দোলের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী: প্রাচীন শাস্ত্র ও সাহিত্যের আলোকে

সর্বাধিক আলোচিত

ভারতবর্ষের বুকে রঙের উৎসব কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তার সঠিক দিনক্ষণ নির্ণয় করা কঠিন হলেও প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য এবং ধ্রুপদী গ্রন্থগুলোতে এর সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন যুগে মানুষ প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে নিজেদের জীবনের স্পন্দনকে মিলিয়ে নিতেই এই ধরনের উৎসবের আয়োজন করত। সময়ের সাথে সাথে এই উৎসবের রূপ ও রীতিনীতিতে নানা পরিবর্তন এলেও এর অন্তর্নিহিত মূল উদ্দেশ্য—অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়—আজও সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে । নিচে প্রাচীন ভারতে এই উৎসবের বিবর্তনের কথা এবং সাহিত্যিক প্রমাণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

প্রাচীন প্রমাণ/গ্রন্থ রঙের উৎসব সম্পর্কিত ঐতিহাসিক তথ্য
অথর্ববেদ পরিশিষ্ট প্রাচীন বৈদিক যুগে দোল বা হোলির প্রথম নিয়মতান্ত্রিক এবং প্রামাণ্য উল্লেখ ।
শিলালিপি (৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) বিন্ধ্য প্রদেশের রামগড়ে প্রাপ্ত প্রাচীন শিলালিপিতে ‘হোলিকোৎসব’-এর লিখিত প্রমাণ ।
ভবিষ্য ও নারদ পুরাণ হিরণ্যকশিপু, হোলিকা, প্রহ্লাদ এবং রাক্ষসী ধুন্ধির উপাখ্যানের বিস্তারিত বর্ণনা ।
রত্নাবলী (৭ম শতাব্দী) রাজা হর্ষবর্ধন রচিত ধ্রুপদী নাটকে বসন্তোৎসব হিসেবে হোলির উল্লেখ ।
আল-বেরুনির লিপি মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের হোলি উদযাপনের ঐতিহাসিক প্রমাণ ।

বেদ ও পুরাণে রঙের উৎসবের উল্লেখ

ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, বৈদিক সাহিত্যের শেষভাগে, বিশেষ করে অথর্ববেদের পরিশিষ্টে (Atharva Veda Parishishta) সর্বপ্রথম হোলি বা দোল উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায় । প্রাচীন আর্যরা পূর্ব ভারতে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে এই উৎসব পালন করতেন। সে যুগে হোলির নাম ছিল ‘হোলাকা’ (Holaka)। জৈমিনি মীমাংসা এবং কাঠক-গৃহ্য-সূত্রেও এই উৎসবের রীতিনীতির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে । প্রাচীন যুগে বিবাহিত নারীরা তাদের পরিবারের সার্বিক মঙ্গল ও সুখ-শান্তি কামনায় রাকা পূর্ণিমায় (পূর্ণিমার চাঁদ) বিশেষ পূজা করতেন, যা পরবর্তীকালে সর্বজনীন রঙের উৎসবে রূপ নেয় ।

পরবর্তীকালে রচিত বিভিন্ন পুরাণে, বিশেষ করে নারদ পুরাণ এবং ভবিষ্য পুরাণে এই উৎসবের সাথে যুক্ত নানা কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায় । এই পুরাণগুলোতে মূলত তিনটি প্রধান কিংবদন্তির কথা বলা হয়েছে: প্রহ্লাদ ও হোলিকার উপাখ্যান, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং শিব ও কামদেবের কাহিনী । এই প্রতিটি কাহিনীই সমাজের মানুষকে কোনো না কোনোভাবে অশুভ চিন্তাধারা থেকে দূরে সরে এসে ভক্তি ও প্রেমের পথে চলার নির্দেশ দেয়।

ঐতিহাসিক শিলালিপি ও ধ্রুপদী সাহিত্যে হোলি

কেবলমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থেই নয়, ভারতের প্রাচীন ইতিহাস এবং ধ্রুপদী সাহিত্যেও হোলি বা বসন্তোৎসবের জোরালো প্রমাণ রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে বিন্ধ্য প্রদেশের রামগড়ে প্রাপ্ত ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি শিলালিপিতে ‘হোলিকোৎসব’-এর কথা স্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে । এটি প্রমাণ করে যে যিশু খ্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই ভারতে রঙের উৎসব একটি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক প্রথা ছিল ।

সপ্তম শতাব্দীতে রাজা হর্ষবর্ধন রচিত ‘রত্নাবলী’ নামক সংস্কৃত নাটকে এবং মহাকবি কালিদাসের রচনায় বসন্তোৎসব বা ‘কাম মহোৎসব’-এর কথা বলা হয়েছে । শুধু হিন্দু শাসকরাই নন, একাদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে আসা বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক আল-বেরুনি তার ঐতিহাসিক ভ্রমণকাহিনীতেও এই আনন্দমুখর উৎসবের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। অন্যান্য মুসলিম ঐতিহাসিকদের লেখাতেও পাওয়া যায় যে, মধ্যযুগে শুধুমাত্র হিন্দুরাই নয়, অনেক অঞ্চলেই মুসলিম সম্প্রদায়ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হোলিকোৎসবে অংশগ্রহণ করত, যা ভারতের প্রাচীন ধর্মনিরপেক্ষ সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ ।

আসুরিক শক্তির বিনাশ এবং মন্দের ওপর ভালোর জয়

যেকোনো প্রাচীন উৎসবের পেছনেই সমকালীন সমাজের ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব লুকিয়ে থাকে। দোলের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এর সাথে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি গল্পই মূলত আসুরিক বা অশুভ শক্তির পতন এবং শুভ শক্তির জয়ের বার্তা বহন করে। অহংকার ও অন্ধকারের বিনাশ ঘটিয়ে সমাজে ভক্তি, প্রেম ও সত্যের আলো জ্বালানোই হলো হোলি বা দোল উৎসবের মূল দর্শন । এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই যুগের পর যুগ ধরে হোলিকা দহন বা ন্যাড়াপোড়ার মতো প্রথাগুলো পালিত হয়ে আসছে।

পৌরাণিক চরিত্র আসুরিক শক্তি এবং হোলির সাথে সম্পৃক্ততা
হিরণ্যকশিপু ক্ষমতার অহংকার এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করার চরম প্রতীক ।
হোলিকা অশুভ শক্তি এবং প্রতারণার প্রতীক, যে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় ।
প্রহ্লাদ নিঃস্বার্থ ভক্তি, সত্য এবং আধ্যাত্মিক শক্তির অটল প্রতীক ।
রাক্ষসী ধুন্ধি সমাজ ও শিশুদের জন্য ক্ষতিকর নেতিবাচক শক্তির প্রতীক, যাকে আনন্দ ও দুষ্টুমির মাধ্যমে তাড়ানো হয় ।

হিরণ্যকশিপু, প্রহ্লাদ এবং হোলিকা দহন

দোলের ইতিহাস ঘাঁটলে সবচেয়ে সুপরিচিত এবং জনপ্রিয় যে কাহিনীটি পাওয়া যায়, তা হলো ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত প্রহ্লাদ এবং রাক্ষসী হোলিকার উপাখ্যান । হিন্দু পুরাণ অনুসারে, প্রাচীনকালে হিরণ্যকশিপু নামে এক পরাক্রমশালী ও অত্যন্ত অহংকারী অসুর রাজা ছিলেন। তিনি ভগবান শিব ও ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করে পাঁচটি বিশেষ বর লাভ করেছিলেন। এই বরের কারণে তাকে কোনো মানুষ বা প্রাণী, কোনো অস্ত্রে বা শস্ত্রে, দিনে বা রাতে, ঘরের ভেতরে বা বাইরে মারা প্রায় অসম্ভব ছিল । এই অসীম ক্ষমতার অহংকারে তিনি নিজেকেই ভগবান বলে দাবি করতেন এবং তার রাজ্যে বিষ্ণুর আরাধনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার নিজের পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। পুত্রের এই ভক্তি হিরণ্যকশিপুর কাছে চরম অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রহ্লাদকে হত্যার জন্য তার বোন হোলিকার সাহায্য নেন। হোলিকার একটি বিশেষ ঐশ্বরিক চাদর বা পোশাক ছিল, যা গায়ে জড়ালে আগুনে পুড়ে যাওয়ার কোনো ভয় ছিল না। হিরণ্যকশিপুর আদেশে হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে একটি বিশাল জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশ করেন ।

তবে ঈশ্বরের লীলা বড়ই অদ্ভুত। ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় এবং প্রহ্লাদের ভক্তির জোরে সেই জাদুকরী চাদরটি হোলিকার গা থেকে উড়ে গিয়ে প্রহ্লাদকে আবৃত করে। ফলে প্রহ্লাদ সম্পূর্ণ অক্ষত থাকেন এবং অহংকারী হোলিকা সেই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যান । পরবর্তীতে ভগবান বিষ্ণু ‘নৃসিংহ’ (অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক সিংহ) অবতার ধারণ করে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই দোলের আগের দিন রাতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ‘হোলিকা দহন’ বা ন্যাড়াপোড়া পালন করে থাকেন, যা অহংকার পুড়িয়ে শুদ্ধ হওয়ার প্রতীক ।

রাক্ষসী ধুন্ধির উপাখ্যান ও শিশুদের উৎসব

প্রহ্লাদের কাহিনীর পাশাপাশি ভবিষ্য পুরাণে রাক্ষসী ধুন্ধির এক তুলনামূলক কম পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত চমকপ্রদ কাহিনী রয়েছে। প্রাচীনকালে পৃথু রাজার রাজত্বে ধুন্ধি বা ধুন্ধা নামে এক ভয়ঙ্কর রাক্ষসীর উপদ্রব শুরু হয়। ভগবান শিবের বরে ধুন্ধি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সে কোনো সাধারণ অস্ত্র, দেবতা বা যোদ্ধার কাছে পরাস্ত হতো না। রাজ্যের শিশুরা তার প্রধান লক্ষ্য ছিল এবং সে তাদের ওপর চরম অত্যাচার চালাত ।

কিন্তু ধুন্ধির একটি অদ্ভুত দুর্বলতা ছিল। শিবের বরের সাথে একটি অভিশাপও যুক্ত ছিল—শিশুদের দুষ্টুমি, বিকট শব্দ এবং গালিগালাজে সে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ত । রাজ্যের পুরোহিতরা রাজাকে এই দুর্বলতার কথা জানান। তাদের পরামর্শে ফাল্গুনী পূর্ণিমার রাতে গ্রামের সব অল্পবয়সী ছেলেরা একত্রিত হয়ে ঢোল বাজিয়ে, চিৎকার করে, এবং রাক্ষসীকে উদ্দেশ্য করে নানা অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে এক বিশাল হৈ-হুল্লোড়ের সৃষ্টি করে। এই বিকট শব্দ ও কোলাহল সহ্য করতে না পেরে ধুন্ধি তার সমস্ত ঐশ্বরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং চিরতরে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায় । সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হোলির দিন হৈ-হুল্লোড় করা, রং মাখানো এবং আনন্দে মেতে ওঠার প্রথা শুরু হয় ।

হোলিকা দহনের তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা

হোলিকা দহন বা ন্যাড়াপোড়া নিছকই একটি সামাজিক প্রথা নয়, সনাতন দর্শনে এর এক গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে। বেদিক শাস্ত্র অনুযায়ী, হোলিকা দহনের অগ্নিকুণ্ড হলো মানুষের ভেতরের অহংকার (Ego), নেতিবাচক চিন্তা এবং সমস্ত আসুরিক প্রবৃত্তিকে পুড়িয়ে ফেলার প্রতীক । আগুন যেমন সবকিছু পুড়িয়ে শুদ্ধ করে, ঠিক তেমনি হোলিকা দহনের মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরের কালিমা দূর করে এক নতুন এবং পবিত্র চেতনার জাগরণ ঘটায়। পরের দিন রঙের মাধ্যমে যে আনন্দ উদযাপিত হয়, তা হলো শুদ্ধ অন্তরে ঈশ্বরের ঐশ্বরিক প্রেমের প্রকাশ ।

রাধা-কৃষ্ণের প্রেম এবং শিব-কামদেবের আত্মত্যাগ

History and mythology of Holi

ভারতীয় দর্শনে প্রেম ও ভক্তি অবিচ্ছেদ্য। আমরা যখন দোলের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী বিশ্লেষণ করি, তখন রাধা-কৃষ্ণের ঐশ্বরিক প্রেমলীলার কথা সবার আগে উঠে আসে। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দিনটি নিছক রঙের খেলা নয়, এটি হলো ভক্তি, সমর্পণ এবং শাশ্বত প্রেমের এক পবিত্র উদযাপন । এর পাশাপাশি, দক্ষিণ ভারতে শিব ও কামদেবকে নিয়েও রয়েছে এক ভিন্ন ধরনের পৌরাণিক কাহিনী, যা প্রেমের আত্মত্যাগের বার্তা দেয়।

পৌরাণিক চরিত্র প্রেম, আত্মত্যাগ এবং হোলির রীতিনীতি
রাধা-কৃষ্ণ ব্রজভূমিতে রং খেলা শুরু, যা ঐশ্বরিক প্রেম এবং বসন্তের আনন্দের শাশ্বত প্রতীক ।
মা যশোদা শ্রীকৃষ্ণকে রাধার মুখে রং মাখানোর পরামর্শ দান, যা থেকে আধুনিক হোলির সূচনা ।
কামদেব ও রতি প্রেমের দেবতার আত্মত্যাগ, যাকে স্মরণ করে দক্ষিণ ভারতে ‘কাম দহন’ পালিত হয় ।
ভগবান শিব ক্রোধানলে কামদেবকে ভস্ম করা এবং পরবর্তীতে তাকে পুনর্জীবন দান ।

শ্রীকৃষ্ণের আক্ষেপ এবং রাধার প্রতি অনুরাগ

পুরাণ অনুযায়ী, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন শিশু ছিলেন, তখন কংসের আদেশে রাক্ষসী পূতনা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিষযুক্ত স্তন্যপান করায়। শ্রীকৃষ্ণ পূতনাকে বধ করলেও সেই বিষের প্রভাবে তার গায়ের রং চিরকালের জন্য গাঢ় নীল বা শ্যামবর্ণ হয়ে যায় । যৌবনে পদার্পণ করার পর শ্রীকৃষ্ণ নিজের এই নীল গায়ের রং নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত থাকতেন। তার মনে সর্বদা এই আক্ষেপ কাজ করত যে, অত্যন্ত ফর্সা গায়ের রঙের অধিকারী রাধা এবং তার সখীরা (গোপীরা) হয়তো তার এই অস্বাভাবিক গায়ের রঙের জন্য তাকে প্রত্যাখ্যান করবে বা ভালোবাসবে না ।

ছেলের এই মানসিক কষ্টের কথা বুঝতে পেরে মা যশোদা তাকে একটি চমৎকার পরামর্শ দেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে বলেন, “তোর যে রং পছন্দ, সেই রং নিয়ে তুই রাধার মুখে মাখিয়ে দে, তাহলে তোদের দুজনের রঙই এক হয়ে যাবে।” মায়ের এই কথা শুনে শ্রীকৃষ্ণ ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন রাধা ও অন্যান্য সখীদের সাথে রং খেলায় মেতে ওঠেন এবং নিজের পছন্দমতো আবির রাধার মুখে মাখিয়ে দেন। এই রং মাখানোর পর রাধা এবং কৃষ্ণের মধ্যে এক গভীর ঐশ্বরিক প্রেমের সূচনা হয় । মূলত ভারতের ব্রজভূমি (মথুরা, বৃন্দাবন, বর্ষানা, নন্দগাঁও)-তে শ্রীকৃষ্ণের এই ভালোবাসার প্রকাশই কালক্রমে রঙের উৎসব বা হোলি হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে ।

বৈষ্ণব দর্শনে দোলযাত্রা এবং দোলনার প্রতীকী অর্থ

বাংলা ও ওড়িশায় হোলি উৎসবটি ‘দোলযাত্রা’ বা ‘দোল পূর্ণিমা’ নামে বেশি পরিচিত। সংস্কৃত ‘দোল’ শব্দের অর্থ হলো দোলনা বা ঝুলন, এবং ‘যাত্রা’ শব্দের অর্থ হলো শোভাযাত্রা । বৈষ্ণব গ্রন্থ ‘গর্গ সংহিতা’-তে চৈত্র মাসে শ্রীকৃষ্ণের দোল উৎসবের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে । এই দিনটিতে রাধা এবং কৃষ্ণের মূর্তিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুল, পাতা এবং রঙিন কাপড় দিয়ে সাজিয়ে একটি সুসজ্জিত দোলনায় বসানো হয় ।

এই দোলনাটি জীবনের উত্থান-পতনের এক গভীর রূপক বা প্রতীক (Metaphor) হিসেবে কাজ করে । দোলনায় রাধা-কৃষ্ণকে বসিয়ে দোল দেওয়ার প্রথাটি মূলত ঈশ্বরের সাথে ভক্তের এক আনন্দময় এবং খেলাচ্ছলে মিলনের প্রতীক। ভক্তরা দোলনার চারপাশে জড়ো হয়ে ভজন গান, কীর্তন করেন এবং রাধা-কৃষ্ণের মূর্তিতে সুগন্ধি আবির ও ফুল অর্পণ করে তাদের ঐশ্বরিক প্রেমের উদযাপন করেন । এই সময় পুরুষেরা রঙিন জল ছিটিয়ে এবং নারীরা ভক্তিগীতি গেয়ে এক আনন্দমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করেন ।

শিবের ক্রোধানল এবং কামদেবের ভস্মীভূত হওয়া

উত্তর ভারতে যেখানে দোল উৎসব রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের প্রতীক, সেখানে দক্ষিণ ভারতের অনেক অঞ্চলে (বিশেষ করে কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ুতে) এটি ‘কাম দহন’ (Kama Dahanam) বা কামদেবের আত্মত্যাগের দিন হিসেবে পালিত হয় । হিন্দু পুরাণ মতে, দেবী সতীর আত্মাহুতির পর ভগবান শিব সংসার ত্যাগ করে এক গভীর ও কঠোর ধ্যানে মগ্ন হন। এদিকে তার এই বৈরাগ্যের সুযোগে তারকাসুর নামক এক অসুর স্বর্গরাজ্য দখল করে নেয়। ব্রহ্মার বরে তারকাসুরের মৃত্যু কেবল শিবের পুত্রের হাতেই সম্ভব ছিল ।

শিবকে পুনরায় সংসারে ফিরিয়ে আনতে এবং দেবী পার্বতীর প্রতি তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য দেবতারা প্রেমের দেবতা কামদেবকে (মদন) নিয়োগ করেন। কামদেব তার স্ত্রী রতিকে সাথে নিয়ে শিবের ধ্যান ভাঙানোর দুঃসাহসিক কাজে ব্রতী হন। তিনি একটি ফুলের তৈরি প্রেমের তীর শিবের বুকে নিক্ষেপ করেন। তীর বিদ্ধ হওয়ামাত্র শিবের ধ্যান ভেঙে যায় এবং তিনি পার্বতীর প্রতি অনুরক্ত হন। কিন্তু নিজের ধ্যান ভঙ্গ হওয়ায় প্রচণ্ড ক্রোধে ভগবান শিব তার তৃতীয় নয়ন উন্মীলন করেন এবং কামদেবকে মুহূর্তের মধ্যে ভস্ম বা ছাই করে দেন (যা মদন-ভস্ম নামে পরিচিত) ।

পরবর্তীতে রতির করুণ প্রার্থনায় এবং অন্যান্য দেবতাদের অনুরোধে সন্তুষ্ট হয়ে শিব কামদেবকে পুনরায় অশরীরী রূপে জীবন দান করেন। কামদেবের এই আত্মত্যাগ এবং প্রেমের জয়ের প্রতি সম্মান জানাতেই দোল উৎসবের দিন দক্ষিণ ভারতে কাম দহন পালিত হয় । কর্ণাটকের নবলগুন্দ এবং অন্যান্য অঞ্চলে এই দিনে কামদেব ও রতির মূর্তি স্থাপন করে পূজা করা হয় এবং নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তান লাভের আশায় বিশেষ প্রার্থনা করেন ।

বাংলায় দোল উৎসব: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং শান্তিনিকেতন

ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রান্তের চেয়ে বাংলার দোলের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী অনেকটাই আলাদা এবং স্বতন্ত্র। বাংলায় এটি শুধুমাত্র রঙের বা হৈ-হুল্লোড়ের উৎসব নয়, বরং এটি ভক্তি, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং ঐক্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলন থেকে শুরু করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাংস্কৃতিক নবজাগরণ—দোল উৎসবকে বাংলায় এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

বাংলার উৎসবের ধারা প্রবর্তক ও মূল বৈশিষ্ট্য
গৌর পূর্ণিমা / দোলযাত্রা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। ভক্তি আন্দোলন, নগর কীর্তন, রাধা-কৃষ্ণের দোলনা আরাধনা এবং মায়াপুর-নবদ্বীপের মেলা ।
বসন্ত উৎসব (ঋতু উৎসব) শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মার্জিত সংস্কৃতি, গান, নাচ, বাউল সঙ্গীত এবং বাসন্তী রঙের পোশাকের ব্যবহার ।
চাঁচর বা ন্যাড়াপোড়া বাংলার সনাতন ঐতিহ্য। দোলের আগের দিন শুকনো পাতা ও জঞ্জাল পুড়িয়ে নতুনের আহ্বান জানানো ।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব ও গৌর পূর্ণিমা

গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে দোল পূর্ণিমার দিনটি অত্যন্ত পবিত্র এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এর কারণ হলো, ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের (১৪০৭ শকাব্দ) এই ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিনেই নদীয়া জেলার শ্রীধাম নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (যিনি নিমাই বা গৌরাঙ্গ নামেও পরিচিত) । বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধার এক সম্মিলিত অবতার, যিনি কলিযুগে মানুষকে উদ্ধার করতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর হাত ধরেই বাংলায় ভক্তি আন্দোলন এক নতুন রূপ পেয়েছিল এবং জাতপাতের বিভেদ ভুলে মানুষ এক পরম সত্তার আরাধনায় মেতেছিল। তাই বাংলার বৈষ্ণব সমাজে এই পবিত্র দিনটি ‘গৌর পূর্ণিমা’ বা ‘গৌর জয়ন্তী’ হিসেবে অত্যন্ত ভক্তিভরে পালিত হয় । বর্তমানে ইসকনের (ISKCON) প্রধান কেন্দ্র শ্রীধাম মায়াপুর এবং মহাপ্রভুর জন্মস্থান নবদ্বীপে এই তিথি উপলক্ষে দীর্ঘ একমাস ব্যাপী বিশাল উৎসবের আয়োজন করা হয় ।

মায়াপুর ইসকন মন্দিরে দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এই দিনে সমবেত হন। তবে মজার বিষয় হলো, ইসকন মন্দিরে এই দিনে সরাসরি রং বা আবির খেলা হয় না। এর পরিবর্তে বৈষ্ণব সম্মেলন, নবদ্বীপ মণ্ডল পরিক্রমা, বিশ্বশান্তি যজ্ঞ, নৌকা বিহার এবং ভাগবত পাঠের আয়োজন করা হয় । সন্ধ্যায় রাধামাধবকে হাতির পিঠে চাপিয়ে সমগ্র মন্দির চত্বর পরিক্রমা করানো হয় এবং মহাপ্রভুর আবির্ভাব ক্ষণে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করে বিশ্বশান্তির জন্য প্রার্থনা করা হয় ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বসন্ত উৎসবের সূচনা

বাংলার দোলের আলোচনা শান্তিনিকেতনের ‘বসন্ত উৎসব’ ছাড়া একেবারেই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বোলপুর-শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দোল উৎসবকে এক অত্যন্ত রুচিশীল, মার্জিত এবং সাংস্কৃতিক রূপ দিয়েছিলেন । তবে অনেকেরই হয়তো অজানা যে, শান্তিনিকেতনে এই বসন্ত উৎসবের বীজ প্রথম বপন করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অত্যন্ত প্রতিভাবান এই কিশোর মাত্র কয়েকজন আশ্রমিক ছাত্রকে নিয়ে ১৯০৭ সালের ১৮ জানুয়ারি আদি কুটিরের হলঘরে প্রথম ‘ঋতু উৎসব’ বা ‘ঋতুরঙ্গ উৎসব’ শুরু করেন ।

পরবর্তীকালে, ১৯২৩ সালে ফাল্গুনী পূর্ণিমার দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আনুষ্ঠানিকভাবে এই উৎসবের নাম দেন ‘বসন্ত উৎসব’ এবং একে আশ্রমের একটি নিয়মিত বার্ষিক অনুষ্ঠানে পরিণত করেন । হিন্দু ধর্মের অন্যান্য অঞ্চলের হোলিতে যে এক ধরনের উদ্দামতা বা অদ্ভুত আমোদ-প্রমোদ ছিল, রবীন্দ্রনাথ সেটিকে সম্পূর্ণ পরিহার করেছিলেন। তিনি এই উৎসবকে ‘সত্য ও সুন্দরের জয়ের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরেন ।

বসন্ত উৎসবের দিন বিশ্বভারতীর ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকরা বাসন্তী (হলুদ) রঙের পোশাক বা শাড়ি পরে আশ্রমের আম্রকুঞ্জে সমবেত হন । “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল” বা “আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে”-এর মতো কালজয়ী রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করে ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানানো হয় । এর পাশাপাশি বাউল শিল্পীদের একতারা বাজিয়ে শান্তির গান পরিবেশন পুরো পরিবেশকে এক ঐশ্বরিক মাত্রায় নিয়ে যায় । বর্তমানে এই ‘রাবীন্দ্রিক বসন্ত উৎসব’ দেখতে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক শান্তিনিকেতনে ভিড় জমান এবং একে অপরের গালে আলতো করে আবির ছুঁইয়ে সম্প্রীতির বার্তা দেন।

বাংলার বৈষ্ণব সমাজে চাঁচর বা ন্যাড়াপোড়ার গুরুত্ব

উত্তর বা পশ্চিম ভারতে যা ‘হোলিকা দহন’, বাংলায় তা ‘চাঁচর’ বা ‘ন্যাড়াপোড়া’ নামে পরিচিত । দোলের আগের দিন রাতে পাড়ার মোড়ে বা খোলা মাঠে শুকনো গাছের ডাল, কাঠ, পাতা এবং বাঁশ একত্রিত করে একটি কুঁড়েঘরের মতো তৈরি করা হয় এবং তাতে আগুন জ্বালানো হয় ।

বাঙালি সমাজে এই চাঁচর পোড়ানোর একটি চমৎকার সামাজিক ও ঋতুভিত্তিক তাৎপর্য রয়েছে। দোল হলো বাংলা ঋতুচক্রের একেবারে শেষ উৎসব। এর পরেই আসে বৈশাখ। পাতাঝরার এই মরসুমে চারপাশের পড়ে থাকা শুকনো পাতা ও জঞ্জাল একত্রিত করে পুড়িয়ে ফেলার অর্থ হলো—পুরনো বছরের সমস্ত রুক্ষতা, শুষ্কতা এবং জঞ্জালকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে নতুন বছর ও নতুন প্রাণকে স্বাগত জানানো । এটি একদিকে যেমন চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার করে, তেমনি মানুষের মনের ভেতরের জমে থাকা অভিমান ও অহংকারকেও দূর করে।

রঙের উৎসবের পেছনের বৈজ্ঞানিক এবং পরিবেশগত কারণ

দোল বা হোলি শুধু একটি পৌরাণিক বা সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, প্রাচীন ঋষিরা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এর মধ্যে গভীর বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যা লুকিয়ে রেখেছিলেন। শীতের শেষ এবং গ্রীষ্মের শুরুতে আবহাওয়ায় যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, তা মানবদেহ এবং প্রকৃতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সাথে শরীরকে খাপ খাইয়ে নিতেই রঙের উৎসবের বিভিন্ন রীতিনীতি বৈজ্ঞানিক উপায়ে তৈরি করা হয়েছিল ।

রীতিনীতি / উপাদান বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব
হোলিকা দহন (অগ্নিকুণ্ড) তাপমাত্রা ৫০-৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে চারপাশের বায়ুর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং শরীরকে উষ্ণ ও রোগমুক্ত রাখে ।
প্রাকৃতিক রং (নিম, হলুদ, পলাশ) শরীরের আয়ন শক্তিশালী করে, ত্বকের মরা কোষ দূর করে এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে ।
রাসায়নিক রং (কপার, পারদ, লেড) চোখের অ্যালার্জি, সাময়িক অন্ধত্ব, ত্বকের ক্যানসার, কিডনি ফেইলিওর এবং হাঁপানির মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে ।
বাদ্যযন্ত্র ও শারীরিক নাড়াচাড়া আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট শারীরিক আলসেমি বা ‘Tardiness’ দূর করে শরীরে শক্তি ও উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনে ।

হোলিকা দহনের ফলে পরিবেশের জীবাণুনাশ

হোলির আগের রাতে যে হোলিকা দহন বা ন্যাড়াপোড়া হয়, তার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। শীতকাল থেকে বসন্ত বা গ্রীষ্মকালে প্রবেশের এই সন্ধিক্ষণে বাতাসে ব্যাকটেরিয়ার প্রজনন ও বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি মাত্রায় হয় (Bacterial growth is maximum) ।

যখন খোলা জায়গায় প্রচুর পরিমাণ শুকনো কাঠ, পাতা এবং গোবর দিয়ে বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়, তখন তার চারপাশের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। প্রথা অনুযায়ী মানুষ যখন এই অগ্নিকুণ্ড প্রদক্ষিণ (পরিক্রমা) করে, তখন আগুনের সেই প্রচণ্ড উত্তাপ মানুষের শরীর এবং চারপাশের পরিবেশের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে । এটি অনেকটা প্রাকৃতিক ‘সাউনা’ (Sauna)-এর মতো কাজ করে যা শীতকালীন সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় ।

এছাড়া ভারতের অনেক অঞ্চলে প্রথা রয়েছে যে, হোলিকা দহনের পরদিন সকালে সেই পোড়া ছাই বা ভস্ম চন্দন বাটা এবং আমগাছের কচি পাতা ও মুকুলের সাথে মিশিয়ে কপালে বা শরীরে লাগানো হয়, যা ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় এবং শরীরকে শীতল রাখে বলে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ।

ভেষজ রঙের স্বাস্থ্যগুণ বনাম রাসায়নিক রঙের ক্ষতিকর প্রভাব

প্রাচীনকালে হোলি খেলা হতো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি রং দিয়ে। কাঁচা হলুদ, নিম পাতা, পলাশ ফুল (Tesu), এবং গাঁদা ফুল বেটে বা শুকিয়ে এই রং তৈরি করা হতো । শীতকালে নিয়মিত স্নান না করার কারণে অনেকের ত্বকে শুষ্কতা, মরা কোষ জমা হওয়া বা বিভিন্ন চর্মরোগ দেখা দেয়। হলুদ বা নিমের মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি রং শরীরে মাখলে তা প্রাকৃতিক স্ক্রাবার ও অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে কাজ করে শরীরকে সতেজ রাখে এবং শরীরের আয়ন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে ।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আধুনিক যুগে বাজারে অধিক লাভের আশায় যে সিন্থেটিক বা রাসায়নিক রং বিক্রি হয়, তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর । বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এই রঙগুলোতে ভয়ানক সব রাসায়নিক উপাদান মেশানো থাকে:

  • সবুজ রং: এতে কপার সালফেট (Copper Sulphate) থাকে, যা চোখে গেলে তীব্র অ্যালার্জি এবং এমনকি সাময়িক অন্ধত্বের কারণ হতে পারে ।
  • লাল রং: উজ্জ্বল লাল রঙে পারদ সালফাইড (Mercury Sulphide) মেশানো থাকে, যা মানুষের ত্বকের ক্যানসার, পক্ষাঘাত (Paralysis), এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায় ।
  • বেগুনি রং: এতে ক্রোমিয়াম আয়োডাইড (Chromium Iodide) থাকায় এটি শ্বাসনালীতে গিয়ে ব্রঙ্কিয়াল হাঁপানি এবং অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে ।
  • কালো রং: লেড অক্সাইড (Lead Oxide) নামক বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে, যা কিডনি ফেইলিওর (Renal failure) এবং শিশুদের শেখার অক্ষমতা বা লার্নিং ডিজেবিলিটি তৈরি করতে পারে ।
  • রূপোলি রং: এতে অ্যালুমিনিয়াম ব্রোমাইড থাকে, যা একটি কার্সিনোজেনিক (ক্যানসার সৃষ্টিকারী) পদার্থ ।

তাই শরীর, চুল এবং চোখকে সুস্থ রাখতে দোল খেলায় সর্বদা রাসায়নিক বর্জন করে ভেষজ বা প্রাকৃতিক আবির ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। ক্রেতারা যদি প্রাকৃতিক রঙের চাহিদা বাড়ান, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এর দাম কমে আসবে এবং সমাজ একটি সুস্থ পরিবেশ পাবে ।

শারীরিক সক্রিয়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি

আবহাওয়া যখন ঠান্ডা থেকে গরমের দিকে পরিবর্তিত হয়, তখন মানুষের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই এক প্রকার ক্লান্তি বা আলসেমি (Tardiness) কাজ করে । এই আলসেমি দূর করার জন্যই প্রাচীন ঋষিরা হোলির দিন গানবাজনা এবং হৈ-হুল্লোড়ের প্রথা চালু করেছিলেন। ফাগ, যোগিরা বা বাউলের মতো লোকগীতি গাওয়ার সময় ঢোল, করতাল ও মঞ্জিরা বাজানো হয়। এই উচ্চ স্বরের বাদ্যযন্ত্র এবং রঙের খেলায় মানুষের শারীরিক নাড়াচাড়া বা ফিজিক্যাল মুভমেন্ট বৃদ্ধি পায়, যা রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে শরীরকে চাঙ্গা করে তোলে ।

এছাড়া রঙের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বা ‘কালার থেরাপি’ মানুষের অবসাদ দূর করে মনে আনন্দ ও ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার করে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এবং বিশ্বজুড়ে হোলি উদযাপনের বৈচিত্র্য

Diversity of Holi celebrations

ভারতবর্ষ বৈচিত্র্যের দেশ। এখানকার বিভিন্ন প্রান্তের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সংস্কৃতির পার্থক্যের কারণে রঙের উৎসবটি ভিন্ন ভিন্ন নামে এবং রীতিনীতিতে পালিত হয় । তবে দোল উৎসব  যে রূপেই পালিত হোক না কেন, উৎসবের মূল সুর সর্বদা আনন্দ, ভালোবাসা এবং সম্প্রীতির মাঝেই নিহিত থাকে। ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে প্রবাসী ভারতীয়দের মাঝেও এই উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে।

অঞ্চল / দেশ হোলি বা দোল উৎসবের আঞ্চলিক নাম ও বিশেষ রীতিনীতি
উত্তরপ্রদেশ (বর্ষানা) লঠমার হোলি: পুরুষরা মহিলাদের রং মাখাতে এলে মহিলারা લાঠি দিয়ে তাড়া করে এবং পুরুষরা ঢাল দিয়ে নিজেদের রক্ষা করে ।
পাঞ্জাব হোলা মহল্লা: শিখ সম্প্রদায়ের পুরুষরা রং খেলার পাশাপাশি তলোয়ার ও ঘোড়া নিয়ে সামরিক শৌর্য প্রদর্শন করে ।
মহারাষ্ট্র রং পঞ্চমী: রং খেলার পাশাপাশি পুরুষরা মানব পিরামিড তৈরি করে উঁচুতে বাঁধা মাখনের হাঁড়ি (মটকি ফোর) ভাঙে ।
গোয়া ও কেরালা শিগমো ও মঞ্জল কুলি: গোয়ায় কৃষকরা বসন্তকে স্বাগত জানায় এবং কেরালায় হলুদ জলের মাধ্যমে উৎসব হয় ।
গায়ানা ও ক্যারিবিয়ান ফাগওয়াহ (Phagwah): প্রবাসী ভারতীয়রা ‘চৌতাল’ নামক বিশেষ গান গেয়ে এবং আবির উড়িয়ে হোলি পালন করেন ।

উত্তর ভারতের লঠমার হোলি এবং পাঞ্জাবের হোলা মহল্লা

উত্তরপ্রদেশের মথুরা, বৃন্দাবন, নন্দগাঁও এবং বর্ষানায় হোলি উদযাপন বিশ্ববিখ্যাত। এখানকার ‘লঠমার হোলি’ (Lathmar Holi) দেখার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমান। পুরাণ অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ নন্দগাঁও থেকে বর্ষানায় রাধার সাথে রং খেলতে আসতেন এবং গোপীদের জ্বালাতন করতেন। এর প্রতীকী রূপ হিসেবে আজও নন্দগাঁওয়ের পুরুষরা যখন বর্ষানায় মহিলাদের রং মাখাতে আসেন, তখন মহিলারা লম্বা লাঠি দিয়ে তাদের তাড়া করেন। পুরুষরা নিজেদের বাঁচাতে চামড়ার ঢাল ব্যবহার করেন এবং উত্তেজক গান গান । এটি অত্যন্ত আনন্দময় এবং খুনসুটিপূর্ণ একটি প্রথা।

অন্যদিকে, পাঞ্জাবে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই উৎসবকে ‘হোলা মহল্লা’ (Hola Mohalla) হিসেবে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে পালন করেন। শিখদের দশম গুরু, গুরু গোবিন্দ সিং এই উৎসবের সূচনা করেছিলেন। এটি মূলত একটি সামরিক মহড়া এবং শৌর্য প্রদর্শনের উৎসব। এই দিনে নিহং শিখরা তলোয়ার চালনা, ঘোড়সওয়ারি এবং অন্যান্য সমরাস্ত্রের খেলা দেখান এবং শেষে একত্রে বসে লঙ্গরে (সাধারন রান্নাঘর) খাবার খান ।

দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বিশেষ রীতিনীতি

মহারাষ্ট্রে হোলিকে ‘রং পঞ্চমী’ বলা হয়। এখানে রঙের খেলার পাশাপাশি ‘মটকি ফোর’ (Matki Phod) নামক একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও রোমাঞ্চকর খেলা হয়। শ্রীকৃষ্ণ শিশুবেলায় কীভাবে মাখন চুরি করতেন, সেটি স্মরণ করতেই পাড়ার মোড়ে মোড়ে উঁচুতে মাখনের হাঁড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। পুরুষদের দল একে অপরের কাঁধে চেপে বিশাল মানব পিরামিড তৈরি করে সেই হাঁড়ি ভাঙার চেষ্টা করে। আর সেই সময় মহিলারা তাদের মনোযোগ নষ্ট করার জন্য চারপাশ থেকে রঙিন জল ছুঁড়তে থাকেন ।

গোয়ায় স্থানীয় কৃষকরা শীতের বিদায় এবং বসন্তকে স্বাগত জানাতে ‘শিগমো’ (Shigmo) উৎসব পালন করেন। এখানে বিরাট শোভাযাত্রা এবং লোকনৃত্যের আয়োজন করা হয় । কেরালায় এই উৎসব ‘মঞ্জল কুলি’ (Manjal Kuli) বা উকুলি নামে পরিচিত, যেখানে হলুদ মিশ্রিত জল একে অপরের দিকে ছোঁড়া হয় । এছাড়া, উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুরে ‘ইয়াওসাং’ (Yaosang) নামে এই উৎসব টানা পাঁচ দিন ধরে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়, যেখানে থাবাল চোংবা নামক বিশেষ লোকনৃত্য পরিবেশিত হয় ।

প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে রঙের উৎসব

ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আজ হোলি এক আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। নেপাল, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুরা নিজস্ব রীতিতে এই উৎসব পালন করেন। এর বাইরেও, ব্রিটিশ বা ডাচ উপনিবেশের সময় যেসব ভারতীয়রা কাজের সন্ধানে গায়ানা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, ফিজি, সুরিনাম এবং মরিশাসে গিয়েছিলেন, তারা আজও তাদের শিকড়কে ভুলে যাননি ।

দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত গায়ানায় হোলিকে ‘ফাগওয়াহ’ (Phagwah) বলা হয়। সেখানে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা ‘চৌতাল’ নামক বিশেষ লোকগীতি গাওয়ার মাধ্যমে এবং একে অপরের গায়ে আবির (Abeer) ও রঙিন পাউডার (Abrack) ছিটিয়ে উৎসব পালন করেন । যুক্তরাষ্ট্র (USA), যুক্তরাজ্য (UK), কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়রাও বিশাল মাঠে একত্রিত হয়ে ডিজে মিউজিকের তালে তালে রং খেলায় মেতে ওঠেন । এই উৎসবগুলো প্রবাসীদের তাদের ফেলে আসা দেশ এবং সংস্কৃতির সাথে যুক্ত রাখার এক শক্তিশালী মাধ্যম।

দোল উৎসবের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও রীতিনীতি

যেকোনো ভারতীয় উৎসবই সুস্বাদু খাবার এবং ভোজনরসিকদের আনন্দ ছাড়া অসম্পূর্ণ। দোল বা হোলিও এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ সময় ধরে রং খেলার পর মানুষের প্রচুর খিদে পায়। তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বিশেষ বিশেষ খাবার তৈরি করার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ রয়েছে । এই খাবারগুলো শুধু ক্ষুধা মেটায় না, বরং উৎসবের আনন্দকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

অঞ্চল / রাজ্য হোলি বা দোলের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পানীয়
পশ্চিমবঙ্গ পিঠে পুলি, মালপোয়া, মুড়ি ঘণ্ট, রাধাবল্লভী, ঘুগনি, আলুর দম এবং রসগোল্লা ।
উত্তর ভারত (মথুরা, দিল্লি) গুজিয়া (ভিতরে ক্ষীর ও ড্রাই ফ্রুটস দেওয়া ভাজা মিষ্টি), ঠান্ডাই (দুধ, বাদাম ও মশলা মিশ্রিত পানীয়) ।
মহারাষ্ট্র পুরন পোলি (Puran Poli – ছোলার ডাল ও গুড় দিয়ে তৈরি বিশেষ মিষ্টি রুটি বা পরোটা) ।
পাঞ্জাব মিঠে চাওয়াল (Meethe Chawal – জাফরান, চিনি ও ড্রাই ফ্রুটস দেওয়া সুগন্ধি মিষ্টি ভাত) ।
রাজস্থান কাঞ্জি বড়া (Kanji Vada – বিউলির ডালের বড়া যা গাঁজানো সরিষার জলে ভিজিয়ে রাখা হয়) ।

বাংলার উৎসবের স্বাদ: পিঠে পুলি থেকে মুড়ি ঘণ্ট

বাঙালির উৎসব মানেই জমজমাট পেটপুজো আর মিষ্টিমুখ। প্রাচীনকাল থেকেই দোলের দিন বাংলার ঘরে ঘরে ‘পিঠে পুলি’ বানানোর চল রয়েছে। ভাপা পিঠে, পাটিসাপ্টা, দুধ পুলি, মালপোয়া এবং চুষির পায়েস দোলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ । চালের গুঁড়ো, দুধ, নারকেল এবং নলেন গুড় দিয়ে তৈরি এই মিষ্টিগুলো উৎসবের আমেজকে সম্পূর্ণ করে তোলে।

এছাড়া দোলের সকালের জলখাবারে বাঙালির প্রথম পছন্দ হলো কচুরি বা রাধাবল্লভী। কলকাতার বিখ্যাত দোকানগুলোতে ফুলকপির সিঙাড়া, খাস্তা কচুরি, আলুর দম এবং চটপটে ঘুগনির ব্যাপক চাহিদা থাকে । দুপুরের ভোজে অনেক বাঙালি পরিবারে ‘মুড়ি ঘণ্ট’ রান্না করার রেওয়াজ রয়েছে। সুগন্ধি গোবিন্দভোগ বা বাসমতি চালের সাথে রুই বা কাতলা মাছের বড় মাথা এবং নানা রকম মশলা দিয়ে তৈরি এই পদটি দোলের দিনের এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার । সব শেষে রসগোল্লা, রাবড়ি এবং নলেন গুড়ের সন্দেশ উৎসবের আনন্দকে তৃপ্তিতে ভরিয়ে দেয় ।

অবাঙালি সমাজের সিগনেচার খাবার: ঠান্ডাই এবং গুজিয়া

হোলির দিন সমগ্র উত্তর ভারতের ঘরে ঘরে যে মিষ্টিটি সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়, তার নাম ‘গুজিয়া’ (Gujiya)। এটি এক প্রকারের মুচমুচে ভাজা মিষ্টি, যার ভেতরে ক্ষীর, নারকেল এবং কাজু-কিশমিশের মতো ড্রাই ফ্রুটসের পুর ভরা থাকে ।

পাশাপাশি ‘ঠান্ডাই’ (Thandai) হলো হোলির সিগনেচার পানীয়। এটি একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং শরীরকে শীতল রাখার পানীয়। শুকনো গোলাপের পাপড়ি, চারমগজ (Melon seeds), এলাচ, গোলমরিচ, পোস্ত দানা, কাঠবাদাম (Almonds) এবং মৌরি একসাথে বেটে ঘন দুধের সাথে মিশিয়ে এই ঠান্ডাই তৈরি করা হয়। পরিবেশনের আগে এর ওপরে বরফ কুচি এবং পেস্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় ।

মহারাষ্ট্রে এই দিন ছোলার ডাল ও গুড় দিয়ে তৈরি ‘পুরন পোলি’ (Puran Poli) নামক এক বিশেষ রুটি বানানো হয়, যা উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ । উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুনি হোলিতে চালের গুঁড়ো ও গুড় দিয়ে তৈরি ‘আরসা পিঠা’ (Arsa Pitha) খাওয়ার রীতি রয়েছে । রাজস্থানে এই দিনে মাষকলাই বা বিউলির ডাল দিয়ে তৈরি ‘কাঞ্জি বড়া’ (Kanji Vada) অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই বড়াগুলোকে গাঁজানো সরিষার জলে (Fermented mustard water) ভিজিয়ে পরিবেশন করা হয়, যা হজমেও সহায়তা করে । পাঞ্জাবে এই দিন জাফরান দিয়ে তৈরি সুগন্ধি ‘মিঠে চাওয়াল’ বা মিষ্টি ভাত খাওয়ার প্রথা রয়েছে ।

শেষ কথা 

পরিশেষে বলা যায়, দোলের ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী কেবল একটি প্রাচীন গল্প বা মিথ নয়; এটি আমাদের সমাজ, জীবনবোধ এবং আধ্যাত্মিকতার এক সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। হিরণ্যকশিপুর পতন থেকে শুরু করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাম্যবাদ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মার্জিত বসন্ত উৎসব—প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনাই আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে অহংকার, ঘৃণা এবং অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে সমাজে ভালোবাসা ও ভক্তির প্রতিষ্ঠা করতে হয় ।

বসন্তের এই রঙিন দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বরের চোখে এবং প্রকৃতির কাছে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। হোলির দিন ধনী-দরিদ্র, জাত-পাত, লিঙ্গ এবং বয়সের সমস্ত সামাজিক বিভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে এসে রং খেলায় মেতে ওঠে । এটি হলো নিজেদের অতীতের সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি ভুলে যাওয়া, পুরনো ঋণ বা শত্রুতা ক্ষমা করে দিয়ে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করার দিন ।

তবে উৎসবের এই আনন্দ যেন কোনোভাবেই পরিবেশ বা কারো স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিষাক্ত রাসায়নিক রং সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে প্রাকৃতিক ভেষজ আবির ব্যবহার করার মাধ্যমেই আমরা এই প্রাচীন উৎসবের আদি, অকৃত্রিম এবং কল্যাণকর রূপটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি । দোলের এই পবিত্র ও আনন্দময় বার্তা আমাদের সবার জীবনে সুখ, শান্তি, সুস্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। রঙের ছোঁয়ায় মুছে যাক জীবনের সমস্ত মলিনতা।

সর্বশেষ