গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে চারপাশের পরিবেশ যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে তখন ঘরের ভেতরটাও গুমোট আকার ধারণ করে। সবার পক্ষে এয়ার কন্ডিশনার বা এসি কেনা কিংবা এর বিপুল বিদ্যুৎ বিল বহন করা সম্ভব হয় না। তাই প্রচণ্ড এই গরমে প্রশান্তি পেতে এসি ছাড়া ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল জানা থাকা অত্যন্ত জরুরি। প্রাকৃতিক কিছু পদ্ধতি এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট কিছু অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে খুব সহজেই ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সঠিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে ঘরের ভেতরের পরিবেশকে রোদ থেকে আড়াল করার মাধ্যমে আপনি একটি আরামদায়ক ও শীতল পরিবেশ তৈরি করতে পারেন।
চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নিই কীভাবে কোনো বাড়তি বৈদ্যুতিক খরচ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে আপনার ঘর শীতল রাখবেন।
১. সঠিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা বা ক্রস ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করা
গ্রীষ্মের গরমে ঘরের ভেতরটা যখন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায় তখন এসি ছাড়া ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল হিসেবে ক্রস ভেন্টিলেশন সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। ক্রস ভেন্টিলেশন বা আড়াআড়ি বায়ু চলাচল হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে ঘরের বিপরীত দিকের দুটি জানালা খোলা রাখা হয় যাতে এক দিক দিয়ে সতেজ বাতাস প্রবেশ করতে পারে এবং অন্য দিক দিয়ে ঘরের গুমোট গরম বাতাস বের হয়ে যেতে পারে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ঘরের ভেতরের বদ্ধ এবং উত্তপ্ত বাতাস খুব দ্রুত অপসারিত হয়। সঠিক সময়ে জানালা খোলা এবং বন্ধ রাখার মাধ্যমে আপনি প্রাকৃতিকভাবেই ঘরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারবেন। এটি একই সাথে আপনার ঘরের পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখে এবং বিদ্যুতের সাশ্রয় করে।
কীভাবে আড়াআড়ি বায়ু চলাচল বা ক্রস ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করবেন
দিনের বেলায় বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাইরের বাতাস অনেক গরম থাকে তাই এ সময় জানালা বন্ধ রাখা উচিত। তবে ভোরবেলা এবং সন্ধ্যার পর বাইরের তাপমাত্রা যখন কিছুটা কমে আসে তখন ঘরের বিপরীত দিকের জানালাগুলো একসাথে খুলে দিতে হবে। সন্ধ্যার পর বাইরের ঠান্ডা বাতাস ঘরে দ্রুত ঢোকানোর জন্য জানালার কাছে একটি বক্স ফ্যান বা টেবিল ফ্যান এমনভাবে সেট করুন যেন তা বাইরের ঠান্ডা বাতাস ভেতরের দিকে টানে। অন্য দিকের জানালার কাছে আরেকটি ফ্যান বাইরের দিকে মুখ করে রাখুন যা ভেতরের গরম বাতাস বাইরে বের করে দেবে। এই চক্রাকার পদ্ধতির ফলে ঘরের ভেতরের গুমোট ভাব একেবারেই কেটে যায়।
ক্রস ভেন্টিলেশন পদ্ধতির সুবিধা ও নিয়মাবলী
| সময়কাল | কাজের ধরন | মূল সুবিধা | বিশেষ সতর্কতা |
| সকাল ৫টা থেকে ৭টা | সব জানালা ও দরজা খুলে দেওয়া | রাতের জমে থাকা গুমোট বাতাস বের করে সতেজ বাতাস আনা | রোদ কড়া হওয়ার আগেই জানালা বন্ধ করে দেওয়া |
| দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা | জানালা ও পর্দা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা | বাইরের লু হাওয়া বা গরম বাতাস ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া | ভেন্টিলেটর খোলা রাখা যেতে পারে |
| সন্ধ্যা ৬টার পর | বিপরীত দিকের জানালা খোলা | বাইরের শীতল বাতাস ঘরে প্রবেশ করানো | ফ্যান ব্যবহার করে বাতাসের প্রবাহ বৃদ্ধি করা |
| সারারাত | নিরাপদ জানালা খোলা রাখা | একটানা প্রাকৃতিক শীতল বাতাস নিশ্চিত করা | মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে নেট ব্যবহার করা |
২. জানালায় তাপ প্রতিরোধী শেড বা ভারী পর্দা ব্যবহার করা
দিনের বেলায় সূর্যের আলো সরাসরি জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। এই আলো এবং বিকিরণ ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র দেয়াল এবং মেঝে উত্তপ্ত করে তোলে যা ঘরের তাপমাত্রাকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়। তাই দিনের বেলা জানালায় ভারী পর্দা টেনে রাখা ঘর ঠান্ডা রাখার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গাঢ় রঙের পর্দা তাপ বেশি শোষণ করে তাই সাদা বা হালকা রঙের পর্দা ব্যবহার করা অনেক বেশি উপকারী কারণ এগুলো সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। এই ছোট পরিবর্তনের ফলেই আপনি ঘরের ভেতরে রোদের তাপ থেকে মুক্তি পাবেন এবং বেশ স্বস্তি অনুভব করবেন।
সঠিক পর্দা নির্বাচনের উপায় ও ব্যবহারবিধি
তাপ আটকাতে সাধারণ পর্দার পাশাপাশি ব্লাইন্ডস বা বাঁশের চিক ব্যবহার করা একটি চমৎকার বুদ্ধি। বাঁশের চিক রোদের তাপ অনেকটাই আটকে দিতে সক্ষম এবং এটি ঘরের ভেতর একটি প্রাকৃতিক আবহ তৈরি করে। এছাড়া জানালায় রিফ্লেকটিভ উইন্ডো ফিল্ম বা থার্মাল ব্ল্যাকআউট পর্দা লাগানো যেতে পারে। থার্মাল পর্দাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এবং অতিরিক্ত তাপ ঘরে ঢুকতে পুরোপুরি বাধা দেয়। আপনার বর্তমান পর্দা যদি খুব পাতলা হয় তবে তার পেছনে একটি সাদা রঙের সুতির কাপড় সেলাই করে নিতে পারেন। সাদা রঙ খুব ভালোভাবে তাপ প্রতিফলিত করে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করবে।
বিভিন্ন ধরনের পর্দার কার্যকারিতা ও বৈশিষ্ট্য
| পর্দার ধরন | মূল উপাদান | কার্যকারিতা ও উপকারিতা | ব্যবহারের উপযুক্ত সময় |
| সুতির হালকা পর্দা | ১০০ শতাংশ সুতি | বাতাস চলাচল স্বাভাবিক রাখে এবং তাপ প্রতিফলিত করে | সকাল এবং বিকেল বেলা |
| বাঁশের চিক | প্রাকৃতিক বাঁশ | সরাসরি রোদ আটকে দেয় এবং পরিবেশ শীতল রাখে | দুপুরের তীব্র রোদের সময় |
| ব্ল্যাকআউট পর্দা | থার্মাল ফেব্রিক | রোদ সম্পূর্ণভাবে আটকে ঘর অন্ধকার ও ঠান্ডা রাখে | দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত |
| রিফ্লেকটিভ ফিল্ম | পলিয়েস্টার ফিল্ম | কাঁচের জানালায় লাগালে অতিবেগুনি রশ্মি প্রবেশ বন্ধ হয় | সারাদিনের জন্য স্থায়ী সমাধান |
৩. ফ্যান ও বরফ দিয়ে এসি ছাড়া ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল
ঘরে এসি না থাকলেও শুধুমাত্র একটি সাধারণ টেবিল ফ্যান এবং এক বাটি বরফ দিয়ে এসির মতো কনকনে ঠান্ডা বাতাস পাওয়া সম্ভব। এটি একটি পরীক্ষিত এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী পদ্ধতি যা প্রচণ্ড গরমে তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেতে অনেকেই ব্যবহার করেন। একটি বড় গামলা বা বাটিতে বেশ কিছু বরফের টুকরো নিয়ে স্ট্যান্ড ফ্যান বা টেবিল ফ্যানের ঠিক সামনে রাখতে হবে। ফ্যান চালু করলে বরফের ওপর দিয়ে আসা বাতাস ঘরের পরিবেশে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এসির মতো কাজ করে। ফ্যান ও বরফ দিয়ে এসি ছাড়া ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল প্রয়োগ করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরের তাপমাত্রা কমে যায়।
ডিআইওয়াই (DIY) পদ্ধতিতে শীতল বাতাস তৈরির ধাপ
প্রথমে কয়েকটি প্লাস্টিকের বড় বোতলে পানি ভরে ডিপ ফ্রিজে রেখে পুরোপুরি বরফ করে নিন। এরপর সেই বোতলগুলো একটি ট্রে বা গামলায় করে ফ্যানের সামনে এমনভাবে রাখুন যেন ফ্যানের বাতাস বোতলগুলোর গায়ে লেগে আপনার দিকে আসে। বরফ গলার সময় আশপাশের বাতাস থেকে তাপ শোষণ করে নেয় ফলে ফ্যানের বাতাস যখন এই বরফশীতল বোতলগুলোর গায়ে লেগে আসে তখন তা একদম এসির মতো ঠান্ডা অনুভূত হয়। বোতলের বরফ গলে পানিতে পরিণত হলে সেগুলো আবার ফ্রিজে রেখে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব একটি উপায় এবং এতে এসির মতো অতিরিক্ত কোনো বিদ্যুৎ খরচের চিন্তা থাকে না।
ফ্যান ও বরফ ব্যবহারের সুবিধা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ
| দিক | বিস্তারিত বিবরণ | কার্যকারিতার মাত্রা |
| প্রয়োজনীয় উপকরণ | টেবিল ফ্যান বা স্ট্যান্ড ফ্যান বড় গামলা এবং বরফ | অত্যন্ত সহজলভ্য |
| কাজের গতি | ফ্যান চালুর ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায় | অত্যন্ত দ্রুত |
| মূল সুবিধা | এসির তুলনায় খরচ নেই বললেই চলে এবং তাৎক্ষণিক প্রশান্তি দেয় | উচ্চ মাত্রায় সাশ্রয়ী |
| সীমাবদ্ধতা | বরফ গলে গেলে পরিবর্তন করতে হয় এবং প্রভাব ঘরের একটি নির্দিষ্ট অংশে থাকে | মাঝারি |
৪. ঘরে ইনডোর প্ল্যান্ট বা সতেজ গাছপালা রাখা

গাছপালা শুধুমাত্র ঘরের অন্দরমহলের সৌন্দর্যই বাড়ায় না বরং প্রাকৃতিক উপায়ে পরিবেশ শীতল রাখতেও বেশ সাহায্য করে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার সময় গাছপালা বাতাস থেকে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ত্যাগ করে। একইসাথে প্রস্বেদন বা ট্রান্সপিরেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছ তাদের পাতা দিয়ে জলীয় বাষ্প বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি ঘরের ভেতরের শুষ্ক আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং চারপাশের গরম বাতাসকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা করে। ঘরে গাছপালা লাগানোর মাধ্যমে এসি ছাড়া ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী এবং এটি বাড়ির সবার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দারুন উপকারী।
ঘর ঠান্ডা রাখে এমন কিছু উপকারী ইনডোর প্ল্যান্ট
অ্যালোভেরা ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে এবং ভেতরের তাপমাত্রা কমাতে দারুণ কাজ করে। স্নেক প্ল্যান্ট এমন একটি গাছ যা রাতের বেলাতেও অক্সিজেন ছাড়ে তাই এটি শোবার ঘরের জন্য সবচেয়ে আদর্শ একটি গাছ। এছাড়া মানি প্ল্যান্ট রাবার প্ল্যান্ট এবং বিভিন্ন ধরনের ফার্ন জাতীয় গাছ ঘরের আর্দ্রতা ধরে রেখে একটি সতেজ ও শীতল পরিবেশ তৈরি করে। এই গাছগুলো জানালার পাশে বা বারান্দার মুখে রাখলে বাইরের গরম বাতাস ঘরে ঢোকার সময় পাতার সংস্পর্শে এসে কিছুটা ঠান্ডা হয়ে যায়। গরমে গাছগুলোকে সতেজ রাখতে নিয়মিত পাতায় পানি স্প্রে করলে ফলাফল আরও চমৎকার পাওয়া যায়।
সেরা ইনডোর প্ল্যান্ট ও তাদের কার্যকারিতা
| গাছের নাম | মূল উপকারিতা | পরিচর্যা ও যত্নের নিয়ম | ঘরের জন্য উপযোগিতা |
| অ্যালোভেরা | বাতাস বিশুদ্ধ করে এবং তাপমাত্রা কমায় | সপ্তাহে একবার পানি দেওয়া এবং আলোযুক্ত স্থানে রাখা | অত্যন্ত উপকারী |
| স্নেক প্ল্যান্ট | রাতে অক্সিজেন দেয় এবং ক্ষতিকর টক্সিন দূর করে | খুব কম পানি প্রয়োজন এবং যেকোনো আলোতে বাঁচে | শোবার ঘরের জন্য সেরা |
| মানি প্ল্যান্ট | পরিবেশ শীতল রাখে এবং দেখতে সতেজ লাগে | মাটি শুকিয়ে গেলে পরিমাণমতো পানি দিতে হয় | বসার ঘরের জন্য উপযুক্ত |
| রাবার প্ল্যান্ট | বাতাসের আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং ছায়া দেয় | নিয়মিত পাতায় পানি স্প্রে করতে হয় এবং পরোক্ষ আলোতে রাখতে হয় | যেকোনো ঘরের জন্য ভালো |
৫. বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমানো ও লাইটিং পরিবর্তন
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্রায় সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র থেকেই প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হয় যা আমরা অনেক সময় খেয়াল করি না। পুরোনো মডেলের ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্ব বা সাধারণ হলুদ লাইট ঘরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেয় কারণ এর শক্তির একটি বড় অংশ আলো না হয়ে তাপ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া টেলিভিশন কম্পিউটার ইস্ত্রি ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন একটানা চলতে থাকলে ঘরের ভেতর গুমোট একটি পরিবেশ তৈরি হয়। তাই প্রয়োজন শেষে এসব যন্ত্র অবশ্যই বন্ধ করে রাখা উচিত। সঠিক অভ্যাসের মাধ্যমে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ বিল বাঁচে অন্যদিকে ঘরও ঠান্ডা থাকে।
তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্রের বিকল্প ও সঠিক ব্যবহার
পুরোনো হলুদ বাল্বের বদলে এনার্জি সেভিং এলইডি বা সিএফএল লাইট ব্যবহার শুরু করুন। এলইডি লাইট খুব কম তাপ উৎপন্ন করে আলো বেশি দেয় এবং টেকসই হয়। দিনের বেলা ঘরের ভারী কাজগুলো যেমন রান্নাবান্না বা কাপড় ইস্ত্রি করার কাজগুলো সকাল সকাল সেরে ফেলার চেষ্টা করুন যাতে দুপুরের তীব্র গরমে এই যন্ত্রগুলোর তাপ ঘরের পরিবেশ আরও খারাপ করতে না পারে। ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার কাজ শেষে স্লিপ মোডে ফেলে না রেখে পুরোপুরি শাটডাউন করে দিন। মোবাইল বা ল্যাপটপ চার্জে লাগিয়ে রাখলে চার্জার থেকে তাপ ছড়ায় তাই চার্জ পূর্ণ হলে অবশ্যই প্লাগ খুলে ফেলা ভালো।
বৈদ্যুতিক যন্ত্র ও উৎপাদিত তাপের মাত্রা
| যন্ত্রপাতির নাম | তাপ উৎপাদনের মাত্রা | বিকল্প ব্যবস্থা বা করণীয় |
| ইনক্যান্ডেসেন্ট বা হলুদ বাল্ব | অত্যন্ত বেশি (প্রায় ৯০ শতাংশ তাপ) | এলইডি বাল্ব দিয়ে দ্রুত পরিবর্তন করা |
| ডেস্কটপ কম্পিউটার | মাঝারি থেকে বেশি | ব্যবহার শেষে পুরোপুরি শাটডাউন করে প্লাগ খোলা |
| মাইক্রোওয়েভ ওভেন | খুব বেশি | দুপুরের গরমে ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং সকালে কাজ সারা |
| মোবাইল ও ল্যাপটপ চার্জার | সামান্য কিন্তু একটানা তাপ উৎপাদন করে | ব্যাটারি ফুল চার্জ হলে সুইচ বন্ধ করা এবং প্লাগ খোলা |
৬. সুতির ও হালকা রঙের বেডিং বা বিছানার চাদর ব্যবহার
গরমকালে রাতে শান্তিতে ঘুমানোর জন্য বিছানার চাদর এবং বালিশের কভারের উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সিল্ক পলিয়েস্টার বা অন্যান্য কৃত্রিম তন্তুর তৈরি চাদর শরীরের তাপ এবং ঘাম শোষণ করতে পারে না ফলে এগুলো দ্রুত গরম হয়ে যায়। এর বদলে পাতলা এবং হালকা রঙের ১০০ শতাংশ সুতির চাদর ব্যবহার করলে তা শরীরের তাপ সহজে বাইরে বের করে দিতে পারে। সুতির কাপড় খুব ভালো বাতাস চলাচল করতে দেয় এবং ঘাম শুষে নিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখে। তাই গ্রীষ্মকালে বিছানার সামগ্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাপড়ের ধরন সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আরামদায়ক ঘুমের জন্য বিছানার চাদর নির্বাচন
সুতির চাদরের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে গরমের জন্য ব্যাম্বু বেডিং অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আরামদায়ক একটি বিকল্প। বাঁশের তন্তু থেকে তৈরি এই চাদরগুলো প্রাকৃতিকভাবেই শ্বাস নিতে পারে এবং এগুলো সাধারণ সুতির চেয়েও বেশি ঘাম শোষণ করতে সক্ষম। ব্যাম্বু বেডিং গায়ে দিলে একটি শীতল অনুভূতি পাওয়া যায় যা গরমের রাতে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের জন্য খুবই উপকারী। পাশাপাশি শোবার ঘরের জন্য হালকা গোলাপি হালকা নীল বা সাদা রঙের চাদর বেছে নিন। হালকা রঙ তাপ কম ধরে রাখে এবং মানসিকভাবেও একটি প্রশান্তিকর পরিবেশ তৈরি করে যা ঘর ঠান্ডা অনুভব করতে সাহায্য করে।
বিভিন্ন বেডিং উপাদানের তুলনামূলক বিবরণ
| কাপড়ের ধরন | ঘাম শোষণ ক্ষমতা | বাতাস চলাচলের সুবিধা | গরমকালের জন্য উপযোগিতা |
| ১০০% সুতি (Cotton) | অত্যন্ত ভালো | খুব ভালো | সেরা পছন্দ |
| ব্যাম্বু বেডিং (Bamboo) | চমৎকার | সর্বোত্তম | প্রিমিয়াম এবং সবচেয়ে আরামদায়ক |
| সিল্ক (Silk) | মাঝারি | মাঝারি | খুব একটা আরামদায়ক নয় |
| পলিয়েস্টার (Polyester) | একেবারেই নেই | খুবই খারাপ | গরমের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী |
৭. ছাদ বা দেয়াল সরাসরি গরম হওয়া ঠেকাতে কার্যকরী উপায়
যাদের বাসা বাড়ির একেবারে উপরের তলায় বা যাদের টিনের চালের ঘর তাদের ক্ষেত্রে রোদ সরাসরি ছাদ উত্তপ্ত করে ফেলে। ছাদ গরম হলে সেই তাপ সিলিং হয়ে সোজা ঘরের ভেতর নেমে আসে এবং পুরো ঘরকে চুল্লির মতো গরম করে দেয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ছাদে সরাসরি রোদ পড়া আটকাতে হবে। ছাদে যদি গাছপালা বা ছাদবাগান করা যায় তবে তা সবচেয়ে ভালো প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে কাজ করে। গাছের টব এবং মাটি সরাসরি রোদকে ছাদে পড়তে দেয় না ফলে ছাদ ঠান্ডা থাকে এবং ঘরের ভেতরের তাপমাত্রাও অনেক কমে যায়।
হিট রিফ্লেকটিভ পেইন্ট এবং অন্যান্য পদ্ধতি
ছাদবাগানের সুযোগ না থাকলে ছাদের মেঝেতে সাদা রঙের হিট রিফ্লেকটিভ পেইন্ট বা চুনকাম করে দিতে পারেন। সাদা রঙ সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে দেয় ফলে ছাদ খুব বেশি উত্তপ্ত হতে পারে না। ঘরের বাইরের দেয়ালেও হালকা রঙের পেইন্ট ব্যবহার করা ভালো। টিনের চালের ক্ষেত্রে চালের নিচে ফলস সিলিং তৈরি করা যেতে পারে। ফলস সিলিং এবং মূল চালের মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গা থাকে তা তাপ কুপরিবাহী হিসেবে কাজ করে এবং ঘরের ভেতর রোদ সরাসরি আসতে বাধা দেয়। এছাড়া দুপুরের দিকে ছাদে বা বাড়ির উঠোনে পানি ছিটিয়ে দিলেও বাষ্পীভবনের কারণে পরিবেশ অনেকটাই শীতল হয়।
ছাদ ও দেয়াল ঠান্ডা রাখার বিভিন্ন পদ্ধতি
| পদ্ধতির নাম | কাজের ধরন | কার্যকারিতা |
| ছাদবাগান তৈরি করা | ছাদে গাছ লাগিয়ে ছায়ার ব্যবস্থা করা | দীর্ঘমেয়াদী এবং পরিবেশবান্ধব |
| রিফ্লেকটিভ পেইন্ট ব্যবহার | ছাদে ও দেয়ালে সাদা বা প্রতিফলক রঙ করা | রোদ প্রতিফলিত করে তাপ কমায় |
| ফলস সিলিং তৈরি | টিন বা ছাদের নিচে অতিরিক্ত আচ্ছাদন দেওয়া | সরাসরি তাপ প্রবেশে বাধা দেয় |
| পানি ছিটানো | দুপুর গড়িয়ে গেলে ছাদে পানি স্প্রে করা | বাষ্পীভবনের মাধ্যমে দ্রুত ছাদ ঠান্ডা করে |
শেষ কথা
গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহে সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকতে ঘরের পরিবেশ ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত জরুরি। উপরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা উপায়গুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করে আপনি সহজেই গরমের তীব্রতা থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে পারেন। সঠিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা জানালায় উপযুক্ত পর্দা ব্যবহার করা এবং ঘরে ইনডোর প্ল্যান্ট লাগানোর মতো ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী পরিবর্তনগুলো আপনার জীবনযাত্রায় দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পর্যায়ক্রমে তাপ উৎপাদনকারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার কমানো এবং ব্যাম্বু বেডিং বা সুতির চাদরের ব্যবহার আপনার স্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। পরিশেষে বলা যায় যে এসি ছাড়া ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল গুলো দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করলে কোনো বড় আর্থিক খরচ ছাড়াই আপনি আপনার ঘরকে শীতল সতেজ এবং আরামদায়ক রাখতে সক্ষম হবেন।

