ঘুমের সময় নাক ডাকা বন্ধ হচ্ছে না? আসল শত্রু কি ভিটামিন ডি এর অভাব?

সর্বাধিক আলোচিত

নাক ডাকা আমাদের সমাজে একটি খুব সাধারণ ব্যাপার। পরিবারে বা বন্ধুদের আড্ডায় নাক ডাকা নিয়ে হাসাহাসি হয় প্রচুর। অনেকেই মনে করেন এটি কেবল গভীর ঘুমের লক্ষণ। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। নাক ডাকা মোটেও শান্তির ঘুমের লক্ষণ নয় বরং এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো সমস্যার সতর্কবার্তা হতে পারে।

সাধারণত ওজন বেড়ে যাওয়া বা সর্দি লাগাকে নাক ডাকার প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সম্প্রতি স্বাস্থ্য গবেষকরা একটি নতুন এবং চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন। আপনার এই বিরক্তিকর নাক ডাকার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি নীরব ঘাতক, আর তা হলো ভিটামিন ডি এর অভাব। একজন স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ হিসেবে এই বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। চলুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে জেনে নেওয়া যাক নাক ডাকার সাথে ভিটামিন ডি এর আসল সম্পর্কটি কোথায় এবং কীভাবে এর সমাধান করা সম্ভব।

নাক ডাকার সাধারণ কারণগুলো কী কী?

ভিটামিন ডি এর প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের জানা দরকার সাধারণত মানুষ কেন নাক ডাকে। ঘুমের সময় যখন আমাদের গলার পেছনের পেশিগুলো শিথিল হয়ে যায় তখন শ্বাসনালী কিছুটা সরু হয়ে আসে। এই সরু পথ দিয়ে বাতাস চলাচলের সময় গলার নরম টিস্যুগুলোতে কাঁপুনি বা ভাইব্রেশন তৈরি হয়। এই ভাইব্রেশন থেকেই নাক ডাকার শব্দ উৎপন্ন হয়।

Cause of Snoring

নাক ডাকার প্রধান কারণগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

কারণ কীভাবে নাক ডাকার সৃষ্টি করে
অতিরিক্ত ওজন গলার চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে শ্বাসনালীতে চাপ পড়ে এবং পথ সরু হয়ে যায়।
ঘুমের ভঙ্গি চিত হয়ে ঘুমালে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে গলার পেশি ও জিহ্বা পেছনের দিকে হেলে শ্বাসনালী আটকে দেয়।
অ্যালার্জি বা সর্দি নাক বন্ধ থাকলে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হয় যা গলার টিস্যুতে ঘর্ষণ ও শব্দের সৃষ্টি করে।
ধূমপান ও অ্যালকোহল এগুলো গলার পেশিকে অতিরিক্ত শিথিল করে দেয় এবং শ্বাসনালীতে প্রদাহ বা ফোলাভাব তৈরি করে।

সাধারণ কারণের বাইরে অন্য কিছু ভাবার সময়

এই কারণগুলো আমাদের সবারই কমবেশি জানা। কিন্তু যারা ওজন নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, ধূমপান করেন না এবং কাত হয়ে ঘুমানোর পরও নাক ডাকছেন তাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা কোথায়? এখানেই স্বাস্থ্য গবেষকরা ভিটামিন ডি এর অভাবের দিকে আঙুল তুলছেন।

ভিটামিন ডি কী এবং শরীরে এর ভূমিকা

ভিটামিন ডি কে বলা হয় সানশাইন ভিটামিন। এটি মূলত একটি ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন যা আমাদের শরীরে হরমোনের মতো কাজ করে। সূর্যের আলো যখন আমাদের ত্বকে পড়ে তখন শরীর প্রাকৃতিকভাবেই এই ভিটামিন তৈরি করতে পারে।

আমাদের শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষেই ভিটামিন ডি এর রিসেপ্টর রয়েছে। হাড় মজবুত করা এবং ক্যালসিয়াম শোষণে এর ভূমিকার কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এর বাইরেও ভিটামিন ডি এর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। প্রথমত এটি আমাদের পেশির স্বাভাবিক শক্তি ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখে। দ্বিতীয়ত এটি শরীরের যেকোনো ধরনের প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন কমাতে সাহায্য করে। আর এই দুটি কাজের সাথেই নাক ডাকার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

ভিটামিন ডি এর অভাব এবং নাক ডাকার সম্পর্ক

ভিটামিন ডি এর ঘাটতি কীভাবে আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় এবং নাক ডাকার শব্দ তৈরি করে তার একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে। বিষয়টি মোটেও জাদুর মতো কিছু নয় বরং সম্পূর্ণ শারীরবৃত্তীয় একটি প্রক্রিয়া।

পেশির দুর্বলতা এবং শ্বাসনালীর সংকোচন

ভিটামিন ডি আমাদের পেশির শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। গলার ভেতরে ফ্যারিঞ্জিয়াল পেশি নামের এক ধরনের পেশি থাকে যা শ্বাসনালীকে খোলা রাখতে সাহায্য করে। শরীরে ভিটামিন ডি কমে গেলে এই পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ঘুমের সময় যখন শরীর শিথিল হয় তখন এই দুর্বল পেশিগুলো শ্বাসনালীকে ঠিকমতো খোলা রাখতে পারে না। শ্বাসনালী চুপসে যায় এবং শ্বাস নেওয়ার সময় টিস্যুগুলো কাঁপতে থাকে। এই কাঁপুনি থেকেই তীব্র নাক ডাকার শব্দ তৈরি হয়।

প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন বৃদ্ধি

নাক ডাকার আরেকটি বড় কারণ হলো শ্বাসনালীতে প্রদাহ। ভিটামিন ডি শরীরের প্রাকৃতিক অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান হিসেবে কাজ করে। এর অভাব হলে গলার ভেতরের টিস্যু এবং টনসিল ফুলে যেতে পারে। শ্বাসনালীর পথ এমনিতে সরু তার ওপর যদি চারপাশের টিস্যু ফুলে যায় তবে বাতাস চলাচলে মারাত্মক বাধার সৃষ্টি হয়। এর ফলে নাক ডাকা তো বটেই এমনকি স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ভয়াবহ সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বিজ্ঞান কি সত্যিই বলছে ভিটামিন ডি খেলেই নাক ডাকা বন্ধ হয়ে যাবে? উত্তর হলো, সরাসরি এমন কোনো গ্যারান্টি বিজ্ঞান দিচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যারা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বা তীব্র নাক ডাকার সমস্যায় ভুগছেন তাদের রক্তে ভিটামিন ডি এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম।

গবেষকরা মনে করেন ভিটামিন ডি এর ঘাটতি সরাসরি নাক ডাকার একমাত্র কারণ নয়। তবে এটি নাক ডাকার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং পরিস্থিতি জটিল করে। তাই শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকলে পেশিগুলো সচল থাকে এবং শ্বাসনালীর প্রদাহ কমে যা পরোক্ষভাবে নাক ডাকা কমাতে দারুণ সাহায্য করে। এটি একটি ব্যালান্সড এবং প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি কেন এত বেশি?

আমাদের দেশ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে বছরের বেশিরভাগ সময়ই প্রচুর রোদ থাকে। লজিক অনুযায়ী আমাদের ভিটামিন ডি এর অভাব হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের শহর অঞ্চলের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ ভয়াবহ ভিটামিন ডি ঘাটতিতে ভুগছেন। এর পেছনে আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রাই প্রধানত দায়ী।

রোদ এড়িয়ে চলার প্রবণতা

আমরা রোদকে ভয় পাই। রোদে পুড়ে ত্বক কালো হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমরা ছাতা ব্যবহার করি, সানস্ক্রিন মাখি এবং শরীর পুরোপুরি ঢেকে রাখি। ফলে ত্বকে সরাসরি রোদ লাগার সুযোগই থাকে না।

ইনডোর লাইফস্টাইল এবং এসির ব্যবহার

এখন বেশিরভাগ মানুষের কাজই অফিস বা ঘরের ভেতরে। সকাল বেলা যখন রোদের তেজ কম থাকে তখন আমরা অফিসে যাই বা ঘুমাই। সারাদিন এসির নিচে কাজ করে সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরি তখন আর সূর্যের আলো থাকে না। ফলে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরির কোনো সুযোগ শরীর পায় না।

খাদ্যাভ্যাস ও দূষণ

শহরের বাতাসে প্রচুর ধুলোবালি এবং দূষণ থাকে যা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকে ঠিকমতো পৃথিবীতে পৌঁছাতে দেয় না। এছাড়া আমাদের প্রতিদিনের খাবারে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ খুবই নগণ্য। সামুদ্রিক মাছ, ডিমের কুসুম বা মাশরুম আমাদের রোজকার মেন্যুতে খুব একটা থাকে না।

কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক:

ঝুঁকির তালিকা কারণ
কর্পোরেট চাকরিজীবী দিনের বেশিরভাগ সময় আবদ্ধ অফিসে কাটান বলে রোদের দেখা পান না।
বয়স্ক মানুষ বয়স বাড়ার সাথে সাথে ত্বকের ভিটামিন ডি তৈরির ক্ষমতা কমে যায়।
অতিরিক্ত ওজনের মানুষ ভিটামিন ডি ফ্যাট কোষে আটকে যায় ফলে রক্তে এর মাত্রা কমে যায়।
গর্ভবতী নারী শরীরে পুষ্টির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ঘাটতি দেখা দেয়।

কীভাবে জানবেন আপনার ভিটামিন ডি এর ঘাটতি আছে কি না?

লক্ষণ দেখে সব সময় ভিটামিন ডি এর ঘাটতি বোঝা যায় না। তবে সারাক্ষণ ক্লান্তি লাগা, পেশিতে ব্যথা, চুল পড়া এবং অবশ্যই তীব্র নাক ডাকা এর অন্যতম কিছু লক্ষণ। এটি নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় হলো রক্ত পরীক্ষা করা।

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী 25-OH Vitamin D নামের একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা করলেই আপনি জানতে পারবেন আপনার শরীরে এর মাত্রা কত। যদি মাত্রা ২০ ন্যানোগ্রাম পার মিলিলিটারের কম হয় তবে তা ঘাটতি হিসেবে ধরা হয়।

ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ নয়

অনেকেই ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট কিনে খাওয়া শুরু করেন। এটি মারাত্মক ভুল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে টক্সিসিটি বা বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর। তাই রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক মাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।

নাক ডাকা কমাতে কার্যকর লাইফস্টাইল টিপস

ভিটামিন ডি এর ঘাটতি পূরণ করার পাশাপাশি নাক ডাকা চিরতরে বন্ধ করতে কিছু অভ্যাসগত পরিবর্তন আনা জরুরি।

ঘুমের ভঙ্গিতে পরিবর্তন

কখনোই সোজা চিত হয়ে ঘুমাবেন না। এক পাশ ফিরে বা কাত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করুন। প্রয়োজনে পিঠের পেছনে একটি বালিশ দিয়ে রাখতে পারেন যেন ঘুমের ঘোরে আপনি চিত হয়ে না যান।

ওজন নিয়ন্ত্রণ

শরীরের ওজন যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয় তবে তা কমানোর উদ্যোগ নিন। গলা এবং ঘাড়ের চারপাশের চর্বি কমলে শ্বাসনালীর ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে এবং বাতাস চলাচলের পথ পরিষ্কার হবে।

ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন

ধূমপান গলার ভেতর শুষ্কতা এবং প্রদাহ তৈরি করে। আর অ্যালকোহল গলার পেশিকে অতিরিক্ত রিলাক্স করে দেয়। এই দুটি বদভ্যাস ত্যাগ করলে নাক ডাকার সমস্যা জাদুকরীভাবে কমে আসতে পারে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও রোদ পোহানো

প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট সকালের বা দুপুরের হালকা রোদে হাঁটার অভ্যাস করুন। এই সময়টায় গায়ে যেন সরাসরি রোদ লাগে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। পাশাপাশি ডিম, দুধ, মাশরুম এবং সামুদ্রিক মাছের মতো খাবার খাদ্যতালিকায় যুক্ত করুন।

সতর্কতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ

একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। শুধু ভিটামিন ডি এর সাপ্লিমেন্ট খেলেই যে আপনার নাক ডাকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। নাক ডাকার পেছনে স্লিপ অ্যাপনিয়া, নাকের হাড় বাঁকা থাকা, কিংবা থাইরয়েডের মতো জটিল সমস্যাও থাকতে পারে।

ভিটামিন ডি কেবল একটি সম্ভাব্য কারণের সমাধান মাত্র। যদি লাইফস্টাইল পরিবর্তন এবং ভিটামিন ডি এর মাত্রা ঠিক করার পরও আপনার নাক ডাকা বন্ধ না হয় তবে অবশ্যই একজন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ বা স্লিপ মেডিসিন ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন। তারা সঠিক রোগ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন।

সুন্দর ও নীরব ঘুমের নিশ্চয়তা

নাক ডাকা সমস্যাটি কেবল পাশের মানুষের ঘুমেরই ব্যাঘাত ঘটায় না, এটি আপনার নিজের স্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় ঝুঁকি। শরীরে প্রতিনিয়ত অক্সিজেনের অভাব তৈরি করে এটি আপনাকে হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই একে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। নিজের লাইফস্টাইল পরিবর্তন করুন, প্রতিদিন কিছুটা সময় রোদে কাটান এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন ডি এর মাত্রা পরীক্ষা করুন। একটু সচেতনতাই পারে আপনাকে এবং আপনার পাশের মানুষটিকে একটি সুন্দর ও নীরব ঘুমের নিশ্চয়তা দিতে।

সর্বশেষ