ডেস্কে বসে কাজ ও ফাস্টফুডের যুগে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: সুস্থ থাকার পূর্ণাঙ্গ গাইড

সর্বাধিক আলোচিত

সকাল ৯টায় অফিসে ঢোকা, এরপর কম্পিউটারের পর্দার দিকে একটানা তাকিয়ে থাকা সেই বিকেল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত। কাজের ফাঁকে হালকা ক্ষুধা পেলে ড্রয়ার থেকে বিস্কুট বের করা বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে চটজলদি বাইরের কোনো খাবার আনিয়ে নেওয়া—এটাই এখন আমাদের বেশিরভাগ চাকরিজীবীর প্রতিদিনের রুটিন। কর্পোরেট এই ইঁদুর দৌড়ে আমরা ক্যারিয়ারে হয়তো অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু অবহেলায় পিছিয়ে পড়ছে আমাদের শরীর ও মন। একটানা বসে থাকা এবং অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণের ফলে শরীরে খুব সহজেই বাসা বাঁধছে স্থূলতা, মেরুদণ্ডের ব্যথা, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগ।

তবে আশার কথা হলো, শত ব্যস্ততা আর যানজটের এই শহরেও একটু সদিচ্ছা এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। চাকরি বা ক্যারিয়ারের সাথে আপস না করে, বরং নিজের প্রতিদিনের রুটিনে ছোট ও বাস্তবসম্মত কিছু পরিবর্তন এনে একটি সুন্দর রুটিন তৈরি করা যায়। আপনার প্রতিদিনের ডেস্কে বসে কাজ করা এবং চারপাশের লোভনীয় খাবারের হাতছানির মাঝে কীভাবে একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করবেন, তা নিয়েই সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের এই বিস্তারিত আয়োজন। চলুন ধাপে ধাপে জেনে নিই নিজেকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়গুলো।

১. সঠিক খাদ্যাভ্যাস তৈরি এবং বাইরের ফাস্টফুড পরিহারের কৌশল

Healthy alternatives to fast food

অফিসে কাজের চাপে আমরা অনেক সময় শর্টকাট হিসেবে পিৎজা, বার্গার বা প্যাকেটজাত খাবার বেছে নিই। এগুলো সহজে হাতের কাছে পাওয়া যায় এবং খেতেও বেশ সুস্বাদু। কিন্তু এই অতিরিক্ত তেল, প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং চিনিযুক্ত খাবারগুলো ধীরে ধীরে আমাদের শরীরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং কাজের প্রতি অনীহা বা আলসেমি তৈরি করে। বাইরের খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়তো একদিনে সম্ভব নয়, তবে এর স্বাস্থ্যকর বিকল্পগুলো দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা যায়। সঠিক খাবার কেবল ওজনই নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং সারাদিন অফিসে মনোযোগ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয়।

অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিপরীতে আপনার প্রতিদিনের রুটিনে যুক্ত করার মতো কিছু চমৎকার পুষ্টিকর বিকল্প নিচে তুলে ধরা হলো।

ফাস্টফুড বা অস্বাস্থ্যকর খাবার পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প পুষ্টিগুণ ও শারীরিক উপকারিতা
ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা প্যাকেটজাত চিপস ভাজা বাদাম, ছোলা বা ঘরে তৈরি মিষ্টি আলুর চিপস প্রচুর ফাইবার, প্রোটিন এবং উপকারি ফ্যাট সরবরাহ করে
বোতলজাত জুস বা এনার্জি ড্রিংক ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা জিরা পানি অতিরিক্ত চিনিমুক্ত, শরীরের আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং হজমশক্তি বাড়ায়
পিৎজা, পাস্তা বা বার্গার লাল আটার রুটি, গ্রিল করা মুরগির মাংস বা সবজির সালাদ দরকারি কার্বোহাইড্রেট এবং উচ্চমাত্রার প্রোটিন নিশ্চিত করে
ক্যান্ডি বা সাধারণ চকলেট ডার্ক চকলেট (যেখানে কোকোর পরিমাণ বেশি) অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর, যা হৃৎপিণ্ডের জন্য অত্যন্ত উপকারী

উপরের তালিকা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, একটু সচেতন হলেই আমরা সহজেই বাইরের খাবার এড়াতে পারি। আসুন এই পুষ্টিকর বিকল্পগুলোকে কীভাবে আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ত রুটিনে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি।

দুপুরের খাবারের জন্য ঘরোয়া আয়োজনের গুরুত্ব

বাইরের খাবারের অস্বাস্থ্যকর চর্বি, অতিরিক্ত তেল ও লবণ এড়াতে নিজের বাসা থেকে আনা খাবারের কোনো বিকল্প নেই। এটি একইসাথে আপনার মাসিক খরচ বাঁচায় এবং স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টি নিশ্চিত করে। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়ো এড়াতে আগের রাতেই দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি কিছুটা গুছিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন, রাতের বেলাতেই সবজি কেটে রাখা বা মাংস মসলা মেখে ফ্রিজে রেখে দিলে সকালে খুব অল্প সময়েই রান্না শেষ করা যায়। এতে করে অফিসে বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসে।

প্রক্রিয়াজাত পানীয়ের বদলে প্রাকৃতিক পানীয়ের ব্যবহার

শরীরকে আর্দ্র রাখা এবং হজমশক্তি ঠিক রাখার জন্য সঠিক পানীয় নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। বোতলজাত জুস বা এনার্জি ড্রিংকগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম চিনি থাকে, যা সাময়িক শক্তি দিলেও পরে শরীরকে আরও ক্লান্ত করে তোলে। এর বদলে কাজের মাঝে সহজেই এনার্জি ধরে রাখার জন্য সাধারণ পানির সাথে কয়েক টুকরো শসা, লেবু বা পুদিনা পাতা মিশিয়ে পান করতে পারেন। এই ধরনের প্রাকৃতিক পানীয় শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দিতে সাহায্য করে এবং সারাদিন সতেজ রাখে।

২. একটানা বসে থাকার মাঝে শারীরিক সক্রিয়তা ধরে রাখার উপায়

ডেস্কে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকাকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ধূমপানের মতোই ক্ষতিকর হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ একইভাবে বসে থাকলে ঘাড়, কাঁধ ও মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়, শরীরে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং পেশি শক্ত হয়ে যায়। একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হলে কাজের ফাঁকে ফাঁকে শরীরকে সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি। ব্যায়ামাগারে যাওয়ার জন্য আলাদা সময় না পেলেও, অফিসের ভেতরেই সাধারণ কিছু নড়াচড়া আপনাকে শারীরিক জড়তা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

অফিসে কাজের ফাঁকে সহজেই করা যায় এমন কিছু নড়াচড়া ও প্রসারণ বা স্ট্রেচিংয়ের ধারণা নিচে দেওয়া হলো।

শারীরিক নড়াচড়া বা কাজ প্রতিদিনের সময়কাল শরীরের যে অংশে প্রভাব ফেলে
ঘাড় ঘোরানো এবং কাঁধ ওঠানো-নামানো ২-৩ মিনিট ঘাড় ও কাঁধের পেশি শিথিল করে ব্যথা কমায়
চেয়ারে বসে পা সোজা করে তোলা ২-৪ মিনিট পায়ের পেশি ও হাঁটুর জয়েন্ট সচল রাখে
লিফটের বদলে সিঁড়ির নিয়মিত ব্যবহার ৫-৭ মিনিট হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখে এবং অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়ায়
দাঁড়িয়ে কাজ করা বা হেঁটে কথা বলা ১০-১৫ মিনিট (মাঝে মাঝে) মেরুদণ্ড সোজা রাখে ও কোমরের ব্যথা প্রতিরোধ করে

অফিসের পরিবেশে খুব সাধারণ কিছু কাজ আপনার শারীরিক জড়তা কাটাতে জাদুর মতো কাজ করতে পারে। চলুন জেনে নিই এগুলো কীভাবে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করবেন।

চেয়ারে বসে সাধারণ মাংসপেশি প্রসারণ বা স্ট্রেচিং

কাজের ফাঁকে মাত্র কয়েক মিনিট সময় নিয়ে চেয়ার থেকে না উঠেই শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা যায়। একটানা টাইপ করার ফলে আমাদের কাঁধ ও ঘাড় সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে। তাই প্রতি এক ঘণ্টা পর পর কাঁধ পেছনের দিকে টেনে বুক প্রসারিত করে বড় করে শ্বাস নিন। ঘাড় ডানে ও বামে ধীরে ধীরে ঘোরান। এই ছোট মাংসপেশি প্রসারণগুলো ঘাড় এবং কাঁধের ব্যথা কমানোর পাশাপাশি পেশির জড়তা দূর করে কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়।

কাজের ফাঁকে হাঁটার অভ্যাস এবং সিঁড়ির ব্যবহার

হাঁটার জন্য কোনো বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। সহকর্মীকে ইমেইল করার বদলে তার ডেস্কে গিয়ে সরাসরি কথা বলা বা নিজের পানি নিজে গিয়ে নিয়ে আসার মতো ছোট ছোট ছুতোয় হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পাশাপাশি অফিসে ওঠার সময় লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার অভ্যাস করুন। প্রতিদিন কয়েক তলা সিঁড়ি ভাঙার অভ্যাস আপনার শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে এবং হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে দারুণ সাহায্য করবে।

৩. মানসিক চাপ কমানো এবং প্রতিদিনের ঘুমের মান উন্নয়ন

অফিসের ডেডলাইন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা এবং প্রতিদিনের যানজট—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আর এই মানসিক চাপের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর। মানসিক চাপ বাড়লে শরীরে এক ধরনের হরমোনের নিঃসরণ ঘটে, যার ফলে আমাদের মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা তৈরি হয়। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত না করলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কখনোই সম্পূর্ণ হয় না।

মানসিক প্রশান্তি ধরে রাখতে এবং ঘুমের মান উন্নত করতে নিচের বিষয়গুলো আপনার রুটিনে যোগ করতে পারেন।

মানসিক চাপের মূল কারণ সমাধানের সহজ উপায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল
একটানা কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রাখা প্রতি ১ ঘণ্টায় ৫ মিনিটের ছোট বিরতি নেওয়া চোখের ক্লান্তি দূর হয় এবং কাজের ফোকাস বাড়ে
ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার করা বিছানায় যাওয়ার আগে পর্দা থেকে দূরে থাকা মস্তিষ্ক শান্ত হয় এবং গভীর ঘুম নিশ্চিত হয়
অতিরিক্ত চা বা কফি পান করা দিনে ২ কাপের বেশি কফি না খাওয়া স্নায়বিক অস্থিরতা কমে এবং সহজে ঘুম আসে
কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত মানসিক চাপ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নেওয়া বা চুপ থাকা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন কমে ও শান্ত থাকা যায়

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া শখের কোনো বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুস্থ জীবনের অন্যতম প্রধান শর্ত। কীভাবে এই সমাধানগুলো কাজে লাগাবেন, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

কাজের মাঝে ছোট বিরতি এবং দীর্ঘশ্বাস নেওয়ার ব্যায়াম

একটানা মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখ ও মস্তিষ্ক উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এই ছোট বিরতিগুলো মানসিক চাপকে একবারে জমতে দেয় না। বিরতির সময় মোবাইল ফোন ঘাঁটার বদলে চোখ বন্ধ করে কয়েকবার বুক ভরে শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে ছাড়ুন। অথবা জানালার বাইরে খোলা আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকুন। এই সাধারণ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম আপনার মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়িয়ে আপনাকে পুনরায় কাজে মন দিতে সাহায্য করবে।

রাতের পর্যাপ্ত ঘুম এবং ডিজিটাল পর্দা থেকে দূরে থাকা

সঠিক ও পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখে, হজমশক্তি বাড়ায় এবং পরের দিন বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ভালো ঘুমের জন্য বিছানায় যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ, টেলিভিশন বা মোবাইলের ক্ষতিকর নীল আলো থেকে দূরে থাকা উচিত। ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস করতে পারেন অথবা হালকা কোনো গান শুনতে পারেন। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে শরীর ও মনকে প্রাকৃতিকভাবে সতেজ করার জন্য গভীর ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।

Desk Job Health Routine for Healthy Lifestyle

৪. ছুটির দিনের সঠিক ব্যবহার এবং পুরো সপ্তাহের পূর্বপ্রস্তুতি

সারা সপ্তাহ নিয়ম মেনে চলার পর ছুটির দিনগুলোতে অনেকেই রুটিন পুরোপুরি ভেঙে ফেলেন। অতিরিক্ত ঘুম, বাইরের ভারী খাবার খাওয়া এবং শুয়ে-বসে সময় কাটানো পুরো সপ্তাহের পরিশ্রমকে নষ্ট করে দিতে পারে। অথচ একটু বুদ্ধি খাটিয়ে ছুটির দিনটিকে যদি আগামী সপ্তাহের প্রস্তুতির জন্য ব্যবহার করা যায়, তবে পুরো সপ্তাহ নিয়ম মেনে চলা অনেক সহজ হয়ে যায়।

ছুটির দিনের সঠিক পরিকল্পনা আপনার সময়, অর্থ এবং স্বাস্থ্য—তিনটিই বাঁচাতে সাহায্য করে। আসুন দেখি সাপ্তাহিক ছুটিতে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে।

ছুটির দিনের কাজ বা পরিকল্পনা কাজের ধরন ও বিবরণ শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা
সাপ্তাহিক বাজার আগে থেকে করে রাখা তাজা ফলমূল, শাকসবজি ও ডিম কিনে রাখা হাতের কাছে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা যায়
সপ্তাহের খাবারের পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া সবজি কেটে রাখা বা মসলা প্রস্তুত করা কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে রান্নার সময় ও ঝামেলা বাঁচে
ঘরের বাইরে শারীরিক কসরত করা পার্কে হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটা সারাসপ্তাহের বসে থাকার একঘেয়েমি দূর হয়
নিজের যত্ন নেওয়া বা শখের কাজ করা বই পড়া, মুভি দেখা বা বাগান করা সপ্তাহের জমে থাকা মানসিক চাপ সম্পূর্ণ দূর হয়

ছুটির দিন মানেই কেবল বিছানায় শুয়ে থাকা নয়, বরং নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে ভালো সময়। এই দিনটিকে কীভাবে কাজে লাগাবেন, তার কিছু উপায় নিচে দেওয়া হলো।

সপ্তাহের খাবারের পূর্বপ্রস্তুতি বা মিল প্রিপারেশন

পুরো ব্যস্ত সপ্তাহের জন্য পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা আগে থেকে করে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আগে থেকে খাবার প্রস্তুত থাকলে বা সবজি কাটা থাকলে অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে রান্না করার আলসেমি কাজ করে না। ফলে রাতের বেলা হুট করে খাবার অর্ডার করার প্রবণতাও একেবারে কমে যায়। রান্নার কাজে সাহায্য করার জন্য কাঁচের বা ভালো মানের প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার সংরক্ষণ করে ফ্রিজে রাখতে পারেন, যা আপনার প্রতিদিনের রান্নার সময় অর্ধেকের বেশি কমিয়ে আনবে।

প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো এবং মানসিক প্রশান্তি

সারা সপ্তাহ অফিসে এসির নিচে আবদ্ধ থাকার পর বাইরের খোলা বাতাস ও সকালের রোদ শরীর ও মনকে দারুণভাবে সতেজ করে। রোদে গেলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যা হাড় মজবুত করার পাশাপাশি মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। একবারে খুব ভারী বা কঠিন কোনো ব্যায়াম না করে নিজের সহ্যক্ষমতা অনুযায়ী অন্তত ৩০ মিনিট হালকা হাঁটা বা সাইকেল চালানো বেছে নিতে পারেন। পরিবারের সাথে কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসাও মানসিক প্রশান্তির জন্য দারুণ কাজ করে।

ব্যক্তিগত প্রতিফলন: রুটিন বনাম বাস্তবতার লড়াই

ডেস্ক জব এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের সাথে যুক্ত থাকার কারণে একটা দীর্ঘ সময় আমাকে একটানা ল্যাপটপের সামনে কাটাতে হয়েছে। শুরুতে কাজের চাপে দুপুরের খাবার বাদ দেওয়া বা রাত জেগে কাজ করার সময় ফাস্টফুডের ওপর নির্ভর করাটা আমার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এর ফলাফল হিসেবে খুব দ্রুতই পিঠের ব্যথা এবং ওজন বাড়ার মতো সমস্যাগুলো দেখা দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারি, স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে কাজের এই গতি বেশিদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়। আমি ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করি। প্রতিদিন সকালে ১৫ মিনিট হাঁটা এবং দুপুরে বাইরের খাবারের বদলে বাসা থেকে আনা সাধারণ খাবার খাওয়া শুরু করি। প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেশ কষ্টকর লাগলেও, ধীরে ধীরে শরীর এই নতুন রুটিনের সাথে মানিয়ে নেয়। এখন আমি বুঝি, শারীরিক সুস্থতা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। নিজের শরীরের প্রতি এই ছোট যত্নটুকুই আমাকে কাজের প্রতি আরও মনোযোগী এবং উদ্যমী করে তুলেছে।

কর্মব্যস্ত জীবনে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ধরে রাখার চূড়ান্ত পদক্ষেপ

একটানা ডেস্কে বসে কাজ করা এবং সহজে ফাস্টফুড পাওয়ার সুবিধা আমাদের বর্তমান কর্পোরেট জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাইলেই রাতারাতি এগুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমরা আমাদের স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি হতে দেব। সঠিক খাদ্যাভ্যাস বেছে নেওয়া, কাজের ফাঁকে ছোট শারীরিক নড়াচড়া, মানসিক চাপ কমানো এবং ছুটির দিনের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারি। মনে রাখবেন, সুস্থ থাকার কোনো শর্টকাট নেই, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস। আজই ছোট একটি পরিবর্তনের মাধ্যমে শুরু করুন—হয়তো কাল চায়ে চিনি খাওয়া বাদ দিলেন বা লিফটের বদলে একতলা সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন। এই ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোই একসময় আপনার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়াবে এবং আপনাকে উপহার দেবে একটি সুস্থ, সুন্দর ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করার পরও কি ওজন কমানো সম্ভব?

হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব। ওজন কমানোর মূল শর্ত হলো আপনি সারাদিনে যতটুকু শক্তি খরচ করছেন, তার চেয়ে কম ক্যালরি গ্রহণ করা। ডেস্কে বসে কাজ করলেও আপনি যদি মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করেন, প্রচুর পানি পান করেন এবং কাজের মাঝে নিয়ম করে একটু হাঁটেন, তবে খুব সহজেই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

২. কাজের চাপে বাইরের খাবার খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে?

এই আকাঙ্ক্ষা বা ক্রেভিং মূলত শরীরে পানির অভাব বা প্রোটিনের ঘাটতি থেকে তৈরি হয়। যখনই বাইরের কোনো অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে ইচ্ছে করবে, প্রথমে এক গ্লাস পানি পান করুন। হাতের কাছে ভাজা বাদাম, শসা বা কোনো ফল রাখুন। এগুলো খেলে পেট ভরা থাকে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়।

৩. সুস্থ জীবনযাপন শুরু করার একেবারে প্রথম ধাপটি কী হওয়া উচিত?

সবচেয়ে সহজ ও প্রথম ধাপ হলো পানি পানের পরিমাণ বাড়ানো এবং খাবারে আলাদা চিনি পরিহার করা। চা বা কফিতে চিনি খাওয়া ছেড়ে দেওয়া এবং বাইরের প্যাকেটজাত জুস বা কোল্ড ড্রিংকস বাদ দেওয়ার মাধ্যমেই আপনি শরীরে একটি বড় পরিবর্তন দেখতে পাবেন।

৪. সারাদিন কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের ওপর চাপ পড়ে, এর ঘরোয়া সমাধান কী?

চোখের চাপ কমাতে একটি সহজ নিয়ম মেনে চলতে পারেন। প্রতি ২০ মিনিট পর পর, কম্পিউটার থেকে চোখ সরিয়ে ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন। এটি চোখের পেশিকে আরাম দেয় এবং মাথা ব্যথা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

৫. ছুটির দিনে বেশি ঘুমালে কি সারাসপ্তাহের ক্লান্তি দূর হয়?

অতিরিক্ত ঘুম অনেক সময় উপকারের বদলে শরীরে আরও বেশি আলসেমি তৈরি করে। ছুটির দিনে সাধারণ সময়ের চেয়ে এক বা দুই ঘণ্টা বেশি ঘুমানো যেতে পারে, কিন্তু সারাদিন শুয়ে থাকলে তা রাতের স্বাভাবিক ঘুমকে ব্যাহত করে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার অভ্যাস ধরে রাখাটাই বেশি স্বাস্থ্যকর।

সর্বশেষ