স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতায় দ্রোহ ও দর্শন: শামসুর রাহমানের দেশভাবনা ও সাংস্কৃতিক লড়াই

সর্বাধিক আলোচিত

ঢাকার শহরকে শুধু রাস্তা, দালান আর মানুষের ভিড় দিয়ে চেনা যায় না। এই শহরের আরেকটি মানচিত্র আছে—যেখানে পল্টনের মিছিল, পুরান ঢাকার গলি, সংবাদপত্রের অফিসের রাত, রমনার গাছ, কারফিউ-নামা নিস্তব্ধতা, দেয়ালে লেখা প্রতিবাদ, শহীদ মিনারের সিঁড়ি আর মধ্যবিত্ত মানুষের ছোট ছোট উদ্বেগ একসঙ্গে জায়গা করে নেয়। সেই মানচিত্রের ওপর দিয়ে বহু দশক হেঁটেছেন শামসুর রাহমান। কখনো একা। কখনো জনতার সঙ্গে।

এ কারণেই তাঁকে ‘নাগরিক কবি’ বলা শুধু একটি সাহিত্যিক অভিধা নয়। তাঁর কবিতার শহর কোনো নির্জীব পটভূমি ছিল না; শহর নিজেই সেখানে একটি চরিত্র। এই ঢাকায় প্রেমিক জানালার পাশে দাঁড়ায়, আবার একই শহরে মিছিলের সামনে উঁচু হয়ে ওঠে আসাদের রক্তাক্ত শার্ট। এখানে নিঃসঙ্গ মানুষ নিজের মৃত্যুচিন্তা নিয়ে ঘরে ফেরে, আবার রাস্তায় বেরোলেই তাকে মুখোমুখি হতে হয় ভাষার অধিকার, স্বৈরশাসন, ধর্মান্ধতা কিংবা স্বাধীনতার অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির। ব্যক্তিগত বিষণ্নতা আর জনজীবনের উত্তাপ—শামসুর রাহমানের কবিতায় এরা কখনো পুরোপুরি আলাদা থাকে না।

তাঁর নাগরিকতা তাই শুধু ঢাকা শহরে বসবাসের অভিজ্ঞতা নয়। এটি ছিল এক ধরনের সচেতন উপস্থিতি। চারপাশে কী ঘটছে, রাষ্ট্র মানুষকে কোথায় আঘাত করছে, সমাজ কোন দিকে সরে যাচ্ছে, আর সেই সবকিছুর মাঝখানে একজন মানুষের ভেতর কী ভাঙছে—তিনি তা দেখেছেন কবির চোখে, কিন্তু লিখেছেন নাগরিকের দায় নিয়ে।

১৭ আগস্ট এলে সেই উপস্থিতির কথাই আরও বেশি মনে পড়ে।

২০০৬ সালের এই দিনে শামসুর রাহমান চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু যে শহর তাঁকে তৈরি করেছিল, যে শহরের ভয়, প্রেম, রক্ত, বিদ্রোহ আর স্বপ্ন তিনি কবিতায় ধরে রেখেছিলেন, সেই ঢাকা আজও প্রতিদিন নতুন করে তাঁর কবিতার ভেতর ঢুকে পড়ে। ট্রাফিকের শব্দ বদলেছে, আকাশরেখা বদলেছে, রাজনৈতিক স্লোগানও বদলেছে; বদলায়নি মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন, কিংবা রাষ্ট্রের সামনে নাগরিকের ভঙ্গুর দাঁড়িয়ে থাকা।

এই কারণেই তাঁর মৃত্যুদিবস শুধু একজন কবিকে স্মরণ করার দিন নয়। এটি আমাদের নিজেদের শহর, রাষ্ট্র এবং নাগরিক বিবেকের কাছেও ফিরে যাওয়ার দিন।

শামসুর রাহমানকে পড়া মানে তখন কেবল কবিতা পড়া নয়।
একটি দেশের নাগরিক আত্মপরিচয় পড়া।

এক জীবনের রেখাচিত্র

Shamsur Rahman biography

শামসুর রাহমানকে শুধু ‘স্বাধীনতার কবি’ বললে তাঁর বিস্তার ধরা পড়ে না। তাঁর জীবন পুরান ঢাকার গলি থেকে সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় কক্ষ, আধুনিক কবিতার নিঃসঙ্গতা থেকে স্বৈরাচারবিরোধী জনপরিসর—এক দীর্ঘ যাত্রা।

জীবনী ও কর্মজীবন এক নজরে

বিষয় তথ্য
জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯২৯, ৪৬ নম্বর মাহুতটুলি, পুরান ঢাকা; পৈতৃক নিবাস পাড়াতলী।
মৃত্যু ১৭ আগস্ট ২০০৬, ঢাকা। বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণে ১৮ আগস্ট লেখা হলেও সমসাময়িক ও পরবর্তী একাধিক নির্ভরযোগ্য নথি ১৭ আগস্ট নিশ্চিত করে।
শিক্ষা পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৪৫; ঢাকা কলেজ থেকে আইএ ১৯৪৭; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা। অনার্স চূড়ান্ত পরীক্ষা দেননি; ১৯৫৩ সালে বিএ পাস কোর্স সম্পন্ন করেন।
সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় পূর্ববাংলার নবীন আধুনিক কবিদের অন্যতম হিসেবে পরিচিতি; ১৯৫০ সালের নতুন কবিতা সংকলনে তাঁর পাঁচটি কবিতা ছিল। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত।
সাংবাদিকতা ১৯৫৭ সালে মর্নিং নিউজ-এ কর্মজীবন শুরু; পরে রেডিও পাকিস্তান, আবার মর্নিং নিউজ এবং ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তান-এ যোগদান। স্বাধীনতার পর পত্রিকাটি দৈনিক বাংলা হয়। ১৯৭৭–১৯৮৭ সময়ে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা-র সম্পাদকীয় নেতৃত্বে ছিলেন।
সাংস্কৃতিক ভূমিকা স্বৈরাচারবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সময় জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি; ১৯৯৬ সালের ১৯ আগস্ট থেকে ১৯৯৯ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলা একাডেমির সভাপতি।
প্রধান পুরস্কার আদমজী পুরস্কার ১৯৬৩; বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ১৯৬৯; জীবনানন্দ পুরস্কার ১৯৭৩; একুশে পদক ১৯৭৭; স্বাধীনতা পুরস্কার ১৯৯২; আনন্দ পুরস্কার ১৯৯৪। এছাড়া ১৯৯৪ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৯৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট দেয়।

নির্জন জানালা থেকে নাগরিক রাস্তায়

কোন শামসুর রাহমানকে আমরা আগে দেখি—প্রতিবাদের কবি, না নিঃসঙ্গ আধুনিক মানুষটিকে?

পঞ্চাশের দশকের তরুণ শামসুর প্রথমে কোনো রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র হাতে কবিতায় আসেননি। তাঁর পেছনে তখন তিরিশের আধুনিক কবিদের দীর্ঘ ছায়া—জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তদের নির্মিত নতুন কাব্যভাষা। প্রথম দিকের কবিতায় ছিল একাকিত্ব, প্রেম, শরীর, মৃত্যু, নগরজীবনের ক্লান্তি এবং অস্তিত্বের অস্পষ্ট বিষণ্নতা। প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা—এই পর্বে ব্যক্তিমানুষের ভেতরের অন্ধকারই অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। সাহিত্যসমালোচনায় তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় জীবনানন্দীয় প্রভাবের কথা বলা হয়েছে, যদিও অল্পকালেই তিনি নিজস্ব নাগরিক স্বর নির্মাণ করেন।

কিন্তু তাঁর শহর জীবনানন্দের কুয়াশার বাংলা নয়। এই শহরের নাম ঢাকা। এখানে হাসপাতাল আছে, ভিখিরি আছে, অফিসফেরত মধ্যবিত্ত আছে, অন্ধগলি আছে, সংবাদ আছে, রাষ্ট্রও আছে।

এইখানেই তাঁর বড় পরিবর্তন।

নিজের অন্তর্জগতের সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর সংঘর্ষ যত বাড়তে থাকে, তাঁর কবিতায় ‘আমি’ ধীরে ধীরে ‘আমরা’র দিকে সরে যায়। নাগরিক নিঃসঙ্গতা মিশে যায় নাগরিক দায়ে। নিজ বাসভূমে এসে সেই যাত্রা আর আড়ালে থাকে না।

রক্তাক্ত শার্টের সামনে কবির দাঁড়ানো

ভাষা আন্দোলন কি শামসুর রাহমানকে একদিনেই রাজনৈতিক কবিতে পরিণত করেছিল?

না। ইতিহাস এত সরল নয়।

বায়ান্ন তাঁর প্রজন্মের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ভিত বদলে দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর প্রকাশ্য প্রতিবাদী কবিস্বর ধীরে ধীরে ষাটের দশকের ঘটনাপুঞ্জে তীক্ষ্ণ হয়। ১৯৬৭ সালে রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার সীমিত করার সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে তিনি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। ১৯৬৮ সালে বাংলা-সহ পাকিস্তানের ভাষাগুলোর ওপর অভিন্ন রোমান হরফ চাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও তিনি অবস্থান নেন; সেই সাংস্কৃতিক সংকটের আবহ তাঁর বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতার পটভূমির সঙ্গে যুক্ত।

তারপর ১৯৬৯।

২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট মিছিলের সামনে উঁচু করে ধরার দৃশ্য তাঁকে আলোড়িত করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় আসাদের শার্ট। ব্যক্তিগত বিষণ্নতার কবি তখন জনতার ইতিহাসের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন।

তবু তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাকে নিখুঁত সরলরেখা বানানো ঠিক হবে না। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের উত্তেজনায় তিনি কয়েকটি যুদ্ধবিষয়ক কবিতা ও একটি ছোট কাব্যনাটকও লিখেছিলেন; পরে সেগুলো তাঁর কাব্যগ্রন্থে নেননি এবং তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী সেগুলোর অভিপ্রায় ছিল যুদ্ধোন্মাদনা নয়, শান্তির পক্ষ নেওয়া। এই পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন কবির রাজনৈতিক চেতনা জন্মগতভাবে প্রস্তুত থাকে না।

তাও তৈরি হয়।
ভুলের ভেতর দিয়েও।

অবরুদ্ধ দেশের ভিতর স্বাধীনতার ভাষা

একাত্তর এলে শামসুর রাহমানের কবিতার সামনে আর নিরাপদ দূরত্ব রইল না।

যুদ্ধের শুরুতে তিনি পরিবারসহ নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই এপ্রিলের প্রথম দিকে রচিত হয় স্বাধীনতা তুমিতোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা—যে দুটি কবিতা পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাব্যিক স্মৃতির সঙ্গে প্রায় অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়।

তিনি দেশ ছেড়ে নিরাপদ প্রবাসে যাননি। অধিকৃত বাংলাদেশের আতঙ্কের মধ্যেই লিখেছেন। তাঁর কয়েকটি যুদ্ধকালীন কবিতা কলকাতার দেশ পত্রিকায় ‘মজলুম আদিব’ ছদ্মনামে ছাপা হয়েছিল, কারণ স্বনামে প্রকাশ তাঁর নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হতে পারত। যুদ্ধশেষে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে কলকাতার অরুণা প্রকাশনী থেকে বন্দী শিবির থেকে প্রকাশিত হয়; প্রথম সংস্করণটি ছিল পরবর্তী পরিচিত সংস্করণের তুলনায় অনেক ছোট।

আমার কাছে এখানে শামসুর রাহমানের কৃতিত্ব শুধু ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি উচ্চারণে নয়। বরং স্বাধীনতাকে তিনি বিমূর্ত রাষ্ট্রতত্ত্ব থেকে নামিয়ে এনেছিলেন মানুষ, রাস্তা, নদী, গ্রাম, শহর ও দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে।

স্বদেশ যখন নিজের মুখ দেখে ভয় পায়

যুদ্ধ শেষ হলেই কি প্রতিবাদের কবির কাজ শেষ হয়?

শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে বরং নতুন জটিলতা শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা আর স্বাধীন রাষ্ট্রের বাস্তবতার ব্যবধান তাঁকে ক্রমশ অস্বস্তিতে ফেলে। দুঃসময়ে মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে—একটির পর একটি গ্রন্থে স্বাধীনতার পরের হতাশা, হত্যা, ক্ষমতার বিকৃতি, সামরিক শাসন ও আদর্শচ্যুতির ছায়া ফিরে আসে। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ সেই রাজনৈতিক হতাশার সবচেয়ে স্মরণীয় কাব্যিক চিহ্নগুলোর একটি।
ততকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে তাঁর একসময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথাও আছে। অথচ পরে তিনিই স্বৈরাচারবিরোধী কবি-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সম্মুখসারিতে দাঁড়ান, জাতীয় কবিতা পরিষদের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৮৭ সালে দৈনিক বাংলা-র চাকরি ছেড়ে দেন।

এই দ্বন্দ্ব তাঁকে ছোট করে না; বরং মানুষটিকে বাস্তব করে। রাজনৈতিক নৈতিকতা অনেক সময় প্রস্তুত মূর্তি নয়। তাকে অর্জন করতে হয়।

কুঠারের মুখে অসাম্প্রদায়িকতার শপথ

শামসুর রাহমানের দর্শনের কেন্দ্রে কোনো সুসংহত দার্শনিক মতবাদের বই ছিল না। ছিল মানুষ।

ব্যক্তিস্বাধীনতা, যুক্তিবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিসর, বাঙালির ভাষাগত পরিচয় এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা—এই কয়েকটি রেখা তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে বারবার ফিরে এসেছে। বাংলাপিডিয়াও তাঁর কাব্যচরিত্রে ‘সকল সংকীর্ণতামুক্ত উদার মানবিক মূল্যবোধ’-এর কথা বিশেষভাবে চিহ্নিত করে।

এই অবস্থানের মূল্যও দিতে হয়েছে।

১৮ জানুয়ারি ১৯৯৯ সালে ঢাকার বাসায় তাঁর ওপর হত্যাচেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তী তদন্ত ও সংবাদনথিতে নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যদের ওই হামলার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথাবলা হয়; হামলায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান, তাঁর স্ত্রী আহত হন।

কলমের বিরুদ্ধে অস্ত্র।

ঘটনাটি তাঁর সাংস্কৃতিক অবস্থানের অর্থকে আরও স্পষ্ট করে। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে অবজ্ঞা করার প্রকল্প ছিল না; ছিল ধর্মের নামে ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিল্প ও বহুত্ববাদকে দমন করার বিরোধিতা। এখানেই তাঁর মানবতাবাদ রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

কবিতা কি কখনো স্লোগানে ক্ষয়ে যায়?

তবু শামসুর রাহমানকে শ্রদ্ধা করার সবচেয়ে ভালো উপায় তাঁকে প্রশ্নের বাইরে রাখা নয়।

তাঁর বিপুল রচনার মান সর্বত্র সমান—এ দাবি করা কঠিন। বাংলাপিডিয়ার মূল্যায়নেও ১৯৭১-পরবর্তী বিপুলসংখ্যক গ্রন্থের মধ্যে কাব্যিক উচ্চতার ওঠানামার কথা বলা হয়েছে। তাঁর কবিতায় কখনো অতিরিক্ত চিত্রকল্প বক্তব্যকে ভারী করেছে—এমন সমালোচনাও আছে।

আরও একটি তর্ক দীর্ঘদিন ধরে আছে। রাজনৈতিক ঘটনার এত দ্রুত কাব্যিক প্রতিক্রিয়া কি কোনো কোনো কবিতাকে স্লোগানের কাছাকাছি নিয়ে যায়? আবার বিপরীত প্রশ্নটিও জরুরি—রাষ্ট্র যখন মানুষের ভাষা, স্বাধীনতা বা ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়, তখন কবি যদি ‘বিশুদ্ধ কবিতা’র নিরাপদ কক্ষে বসে থাকেন, সেটিই বা কতটা নৈতিক?

শামসুর রাহমানের উত্তর তাঁর সমগ্র রচনায়। তিনি রাজনৈতিক কবিতা লিখেছেন, কিন্তু প্রেমের কবিতা ছাড়েননি। নাগরিক বিষণ্নতা ছাড়েননি। মৃত্যু, বার্ধক্য, স্মৃতি, শরীর, সৌন্দর্য, পুরাণ—কিছুই ছাড়েননি। সমালোচকেরা যথার্থই মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে শুধু ‘জাতীয়তাবাদী কবি’ বা কয়েকটি বিখ্যাত রাজনৈতিক কবিতার রচয়িতা বানালে তাঁর নাটকীয় স্বগতোক্তি, দৈনন্দিন জীবন ও বিশাল বিষয়বৈচিত্র্য আড়ালে পড়ে যায়।

কবি নাগরিক।
নাগরিকও কবি।

সম্পাদকীয় ডেস্কের পাশেই ছিল আরেক বাংলাদেশ

শামসুর রাহমানের কবিতার নাগরিকতা বোঝার জন্য তাঁর সাংবাদিক জীবনকে আলাদা করে রাখা যায় না। সংবাদপত্রের অফিসে প্রতিদিন ইতিহাস আসে অসম্পূর্ণ বাক্যে—হত্যা, নির্বাচন, মিছিল, দুর্ঘটনা, ক্ষমতার বিবৃতি, মানুষের ক্ষুদ্র সুখ ও বড় বিপর্যয়। সেই দৈনিক বাস্তবতার সংস্পর্শ তাঁর কবিতায় সংবাদকে কখনো সংবাদ হিসেবেই রাখেনি; তাকে চিত্রকল্পে, ব্যঙ্গে কিংবা নাগরিক স্মৃতিতে বদলে দিয়েছে। বাংলাপিডিয়াও তাঁর কবিতায় সাংবাদিকতার উপাদানের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ করেছে।

দৈনিক বাংলাবিচিত্রা-য় তাঁর দীর্ঘ সম্পাদকীয় ভূমিকা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও প্রভাব রেখেছিল। পরে জাতীয় কবিতা পরিষদের নেতৃত্ব এবং ১৯৯৬–১৯৯৯ সময়ে বাংলা একাডেমির সভাপতিত্ব তাঁকে কেবল লেখক নয়, বাংলাদেশের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানজগতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত করে।

তাঁর পরের প্রজন্ম তাঁকে অনুসরণও করেছে, অস্বীকারও করেছে। সেটিই স্বাভাবিক। বড় কবির প্রভাব শুধু অনুকরণে বোঝা যায় না; তাঁকে অতিক্রম করার চেষ্টা দিয়েও বোঝা যায়।

Themes of Shamsur Rahman's Poetry

গ্রন্থের দীর্ঘ নদী

সাহিত্যকর্মের সম্পূর্ণ তালিকা

ধরন গ্রন্থ ও প্রকাশবর্ষ
কাব্যগ্রন্থ: ১৯৬০–১৯৭৮ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০); রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩); বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭); নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮); নিজ বাসভূমে (১৯৭০); বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২); দুঃসময়ে মুখোমুখি (১৯৭৩); ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা (১৯৭৪); আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি (১৯৭৪); এক ধরনের অহংকার (১৯৭৫); আমি অনাহারী (১৯৭৬); শূন্যতায় তুমি শোকসভা (১৯৭৭); বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে (১৯৭৭); প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে (১৯৭৮)।
কাব্যগ্রন্থ: ১৯৮১–১৯৮৯ প্রেমের কবিতা (১৯৮১); ইকারুসের আকাশ (১৯৮২); মাতাল ঋত্বিক (১৯৮২); উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২—কিছু তালিকায় ১৯৮৩); কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি (১৯৮৩); নায়কের ছায়া (১৯৮৩); আমার কোনো তাড়া নেই (১৯৮৪); যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে (১৯৮৪); অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই (১৯৮৫); হোমারের স্বপ্নময় হাত (১৯৮৫); শিরোনাম মনে পড়ে না (১৯৮৫); ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই (১৯৮৫); ধুলায় গড়ায় শিরস্ত্রাণ (১৯৮৫); এক ফোঁটা কেমন অনল (১৯৮৬); টেবিলে আপেলগুলো হেসে ওঠে (১৯৮৬); দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে (১৯৮৬); অবিরল জলভূমি (১৯৮৬); আমরা ক’জন সঙ্গী (১৯৮৬); ঝর্ণা আমার আঙুলে (১৯৮৭); স্বপ্নেরা ডুকরে ওঠে বারবার (১৯৮৭); খুব বেশি ভালো থাকতে নেই (১৯৮৭); মঞ্চের মাঝখানে (১৯৮৮); বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় (১৯৮৮); হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো (১৯৮৯)।
কাব্যগ্রন্থ: ১৯৯০–১৯৯৯ সে এক পরবাসে (১৯৯০); গৃহযুদ্ধের আগে (১৯৯০); খণ্ডিত গৌরব (১৯৯২); ধ্বংসের কিনারে বসে (১৯৯২); হরিণের হাড় (১৯৯৩); আকাশ আসবে নেমে (১৯৯৪); উজাড় বাগানে (১৯৯৫); এসো কোকিল এসো স্বর্ণচাঁপা (১৯৯৫); মানব হৃদয়ে নৈবেদ্য সাজাই (১৯৯৬); তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন (১৯৯৬); তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি (১৯৯৭); হেমন্ত সন্ধ্যায় কিছুকাল (১৯৯৭); ছায়াগণের সঙ্গে কিছুক্ষণ (১৯৯৭); মেঘলোকে মনোজ নিবাস (১৯৯৮); সৌন্দর্য আমার ঘরে (১৯৯৮); রূপের প্রবালে দগ্ধ সন্ধ্যা রাতে (১৯৯৮); টুকরা কিছু সংলাপের সাঁকো (১৯৯৮); স্বপ্নে ও দুঃস্বপ্নে বেঁচে আছি (১৯৯৯)।
কাব্যগ্রন্থ: ২০০০–২০০৬ নক্ষত্র বাজাতে বাজাতে (২০০০); শুনি হৃদয়ের ধ্বনি (২০০০); হৃদপদ্মে জ্যোৎস্না দোলে (২০০১); ভগ্নস্তূপে গোলাপের হাসি (২০০২); ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছে (২০০৩); গন্তব্য নাই বা থাকুক (২০০৪); কৃষ্ণপক্ষে পূর্ণিমার দিকে (২০০৪); গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান (২০০৫); অন্ধকার থেকে আলোয় (২০০৬); না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন (২০০৬)।
উপন্যাস অক্টোপাশ (১৯৮৩); অদ্ভুত আঁধার এক (১৯৮৫); নিয়ত মন্তাজ (১৯৮৫); এলো সে অবেলায় (১৯৯৪)।
স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী স্মৃতির শহর (১৯৭৯); কালের ধুলোয় লেখা (২০০৪)। শেষোক্তটি আগে দৈনিক জনকণ্ঠ-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
শিশু-কিশোর ও ছড়া এলাটিং বেলাটিং (১৯৭৪); ধান ভানলে কুঁড়ো দেব (১৯৭৭); গোলাপ ফোটে খুকীর হাতে (১৯৭৭); রংধনুর সাঁকো (১৯৯৪); লাল ফুলকির ছড়া (১৯৯৫); নয়নার জন্য (১৯৯৭); আমের কুঁড়ি জামের কুঁড়ি (২০০৪); নয়নার জন্য গোলাপ (২০০৫)। বাংলাপিডিয়া আটটি ছড়ার বইয়ের কথা উল্লেখ করে; স্মৃতির শহর কিশোরপাঠ্য হলেও এখানে স্মৃতিকথা হিসেবে আলাদা রাখা হয়েছে।
অনূদিত কবিতা ফ্রস্টের কবিতা (১৯৬৬); রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা (১৯৬৮); খাজা ফরিদের কবিতা—কিছু গ্রন্থপঞ্জিতে ১৯৬৮, বাংলাপিডিয়ায় ১৯৬৯; তাই বছরটি উৎসভেদে ভিন্ন।
অনূদিত নাটক মার্কোমিলিয়ান্‌স্‌ (ইউজিন ও’নীল, ১৯৬৭); হৃদয়ের ঋতু (টেনেসি উইলিয়মস, ১৯৭১); হ্যামলেট (উইলিয়ম শেক্সপিয়র, টীকা ও ভূমিকাসহ গ্রন্থাকারে ১৯৯৫)।
প্রবন্ধ, কলাম ও অন্যান্য গদ্য আমৃত্যু তাঁর জীবনানন্দ (১৯৮৬); শামসুর রাহমানের প্রবন্ধ (২০০১); একান্ত ভাবনা (২০০১); কবিতা এক ধরনের আশ্রয় (২০০২); কবে শেষ হবে কৃষ্ণপক্ষ (২০০৬)। বিভিন্ন গ্রন্থপঞ্জিতে শামসুর রাহমানের গল্প নামের গল্পসংকলনের উল্লেখ আছে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য উৎসে এর প্রথম প্রকাশবর্ষ একভাবে নিশ্চিত করা যায়নি বলে এখানে বছর আরোপ করা হলো না।

এই দীর্ঘ তালিকার দিকে তাকালে এক ধরনের বিস্ময় হয়। এত বই কি সব সমান জরুরি? নিশ্চয়ই নয়। কোনো কবির ক্ষেত্রেই তা হয় না। কিন্তু সংখ্যার ভেতর আরেকটি সত্য আছে—শামসুর রাহমান কবিতাকে জীবনের পাশে রাখা কোনো অবসরের কাজ ভাবেননি। তিনি তাকে জীবনযাপনের কেন্দ্রে রেখেছিলেন।

আগস্টের ভেজা আলোয় যে কণ্ঠ ফিরে আসে

শামসুর রাহমান আমাদের এমন এক অস্বস্তিকর উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন, যেখানে স্বাধীনতার অর্থ বারবার পরীক্ষা করতে হয় স্বাধীন রাষ্ট্রের ভেতরেই; যেখানে ভাষার অধিকার অর্জন করলেই সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা চিরস্থায়ী হয়ে যায় না; যেখানে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সঙ্গে নিজের আগের আপস বা দ্বিধাকেও দেখতে হয়; যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো অলংকার নয়, কখনো জীবনঝুঁকির অবস্থান; এবং যেখানে কবিকে একই সঙ্গে নিজের নিঃসঙ্গতা ও জনতার ভাঙা স্বপ্নের দায় বহন করতে হয়।

আমার কাছে তাঁর দেশভাবনার সবচেয়ে স্থায়ী শিক্ষা এখানেই। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবেসেছেন বলেই বাংলাদেশকে প্রশ্ন করেছেন। প্রশংসা করেননি শুধু। ক্ষতও দেখিয়েছেন।

সেটিই সাংস্কৃতিক ভালোবাসার কঠিন রূপ।

১৭ আগস্ট আবার আসবে। ঢাকার আকাশে হয়তো মেঘ থাকবে, হয়তো থাকবে নির্মম রোদ। ভেজা রাস্তায় মানুষ দ্রুত হাঁটবে। কোথাও কোনো তরুণ প্রথমবার পড়বে আসাদের শার্ট, কেউ খুলবে বন্দী শিবির থেকে, কেউ হয়তো তাঁর রাজনৈতিক কবিতাকে অতিরিক্ত উচ্চকিত বলে সরিয়ে রাখবে, তারপর অন্য কোনো নিঃসঙ্গ কবিতায় হঠাৎ নিজের মুখ দেখতে পাবে।

কবি হয়ত তখন অনুপস্থিত।

কিন্তু তাঁর কণ্ঠটি থাকবে।

সর্বশেষ