সবকিছু বদলাতে নেই: তৌফিক ইমরোজ খালিদী, একটি নিউজরুম এবং কিছু শাশ্বত দায়

সর্বাধিক আলোচিত

বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ তৌফিক ইমরোজ খালিদীর চিরবিদায়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি

কিছু মৃত্যু আমাদের শুধু শোকাহত করে না, কিছু মৃত্যু আমাদের পেছনে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে।

একজন মানুষ কী করেছিলেন, কতগুলো প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন কিংবা কত বছর সাংবাদিকতা করেছিলেন—সেই হিসাবের বাইরেও তখন আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে: তিনি কী রেখে গেলেন?

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সাংবাদিকতার দিকে তাকালে আমার কাছে সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

তিনি কী রেখে গেলেন?

একটি সংবাদমাধ্যম?

বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার একটি নতুন পথ?

একটি প্রজন্মের সাংবাদিক?

নাকি এমন কিছু মূল্যবোধ, যেগুলোকে আমরা দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে ক্রমেই পুরোনো বলে ভুল করতে শুরু করেছি?

সম্ভবত—সবগুলোই।

২০২৬ সালের ২ অক্টোবর লন্ডনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জীবনাবসান ঘটে। বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৯ বছর। ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা অবস্থায় ব্রেন হেমোরেজের পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার এই পথিকৃতের আকস্মিক বিদায় এমন এক সময়ে এলো, যখন তাঁর হাতে গড়া bdnews24.com মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর তার ২০ বছরের যাত্রা উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

মাত্র ঊনষাট।

একজন মানুষের জীবনের জন্যই বয়সটি কম। আর সাংবাদিকতার জন্য তো আরও কম।

কিন্তু সময়ের দৈর্ঘ্য দিয়েই সব জীবনকে মাপা যায় না।

কিছু জীবনকে মাপতে হয় তারা কতটা পথ তৈরি করে দিয়ে গেছে, তা দিয়ে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

যখন অনলাইনে সংবাদ পড়াটাই ছিল নতুন

আজ মোবাইল ফোন খুলে প্রতি মিনিটে সংবাদ পাওয়া এতটাই স্বাভাবিক যে, আমরা প্রায় ভুলে গেছি—বাংলাদেশে একটা সময় ছিল যখন ‘অনলাইন নিউজরুম’ নিজেই ছিল নতুন একটি ধারণা।

মোবাইল ইন্টারনেট ছিল শৈশবে। স্মার্টফোন তখনও মানুষের হাতে হাতে পৌঁছেনি। দিনের খবর জানার প্রধান মাধ্যম ছিল ছাপা সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও রেডিও।

সেই সময়েই তৌফিক ইমরোজ খালিদী অন্য একটি ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন।

২০০৫ সালে সংবাদ সংস্থা হিসেবে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে নতুন রূপ পায়। ২৩ অক্টোবর ২০০৬ থেকে সাধারণ পাঠকের জন্য ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সংবাদ প্রকাশ শুরু করে bdnews24.com। প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম ২৪/৭ ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ প্রকাশক হিসেবে বর্ণনা করে; স্বাধীন সংবাদ সংস্থা UNB-ও খালিদীকে বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার একজন পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

আজ থেকে বিশ বছর আগে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বোঝার জন্য সেই সময়টিকে মনে করতে হবে।

তখন একটি নিউজরুম থেকে কেউ যদি বলতেন, মানুষ একদিন রাস্তায় চলতে চলতে মোবাইল ফোনে সংবাদ পড়বে, সেটি অনেকের কাছেই ভবিষ্যতের গল্প মনে হতে পারত।

তাঁর সাবেক সহকর্মীদের স্মৃতিচারণেও এমন একটি ঘটনা এসেছে। ২০০৭ সালের দিকে খালিদী বলতেন, তিনি চান মানুষ ফোনেই bdnews24.com পড়ুক। সহকর্মীদের কারও কারও কাছে তখন ধারণাটি অবাস্তব মনে হয়েছিল।

সময় দেখিয়েছে, তিনি ভবিষ্যৎটি ভুল দেখেননি।

কিন্তু শুধু প্রযুক্তি আগে দেখতে পাওয়া তাঁকে আলাদা করেনি।

আমার কাছে তাঁর বড় অবদান অন্য জায়গায়।

তিনি প্রযুক্তি বদলেছিলেন, কিন্তু সাংবাদিকতার ভিত্তিটা বদলাতে চাননি।

দ্রুততার আগে বিশ্বাসযোগ্যতা

অনলাইন সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি গতি।

আবার সবচেয়ে বড় বিপদও সম্ভবত এই গতি।

একটি খবর প্রকাশে কয়েক মিনিট দেরি হলে হয়তো প্রতিযোগী এগিয়ে যাবে। ফলে এখন অনেক নিউজরুমেই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—‘খবরটা আগে কে দিল?’

কিন্তু এর চেয়েও জরুরি প্রশ্ন আছে।

খবরটা ঠিক কে দিল?

এই জায়গাতেই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতার দর্শনের গুরুত্ব।

তাঁর সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে বারবার উঠে এসেছে তথ্যের উৎস উল্লেখ করা, যাচাই করা এবং একটি খবরকে পেশাদার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করার বিষয়ে তাঁর কঠোরতার কথা। bdnews24.com-এর newsroom culture-এ attribution—অর্থাৎ তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে তা স্পষ্ট করার বিষয়টিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

বিষয়টি বাইরে থেকে খুব ছোট মনে হতে পারে।

কিন্তু সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা আসলে এই ছোট ছোট জায়গাতেই তৈরি হয়।

‘একটি সূত্র জানিয়েছে’ বললেই কি যথেষ্ট?

সূত্রটি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

একটি অভিযোগের বিপরীত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি?

সংখ্যাটি কোথা থেকে এলো?

একটি ছবি কখনকার?

ভিডিওটি সত্যিই ওই ঘটনার কি না?

যে বক্তব্যটি শিরোনামে যাচ্ছে, মানুষটি সত্যিই সেটি বলেছেন কি না?

আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কয়েক সেকেন্ডে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের যুগে এই প্রশ্নগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতার পুরোনো একটি শিক্ষা এখন বরং আরও আধুনিক মনে হয়—

আগে হওয়া গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সঠিক হওয়া তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি নিউজরুম আসলে কী?

সংবাদপত্রের পাঠক সাধারণত একজন সম্পাদককে প্রতিদিন দেখতে পান না।

তিনি সব খবর লেখেন না।

সব সাক্ষাৎকার নেন না।

প্রতিটি ছবি তোলেন না।

প্রতিটি শিরোনামও তাঁর হাতে লেখা হয় না।

তারপরও একটি ভালো সংবাদমাধ্যমে সম্পাদকের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

সেটি পাওয়া যায় তার newsroom culture-এ।

কোনো খবরের পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে সেটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তে।

নিজের পছন্দের মানুষ সম্পর্কে অস্বস্তিকর তথ্যও প্রকাশ করার সাহসে।

নিজের অপছন্দের মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেও যাচাই ছাড়া সেটি না ছাপানোর পেশাদারিত্বে।

একজন সম্পাদক শেষ পর্যন্ত শুধু সংবাদ সম্পাদনা করেন না।

তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সীমারেখা তৈরি করেন।

কোনটা সংবাদ, কোনটা গুজব।

কোনটা তথ্য, কোনটা দাবি।

কোনটা সাংবাদিকতা, আর কোনটা প্রচারণা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকারগুলোর একটি সম্ভবত এখানেই।

তাঁর সাবেক সহকর্মীরা তাঁকে এমন একজন mentor হিসেবে স্মরণ করছেন, যিনি শুধু সংবাদ কীভাবে লিখতে হয় তা শেখাননি, সাংবাদিক হিসেবে নিজের জায়গায় কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সেটিও শিখিয়েছিলেন। ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাঁর অধীনে কাজ করা এক সহকর্মী স্মরণ করেছেন, সংবেদনশীল সংবাদকে কীভাবে নিরপেক্ষ ও সংযতভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে হয়, সেটি তিনি তখন শিখেছিলেন।

এটি একজন সম্পাদকের ছোট উত্তরাধিকার নয়।

মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ‘বিট’ নয়

তৌফিক ইমরোজ খালিদী এবং bdnews24.com -এর কথা বলতে গেলে আরেকটি জায়গা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি বহুবার বাঁক নিয়েছে। সরকার পাল্টেছে, রাজনৈতিক ভাষা পাল্টেছে, ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে ইতিহাস নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা ধরনের বিতর্ক, ব্যাখ্যা ও অপব্যাখ্যা।

এই দীর্ঘ সময়ে bdnews24.com মুক্তিযুদ্ধকে তার সম্পাদকীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং সমর্থকেরা বিভিন্ন সময়ে এটিকে মুক্তিযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অবস্থানের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এখানে একটি বিষয় আলাদা করে বলা দরকার।

মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়।

এটি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস।

সেই ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং কোনো দল বা সরকারের প্রতি দায়বদ্ধতা এক বিষয় নয়।

বরং সাংবাদিকতার কাজই হলো এই দুইয়ের সীমারেখা পরিষ্কার রাখা।

একটি সরকার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে পারে; তার মানে এই নয় যে সেই সরকারের প্রতিটি কাজ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে।

একটি রাজনৈতিক দল স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে; তার মানে এই নয় যে সংবাদমাধ্যম তার ভুলের সমালোচনা করবে না।

মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দায়বদ্ধতা আর ক্ষমতার প্রতি আনুগত্যকে এক করে ফেললে সাংবাদিকতা তার স্বাধীনতা হারায়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনায় এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, নাগরিক মর্যাদা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্ন করার অধিকার—এসব মূল্যবোধ কোনো সরকার ক্ষমতায় আছে তার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।

এগুলো রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবোধ।

‘সবকিছু বদলাতে নেই’

এক সময় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরে ‘বদলে যাও, বদলে দাও’ কথাটি ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।

পরিবর্তনের আহ্বান অবশ্যই প্রয়োজনীয়।

একটি সমাজ পরিবর্তন ছাড়া এগোয় না।

সাংবাদিকতাও পরিবর্তন ছাড়া বাঁচতে পারে না।

কাগজ থেকে ওয়েব এসেছে।

ওয়েব থেকে অ্যাপ।

টেক্সটের সঙ্গে এসেছে ভিডিও, পডকাস্ট, লাইভ আপডেট।

এখন এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

আরও পরিবর্তন আসবে।

কিন্তু সেই সময়কে ঘিরে আরেকটি উচ্চারণ অনেকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে—এক ধরনের পাল্টা দর্শনের মতো:

সবকিছু বদলাতে নেই।
কিছু মূল্যবোধ ও আদর্শ শাশ্বত।

কথাটি তৌফিক ইমরোজ খালিদীর চিরবিদায়ের দিনে অদ্ভুতভাবে আরও অর্থবহ মনে হয়।

কারণ সত্যিই তো—

সবকিছু বদলানো যায় না।

সংবাদের মাধ্যম বদলাবে, সত্যের প্রয়োজন বদলাবে না।

প্রযুক্তি বদলাবে, প্রমাণের প্রয়োজন বদলাবে না।

পাঠকের অভ্যাস বদলাবে, সাংবাদিকের জবাবদিহি বদলাবে না।

ক্ষমতার মানুষ বদলাবে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার প্রয়োজন বদলাবে না।

সম্পাদক বদলাবেন, সাংবাদিক বদলাবেন, প্রতিষ্ঠানও একদিন বদলে যাবে—

কিন্তু সাংবাদিকতার মেরুদণ্ডটুকু বদলে গেলে আর সাংবাদিকতা থাকে না।

সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধ ও ক্ষমতা

সাংবাদিকতা কারও চাকরি নয়

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা কখনোই খুব সহজ পেশা ছিল না।

এ দেশের গণমাধ্যম বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক চাপ দেখেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চাপ দেখেছে, ব্যবসায়িক স্বার্থের চাপ দেখেছে, বিজ্ঞাপনদাতার চাপ দেখেছে; একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব মালিকানা কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কর্মজীবনও চাপমুক্ত ছিল না।

২০১৯ সালে একটি বিনিয়োগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান শুরু হয় এবং পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। তিনি অভিযোগগুলো ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করেছিলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক মামলা প্রত্যাহার করলে আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়। খালিদী সেই কয়েক বছরের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ্যে ‘হয়রানি’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ সালের সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও bdnews24.com কোনো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিজেদের একাকার না করার নীতি অনুসরণ করেছিল এবং এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক মূল্যও দিতে হয়েছিল। এটি তাঁর নিজের বর্ণনা; সেই সময়ের ইতিহাস বিচার করার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত সূত্র অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন আছে।

সংবাদমাধ্যম কার কাছে দায়বদ্ধ?

সরকারের কাছে?

বিরোধী দলের কাছে?

ব্যবসায়িক মালিকের কাছে?

বিজ্ঞাপনদাতার কাছে?

নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী জনমতের কাছে?

উত্তরটি হয়তো খুব পুরোনো।

প্রথমত সত্যের কাছে। তারপর পাঠকের কাছে।

সাংবাদিকতা সরকারের জনসংযোগ বিভাগ নয়।

বিরোধী দলের প্রচার বিভাগও নয়।

কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বিভাগও নয়।

আবার মানুষের আবেগকে প্রতিদিন সন্তুষ্ট রাখাও সাংবাদিকতার কাজ নয়।

কখনো কখনো একজন সাংবাদিকের কাজই হলো পাঠক যে কথা শুনতে চান না, প্রমাণ যদি সেদিকে নিয়ে যায়, সেই কথাটিও বলা।

সাহস সবসময় চিৎকার করে না

আমরা ‘সাহসী সাংবাদিকতা’ বলতে অনেক সময় খুব দৃশ্যমান কিছু কল্পনা করি।

কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন সাহসগুলো অনেক সময় পাঠক দেখতেই পান না।

সব সংবাদমাধ্যম একটি খবর দিয়ে দিয়েছে—তারপরও নিজের প্রতিবেদকের দ্বিতীয় সূত্র পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা সাহস।

একজন ক্ষমতাবান ফোন করেছেন—তারপরও সঠিক তথ্যটি না সরানো সাহস।

নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের পক্ষে যায় এমন একটি তথ্য ভুল প্রমাণিত হলে সেটি বাদ দেওয়া সাহস।

প্রতিযোগী এগিয়ে যাবে জেনেও অসম্পূর্ণ সংবাদ আটকে রাখা সাহস।

আর ভুল হয়ে গেলে প্রকাশ্যে সংশোধন করার মানসিকতাও সাহস।

সাংবাদিকতার লড়াই অনেক সময় রাস্তায় হয়।

অনেক সময় আদালতে হয়।

কিন্তু প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় লড়াইটি হয় newsroom-এর ভেতরে।

Publish বাটনে চাপ দেওয়ার ঠিক আগে।

আমাদের কি যথেষ্ট প্রমাণ আছে?

এই একটি প্রশ্নই কখনো কখনো একটি সংবাদমাধ্যমের চরিত্র বলে দেয়।

দুই দশকের সাংবাদিকতার আয়নায় একজন মানুষ

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পেশাগত জীবন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের বড় একটি রূপান্তরের সাক্ষী।

তিনি ১৯৮৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেন। কাজ করেছেন The Financial Express, The Daily Star এবং BBC World Service-এ। এরপর বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার প্রথম যুগের অন্যতম প্রধান নির্মাতা হয়ে ওঠেন। UNB-এর প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক একটি উদ্যোগে তাঁকে এশিয়া-প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়ার ১৪ জন উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবকের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

ভাবলে বিস্ময় লাগে।

যে মানুষটি সংবাদপত্রের যুগের সাংবাদিকতা করেছেন, তিনিই আবার মোবাইল ফোনে সংবাদ পড়ার ভবিষ্যৎ দেখেছেন।

এক অর্থে তাঁর কর্মজীবনের ভেতরেই বাংলাদেশের সাংবাদিকতা কাগজ থেকে স্ক্রিনে চলে এসেছে।

কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো প্রযুক্তির নয়।

মূল্যবোধের।

তাঁর অনুপস্থিতি কোথায় সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যাবে?

একটি নিউজরুমে একজন প্রধান সম্পাদক চলে গেলে তাঁর চেয়ারটি অন্য কেউ নেবেন।

সম্পাদক আসবেন।

নতুন নেতৃত্ব আসবে।

সংবাদ প্রকাশ চলবে।

সাইট আপডেট হবে।

পাঠক সকালে আবারও খবর খুলবেন।

পৃথিবী কোনো মানুষের জন্য থেমে থাকে না।

কিন্তু একজন সম্পাদকের প্রকৃত অনুপস্থিতি চেয়ারে বোঝা যায় না।

বোঝা যায় সেই মুহূর্তে, যখন নিউজরুম কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ায়।

এই সংবাদটি এখন প্রকাশ করা উচিত কি না?

চাপের মুখে শিরোনাম বদলানো হবে কি না?

প্রমাণ দুর্বল—তবু কি দেওয়া হবে?

জনপ্রিয় মতের বিপক্ষে তথ্য পাওয়া গেছে—সেটি কি প্রকাশ করা হবে?

ঠিক সেই জায়গাগুলোতেই একজন সম্পাদক বহু বছর ধরে তাঁর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিজের মানদণ্ড রেখে যান।

তাই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা সম্ভবত শুধু তাঁকে নিয়ে আবেগপূর্ণ স্মৃতিচারণ নয়।

সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হবে তাঁর ভালো কাজগুলোকে প্রতিষ্ঠানগত অভ্যাসে পরিণত করা।

তথ্যের উৎস খোঁজা।

প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত না করা।

ইতিহাসকে সুবিধামতো বদলে না দেওয়া।

ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন হারিয়ে না ফেলা।

আর নিজের বিশ্বাসের চেয়েও সত্যকে বড় করে দেখার চেষ্টা করা।

শেষ পর্যন্ত থেকে যায় কিছু নীতি

তৌফিক ইমরোজ খালিদী চলে গেলেন এমন এক সময়ে, যখন সাংবাদিকতার সামনে নতুন ও ভয়ংকর কিছু চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।

আজ একটি ভুয়া ছবি কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

একটি কৃত্রিম ভিডিও দিয়ে ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব।

মানুষ অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘খবর’ পেয়ে যায়।

ফলে সাংবাদিকতার কাজ এখন শুধু খবর পৌঁছে দেওয়া নয়।

সাংবাদিকতার কাজ এখন আরও বেশি করে বিশ্বাস করার মতো খবর খুঁজে দেওয়া।

এই সময়েই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মতো সম্পাদকদের কাজের অর্থ আরও স্পষ্ট হয়।

তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল—এ কথা বলার প্রয়োজন নেই।

কোনো সম্পাদকই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন।

কোনো সংবাদমাধ্যমও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।

বরং সাংবাদিকতার সৌন্দর্যই এখানে—সাংবাদিককেও প্রশ্ন করা যাবে, সম্পাদককেও, প্রতিষ্ঠানকেও।

তবু একজন মানুষের সামগ্রিক কাজের দিকে তাকিয়ে তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবোধকে স্বীকার করা যায়।

বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার পথ তৈরি করা।

একটি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে নেওয়া।

প্রকাশের আগে যাচাইকে গুরুত্ব দেওয়া।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সম্পাদকীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা।

অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নকে সংবাদমাধ্যমের বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখা।

এবং চাপের মধ্যেও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা।

এসবই তাঁর কর্মজীবনের আলোচনার অংশ হয়ে থাকবে।

তারপরও শেষ পর্যন্ত মনে পড়ে যায় সেই সহজ কথাটি—

সবকিছু বদলাতে নেই।

মানুষ চলে যাবে।

প্রযুক্তি বদলাবে।

একদিন হয়তো আজকের ওয়েবসাইটও থাকবে না।

নিউজরুমের ধরন বদলাবে।

সংবাদ তৈরিতে মানুষের পাশে আরও বেশি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বসবে।

কিন্তু কিছু জিনিসকে পুরোনো হতে দেওয়া যাবে না।

সত্য।
প্রমাণ।
সততা।
মানুষের মর্যাদা।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
অসাম্প্রদায়িকতা।
প্রশ্ন করার স্বাধীনতা।
এবং ক্ষমতার সামনে সাংবাদিকের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার।

এসব বদলে গেলে সাংবাদিকতার প্রযুক্তি হয়তো থাকবে, সাংবাদিকতার আত্মা থাকবে না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর চিরবিদায়ের দিনে তাই তাঁকে নিয়ে শুধু একটি শোকবাক্য লিখতে ইচ্ছা করে না।

বরং তাঁর জীবন থেকে পাওয়া একটি কথাই আগামী দিনের সাংবাদিকদের জন্য রেখে দিতে ইচ্ছা করে—

সময় বদলাবে। মাধ্যম বদলাবে। মানুষও বদলাবে।
কিন্তু সবকিছু বদলাতে নেই।
কিছু মূল্যবোধ সত্যিই শাশ্বত।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর কাজ, তাঁর নির্মিত newsroom culture এবং তাঁর রেখে যাওয়া পেশাদারিত্বের মানদণ্ড স্মরণে থাকুক।

সর্বশেষ