসেবে পালিত হতো, যা শরতের শুরু, নতুন ইজারা চুক্তি এবং শিক্ষাবর্ষের সূচনার প্রতীক।
  • ব্রুনেই – সংবিধান দিবস: ১৯৫৯ সালের এই দিনে ব্রুনেই তাদের প্রথম লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন লাভ করে এবং একটি স্বাধীন সুলতানাত হিসেবে নিজেদের ভিত্তি মজবুত করে।

বিশ্ব ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ঘটনাবলি

২৯শে সেপ্টেম্বরের দিনটি বিশ্বের নানা প্রান্তে রাজনীতি, মহাকাশ বিজ্ঞান এবং যুদ্ধের মতো বড় বড় ঘটনাগুলোর সাক্ষী হয়ে আছে।

আমেরিকা মহাদেশ:

  • ১৯১৫ – প্রথম ট্রান্সকন্টিনেন্টাল ওয়্যারলেস স্পিচ: এটিঅ্যান্ডটি (AT&T) প্রথমবারের মতো রেডিও টেলিফোনের মাধ্যমে মানুষের কণ্ঠস্বর সফলভাবে সম্প্রচার করে। ভার্জিনিয়া থেকে ক্যালিফোর্নিয়া হয়ে সেই শব্দ পৌঁছায় হাওয়াই পর্যন্ত। টেলিযোগাযোগের ইতিহাসে এটি ছিল এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
  • ১৯৮২ – ‘চিয়ার্স’ নাটকের প্রিমিয়ার: মার্কিন টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় সিটকম ‘চিয়ার্স’-এর প্রথম পর্ব এনবিসি-তে সম্প্রচারিত হয়। বোস্টনের একটি বারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ধারাবাহিকটি টানা ১১টি সিজন ধরে চলে এবং ২৮টি এমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়।
  • ২০০৫ – জন রবার্টস প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিশ্চিত: উইলিয়াম রেহনকুইস্টের মৃত্যুর পর মার্কিন সিনেট জন জি. রবার্টস জুনিয়রকে সুপ্রিম কোর্টের ১৭তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ চূড়ান্ত করে।
  • ২০০৮ – ওয়াল স্ট্রিটের ধস: ইউএস হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস প্রাথমিক ইমার্জেন্সি ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন অ্যাক্ট (TARP) প্রত্যাখ্যান করার পর ডাউ জোন্স সূচক এক দিনেই ৭৭৭.৬৮ পয়েন্ট পড়ে যায়। সেই সময়ের নিরিখে এটি ছিল এক দিনে সবচেয়ে বড় দরপতন, যা বিশ্বজুড়ে মহামন্দার (Great Recession) অশনি সংকেত দিয়েছিল।

রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়ন:

  • ১৯৫৭ – কিশটিম পারমাণবিক বিপর্যয়: সোভিয়েত ইউনিয়নের ওজিওর্স্কে মায়াক পারমাণবিক চুল্লির বর্জ্য সংরক্ষণ ট্যাঙ্কে শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার কারণে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে এবং ২ লক্ষ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চেরনোবিল এবং ফুকুশিমার পর এটি ইতিহাসের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক দুর্ঘটনা।
  • ১৯৭৭ – স্যালিয়ুট ৬-এর উৎক্ষেপণ: সোভিয়েত ইউনিয়ন সফলভাবে তাদের মহাকাশ স্টেশন ‘স্যালিয়ুট ৬’ পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠায়। এর দুটি ডকিং পোর্টের কারণে একই সাথে একাধিক মহাকাশযান যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা মহাকাশে দীর্ঘ সময় মানুষের বসবাসের পথ প্রশস্ত করেছিল।

চীন ও পূর্ব এশিয়া:

  • ১৯৫৪ – চীন-সোভিয়েত শীর্ষ সম্মেলন: সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ মাও সেতুংয়ের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার জন্য বেইজিং পৌঁছান। যদিও উদ্দেশ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক ঐক্য মজবুত করা, কিন্তু এই বৈঠকের অর্থনৈতিক ও আদর্শগত মতবিরোধই পরবর্তীকালে চীন-সোভিয়েত বিভাজনের বীজ বপন করেছিল।
  • ১৯৭২ – চীন-জাপান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ: জাপানের প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকা এবং চীনের প্রিমিয়ার চৌ এনলাই বেইজিংয়ে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের যুদ্ধাবস্থার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে এবং নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ:

  • ১৮২৯ – মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠন: লন্ডনের রাস্তায় প্রথমবারের মতো সাধারণ পোশাকে পুলিশ টহল দিতে শুরু করে। হোম সেক্রেটারি স্যার রবার্ট পিলের উদ্যোগে তৈরি এই বাহিনী ‘ববি’ বা ‘পিলার’ নামে পরিচিত হয়। জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে আধুনিক বেসামরিক পুলিশি ব্যবস্থার এটাই ছিল প্রথম রূপ।
  • ১৯১৮ – হিন্ডেনবার্গ লাইনে মিত্রবাহিনীর সাফল্য: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান এবং আমেরিকান বাহিনী জার্মান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সুরক্ষিত হিন্ডেনবার্গ লাইনে চূড়ান্ত আঘাত হানে। এই আক্রমণ জার্মানির প্রতিরোধ ভেঙে দেয় এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ত্বরান্বিত করে।
  • ১১৮৭ – জেরুজালেম অবরোধ শুরু: ক্রুসেডারদের হাতে থাকা জেরুজালেম শহর চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে সুলতান সালাদিনের নেতৃত্বাধীন আইয়ুবীয় বাহিনী। ২ অক্টোবর শহরটি বিনা রক্তপাতে আত্মসমর্পণ করে, যার ফলে জেরুজালেমে ক্রুসেডারদের ৮৮ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
  • ১৯৩৮ – মিউনিখ চুক্তি: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এদোয়ার্দ দালাদিয়ে, হিটলার এবং মুসোলিনি মিউনিখে বৈঠকে বসেন। ৩০শে সেপ্টেম্বর ভোরে তারা একটি চুক্তিতে সই করেন, যেখানে যুদ্ধ এড়ানোর মরিয়া আশায় চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড নাৎসি জার্মানির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
  • ১৯৪১ – বাবি ইয়ার গণহত্যা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম অন্ধকারতম অধ্যায়। ইউক্রেনের কিয়েভের কাছে বাবি ইয়ার উপত্যকায় জার্মান বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা মাত্র দু’দিনে ৩৩,০০০-এর বেশি নিরপরাধ ইহুদিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হলোকাস্টের ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ একক গণহত্যা।

কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও অন্যান্য:

  • ১৯৬২ – কানাডার ‘অ্যালোয়েট ১’ উৎক্ষেপণ: সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে কানাডা তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠায়। পৃথিবীর আয়নোস্ফিয়ার নিয়ে গবেষণার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল।
  • ১৯৮৮ – অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়া ঐতিহ্য উদযাপন: ১৮৯৬ সালের আধুনিক অলিম্পিকের শুরু থেকে প্রতিটি গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী মাত্র দুটি দেশের একটি হলো অস্ট্রেলিয়া। এই দিনটিতে তাদের সেই অসামান্য ক্রীড়া ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো হয়।
  • ১৯১১ – ইতালি-তুরস্ক যুদ্ধ শুরু: অটোমান সাম্রাজ্যের প্রদেশ ত্রিপোলিতানিয়া এবং সিরেনাইকা (বর্তমান লিবিয়া) দখলের উদ্দেশ্যে ইতালি যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামরিক পর্যবেক্ষন এবং বোমা হামলার কাজে বিমানের ব্যবহার করা হয়েছিল।
  • ১৯৩২ – বোকেড়ন যুদ্ধের সমাপ্তি: টানা তিন সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী অবরোধের পর বলিভিয়ার হাত থেকে ফোর্টিন বোকেড়ন দখল করে প্যারাগুয়ের বাহিনী। এটি ছিল চাকো যুদ্ধের (১৯৩২-১৯৩৫) প্রথম বড় লড়াই, যা বিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।

বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বদের জন্ম ও মৃত্যু

এই দিনটিতে যেমন অনেক গুণী মানুষের জন্ম হয়েছে, তেমনই আমরা হারিয়েছি অনেক কিংবদন্তিকে।

বিখ্যাত জন্ম:

  • মিগুয়েল দে সার্ভান্তেস (১৫৪৭ – ১৬১৬): স্প্যানিশ সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ডন কুইক্সোট’কে বিশ্বের প্রথম আধুনিক উপন্যাস এবং পশ্চিমা সাহিত্যের অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।
  • কারাভাজ্জিও (১৫৭১ – ১৬১০): ইতালীয় চিত্রশিল্পী। আলো-আঁধারির খেলায় (chiaroscuro) মানুষের বাস্তব রূপকে তিনি যেভাবে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা গোটা ইউরোপের বারোক শিল্পকলায় বিপ্লব এনেছিল।
  • অ্যাডমিরাল হোরাশিও নেলসন (১৭৫৮ – ১৮০৫): ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কিংবদন্তি কমান্ডার। তাঁর অসাধারণ রণকৌশলের কাছে নেপোলিয়নের বাহিনী বারবার পরাজিত হয়েছিল। ট্রাফালগারের যুদ্ধে তিনি বীরের মতো প্রাণ বিসর্জন দেন।
  • এনরিকো ফার্মি (১৯০১ – ১৯৫৪): পারমাণবিক যুগের স্থপতি হিসেবে পরিচিত এই ইতালীয়-মার্কিন পদার্থবিদ বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান।
  • জিন অট্রি (১৯০৭ – ১৯৯৮): ‘দ্য সিংগিং কাউবয়’ নামে পরিচিত এই মার্কিন তারকা রেডিও, সিনেমা এবং টেলিভিশনে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন। হলিউড ওয়াক অফ ফেমে একমাত্র তাঁরই পাঁচটি তারা রয়েছে।
  • মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি (১৯১২ – ২০০৭): আধুনিকতাবাদী ইতালীয় চলচ্চিত্র পরিচালক। ‘ল’অ্যাভেঞ্চুরা’ এবং ‘ব্লো-আপ’-এর মতো সিনেমার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধরনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন।
  • জেরি লি লুইস (১৯৩৫ – ২০২২): ‘দ্য কিলার’ খ্যাত মার্কিন গায়ক ও পিয়ানোবাদক। রক অ্যান্ড রোল মিউজিকের অন্যতম এই পথিকৃৎ তাঁর উদ্দাম পারফরম্যান্সের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বিখ্যাত মৃত্যু:

  • পম্পেই দ্য গ্রেট (১০৬ খ্রি.পূ. – ৪৮ খ্রি.পূ.): রোমান প্রজাতন্ত্র থেকে সাম্রাজ্যে পরিণত হওয়ার পেছনে এই রোমান সেনাপতির বড় ভূমিকা ছিল। জুলিয়াস সিজারের কাছে যুদ্ধে হেরে মিশরে পালিয়ে যাওয়ার পর পৌঁছানো মাত্রই তাঁকে গুপ্তহত্যা করা হয়।
  • এমিল জোলা (১৮৪০ – ১৯০২): ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম সেরা ঔপন্যাসিক। বিখ্যাত ‘ড্রেফাস অ্যাফেয়ার্স’-এর সময় ফরাসি সমাজের ভেতরের ইহুদি-বিদ্বেষ নিয়ে তাঁর খোলা চিঠি “J’Accuse…!” ইতিহাস হয়ে আছে। নিজ বাড়িতে কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়।
  • রুডলফ ডিজেল (১৮৫৮ – ১৯১৩): জার্মান প্রকৌশলী, যাঁর নামেই ‘ডিজেল ইঞ্জিন’-এর নামকরণ করা হয়েছে। নর্থ সি পাড়ি দেওয়ার সময় এক রাতে স্টিমার থেকে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান।
  • ডব্লিউ. এইচ. অডেন (১৯০৭ – ১৯৭৩): বিখ্যাত অ্যাংলো-আমেরিকান কবি, যাঁর লেখা প্রেম, রাজনীতি ও মনস্তত্ত্বের গভীরতা বিংশ শতাব্দীর কবিতায় এক স্থায়ী প্রভাব ফেলে গেছে।
  • রয় লিচেনস্টাইন (১৯২৩ – ১৯৯৭): পপ আর্ট মুভমেন্টের অন্যতম পুরোধা। কমিক-স্ট্রিপ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আঁকা তাঁর ছবিগুলো আজও সমকালীন শিল্পের অন্যতম সেরা উদাহরণ।

ইতিহাসের অজানা কিছু তথ্য (Did You Know?)

  • রুডলফ ডিজেলের রহস্যজনক অন্তর্ধান: ১৯১৩ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর রাতে জার্মান আবিষ্কারক রুডলফ ডিজেল একটি মিটিংয়ে যোগ দিতে ‘এসএস ড্রেসডেন’ নামের জাহাজে চড়ে অ্যান্টওয়ার্প থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। রাত ১০টার দিকে তিনি নিজের কেবিনে ঘুমাতে যান এবং সকালে ডাকতে বলেন। এরপর তাঁকে আর জীবিত দেখা যায়নি। দশ দিন পর সমুদ্রে তাঁর মৃতদেহ ভাসতে দেখা যায়। তিনি কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি ব্যবসায়িক শত্রুতার জেরে তাঁকে খুন করা হয়েছিল—সেই রহস্যের জট আজও খোলেনি।
  • টপ হ্যাট পরা পুলিশ: ১৮২৯ সালে যখন লন্ডনে প্রথম মেট্রোপলিটন পুলিশ টহল দেওয়া শুরু করে, তখন তাদের ইউনিফর্ম ছিল গাঢ় নীল রঙের কোট এবং মাথায় লম্বা ‘টপ হ্যাট’। সামরিক বাহিনীর লাল কোটের থেকে পুলিশকে আলাদা করে তুলে ধরতেই এই পোশাক বেছে নেওয়া হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ পুলিশকে নিজেদের লোক বলে ভরসা করতে পারে।
  • লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক বিপর্যয়: ১৯৫৭ সালের কিশটিম বিস্ফোরণের ভয়াবহতা সোভিয়েত সরকার প্রায় ২০ বছর ধরে গোটা বিশ্ব থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। চিকিৎসার দোহাই দিয়ে তারা গোপনে ১০ হাজার মানুষকে সরিয়ে ফেলে এবং বহু গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। ১৯৭৬ সালে এক নির্বাসিত সোভিয়েত বিজ্ঞানী বিষয়টি ফাঁস করলে দুনিয়াবাসী এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ের কথা জানতে পারে।

শেষ কথা

২৯শে সেপ্টেম্বরের পাতাগুলো যেন বারবার প্রমাণ করে দেয় যে মানুষের সাহস, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং আর্থ-সামাজিক পালাবদল কীভাবে একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। বাংলার মাটিতে মাতঙ্গিনী হাজরার অকুতোভয় আত্মত্যাগ কিংবা কোমাগাতা মারুর মর্মান্তিক পরিণতি থেকে শুরু করে সার্ভান্তেসের কালজয়ী সাহিত্য অথবা এনরিকো ফার্মির পারমাণবিক গবেষণা—এই দিনটি একাধারে মানুষের ধ্বংস ও সৃষ্টির ক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।

ইতিহাসের এই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা বুঝতে পারি, এগুলো কেবল পুরোনো ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়। আজকের দিনের জটিল জলবণ্টন চুক্তি, বিশ্ব হার্ট দিবসের মতো স্বাস্থ্য সচেতনতা, কিংবা সমানাধিকারের জন্য লড়াই—এসব কিছুর বীজ পোঁতা আছে অতীতের এই দিনগুলোতেই। এই ঐতিহাসিক স্মৃতিগুলো আমাদের শুধু অতীতকেই চেনায় না, বরং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সঠিক পথটি বেছে নিতেও সাহায্য করে।

সর্বশেষ